X
শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১, ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

করোনার করুণ কাহিনি: কান্নার কোরবানি ও প্রাণশক্তির বেলোর্মি

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২১, ১৬:১৫

মাকসুদুল হক ‘দেশপ্রেম হলো রাষ্ট্রকে নিঃস্বার্থ সমর্থন করা এবং সরকারকে যদি সে সমর্থনযোগ্য হয়—মার্ক টয়েন (১৮৩৫-১৯১০)

১. লকডাউন শিথিল করার সমর্থন:

আজকের লেখা শুরু করছি আমাদের জাতীয় জীবনে এ মুহূর্তের সবচেয়ে বার্নিং কোয়েশ্চন নিয়ে।

এই ভয়াল মহামারির মৃত্যু ও সংক্রমণ বৃদ্ধির ঊর্ধ্বগতির কথা ভালো জেনেও সরকারের ১৫ জুলাই থেকে ২৩ জুলাই লকডাউন শিথিল করার প্রজ্ঞাপন দেশপ্রেমী জনগণ সমর্থন করে—কী, করে না?

নিঃসন্দেহে অতি কম জানা জনগণ অত কিছু জানুক আর না জানুক, বুঝুক আর না বুঝুক—সে এতটুকু জানে ও এতটুকু বোঝে যে সে নিজে কিছুই জানে না ও কিছুই বোঝে না। সে ‘বিলকুল বেকুব’। 

পেটের জ্বালায় যার দিন কাটে তাকে যা বলবেন সে তা-ই বিশ্বাস করবে নীরবে ও নিভৃতে। তবে যতই সে ‘বেকুব’ হোক, যতই তাকে শোষণ-শাসন-নিপীড়ন করেন—সে তার অদ্ভুত এক প্রাণশক্তির ওপরে ভর করে বেঁচে থাকে।

সেই শক্তিকে সে বহু নাম ডাকে—শিবশক্তি, কুণ্ডলিনী, জীবাত্মা, কাহারসিলাবিয়া, তাওয়াক্কুল ইত্যাদি এবং তার অর্থ না বুঝলেও সে তার আত্মাতে শক্তভাবে ধারণ করে ও তার পবিত্র আত্মার সঙ্গে কখনোই বিশ্বাসঘাতকতা করে না।

এই সরল স্বীকারোক্তি জনগণ করছে, কারণ আগামী ২১ জুলাই ২০২১ পবিত্র ঈদ উল আজহা তথা কোরবানি ঈদ। তা পালন করার ক্ষেত্রে যেকোনও বাধা কেউ সহজে মানতে রাজি না হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক।

সরকারের কাছে শাশ্বত বিজ্ঞানের সব তথ্য-উপাত্ত নখদর্পণে থাকা সত্ত্বেও এই ভয়াবহ আত্মঘাতী ঝুঁকি নেওয়াটা ‘সাহসী’ বলা একেবারেই ভুল হবে না।

তবে একটু ক্ষান্ত দিন। আমরা আজ সরকারের সাফাই গাইতে মঞ্চে উঠিনি এবং তেমনটা মনে করা হবে খুবই দুঃখজনক ও অযাচিত।

খেটে-খাওয়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দেশের ৮০ শতাংশ জনগণের সম্মুখে কেবল দুটি স্পষ্ট পথ খোলা। 

আমরা অনাহারে নাকি ভাইরাসের ছোবল খেয়ে মরবো?

দৃশ্যমান শত্রুর বিরুদ্ধে স্বাধীনতার স্বপ্নে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হওয়ার বাংলাদেশে—এক অদৃশ্য শত্রু ক’টা প্রাণই বা কেড়ে নিতে পারে? ১-২ লাখ?

না, এই প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশ তো অনেক দূরের কথা—পৃথিবীর কেউ দিতে পারবে না।

আতঙ্কপ্রবণ ‘বাঘ আসছে বাঘ আসছে’ ঘন ঘন বিপদ সংকেত বাজানো ‘মিডিয়ার মানুষ’ আমরা নই ও নিঃসংকোচে স্বীকার করি সরকারের কাছেও এই দুটি অপশনের যেকোনও একটি বাছাই করা ছাড়া আর কি কিছু করার ছিল?

কী করবেন আপনারা যখন ‘বাঘমামা’ আসলেই এসে হাজির হয়েছেন ও গড়ে প্রতিদিন ২০০ মানুষ খাচ্ছেন—এমনকি ঢাকা নামের ‘কংক্রিট জঙ্গল’-এ?

তবে আমরা নিরক্ষর জনগণের ইদানীংকার ‘থিম সং’ ‘আমি বাঘ শিকার যামু/ বন্দুক লইয়া রেডি হইলাম আমি আর মামু’।  আমরা লড়াই করতে চাই। অদৃশ্য বাঘকে খতম করতে চাই।

গরিব মরার সময়েও হাসিমুখে গান করতে জানে—যেমনটা সে করেছিল একাত্তরে। যুদ্ধে বিধ্বস্ত বাংলাদেশে ‘কান্দে আবার হাসতে জানে’ ছিল জাতির পিতার প্রিয় গান।

এ হলো অত্যন্ত ক্ষারকীয় সমীকরণ—তা রাষ্ট্রচিন্তার মোটা মাথাগুলোকে ঘোলা করে অচেতন করতে বাধ্য।

সরকারের এই দৃঢ় সংকল্প ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ বা ‘সাপ মারবো কিন্তু লাঠি ভাঙবে না’ প্রচলিত প্রবাদবাক্যগুলোর সঙ্গে তুলনা করা গেলেও যেতে পারে—তবে সেই তুলনা হবে করোনার মতো নিদারুণ নিষ্ঠুর ও করুণ।

সরকার যে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এক নিগূঢ় বাধ্যবাধকতার মাঝে দিন কাটাচ্ছে তা জনগণ ভালোই উপলব্ধি করে।

একদিকে হতদরিদ্রের ‘ভাত দে ভাত দে’ আর্তচিৎকার অপরদিকে ব্যবসায়ীদের ‘সবকিছু খুলে দে’ বিরামহীন দাবি।

প্রশ্ন হলো রাষ্ট্রের এই ব্যবসায়ী শ্রেণির লুণ্ঠনের রাজত্বে ১৬ কোটি জনগণকে ‘ভাতে-ডালে’ একবেলাও কি খেয়ে বাঁচিয়ে রাখার সামর্থ্য আছে?

নেই। কারণ, নব্য ব্যবসায়ী শ্রেণি মানবজীবনের চেয়েও মুনাফাকে বেশি তারিফ করে। তাদের কত টাকা আছে তা তারা জানে—কিন্তু কতটা সময় আছে তা জানে না।

তাদের আত্মার ও কলিজার সাইজ খুবই ছোট।

তারা কিছু পারুক আর না পারুক, জনসংখ্যার ১ শতাংশ বা তারও কম হলেও রাষ্ট্রসহ সরকারকে নানাবিধ অজুহাত দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করারও ক্ষমতা রাখে।

এই একরোখা দাম্ভিকতা অথচ তাদের কোনও কিছুরই কমতি নেই।

তারা ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে কালো টাকা সাফেদ করার আইন পাস করালেও তার নিজের লোভ-লালসা থামানোর আইনে বিশ্বাসী না।

সমগ্র বাংলাদেশ আজ ব্যবসায়ী শ্রেণির খপ্পরে। জনগণের ভাগ্যকে রেখেছে জিম্মি, কেবল তার একান্ত ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধার করার উদ্দেশ্যে।

তাদেরই একজনের বিস্কুট ফ্যাক্টরিতে কয়েক ডজন ছোট নিরীহ গরিবের সন্তানদের আগুনে দগ্ধ হয়ে ছাই করে দিলেও তাদের দিলে একটুও রহম আসে না।

বড়জোর কয়েক দিন কারাগারের ‘বিরিয়ানি খাবার শাস্তি’ পেলেও পেতে পারে। তার ক’দিন পর তারই নিজেদের ‘মাজহাব’-এর ভাই-ব্রাদারগণ দ্বারা রাষ্ট্রকে হালকা কুস্তির পটকন দিয়ে, জামিন নিতে পারলেই—আমরা সবাই বিষয়টা সারা জীবনের জন্য ভুলে যাই।

সরকার এই ‘সাহসী’ পদক্ষেপ নিতে পেরেছে, কারণ গরিবের দুর্দান্ত বেকুবি সাহস যথেষ্ট চিন্তার উপাদান রাখে।

সে গেলো ১৬ মাসে ‘করোনায় আমগো কিসুই হইবো না। হেইডা দাহা শহরের বড় লোকের রুগ’— ধারণা কি নিতান্তই কল্পকাহিনি ছিল?

জেলা শহর গ্রামাঞ্চলে না ছিল করোনার লক্ষণীয় কোনও প্রমাণ, না ছিল সংক্রমণের কোনও ঝুঁকি। তাদের এই সুখ শহুরে বড় লোক শ্রেণি আর সহ্য করতে পারলো না।

গেলো রমজানের ‘খুশির ঈদের’ বাড়িতে ফেরা জনগণ দ্বারা সংক্রমণ ঘটিয়ে, গরিবের কপালে বাড়িটা দিয়ে উপচে-পড়া মহাআনন্দে—‘দিজ ডার্টি পিপল, ল্যাংটা পিপল’দের ‘সো স্যাড বাট কুল’ বাউল সং গাইতে গাইতে ঢাকা ফিরিলো।

২. গরুর “সীমিত পরিসরে” সমাচার:

দু’মাস দশ দিন পর:

‘ওইসব লকডাউন ফকডাউন বুঝি কম। গরু না খাইতে দিলে আমি লীগরে আস্ত খাইয়্যা ফালামু হুম’ হুমকি দিয়ে সেই আগের কাউন্টার ঘুঁটি চাল দিয়া বসলো।

যুক্তি: ‘ম্যান ৪০ লক্ষ টাকার আমেরিকার টেক্সান বুল কি বুলশিট করার জন্য অনলাইন-এ অর্ডার দিয়েছি?’

‘আফ্টার অল আল্লাহর সন্তুষ্টি তো লাভ করতে হবে ভাই’।

হুজুরগণ পেছন থেকে ‘খতরনাক রুহানি’ চেহারায় তর্জনী ঝাঁকিয়ে এন্ডোর্সমেন্ট দিলেন—“হুমম কথা ঠিক না?— ঠিক ঠিক ঠিক”—জবর জবর তিন বড়!

এ মতো অবস্থায় আপনারাই বলুন আনস্মার্ট জনগণ কী করবে, বা তার কী করার আছে?

‘জাস্ট গিভ ডেম অ্যা লট অফ গরুর গোশত। ডিজ পুওর পিপল নিড প্রোটিন’।

ঈদের দিন গরিব দুই টুকরো মাংস পাবে তাতেই সে মহাখুশি।

আর ‘গরুর রচনা’? থাক...

৩. আত্মরক্ষার কৌশলের প্রতুলতা ও শত্রুর অনুপ্রবেশ:

জীবনে দুটো যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা আমার আছে।

তবে যেকোনও যুদ্ধে ‘সিভিল ডিফেন্স’ বা বেসামরিক আত্মরক্ষার বহু কৌশল রাষ্ট্র জনগণকে শিক্ষায় শিক্ষিত কেবল করে না—তা মানতে বাধ্য করা হয়।

করোনা নিঃসন্দেহে একটা যুদ্ধ এবং বলতে একটুও দ্বিধা নেই যে তা ‘অঘোষিত তৃতীয় মহাযুদ্ধ’।

যেহেতু মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ—শত্রুর মূল অস্ত্র মিথ্যাকে সত্য বানানো ও সত্যকে মিথ্যা বানিয়ে আপনাদের কনভিন্স করা।

গোয়েবেল কেবল হিটলারের প্রোপাগান্ডা মন্ত্রীর নাম ছিল না। সে ছিল তথ্য দ্বারা সত্য গোপন করার এক ‘জীবন্ত সত্তার’ নাম।

মস্তিষ্ক ধোলাইয়ের কিংবদন্তি।

সেই সত্তা আজ ফাইন টিউনড হয়ে তথাকথিত ‘আলোকন ও বিশ্বায়ন’-এর যুগে আমাদের গোলকধাঁধার চক্করের ফাঁদে ফেলে মানবমস্তিষ্ক দংশন করতে হাজির হয়েছে আমাদের দ্বারপ্রান্তে এবং এসেছে রঙ-বেরঙের ছদ্মবেশে। 

আমরা আমাদের বেকুবিতে তাকে নির্দ্বিধায় অনুপ্রবেশ অধিকার দিয়েছি বৈঠকখানা থেকে শয়নকক্ষ হয়ে শৌচাগার অবধি ।

বাপদাদা, মুরুব্বিরা এ কি জিনিস তা বোঝানোর জন্য একটা ইংরেজি সংজ্ঞা ব্যবহার করতো ‘ইডিয়ট বাক্স’ বা ‘বেআক্কেলের ভাণ্ড’।

ওটা আবার কী?

