X
শুক্রবার, ০৬ আগস্ট ২০২১, ২১ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

কোথাও কিছু হচ্ছে

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২১, ১১:৩২

আমি ঠিক বলতে পারব না আমার পাশের ফ্ল্যাটের ঘাড় নিচু করে হাঁটা বৃদ্ধ-হই-হই লোকটা আছে কিনা। লিফট ধরতে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে যখন দেখতাম বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের ফেনা উপচে উঠছে, আমি মনে মনে গুনে নিতাম বিশ জোড়া সিঁড়ির মিনিমান দুইশত স্টেপ, ব্যাকপ্যাকের নিচের বেল্ট কোমরের সঙ্গে লাগিয়ে দিতাম দৌড়। হ্যাঁ দৌড়ই বলতে হবে, একটুও না থেমে আমি দশতলায় উঠে যেতাম। ততক্ষণে বৃদ্ধ-লিফট তারচেয়ে আরো বৃদ্ধদের যার ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে পৌঁছে দিত।

আমি থাকি ছাদে। যেখানে আকাশটা ঈষৎ নীল হয়ে সাদা সাদা মেঘের ভাড়ে নুয়ে থাকে, সেখানে। দিনের বেলা গরম। পাতিলে চাল-ডাল রেখে দিলে আপনাআপনিই সেদ্ধ হয়ে যায়। তখন অবশ্য আমি প্রায়ই থাকি না।
কোভিডে আক্রান্ত হবার পর পালানো বয়ফ্রেন্ডকে আমি আর এই গরমের মধ্যে তিষ্টাতে দেইনি। তবে তার প্রতিবার সঙ্গে করে আনা এয়ার কুলারটি রয়ে গেছে। সেটার ঠান্ডা হাওয়া খেতে আমার ঘেন্না লাগে না মোটেও।

ফাঁকা ছাদটি এই অবসরে সবজি আর ফুলে ফুলে ভরে গেছে। সবজি বলতে বেগুন, মিষ্টি কুমড়া, ঢেঁড়শ আর বেটে একটা গাছভর্তি পেঁপে, ধেনোমরিচেরও আছে একটা। ফুল বলতে অপরাজিতা, যেটা গরম জলে ফুটিয়ে খাওয়ার অভ্যাস করেছি চায়ের বিকল্প হিসেবে।

ঊষার সময় ঘুম থেকে উঠে কৃষিকাজ করে এয়ার কুলার ছেড়ে আমি লিখতে বসি। একটি উপন্যাস ফাঁদছি। আমার ডেইলি লাইফ নিয়েই উপন্যাস। প্রতিদিন যা যা করি। এমনকি গোপন কর্মও বাদ যায় না; গোপন চিন্তাও না। আমার বয়ফ্রেন্ডকে সেই উপন্যাসের নায়ক বানিয়ে নিয়ে চলেছিলাম, কিন্তু আমি কোভিডে আক্রান্ত হাবার পর তার পিছটান আমাকে শিক্ষা দিয়েছে একলা চলার। হ্যাঁ, আমি তাকে জ্বালিয়েছি। জ্বালানো আমার স্বভাব। আমার সঙ্গ পেতে হলে তার খরচাও যেমন করতে হবে, তেমনি বাসার ধোয়ামোছার কাজও তাকে দিয়ে করাতাম। বেচারা দ্রুত ক্লান্ত হলে বিছানায় ঠেসে তার উপর লাফিয়ে উঠে বলতাম, এবার শুরু করি? সে সত্যি সত্যি ভয় পেয়ে যেতো। যাক আমার উপন্যাসে সে নেই। তার নাম নীল হলেও, সেখানে গু-কালার মানে হলুদ রিপ্লেস অল করে দিয়েছি। যদিও তার তেমন দোষ নেই। দোষ না থাকাটাই দোষের। সে আমার বাসায় আমার সঙ্গে থেকে কোভিড বাধাতে পারত। আমরা দুজন একসঙ্গে গরম জলের ভাপ নিতাম।

যাক গুয়ের কথা বাদ, বা যদিও ফিরে আসে, আসবেই তো; প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে সে তো ফিরেই আসে। আসুক। কমোডের মধ্যেই তাকে দেখতে চাই, উপন্যাসে না।

আমার উপন্যাসে ঢুকে পড়েছে নিচতলার এক বৃদ্ধ-হই-হই-বৃদ্ধ, ঘাড় সামনের দিকে ঝুঁকে হাঁটে, একদিন আমার খোলা দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকে, নাম ধরে নয়, ‘এই ইয়াং লেডি’ বলে। আমি যথেষ্ট শালীন কাপড়ে ছিলাম না। বিছানা চাদরটি গায়ে পেঁচিয়ে দরজায় দাঁড়াই।

‘এটি বোধ হয় আপনার।’ একটি অন্তর্বাস সাপের লেজ ধরে ঘোরাবার মতো করে ঘুরিয়ে তিনি বললেন।

আমি অন্তর্বাস পরি না। শুধু তাই নয়, আমি অন্তর্বাসবিরোধী সোশ্যাল এক্টিভিস্ট। কিন্তু ব্যাপারটা এখানেই সমাপ্ত করতে হাত বাড়িয়ে নেই, ‘ধন্যবাদ, বাতাসে উড়ে গেছে বোধ হয়।’

তিনি হাসলেন ঘরের ভেতরে চোখদুটো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে।

আমি তাকে বসতে বললাম না।

না, বসতে বলেছি। ওইদিন আমার মেজাজ তেমন ভালো ছিলো না। কোভিড পজেটিভের ১১ তম দিনে ছিলাম। মালটা ঘরে ঢুকতেই আশ্চর্য একটি ঘ্রাণে আমার ঘর ভেসে গেল। ভীষণ জলের তোড় থেকে যেমন মাঝি-মাল্লারা নৌকা সামলে রাখে আমি নিজেকে সেভাবে সামলোতে গিয়েও ব্যর্থ হলাম।

তার মুখ আমার মনে নেই। লোকটি বৃদ্ধ-হই-হই হলেও তার ভেতরে এক দোর্দণ্ড তারুণ্য রয়েছে। বা মায়া। ওইসময় সে নিজেও তার বৃদ্ধ খোলশটি খুলে ফেলে তারুণ্যের রঙিন আভায় পুড়তে থাকে।

যাবার সময় আমি তার হাতে অন্তর্বাসটি তুলে দিয়ে বললাম, এটা আপনারই কাজে লাগবে, আমি উন্মুক্ত বক্ষের নারী।

তিনি উপহার পেয়েছেন মনে করে যত্নের সঙ্গে ভাঁজ করে পকেটে চালান করে দিলেন।

বৃদ্ধ-হই-হই লোকটির আর কোনো সাড়া ছিল না [সাড়া পেলে মন্দ হতো না]। একদিন তাকে দেখি গ্যারেজে, ঘাড় আরো বেশি গুজো করে হাঁটতে হাঁটতে লিফটের দিকে আসছেন। আমি সিঁড়ি-দৌড় না দিয়ে তার সঙ্গে লিফটে উঠি। আমি প্রথমে হাত নেড়ে তাকে হ্যালো বলি। তিনি প্রাগৈতিহাসিক কালের থেকে চোখ তুলে আমার দিকে তাকাতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু তার চোখগুলো খুলে লিফটের ভেতরে লাফাতে শুরু করল। আমি তা ধরে ধরে তার হাতে দিতে লাগলাম, কিন্তু তাও তিনি ধরে রাখতে পারলেন না।

লোকটা বোধহয় অন্ধই হয়ে গেল!

*

মাঝখানে এই বৃদ্ধনিবাসটি এম্বুলেন্সের হুইসেলে জেগে জেগে উঠে একেবারেই নীরব হয়ে গেছে। আমি ছাদে ফলানো সবজি খাই, আর ফুল দিয়ে সেজে তাহিতি দ্বীপের তরুণীদের মতো বেঁচে থাকি।

কিন্তু সকালে আমার ঘুম ভাঙে তীব্র পচা গন্ধে, প্রতিদিনই, যেন একটি কালো মাদি কুত্তা আমার খাটের নিচে মরে পচে আছে। আমি ঘর তছনছ করে ছাদের চারপাশে হেঁটে গন্ধের উৎস খোঁজার চেষ্টা করি আর ক্লান্ত হয়ে পড়ি। তারপর ট্রিপল থ্রি-তে ফোন। বাসার ঠিকানা বলতে না বলতেই আমার স্নায়ু অবশ হতে শুরু করে। যেন গন্ধটা আমাকে আবিষ্ট করে রেখেছে। তখন বহুবার আমার ফোন বেজে উঠতে পারে, কিন্তু আমার স্নায়ু আর অন্যকিছু গ্রহণের জন্য প্রস্তুত থাকে না

/জেডএস/

সম্পর্কিত

রবীন্দ্রনাথের পারস্য মুগ্ধতা

রবীন্দ্রনাথের পারস্য মুগ্ধতা

‘হাতিটা উধাও’ গ্রন্থের অনুবাদকের কথা

‘হাতিটা উধাও’ গ্রন্থের অনুবাদকের কথা

ফজল হাসানের অনুবাদে বিদেশি গল্পের সংকলন

ফজল হাসানের অনুবাদে বিদেশি গল্পের সংকলন

‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’র ভূমিকা

‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’র ভূমিকা

রবীন্দ্রনাথের পারস্য মুগ্ধতা

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২১, ০০:২৯

পৃথিবীর সেরা পর্যটকের তালিকা করলে রবীন্দ্রনাথের নাম তাতে যুক্ত হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভ্রমণ করেছিলেন বলা যায়। এবং একজন কবির চোখে সে ভ্রমণের নানা বর্ণনার কথাও আমরা জানি। পৃথিবীকে, পৃথিবীর মানুষ ও জনপদ দেখা এবং তাকে উপলব্ধির আলোয় বর্ণনা করার ক্ষমতা ছিল কবি রবীন্দ্রনাথের। প্রতিটি ভ্রমণের আগে তিনি প্রস্তুতি নিতেন, ইতিহাস থেকে জেনে নিতেন সেই সব অঞ্চলের নানান তথ্য। আর পরে লিখতেন সেই ভ্রমণবৃত্তান্ত। নানা রঙে, বর্ণে, বিভায় ইতিহাস-রাজনীতি-ধর্ম-পুরাণ আর নিজের আততি নিয়ে সেই হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ। পাঠক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের এই জাতীয় রচনা খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় বিশেষত কবির অনুভবঋদ্ধ বর্ণনা আমাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। জহিরউদ্দীন মুহম্মদ বাবুর, ইবনে বতুতা, হিউয়েন সাং প্রমুখ প্রাচীন পর্যটক ও তাদের লেখাপত্রও আমাদের চিন্তাজগতে আলোড়ন তোলে। প্রাচীন জীবনযাপন, সংস্কৃতি সভ্যতা আচরণ ইত্যাদি বিষয়ে এসব লেখা আমাদের প্রাণিত করে। রাজা বা সম্রাটগণ যেসব বর্ণনা দিয়েছেন তার সামান্য অংশই আমাদের স্পর্শ করে, সেখানে রাজ্যবিস্তার, উত্তরাধিকার, সংঘাত নিয়ে বেশিরভাগ কথাবার্তা লক্ষ করা যায়। তবে মাঝে কারোর লেখায় আমরা গভীর কিছু অনুভব পেয়ে যাই যা নতুন এবং আমাদের চোখে আবিষ্কারের নেশা ধরিয়ে দেয়। যেমন, বাবুরনামায় বাবুর লিখেছেন : ‘শাবান মাসে সূর্য যখন কুম্ভ রাশিতে আমি তখন কাবুল থেকে হিন্দুস্থান পানে যাত্রা করলাম। বাদাম চশমা ও জাগদালিকের পথ ধরে ছদিনের দিন আমরা আদিনাপুর এসে পৌঁছলাম। এর পূর্বে কোনো উষ্ণ দেশ বা হিন্দুস্থান দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। আদিনাপুর এসে যখন পৌঁছলাম তখন সম্পূর্ণ অভিনব জগতের দৃশ্য আমার চোখের সম্মুখে ভেসে উঠল। আমি দেখলাম, এ জগতের ঘাস পৃথক; এখানকার বনজন্তু আলাদা, এর পাখি আলাদা। এমনকি এ নতুন জগতের যাযাবর জাতি ইল এবং উলুসদের আচার-আচারণ আলাদা। আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম।’ নিজের জন্মস্থান ফরগনার বর্ণনা তিনি দিয়েছেন একজন কবির মতো করে। প্রতিটি জেলার স্বতন্ত্র নৈসর্গিক পরিচয় দিয়েছেন, দিয়েছেন প্রাকৃতিক অবস্থানের বৈচিত্র্যপূর্ণ বর্ণনা; তার সাথে মিলিয়ে দেখেছেন পৃথিবীর অন্য জনপদকে। রবীন্দ্রনাথ ও বাবুরনামা পড়েছিলেন এবং বাবুরের অনেক মন্তব্য তিনি উদ্ধৃত করেছেন তাঁর লেখায়।
রবীন্দ্রনাথ যখন পারস্যে ভ্রমণে যান তিনিও বিস্মিত হয়ে দেখেছিলেন পারস্যের জীবন সংস্কৃতি প্রকৃতি ও মানুষের আচার-আচরণ, তাদের ধর্ম দর্শন মতাদর্শ ও জীবনযাপনপদ্ধতি। পারস্য প্রাচীন সভ্যতা সাহিত্য সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান। ফার্সি সাহিত্যের কবিরা পৃথিবীকে নতুন চিন্তার জগতে নিয়ে গেছেন। রুমি, ইবনে সিনা, ওমর খৈয়ম, সানায়ি, হাফিজ, সাদী, আত্তার থেকে অজস্র কবিরা যে কবিতা লিখেছেন তা আমাদের মানসিক জগৎকে প্রসারিত করে, আমাদেরকে চিন্ময় অনুভূতির জগতে নিয়ে যায়। ব্যাবিলনীয়, আকামেনীয়, সাসানীয় সভ্যতার অন্যতম পাদপীঠ পারস্য বহুদিন ধরে কবির মনে স্থান করে নিয়েছিল। পারস্যের রাজা রেজা শাহ পাহলভি কবিকে সে দেশ ভ্রমণের আমন্ত্রণ করলে তিনি আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন যদিও তার বয়স হয়েছিল তখন সত্তর বছর। পারস্য তার মনে কতটা স্থান জুড়ে ছিল তার উদাহরণ পারস্যে লেখার প্রতি ছত্রে ছত্রে রয়েছে। মুসলমান সমাজ সভ্যতা, বাহাই, জরথুস্ত্রু সম্প্রদায় ও তাদের ইতিহাস, যাযাবরদের জীবনযাত্রা এবং পারস্যের অতীত ইতিহাস বিশেষত ফার্সি কবিতার গভীর ভুবন কবিতে মথিত করেছিল। ১১ এপ্রিল, ১৯৩২ তিনি যাত্রা শুরু করেন। তিনি আমন্ত্রণ পবার পর লিখেছেন।‘ দেশ থেকে বেরবার বয়স গেছে এইটেই স্থির করে বসেছিলাম। এমন সময় পারস্যরাজের কাছ থেকে নিমন্ত্রণ এল। মনে হল এ নিমন্ত্রণ অস্বীকার অকর্তব্য হবে। তবু সত্তর বছরের ক্লান্ত শরীরের পক্ষ থেকে দ্বিধা ঘোচে নি। বোম্বাই আমার পারসী বন্ধু দিনশা ইরানী ভরসা দিয়ে লিখে পাঠালেন যে, পারস্যের বুশেয়ারা বন্দর থেকে তিনিও হবেন আমার সঙ্গী। তা ছাড়া খবর দিলেন যে, বোম্বাইয়ের পারসিক কনসাল কেহান সাহেব পারসিক সরকারের পক্ষ থেকে আমার যাত্রার সাহচর্য ও ব্যবস্থার ভার পেয়েছেন।’
কবি অত্যন্ত অনুপুঙ্খভাবে তার যাত্রার প্রতিটি পদক্ষেপের বর্ণনা দিয়েছেন, সাথে দিয়েছেন প্রয়োজনীয় তথ্য-ইতিহাস, জনমানুষের ব্যবহারজনিত পরিচয়, প্রকৃতির নানা উপাচার এবং নিজের মন্তব্য-প্রতিক্রিয়া। কোনো কিছু তাঁর চোখে বাদ পড়েনি। কবির সূক্ষ্ম রসবোধ, ভারতবর্ষের সাথে পারস্যের সংযোগ, পারস্যের ঐতিহ্য-গৌরবগাথার কথা আমরা খুব সবিস্তারে এখানে পাই। কবি রবীন্দ্রনাথের মনন রুচি বৈদগ্ধচেতনা এখানে প্রকাশিত হয়েছে সুন্দরভাবে। পারস্য নিয়ে কবির সার্বিক মনোভাব এখানে রয়েছে, রয়েছে তার মুগ্ধতা যা অফুরান মনে হয় কখনো কখনো। এ ক্ষুদ্র লেখায় আমরা কবির এই লেখায় পারস্য মুগ্ধতার কিছু উদাহরণ দেবার চেষ্টা করব, পাশাপাশি পারস্য সম্পর্কিত তাঁর কিছু বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করব।
ইরানের প্রায় সব শহর ও ইরাকের বাগদাদ (কবি লিখেছের বোগদাদ) কবি এই সফরে ঘুরে দেখেছিলেন। প্রথমে ঢুকেছিলেন বুশেয়ার (১৩ই এপ্রিল) শহরে বায়ুতরিতে করে। এর আগে তিনি যেতেন সমুদ্রপথে। শরীর সায় দেবে না ভেবে বিমানে করে গিয়েছিলেন পারস্যে। তবে ভেতরের ভ্রমণ ছিলো নানা উপায়ে। কবি পুত্রবধু, কবির সচিব অমিয় চক্রবর্তী সাথে ছিলেন। কবি উড়োজাহাজ প্রসঙ্গে বাল্যের স্মৃতি জুড়ে দিয়েছেন। এই জুড়ে দেওয়া কথমালাগুলো এই রচনার মুক্তমালা যা আমাদের গভীরভাবে আকর্ষণ করে। যেমন বুশেয়ার থেকে আবার বায়ুযানে ওঠার আগে কবি লিখেছেন : মনে পড়ে ছাদের ঘর থেকে দুপুর-রৌদ্রে চিলের ওড়া চেয়ে চেয়ে দেখতাম; মনে হত দরকার আছে বলে উড়ছে না। বাতাসে যেন তার অবাধ গতির অধিকার আনন্দবিস্তার করে চলেছে। সেই আনন্দের প্রকাশ কেবল গতিসৌন্দর্যে তা নয়, তার রূপসৌন্দর্যে। নৌকার পালটাকে বাতাসের মেজাজের সঙ্গে মানান করে রেখে চলতে হয়, সেই ছন্দ রাখবার খাতিরে পাল দেখতে সুন্দর হয়েছে। পাখির পাখাও বাতাসের সাথে মিল করে চলে, তাই এমন তার সুষমা। আবার সেই পাখায় রঙের সামঞ্জস্যও কত। এই তো প্রাণীর কথা, তার পরে মেঘের লীলা—সূর্যের আলো থেকে কত রকম রঙ ছেঁকে নিয়ে আকাশে বানায় খেয়ালের খেলাঘর। মাটির পৃথিবীতে চলায় ফেরায় দ্বন্দ্বের চেহারা, সেখানে ভারের রাজত্ব, সকল কাজের বোঝা ঠেলতে হয়। বায়ুলোকে এতকাল যা আমাদের মন ভুলিয়েছে সে হচ্ছে ভারের অভাব, সুন্দরের সহজ সঞ্চরণ।’ কবি আত্মার ছবি ভেসে ওঠে এ কথামালায়। এরপর তিনি আরো গভীর করে তুলনা করেন বায়ুযানের সাথে প্রকৃতির গতিসৌন্দর্যযানের। তিনি অনুভব করেন পাখি বা নৌকার যে গতি বাতাসের সাথে মিতালি করে আধুনিক বিমান তা করতে পারে না। সেখানে প্রকৃতির সরসতা নেই আছে জোর বা অহমিকা। তিনি লিখেছেন : এতদিন পরে মানুষ পৃথিবী থেকে ভারটাকে নিয়ে গেল আকাশে। তাই তার ওড়ার যে চেহারা বেরল সে জোরের চেহারা। তার চলা বাতাসের সঙ্গে মিল করে নয় বাতাসকে পীড়িত করে; এই পীড়া আজ ভূলোক থেকে গেল দ্যুলোকে। এই পীড়ায় পাখির গান নেই, জন্তুর গর্জন আছে। ভূমিতল আকাশকে জয় করে আজ করছে।’ এই অসাধারণ তুলনা দেবার পর কবি যখন বায়ুযানে আবার উঠলেন তখন মনে এল নতুন ভাবনা। বিজ্ঞানের উন্নতিতে আকাশ দখল করে চলার যে অধিকার মানুষ পেল তা তাকে মানবতার বাইরে নিয়ে গেল, সুবিধে খানিকটা হল বটে তবে মানুষের গর্ব ও অহংকার প্রচুর পরিমাণে বেড়ে গেল। এই বেগ তাকে অমানবিকতার দিকে নিয়ে গেল। কবির এই ব্যাখ্যা সত্যি গভীর অনুসন্ধানমূলক এবং আধুনিক পৃথিবীর জন্য খুবই কার্যকরী ভাবনা। কবির মুখে তাঁর অনুভূতি শোনা যাক : বায়ুতরী যতই উপরে উঠল ততই ধরণীর সঙ্গে আমাদের পঞ্চইন্দ্রয়ের যোগ সংকীর্ণ হয়ে একটা মাত্র ইন্দ্রিয়ে এসে ঠেকল, দর্শন ইন্দ্রিয়ে, তাও ঘনিষ্ঠভাবে নয়। নানা সাক্ষ্য মিলিয়ে যে পৃথিবীকে বিচিত্র ও নিশ্চিত করে জেনেছিলুম সে ক্রমে এল ক্ষীণ হয়ে, যা ছিল তিন আয়তনের বাস্তব তা হয়ে এল দুই আয়তনের ছবি ... মনে হল, এমন অবস্থায় আকাশযানের থেকে মানুষ যখন শতঘ্নী বর্ষণ করতে বেরয় তখন সে নির্মমভাবে ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে; যাদের মারে তাদের অপরাধের হিসাববোধ উদ্যত বাহুকে দ্বিধাগ্রস্ত করে না, কেননা হিসেবের অঙ্কটা অদৃশ্য হয়ে যায়। যে বাস্তবের ‘পরে মানুষের স্বাভাবিক মমতা, সে যখন ঝাপসা হয়ে আসে তখন মমতারও আধার যায় লুপ্ত হয়ে।’
পারস্যের রাজা তাকে আমন্ত্রণ করেছিলেন বলেই নয় কবির পারস্যমুগ্ধতা ছিল বাল্যকাল থেকে। পারস্যের রাজা কবিকে অভিবাদন দেবার পর কবি যে জবাব দিয়েছিলেন তা থেকে কবির পারস্যমুগ্ধতা প্রকাশ পায়। কবি লিখেছেন : একদিন দূর থেকে পারস্যেও আমার কাছে পৌঁচেছিল। তখন আমি বালক। সে পারস্য ভাবরসের পারস্য, কবির পারস্য। তার ভাষা যদিও পারসিক, তার বাণী সকল মানুষের। আমার পিতা ছিলেন হাফেজের অনুরাগী ভক্ত। তাঁর মুখ থেকে হাফেজের কবিতার আবৃত্তি ও তার অনুবাদ অনেক শুনেছি। সেই কবিতার মাধুর্য দিয়ে পারস্যের হৃদয় আমাদের হৃদয়ে প্রবেশ করেছিল। আজ পারস্যের রাজা আমাকে আমন্ত্রণ করেছেন, সেই সঙ্গে সেই কবিদের আমন্ত্রণও মিলিত। আমি তাঁদের উদ্দেশে আমার সকৃতজ্ঞ অভিবাদন অর্পণ করতে চাই যাঁদের কাব্যসুধা জীবনকাল পর্যন্ত আমার পিতাকে এত সান্ত্বনা এত আনন্দ দিয়েছে।’ কবির আফসোস ছিল তিনি যে ভাষায় কথা বলছেন তা তারা জানেন না এবং তরজমার মাধ্যমে কবির বক্তব্য তাদেও কাছে সম্পূর্ণভাবে পৌঁছাবে না। কবি মাতৃভাষায় না বলার কারণে তাঁর বক্তব্যে কিছু আড়ষ্ঠতা ছিল সেটাও তিনি উল্লেখ করেছেন। কবি হাফিজের সমাধি দেখার সময় বলেছেন : বেরলুম. পিতার তীর্থস্থানে আমার মানস-অর্ঘ্য নিবেদন করতে। রাজাকে কবি বলেছেন তাদের অর্জন সম্পর্কে। রাজা যে সম্প্রদায়বিরোধিতার অসভ্য হিংস্রতাকে উনমূলিত করতে পেরেছেন তা জেনে কবি প্রীত হয়েছেন। কবির কিছু বই রেশমের কাপড়ে বাধাই করে রাজাকে উপহার দেওয়া হল। তাতে ছিল কবির রচিত একটি চিত্রপটে বাংলা কবিতা ও তার ইংরেজি তরজমা। বাংলায় লেখাটি এরকম : আমার হৃদয়ে অতীত স্মৃতির/ সোনার প্রদীপ এ যে/ মরিচা—ধরানো কালের পরশ/ বাঁচয়ে রেখেছি মেজে।/ তোমরা জ্বেলেছ, নতুন কালের/ উদার প্রাণের আলো—/ এসেছি, হে ভাই, আমার প্রদীপে/ তোমার শিখাটি জ্বালো।’
এশিয়ার এই রাজ্য তার শৌর্য ও উদারনৈতিক চরিত্র ছড়িয়ে দিচ্ছে সবদিকে। কবি রাজার কার্যক্রমের পর্যালোচনা করেছেন অনেক স্থানে, মূল্যায়ন করেছেন : ‘বর্তমান পারস্যরাজের চরিতকথা আমার আপন দেশের প্রান্তে বসেও শুনেছি এবং সেই সঙ্গে দেখতে পেয়েছি দূরে দিকসীমায় নবপ্রভাতের সূচনা। বুঝেছি, এশিয়ার কোনোস্থানে যথার্থ একজন লোকনেতারূপে স্বজাতির ভাগ্যনেতার অভ্যুদয় হয়েছে—তিনি জানেন কী করে বর্তমান যুগের আত্মরক্ষণ-উপযোগী শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে, কী করে প্রতিকূল শক্তিকে নিরস্ত করতে হবে, বিদেশ থেকে যে সর্বগ্রাসী লোভের চক্রবাত্যা নিষ্ঠুর বলে এশিয়াকে চারি দিকে আঘাত করতে উদ্যত কী করে তাকে প্রতিহত করা সম্ভব।’ রবীন্দ্রনাথ পারস্যকে ভালবাসতেন তার অজস্র উদাহরণ এই ভ্রমণবৃত্তান্তে রয়েছে। তিনি যে প্রস্তুতি নিয়ে এ রচনা শুরু করেছিলেন সেটা তো স্পষ্ট তবে তার পারস্যঅনুরাগ পূর্ব থেকেই ছিলো। ইরানে থাকতেই কবির জন্মদিন এসে যায় এবং তা সাড়ম্বরে পালিত হয়, বহু মানুষ কবিকে অভিনন্দন জানাতে আসেন, উপহার দেন। সবাইকে অভিবাদনের জবাবে তিনি একটি কবিতা রচনা করেন। এই কবিতার ইংরেজি তরজমাই তিনি পারস্যবাসীকে শোনান তবে কবিতাটি বাংলায়ও লিখিত হয়েছিল। কবির পারস্যমুগ্ধতার কিছু উদাহরণ এখানে স্পষ্ট হয় : ইরান, তোমার বীর সন্তান/ প্রণয়-অর্ঘ্য করিয়াছে দান/ আজি এ বিদেশী কবির জন্মদিনে,/ আপনারে বলি নিয়েছে তাহারে চিনে।’