‘আক্কেলমান-এর জন্য ইশারাই যথেষ্ট’– বাকিটা আক্কেল খাটিয়ে বুঝে নিন।

এরপর যা লিখবো তা হবে সান্ধ্য ভাষায় —যারা “বুঝতে” চান বুঝে নিয়েন নিজগুণে।

মহামারি যুদ্ধে যেসব আত্মরক্ষার কৌশল ইদানীং শেখানো হচ্ছে তা খুবই অপ্রতুল এবং আমাদের জনগণকে বিন্দুমাত্র নিরাপদ কোনোভাবেই রাখতে পারে না।

আসুন একেকটা করে আলাপ করা যাক:

– হাত ধৌতকরণ বা স্যানিটাইজারের ব্যবহার নিয়ে কোথাও কোনও উচ্চবাচ্য আর তেমন নেই। তা বাতিলের খাতায় চলে গেছে। কেন?

তা আপনারা না জানলেও একটা শক্ত যুক্তির কাছে বেদম পিটুনি খেয়ে সে ভেগে গেছে।

জনগণের এক বিলকুল বেকুব বলে বসলো:

‘এমনি এক ভাইরাস যা দুই ডোজ ভ্যাকসিন দিলেও মরে না কিন্তু সাবান দিয়ে দুই হাতে ডলা দিলেই সে মরে যায়... বেচারা।’

বিষয়টা মোটেও অদ্ভুত না— এ বহুজাতিক বেনিয়া প্রসাধনী কোম্পানিগুলোকে ৯৯.৯ পার্সেন্ট “অদ্ভুত ভূত” বাঁচানোর ধান্দা।

– ‘মাস্ক মাস্ক আর মাস্ক’–কেবল বাংলাদেশে নয়, সমগ্র বিশ্বে তেমন সিরিয়াস পাত্তা পাচ্ছে না। পাবে না তার কারণ?

করোনা বায়ুবাহিত ভাইরাস তেমন কনফারমেশন পাওয়া যাচ্ছে না।

– সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং বা শারীরিক দূরত্ব—সেটা কোথাও কোনও দেশে ১০০ ভাগ কার্যকর করা যাচ্ছে না। অর্থাৎ ‘ধরার উপরে সরার’ জ্ঞানের ফ্লপ।

– ভ্যাকসিন? বাংলাদেশের ১ কোটি মানুষের দেহে এ অবধি কী দেওয়া হয়েছে?

যদি ৫ বছরেও সমগ্র দেশে দেওয়া হয় তাহলে এই মধ্যবর্তী সময়ে মানুষ কি মরতেই থাকবে?

কতজন মারা যাবে তা কি হানড্রেড পার্সেন্ট গ্যারান্টি দিয়ে কেউ বলতে পারবেন?

৪. সুশক্তি বনাম কুশক্তি:

এই মহামারি যুদ্ধ হচ্ছে এনার্জি বা শক্তির খেলা।

খেয়াল করবেন শুধু পজিটিভ (ইতিবাচক) আর নেগেটিভ (নেতিবাচক) নিয়ে হই-হুল্লোড় অথচ নিউট্রাল (অনির্ণেয়) নিয়ে কোনও শব্দ নেই।

পশ্চিমা বিজ্ঞান মানবদেহের শক্তিকে সর্বদা ‘অবৈজ্ঞানিক’ বলে তুচ্ছ করে এসেছে।

তবে সত্যটা হলো মানবদেহের প্রাকৃতিক শক্তির বা এনার্জির কাছে মানবসৃষ্ট অপ্রাকৃতিক শক্তির কোনও তুলনাই চলে না।

খেলাটা হচ্ছে মানুষ যখন আনন্দ-উল্লাস, হাসিঠাট্টা, বিনোদন বা মন ভালো থাকার কোনও কর্ম করে– তার সমগ্র দেহে অর্থাৎ মূলাধার হতে ব্রহ্মরন্ধ্র বা ‘সুলতান আধিকর’ অবধি নিরবচ্ছিন্ন ইতিবাচক শক্তি প্রবাহিত হতে থাকে।

এই শক্তি এতটাই শক্তিশালী যে এর দ্বারা অনেক অসম্ভবকেও সম্ভব করা সম্ভব।

অপরদিকে অশান্তি, ক্ষোভ, রাগ, অনিশ্চয়তা, দুঃখ, শোক, ব্যথা বেদনা ইত্যাদি বিপরীত গতিতে প্রবাহিত হতে থাকলে তাকে বলা হয় নেগেটিভ বা নেতিবাচক শক্তি।

যেসব মানুষ এই দুই ধরনের অল্টারনেটিভ ফিলিংস, মুড সুইং বা অনুকল্প অনুভূতি দ্রুত দমন করে স্বাভাবিক হতে পারে– তাদের বলা হয় নিউট্রাল বা অনির্ণেয়, ইকুইলিব্রিয়াম বা সুস্থিতি।

এখন খেলাটার সূত্রপাত হয়: কোনটা পজিটিভ আর কোনটা নেগেটিভ তা নিয়ে ইচ্ছাকৃত দিকভ্রান্ত করে সবার মাথায় গড় বড় বাঁধিয়ে দেওয়া।

যে মুহূর্তে আপনি চিন্তা করা শুরু করবেন ‘আমাকে কি করোনা ধরলো’ ঠিক সেই মুহূর্তে এই ভয়াল নেগেটিভ শক্তি আপনাকে ওভারটেক করে গ্রাস করবে।

কিছু সময়ের ভেতরেই আপনি যা চিন্তা করবেন। আবার বলছি আপনি যা চিন্তা করবেন ঠিক তা-ই ঘটবে।

আপনার দেহের প্রতিটি কোষে, প্রতিটি ডিএনএ-তে ওই একই সিগন্যাল প্রতিলিপিত হতে থাকবে।

যে মুহূর্তে আপনি সর্বত্র জানান দেবেন ‘আমি কোভিড পজিটিভ’, আপনি শত্রুকে সিগন্যাল দিচ্ছেন সে ‘পজিটিভলি জিতেছে’।

খেয়াল করুন এই ভয়াবহ সময়ে যখন টোকিও অলিম্পিক হাজার রকম স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরিচালিত হচ্ছে অথচ “ইউরো কাপ” জুয়াখেলা কোন যুক্তিতে এতটা ‘খুল্লমখুল্লা’ স্টাইল-এ অনুষ্ঠিত হলো?

তার ফলশ্রুতিতে সমগ্র ইউরোপ আবার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের খপ্পরে পড়েছে।

ঠিক একই সময়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ফুটবল নিয়ে রামদা, লাঠিসোঁটা মারামারির খবর আন্তর্জাতিক হেডলাইন নিয়ে যারা খুব খুশি হয়েছিলেন– ক’দিন অপেক্ষা করুন বুঝতে পারবেন।

৫. শারীরিক দূরত্ব কার্যকরীভাবে কত ফিট?:

শারীরিক দূরত্ব পাক্কা ৩ ফিট থেকে ৬ ফিট হতে হবে। ২ ফিট বা ৯ ফিট-এ কেন নয়? এই প্রশ্ন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে কেউ কি করেছে?

এই ফাঁকটা সৃষ্টি করা হয়েছে করোনাকে বীরদর্পে ঢুকে তার ‘টার্গেট সিলেকশন’-এর কাজ সহজে ও অনায়াসে সহায়তা করার লক্ষ্যে।

পজিটিভ যোগ পজিটিভ যেমন সব সময় পজিটিভ হয় না, নেগেটিভ যোগ নেগেটিভও সব সময় নেগেটিভ হয় না।

যখন একাধিক পজিটিভের ঘাড়ে ১০ গুণ নেগেটিভ বাঁদরঝাঁপ দেয় ঠিক তখনই ফলস নেগেটিভের মতো ফলস পজিটিভের আগমন ঘটে।

যারা নেগেটিভ বা পজিটিভ অনুভূতি দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখে না। খেয়াল করে দেখবেন তারা কখনোই কোভিড-এ আক্রান্ত হন না।

একি মানুষজনের গাদাগাদি করে হাঁটাচলা ও বসার কারণে, সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং?

না, তা মোটেও নয়।

আনন্দ-উল্লাসরত খেলা বা কনসার্টের দর্শক, হাটবাজার, শপিং মল ইত্যাদির ভিড়ে করোনা প্রবেশ করতে পারে না কারণ এত পজিটিভ এনার্জির ভেতরে প্রবেশ করা ইম্পসিবল।

কিন্তু ঠিক যে মুহূর্তে খেলার হারজিত নিয়ে অনুভূতিগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে, সুস্থিতি বিনষ্ট হয়ে ‘মাথা গরম করে পাগল’ মারামারি শুরু হয়—ঠিক তখনই করোনা দেহে না—মস্তিষ্কের উপরে বাঁদরঝাঁপ শুরু করে দেয়।

৬. বিষয়টা আরেকটু পরিষ্কার করি?

ধরুন, আপনাদের বাম হাত যদি হয় নেগেটিভ আর ডান হাত হয় পজিটিভ তাহলে নিউট্রাল কোথায়? সহজ উত্তর মস্তিষ্ক- তাই তো? মস্তিষ্ক কি কেবল সাদা বা কালো রঙ চেনে নাকি রংধনুর শত রঙ চেনে?

মূক, বধির বা অন্ধেরা করোনা আক্রান্ত হয়েছে। সে রকম খবর কি আছে? না থাকারই কথা।

প্রাচীন গানে বলা হয়েছে:

“হায় রে কপাল মন্দ চোখ থাকিতে অন্ধ—এ-জীবন জ্বইলা পুইড়া শেষ তো হইলো না”...

উপসংহার: করোনা নিয়ে চোখে যত কম দেখবেন, মুখে যত কম বলবেন, ততই মঙ্গল।

৭. দোহাই লাগে:

শেষ করছি আমার প্রিয় বন্ধু অনিক খান-এর ২০০৬-তে রচিত ছড়া দিয়ে। তার বয়স তখন ছিল ২২:

দোহাই লাগে দু-চোখ খুলে দেখুন আশেপাশে
দেশপ্রেমিকের বেশে কারা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে?

সুদূর থেকে আসছে শুনুন নানান রঙের মন্ত্র —
বৃদ্ধ শকুন-হায়েনারা করছে ষড়যন্ত্র!

বাংলাদেশের তরুণ— লাল-সবুজের পতাকাটা শক্ত করে ধরুন।

জি হুজুরের মার্কা গায়ে কেমন করে সাঁটি?
রক্ত দিয়ে কেনা আমার বাংলাদেশের মাটি।

সেই মাটিরই আমরা ফসল নোংরা শেকড়-বাকড় না,
মুখের ওপর বলতে শিখুন— আমরা কারো চাকর না!

বাংলাদেশের তরুণ —দুঃসাহসের বারুদ দিয়ে মস্তিষ্ক ভরুন।

আর কতকাল আর কতদিন থাকবে মাথা নিচু?
আর কতদূর হাঁটতে হবে আপসগুলোর পিছু?

নতুন মগজ, নতুন পেশী, নতুন দিনের ঢেউ...
তুলতে পারে এমন তুফান নেই কি কোথাও কেউ?

বাংলাদেশের তরুণ—দোহাই লাগে, একটা কিছু করুন।

শেষ কথা: ‘নিজের মস্তিষ্ক কারও কাছে স্বেচ্ছায় ইজারা দেবো না’—এ হোক এবারের কোরবানির আমাদের দৃপ্ত প্রতিজ্ঞা।

লড়াই চালিয়ে যান। জয় আমাদের সুনিশ্চিত।

 

লেখক: সংগীতশিল্পী

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

করোনার করুণ কাহিনি: মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের পটভূমি ও  ‘বাংলাদেশ ভ্যারিয়েন্ট’

করোনার করুণ কাহিনি: মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের পটভূমি ও ‘বাংলাদেশ ভ্যারিয়েন্ট’

করোনার করুণ কাহিনি: শাটডাউন, লকডাউন ও  ‘ব্রেকডাউন’

করোনার করুণ কাহিনি: শাটডাউন, লকডাউন ও  ‘ব্রেকডাউন’

করোনার করুণ কাহিনি: সাধারণ ছুটি থেকে লকডাউন ও অতঃপর

করোনার করুণ কাহিনি: সাধারণ ছুটি থেকে লকডাউন ও অতঃপর

করোনার করুণ কাহিনি: ব্যবসায়ী শ্রেণির মানসিকতা ও ‘ম্যানেজ’ সংস্কৃতি

করোনার করুণ কাহিনি: ব্যবসায়ী শ্রেণির মানসিকতা ও ‘ম্যানেজ’ সংস্কৃতি

সাংবাদিকতা বনাম করপোরেট ইমেজ

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২১, ১৮:৪২

মো. সামসুল ইসলাম সম্প্রতি আমাদের দেশের সাংবাদিকতা যে কারণে ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বা সমালোচিত হচ্ছে তাহলো ব্র্যান্ড বা করপোরেট ইমেজ রক্ষায় সাংবাদিকদের ভূমিকা। যেকোনও কারণে কোনও করপোরেট হাউজ যখন বিতর্কিত হয়, তখন কোনও কোনও গণমাধ্যমের করপোরেট ইমেজ রক্ষার প্রচেষ্টা আমাদের জনগণ স্বভাবতই মেনে নিতে পারেন না। অনেকে ক্ষেত্রেই তারা, কিছুটা অযৌক্তিকভাবেই, ব্যক্তি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হয়ে ওঠেন।

করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ইমেজ রক্ষার কাজ আর সাংবাদিকতা দুটি ভিন্ন পেশা। গণতন্ত্র আর উদার অর্থনীতির যুগে মুক্ত গণমাধ্যম যেমন অপরিহার্য, তেমনি অপরিহার্য ব্যবসায়িক বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানসমূহ।

বিতর্ক এড়াতে সঙ্গত কারণেই আমি আমাদের দেশের কোনও উদাহরণ টানতে চাই না। কিন্তু একটা ব্যাপারে সবাই একমত হবেন যে কোনও প্রতিষ্ঠানের মালিক পক্ষ বা প্রধান নির্বাহী বা অন্য কেউ যখন বিতর্কিত হয়ে পড়েন বা অপরাধ করেন তখন সেই প্রতিষ্ঠানকে কেউ হয়তো ধ্বংস করে দিতে চাইবেন না। হাজার হাজার মানুষ সেখানে চাকরি করছেন। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে সেটি গড়ে উঠেছে। সবাই চাইবেন অভিযুক্ত ব্যক্তি যাতে আইনের আওতায় আসে। কিন্তু ব্র্যান্ড বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব যাতে অক্ষুণ্ণ থাকে।  

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এক্ষেত্রে ব্র্যান্ড বা করপোরেশনের ইমেজ কে রক্ষা করবে? করপোরেট কমিউনিকেশনের নির্বাহীরা? নাকি সাংবাদিকরা? ব্র্যান্ড বা করপোরেট ইমেজ রক্ষার ব্যাপারটি একটি বিশেষায়িত কাজ। গণমাধ্যমকে বিতর্কিত না করে নৈতিকতা অক্ষুণ্ণ রেখেও এটা করার প্রচেষ্টা নেওয়া যায়।

আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই সেখানে এই সেমিস্টারে যে কয়েকটা কোর্স পড়াচ্ছি তার মধ্যে একটি কোর্স হচ্ছে করপোরেট কমিউনিকেশন অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স।  যদিও পশ্চিমা টেক্সবইগুলোতে করপোরেট কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে ইথিক্যাল প্র্যাকটিসের কথা উল্লেখ করা হয় কিন্তু আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই কোর্স পড়াতে গেলে বিব্রত হতে হয়। যেমন, সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীরা অন্য কোর্সে মিডিয়ার যে কোড অব কন্ডাক্ট বা আচরণবিধি শিখে আসে তার উল্টো চিত্র চলে আসে এ কোর্সে এসে।

সেটা হয় বাংলাদেশের কিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য। যেমন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের যারা মালিকানায় আছেন বা শীর্ষ নির্বাহীরা যখন কোনও অপরাধ করেন বা সেসব প্রতিষ্ঠানে কোনও দুর্ঘটনা ঘটে তখন সাংবাদিকতা আর করপোরেট কমিউনিকেশনের দায়িত্ব কিন্তু ভিন্ন।

সাংবাদিকতার আদর্শ অনুসারে সাংবাদিকরা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে পাঠক, দর্শককে সঠিক তথ্য জানাবেন।  আর করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কমিউনিকেশনের নির্বাহীরা ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট বা ব্র্যান্ড ও ইমেজ রক্ষার চেষ্টা করবেন। এগুলোর সুনির্দিষ্ট কৌশল আছে। সেসব প্রতিষ্ঠানের কমিউনিকেশন বা পাবলিক রিলেশন্সের লোকজন এসব কৌশল জানেন বলে আমরা ধরে নিতে পারি এবং তারা বিভিন্নভাবে এ সংকট কাটানোর ব্যাপারে টপ ম্যানেজমেন্টকে ধারণা দেবেন। ভুল স্বীকার বা জনগণকে সঠিক তথা দেওয়া, দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা বা ক্ষেত্র বিশেষে নিশ্চুপ থাকাসহ বিভিন্ন স্ট্র্যাটেজি বা কৌশল তার নিতে পারেন প্রতিষ্ঠানের ইমেজ রক্ষার্থে।    

আমি কিন্তু এখানে করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্র্যান্ড বা প্রতিষ্ঠানের ইমেজ রক্ষার কথা বলছি। কোনও ব্যক্তিকে তার অপরাধের জন্য আইনের হাত থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা বলছি না। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে বলে আমরা ধরে নিচ্ছি।

আমাদের দুর্ভাগ্য যে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা দেখছি কিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠান কোনও দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে মিডিয়াকে ভুলভাবে ব্যবহার করে সবকিছু লেজেগোবরে করে ফেলেন এবং নিজেদের বিপদ বাড়ান। আবার কোনও কোনও ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ইমেজ রক্ষার্থে সাংবাদিকতা ভুলে করপোরেট কমিউনিকেশনের অংশ হয়ে যান। গণমাধ্যমের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা উলটো ব্র্যান্ড প্রটেকশনের জন্য মাঠে নামেন সাংবাদিকতার রীতিনীতি ভুলে।

সম্প্রতি আমরা এরকম অনেক উদাহরণ আমাদের দেশেই দেখছি। দেশে জনগণের মিডিয়া লিটারেসি বা গণমাধ্যম স্বাক্ষরতা বাড়ছে। জনগণ সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছেন। গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে ঘটনা প্রবাহ অন্যদিকে নেওয়ার প্রচেষ্টায় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কি কোনও লাভ হয়? বা তাদের ইমেজ সুরক্ষিত হয়? আমার মনে হয় না। জনগণ এখন অনেক সচেতন।  

সাংবাদিকতা পেশার স্বতন্ত্র সীমারেখা নির্ণয় করা তাই জরুরি হয়ে পড়েছে। অনেক পেশার সঙ্গেই জড়িয়ে পড়ছে তাদের নাম। তবে এ সমস্যা যে শুধু আমাদের দেশের তা নয়।  ধনতান্ত্রিক সমাজের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তাদের রাজধানীগুলো লবিস্ট গ্রুপ আর পিআর ফার্মে ভর্তি। এর ঢেউ এসে পড়েছে আমাদের দেশেও। মিডিয়াকে বিভিন্ন ইন্টারেস্ট গ্রুপের স্বার্থ রক্ষা করতে হয়। মিডিয়াতে যা প্রকাশিত হয় তার কতটুকু অন্যের স্বার্থ রক্ষার্থে আর কতটুকু জনগণের জন্য তা আসলে বিশাল প্রশ্ন।

বিভিন্ন দেশের অ্যাম্বাসি, এনজিও, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, নন প্রফিট অর্গানাইজেশন সবারই আসলে গণমাধ্যমকে দরকার। মিডিয়া কাভারেজ সবার অস্তিত্ব রক্ষায় জরুরি। নন প্রফিট অর্গানাইজেশনদের মিডিয়া কাভারেজ দেখিয়ে ফান্ড আনতে হয়। রাষ্ট্রদূতদের নিজ দেশে কাজকর্ম দেখাতে দরকার মিডিয়া কাভারেজ। সুতরাং এটা মোটেই আশ্চর্যের বিষয় নয় যে উন্নত বা উন্নয়নশীল সব দেশেই পিআর ফার্ম গড়ে উঠছে। অর্থের বিনিময়ে তারা বিনিময়ে তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মিডিয়া কাভারেজ নিশ্চিত করে।

এখানে লুকোনোর কিছু নেই। করপোরেট মিডিয়া বিশ্বব্যাপী এভাবেই কাজ করে। মিডিয়া তো অনেক দেশের ফরেন মিনিস্ট্রির এক্সটেনশন হিসেবে কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে তারাই যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আমাদের দেশে জনগণ আগে মিডিয়ার ভেতরের এতকিছু জানতো না। এখন কিছুটা বুঝতে পারছে যে তারা আসলে কার বা কী খবর দেখছে। এটা জেনেই তারা ফেসবুকে মিডিয়া বা সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে।

তবে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের দেশের একটা পার্থক্য হলো সেসব দেশে অনেক সংগঠিত মিডিয়া ওয়াচ গ্রুপ বা মিডিয়া মনিটরিং এজেন্সি এবং সেই সঙ্গে ফ্যাক্ট চেকিং গ্রুপ থাকে। বিভিন্ন ইস্যুতে মিডিয়া কাভারেজের ব্যাপারে গণমাধ্যম সমালোচকরা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন এবং তা জনগণের সামনে তুলে ধরেন।  আমাদের দেশে এরকম গঠনমূলক সমালোচনা খুব কমই হয়, যাতে সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা উপকৃত হতে পারেন। বরং যেটি হয় তাহলো ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিকমাধ্যমে ব্যক্তি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কুৎসিত গালাগালি। সাংবাদিকরাও তো চাকরি করেন। অনেক ক্ষেত্রেই মিডিয়ার মালিকদের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।

সাংবাদিকতার অস্তিত্ব রক্ষার্থে আমাদের সাংবাদিকদের এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। গণমাধ্যমের মালিক, সাংবাদিকদের বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, ইউনিয়ন,  সবাইকে এটি নিয়ে চিন্তা করতে হবে,  সবাইকে মিলে মিডিয়ার সেলফ রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক বা কাঠামো তৈরি করতে হবে, যাতে সাংবাদিকতা পেশার স্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদা রক্ষিত হয়।

লেখক: কলামিস্ট; বিভাগীয় প্রধান, জার্নালিজম, কমিউনিকেশন ও মিডিয়া স্টাডিজ, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

ইমেইল: [email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

করোনাকালে গণমাধ্যম: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

করোনাকালে গণমাধ্যম: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

আয়কর রিটার্ন ইমেইলে জমা নেওয়ার উদ্যোগ যে কারণে জরুরি  

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২১, ১৭:২১
মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের আক্রমণ থেমে নেই। প্রকট থেকে প্রকট, তীব্র থেকে তীব্র হচ্ছে এর ভবিষ্যৎ বিস্তার। এর  প্রতিরোধের সাধ্যমতো চেষ্টা চলছে অবিরত। এ প্রচেষ্টায় কখন যে বিরতির নিশ্বাস ফেলা যাবে জানে না কেউই! এ অদৃশ্য শত্রু বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা মানব ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। অসহায় মানুষ সর্বশেষ মহান রবের কাছে প্রার্থনা করে, তিনি যেন এ অদৃশ্য শত্রুকে ঘায়েল করার ক্ষমতা তাঁর সৃষ্টির সেরা জীব আশরাফুল মাখলুকাতকে দান করেন। আমিন।  