ইরান থেকে ফেরার সময় কবি ইরানের জনগণ ও রাজার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান, তাদের অভিবাদনের উত্তর দেন। সেই উত্তরের মধ্যে কবি পারস্যদেশের প্রতি, জনগণের প্রতি কবির অকুণ্ঠ ভালোবাসা কৃতজ্ঞতা ও পক্ষপাতের কথা আবেগের সঙ্গে উচ্চারণ করেন : আজ শেষ পর্যন্ত তোমাদের কাছে বিদায় নেবার সময় এসেছে, কৃতজ্ঞতায় ভরা আমার এই হৃদয়খানি তোমাদের দেশে রেখে গেলাম... অবশেষে দেখা গেল নবজাগরণের আলোকরশ্মি। এই মহাদেশের অন্তরের মধ্যে একটা স্পন্দমান জীবনের কম্পন ক্রমেই যেন নিবিড় আত্মোপলব্ধির মধ্যে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে। এই পূর্ণ মুহূর্তে আজ আমি কবি তোমাদের কাছে এসেছি নবযুগের শুভপ্রভাত ঘোষণা করতে, তোমাদের দিগন্তের অন্ধককার ভেদ করে যে আলোক ফুটে উঠেছে সেই আলোককে অভিনন্দন করতে—আমার জীবনের মহৎ সৌভাগ্য আজ তোমাদের কাছে এলাম। জয় হোক ইরানের।’
পারস্য ভ্রমণবৃত্তান্ত লিখতে গিয়ে তিনি পৃথিবীতে মানবসভ্যতার নানা পর্ব ও উত্থানের কারণ ও উৎস সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। এশিয়াকে কীভাবে ইউরোপ দখল করল, কীভাবে প্রাচ্য জেগে উঠতে চেয়েছিল, তার ওপর কীভাবে অত্যাচার হয়েছে, জাপান ইউরোপের শৌর্যকে গ্রহণ কী ভুল করেছিল, তুর্কী তাতারদের কাণ্ড, পারস্য কীভাবে জেগে ওঠল সভ্যতার সোপান ধরে ইত্যকার নানা বিষয়ে তিনি গভীর তাৎপর্যময় কথা বলেছেন। কবির ইতিহাস পাঠ যে কত গভীর ও সমসাময়িক তা বোঝা যায় এ রচনায়। এর পাশাপাশি তিনি ভারতবর্ষ, আর্যজাতি, পারস্য সভ্যতা সম্পর্কে যে মূল্যায়ন করেছেন তা অভাবনীয়। ভ্রমণবৃত্তান্ত যে কত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে তা পারস্যে বোঝা যাবে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর টালমাটাল পৃথিবী নিয়ে কবি অনেক মন্তব্য করেছেন। ইউরোপ যে শক্তি দেখিয়েছে তার বিরুদ্ধে তিনি কথা বলেছেন যুক্তি দিয়ে। এশিয়ার জাগরণ যেভাবে হওয়ার কথা সেভাবে হয়নি বা হতে পারেনি। তিনি লিখেছেন : আমি এই কথা বলি, এশিয়া যদি সম্পূর্ণ না জাগতে পারে তা হলে য়ুরোপের পরিত্রাণ নেই। এশিয়ার দুর্বলতার মধ্যেই ইউরোপের মৃত্যুবাণ। এই এশিয়ার ভাগবাটোয়ার নিয়ে যত তার চোখ-রাঙারাঙি, তার মিথ্যে কলঙ্কিত কূটকৌশলের গুপ্তচরবৃত্তি। ক্রমে বেড়ে উঠেছে সমরসজ্জার ভার, পণ্যের হাট বহুবিস্তৃত করে অবশেষে আজ অগাধ ধনসমুদ্রের মধ্যে দুঃসহ করে তুলেছে দারিদ্র্যতৃষ্ণা।’ পারস্যের গৌরব নিয়ে তিনি বিস্তারিতভাবে বলেছেন, বলেছেন শেকড়ের কথা, আর্যসংস্রবের কথা, বীরদের কথা, ধর্মপালনের কথা, মুসলিম হওয়ার পরও তাদেও পুরনো সংস্কৃতিকে লালন করার কথা। পারস্যের সাথে ভারত বর্ষের কোথায় যোগ কোথায় অন্বয় সে কথাও কবি বলেছেন স্পষ্ট করে। পারস্য সভ্যতার গোড়ার কথা বলতে গিয়ে কবি লিখেছেন : পারস্যের ইতিহাস যখন শাহনামার পুরাণকথা থেকে বেরিয়ে এসে স্পষ্ট হয়ে উঠল তখন পারস্যে আর্যদের আগমনের হাজার বছর পেরিয়ে গেছে। তখন দেখি আর্যজাতির দুই শাখা পারস্য-ইতিহাসের আরম্ভকালকে অতিক্রম করে আছে, মীদিয় এবং পারসিক। মীদিয়রা প্রথমে এসে উপনিবেশ স্থাপন করে, তারপর পারসিক। এই পারসিকদের দলপতি ছিলেন হখমানিশ। তাঁরই নাম অনুসারে এই জাতি আকামেনিড আখ্যা পায়। খ্রিষ্টজন্মের সাড়ে-পাঁচশ পূর্বে আকামেনীয় পারসিকেরা মীদিয়দের শাসন থেকে সমস্ত পারস্যকে মুক্ত করে নিজেদের অধীনে একচ্ছত্র করে। সমগ্র পারস্যেও সেই প্রথম অদ্বিতীয় সম্রাট ছিলেন বিখ্যাত সাইরাস, তাঁর প্রকৃত নাম খোরাস। তিনি শুধু যে সমস্ত পারস্যকে এক করলেন তা নয়, সেই পারস্যকে এমন এক বৃহৎ সাম্রাজ্যের চূড়ায় অধিষ্ঠিত করলেন সে যুগে তার তুলনা ছিল না।’
বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথে পারস্যমুগ্ধতার কারণের পেছনে যুক্তিও তিনি তুলে ধরেছেন নানা উদাহরণ দিয়ে। হত্যা লুণ্ঠনের ইতিহাস তো অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই তবে পারস্য মানবতা ও সভ্যতাকে গ্রহণ করেছিল সেটাও মনে রাখা প্রয়োজন। ভারতবর্ষের মুসলমানদের নিয়ে কবি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, গল্প লিখেছিলেন সেখানে কবি মুসলিমসম্প্রদায় নিয়ে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। পারস্যে এসে তিনি পারসিক মুসলমানদের আচার-আচরণ, বা রাজাদের অসাম্প্রদায়িক আচরণ, যাযাবরদের চেতনা নিয়ে প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেছেন। এমনকি ভারতবর্ষে যে হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব তার উদাহরণ পারস্যের প্রসঙ্গে তাদের মুখের কথায় ব্যাখ্যা করেছেন। যে বোধ যাযাবরদের মধ্যে আছে তা ভারতীয়দের নেই সেটা কবি উপলব্ধি করেছেন। পারস্যের অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় কবির নজরে এসেছে। পারস্যবাসীর প্রকৃতি প্রেমের কথা কবি অনেকবার বলেছেন। একটা ছোট বর্ণনা পড়া যাক : আজ সকালে নির্মল আকাশ, স্নিগ্ধ রৌদ্র। দোতলায় একটি কোণের বারান্দায় বসেছি। নীচের বাগানে এল্ম পপলার উইলো গাছে বেষ্ঠিত ছোট জলাশয় ও ফোয়ারা। দূরে গাছপালার মধ্যে একটি মসজিদের চূড়া দেখা যাচ্ছে, যেন নীল পদ্মের কুঁড়ি, সুচিক্কণ নীল পারসিক টালি দিয়ে তৈরি, এই সকাল বেলাকার পাতলা মেঘে-ছোঁওয়া আকাশের চেয়ে ঘনতর নীল।’ এই বর্ণনার পাশে আর একটি বর্ণনা রাখা যায় যেখানে কবি স্বীকার করেছেন ধর্মীয় আচারের দিক দিয়ে মুসলমানরা বেশ উদার। তিনি মসজিদে ঢুকেছেন অনেকস্থানে। একটি স্থানের কথা বলেছেন এভাবে : এই মসজিদের প্রাঙ্গনে যাদের দেখলেম তাদের মোল্লার বেশ। নিরুৎসুক দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখলেম হয়তো মনে প্রসন্ন হয়নি। শুনলুম আর দশ বছর আগে এখানে আমাদের প্রবেশ সম্ভবপর হত না। শুনে আমি যে বিস্মিত হব সে রাস্তা আমার নেই। কারণ, আর বিশ বছর পরেও পুরীতে জগন্নাথের মন্দিরে আমার মত কোনো ব্রাত্য যে প্রবেশ করতে পারবে সে আশা করা বিড়ম্বনা।’
এই সব মোল্লারা কবির কাছে অন্য সময় নানাবিধ দার্শনিকসুলভ প্রশ্ন করেছেন। একজন মোল্লা কবিকে বললেন, নানা জাতির নানা ধর্মগ্রন্থে নানা পথ নির্দেশ করে, তার মধ্যে সত্যপথ নির্ণয় করা যায় কী উপায়ে? কবি বলেছেন : ঘরের দরজা জানালা সব বন্ধ করে যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে। আলো পাবো কী উপায়ে’ তাকে কেউ উত্তর দেয় চকমকি ঠুকে—কেউ বলে তেলের প্রদীপ, কেউ বলে মোমের বাতি, কেউ বলে ইলেকট্রিক আলো জ্বেলে। সেই-সব উপকরণ ও প্রণালী নানাবিধ, তার ব্যয় যথেষ্ট, তার ফল সমান নয়। যারা পুঁথি সামনে রেখে কথা কয় না, যাদেও সহজ বুদ্ধি, তারা বলে, দরজা খুলে দাও। ভালো হও, ভালোবাসো, ভালো করো, এইটেই পথ। যেখানে শাস্ত্র এবং তত্ত্ব এবং আচারবিচারের কড়াকড়ি সেখানে ধার্মিকদের অধ্যবসায় কথা-কাটাকাটি থেকে শুরু করে গলা-কাটাকাটিতে গিয়ে পৌঁছয়।’ পারস্য যেভাবে তাদের ধর্ম সংস্কৃতির বোধকে পাকাপোক্ত করেছে মানবিক বিবেচনায় তা কবিকে প্রাণিত করেছিল। কবি নিজেই যে মানবিক অসাম্প্রদায়িক সমাজের স্বপ্ন দেখতেন অথচ ধর্মকে অস্বীকার করতেন না সেরকম পরিবেশ তিনি পারস্যে দেখেছেন। তাদের সুফি মতাদর্শের বিকাশই প্রমাণ করে যে তারা ধর্ম দিয়ে চিন্তা বিকাশে বাধা দিতে চাননি। সুফি কবিদের এই চিন্তার স্বাধীনতা সুযোগ ছিল বলে তারা বড় কবি হতে পেরেছেন। আমরা সেটা পারিনি।
কবি এক অভিবাদনের জবাবে আরব সংস্কৃতির গৌরব ও ঐশ্বর্য নিয়ে তাঁর পক্ষপাতের কথা বলেছেন। পারস্যে গিয়েই তিনি বললেন সবার সামনে তবে একথা তাঁর মনে ছিল আগে থেকেই : একদা আরবের পরম গৌরবের দিনে পূর্বে পশ্চিমে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক ভূভাগ আরব্যের প্রভাব-অধীনে এসেছিল। ভারতবর্ষে সেই প্রভাব যদিও আজ রাষ্ট্রশাসনের আকারে নেই, তবু সেখানকার বৃহৎ মুসলমানসম্প্রদায়কে অধিকার করে বিদ্যার আকারে, ধর্মের আকারে আছে। সেই দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে আমি আপনাদের বলছি, আরবসাগর পার করে আরবের নববাণী আর একবার ভারতবর্ষে পাঠান—যাঁরা আপনাদের স্বধর্মী তাঁদের কাছে—আপনাদের মহৎ ধর্মগুরুর কাছে পূজানামে, আপনাদের পবিত্রধর্মের সুনামী রক্ষার জন্য। দুঃসহ আমাদের দুঃখ, আমাদের মুক্তির অধ্যবসায় পদে পদে ব্যর্থ; আপনাদের নবজাগ্রত প্রাণের উদার আহ্বান সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা থেকে অমানুষিক অসহিষ্ণুতা থেকে, উদার ধর্মের অবমাননা থেকে, মানুষে মানুষে মিলনের পথে, মুক্তির পথে নিয়ে যাক হতভাগ্য ভারতবর্ষকে। এক দেশের কোলে যাদের জন্ম অন্তরে বাহিরে তারা এক হোক।’
পারস্যের পথে পথে ঘুরে, শহরে গ্রামে প্রাসাদে যাপন করে, মানুষের সাথে মিশে, তাদের আচার আচরণ পর্যবেক্ষণ করে, তাদের কথা শুনে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে থেকে তিনি পারস্যকে চিনেছিলেন; রাজা থেকে সাধারণ মানুষ, মোল্লা, নারী, শিল্পী-কবি, বেদুইন সবার সাথে মিলে, কথা বলে তিনি পারস্যের প্রকৃত রূপ চিনতে চেয়েছেন। ইতিহাসের পাঠ কবিকে সাহায্য করেছে সন্দেহ নেই তবে তাঁর উপলব্ধির আলোকে পারস্যের রূপ মুখরিত হয়ে উঠেছে। এই মুগ্ধতার ছবি তাঁর মনে আমৃত্যু ছিল। এই মুগ্ধতা অকৃত্রিম, তুলনাহীন।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