মহামানবদের জীবনী পড়লে দেখা যায়, তাঁরা সকল সময় বিপদে ধৈর্য ধারণের জন্য বলেছেন। আমরা ধৈর্য ধরছি। আমাদের আপনজন, প্রতিবেশী, কাছের মানুষ, পরিচিতজনকে ইতোমধ্যে বিদায় দিয়েও নিজেদের জীবন সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছি। যত দিন দেহে প্রাণ থাকবে বহমান, ততদিন আমাদের চলারগতি থাকবে চলমান। এ চলমান জীবনের সংগ্রামে সংসার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় কাজের সকল স্তরে বিরাজমান কার্যাদি যেন বিকল্প চিন্তার ভাণ্ডারে ঘুরপাক খাচ্ছে। পরিবারের প্রধানকে, সমাজের মাতাব্বরকে, অফিস প্রধানকে প্রতিনিয়ত বিকল্প ভাবতে হচ্ছে। এ বিকল্প ভাবনার ফলও আসছে দ্রুত। তাই তো আমরা অতিমারির সময়েও অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে সক্ষম হচ্ছি।

আমাদের সরকার রাজস্ব আদায়কে অতীব জরুরি সেবার আওতায় স্থান দিয়েছে। মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য অতি জরুরি সেবাগুলো যেমন অত্যাবশ্যক, তেমনি রাষ্ট্রীয় অর্গানগুলো সচল রাখার ক্ষেত্রে রাজস্বও একটি অতীব জরুরি খাত। আগে তেমন না বুঝলেও এখন তা বঝুতে আর অসুবিধা হয় না। তাই কঠোর লকডাউন ব্যবস্থার মধ্যেও রাজস্ব আদায় অব্যাহত রাখার প্রজ্ঞাপন আমরা দেখেছি।

এ জরুরি সেবা খাতটির একমাত্র উপাদান দেশের নাগরিকগণ। যারা নিজেদের আয়-রোজকারের অর্থ দিয়ে রাষ্ট্রকে চলার গতি দিয়ে থাকে।  প্রত্যেক করদাতা নাগরিক রাষ্ট্রের জন্য ডিম পাড়া হাঁসের মতো। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ডিম পাড়া হাঁসের প্রতি খামারিরা বিশেষ নজর রাখলেও করদাতা নাগরিকদের জন্য আমাদের রাষ্ট্রের করার তেমন কিছু নেই। বরং করদাতাদের হয়রানির অভিযোগ বিস্তর। তাই অনেক করদাতা জোর করে হলেও রাষ্ট্রকে 'ডিম' উপহার দিতে বিরাগ। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র বড়ই বোকা। জোর করে ডিম পাড়ানোর চেষ্টা করে। ফলে হাঁসও মরে, ডিমও ভেঙে চুরমার! কর আদায় ঋণাত্মক! বছর বছর ঘাটতি বাজেট; সংশোধিত বাজেট বা ঋণ করে ব্যয় নির্বাহ করা হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক ব্যাপার।  

একটু কৌশলী হলে রাষ্ট্র অল্প বিনিয়োগে ব্যাপক রাজস্ব আদায় করার সুযোগ পেতে পারে। সভা, সেমিনার, নাগরিক সংলাপে আমরা অনেক গুণী মানুষকে বলতে শুনি রাষ্ট্র সকল সহজ উদ্যোগগুলো নিচ্ছে। শত কোটি টাকাও বরাদ্দ দিচ্ছে, ব্যয় হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উদ্যোগটা আর আলোর মুখ দেখে না। এর অন্তরালে নাকি একটি চক্র আছে। এ চক্র সরকারকে তা করতে বাধাগ্রস্ত করে। করদাতারা অসহায় প্রাণীর মতো এ বাণীগুলো শুনে অবাক! সরকার নাকি চক্রের মধ্যে জিম্মি। তাহলে সরকারের দরকার কী? প্রতিটি জায়গা একটি করে চক্র সক্রিয় করে দিয়ে সরকার হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকুক বা বিদায় নিয়ে ক্লান্তির নিশ্বাস ফেলুক। তবু তো আমরা বাঁচি। চক্রটি কিছুদিন চক্রান্ত করে ক্লান্ত হয়ে বলবে এবার করদাতাদের জন্য কিছু করি। এগুলো আমার আক্ষেপের কথা!

বাস্তবতা হলো সরকার চাইলে যেকোনও উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে পারে, এবং ভালোভাবে পারে। তাই করদাতা নাগরিকদের কষ্ট লাঘব করা যায় এমন কিছু করার উদ্যোগ নিলে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ফলাফল আসবে।

এ ক্ষেত্রে চক্রকে দমন করার দায়িত্ব সরকারের। করদাতারা যত কম ঝামেলায়, সহজে ও নিরাপদে আয়কর পরিশোধ, নথি জমা ও সেবা পেতে পারে তার উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার বিগত ১১ জুলাই ২০২১ তারিখে মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের স্মারক নং ০৪.০০.০০০০.৫১৪.১৬.০০১.২১.২২৩-এর মাধ্যমে সরকারি সকল অফিসের দাফতরিক কাজসমূহ ভার্চুয়ালি (ই-নথি, ই-টেন্ডারিং, ই-মেইল, এসএমএস, হোয়াটস অ্যাপসহ অন্যান্য মাধ্যমে) সম্পন্ন করার ঘোষণা করেছে। এটা সময়োপযোগী একটি কাজ। এটা বাস্তবায়ন করা হলে অবশ্যই দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল থাকবে বাধাহীনভাবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ সার্কুলারের বাইরে নয়। তবু রাজস্ব আদায় ও আয়করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধিও চলমান উদ্যোগগুলোর সঙ্গে অতিদ্রুততম সময়ের জন্য সার্কেলভিত্তিক ই-মেইল-এর মাধ্যমে রিটার্ন জমা নেওয়ার উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ বিগত বছর সীমিত পরিসরে সার্কেলভিত্তিক করমেলা হলেও এবার তা করা আদৌ সম্ভব কিনা, তা বলা কঠিন। তাই প্রতিটি সার্কেল থেকে একটি অভিন্ন ই-মেইল চালু করা হোক, যেখানে করদাতা বা তার প্রতিনিধি আয়কর রিটার্ন জমা দিতে পারবেন। করদাতার পক্ষে ইমেইল করার সঙ্গে সঙ্গে বা ই-মেইলটি গ্রহণ করার পর ফিরতি একটি ইমেইলে প্রাপ্তি স্বীকার অটোমেটিক চলে আসবে। এ ফিরতি ইমেইলটি হবে করদাতার জন্য প্রাপ্তিস্বীকার। ইমেইলভিত্তিক আয়কর রিটার্ন জমা নেওয়ার এ উদ্যোগটি হতে পারে এ সময়ের জন্য একটি সেরা উদ্যোগ।  

অনেকে বলবেন অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে, তাই ইমেইলে দেওয়ার প্রয়োজন কী? কিন্তু অনলাইনে যে বিস্তারিত তথ্য দিতে হয়, অনেক করদাতার পক্ষে তা বুঝা বা ধাপে ধাপে তথ্য দিয়ে রিটার্ন জমা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। যার ফলে অনেকে এ সেবাটি গ্রহণ করতে তেমন আগ্রহী হচ্ছেন না। তবে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন ব্যবস্থা সহজীকরণ করেও রাজস্ব করদাতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা যেতে পারে। যে উদ্যোগই নেওয়া হোক, তা যেন ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয় এবং করদাতাদের বুঝতে সহযোগিতা করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। নতুবা উদ্যোগগুলো কাজে আসবে না।

সম্প্রতি একটি ঘটনা বলে আজকের বিষয়টি শেষ করবো। আমি নিজে চলতি মাসে একটি ভ্যাট সার্কেল-এ বাংলা ফরমেটে একটি ভ্যাট রিটার্ন ইমেইলে সাবমিট করার জন্য সংশ্লিষ্ট সার্কেল কর্মকর্তাকে অনুরোধ করি। তিনি আমাকে উত্তর দিলেন, ইমেইলে রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে না। আমি উত্তর দিলাম সরকারি সিদ্ধান্ত আছে, আপনারা মানছেন না কেন? তিনি বলেন, আমাদের জন্য তা প্রযোজ্য নয়। ফোন কেটে গেলো। কিছুক্ষণ পরে তিনি ফোন দিলেন, বললেন আপাতত জমা দেন, অফিস খোলার পর হার্ডকপি জমা দিয়ে দেবেন। আমি সম্মতি দিলাম এবং ইমেইলে পাঠালাম। ৩০ মিনিটি পর তিনি আবার ফোন দিলেন, বললেন, বাংলা ফরমেট গ্রহণযোগ্য নয়। আমি বললাম, ইংরেজি ফরমেট পাচ্ছি না। আপনার কাছে থাকলে একটু পাঠিয়ে দেবেন। তিনি উত্তর দিলেন, এগুলো আমাদের কাছে নেই, থাকে না। আপনার প্রয়োজনে আপনি সংগ্রহ করে নেবেন। আপনাকে যেমন নিজের প্রয়োজনে বিআইএন নম্বর নিতে হয়েছে, তেমনই রিটার্ন জমার ফরমেটও নিজ উদ্যোগে সংগ্রহ করতে হবে। এনবিআর অফিসের সামনে বিক্রি হয়, সেখান থেকে কিনতে পারেন।

ওনার কথা শোনার পর আমি বললাম, আপনার কথাটি আমি মেনে নিতে পারছি না। আপনার দায়িত্ব হচ্ছে আমাকে ফরমেট সংগ্রহ করে দেওয়া। আপনি আমাকে সরকারি বিনামূল্যের ফরম কিনতে বলতে পারেন না।

এ অফিসারকে আমি সরাসরি দেখিনি। মনে হয়েছে নতুন চাকরিতে যোগদান করেছেন। আমার মনে হলো তিনি আমার কথা একটু আমলে নিলেন। আচ্ছা রাখি বলে ফোনটা কেটে দিলেন। তারও ২৫-৩০ মিনিটের মধ্যে আমার ইমেইলে ইংরেজি ফরমটি পাঠালেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে ধন্যবাদ জানিয়ে এবং প্রশংসা করে একটি মেইলের উত্তর দেই। তিনি আমার কাছে এরপর দুই দুইবার ফোন করেছেন এবং আমাদের মধ্যে ভালো আলোচনা হয়েছে।

এ আলোচনাটা আনলাম এজন্য যে আমাদের নাগরিকরা যেমন কর ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেন, তেমন কর আদায়কারী কর্মকর্তাদের মাঝেও কিছুটা ভাব কাজ করে এমন- আইন মোতাবেক সব দায়িত্ব নাগরিকের, সময় মতো তা না দিলে জরিমানা ও জেল হতে পারে। সুতরাং আমার এখানে কাজ কী? করদাতার কাজ করদাতাই করবেন। কিন্তু না, করদাতারা সচেতন হলে কর আদায়কারীরাও দায়িত্বশীল হবেন।    

লেখক: আয়কর আইনজীবী
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

ভ্যাট আদায়ে ন্যায্যতার ঘাটতি, নজর দেবে কে?

ভ্যাট আদায়ে ন্যায্যতার ঘাটতি, নজর দেবে কে?

‘ব্লকচেইন প্রযুক্তি’ হতে পারে রাজস্ব আদায়ের নতুন দিগন্ত

‘ব্লকচেইন প্রযুক্তি’ হতে পারে রাজস্ব আদায়ের নতুন দিগন্ত

প্রতিবন্ধীদের সহায়ক চলনযন্ত্রের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার জরুরি

প্রতিবন্ধীদের সহায়ক চলনযন্ত্রের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার জরুরি

বিদেশি অনুদানে বাস্তবায়িত প্রকল্প ব্যয়ে ভ্যাট-ট্যাক্স কতটা যৌক্তিক!

বিদেশি অনুদানে বাস্তবায়িত প্রকল্প ব্যয়ে ভ্যাট-ট্যাক্স কতটা যৌক্তিক!