‘হাতিটা উধাও’ গ্রন্থের অনুবাদকের কথা

‘হাতিটা উধাও’ গ্রন্থের অনুবাদকের কথা

ফজল হাসানের অনুবাদে বিদেশি গল্পের সংকলন

ফজল হাসানের অনুবাদে বিদেশি গল্পের সংকলন

‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’র ভূমিকা

‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’র ভূমিকা

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

নতুন বইয়ের খবর

‘হাতিটা উধাও’ গ্রন্থের অনুবাদকের কথা

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২১, ১০:১৫

গত ২ আগস্ট প্রকাশিত হয়েছে হারুকি মুরাকামির গল্পের বই ‘জো-নো-শোমেৎসু’-এর বাংলা অনুবাদ ‘হাতিটা উধাও’। অনুবাদ করেছেন অভিজিৎ মুখার্জি, অনুরাধা চট্টোপাধ্যায়, রীমা রায় এবং শুভা বসু। প্রকাশ করেছে যাদবপুর ইউনিভার্সিটি প্রেস, প্রচ্ছদ করেছেন কৌস্তভ চক্রবর্তী, ২৭৯ পৃষ্ঠার বইটির মুদ্রিত মূল্য ৪৫০ ভারতীয় রুপি।  

পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন;
মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে

সভ্যতার যে কোনো পর্যায়েই মানুষকে তার নিজের অস্তিত্বের নানা বিপন্নতার সার্বিক চিত্রটার মুখোমুখি হতেই হয়। খুঁজে বের করতে হয় আবহমান কালের মানুষী সত্যের পরিপ্রেক্ষিতে তার সেই সময়কার চাহিদা ও চেতনার পরিস্থিতিটা কী। প্রাণীজগতে বিবর্তনের পথে মানুষের উদ্ভব হওয়া ইস্তক সভ্যতার নানা পর্যায় পার হয়ে আসতে আসতে মানুষ অর্জন করেছে তার স্বভাবের কিছু প্রাথমিক দিক, যা দু’চার সহস্রাব্দ সময়ের বা ভৌগলিক দূরত্বের প্রভাবের ঊর্ধ্বে। স্বভাবের এই প্রাথমিক দিকগুলোর হদিস যেমন নৃতাত্ত্বিকরা দেন, মনস্তত্ত্ববিদরা দেন, দার্শনিকরা দেন, ইতিহাসের কিছু কালজয়ী প্রজ্ঞার রেখে যাওয়া বাণীও সেগুলোর সঙ্গে মানুষের পরিচয় করিয়ে দেয়। নানা সভ্যতার ধারার সম্মিলিত এক অখণ্ড প্রবাহের গর্ভ থেকে উঠে এসে, দৈনন্দিন জীবনধারণে ব্যস্ত সাধারণ মানুষের কাছে সেইসব মানুষী সত্য পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করে সাহিত্যের হাত ধরে। কি উপন্যাস, কি ছোটগল্প, একেকটা ছোটো ছোটো জানালা খুলে দেয়, কিছুটা কিছুটা করে সেই সত্য যাতে মানুষের গোচরে আসে, নিজের সভ্যতার, সমাজের বর্তমান রূপটিকে বিচার করতে শেখে মানুষ আবহমানের পরিপ্রেক্ষিতে। বর্তমান সময়ের বিশ্বসাহিত্যের পাঠকের বৃহত্তম অংশের কাছে ঘনিষ্ঠতম হয়ে ওঠার গৌরব, তর্কসাপেক্ষে হলেও, যে জাপানি সাহিত্যিকের ওপর ন্যস্ত হতে পারে, তাঁর নাম মুরাকামি হারুকি। ২০২১ সালে, এই অনুবাদ প্রকাশের সময় আর নতুন করে মুরাকামি সম্বন্ধে নানা তথ্য পাঠকদের জানানোর তেমন প্রয়োজন নেই। নিজস্ব আখ্যানশৈলিতে আবহমান কালের মানুষী সত্যের সঙ্গে এই শতাব্দীর মানুষী বিপন্নতার মুখোমুখি দেখা করিয়ে দেওয়াই তাঁর জনপ্রিয়তার ভিত্তি বলে অনেকেই মনে করেন। উপন্যাস ও ছোটগল্প উভয়ক্ষেত্রেই অনায়াস বিচরণকারী এই লেখকের প্রথম ছোটগল্প সংকলন ‘জো-নো-শোমেৎসু’, এ-যাবৎ প্রকাশিত হওয়া তাঁর সমস্ত গল্পসংকলনের মধ্যে সবচেয়ে সমাদৃতও বটে। সাহিত্যের ভূমিকার যে সংজ্ঞা দিয়ে এই লেখাটা শুরু করেছি, সেটিকে সর্বাংশে সার্থক হয়ে উঠতে দেখা যায় এই সংকলনের গল্পগুলোতে। ২০০৫ সাল থেকে শুরু করে, মাঝখানে বেশ দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান রেখে রেখে এই সংকলনের কিছু গল্প অনুবাদ করেছিলাম বিভিন্ন পত্রপত্রিকার জন্য। প্রত্যাশাতীত সাড়া পেয়ে, মনে একটা ইচ্ছে তৈরি হয়েই ছিল পুরো সংকলনটাই অনুবাদ করে ফেলার।

ঐতিহাসিক কারণেই বাঙালি সাহিত্যমোদীর সঙ্গে পশ্চিমী সাহিত্যের যতটা ঘনিষ্ঠ পরিচয়, জাপানি সাহিত্যের সঙ্গে ঠিক অতটা নয়। কিন্তু অতি-সাম্প্রতিক কালে তরুণ প্রজন্মের বাঙালি পাঠকদের একাংশের মধ্যে একেবারে এইসময়কার জাপানি লেখকদের গল্প উপন্যাস ইংরিজি অনুবাদে পড়ার ঝোঁক চোখে পড়ার মতো বেড়ে গিয়েছে। সেটা লক্ষ করেই মনে হলো যে ‘জো-নো-শোমেৎসু’ সংকলনটা অনুবাদে প্রকাশ করার একটা দায়িত্ব স্পষ্টতই তৈরি হয়েছে। সংকলনের গল্পগুলোর প্রাসঙ্গিকতা ও আবেদন এই দেড় দশকে এতটুকুও হ্রাস পায়নি, বরং কিছু ক্ষেত্রে সম্ভবত বেড়ে গিয়েছে।

কলকাতায় যেসব তরুণ তরুণীরা জাপানি ভাষা শেখেন, ভাষাগত দক্ষতার একটা পর্যায়ে পৌঁছে তাঁরা যদি জাপানি সাহিত্য অনুবাদে আগ্রহী হন, পাঠকেরা প্রভূতভাবে এই সমৃদ্ধ সাহিত্যের স্বাদ গ্রহণ করে আনন্দিত ও উপকৃত হবেন। সেই কারণে আমার মনে হয়েছিলো, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে জাপানি ভাষার শিক্ষক হিসেবে যাঁদের ছাত্রছাত্রী হিসেবে পেয়েছি, তাঁদের মধ্য থেকে কেউ কেউ দু’একটা করে গল্প অনুবাদ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করলে, অনতিদূর ভবিষ্যতে নিজেরাই অনুবাদের কাজে হাত দেওয়ার ব্যাপারে ক্রমেই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারবেন। আমার তিন ছাত্রী, শ্রীমতি শুভা বসু, শ্রীমতি রীমা রায় ও শ্রীমতি অনুরাধা চ্যাটার্জি এই সংকলনের মোট সতেরোটা গল্পের মধ্যে, একেকজন দু’টি করে, মোট ছ’টা গল্প অনুবাদ করেছেন। প্রস্তাব দেওয়ামাত্র, কর্মব্যস্ততার মধ্যেও নির্দ্বিধায় অনুবাদের দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছেন বলে তাঁরা আমার ধন্যবাদার্হ।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে যে হাই-ভোল্টেজ ল্যাবরেটরি আমার কর্মক্ষেত্র, তার থেকে দশ কি পনেরো গজ দূরত্বে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনার যে দপ্তর, সেখানকার পরিবেশ, যাঁরা নিবিষ্ট হয়ে কাজ করে যাচ্ছেন বলে সর্বদা দেখা যায়, তাঁদের নিষ্ঠা, যোগ্যতা, এতটাই আমার ভরসার জায়গা যে আলস্যের শিকার না হয়ে বেশ কিছুদিন টানা পরিশ্রমে আমারও উৎসাহ আদ্যন্ত বজায় ছিলো। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনার ডিরেক্টার অধ্যাপক অভিজিৎ গুপ্ত, আর যাঁরা পাণ্ডুলিপিকে মুদ্রণযোগ্য পর্যায়ে উপনীত করাতে আন্তরিক নিষ্ঠা নিয়ে কাজ করেছেন, সেই শুচিস্মিতা ঘোষ, কৌশিক আনন্দ কীর্তনীয়া, এঁদের কারুকেই ঠিক ধন্যবাদ দেব না, কারণ আমরা একসঙ্গে কাজ করে এই বইটাকে একটা রূপ দিয়েছি, পাঠকের ভালো লাগলে, আমরা এই ক’জন তৃপ্ত।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

রবীন্দ্রনাথের পারস্য মুগ্ধতা

রবীন্দ্রনাথের পারস্য মুগ্ধতা

ফজল হাসানের অনুবাদে বিদেশি গল্পের সংকলন

ফজল হাসানের অনুবাদে বিদেশি গল্পের সংকলন

‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’র ভূমিকা

‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’র ভূমিকা

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

নতুন বইয়ের খবর

ফজল হাসানের অনুবাদে বিদেশি গল্পের সংকলন

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২১, ২০:৩৮

ভিনদেশের স্মরণীয়-বরণীয় এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বিভিন্ন লেখক থেকে শুরু করে স্বল্প পরিচিত, কিন্তু প্রতিভাবান তরুণ লেখকদের নানান স্বাদের এবং আলাদা মেজাজের চব্বিশটি ছোটগল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে ‘ভিনদেশের সেরা দুই ডজন গল্প’ সংকলনটি।

এই সংকলনের গল্পগুলোকে তিনটি পৃথক পর্বে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম পর্বে আছে চার দেশের পাঁচজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী লেখকের আটটি গল্প—রাশিয়ার ইভান বুনিন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্নেষ্ট হেমিংওয়ে ও টনি মরিসন, মিশরের নাগিব মাহফুজ এবং পোল্যান্ডের ওলগা তোকারজুক রয়েছেন এই তালিকায়। দ্বিতীয় পর্বে রয়েছেন তিন দেশের তিনজন ম্যান বুকার পুরস্কার বিজয়ীর চারটি গল্প—নাইজেরিয়ার বেন ওকরি, কানাডার মার্গারেট অ্যাটউড এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ স্যন্ডার্স রয়েছেন এই তালিকায়। তৃতীয় পর্বে রয়েছে ছয় দেশের নয়জন লেখকের বারোটি গল্প। এরা হলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেট চপিন, জয়েস ক্যারল ওটস্, শারম্যান আলেক্সি, লুসিয়া বার্লিন, ইজরায়েলের এটগার কেরেট, নেপালের বিশ্বেশ্বর প্রসাদ কৈরালা, নয়নরাজ পান্ডে ও দিলীপ আচার্য্য, ভারত বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান অনুকৃতি মিশ্র, ভূটানের পেমা চইডার এবং মালদ্বীপের মাদুলু ওয়াহিদ ।

পাঠকের সুবিধার্থে প্রতিটি গল্পের শুরুতে গল্পকারের পরিচিতি ও সাহিত্যকর্মের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হয়েছে, যা গল্পকার সম্পর্কে উৎসুক পাঠকের মনে সামান্য ধারণা দিতে সক্ষম হবে। এছাড়া প্রতিটি গল্পের শেষে রয়েছে গল্পসূত্র।

‘ভিনদেশের সেরা দুই ডজন গল্প’ গ্রন্থের প্রতিটি গল্পেই গল্পকারের দেশ এবং সময় ছাড়াও সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মূল্যবোধ ও ঘাত-প্রতিঘাতের বিষয় ফুটে উঠেছে। প্রতিটি গল্পের দীর্ঘ আলোচনা বা সমালোচনা, এমনকি চুলচেরা বিশ্লেষণ না করে বাছাইকৃত কয়েকটি গল্পের সারকথা বা মূল বিষয় এবং অসাধারণ বৈশিষ্ট্য অতি সংক্ষেপে আলোকপাত করা হয়েছে ভূমিকায়।

বইটি প্রকাশ করছে ‘দিব্য প্রকাশ’, প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

রবীন্দ্রনাথের পারস্য মুগ্ধতা

রবীন্দ্রনাথের পারস্য মুগ্ধতা

‘হাতিটা উধাও’ গ্রন্থের অনুবাদকের কথা

‘হাতিটা উধাও’ গ্রন্থের অনুবাদকের কথা

‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’র ভূমিকা

‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’র ভূমিকা

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’র ভূমিকা

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০২১, ১২:২৬

[আবুল হাসান ষাটের দশকের অন্যতম কবি। জন্মেছিলেন ১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট, মাত্র ২৯ বছর বয়সের জীবনে তিনি সৃষ্টি করেছেন অমূল্য সোনালি শস্য। তার মৃত্যুর প্রায় উনিশ বছর পর প্রকাশিত হয় ‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’। যার ভূমিকা লেখেন দেশবরেণ্য কবি শামসুর রাহমান। সেই ভূমিকাটি পুনঃপ্রকাশ করা হলো কবি আবুল হাসানের জন্মদিন উপলক্ষ্যে।]

পঞ্চাশের দশকের কয়েকজন কবি বাংলাদেশের কবিতার নতুন জমি তৈরি করলেন, আবাদ করলেন সেই জমি মেধা ও শ্রমে। এই জমিতে পা রেখেই ষাটের দশকের সিকদার আমিনুল হক, রফিক আজাদ এবং আবদুল মান্নান সৈয়দ বিশিষ্টতা অর্জন করেন। তাঁদের আবির্ভাবের পরই সানাউল হক খান, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা এবং অকালপ্রয়াত আবুল হাসানের কাব্যশস্য হিলহিলিয়ে ওঠে। সর্বপ্রথম আবুল হাসানের কবিতা পড়ি ‘সংবাদ’-এর সাহিত্য সাময়িকীতে। সেই বৈশিষ্ট্যহীন কবিতার লেখকের নাম ছিল আবুল হোসেন। তখন আবুল হাসান আবুল হোসেন নাম লিখতেন। বোধহয় সেটাই ছিল তাঁর পিতৃদত্ত নাম। অল্প দিনের মধ্যেই হাসানের মনে পড়ে যায় যে, চল্লিশের দশকের একজন বিখ্যাত কবির নামও আবুল হোসেন। তাই তিনি হোসেন থেকে হাসান-এ রূপান্তরিত হলেন। এই নাম পরিবর্তনের পর তাঁর কবিতাও বদলে যেতে লাগলো। একজন খাটি কবির জন্ম হলো। এই কবির জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত কবিতায় ভরপুর ছিল। যেন হাওয়ায়, ধূলোয়, গাছের পাতায়, পাখির ডানায়, নদীর জলে, দিনের কোলাহলে, রাত্রির নিস্তব্ধতায় তিনি কবিতা পেয়ে যেতেন অবলীলায়। যিনি সর্বক্ষণ কবিতার ধ্যানে মগ্ন নন তার পক্ষে অসম্ভব এই কবিতা-আহরণ।

আবুল হাসান মাত্র ২৯ বছর বয়সে মারা যান। তাঁর মৃত্যু আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ক্ষীণায়ু জন কীটস্ এবং সুকান্ত ভট্টাচার্যের কথা। জানি না, কত বছর বয়সে তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন। তাঁর কবিজীবন দীর্ঘ নয়। তাঁর সংক্ষিপ্ত কাব্যচর্চা আমাদের উপহার দিয়েছে ‘রাজা যায় রাজা আসে’, ‘যে তুমি হরণ করো’ এবং ‘পৃথক পালঙ্ক’-এরমতো তিনটি উজ্জ্বল কাব্যগ্রন্থ। তাছাড়া তাঁর অগ্রন্থিত কবিতার সংখ্যাও কম নয়। আবুল হাসান যেসব কবিতা গ্রন্থভুক্ত করেন নি সেগুলোতেও হাসানীয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।

আবুল হাসান রচনা সমগ্র আবুল হাসান বরিশালে জন্মগ্রহণ করে। তাঁর শৈশব কেটেছে বরিশালের মনোমুগ্ধকর নৈসর্গিক পরিবেশে। সেখানকার গাছগাছালি, নদীনালাকে তিনি উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন তাঁর কবিতায়, যেমন করেছেন ঢাকা বাসের অভিজ্ঞতাকে। গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের মিলিত অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতাকে বর্ণাঢ্য, সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর কবিতা সহজেই পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করে। গোড়ার দিকে তাঁর কবিতায় জীবনানন্দ দাশ এবং আরো কোনো কোনো কবির ছায়া লক্ষ করা গেছে। অনুজ কবির উপর অগ্রজ কবির প্রভাব পড়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ কোনো কবিই ভুইফোড় কিছু নন। একটি ধারাবাহিকতার অন্তর্গত তিনি; অতীতের কাব্যকৃতি একজন নতুন কবিকে তার শিল্পসৃষ্টির পক্ষে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। নতুন কবি তার নিজস্ব এলাকা সৃষ্টি করেন পূর্বসূরীদের অর্জনকে কাজে লাগিয়ে, তাঁদের কাব্যকলার কাঠামোয় বন্দী হয়ে নয়। নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পেতে হয় তাকে। আবুল হাসান তার নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পান প্রাথমিক অনুশীলনের প্রক্রিয়ার মধ্য থেকেই।