উন্নয়নের তিন ডজন ইস্যু

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২১, ১৫:৩২

মোস্তফা মোরশেদ অর্থনীতির একটি নতুন শাখা হিসেবে ১৯৪০ এর দশকে উন্নয়ন অর্থনীতির যাত্রা শুরু হয়। এর উত্থানের পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক শাসন শেষে পরিবর্তিত পৃথিবীতে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোকে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জের হাত থেকে রক্ষা করা। নতুন তত্ত্ব ও মডেলের সমন্বয়ে শুরু হওয়া এ ধারাকে অনেকেই ব্রিটিশদের সৃষ্টি (British Affair) বলে অভিহিত করেন।

এ লেখায় উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত ইস্যুগুলো আলোচনা করা হয়েছে। একটি দেশের উন্নয়নের পরিকল্পনা কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সাথে যারা বিভিন্নভাবে সম্পৃক্ত তাদের জন্য উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হয়। উন্নয়নের সাথে যে সব চলক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সেগুলো সম্পর্কে যথাযথভাবে জানা এবং এ চলকগুলোর সম্ভাব্য পরিবর্তন পরিমাপ করার মাধ্যমে উন্নয়ন অর্থনীতির পাঠ সফলতা লাভ করে। নীতি নির্ধারকদের পাশাপাশি অর্থনীতির শিক্ষার্থীদেরও এসব জানার অবকাশ রয়েছে। প্রসঙ্গত, ব্যাখ্যা করার সুবিধার্থে এবং যথার্থ পরিভাষার অভাবে এ লেখায় অনেকগুলো ইংরেজি শব্দ সরাসরি ব্যবহার করা হয়েছে।

উন্নয়ন একটি বহুমুখী ধারণা। খুব স্বল্প পরিসরে এর ব্যাখ্যা বা বর্ণনা অসম্ভব। উন্নয়ন আলোচনায় অনেক বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। সংক্ষেপে বললে, উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনযাত্রার সাথে সম্পর্কিত সকল চলকের ইতিবাচক পরিবর্তন এবং সামগ্রিকভাবে জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। উন্নয়নের সাথে জড়িত চলকগুলোর তালিকা করলে মানুষের জীবন এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের সাথে তার সম্পৃক্ত সকল বিষয় চলে আসে। চলকগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক এতটাই নিবিড় যে এদের একটির পরিবর্তন হলে আরেকটি বিভিন্ন মাত্রায় পরিবর্তিত হয় যা অর্থনীতির ভাষায় অন্তর্জনিষ্ণু (ইস্যু ১) (endogenity) হিসেবে বিবেচিত। বাস্তবিক অর্থে, উন্নয়ন অর্থনীতির ধারণায় বহির্জনিষ্ণু (exogenous) চলক বলতে কিছু নাই। উন্নয়নের রুপরেখা প্রণয়নে চলকের সংখ্যা যত সমস্যা সৃষ্টি করে তার চেয়ে বেশি সমস্যা তৈরি করে এদের পারস্পরিক অন্তর্জনিষ্ণু সম্পর্ক।

চলকের দুটি প্রকার রয়েছে; পরিমাণগত (ইস্যু ২) ও গুণগত (ইস্যু ৩)। পরিমাণগত চলকগুলোর তালিকায় যে সকল চলক থাকবে সে তালিকা অনেক দীর্ঘ। আলোচনার সুবিধার্থে ধরা যাক, এ তালিকায় পঞ্চাশটি চলক রয়েছে। তবে এ তালিকার প্রথমেই আসবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (ইস্যু ৪)। ১৯৮০ এর দশকে ‘উন্নয়ন’ ও ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি’কে দুটি আলাদা ইস্যু বিবেচনা করা হতো। এমনকি এর পক্ষে দুটি আলাদা school of thought-ও গড়ে উঠে। তবে সময়ের পরিক্রমায় বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার (ইস্যু ৫) বিকাশের কারণে এ বিতর্কের অবসান হয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি’ সকল আয়ের দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চলক হিসেবে উন্নয়ন অর্থনীতির আলোচনায় সর্বাগ্রে স্থান করে নিয়েছে। তালিকার দ্বিতীয় চলকটি একেক দেশের জন্য একেক রকম হবে। যেমন, আফ্রিকার উন্নয়নের তালিকার দ্বিতীয় চলক হয়ত ‘বিশুদ্ধ পানি’, ভারতের ক্ষেত্রে হয়ত ‘স্যানিটেশন’ কিংবা পৃথিবীর অনেক দেশের জন্য সেটি ‘বৈষম্য’। ইস্যু হিসেবে উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত চলকগুলোকে বিবেচনা করার অবকাশ ছিল না, এ লেখার কলেবর বেড়ে যেত।

গুণগত চলকগুলো মূলত উন্নয়ন আলোচনার বিদ্যমান পরিমাণগত চলকের ক্রমাগত উৎকর্ষ সাধনের প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত। উন্নয়নের চলক হিসেবে ‘শিক্ষার উপকরণ’ বিবেচনা করলে দেখতে হবে এগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য কতটুকু উপকারী। যেমন, নির্দিষ্ট সংখ্যক কলমের বিপরীতে কী মানের কলম সরবরাহ করা হবে সেটিই মুখ্য। পরিমাণগত চলকের গুণগত মান অর্জনের মাধ্যমে গুণগত চলকের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জিত হয়।

উন্নয়ন সরাসরি জনগণের সাথে সম্পৃক্ত (ইস্যু ৬)। নির্দিষ্ট করে বললে, উন্নয়ন শুধুমাত্র মানুষের জন্য। যেখানে মানুষ নাই সেখানে উন্নয়ন নাই। মরুভূমিতে যেখানে মানুষের বসবাস নাই সেখানে উন্নয়ন চিন্তার প্রতিফলন নাই। এ অবস্থাকে আন-ডেভেলপমেন্ট বলা হয়ে থাকে। সম্ভাব্য উন্নয়ন হবার জায়গায় উন্নয়ন কম হলে তাকে আন্ডার-ডেভেলপমেন্ট বলে।

উন্নয়নকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য একক কোনো পদ্ধতি বা মডেল পাওয়া যায় না। বিশ্বব্যাংক যেভাবে সংজ্ঞায়িত (ইস্যু ৭) করেছে তাতে শুধুমাত্র মাথাপিছু জিএনআই (মার্কিন ডলার) এর উপর ভিত্তি করে দেশগুলোকে তিনভাগে ভাগ করা হয়–

১) নিম্ন-আয়ের দেশ (মাথাপিছু জিএনআই ১,০২৫ এর কম);

২) মধ্যম-আয়ের দেশ;

৩) উচ্চ-আয়ের দেশ (মাথাপিছু জিএনআই ১২,৪৭৫ এর বেশি)।

মধ্যম-আয়ের দেশসমূহকে আবার দু’ভাগে ভাগ করা হয়; নিম্ন মধ্যম-আয়ের দেশ (মাথাপিছু জিএনআই ১,০২৬ থেকে ৪,০৩৫) ও উচ্চ মধ্যম-আয়ের দেশ (মাথাপিছু জিএনআই ৪,০৩৬ থেকে ১২,৪৭৫)।

অপরদিকে, জাতিসংঘের বিশ্লেষণ (ইস্যু ৮) অনুযায়ী বিশ্বের দেশসমূহকেও তিন ভাগে ভাগ করা হয়; ১) স্বল্পোন্নত দেশ, ২) উন্নয়নশীল দেশ, ও ৩) উন্নত দেশ। জাতিসংঘ তিনটি সূচকের (মাথাপিছু জিএনআই, মানব সম্পদ সূচক ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক) উপর ভিত্তি করে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের হিসাব করে থাকে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশে উত্তরণের কোনও মাপকাঠি নেই। জাতিসংঘ শুধুমাত্র স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের তালিকা প্রণয়ন করে। এ তালিকার বাইরের দেশগুলো উন্নত দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। উন্নয়ন পরিমাপে মানব উন্নয়ন সুচক বা HDI-ও (ইস্যু ৯) ব্যবহৃত হয় যা বহুলভাবে স্বীকৃত। HDI এর গঠন অনেকটা পূর্বে উল্লিখিত জাতিসংঘের মানব সম্পদ সূচকের মতো।

এছাড়া উন্নয়ন পরিমাপ করতে হলে আবশ্যিকভাবে সামাজিক খরচ ও লাভের বিশ্লেষণ (social cost-benefit analysis) করতে হয়। কারণ প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের (সরকারি ও বেসরকারি) সাথে এক্সটারনালিটির (ইস্যু ১০) গভীর সংযোগ রয়েছে যা টাকার অংকে পরিমাপ করতে হয়। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে যে সকল ঋণাত্মক চিত্র উঠে আসে অর্থনীতির আলোচনায় এগুলোকে নেগেটিভ এক্সটারনালিটি এবং ধনাত্মক বিষয়গুলোকে পজিটিভ এক্সটারনালিটি বলা হয়ে থাকে। এ সকল এক্সটারনালিটি পরিমাপের মাধ্যমেই অর্থনীতির পাঠে সামাজিক খরচ ও লাভের বিশ্লেষণ (ইস্যু ১১) করা হয়। কোনও প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে যদি নিগেটিভ এক্সটারনালিটি উদ্বুদ্ধ হয়ে সামাজিক ক্ষতি বেশি হয় তবে বাজার ব্যর্থ (ইস্যু ১২) (market failure) হয়। বাজার ব্যর্থতা ঠেকানোর জন্য প্রকল্প নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি কর্তৃত্বের (authority) দরকার হয়। এ কর্তৃত্বই কার্যত সরকার এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত সরকারের কার্যপরিধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এভাবেই সরকার উন্নয়ন অর্থনীতিতে ভূমিকা (ইস্যু ১৩) রেখে থাকে।

সামাজিক খরচ ও লাভের হিসাব করা বেশ জটিল ও কষ্টসাধ্য। অনুন্নত দেশের জন্য এটি প্রায় অসম্ভব। এর সবচেয়ে বড় কারণ সরকারের দুর্বল প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি গবেষণা খাতের দুর্বলতা (ইস্যু ১৪)। সরকারি বা বেসরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সাথে উন্নয়ন সিদ্ধান্তের একটি দারুণ সমন্বয় দরকার যা পূর্বে উল্লিখিত অর্থনীতিতে সরকারের ভুমিকার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশ।  

প্রকল্প নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের সাথে অনেক বিষয় জড়িত। মোটাদাগে যদি পুরা অর্থনীতিকে তিনভাগে ভাগ করা হয় (কৃষি, শিল্প ও সেবা) তবে প্রকল্প নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবগুলোকে সমান প্রাধান্য দিতে হবে কারণ একটি আরেকটির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। একটি অন্যটির চেয়ে তুলনামূলক বেশি অনেক এগিয়ে গেলে উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হয়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রকল্পের অগ্রাধিকার তালিকা প্রণয়ন (ইস্যু ১৫)।

উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য উন্নয়ন প্রকল্পের অনেক দীর্ঘ তালিকা থাকতে পারে তবে সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকায় উন্নয়ন প্রকল্পের একটি অগ্রাধিকার তালিকা থাকা আবশ্যক।

অগ্রাধিকার তালিকা হতে অর্থনৈতিক প্রভাবের (economic impact) (ইস্যু ১৬) আলোকে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হয়। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে যুক্তিসঙ্গত কারণে অনেকক্ষেত্রেই সরকার ব্যক্তিখাতের মতো আচরণ করে না। ব্যক্তিখাত যেমন মুনাফা (profit) কেন্দ্রিক আচরণ করে সেখানে সরকারের পরিকল্পনায় থাকে মানুষের সেবা (service) বাড়ানোর ব্রত। তাই ব্যক্তিখাতে ব্যবহৃত বিনিয়োগের পরিমাপকগুলো (ইস্যু ১৭) যেমন, এনপিভি, আইআরআর, প্রফিটাবিলিটি ইনডেক্স, ইত্যাদি দ্বারা সরকারি বিনিয়োগের মূল্যায়ন করা সম্ভব হয় না। প্রায় সকল আয়ের দেশের জন্য অবকাঠামোগত বিনিয়োগ (ইস্যু ১৮) উন্নয়ন অগ্রযাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এর পাশাপাশি অনুন্নত বা স্বল্পোন্নত দেশের জন্য অনেকক্ষেত্রেই প্রকল্প বাস্তবায়নের মূল লক্ষ্য হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি (ইস্যু ১৯)।

প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে আরেকটি বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যে কোনও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সাথে এর সাথে সম্পর্কিত চলক বা চলকগুলোর trade-off (ইস্যু ২০) রয়েছে। অনেকক্ষেত্রেই একটি চলকের উন্নতি হলে অন্য একটি বা একাধিক চলক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একটি ধ্রুপদী উদাহরণ হচ্ছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) দুটি গোলের পারস্পরিক সম্পর্ক। এসডিজি গোল-৮ এ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও সুন্দর কর্মসংস্থানের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে গোল-১০ এ সব ধরনের বৈষম্য কমানোর (ইস্যু ২১) লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের (গোল- ৮) সাথে বৈষম্যের সরাসরি ঋণাত্মক সম্পর্ক রয়েছে। বাস্তবে দেখা যায়, পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলে দুটি বিপরীতধর্মী বিষয়ের অবতারণা হয়; এক) দারিদ্র্য কমে (ইস্যু ২২), কিন্তু, দুই) আয় এবং আয় বহির্ভূত বৈষম্য বাড়ে।