আবুল হাসান মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত কবি, কবি ছাড়া আর কিছুই নন। তাঁর প্রতিটি নিঃশ্বাসে বয়ে গেছে কবিতা। তাঁর এলোমেলো জীবনের ছাপ পড়েছে তার কবিতাতেও। এই এলোমেলোমি তাঁর কবিতার দুর্বলতা এবং শক্তি। আবুল হাসানের কবিতার আপাত-অসংলগ্নতা এমনই হৃদয়গ্রাহী যে পাঠক অভিভূত হয়ে পড়েন। তাই, তরুণ কবিদের কাছে তিনি এত প্রিয়। যখন কোনো কোনো তরুণ কবির রচনায় আবুল হাসানের পংক্তিমালার ছায়া দেখতে পাই, তখন বিস্মিত হই না। তিনি যৌবনের বিষণ্নতা, নৈঃসঙ্গ্য এবং দীর্ঘশ্বাসের কবি। তাঁর শিল্প-সৌন্দর্য বোধ যেমন তীক্ষ্ণ তেমনি তীব্র মানুষের প্রতি তাঁর মমতা, জীবনের প্রতি ভালোবাসা। কবি-সমালোচক আবু হেনা মোস্তফা কামাল যথার্থই বলেছেন, “চূড়ান্ত ব্যবচ্ছেদ করলে তাঁর (আবুল হাসানের) ভেতরে মায়া ও মমতা, মানুষের জন্যে দুঃখবোধ ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাবে না।” একজন সত্যিকারের কবিই তো যীশু খৃষ্টের মতো সকল মানুষের হয়ে দুঃখ পান।

আবুল হাসান তাঁর একটি কবিতায় বলেছেন, “শিল্প তো নিরাশ্রয় করে না। কাউকে দুঃখ দেয় না।” সেই একই কবিতায় তিনি লেখেন,

“শিল্প তো স্বাতীর বুকে মানবিক হৃৎপিণ্ড,
তাই আমি তার হৃৎপিণ্ডে যাই চিরকাল রক্তে আমি
শান্তি আর শিল্পের মানুষ।”

হ্যাঁ, তিনি শান্তি আর শিল্পের মানুষ, সর্বোপরি মানবপ্রেমী প্রকৃত কবি। এজন্যেই তাঁর রচনা সমগ্র আমাদের অবশ্যপাঠ্য। একজন কবির মূল্যায়নের জন্যে তাঁর প্রধান এবং গৌণ সকল রচনাই পড়া প্রয়োজন। কখনো কখনো গৌণ রচনাতেও কবির কোনো বিশেষ দিক প্রতিফলিত, যা তাঁর পাঠকদের জানা খুবই জরুরি। বাংলাদেশের কাব্যমানচিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার অধিকারী আবুল হাসান তার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও। আমরা যারা তাঁর কবিতার গুণমুগ্ধ পাঠক তারা জানি, তিনি ক্রমশ পরিণতির দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। এই পরিণতির স্বাক্ষর বহন করছে আবুল হাসানের তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘পৃথক পালঙ্ক’। এই ‘পৃথক পালঙ্ক’ তাঁর কবিতার স্বাতন্ত্র্যের পরিচায়ক। তিনি চিরদিন ‘পৃথক পালঙ্ক’-এ-সমাসীন থাকবেন।

বিদ্যাপ্রকাশ এই অকালমৃত কবির রচনা সমগ্র প্রকাশ করে পাঠক সমাজের কৃতজ্ঞতা ভাজন হয়েছেন। আমরা বিদ্যাপ্রকাশের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। আমার এই ক্ষুদ্র রচনা আবুল হাসানের কবিকৃতির প্রতি সুবিচার করতে পারে নি। এখানে আমি একজন সতীর্থ হিসেবে তাঁর কবিতার প্রতি আমার অনুরাগ প্রকাশ করেছি মাত্র, এর বেশি কিছু নয়। কবি বিষয়ে আলোচনা পাঠের চেয়ে তাঁর কবিতাবলী নিবিষ্ট চিত্তে পাঠ করাই বেশি জরুরি। বাংলাদেশের কবিগোষ্ঠীর যাঁদের কবিতা আমৃত্যু বার বার পড়বো, আবুল হাসান নিঃসন্দেহে তাঁদের অন্যতম।
২৬.০১.৯৪

/জেডএস/

সম্পর্কিত

রবীন্দ্রনাথের পারস্য মুগ্ধতা

রবীন্দ্রনাথের পারস্য মুগ্ধতা

‘হাতিটা উধাও’ গ্রন্থের অনুবাদকের কথা

‘হাতিটা উধাও’ গ্রন্থের অনুবাদকের কথা

ফজল হাসানের অনুবাদে বিদেশি গল্পের সংকলন

ফজল হাসানের অনুবাদে বিদেশি গল্পের সংকলন

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

ধারাবাহিক—এক

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২১, ১৩:৩৭

[১৯৩০-৩৯ সময়পর্বে প্যারিসে বসবাসকালের অভিজ্ঞতা নিয়ে মিলার এই উপন্যাসিকাটি লেখেন। ওঁর ‘ট্রপিক অফ ক্যান্সার’, ‘ব্ল্যাক স্প্রিং’, ‘ট্রপিক অফ ক্যাপ্রিকর্ন’, ‘দ্য রোজি ক্রুসিফিকশন’—ট্রিলজি, এগুলোর মতোই ‘কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি’ও একটি আত্মজৈবনিক আখ্যান। ’৩০-এর দশকের শুরুর দিকের অভিজ্ঞতাই এতে রয়েছে, যে সময়টায় মিলার ‘ব্ল্যাক স্প্রিং’ উপন্যাসটি লিখছিলেন। থাকতেন শহরতলি ক্লিশির একটা ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে বন্ধু আলফ্রেড পার্লেসের সাথে ভাগ করে। লেখক জীবনের এক প্রতিকূল অবস্থার সাথে তখন লড়ছেন মিলার। প্যারিস থেকে নিউ ইয়র্কে ফেরার অল্প কিছুদিন বাদে ১৯৪০-এ লেখেন এই উপন্যাসিকাটি। পরে, ১৯৫৬ সালে বিগ সারে থাকার সময়, যখন তিনি ‘নেক্সাস’-এর ওপর কাজ করছেন, এতে কিছু সংযোজন, পরিমার্জন করেন।
‘কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি’ গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় ফ্রান্সে, অলিম্পিয়া প্রেস থেকে, ১৯৫৬ সালেই। আমেরিকায় মিলারের ‘ট্রপিক অফ ক্যান্সার’-এর ওপর দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে চলা অশ্লীলতার অভিযোগ তথা আইনি নিষেধাজ্ঞা ১৯৬৪-৬৫ নাগাদ উঠে যাবার পর ওঁর অন্যান্য বইয়ের সাথে এই উপন্যাসিকাটিও আমেরিকায় প্রকাশিত হয় ১৯৬৫ সালে। প্রকাশক, গ্রোভ প্রেস।
মিলারের ফোটোগ্রাফার-বন্ধু জর্জ ব্রাসেই ওঁর ‘হেনরি মিলার: দ্য প্যারিস ইয়ার্স’ বইতে জানিয়েছেন যে, মিলারের মতে (‘কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি’র) ‘টাইটল ইজ কমপ্লিটলি মিসলিডিং’।       
উল্লেখ থাকে যে, উপন্যাসিকাটির দুটি অংশ। প্রথমাংশ, ‘কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি’, দ্বিতীয়াংশ ‘মারা ম্যারিগনান’। যদিও, দুটি অংশই মূল গ্রন্থে দু মলাটের ভেতর রয়েছে এবং তাদের মধ্যে স্থান, কাল ও পাত্রের বহুলাংশে সাদৃশ্য থাকলেও, আখ্যানের ক্রমিক পরিণতির দিক থেকে বা কাহিনির ধারাবাহিক বিন্যাসে অংশ দুটিতে প্রত্যক্ষ বা অনিবার্য কোনও যোগ নেই। আমি এখানে শুধু প্রথমাংশটিরই অনুবাদ করেছি।
অনুসন্ধিৎসু পাঠকের জন্য বলা, মিলারের ‘কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি’ অবলম্বনে সিনেমা তৈরি হয়েছে দু’বার। প্রথমটি একটি ড্যানিশ প্রোডাকশন, ১৯৭০ সালে। দ্বিতীয়টি ছিল ফরাসি নির্মাণ, ১৯৯০ সালে পরিচালক ক্লদ শাব্রল এটা নিয়ে সিনেমা করেন। ১৯৯১ সালে, আমেরিকার সাহিত্যের ওপর ভিত্তি করে এইচবিও চ্যানেল একটি অ্যান্থলজি সিরিজ করেছিল, তাতে এই উপন্যাসের দ্বিতীয় ভাগ অর্থাৎ ‘মারা ম্যারিগনান’ অবলম্বনে একটি ৩০ মিনিটের শর্ট ফিল্ম তৈরি হয়, যার নাম ছিল ‘মারা’।  
উপন্যাসিকাটিতে ফ্রান্সের একাধিক রাস্তাঘাট, জায়গা, স্থাপত্য নিদর্শন এবং শিল্প ও সাহিত্য-ব্যক্তিত্বের নাম রয়েছে। বাঙালির জিভে তাদের যথাযথ উচ্চারণ কী হবে বা কী হওয়া উচিত তা নিয়ে পণ্ডিতমহলে বিতর্ক চিরকাল থাকবে। আমি একটা স্বাভাবিক ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছি। যা হয়তো বিশুদ্ধ ফরাসি উচ্চারণ নয় তবে তার কাছাকাছি, আবার বাঙালির জিভেও বেমানান নয়।
আরেকটি কথা, যে সমস্ত ফরাসি নাম বা শব্দ এই উপন্যাসে তথা এই অনুবাদে রয়েছে, তাদের সম্পর্কে পরিশিষ্টে সামান্য কিছু পরিচিতি উল্লেখের চেষ্টা করেছি। যাতে আগ্রহী পাঠকের কাছে উপন্যাসে জড়িয়ে থাকা পরিমণ্ডলটির আবহ সাবলীল হয়। সেপ্টেম্বর—অক্টোবর, ২০১৬। —অনুবাদক।] 

এ লেখা যখন লিখছি, রাত নেমে এসেছে। লোকজন সব ডিনারে চলল। সারাটাদিন ছিল ধূসর। প্যারিসে যেমন হামেশাই দেখা যায়। চিন্তায় হাওয়া লাগাতে ব্লকগুলোর আশপাশ দিয়ে হাঁটছি। করতে কিছুই পারছি না, শুধু ভাবছি নিউ ইয়র্ক আর প্যারিস এই শহর দুটোর মধ্যে কী ভীষণ তফাত। সেই একই সময়, একইরকম দিন, এমনকী এই ধূসর শব্দটাও, যা এইসব সঙ্গ থেকেই আসে, সেই গ্রিসাইলের সাথে অল্পই সাযুজ্য তার, একজন ফরাসির কানে যা চিন্তা ও অনুভূতির একটা জগৎ জাগিয়ে তুলতে সক্ষম। অনেক আগে, প্যারিসের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, দোকানের জানলায় রাখা জলরঙের কাজগুলো মন দিয়ে দেখতে দেখতে, আমি সেই জিনিসটার একক অনুপস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলাম যাকে পেইন’জ গ্রে[১] বলে। এটা আমি উল্লেখ করলাম কারণ, সবাই-ই জানে প্যারিস সবিশেষভাবে এমন এক শহর যার নির্দিষ্ট কোনও সংজ্ঞা নেই। উল্লেখ করলাম কারণ, আমেরিকান শিল্পীরা তৈরি করা ফরমায়েসি ধূসরকেই ব্যবহার করে অতিরিক্ত এবং বদ্ধমূলভাবে। ফ্রান্সে এই ধূসরমালা অসীম; এখানে ধূসর তার পরিণাম-লুপ্ত।

ধূসরতার এই বিপুল পৃথিবী নিয়ে ভাবছিলাম যাকে আমি এই প্যারিসেই চিনেছি। কারণ এরকম সময়ে, এমনিই যখন বুলেভার ধরে হেঁটে যাচ্ছিলাম, অধীর আগ্রহে মনে হল ঘরে ফিরে যাই, লিখি, আমার স্বাভাবিক অভ্যেসের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী একটা লেখা। ওখানে আমার সময় ফুরোলে আমি আবার প্রবৃত্তিগতভাবে ঠিক ভিড়ে মিশে যাব। এখানে এই ভিড়, সবরঙের শূন্যতা, সবকিছুর সূক্ষ্ম তারতম্য, সব ভেদ ও স্বাতন্ত্র্য, আমাকে নিয়ে যাবে আমার ভেতরে, ফিরিয়ে নিয়ে যাবে আমার ঘরে, আমার কল্পনার মধ্যে এক নিরুদ্দিষ্ট জীবনের সেই জটিল ও মিশ্র উপাদানগুলোকে খুঁজতে, যখন সেগুলো সংমিশ্রিত ও আত্তীকৃত হয়ে প্রতিপালিত আর সুসংগত অস্তিত্বের সৃষ্টির দিকে হয়তো কী অনিবার্যভাবে পুনরুৎপাদন করছে কোমল ও স্বাভাবিক ধূসরকে। এরকম একটা দিনে, এরকম সময়ে র‌্যু লাফিত্তের[২] যে কোনও জায়গা থেকে সাক্রে কয়্যেরের[৩] দিকে তাকিয়ে দেখাটাই আমাকে স্বপ্নাবেশে নিয়ে যেতে সক্ষম। এমনকী যখন আমি ক্ষুধার্ত কিংবা ঘুমনোরও কোনও জায়গা নেই তখনও আমার ওপরে এই দৃশ্যটার এরকমই প্রভাব চলত। পকেটে আমার হাজার ডলার থাকলেও আমি জানি এমন কোনও দ্রষ্টব্য নেই যা আমার মধ্যে এরকম স্বপ্নাবেশ জাগাতে পারে।

প্যারিসের ধূসর দিনগুলোয় আমি সাধারণত মঁমার্তের[৪] ক্লিশির দিকে হাঁটি।

ক্লিশি থেকে অবারভিলারের[৫] দিকে একের পর এক কাফে, রেস্তোরাঁ, থিয়েটার, সিনেমাহল, কাপড়ের দোকান আর হোটেল। এটা প্যারিসের ব্রডওয়ে যা ৪২নং আর ৫৩নং রাস্তার মাঝখানের অল্প বিস্তৃতিটার দিকে সংযুক্ত হয়েছে।

ব্রডওয়ে সর্বদাই ছুটছে। মাথা ঘুরিয়ে দেয় আর ঝলমলে। বসার কোনও জায়গা নেই। মঁমার্ত আলস্যপরায়ণ, মন্থরগতি, উদাসীন আর গতানুগতিক, খানিকটা বাজেই আর নোংরা, সম্মোহন করার মতো রূপসী সে নয়, ঝকমকে নয় কিন্তু ধুঁইয়ে ধুঁইয়ে ওঠা আগুনে দেদীপ্যমান।

ব্রডওয়ে রোমাঞ্চকর, এমনকী কখনও জাদুকরী, কিন্তু সেখানে আগুন নেই, তাপ নেই কোনও— সে এক ঝকঝকে আলোকিত অ্যাজবেস্টস্‌, বিজ্ঞাপনের প্রতিভূদের স্বর্গ। মঁমার্ত অতি ব্যবহারে জীর্ণ, নিষ্প্রভ, বেওয়ারিশ, ন্যাংটো লম্পট, ভাড়াটে সেনার মতো শুধু টাকার জন্য কাজ করে, অশ্লীল। যদি এমন কিছু থাকে, যা বিরক্তিকর অথচ আকর্ষণীয়, কিন্তু কপট কুটিলতার সাথে বিরক্তিকর, সেরকম আবাধ্য লম্পট সে। খানকতক বার এখানে রয়েছে যা একচেটিয়াভাবে বেশ্যা, দালাল, ঠগ আর জুয়াড়িতে ভর্তি, ওদের হাজারবার নিরস্ত করলেও শেষ অব্দি তোমায় চুষে নেবে আর দাবি করবে ঠকেছে বলে।    

এই বুলেভারের প্রধান বস্তু হল রাস্তার ধারের হোটেলগুলো, যাদের কদর্যতা এতোটাই বদ আর কুটিল যে সেখানে ঢোকার চিন্তামাত্র তুমি কেঁপে উঠবে, তবু এটা অনিবার্য যে এদের মধ্যে কোনও একটায় কোনও-না-কোনও দিন তুমি একটা রাত অন্তত কাটাবে, হয়তো একটা সপ্তাহ বা একটা মাস। এমনকী হয়তো এই জায়গাটার প্রতি আসক্তই হয়ে পড়বে এটা দেখে যে, একদিন তোমার গোটা জীবনের আদলটাই পালটে গেছে এবং একসময় যাকে তুমি হীন, জঘন্য ভেবেছ এখন তাকেই মোহময়, চমৎকার মনে হচ্ছে। বৃহৎ প্রেক্ষিতে, আমার সন্দেহ, মঁমার্তের এই কপট মোহের কারণ প্রকাশ্য ও বেআইনি যৌনব্যবসা।

সেক্স জিনিসটা রোম্যান্টিক নয় বিশেষত যখন তা বিকিকিনির হাটে এসেছে। কিন্তু ছেয়ে থাকা একটা সুগন্ধ সে তৈরি করতে পারে, একটা ঝাঁজালো অতীত-আর্তি। যা দুর্ধর্ষ আলোকিত গে হোয়াইট ওয়ের[৬] চেয়েও অনেক অনেক বেশি রহস্যময় আর সম্মোহনকারী। প্রকৃতপ্রস্তাবে আবছা, অন্ধকারময় আলোতেই যৌনজীবনের শ্রীবৃদ্ধি; আলো-আঁধারির ছায়াতেই এর ঘর, নিওন আলোর ঝলসানি এখানে নয়।

ক্লিশির এক কোণে কাফে ওয়েপলার, যা দীর্ঘদিন ধরে বহুবার যাওয়া আমার অত্যন্ত প্রিয় এক জায়গা। দিনের পুরোটা সময় সমস্তরকম আবহাওয়ায় তার ভেতরে, বাইরে আমি বসেছি। একটা আস্ত বইয়ের মতো আমি একে জানি। ওয়েটার, ম্যানেজার, ক্যাশিয়ার, বেশ্যা, খদ্দের এমনকী বাথরুমে থাকা অ্যাটেন্ডেন্টদের মুখগুলো আমার স্মৃতিতে এমনভাবে খোদাই করা আছে যেন তারা একটা বইয়ের অলঙ্করণ, যে বই আমি রোজ পড়েছি। মনে পড়ে, সেই প্রথম যখন এসেছিলাম কাফে ওয়েপলারে, আমার স্ত্রীর সাথে, ১৯২৮ সেটা; রোয়াকের ওপরে একটা ছোট্ট টেবিলে মাতাল বেহেড হয়ে এক বেশ্যাকে যখন মরে পড়ে যেতে দেখলাম, আর দেখলাম কেউ তাকে ধরার জন্য ছুটেও গেল না, কীরকম প্রবল ধাক্কা খেয়েছিলাম আমি এটা দেখে, মনে পড়ে। ফরাসিদের এই নির্বিকার ঔদাসীন্য হতবাক আর আতঙ্কিত করে দিয়েছিল আমাকে; এখনও করে, ওদের মধ্যে যেসব ভালো গুণ রয়েছে পরবর্তীকালে সেসব জানার পরেও। ‘এ কিছু না, সামান্য একটা বেশ্যা... একটু মাতাল হয়ে পড়েছিল আর কি’। এখনও আমি এই শব্দগুলো শুনতে পাই। আজও তারা আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে যায়। কিন্তু এটাই প্রকৃত ফরাসিয়ানা, এই মনোভাবটা, আর তুমি যদি এটা মেনে নিতে না শেখো, ফ্রান্সে তোমার অবস্থানটা খুব সুখপ্রদ হবে না।  

ধূসর দিনগুলোয়, যখন বড় কাফেগুলো ছাড়া সর্বত্র ঠান্ডায় জমে গেছে, রাতে ডিনারে যাবার আগে কাফে ওয়েপলারে এক-দু ঘণ্টা কাটাবার জন্য আমি উন্মুখ হয়ে থাকতাম। কামোদ্দীপনার এমন সুসময় ভাসিয়ে নিয়ে যেত এই জায়গাটাকে, যা উঠে এসেছে এক ঝাঁক বেশ্যার হাত ধরে, যারা জমায়েত করে থাকত ঢোকার মুখটার কাছে। ধীরে ধীরে তারা খদ্দেরদের কাছে নিজেদের বিলি-বণ্টন করে দিলে, জায়গাটা তখন শুধু কামনায় উষ্ণই হয়ে উঠত না, মিষ্টি একটা সুগন্ধের মাধুর্যে ভরে যেত।

আবছা আলোয় সুগন্ধী জোনাকির মতো তারা ডানা ঝাপটাত। যারা খদ্দের খুঁজে নেবার মতো ভাগ্যবান হত না, রাস্তায় পায়চারি করত অলসভাবে, তারপর সাধারণত আবার ফিরে আসত একটু বাদেই, তাদের পুরনো জায়গায়। গর্বে অন্যদের মুখ তখন ঝকঝক করছে, সন্ধের পালা শুরু করতে তারা প্রস্তুত। যে কোণটায় সাধারণত ওরা জড়ো হত সেটা যেন একটা এক্সচেঞ্জ মার্কেট, এই সেক্স মার্কেটেরও ওঠা-নামা আছে অন্য এক্সচেঞ্জ মার্কেটের মতোই। বর্ষার দিনগুলো সাধারণত এখানে ভালো ব্যবসা-পাতির দিন, আমার চোখে তা-ই মনে হয়েছে। প্রবাদ আছে, একটা বর্ষার দিনে তুমি দুটো কাজই করতে পারো যখন বেশ্যারা কখনও তাস পিটিয়ে সময় নষ্ট করে না।

সেই দিনটাও ছিল বর্ষারই দিন, শেষবিকেলের দিক। কাফে ওয়েপলারে এক নবাগতাকে লক্ষ করলাম। আমি বেরিয়েছিলাম কেনাকাটা করতে, আমার হাত ভর্তি হয়ে আছে বই আর কিছু ফোনোগ্রাফ রেকর্ডে। সেদিন নিশ্চয়ই আমেরিকা থেকে একটা অপ্রত্যাশিত অর্থপ্রাপ্তি ঘটেছিল যার ফলে কেনাকাটা যা করেছি তারপরেও কয়েকশো ফ্রাঙ্ক তখনও আমার পকেটে। আমি বসে আছি ওই এক্সচেঞ্জের জায়গাটায়, ক্ষুধাময় এক মহিলামহল পরিবেষ্টিত হয়ে; ক্রমাগত খুঁচিয়ে যাওয়া বেশ্যার দল আর যা কিছু আমার সামনে দিয়ে যাচ্ছে সেসবে আমার কোনও প্রতিবন্ধকতাই হচ্ছিল না, কারণ আমার চোখ তখন একনজরে তাক করে আছে মোহসঞ্চারী ওই নবাগতা সুন্দরীর দিকে, যে অনেকটা তফাতে কাফের দূরবর্তী কোণে বসে আছে। তাকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় সুন্দরী এক যুবতি বলেই মনে হল যে তার প্রেমিকের সাথে দেখা করবে বলে এসেছে এবং নির্ধারিত সময়ের অনেকটা আগেই চলে এসেছে। যে মদটা মেয়েটা অর্ডার করেছিল নামমাত্রই ছুঁয়েছে সেটা। তার টেবিলের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া পুরুষদের দিকে সে পূর্ণ এবং স্থির দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, কিন্তু তা থেকে কিছুই বোঝা যায় না— ব্রিটিশ বা আমেরিকান মহিলাদের মতো একজন ফরাসি মহিলা কখনওই তার দৃষ্টি সরিয়ে নেয় না। নিরুদ্বিগ্ন স্থির চোখে তাকিয়ে সে চারপাশ মাপছে, কিন্তু দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কোনও স্পষ্ট প্রয়াস তাতে নেই। সে ছিল নিঃশব্দ পদসঞ্চারী এবং সম্ভ্রম উদ্রেককারী, আগাগোড়া স্থিতিসাম্যে টান টান আর নিজেকে ধরে রাখা একজন।

সে অপেক্ষা করছিল। আমিও অপেক্ষা করছিলাম। আমি উৎসুক ছিলাম দেখতে যে সে কার অপেক্ষায় বসে আছে।

আধঘণ্টা পর, যে সময়টায় আমি বেশ ক’বার তার চোখাচোখি হলাম এবং ধরে ফেললাম, এ মেয়ে অপেক্ষা করছে যেকোনও কারুর জন্যেই, যে সঙ্গত আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবটা করবে। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত মাথা বা হাত নেড়ে ইশারাটুকুই করতে হয় যাতে মেয়েটি তার টেবিল ছেড়ে উঠে আসবে এবং তোমার সাথে যোগ দেবে— যদি সে ঠিক সেই ধরনের মেয়ে হয়। কিন্তু তখনও আমি একেবারে নিশ্চিত হতে পারিনি। আমার চোখে তো সে দেখতে খুবই সুন্দর, সুপুষ্ট, উথলে ওঠা যাকে বলে— মানে বলতে চাইছি যত্নে লালিত আরকি।  

যখন ওয়েটার আরেকবার রাউন্ডে এল আমি মেয়েটিকে দেখিয়ে ওকে জিগ্যেস করলাম যে চেনে কিনা। ওয়েটার যখন বলল ‘না’, আমি বললাম ওকে এখানে আসতে বলো, আমার সাথে জয়েন করুক। আমি মন দিয়ে ওর মুখ লক্ষ করছিলাম যখন ওয়েটার ওকে মেসেজটা দিচ্ছিল। ওর মুখে হাসি এবং আমার দিকে তাকিয়ে অল্প মাথা নাড়ানোটা দেখে আমার যেন একটা রোমাঞ্চ দিয়ে গেল। আমি আশা করেছিলাম যে ও জলদি উঠে পড়বে এবং এদিকে চলে আসবে, কিন্তু তার বদলে বসেই রইল এবং আবার হাসল, এবারে আরও মৃদু, আর সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা ঘুরিয়ে জানলা দিয়ে একদৃষ্টে স্বপ্নমাখা চোখে তাকিয়ে রইল। মাঝখানে ঢুকে পড়তে আমি একটু সময় দিলাম এবং দেখলাম নড়াচড়ার কোনও লক্ষণই তার নেই, এবারে আমি উঠে দাঁড়ালাম, সোজা হেঁটে গেলাম ওর টেবিলের দিকে। যথেষ্ট আন্তরিকভাবেই সে আমায় স্বাগত জানাল, যেন বাস্তবিকই আমি তার বন্ধু, কিন্তু আমি লক্ষ করলাম ও যেন একটু আচ্ছন্ন হয়ে আছে নেশায়, প্রায় অপ্রস্তুত। আমাকে বসতে দিতে চায় কি চায় না ঠিক নিশ্চিত ছিলাম না আমি, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি বসে পড়লাম এবং ড্রিঙ্ক অর্ডার করে চট করে ওর সাথে কথা বলতে শুরু করে দিলাম। (চলবে)

পরিশিষ্ট
১. পেইন’জ গ্রে (Payne’s grey) : নীল, লাল, কালো এবং শাদা রঞ্জকে তৈরি একটি কম্পোজিট পিগমেন্ট। বিশেষত জলরঙের ছবিতে ব্যবহার করা হয়। ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ শিল্পী উইলিয়াম পেইনের নামানুসারে এই নাম।
২. র‌্যু লাফিত্তে (Rue Laffitte) : প্যারিসের একটি রাস্তা। বর্তমানে এর বিস্তৃতি বুলেভার্দ দে ইতালিয়েনস থেকে র‌্যু নত্‌রদাম দে লরেত্তে অবধি। এই রাস্তাটার একেবারে শুরুর মুখে, অর্থাৎ বুলেভার্দ দে ইতালিয়েনসের জংশন থেকে সাক্রে কয়্যেরকে দেখে মনে হয় নত্‌রদাম গির্জার শৃঙ্গভাগে দাঁড়িয়ে আছে।   
৩. সাক্রে কয়্যের (Sacré Coeur) : ১৯১৪ সালে নির্মিত প্যারিসের রোমান ক্যাথলিক চার্চ। ইংরিজিতে পুরো নাম, ব্যাসিলিকা অফ দ্য সেক্রেড হার্ট অফ প্যারিস। ১৮৭১ সালের ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধে ফরাসিদের পরাজয় এবং ওই বছরই সমাজতান্ত্রিক পারি কম্যিউনের জাতীয় স্মৃতিতে শহরের সবচেয়ে উচ্চবিন্দুতে মঁমার্তের শৃঙ্গভাগে রোমান-বাইজেন্টাইন স্থাপত্যরীতির এই চার্চ। ফরাসি রক্ষণশীলতার নৈতিক ভাষ্যের মূর্ত প্রকাশ বলে একে ধরা হয়। এর গম্বুজের চূড়া থেকে প্রায় গোটা প্যারিস শহরটাকে দেখা যায়। 
৪. মঁমার্ত : ফরাসি উচ্চারণে মঁমার্ত্র (Montmartre)। এটা প্যারিসের অষ্টাদশ প্রশাসনিক শাখার অন্তর্গত এক পাহাড়ি টিলা। এর চূড়াভাগে থাকা শ্বেত-গম্বুজওয়ালা সাক্রে কয়্যের গির্জা আর গোটা এলাকা জুড়ে ছড়ানো নৈশ কাফেগুলির জন্যে অধিক পরিচিত মঁমার্ত। দালি, পিকাসো, ভ্যান গঘ প্রমুখ বহু শিল্পী বিশ শতকের শুরু থেকে এখানে এসেছেন, থেকেছেন দীর্ঘকাল, তাঁদের কাজ করেছেন।
৫. অবারভিলে (Aubervillers) : প্যারিসের উত্তর-পূর্বের শহরতলিতে অবস্থিত একটি ফরাসি কম্যিউন।    
৬. গে হোয়াইট ওয়ে : ১৯০২ সাল থেকে নিউইয়র্কের ব্রডওয়েকে ‘গ্রেট হোয়াইট ওয়ে’ বলা হয়। মিউজিকাল গে হোয়াইট ওয়ে ১৯০৭-এর অক্টোবরে ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ক্যাসিনো থিয়েটারে চালু হলে, ‘গ্রেট হোয়াইট ওয়ে’র বদলে নাট্যশহর ব্রডওয়েকে সাধারণত ‘গে হোয়াইট ওয়ে’ নামেই ডাকা হত এর ডাকনাম হিসেবে। বিশ শতকের পঞ্চাশ এবং ষাটের দশক থেকে ‘গে’ শব্দটি ‘সমকামী’ অর্থে ব্যবহৃত হয়। আবার ওই সময় থেকেই টেলিভিশনের দর্শক বাড়ার সাথে সাথে আমেরিকার সংস্কৃতির ওপর ব্রডওয়ে মিউজিকালের বিপুল প্রভাব ও জনপ্রিয়তাও কমতে শুরু করে। এখন ‘গে হোয়াইট ওয়ে’ কথাটি কদাচিৎ ব্যবহৃত হতে দেখা যায়, যদি বা হয়, তাহলে ‘গে’ শব্দের সমকামী ব্যবহারকেই এতে উল্লেখ করা হয়।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

রবীন্দ্রনাথের পারস্য মুগ্ধতা

রবীন্দ্রনাথের পারস্য মুগ্ধতা

‘হাতিটা উধাও’ গ্রন্থের অনুবাদকের কথা

‘হাতিটা উধাও’ গ্রন্থের অনুবাদকের কথা

ফজল হাসানের অনুবাদে বিদেশি গল্পের সংকলন

ফজল হাসানের অনুবাদে বিদেশি গল্পের সংকলন

‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’র ভূমিকা

‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’র ভূমিকা

সর্বশেষ

ত্রিপুরার পর আসাম-কেরালাকে টার্গেট তৃণমূলের

ত্রিপুরার পর আসাম-কেরালাকে টার্গেট তৃণমূলের

বাংলাদেশের রাব্বি পেলেন রূপা

বাংলাদেশের রাব্বি পেলেন রূপা

গাজীপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি মাসুদ সম্পাদক রাহিম

গাজীপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি মাসুদ সম্পাদক রাহিম

সিটি করপোরেশন এলাকায় ৭-৯ আগস্ট ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইন চালানো যাবে

সিটি করপোরেশন এলাকায় ৭-৯ আগস্ট ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইন চালানো যাবে

কওমি মাদ্রাসা খোলার ঘোষণা সত্য নয়: বেফাক

কওমি মাদ্রাসা খোলার ঘোষণা সত্য নয়: বেফাক

রবীন্দ্রনাথের পারস্য মুগ্ধতা

রবীন্দ্রনাথের পারস্য মুগ্ধতা

বার্সেলোনার ঘোষণা, মেসি থাকছেন না

বার্সেলোনার ঘোষণা, মেসি থাকছেন না

পরীমণির সঙ্গে আমার পবিত্র সম্পর্ক: চয়নিকা চৌধুরী

পরীমণির সঙ্গে আমার পবিত্র সম্পর্ক: চয়নিকা চৌধুরী

মরদেহ সংরক্ষণে দুর্ভোগে ঢামেক

মরদেহ সংরক্ষণে দুর্ভোগে ঢামেক

রবীন্দ্র প্রয়াণ দিবসে ‘পয়লা নম্বর’

রবীন্দ্র প্রয়াণ দিবসে ‘পয়লা নম্বর’

যাত্রাবাড়ীতে ৭০ কেজি গাঁজাসহ দুজন গ্রেফতার

যাত্রাবাড়ীতে ৭০ কেজি গাঁজাসহ দুজন গ্রেফতার

নাটকে প্রতিবন্ধীদের নিয়ে ভিত্তিহীন মন্তব্য: মানবাধিকার কমিশনের ক্ষোভ

নাটকে প্রতিবন্ধীদের নিয়ে ভিত্তিহীন মন্তব্য: মানবাধিকার কমিশনের ক্ষোভ

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

রবীন্দ্রনাথের পারস্য মুগ্ধতা

রবীন্দ্রনাথের পারস্য মুগ্ধতা

‘হাতিটা উধাও’ গ্রন্থের অনুবাদকের কথা

নতুন বইয়ের খবর‘হাতিটা উধাও’ গ্রন্থের অনুবাদকের কথা

ফজল হাসানের অনুবাদে বিদেশি গল্পের সংকলন

নতুন বইয়ের খবরফজল হাসানের অনুবাদে বিদেশি গল্পের সংকলন

‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’র ভূমিকা

‘আবুল হাসান রচনা সমগ্র’র ভূমিকা

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

ধারাবাহিক—একক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

© 2021 Bangla Tribune