উন্নয়ন সংজ্ঞায়িত করার জন্য চলকের যে দীর্ঘ তালিকা রয়েছে সেখানে বৈষম্য নিয়ন্ত্রণ করা সবচেয়ে দুর্বোধ্য এবং কঠিন কাজ। পৃথিবীর সকল আয়ের দেশের জন্য উন্নয়ন তালিকার সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং চলক হচ্ছে বৈষম্য কমানো যা দীর্ঘসময় ধরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। একটি অর্থনীতিতে দু’ধরনের বৈষম্য দেখা যায়, আয় ও আয়-বহির্ভূত। আয় দ্বারা সৃষ্ট যে বৈষম্য সেটি সহজেই অনুমেয়। আয়-বহির্ভূত বৈষম্য হচ্ছে সামাজিক প্রথা, নিয়ম, শিক্ষা, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব ইত্যাদির কারণে সৃষ্ট বৈষম্য। সত্যি বলতে, আয়ের বৈষম্য অন্যান্য বৈষম্যের প্রায় সমান বদলি (proxy) হিসেবে কাজ করে। বৈষম্যের কারণে উন্নয়ন অন্তর্ভুক্তিমূলক (inclusive) (ইস্যু ২৩) হয় না। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে দারিদ্র্য কমানোর পাশাপাশি বৈষম্যও কমাতে হবে।

সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা (ইস্যু ২৪) থাকতে হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের হাত ধরে আমরা এরূপ দুটি পরিকল্পনা দেখেছি, রূপকল্প -২০২১ ও রুপকল্প-২০৪১। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো উন্নয়নের জন্য সব দেশের আলাদা আলাদা কৌশল (ইস্যু ২৫) থাকবে। সম্পদের ভিন্নতা থাকায় প্রত্যেক দেশের আলাদা ভিশন ও কৌশল থাকা স্বাভাবিক এবং যুক্তিযুক্ত। যদিও অনেকক্ষেত্রেই আমরা উন্নয়নের তত্ত্ব ও মডেলকে সবার জন্য একইভাবে (generalize) ব্যবহার (ইস্যু ২৬) করার চেষ্টা করে থাকি যা বাস্তবে অসম্ভব।

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকার সম্পদের স্থানান্তর (ইস্যু ২৭) করে থাকে। এ প্রক্রিয়া যত স্বচ্ছ হবে উন্নয়নের গতি (ইস্যু ২৮) তত বেশি হবে। সময়ের পরিক্রমায় সকল আয়ের দেশেই উন্নয়ন হয়। তবে এর গতিটাই মুখ্য। উন্নয়নের গতির সাথে কার্যত এ লেখায় বর্ণিত সকল চলকই সম্পৃক্ত। সম্পদের স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী উপস্থিতি এবং এসব প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিকরণ (ইস্যু ২৯) প্রয়োজন। এর পাশাপাশি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের (ইস্যু ৩০) গুরুত্বও অনেক। সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হচ্ছে উপকার বা সুবিধাভোগী (stakeholder) পর্যায়ে স্বাধীনভাবে তাদের মতামত প্রকাশের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করা। এটি করতে হলে সামজিক ন্যায়বিচার (ইস্যু ৩১) নিশ্চিত করতে হয়। আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও (ইস্যু ৩২) তখন উন্নয়নের চলক হয়ে উঠে।

সম্পদ স্থানান্তরের বিষয়টি বর্তমান প্রচলিত উন্নয়ন মডেলে নতুন রূপ লাভ করেছে। এনজিওদের মতো যদি উপকারভোগীদের মাঝে সম্পদের মালিকানা বা স্বত্ব (ownership) (ইস্যু ৩৩) সৃষ্টি করা না যায় তবে স্থানান্তরিত সম্পদ কার্যত কোনো কাজে আসে না। ধরুন, সরকার একটি নলকূপ স্থাপন করল। যারা এর উপকারভোগী তারা যদি এর রক্ষনাবেক্ষণ না করে তবে কিছুদিন পর এর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে। যদি উপকারভোগীরা এর পেছনে ব্যয় (খুব সামান্য হলেও) এবং রক্ষনাবেক্ষণ করে তবে নলকূপটির ব্যবস্থাপনা অনেক সহজ হবে। বাংলাদেশে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচিতে এরকমই স্বত্ব তৈরি করার নজির রয়েছে।

উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত আরও অনেক ইস্যু রয়েছে। বৈষম্যের মতো যে চলকটি আজকের দিনে উন্নয়ন অর্থনীতির আলোচনায় অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক সেটি হলো পরিবেশ সংরক্ষণ (ইস্যু ৩৪)। উন্নয়ন টেকসই করতে হলে এর বিকল্প নেই। উন্নয়ন মাত্রই টেকসই হবে তাই আমার মতে ‘টেকসই উন্নয়ন’ শব্দটি বাহুল্য দোষে দুষ্ট! সমষ্টিক অর্থনীতির আলোচনায় রাজস্ব ও মুদ্রানীতির একটি চমৎকার ভারসাম্য (ইস্যু ৩৫) থাকা বাঞ্ছনীয়। দুই ঘরানার দু’দল অর্থনীতিবিদগণ যা-ই বলেন না কেন দু’টির কোনও একটি অপরটির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। বিশেষ করে, একটি স্বাধীন, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও কর্তৃত্বপূর্ণ মুদ্রানীতি আজকের এ বিশ্বে অনেক বেশি প্রয়োজন।

উন্নয়ন অর্থনীতির ব্যপকতা ও বিষয়বস্তুর গভীরতা বিবেচনা করলেও লেখাটি স্বয়ংসম্পূর্ণ। তবে কারও কাছে ইস্যু হিসেবে কোনও কিছু বাদ পড়েছে বলে মনে হতে পারে। যেমন, একটি অর্থনীতিতে সরকারের গঠন (গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক না-কি একনায়কতান্ত্রিক) কেমন হবে উন্নয়ন অর্থনীতির আলোচনায় সেটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তবে সরকারের গঠন বিষয়টি সামাজিক ন্যায় বিচার ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্বারা (যা ইস্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে) প্রতিস্থাপন করা যায়। প্রসঙ্গত, এখানে কিছু ইস্যুকে যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে হবে আবার কিছু ইস্যু বাদ দিতে হবে। সম্ভাব্য সকল ইস্যু বিবেচনায় নিয়ে একটি পরিপূর্ণ অথচ সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রণয়নের চেষ্টা করা হয়েছে। হুশিয়ার করে দেওয়া যেতে পারে, উন্নয়নের রূপরেখা প্রণয়নে বর্ণিত ইস্যুগুলোকে বিবেচনা করতেই হবে। অন্যথায়, উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের শ্রম ও অর্থ সবই dead-weight loss (ইস্যু ৩৬) হিসেবে গণনা করতে হবে।

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষক

[email protected]

/এসএএস/

সম্পর্কিত

সাংবাদিকতা বনাম করপোরেট ইমেজ

সাংবাদিকতা বনাম করপোরেট ইমেজ

আয়কর রিটার্ন ইমেইলে জমা নেওয়ার উদ্যোগ যে কারণে জরুরি  

আয়কর রিটার্ন ইমেইলে জমা নেওয়ার উদ্যোগ যে কারণে জরুরি  

‘তুমি জানো আমি কে?’

‘তুমি জানো আমি কে?’

ইভ্যালি, সেজান জুস ফ্যাক্টরি আর ‘রেফারি’দের কথা

ইভ্যালি, সেজান জুস ফ্যাক্টরি আর ‘রেফারি’দের কথা

‘তুমি জানো আমি কে?’

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২১, ১৬:৫০

প্রভাষ আমিন সময়টা ১৯৮৯-৯০ সালের দিকে। আমি তখন নতুন ঢাকায় এসেছি। টুকটাক লেখালেখির চেষ্টা করি। থাকি যাত্রাবাড়ির এক মেসে। সেখানে একদিন এক ভদ্রলোক অকারণে আমার সঙ্গে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া বাধাতে এলেন। তার আচরণে আমি অবাক। একদম অচেনা একজন মানুষের সঙ্গে কেউ এমন আচরণ করতে পারেন, এটা আমার ভাবনাতেই ছিল না। আমি খুব ঠান্ডামাথায় তাকে বললাম, ভাই আমি আপনাকে চিনি না।

আপনিও তো আমাকে চেনেন না। এমন করছেন কেন? তিনি এটাকে নিলেন হুমকি হিসেবে। তিনি আরও রেগে গেলেন, আপনাকে চিনতে হবে কেন, আপনি কে? আমি অনেক কষ্টে তাকে বোঝাতে পারলাম– আমি মোটেই কেউ নই। আমাকে চেনারও কোনও কারণ নেই। কিন্তু অচেনা কোনও মানুষের সঙ্গে এমন আচরণ করা উচিত নয়, এমন আচরণ করা যায় না। তিনি পরে তার ভুল বুঝতে পেরেছিলেন। তবে তাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।

আমাদের অনেকেই নিজেকে চেনানোর চেষ্টা করি, হুমকি দেই। ইদানীং টিভিতে একটি চায়ের বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়। এয়ারপোর্টে এক এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে এক ভদ্রলোক তাড়াহুড়ো করে গেলেন। কাউন্টারের ভদ্র মহিলাকে তিনি হুমকি দেন, ‘তুমি জানো আমি কে?’ প্রাথমিকভাবে ভদ্র মহিলার মন খারাপ হলেও সেই চা খেয়ে তার সাহস অনেক বেড়ে যায়। তিনি লাউড স্পিকারে ঘোষণা দেন, এই ভদ্রলোক জানেন না উনি কে। কেউ যদি তার পরিচয় জানেন, কাউন্টারে যোগাযোগ করুন। আমাদের চারপাশে এখন এই ভদ্রলোকের মতো নিজেকে না জানা লোকের ভিড়। আমরা নিজেকেই চিনি না, তাই নানান পরিচয়ে চেনানোর আকুল চেষ্টা। সত্য-মিথ্যা জানি না, ফেসবুকে একটা সাইনবোর্ড দেখেছি, ‘এই জমির মালিক বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ শহীদুল ইসলামের শ্যালক অমুকের।’ আহারে নিজের জমি রক্ষার কী আকুল চেষ্টা। জমি প্রসঙ্গে একটা পুরনো কৌতুক মনে পড়লো। কৌতুক হলেও ঘটনা সত্য। তখন স্বৈরাচার এরশাদের আমল। তখন জমিতে বেশিরভাগ সাইনবোর্ড দেখা যেত সেনা কর্মকর্তাদের। আমরা তখন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে আড্ডা মারি। কেন্দ্রের চার কুতুব ছিলেন আহমেদ মাযহার, লুৎফর রহমান রিটন, আমীরুল ইসলাম ও আসলাম সানী। আমরা তাদের পেছনে ঘুর ঘুর করি। বকাঝকা খাই। আমাদের সবারই নুন আনতে পান্তা ফুরায় দশা। তো একদিন সানী ভাই খুব গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ভাবছি সাভারে একটা জমি কিনবো। সেখানে সাইনবোর্ডে লিখবো, ‘এই জমির মালিক লে. ক. আসলাম সানী টিএসসি।’ আমরা তো অবাক সানী ভাই জমি কেনার টাকা পাবেন কোথায়। তারচেয়ে বড় কথা, তিনি সাইনবোর্ডে মিথ্যা কথা লিখবেন। আমাদের বিস্ময়ের জবাবে সানী ভাই বললেন, এখানে কোনও মিথ্যা নেই, লে. ক. মানে হলো লেখক, কবি; আর টিএসসি মানে সারাদিন টিএসসিতে আড্ডা মারে। তবে পাবলিক মনে করবে লেফটেন্যান্ট কর্নেল; আর টিএসসিকে মনে করবে পিএসসির চেয়ে বড় কোনও ডিগ্রি। সানী ভাইয়ের কৌতুকে আমরা সবাই খুব মজা পেলাম। তবে তিন দশকেও এই পরিস্থিতি বদলায়নি, বরং আরও বেড়েছে।

আমরা সবাই ক্ষমতাশালী হতে চাই। ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে চাই। অথচ চাইলে ভালোবেসে এরচেয়ে কম কষ্টে মানুষের হৃদয় জয় করা সম্ভব। ভালোবাসার কষ্ট আমরা করতে চাই না। ক্ষমতার দাপটে সব লন্ডভন্ড করে ফেলতে চাই। ভিকারুননিসা কলেজের প্রিন্সিপালের একটি টেলিফোন কথোপকথন ফাঁস হয়েছে। তাতে তিনি প্রতিপক্ষকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করছেন। নিজে একসময় পিস্তল নিয়ে ঘুরতেন, বালিশের নিচে পিস্তল রেখে ঘুমাতেন, সেই রেফারেন্স দিচ্ছেন। ছাত্রলীগ, যুগলীগ, যুব মহিলা লীগের হুমকি দিয়েছেন। নিজেকে ক্ষমতাশালী প্রমাণের চেষ্টা করছেন। কী অবস্থায় তিনি এমন কথা বলছেন, তাকে কারা উসকানি দিচ্ছেন; সে প্রসঙ্গ ভিন্ন। তিনি একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা, দেশের সবচেয়ে নামি কলেজের প্রিন্সিপাল; অন্যায়ের মোকাবিলা করার জন্য এটুকুই যথেষ্ট। কিন্তু নিজের ক্ষমতার ওপর আস্থা রাখতে না পেরে তিনি রাজনীতি টেনে এনেছেন। অবশ্য বাংলাদেশের বাস্তবতায় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাই সব ক্ষমতার উৎস। তাই তো সবাই আওয়ামী লীগ হতে চায়। গত এক যুগে বাংলাদেশে প্রায় সবাই আওয়ামী লীগ বনে গেছেন। বিপদের দিনে যাদের টিকিটিও দেখা যায়নি, তারাই এখন আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী। চকচকে মুজিব কোট পরে তারা ঘুরে বেড়ান। গোপালগঞ্জের আশপাশের জেলায় বাড়ি হলেও সবাই বলেন বাড়ি গোপালগঞ্জে। অন্য জেলার মানুষ গোপালগঞ্জে গিয়ে একটু জমি কিনে স্থায়ী ঠিকানা গোপালগঞ্জ বানিয়ে ফেলেছেন, এমন উদাহরণও কম নয়। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে এরা নিজেদের বগুড়া বা ফেনীর মানুষ বানানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন।

কোনও অপকর্ম করে কেউ ধরা পড়লেই দেখা যায়, তিনি আওয়ামী লীগের কোনও উপ-কমিটির সদস্য বা কোনও আওয়ামী দোকানের নেতা। ক্ষমতাবান লোকজনের সঙ্গে তারও ছবি আছে। রিজেন্ট কেলেঙ্কারির  সাহেদও আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক উপ-কমিটির সদস্য ছিলেন। ক্ষমতাবানদের সঙ্গে তার ছবির কোনও অন্ত নেই। ‘আওয়ামী চাকরিজীবী লীগে’র সভাপতির পরিচয় দিয়ে বিপাকে পড়া হেলেনা জাহাঙ্গীরও আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য ছিলেন। বিপাকে পড়ে তিনিও সরকারের মন্ত্রী আর আওয়ামী লীগ নেতাদের কথা বলছেন।

সবার হাতে হাতে ক্যামেরা থাকায় ক্ষমতা দেখানোর আরেক পন্থা হয়েছে ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সেলফি। কোনও সামাজিক বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে গিয়ে এক ফাঁকে হয়তো ওবায়দুল কাদের বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা অন্য কোনও মন্ত্রী-এমপির সঙ্গে একটা সেলফি তুলে নিয়েছেন। ব্যস সেটা ফেসবুকে ব্যাপক প্রচার, বাসার ড্রইং রুমে বড় করে বাঁধাই করে রাখাই হলো ক্ষমতা দেখানোর আরেক কৌশল। নেতাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। একজন রাজনৈতিক নেতা কেউ ছবি তুলতে চাইলে মুখের ওপর না করতে পারেন না।

ক্ষমতা দেখানোর প্রবণতা সর্বত্র। কোনও কাজ বাগাতে, টেন্ডার পেতে, সুবিধা পেতে তিনি কাকে কাকে চেনেন তার ফিরিস্তি দিতে থাকেন। গাড়িতে ‘সাংবাদিক, ডাক্তার, পুলিশ, র‌্যাব, উকিল’ নানা সাইনবোর্ড লেখা থাকে। সবাই এই পরিচয়ে রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশকে ক্ষমতা দেখাতে চান। কয়েক দিন আগে লকডাউনের সময় পুলিশ এক ডাক্তারকে আটকালে তিনি এক মন্ত্রীকে ফোন করেছিলেন। ট্রাফিক পুলিশও এসবে অভ্যস্ত। একাধিকবার আমার গাড়িকে নানা কারণে আটকে মামলা দেওয়া হয়েছে, জরিমানা করা হয়েছে। আমি দ্রুত তা পরিশোধ করেছি। পরে পরিচয় জানতে পেরে তিনি বলেন, আগে বলবেন না আপনি সাংবাদিক। আমি তাকে বলি, যেটা অপরাধ সেটা সবার জন্যই অপরাধ। সাংবাদিকদের জন্য তো আলাদা আইন নেই। অনেকে এসে আমাকে বলেন, অমুককে একটু ফোন করে দেন। এই হলো নম্বর। আমি বলি, ভাই আমি তো তাকে চিনি না। কীভাবে ফোন করবো। তিনি বলেন, চিনতে হবে  না। ফোন করে আপনার পরিচয় দিলেই হবে। আমি তাকে বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দিয়ে বলি, এটা সম্ভব নয়। তিনি মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে ফিরে যান। একজন অপরিচিত মানুষকে ফোন করে নিজের পরিচয় দিয়ে কীভাবে কোনও তদবির করা যায়, আমার মাথায়ই ঢোকে না। কিন্তু নিশ্চয়ই এমনটি ঘটে। নইলে তিনি সেটা বলবেন কেন।

শুরুতে যে টিভি বিজ্ঞাপনের সংলাপের কথা বলা হয়েছে, ‘তুমি জানো আমি কে’, এটি আসলে ভদ্রতা করে বানানো। বাস্তবে সবাই মনে মনে বলে, ‘তুই চিনস আমি কে’। যার সত্যি সত্যি দেওয়ার মতো পরিচয় আছে, তিনি কখনও বলেন না, তুমি চেন আমি কে। তার হয়ে অনেক মানুষ পরিচয় বলে দেবে। সূর্যের চেয়ে বালি বেশি গরম হয়। তাই যাদের দেওয়ার মতো পরিচয় নেই, তারাই বেশি হম্বিতম্বি করে। মানুষকে চেনানোর চেষ্টা না করে, আমরা যদি নিজেই আগে নিজেকে চেষ্টা করি, তাহলেই বরং লাভ বেশি, মর্যাদা বেশি। আমরা যেন এমন কর্ম করি, যাতে সবাই বলে, ওই দেখো অমুক যায়; তাহলেই মাথা উঁচু করে থাকা যায়, মর্যাদার সঙ্গে বাঁচা যায়।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 
 
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

আহা জীবন, আহা কলেজ জীবন!

আহা জীবন, আহা কলেজ জীবন!

লকডাউন থামলেও মৃত্যু থামেনি

লকডাউন থামলেও মৃত্যু থামেনি

তৈলাক্ত বাঁশের অঙ্ক !

তৈলাক্ত বাঁশের অঙ্ক !

হলি আর্টিজান: জঙ্গিবাদের উত্থান-পতন

হলি আর্টিজান: জঙ্গিবাদের উত্থান-পতন

ইভ্যালি, সেজান জুস ফ্যাক্টরি আর ‘রেফারি’দের কথা

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২১, ১৬:২৩

ডা. জাহেদ উর রহমান ২০১৫ সালে বিশ্ববিখ্যাত জার্মান গাড়ি নির্মাতা ফোক্স ওয়াগনের এক ভয়ংকর জালিয়াতি প্রকাশিত হয়, যা ‘ডিজেলগেট’ বা ‘ইমিশনগেট’ কেলেঙ্কারি হিসেবে পরিচিত পায়। কোম্পানিটি তাদের তৈরি ডিজেলচালিত গাড়িগুলোর পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নাইট্রিক অক্সাইড এবং নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড কমিয়ে দেখানোর জন্য জালিয়াতির আশ্রয় নেয়। তারা তাদের গাড়িতে এমন একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করে, যেটি শুধু পরীক্ষার সময় গ্রহণযোগ্য মাত্রায় ওই দুটি গ্যাসের নিঃসরণ দেখায়। বাস্তবে যখন রাস্তায় গাড়িগুলো চলে তখন এই গ্যাসগুলোর নিঃসরণ বহুগুণ বেশি হয়। বিশ্বের অতি বিখ্যাত কোম্পানিটির এই জালিয়াতি নিয়ে আবারও আসবো কলামের শেষ অংশে।

ইভ্যালি নামের ই-কমার্স সাইটটি সাম্প্রতিক সময়ে তুমুল আলোচনার বিষয় হয়েছে। শেষ খবরে দেখা যায় দেশের একটি বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠানটিতে বেশ বড় বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত কী হবে সেটা বলার সময় এখনও আসেনি। তবে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক সংকটের সুরাহা হয়েছে। এখন এই কোম্পানিটি কীভাবে ব্যবসা করবে জানি না, কিন্তু তার আগের ব্যবসার ধরনে নিশ্চিতভাবেই সমস্যা ছিল।

আমরা এই আলোচনায় আলোচিত বিনিয়োগটির আগের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলি। ইভ্যালির  মালিক চাইতেই পারেন ব্যবসায়িক রীতি-নীতি, রাষ্ট্রীয় আইন না মেনে, এমনকি লুটপাট করে হলেও টাকা বানাতে। এই কোম্পানিটিকে দেখে গজিয়ে ওঠা আলেশামার্ট-সহ অন্যান্য কোম্পানিগুলোর মালিকও সেটা চাইতে পারেন। তারা চাইতে পারেন যেকোনও মূল্যে তাদের প্রফিটকে ‘ম্যাক্সিমাইজ’ করতে।

‘ম্যাক্সিমাইজিং প্রফিট’ বা ‘মুনাফার সর্বোচ্চকরণ’ বাজার অর্থনীতিতে ব্যবসায় খুব আলোচিত একটি কথা। প্রতিটি ব্যবসায়ীর মূল প্রবণতা থাকে তার মুনাফাকে যত বেশি সম্ভব বাড়ানো। যেহেতু এখানে সর্বোচ্চকরণ শব্দটি আছে তাতে এটা বোঝা যায় এর কোনও সীমা নেই। এক টাকা বিনিয়োগে কেউ যদি ১০০ টাকা মুনাফাও করে তবু সেটাকে আরও বাড়ানোর চেষ্টা করবে। এই বাড়ানোর জন্য ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো করতে পারে যাচ্ছেতাই।

কিছু দিন আগেই বহু মানুষ পুড়ে আক্ষরিক অর্থেই অঙ্গার হয়েছিল সেজান জুস ফ্যাক্টরিতে ঘটা অগ্নিকাণ্ডে। দেখা গেছে সেই ভবনটি অগ্নিকাণ্ড এবং অন্যান্য জরুরি অবস্থার ঝুঁকি মোকাবিলার মতো ন্যূনতম পদক্ষেপও নেয়নি। এমনকি সেই কোম্পানিতে ছিল অনেক শিশু শ্রমিকও। কোম্পানিটির মালিক চাইতে পারেন নিয়ম-নীতি, আইন পালন না করে সেই খাতে ব্যয় অনেক কমিয়ে এবং অনেক কম ব্যয়ে শিশুশ্রমিক রেখে তার ‘প্রফিট ম্যাক্সিমাইজ’ করতে।

ইভ্যালি এবং তার অনুকরণে প্রতিষ্ঠিত আলেশামার্টসহ আরও বেশ কিছু ই-কমার্স সাইট যা করছিল তাতে শুরু থেকেই খুব স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছিল এই কোম্পানিগুলো আসলে কী করতে যাচ্ছে। মূল দামের দুই-তৃতীয়াংশ অর্ধেক কিংবা তারও কম দামে মানুষ যখন নানা মূল্যবান পণ্য পেতে শুরু করলো তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই অনেকেই এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়লো। সাম্প্রতিক অতীতে যুবক, ইউনিপে টু ইউ, ডেসটিনির মতো প্রতিষ্ঠানের কাণ্ড দেখার পরও মানুষ আবার এই কোম্পানিগুলোর ফাঁদে পা দিলো।

সামাজিক মাধ্যমে দেখেছেন অনেকেই ‘লোভী’ মানুষদের ভীষণ গালমন্দ করছেন। সাম্প্রতিক অতীতের উদাহরণগুলো দিয়ে করা এই গালমন্দকে আপাতদৃষ্টিতে যৌক্তিকও মনে হয়। কিন্তু আমরা অনেকেই তলিয়ে দেখি না আলোচিত এই ই-কমার্স সাইটগুলো আদৌ এমন ব্যবসা করতে পারে কিনা। বিশেষ করে ইভ্যালি সারাদেশে যে পরিমাণ বিজ্ঞাপন দিয়ে এই ব্যবসায় নেমেছে, মাসের পর মাস চালিয়ে গেছে, তাতে এটা মনে করার কোনও কারণ নেই এই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক এবং রেগুলেটররা এদের সম্পর্কে জানতেন না। এরা কেউ ‘জিনের বাদশা’ পরিচয় দিয়ে মানুষকে ফোন করে প্রতারণা করে টাকা নেয়নি।

ধরে নেওয়া যাক আলোচিত এই ই-কমার্স সাইটগুলো ইভ্যালির চেয়ারম্যানের ভাষ্য মতো তাদের ব্যবসা শুরুর জন্য বেশ কিছু দিন এরকম অফার করেছে। ধরে নেওয়া যাক এই খাতে তারা কয়েকশ’ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারপর তারা ক্রমান্বয়ে ভর্তুকি কমিয়ে একটা সাধারণ ই-কমার্স সাইটে পরিণত হবে। এবং এটাও মনে করে নেওয়া যাক ক্রেতাদের পণ্য প্রাপ্তিতে কিংবা পণ্য না পেলে টাকা ফেরত পাওয়াতে কোনও রকম সমস্যা হচ্ছে না। মজার ব্যাপার, এই ইউটোপিয়ান পরিস্থিতিতেও এটা একেবারেই বেআইনি, এটা কোনোভাবেই চলতে দেওয়ার কথা ছিল না।

পশ্চিমের অ্যান্টি-ট্রাস্ট ল'-এর আদলে বাংলাদেশেও আইন আছে- প্রতিযোগিতা আইন, ২০১২। আইনটি নিয়ে বিস্তারিত আলাপের জায়গা এই কলাম না। তবে আইনের নামটি নিশ্চয়ই স্পষ্ট করে এই আইনের উদ্দেশ্য হচ্ছে বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। এই আইনে একটি প্রতিযোগিতা কমিশন গঠন করার কথা এবং সেটা বাংলাদেশে আছে। আইনে সেই কমিশনের কার্যাবলি যা হবে তাতে প্রথম কথাটি হচ্ছে এটা -

৮.১(ক) বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব বিস্তারকারী অনুশীলনসমূহকে নির্মূল করা, প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করা ও বজায় রাখা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করা।

হঠাৎ মানুষের টাকা মেরে না দিলেও শত শত কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে বাজারে এমন একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা ইভ্যালি এবং অন্য ই-কমার্স সাইটগুলো কোনোভাবেই তৈরি করতে পারে না। এমন অফার শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কথা ছিল প্রতিযোগিতা কমিশন সেটিকে বন্ধ করবে। কিন্তু না, এটা চললো এবং চলতেই থাকলো।

এরপর আরও কয়েক মাস আগেই যখন জানা যাচ্ছিল ইভ্যালি মানুষের পণ্য দিতে পারছে না এবং পণ্য না পাওয়া মানুষের টাকাও ফেরত দিচ্ছে না, তখন তো এই কোম্পানির চরিত্র সম্পর্কে দ্বিধার আর কিছুই ছিল না। কিন্তু তখনও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সেই ব্যবসা আরও চলতে দিয়ে বহু মানুষের ভয়ংকর ক্ষতির কারণ হতে দেওয়া হয়েছে; যত দিন গেছে তত বেশি মানুষ এই জালে জড়িয়েছে।

সেজান জুস ফ্যাক্টরিতে নানারকম অনিয়ম ছিল। দুর্ঘটনার পর ফায়ার ব্রিগেডের পক্ষ থেকে অন-রেকর্ড বলা হয়েছে সেই ভবনে এমনকি একটি অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রও ছিল না। সব কারখানায় সব আইন ঠিকঠাক মতো মেনে চলছে কিনা সেটা তদারক করার জন্য পরিদর্শক আছেন। বছর দশেক আগে এদের সংখ্যা খুব কম থাকলেও রানা প্লাজার ঘটনার পর এদের সংখ্যা এখন পর্যাপ্ত। দুর্ভাগ্য আমাদের, রানা প্লাজার ঘটনার পর আমদানিকারকদের চাপে গার্মেন্ট কারখানাগুলোকে কমপ্লায়েন্স রক্ষা করার জন্য ঠিক হতে হয়েছে। কিন্তু অন্যান্য সেক্টরের বেশিরভাগ কারখানা প্রয়োজনীয় মানের আশপাশেও নেই। এমন দেশে আমরা বসবাস করি যেখানে অনেক ক্ষেত্রেই নাগরিকদের স্বার্থ দেখা হয় না, নাগরিকদের স্বার্থ যতটুকু নিশ্চিত হয়, ততটুকু হয় বিদেশের চাপে।

শুরুর প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। ফোক্স ওয়াগন-এর মতো বিখ্যাত কোম্পানিও তাদের গাড়িতে জালিয়াতি করছিল। মজার ব্যাপার, এই কোম্পানি তাদের গাড়িগুলো যখন আমেরিকায় পাঠায় তখন ‘ইউনাইটেড স্টেইটস এনভায়রমেন্টাল প্রটেকশন এজেন্সি’ শেষ পর্যন্ত এই জালিয়াতি ধরতে সক্ষম হয়। এতে নিশ্চিত হয় আমেরিকার নাগরিকদের স্বার্থ। এরপর নেওয়া হয়েছে নানা রকম শাস্তিমূলক পদক্ষেপ।

ফোক্স ওয়াগন কেলেঙ্কারি প্রমাণ করে উন্নত পুঁজিতান্ত্রিক পশ্চিমা দেশগুলোতেও এমনকি অতি স্বনামধন্য ব্র্যান্ডগুলোও তাদের প্রোফিট ম্যাক্সিমাইজেশনের জন্য অন্যায় পদক্ষেপ এমনকি জালিয়াতির আশ্রয় নিতে পারে। কিন্তু সেসব দেশে রেগুলেটররা থাকে, যারা জনগণ আর এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে থেকে রেফারির দায়িত্ব পালন করে। তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে উভয়ের মধ্যে যাতে বেআইনি অন্যায় কিছু না ঘটে। সেই রেফারিকে কদাচিৎ কিনে ফেলার ঘটনা সেখানে দেখা যায় না, তা নয়। কিন্তু সেই প্রবণতা খুব কম, আর অন্যায় যোগসাজশের জন্য দায়ী রেগুলেটরদের শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।

ইভ্যালি বা সেজান জুসের মালিক কিংবা এই দেশের আর সব ব্যবসায়ী ন্যায়ানুগ ব্যবসা করলে সেটা খুব ভালো। কিন্তু একটা রাষ্ট্রের সরকার থাকতে হয় এটা ধরে নিয়ে যে বহু মানুষ বেআইনি কাজ করবে, নিয়ম ভাঙবে। বহু ‘হায় হায় কোম্পানি’ জনগণকে পথে বসিয়ে নিজে ফুলে-ফেঁপে উঠতে চাইবে। জনগণের টাকায় পরিচালিত সরকারের তখনকার কাজ হবে রেফারির ভূমিকা নেমে ‘ফাউল’ বন্ধ করে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা। সত্যিকার অর্থে সরকার দরকার এজন্যই; সব মানুষ নিজ থেকে ভালো আচরণ করলে, অন্যের প্রতি অন্যায় না করলে তো সরকারেরই দরকার নেই।

এই রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে, সরকার চালানোর ব্যয় সংস্থান করার একজন করদাতা হিসেবে আমার ক্ষোভ-উষ্মার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সরকারের দায়িত্বশীল মানুষ। এই ক্ষেত্রে রেফারির ভূমিকা পালন করার কথা ছিল। তাদের দায়িত্ব হচ্ছে আমাদের স্বার্থ দেখার জন্য। সেই অনেক রেফারি যখন ব্যবসায়ীদের টাকার কাছে বিক্রি হয়ে আপামর জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন সেই মানুষদের শাস্তি হওয়া উচিত ব্যবসার মালিকদের চাইতে বেশি।

এই দেশে একের পর এক ভয়ংকর শিল্প দুর্ঘটনা হয়েছে, রাসায়নিক গুদামে অগ্নিকাণ্ড হয়েছে, মানুষ সর্বস্ব খুইয়েছে শেয়ার বাজারে কিংবা ভুঁইফোড় ‘হায় হায় কোম্পানি’র হাতে। একটি ঘটনার ক্ষেত্রেও আমরা কি দেখেছি দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থার কারও উল্লেখযোগ্য শাস্তি হয়েছে?

মূল অপরাধীদের আইনের আওতার বাইরে রেখে আর সব পদক্ষেপ আইওয়াশের বেশি কিছু হবে না। আমাদের হয়তো অপেক্ষা করতে হবে কোনও দিন বিদেশি কোনও চাপের...।

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

করোনা মোকাবিলায় আমলাই যথেষ্ট, বিশেষজ্ঞ কমিটি কেন?

করোনা মোকাবিলায় আমলাই যথেষ্ট, বিশেষজ্ঞ কমিটি কেন?

সরকার কি স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ‘বলির পাঁঠা’ বানাবে?

সরকার কি স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ‘বলির পাঁঠা’ বানাবে?

মোটরসাইকেল কিংবা ‘চলমান কফিন’

মোটরসাইকেল কিংবা ‘চলমান কফিন’

পরীমণি ‘ভাগ্যবান’, নাসির-অমি নয়

পরীমণি ‘ভাগ্যবান’, নাসির-অমি নয়

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

৫ আগস্টের আগে কারখানায় যোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়: জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী

৫ আগস্টের আগে কারখানায় যোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়: জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী

ঈদে বিক্রি না হওয়া ‘কালো মানিক’কে নিয়ে বিপাকে খামারি

ঈদে বিক্রি না হওয়া ‘কালো মানিক’কে নিয়ে বিপাকে খামারি

অটোরিকশা থেকে চাঁদা আদায় নিয়ে সংঘর্ষে আহত ১৩

অটোরিকশা থেকে চাঁদা আদায় নিয়ে সংঘর্ষে আহত ১৩

ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রীর বিয়ের আয়োজন করায় বাবার জরিমানা

ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রীর বিয়ের আয়োজন করায় বাবার জরিমানা

ভয়াবহ দাবানলে পুড়ছে তুরস্ক

ভয়াবহ দাবানলে পুড়ছে তুরস্ক

খুলনায় বৃষ্টিতে ভেসে গেছে ১০৮ কোটি টাকার মাছ

খুলনায় বৃষ্টিতে ভেসে গেছে ১০৮ কোটি টাকার মাছ

হেফাজতের হরতালে সহিংসতা মামলার আসামি গ্রেফতার

হেফাজতের হরতালে সহিংসতা মামলার আসামি গ্রেফতার

করোনা রোগীর চাপ ঢাকা মেডিক্যালে

করোনা রোগীর চাপ ঢাকা মেডিক্যালে

প্রতি শনিবার ১০ মিনিট সময় চান মেয়র আতিক

প্রতি শনিবার ১০ মিনিট সময় চান মেয়র আতিক

করোনায় প্রথম র‌্যাবের নারী সদস্যের মৃত্যু, মহাপরিচালকের শোক

করোনায় প্রথম র‌্যাবের নারী সদস্যের মৃত্যু, মহাপরিচালকের শোক

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব রটানোর অভিযোগে একজন গ্রেফতার

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব রটানোর অভিযোগে একজন গ্রেফতার

ফুটবল খেলায় ও রাস্তায় ঘোরাঘুরি করায় আটক ৪৪

ফুটবল খেলায় ও রাস্তায় ঘোরাঘুরি করায় আটক ৪৪

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune