X
বুধবার, ০৪ আগস্ট ২০২১, ২০ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

ব্যাট-বল

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২১, ১১:৩৯

বাংলাদেশ ভার্সেস নিউজিল্যান্ড। টসে জিতে বোলিঙের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। প্রথম বলটা খেলার জন্য ওপেনিং ব্যাটসম্যান রস টেইলর ক্রিজে দাঁড়িয়ে প্রস্তুত। অপরপ্রান্তে বল-হাতে সেও তৈরি ইনিংসের প্রথম বলটা করার জন্য। বিশ্বকাপে এটা বাংলাদেশের দ্বিতীয় ম্যাচ। আগের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার সাথে গোহারা হেরেছে তারা। পরের প্রতিপক্ষ অপেক্ষাকৃত সহজ, আফগানিস্তান। কিন্তু সেকেন্ড রাউন্ডে উঠতে হলে জেতা ছাড়া অন্য কোনও বিকল্প নেই আজকে।

আগের খেলায় টিমে তার জায়গা হয়নি। বলতে গেলে অনেকটা ভাগ্যের ফেরে সুযোগ পেয়ে গেছে সে এই ম্যাচে। গতকাল প্র্যাকটিস সেশনে পায়ে হঠাৎ চোট পেয়েছে শফিউল। ডান পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেছে তার। বেশ কিছুদিনের জন্য টিম থেকে ছিটকে গেছে সে। মূল পেসার মোস্তাফিজও ইনজুরিতে গত দুইমাস। ওয়েটিং থেকে তাই তাকে ডেকে নিয়েছে টিম ম্যানেজমেন্ট। মূলত অলরাউন্ডার হিসেবে চান্স পেয়েছে সে। সুযোগটা কাজে লাগাতে হলে আজকে কিছু একটা করে দেখাতেই হবে তাকে, নইলে আবারও বাদ পড়ে যাবে।

রাখে আল্লা মারে কে!

গভীর শ্বাস টেনে ফুসফুস ভরে নেয় সে কানায় কানায়, তারপর ধীরে ধীরে সব বাতাস ছেড়ে দিয়ে তুলার মতো হালকা করে নিজেকে। তিন আঙুলে বলটা গ্রিপ করে প্রচণ্ড বেগে দৌড়াতে শুরু করে ক্রিজের দিকে। প্রতি পদক্ষেপে একটু একটু করে গতি বাড়ায় দ্রুত। বাধাহীন ঢেউয়ের মতো তার লম্বা চুলগুলো ভাসতে থাকে বাতাসে...

এক সেকেন্ডও সময় নেয়নি পুরো ঘটনা ঘটতে। কিছু বুঝবার আগেই আত্মরক্ষার ভঙ্গিতে ব্যাটটা সামনে এগিয়ে দিয়েছিল টেইলর। দেড়শো কিলো বেগে আউটসুইং করা বলটা দেখতেই পায়নি যেন সে। ব্যাটের কানায় লেগে ফার্স্ট স্লিপে দাঁড়িয়ে থাকা সৌম্যের হাতে জমা হয়েছে বলটা।

'আউট!'
সমর্থকদের চিৎকারে মুখর হয়ে ওঠে ইডেন গার্ডেন। পরের বলটাও দেড়শোর কাছাকাছি। লেগ থেকে ইনসুইং করে চোখের পলকে উড়িয়ে নিয়ে গেছে মিডল স্ট্যাম্প।

ক্লিন বোল্ড।

হতভম্ব ম্যাককুলাম একবার সেদিকে তাকিয়ে মাথা নীচু করে সোজা হাঁটা দিয়েছে প্যাভেলিয়নের দিকে। পরেরটা আবার আউট সুইং। দেড়শো ছাড়ানো গতি। ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রতগতির ডেলিভারি। ব্যাটসম্যানের সব প্রস্তুতি নস্যাৎ হয়ে যায় গতির কাছে। আবারও ব্যাটের কানায় লেগে ফার্স্ট স্লিপে সৌম্যের হাতে ক্যাচ। হ্যাটট্রিক! জীবনের প্রথম আর্ন্তজাতিক ম্যাচে প্রথম তিন বলে তিন উইকেট।

ওয়ার্ল্ড রেকর্ড!

না, কোনোভাবেই আসছে না ঘুমটা। চোখের পাতা ভারী হয়ে এসেছিল কয়েক মুহূর্তের জন্য; হুট করে আবার ছিঁড়ে গেছে সুতাটা। মেজাজটা খিঁচড়ে ওঠে তার। গায়ের নিচে বেডশিটটা কুঁচকে নেই কোথাও; গায়ের ওপর পাতলা কাঁথাটাও মোটামুটি টানটান। না। ধীরে ধীরে একটা ভয় ঢুকে যাচ্ছে ভেতরে। ৩টা বেজে গেছে নিশ্চয়ই! কিছুক্ষণ পরেই আলো ফুটে যাবে। মাথার ভার আলতো করে বালিশে ছেড়ে দেয় সে। ভেতরে ছটফট করতে থাকা গরম বাবলটাকে যেকোনো উপায়ে বের করে দিতে হবে মাথা থেকে। নইলে ঘুম আসবে না আর আজকে। কোলবালিশটা আরও ঘন করে পায়ের নিচে টেনে নেয় সে। চোখের পর্দার ভেতর শান্ত করে আইবল দুটো। ডান পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে একবার চুলকে নেয় বাম পায়ের গোড়ালি। তারপর যতটা সম্ভব রিলাক্সড মুডে পরের ম্যাচের কল্পনায় চলে যায়।

ইদানীং খেলাগুলোকে অনেকক্ষণ ধরে চালিয়ে নিতে হচ্ছে ঘুমটাকে বাঁধবার জন্য। কখনও কখনও একেবারে ফাইনাল পর্যন্ত গড়িয়ে দিতে হচ্ছে বলটাকে। বেশিরভাগ সময়ই ফোকাস ঠিক থাকতে চায় না, সরে যায় জায়গা থেকে। আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হয় সব; প্রথম বল থেকে।

ফার্স্ট রাউন্ডে প্রতিপক্ষ সাধারণত নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইংল্যান্ড। সাথে একটা দুর্বল অপোনেন্ট। নিজের কাছে বিশ্বাসযোগ্য লাগে এতে। সেমিতে পাকিস্তান আর ফাইনালে ভারত। ভারত-পাকিস্তানে এসে কিছুটা স্বস্তি পায় সে। মোটামুটি বেশ কয়েকজন প্লেয়ারের নাম জানা আছে তার। ভাবনার লাগাম ছেড়ে দিতে সুবিধা হয় এতে। নিউজিল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার বেশিরভাগই অপরিচিত! রস টেইলর, ম্যাককুলাম, উইলিয়ামসন; এই দুয়েকটাকেই চিনে শুধু। ভারত-পাকিস্তানের আরও একটা সুবিধা আছে। ক্রিকেট মাঠে এরা চিরশত্রু। এদের পরাজয়ে উল্লাসটা বেশি হয় অনেক। দেশপ্রেমের কানা দৈত্যটাকে খাবার জোগানো যায়। তাই শেষ খেলাটা এদের সাথে হলেই জোশটা জমে ওঠে।

ফাইনালে বাংলাদেশ সবসময় বিশাল ব্যবধানে জেতে। একতরফা খেলায় নাকানি-চোবানি খায় মহা-ভারত। সেইসব ম্যাচে ব্যাট হাতে ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকায় সে। কিংবা বল হাতে আট উইকেট। তাও মাত্র ছয় রানের খরচায়। এটাও ওর্য়াল্ড রেকর্ড। এতকিছুর পরও দুর্ভাগা রাতগুলোতে ঘুম আসতে চায় না অনেকসময়। তখন শুরু হয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, তারপর আইপিএল...

নিজের চুলগুলো নিয়েই যত দুশ্চিন্তা তার। কী করবে এগুলোকে! কদমছাঁট দিয়ে দেবে! নাকি হরভজনের মতো মাথায় পাগড়ি বেঁধে নেবে চুড়ো করে? চুলগুলোর নাহয় কোনও গতি করা গেল। কিন্তু বুকদুটো? এগুলো ঢাকবে কী করে! নিজের বুকে হাত দেয় হোমায়রা। বেশ ভারী; লুকানো মুশকিল হয়ে যাবে। ছেলেদের বিশ্বকাপটা তাইলে সে কীভাবে খেলবে!

হোমায়রা নিজেই জানে না এতকিছু থাকতে প্রতিরাতে সে ক্রিকেট খেলার কল্পনাকেই কেন বেছে নিয়েছে ঘুমাবার জন্য! কখন থেকে বেছে নিয়েছে? তাও আবার ছেলেদের ক্রিকেট! কিছুদিন আগে মেয়েদের ক্রিকেট নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়েছিল হঠাৎ। চলেছিলও কয়েকদিন। সালমা, রুমানা, নিগার সুলতানা; কী কী সব নামও শোনা গিয়েছিল তখন। তারপর যেইকে সেই। এসব কারণেই হয়তো মেয়েদের ক্রিকেট খেলতে কখনোই ইচ্ছে হয়নি তার। কোনো চার্ম পায়নি সেখানে। এসব খেলা দেখার জন্য কেউ অপেক্ষা করে থাকে না, কঠিন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটা ম্যাচ জিতলে আনন্দের বন্যা বয়ে যায় না কোথাও। এই যে সবার মধ্যমণি হয়ে থাকা, আঠারো কোটি মানুষের বুকের ধন হয়ে থাকা; এর একটা তীব্র আকর্ষণ আছে। তাই কল্পনাতেও সে পুরুষদের ক্রিকেটই খেলেছে। চুল কেটে, বুক দাবিয়ে, সমস্ত কমনীয়তা লুকিয়ে রেখে...

রূপকথা হওয়ার আগে আগে একটানা শুয়ে থাকতে হতো তাকে। সারা দিন সারা রাত। সময় কাটতেই চাইত না যেন। ইন্টারনেটেও আসক্তি ছিল না তেমন। বরং উদ্ভট সব ভাবনা ভাবতে ভালো লাগত তার; ভাবতে ভালো লাগত এমন কিছু একটা করছে সে, যা দেখবার জন্য সারাদেশ উন্মুখ হয়ে আছে; তীব্র উৎকণ্ঠা নিয়ে তার সূক্ষ্মতম নড়াচড়াও পর্যবেক্ষণ করছে মানুষ। যেন তার উপরই তুলে দেয়া হয়েছে জাতির পুরোটা ভার; সে ফেলে দিলেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ছিটকে যাবে সব। অনেক হিশেব মিলিয়ে দেখেছে সে, একমাত্র ক্রিকেটই তাকে সেই চূড়ান্ত আত্মতৃপ্তি দিতে পারে। জাতীয় দলের ক্রিকেট, পুরুষ দলের ক্রিকেট।

সেইসময় একদমই ঘুম আসতে চাইত না। সারা শরীর ম্যাজম্যাজ করত, মন অবসন্ন হয়ে থাকত প্রতিমুহূর্তে, কিন্তু চোখে ঘুমের লেশমাত্র নাই। টিভি দেখতে ভালো লাগত না, বইয়ের পাতাগুলোও বিস্বাদ লাগত। কিছুতেই মন বসত না তখন, কিচ্ছুতে না। শুয়ে শুয়ে শুধু আবোল-তাবোল ভাবতে ভালো লাগত। সে তার গর্ভের বাচ্চাটার কথা ভাববার চেষ্টা করেছে বারবার। ভেবেছেও কোনও কোনোদিন। কিন্তু ভয় লাগত তার। মনে হতো একটা পাপ করতে যাচ্ছে সে শিশুটাকে এই পৃথিবীতে নিয়ে এসে। যে-শিশুটা জন্মের পর তার বাবাকে পাবে না, পাবে না বাবার দিকের কোনও আত্মীয়ের আদর। বাচ্চাটা হয়তো সবকিছুর জন্য তাকেই দায়ী করবে। বলবে, কেন সে মানিয়ে নিতে পারেনি, অন্তত তার জন্য আরেকটু মেনে নেয়নি কেন সে!

হোমায়রা বুঝতে পারে না কতটুকু মানিয়ে নিলে তাকে মানিয়ে নেওয়া বলে। বিয়েটা তো তার একার ইচ্ছায় হয়নি; আরিফেরও পূর্ণ সম্মতি ছিল তাতে। তাছাড়া সেও তো ফেলনা কিছু নয়! পাল্লায় মাপলে বরং তার দিকটাই ভারী হবে কোথাও কোথাও। আরিফ তাকে একগাদা মানুষের সামনে নিয়ে গিয়ে ফেলেছিল। অথচ বিয়ের আগে এমন কথা ছিল না। বাপের বাড়ির হট্টমেলায় অতিষ্ঠ হোমায়রা কৈশোর থেকেই নিজের একটা ঘর চেয়েছে মনে মনে; যেখানে কোনও খবরদারি নেই, নেই কোনও উৎপাত। বাড়িতে পুরুষ অতিথির আগমন ঘটলে বারান্দায় শুকোতে দেওয়া অন্তর্বাস লুকানোর জন্য ছুটতে হয় না যেখানে। তাদের রুমটা শুধু দুইবোন নয়, দাদির জন্যও বরাদ্দ ছিল। আর এই রুমেই বাড়ির প্রধান মুরুব্বির বাস বলে গ্রাম থেকে আসা সকল উৎপাতের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই রুম। তাছাড়া দিন-রাত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দাদিবুড়ির খ্যাচড়-খ্যাচড় তো ছিলই! অথচ বড় ভাই, সারা দিন টো-টো কোম্পানির ম্যানেজারির ফলে তার ঘর ভোঁ ভোঁ, তবুও ঘরখানি তার দখলে। গোছগাছ করা ছাড়া ওই ঘরে ঢোকারও অনুমতি ছিল না কারও।

হোময়রার এইসব আক্ষেপ জানত আরিফ। তাই কথা দিয়েছিল নিজেদের একটা ঘর হবে তাদের, শুধু দুজনের একটা ঘর। যেখানে সমস্ত কিছুই কেবল দুজনের মনের মতো করে হবে। অথচ হয়েছে ঠিক উল্টো। প্রথম প্রথম তবু সহ্য করে নিয়েছিল সে। আরিফ আশ্বাস দিয়েছিল; বলেছিল, 'মাত্র কয়টা দিন, একটু গুছাইয়া নিতে দাও।' কিন্তু দুই বছরেও যখন 'কয়টা দিন' আর শেষ হচ্ছিল না তখন সে বুঝে নিয়েছে চাপ না দিলে কোনোদিনও শেষ হবে না।

এর আগেই অবশ্য তার গায়ের গন্ধ খোঁজা শুরু হয়ে গেছে পরিবারে। 'কেন সে অফিস থেকে দেরিতে ফেরে, ছুটির দিনেও কেন বাইরে যায়, শ্বশুর শ্বাশুড়ির কেন খেয়াল রাখে না...' কত কত অভিযোগ! সব এখন মনেও নাই। এমনকি পুঁচকে ননদটাও, যে কি না প্রায়ই তার কাছ থেকে এটা ওটা চেয়ে নিত, চুরিও করত, সেও ভাইয়ের কাছে কান ভারী করা শুরু করে দিয়েছিল তার নামে। কাহাতক আর সহ্য করা যায়!

এসব নিয়ে কোনো বাহাসে যায়নি হোমায়রা, এত ছোটো ছোটো বিষয় নিয়ে কথা বলার রুচি হয়নি তার। সমস্ত ঝগড়া সে একবাক্যে শেষ করতে চেয়েছে—'আমার বাসা কোথায়!'

নিজের বাসা, যেখানে হাত-পা ছড়িয়ে দুপুরবেলা সটান শুয়ে থাকলে দরজার ফাঁকে কেউ উঁকি দিয়ে দেখবে না, গজগজ করে বলবে না—'ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ; মাইয়ামাইনষের এমুন বেহাইয়াপনা বাপের জন্মেও দেহি নাই!'
সে তো তার নিজের পরিবার ছেড়ে এসেছিল আরিফের এক কথায়। আরিফেরও তা-ই কথা ছিল। আরিফ তার কথা রাখেনি। এক দঙ্গল মানুষের জঙ্গলে ফেলে দিয়েছিল তাকে ধরে নিয়ে। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করেছে সে দিনের পর দিন। ক্ষেপে ওঠেনি, চেঁচামেচি করেনি, অশোভন আচরণ করেনি কারও সাথে। পরিবর্তে সে একনাগাড়ে নিজের ইচ্ছাটুকু পেশ করে গেছে—‘চলো, এমন একটা বাসা নেই, যেইখানে পুরো পরিবার পাশাপাশি দুটো আলাদা ফ্ল্যাটে থাকা যায়, একটা বন্ধ দরজার এপারওপারে।' একটা দরজাই তো চেয়েছিল সে, যেটার খোলা-বন্ধের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে থাকবে। এমনও বলেছিল সেই ঘরের ভাড়া সে নিজেই দেবে, খরচও। আরিফ তার মা-বাবারটা দিক। কানে তোলেনি আরিফ, সমাজ তার কান আগেই এঁটে দিয়েছিল; পুরুষত্বে আঘাত লেগেছিল তার। বেমালুম ভুলে গিয়েছিল সে; শুধু এই একটি প্রতিজ্ঞার বিনিময়ে হোমায়রা এক কাপড়ে বাড়ি থেকে চলে আসার এমন হটকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

অথচ সবাই উল্টো তাকেই দোষ দিয়ে বসে। মা-বাবা থেকে সন্তানকে আলাদা করবার ঘৃণ্য চক্রান্তের হোতা বানিয়ে তোলে কথার মারপ্যাঁচে। সেই মুহূর্তেও আরিফ সম্পুর্ণ নিষ্ক্রিয় ছিল, এমন একটা ভঙ্গি করে ছিল যেন সে ভাজা মাছটাও উল্টে খেতে শেখেনি; যেন হোমায়রা জাদুটোনা করে এমন ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুটাকে মায়াবী জালে পুরে নিয়েছে। আরিফ একবারও সবার সামনে মুখ ফুটে বলেনি—‘এই মেয়েটাকে বিয়ের আগে আমি কথা দিয়েছিলাম, বলেছিলাম আমাদের নিজেদের আলাদা একটা ঘর হবে, নিজস্ব একটা পৃথিবী হবে চার দেয়ালের ভেতরে।' আরিফ না বলুক, সে বলেছে সবার সামনে। জোরগলায়। এতেও সবাই তার ডাইনি রূপটাই দেখেছে। কেউ ফোড়নের টানে লম্বা শেকল বুনেছে, 'ও...! তাইলে বিয়ার আগেই বেবাগ ফিটিং দিয়া রাখসিল ম্যাডামে!’ অন্যরা বলেছে, 'হইব নিশ্চয় একদিন, অহনই এত বেদিশা হওনের কী আছে!' এমনকি তার নিজের বড় ভাই পর্যন্ত বলেছে—'সবার সাথে মিলমিশ কইরা থাকাটাই সমাজ।' এতে নাকি জীবনে পূর্ণতা আসে!
তার একটিমাত্র চাওয়া এমনভাবে উপেক্ষিত হবে, মানতে পারছিল না হোমায়রা। এমনকি পিচ্চি ননদটার হাসি থেকেও বিদ্রূপের ছিটে এসে লাগছিল গায়ে—'আইছে লাডের বেডি, ভাইরে যুদা করতে, থোঁতা মুখ ভোতাইয়া দিমু এক্কেরে!’
নিজেকে প্রচণ্ড পরাজিত লাগছিল তার, অপাঙক্তেয় মনে হচ্ছিল। কোথাও আশ্রয় পাচ্ছিল না সে তখন; জোর করে তাকে মুছে দেওয়া হয়েছে দৃশ্যপট থেকে; ধীরে ধীরে পুরো পরিবারের কাছে ইনভিজিবল হয়ে গিয়েছিল সে। এমনকি আরিফের কাছেও! নিজের ব্যর্থতা ঢাকতেই বুঝি তার কাছ থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতে শুরু করেছিল আরিফ। না, আর পারেনি সে নিতে। একটা অক্ষম ক্রোধ তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছিল প্রতিমুহূর্তে। এই ক্রোধটাই তার বিড়াল শরীর থেকে বাঘটাকে টেনে বের করে এনেছিল শেষমেশ। লাথি মেরে চলে এসেছিল সে সংসার ছেড়ে।

এরপর থেকেই কেন যেন সবসময় তার মনে হতো, এমন কিছু একটা করবে সে যাতে আশপাশের সবাই তার দিকে উন্মুখ হয়ে চেয়ে থাকবে; তার বাচ্চাটা জন্মের পর থেকে তাকে সুপারহিরো ভেবে বড় হবে; তাকেই মা, তাকেই বাবা ভাবতে শিখবে। সুপারহিরো হওয়ার সুপ্ত বাসনা অবশ্য হোমায়রার ছেলেবেলা থেকেই ছিল। নিজেকে কতবার সে মৌসুমী, শাবনূরের জায়গায় কল্পনা করেছে। বিমান দুর্ঘটনায় ফারিয়া লারার মৃত্যুও তাকে প্রভাবিত করেছিল। তখন নিজেকে পাইলট ভেবে বেশ সুখ পাওয়া যেত। কল্পনা চাওলার মৃত্যু, বুকসেল্ফের সায়েন্স ফিকশন বইগুলো আর এইচবিওতে দেখানো আর্মাগেডনের মতো মুভিগুলোর কারণে নিজেকে নভোচারী কল্পনা করে দারুণ এক্সাইটমেন্ট পাওয়া যেত তখন! রাতের বেলায়, ঘুমুতে গেলে, দাদির পুরাতন দিন নিয়ে আক্ষেপের বিনুনি শুনতে শুনতে কতবার যে সে স্পেসশিপের ক্যাপ্টেন হয়েছে! জরুরি পরিস্থিতিতে স্পেশ-স্যুট গায়ে আর সাকশান জুতো পায়ে জিরো গ্র‍্যাভিটিতে ব্যালেন্স করতে করতে দলের অন্যদের চিৎকার করে নির্দেশ দিচ্ছে। ইমার্জেন্সি বাটনের ভোঁ...ও..ও.. সংকেতের বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে দলের অন্যদের কাছে কেবল তার অঙ্গুলি হেলনই একমাত্র ভরসা, কল্পনাগুলোয় শাবনূর-মৌসুমীর রংঢং কিংবা অ্যাঞ্জেলিনা জোলির অ্যাকশনের চেয়েও বেশি উত্তেজনা দিত তাকে, যদিও তখন আজকের মতো সকলের নয়নের মণি হওয়ার জন্য এমন মরিয়া ছিল না। ভাবনাগুলো ভাবতেই কেবল ভালো লাগত। কিন্তু এখন কেন এমন হয়?

বহুদিন পর্যন্ত হোমায়রা বুঝে উঠতে পারেনি কী করলে সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া যাবে। কত আউলফাউল ভাবনা ভেবেছে সে এ-দিনেও; সিনেমার নায়ক হওয়ার কথা ভেবেছে একবার। একেবারে নাম্বার ওয়ান সাকিব খান! আরেকবার ভেবেছে নেতা হবে; তুখোড় পলিটেশিয়ান! তার বাক-বৈদগ্ধের ক্যারিশ্মায় উপচে পড়ছে ময়দান, ভাবতে ভালো লেগেছিল কিছুদিন, কিন্তু দানা বাঁধেনি ভেতরে। তারপর কেমনে যেন ক্রিকেট খেলার চিন্তাটা মাথায় ঢুকে গেল। এতদিনে মোক্ষম মন্ত্রের সন্ধান পেয়েছে সে! একমাত্র ক্রিকেটই নতজানু করে দিতে পারে সবাইকে। আশরাফুলই আশার ফুল হতে পারে এই দেশে। সব প্রাপ্তি, সব প্রতিষ্ঠা সেখানে। আর কোনও দীর্ঘমেয়াদী বীরত্ব নাই কোথাও।

কবছর আগে পরপর কয়েকটা মেয়ে এভারেস্টের চূড়ায় উঠে হইচই ফেলে দিয়েছিল খুব। তারও আনন্দ হয়েছিল শুনে। সেও তাদের মতো শাদা শাদা কল্পনার বরফ ভেঙে অক্সিজেন মাস্ক ছাড়াই ঠান্ডা পাহাড়চূড়ায় উঠেছে, অ্যাভালাঞ্জের নীচে চাপা পড়েছে, দড়ি ছিঁড়ে শূন্যে ঝুলে থেকেছে ঘন্টার পর ঘন্টা। কিন্তু বেশিদিন চালিয়ে যেতে পারেনি। কয়েক রাত যেতে না যেতেই চোখ বিদ্রোহ করেছে ঘুমাতে। সবার মতো তার ভাবনাও বিস্মৃতির আড়ালে বিলীন হয়ে গেছে দ্রুত। তারও আগে, নিজেকে একবার সানিয়া মির্জার স্থলে কল্পনা করতে চেয়েছিল সে। লন টেনিসের গ্যালারি কাঁপাচ্ছে তার হাতের র‍্যাকেট, বল পেটানোর দমকে মিনিস্কার্ট পরিহিত উরুর উদ্বেলে যেই রোমাঞ্চিত হতে গিয়েছে, মনে পড়ে গেছে মির্জা সাহেবার কথা, যত ভালো খেলুন না কেন, খেলার চেয়ে তার উরুতেই যেন বেশি মজে থাকত দর্শক। নাহ্, আরাম পাওয়া যায়নি না আর। কল্পনার লাগামহীন ঘোড়াটার রাশ টেনে ধরেছিল সে তখন।

তার মধ্যে কি তবে পুরুষালি হরমোনের প্রভাব বেশি? মনে পড়ে, আরিফও একবার এরকম বলেছিল বিয়ের পরপর। একটু আহত হলেও উড়িয়ে দিয়েছিল সে দুষ্টুমির ছলে বলা স্বামীর সন্দেহটাকে। নিজেকে তো সে চেনে। অন্য কোনোকিছুতেই তার এমন পুরুষালি ইচ্ছা হয় না, কখনোই হয়নি। তবে এটা সত্যি; ছোটোবেলা থেকেই একটু ডানপিটে ছিল সে। হরহামেশা গাছে চড়েছে, বাড়ির ছাদে ক্রিকেট খেলেছে, হাডুডু খেলেছে। খেলেছে ব্যাডমিন্টন। ফুটবলও তো খেলেছে! গ্রামে গেলে পুকুরে ঝাঁপাঝাঁপি করেছে, মারামারি করেছে, একবার তো সমবয়সি চাচাতো ভাইয়ের মাথাই ফাটিয়ে দিয়েছিল র‍্যাকেট দিয়ে। তাইলে শুধু ক্রিকেট নিয়ে তার এই অবসেশন কেন? হিরো হিসেবে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্যের জন্য নিশ্চয়ই। তাছাড়া..., তাছাড়া এর মধ্যে অন্যরকম এক পৌরুষের ঝাঁজ পায় সে। অন্তত তার তা-ই মনে হয়। কিংবা এমনও হতে পারে বিদ্ঘুটে সমাজব্যবস্থা অন্য সবার মতো তার উপরও আরোপ করেছে এই পৌরুষ! হিরোবিহীন এই দেশে হিরোর খুব দরকার হয়ে পড়েছিল হয়তো, তাই ভারত-পাকিস্তানের দেখাদেখি ডামি হিরো বানিয়ে নিয়েছে এদেশের মানুষ।

বড় ভাইয়ার ক্রিকেট ব্যাগটার কথা মনে পড়ে হোমায়রার; শাদা রঙের একটা ব্যাগ। পাশাপাশি লম্বা ধরনের ভারী ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে দুপুর শেষ না হতেই বের হয়ে যেত ভাইয়া। সেই ব্যাগে ব্যাট, প্যাড আর তোবড়ানো সুতা-ছেঁড়া লাল রঙের বল ছিল কয়েকটা। এর আগে সে জানতই না বল যে সেলাই করে বানানো যায়! ভীষণ বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল সেটা তার জন্য। ব্যাগটা ধরা তাদের দুইবোনের জন্য নিষেধ ছিল। মারাত্মক নিষেধ! তারপরও তারা বহুবার ব্যাগটা খুলে কাঠফাটা ব্যাটটা, চামড়া-ওঠা প্যাডগুলো আর ফ্যাকাশে লাল বলগুলো দেখত, ধরত। একবার লুকিয়েও রেখেছিল একটা বল। ব্যাগটা কেন তাদের আকর্ষণ করত সেটা সে বহুবার ভাববার চেষ্টা করেছে সে। অনেক পরে; যখন সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে তার অনাগত সন্তানের জন্য অপেক্ষা করছিল তখন কিঞ্চিৎ আবিষ্কার করতে পেরেছে বলে মনে হয়। সেই আবিষ্কারে নিঃসন্দেহ হওয়ার কিছু নাই হয়তো, কিন্তু সম্ভাবনা আছে।
সে দেখেছে ব্যাগটা কাঁধে ঝোলানোমাত্র ভাইয়ার চোখের মণি দুটো বদলে যেত। একটা প্রচ্ছন্ন হলুদ আভা জ্বলজ্বল করত চোখে। এটা বহুবার খেয়াল করেছে হোমায়রা। এক ধরনের বেটাগিরি এসে ভর করত ভাইয়ার উপর তখন। যেন নিঃশব্দে বলত তাদের, 'চাইয়া দ্যাখ আমারে, আমার হেডম আছে যহন খুশি চাইর দেয়ালের বাইরে যাওনের, তোগো নাই। আমার পৌরুষ আমারে এই অধিকার দিছে!'

এটা একটা কারণ হতে পারে। কিংবা কোনও কারণ নাও থাকতে পারে। সে যে এখন, ইদানীং, গত ছয়-সাত বছর ধরে, প্রতিরাতে অথবা বেশিরভাগ রাতে বিশ্বকাপে ছক্কা না মেরে কিংবা কোহলির উইকেট না নিয়ে ঘুমাতে যেতে পারে না এই সত্যকে জাস্টিফাই করার জন্য নিজেকে কোনও কারণ দর্শানোর মানে হয় না। এতে তার ঘুমের আকুতি, মুহুর্মুহু হাততালি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা; কোনোটাই মিথ্যা হয়ে যাবে না।

আজান হচ্ছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আলো ফুটে যাবে। চোখের পাতাও ভারী হয়ে আসতে শুরু করেছে এর মধ্যে। হোমায়রা সরাসরি ফাইনাল খেলায় চলে যায়। একশো চুরান্নবই রান তার। ডাবল সেঞ্চুরি হতে মাত্র ছয় রান লাগবে আর। রবিচন্দন অশ্বিনের আলতো বাঁক খাওয়া স্লো বলটাতে সপাটে ব্যাট চালায় সে। সোজা গ্যালারিতে গিয়ে আছড়ে পড়ে বলটা।

সিক্স!
‘হোমায়রা, হোমায়রা!’

চিৎকারে ফেটে পড়েছে গ্যালারি। একটা বিক্ষুব্ধ সমুদ্র যেন চারদিক থেকে ধেয়ে আসছে তার দিকে। আবেশে চোখদুটো আরেকটু ভারী হয়ে ওঠে তার। বন্ধ চোখের ভেতরে সে একটা বিশাল প্ল্যাকার্ড দেখতে পায়—
'হোমায়রা, প্লিজ! ম্যারি মি!’

হোমায়রা হাসে।

হাসতে হাসতে তলিয়ে যায় ঘুমের মধ্যে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

ধারাবাহিক—এক

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২১, ১৩:৩৭

[১৯৩০-৩৯ সময়পর্বে প্যারিসে বসবাসকালের অভিজ্ঞতা নিয়ে মিলার এই উপন্যাসিকাটি লেখেন। ওঁর ‘ট্রপিক অফ ক্যান্সার’, ‘ব্ল্যাক স্প্রিং’, ‘ট্রপিক অফ ক্যাপ্রিকর্ন’, ‘দ্য রোজি ক্রুসিফিকশন’—ট্রিলজি, এগুলোর মতোই ‘কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি’ও একটি আত্মজৈবনিক আখ্যান। ’৩০-এর দশকের শুরুর দিকের অভিজ্ঞতাই এতে রয়েছে, যে সময়টায় মিলার ‘ব্ল্যাক স্প্রিং’ উপন্যাসটি লিখছিলেন। থাকতেন শহরতলি ক্লিশির একটা ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে বন্ধু আলফ্রেড পার্লেসের সাথে ভাগ করে। লেখক জীবনের এক প্রতিকূল অবস্থার সাথে তখন লড়ছেন মিলার। প্যারিস থেকে নিউ ইয়র্কে ফেরার অল্প কিছুদিন বাদে ১৯৪০-এ লেখেন এই উপন্যাসিকাটি। পরে, ১৯৫৬ সালে বিগ সারে থাকার সময়, যখন তিনি ‘নেক্সাস’-এর ওপর কাজ করছেন, এতে কিছু সংযোজন, পরিমার্জন করেন।
‘কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি’ গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় ফ্রান্সে, অলিম্পিয়া প্রেস থেকে, ১৯৫৬ সালেই। আমেরিকায় মিলারের ‘ট্রপিক অফ ক্যান্সার’-এর ওপর দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে চলা অশ্লীলতার অভিযোগ তথা আইনি নিষেধাজ্ঞা ১৯৬৪-৬৫ নাগাদ উঠে যাবার পর ওঁর অন্যান্য বইয়ের সাথে এই উপন্যাসিকাটিও আমেরিকায় প্রকাশিত হয় ১৯৬৫ সালে। প্রকাশক, গ্রোভ প্রেস।
মিলারের ফোটোগ্রাফার-বন্ধু জর্জ ব্রাসেই ওঁর ‘হেনরি মিলার: দ্য প্যারিস ইয়ার্স’ বইতে জানিয়েছেন যে, মিলারের মতে (‘কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি’র) ‘টাইটল ইজ কমপ্লিটলি মিসলিডিং’।       
উল্লেখ থাকে যে, উপন্যাসিকাটির দুটি অংশ। প্রথমাংশ, ‘কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি’, দ্বিতীয়াংশ ‘মারা ম্যারিগনান’। যদিও, দুটি অংশই মূল গ্রন্থে দু মলাটের ভেতর রয়েছে এবং তাদের মধ্যে স্থান, কাল ও পাত্রের বহুলাংশে সাদৃশ্য থাকলেও, আখ্যানের ক্রমিক পরিণতির দিক থেকে বা কাহিনির ধারাবাহিক বিন্যাসে অংশ দুটিতে প্রত্যক্ষ বা অনিবার্য কোনও যোগ নেই। আমি এখানে শুধু প্রথমাংশটিরই অনুবাদ করেছি।
অনুসন্ধিৎসু পাঠকের জন্য বলা, মিলারের ‘কোয়ায়েট্‌ ডেইজ ইন ক্লিশি’ অবলম্বনে সিনেমা তৈরি হয়েছে দু’বার। প্রথমটি একটি ড্যানিশ প্রোডাকশন, ১৯৭০ সালে। দ্বিতীয়টি ছিল ফরাসি নির্মাণ, ১৯৯০ সালে পরিচালক ক্লদ শাব্রল এটা নিয়ে সিনেমা করেন। ১৯৯১ সালে, আমেরিকার সাহিত্যের ওপর ভিত্তি করে এইচবিও চ্যানেল একটি অ্যান্থলজি সিরিজ করেছিল, তাতে এই উপন্যাসের দ্বিতীয় ভাগ অর্থাৎ ‘মারা ম্যারিগনান’ অবলম্বনে একটি ৩০ মিনিটের শর্ট ফিল্ম তৈরি হয়, যার নাম ছিল ‘মারা’।  
উপন্যাসিকাটিতে ফ্রান্সের একাধিক রাস্তাঘাট, জায়গা, স্থাপত্য নিদর্শন এবং শিল্প ও সাহিত্য-ব্যক্তিত্বের নাম রয়েছে। বাঙালির জিভে তাদের যথাযথ উচ্চারণ কী হবে বা কী হওয়া উচিত তা নিয়ে পণ্ডিতমহলে বিতর্ক চিরকাল থাকবে। আমি একটা স্বাভাবিক ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছি। যা হয়তো বিশুদ্ধ ফরাসি উচ্চারণ নয় তবে তার কাছাকাছি, আবার বাঙালির জিভেও বেমানান নয়।
আরেকটি কথা, যে সমস্ত ফরাসি নাম বা শব্দ এই উপন্যাসে তথা এই অনুবাদে রয়েছে, তাদের সম্পর্কে পরিশিষ্টে সামান্য কিছু পরিচিতি উল্লেখের চেষ্টা করেছি। যাতে আগ্রহী পাঠকের কাছে উপন্যাসে জড়িয়ে থাকা পরিমণ্ডলটির আবহ সাবলীল হয়। সেপ্টেম্বর—অক্টোবর, ২০১৬। —অনুবাদক।] 

এ লেখা যখন লিখছি, রাত নেমে এসেছে। লোকজন সব ডিনারে চলল। সারাটাদিন ছিল ধূসর। প্যারিসে যেমন হামেশাই দেখা যায়। চিন্তায় হাওয়া লাগাতে ব্লকগুলোর আশপাশ দিয়ে হাঁটছি। করতে কিছুই পারছি না, শুধু ভাবছি নিউ ইয়র্ক আর প্যারিস এই শহর দুটোর মধ্যে কী ভীষণ তফাত। সেই একই সময়, একইরকম দিন, এমনকী এই ধূসর শব্দটাও, যা এইসব সঙ্গ থেকেই আসে, সেই গ্রিসাইলের সাথে অল্পই সাযুজ্য তার, একজন ফরাসির কানে যা চিন্তা ও অনুভূতির একটা জগৎ জাগিয়ে তুলতে সক্ষম। অনেক আগে, প্যারিসের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, দোকানের জানলায় রাখা জলরঙের কাজগুলো মন দিয়ে দেখতে দেখতে, আমি সেই জিনিসটার একক অনুপস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলাম যাকে পেইন’জ গ্রে[১] বলে। এটা আমি উল্লেখ করলাম কারণ, সবাই-ই জানে প্যারিস সবিশেষভাবে এমন এক শহর যার নির্দিষ্ট কোনও সংজ্ঞা নেই। উল্লেখ করলাম কারণ, আমেরিকান শিল্পীরা তৈরি করা ফরমায়েসি ধূসরকেই ব্যবহার করে অতিরিক্ত এবং বদ্ধমূলভাবে। ফ্রান্সে এই ধূসরমালা অসীম; এখানে ধূসর তার পরিণাম-লুপ্ত।

ধূসরতার এই বিপুল পৃথিবী নিয়ে ভাবছিলাম যাকে আমি এই প্যারিসেই চিনেছি। কারণ এরকম সময়ে, এমনিই যখন বুলেভার ধরে হেঁটে যাচ্ছিলাম, অধীর আগ্রহে মনে হল ঘরে ফিরে যাই, লিখি, আমার স্বাভাবিক অভ্যেসের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী একটা লেখা। ওখানে আমার সময় ফুরোলে আমি আবার প্রবৃত্তিগতভাবে ঠিক ভিড়ে মিশে যাব। এখানে এই ভিড়, সবরঙের শূন্যতা, সবকিছুর সূক্ষ্ম তারতম্য, সব ভেদ ও স্বাতন্ত্র্য, আমাকে নিয়ে যাবে আমার ভেতরে, ফিরিয়ে নিয়ে যাবে আমার ঘরে, আমার কল্পনার মধ্যে এক নিরুদ্দিষ্ট জীবনের সেই জটিল ও মিশ্র উপাদানগুলোকে খুঁজতে, যখন সেগুলো সংমিশ্রিত ও আত্তীকৃত হয়ে প্রতিপালিত আর সুসংগত অস্তিত্বের সৃষ্টির দিকে হয়তো কী অনিবার্যভাবে পুনরুৎপাদন করছে কোমল ও স্বাভাবিক ধূসরকে। এরকম একটা দিনে, এরকম সময়ে র‌্যু লাফিত্তের[২] যে কোনও জায়গা থেকে সাক্রে কয়্যেরের[৩] দিকে তাকিয়ে দেখাটাই আমাকে স্বপ্নাবেশে নিয়ে যেতে সক্ষম। এমনকী যখন আমি ক্ষুধার্ত কিংবা ঘুমনোরও কোনও জায়গা নেই তখনও আমার ওপরে এই দৃশ্যটার এরকমই প্রভাব চলত। পকেটে আমার হাজার ডলার থাকলেও আমি জানি এমন কোনও দ্রষ্টব্য নেই যা আমার মধ্যে এরকম স্বপ্নাবেশ জাগাতে পারে।

প্যারিসের ধূসর দিনগুলোয় আমি সাধারণত মঁমার্তের[৪] ক্লিশির দিকে হাঁটি।

ক্লিশি থেকে অবারভিলারের[৫] দিকে একের পর এক কাফে, রেস্তোরাঁ, থিয়েটার, সিনেমাহল, কাপড়ের দোকান আর হোটেল। এটা প্যারিসের ব্রডওয়ে যা ৪২নং আর ৫৩নং রাস্তার মাঝখানের অল্প বিস্তৃতিটার দিকে সংযুক্ত হয়েছে।

ব্রডওয়ে সর্বদাই ছুটছে। মাথা ঘুরিয়ে দেয় আর ঝলমলে। বসার কোনও জায়গা নেই। মঁমার্ত আলস্যপরায়ণ, মন্থরগতি, উদাসীন আর গতানুগতিক, খানিকটা বাজেই আর নোংরা, সম্মোহন করার মতো রূপসী সে নয়, ঝকমকে নয় কিন্তু ধুঁইয়ে ধুঁইয়ে ওঠা আগুনে দেদীপ্যমান।

ব্রডওয়ে রোমাঞ্চকর, এমনকী কখনও জাদুকরী, কিন্তু সেখানে আগুন নেই, তাপ নেই কোনও— সে এক ঝকঝকে আলোকিত অ্যাজবেস্টস্‌, বিজ্ঞাপনের প্রতিভূদের স্বর্গ। মঁমার্ত অতি ব্যবহারে জীর্ণ, নিষ্প্রভ, বেওয়ারিশ, ন্যাংটো লম্পট, ভাড়াটে সেনার মতো শুধু টাকার জন্য কাজ করে, অশ্লীল। যদি এমন কিছু থাকে, যা বিরক্তিকর অথচ আকর্ষণীয়, কিন্তু কপট কুটিলতার সাথে বিরক্তিকর, সেরকম আবাধ্য লম্পট সে। খানকতক বার এখানে রয়েছে যা একচেটিয়াভাবে বেশ্যা, দালাল, ঠগ আর জুয়াড়িতে ভর্তি, ওদের হাজারবার নিরস্ত করলেও শেষ অব্দি তোমায় চুষে নেবে আর দাবি করবে ঠকেছে বলে।    

এই বুলেভারের প্রধান বস্তু হল রাস্তার ধারের হোটেলগুলো, যাদের কদর্যতা এতোটাই বদ আর কুটিল যে সেখানে ঢোকার চিন্তামাত্র তুমি কেঁপে উঠবে, তবু এটা অনিবার্য যে এদের মধ্যে কোনও একটায় কোনও-না-কোনও দিন তুমি একটা রাত অন্তত কাটাবে, হয়তো একটা সপ্তাহ বা একটা মাস। এমনকী হয়তো এই জায়গাটার প্রতি আসক্তই হয়ে পড়বে এটা দেখে যে, একদিন তোমার গোটা জীবনের আদলটাই পালটে গেছে এবং একসময় যাকে তুমি হীন, জঘন্য ভেবেছ এখন তাকেই মোহময়, চমৎকার মনে হচ্ছে। বৃহৎ প্রেক্ষিতে, আমার সন্দেহ, মঁমার্তের এই কপট মোহের কারণ প্রকাশ্য ও বেআইনি যৌনব্যবসা।

সেক্স জিনিসটা রোম্যান্টিক নয় বিশেষত যখন তা বিকিকিনির হাটে এসেছে। কিন্তু ছেয়ে থাকা একটা সুগন্ধ সে তৈরি করতে পারে, একটা ঝাঁজালো অতীত-আর্তি। যা দুর্ধর্ষ আলোকিত গে হোয়াইট ওয়ের[৬] চেয়েও অনেক অনেক বেশি রহস্যময় আর সম্মোহনকারী। প্রকৃতপ্রস্তাবে আবছা, অন্ধকারময় আলোতেই যৌনজীবনের শ্রীবৃদ্ধি; আলো-আঁধারির ছায়াতেই এর ঘর, নিওন আলোর ঝলসানি এখানে নয়।

ক্লিশির এক কোণে কাফে ওয়েপলার, যা দীর্ঘদিন ধরে বহুবার যাওয়া আমার অত্যন্ত প্রিয় এক জায়গা। দিনের পুরোটা সময় সমস্তরকম আবহাওয়ায় তার ভেতরে, বাইরে আমি বসেছি। একটা আস্ত বইয়ের মতো আমি একে জানি। ওয়েটার, ম্যানেজার, ক্যাশিয়ার, বেশ্যা, খদ্দের এমনকী বাথরুমে থাকা অ্যাটেন্ডেন্টদের মুখগুলো আমার স্মৃতিতে এমনভাবে খোদাই করা আছে যেন তারা একটা বইয়ের অলঙ্করণ, যে বই আমি রোজ পড়েছি। মনে পড়ে, সেই প্রথম যখন এসেছিলাম কাফে ওয়েপলারে, আমার স্ত্রীর সাথে, ১৯২৮ সেটা; রোয়াকের ওপরে একটা ছোট্ট টেবিলে মাতাল বেহেড হয়ে এক বেশ্যাকে যখন মরে পড়ে যেতে দেখলাম, আর দেখলাম কেউ তাকে ধরার জন্য ছুটেও গেল না, কীরকম প্রবল ধাক্কা খেয়েছিলাম আমি এটা দেখে, মনে পড়ে। ফরাসিদের এই নির্বিকার ঔদাসীন্য হতবাক আর আতঙ্কিত করে দিয়েছিল আমাকে; এখনও করে, ওদের মধ্যে যেসব ভালো গুণ রয়েছে পরবর্তীকালে সেসব জানার পরেও। ‘এ কিছু না, সামান্য একটা বেশ্যা... একটু মাতাল হয়ে পড়েছিল আর কি’। এখনও আমি এই শব্দগুলো শুনতে পাই। আজও তারা আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে যায়। কিন্তু এটাই প্রকৃত ফরাসিয়ানা, এই মনোভাবটা, আর তুমি যদি এটা মেনে নিতে না শেখো, ফ্রান্সে তোমার অবস্থানটা খুব সুখপ্রদ হবে না।  

ধূসর দিনগুলোয়, যখন বড় কাফেগুলো ছাড়া সর্বত্র ঠান্ডায় জমে গেছে, রাতে ডিনারে যাবার আগে কাফে ওয়েপলারে এক-দু ঘণ্টা কাটাবার জন্য আমি উন্মুখ হয়ে থাকতাম। কামোদ্দীপনার এমন সুসময় ভাসিয়ে নিয়ে যেত এই জায়গাটাকে, যা উঠে এসেছে এক ঝাঁক বেশ্যার হাত ধরে, যারা জমায়েত করে থাকত ঢোকার মুখটার কাছে। ধীরে ধীরে তারা খদ্দেরদের কাছে নিজেদের বিলি-বণ্টন করে দিলে, জায়গাটা তখন শুধু কামনায় উষ্ণই হয়ে উঠত না, মিষ্টি একটা সুগন্ধের মাধুর্যে ভরে যেত।

আবছা আলোয় সুগন্ধী জোনাকির মতো তারা ডানা ঝাপটাত। যারা খদ্দের খুঁজে নেবার মতো ভাগ্যবান হত না, রাস্তায় পায়চারি করত অলসভাবে, তারপর সাধারণত আবার ফিরে আসত একটু বাদেই, তাদের পুরনো জায়গায়। গর্বে অন্যদের মুখ তখন ঝকঝক করছে, সন্ধের পালা শুরু করতে তারা প্রস্তুত। যে কোণটায় সাধারণত ওরা জড়ো হত সেটা যেন একটা এক্সচেঞ্জ মার্কেট, এই সেক্স মার্কেটেরও ওঠা-নামা আছে অন্য এক্সচেঞ্জ মার্কেটের মতোই। বর্ষার দিনগুলো সাধারণত এখানে ভালো ব্যবসা-পাতির দিন, আমার চোখে তা-ই মনে হয়েছে। প্রবাদ আছে, একটা বর্ষার দিনে তুমি দুটো কাজই করতে পারো যখন বেশ্যারা কখনও তাস পিটিয়ে সময় নষ্ট করে না।

সেই দিনটাও ছিল বর্ষারই দিন, শেষবিকেলের দিক। কাফে ওয়েপলারে এক নবাগতাকে লক্ষ করলাম। আমি বেরিয়েছিলাম কেনাকাটা করতে, আমার হাত ভর্তি হয়ে আছে বই আর কিছু ফোনোগ্রাফ রেকর্ডে। সেদিন নিশ্চয়ই আমেরিকা থেকে একটা অপ্রত্যাশিত অর্থপ্রাপ্তি ঘটেছিল যার ফলে কেনাকাটা যা করেছি তারপরেও কয়েকশো ফ্রাঙ্ক তখনও আমার পকেটে। আমি বসে আছি ওই এক্সচেঞ্জের জায়গাটায়, ক্ষুধাময় এক মহিলামহল পরিবেষ্টিত হয়ে; ক্রমাগত খুঁচিয়ে যাওয়া বেশ্যার দল আর যা কিছু আমার সামনে দিয়ে যাচ্ছে সেসবে আমার কোনও প্রতিবন্ধকতাই হচ্ছিল না, কারণ আমার চোখ তখন একনজরে তাক করে আছে মোহসঞ্চারী ওই নবাগতা সুন্দরীর দিকে, যে অনেকটা তফাতে কাফের দূরবর্তী কোণে বসে আছে। তাকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় সুন্দরী এক যুবতি বলেই মনে হল যে তার প্রেমিকের সাথে দেখা করবে বলে এসেছে এবং নির্ধারিত সময়ের অনেকটা আগেই চলে এসেছে। যে মদটা মেয়েটা অর্ডার করেছিল নামমাত্রই ছুঁয়েছে সেটা। তার টেবিলের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া পুরুষদের দিকে সে পূর্ণ এবং স্থির দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, কিন্তু তা থেকে কিছুই বোঝা যায় না— ব্রিটিশ বা আমেরিকান মহিলাদের মতো একজন ফরাসি মহিলা কখনওই তার দৃষ্টি সরিয়ে নেয় না। নিরুদ্বিগ্ন স্থির চোখে তাকিয়ে সে চারপাশ মাপছে, কিন্তু দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কোনও স্পষ্ট প্রয়াস তাতে নেই। সে ছিল নিঃশব্দ পদসঞ্চারী এবং সম্ভ্রম উদ্রেককারী, আগাগোড়া স্থিতিসাম্যে টান টান আর নিজেকে ধরে রাখা একজন।

সে অপেক্ষা করছিল। আমিও অপেক্ষা করছিলাম। আমি উৎসুক ছিলাম দেখতে যে সে কার অপেক্ষায় বসে আছে।

আধঘণ্টা পর, যে সময়টায় আমি বেশ ক’বার তার চোখাচোখি হলাম এবং ধরে ফেললাম, এ মেয়ে অপেক্ষা করছে যেকোনও কারুর জন্যেই, যে সঙ্গত আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবটা করবে। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত মাথা বা হাত নেড়ে ইশারাটুকুই করতে হয় যাতে মেয়েটি তার টেবিল ছেড়ে উঠে আসবে এবং তোমার সাথে যোগ দেবে— যদি সে ঠিক সেই ধরনের মেয়ে হয়। কিন্তু তখনও আমি একেবারে নিশ্চিত হতে পারিনি। আমার চোখে তো সে দেখতে খুবই সুন্দর, সুপুষ্ট, উথলে ওঠা যাকে বলে— মানে বলতে চাইছি যত্নে লালিত আরকি।  

যখন ওয়েটার আরেকবার রাউন্ডে এল আমি মেয়েটিকে দেখিয়ে ওকে জিগ্যেস করলাম যে চেনে কিনা। ওয়েটার যখন বলল ‘না’, আমি বললাম ওকে এখানে আসতে বলো, আমার সাথে জয়েন করুক। আমি মন দিয়ে ওর মুখ লক্ষ করছিলাম যখন ওয়েটার ওকে মেসেজটা দিচ্ছিল। ওর মুখে হাসি এবং আমার দিকে তাকিয়ে অল্প মাথা নাড়ানোটা দেখে আমার যেন একটা রোমাঞ্চ দিয়ে গেল। আমি আশা করেছিলাম যে ও জলদি উঠে পড়বে এবং এদিকে চলে আসবে, কিন্তু তার বদলে বসেই রইল এবং আবার হাসল, এবারে আরও মৃদু, আর সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা ঘুরিয়ে জানলা দিয়ে একদৃষ্টে স্বপ্নমাখা চোখে তাকিয়ে রইল। মাঝখানে ঢুকে পড়তে আমি একটু সময় দিলাম এবং দেখলাম নড়াচড়ার কোনও লক্ষণই তার নেই, এবারে আমি উঠে দাঁড়ালাম, সোজা হেঁটে গেলাম ওর টেবিলের দিকে। যথেষ্ট আন্তরিকভাবেই সে আমায় স্বাগত জানাল, যেন বাস্তবিকই আমি তার বন্ধু, কিন্তু আমি লক্ষ করলাম ও যেন একটু আচ্ছন্ন হয়ে আছে নেশায়, প্রায় অপ্রস্তুত। আমাকে বসতে দিতে চায় কি চায় না ঠিক নিশ্চিত ছিলাম না আমি, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি বসে পড়লাম এবং ড্রিঙ্ক অর্ডার করে চট করে ওর সাথে কথা বলতে শুরু করে দিলাম। (চলবে)

পরিশিষ্ট
১. পেইন’জ গ্রে (Payne’s grey) : নীল, লাল, কালো এবং শাদা রঞ্জকে তৈরি একটি কম্পোজিট পিগমেন্ট। বিশেষত জলরঙের ছবিতে ব্যবহার করা হয়। ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশ শিল্পী উইলিয়াম পেইনের নামানুসারে এই নাম।
২. র‌্যু লাফিত্তে (Rue Laffitte) : প্যারিসের একটি রাস্তা। বর্তমানে এর বিস্তৃতি বুলেভার্দ দে ইতালিয়েনস থেকে র‌্যু নত্‌রদাম দে লরেত্তে অবধি। এই রাস্তাটার একেবারে শুরুর মুখে, অর্থাৎ বুলেভার্দ দে ইতালিয়েনসের জংশন থেকে সাক্রে কয়্যেরকে দেখে মনে হয় নত্‌রদাম গির্জার শৃঙ্গভাগে দাঁড়িয়ে আছে।   
৩. সাক্রে কয়্যের (Sacré Coeur) : ১৯১৪ সালে নির্মিত প্যারিসের রোমান ক্যাথলিক চার্চ। ইংরিজিতে পুরো নাম, ব্যাসিলিকা অফ দ্য সেক্রেড হার্ট অফ প্যারিস। ১৮৭১ সালের ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধে ফরাসিদের পরাজয় এবং ওই বছরই সমাজতান্ত্রিক পারি কম্যিউনের জাতীয় স্মৃতিতে শহরের সবচেয়ে উচ্চবিন্দুতে মঁমার্তের শৃঙ্গভাগে রোমান-বাইজেন্টাইন স্থাপত্যরীতির এই চার্চ। ফরাসি রক্ষণশীলতার নৈতিক ভাষ্যের মূর্ত প্রকাশ বলে একে ধরা হয়। এর গম্বুজের চূড়া থেকে প্রায় গোটা প্যারিস শহরটাকে দেখা যায়। 
৪. মঁমার্ত : ফরাসি উচ্চারণে মঁমার্ত্র (Montmartre)। এটা প্যারিসের অষ্টাদশ প্রশাসনিক শাখার অন্তর্গত এক পাহাড়ি টিলা। এর চূড়াভাগে থাকা শ্বেত-গম্বুজওয়ালা সাক্রে কয়্যের গির্জা আর গোটা এলাকা জুড়ে ছড়ানো নৈশ কাফেগুলির জন্যে অধিক পরিচিত মঁমার্ত। দালি, পিকাসো, ভ্যান গঘ প্রমুখ বহু শিল্পী বিশ শতকের শুরু থেকে এখানে এসেছেন, থেকেছেন দীর্ঘকাল, তাঁদের কাজ করেছেন।
৫. অবারভিলে (Aubervillers) : প্যারিসের উত্তর-পূর্বের শহরতলিতে অবস্থিত একটি ফরাসি কম্যিউন।    
৬. গে হোয়াইট ওয়ে : ১৯০২ সাল থেকে নিউইয়র্কের ব্রডওয়েকে ‘গ্রেট হোয়াইট ওয়ে’ বলা হয়। মিউজিকাল গে হোয়াইট ওয়ে ১৯০৭-এর অক্টোবরে ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ক্যাসিনো থিয়েটারে চালু হলে, ‘গ্রেট হোয়াইট ওয়ে’র বদলে নাট্যশহর ব্রডওয়েকে সাধারণত ‘গে হোয়াইট ওয়ে’ নামেই ডাকা হত এর ডাকনাম হিসেবে। বিশ শতকের পঞ্চাশ এবং ষাটের দশক থেকে ‘গে’ শব্দটি ‘সমকামী’ অর্থে ব্যবহৃত হয়। আবার ওই সময় থেকেই টেলিভিশনের দর্শক বাড়ার সাথে সাথে আমেরিকার সংস্কৃতির ওপর ব্রডওয়ে মিউজিকালের বিপুল প্রভাব ও জনপ্রিয়তাও কমতে শুরু করে। এখন ‘গে হোয়াইট ওয়ে’ কথাটি কদাচিৎ ব্যবহৃত হতে দেখা যায়, যদি বা হয়, তাহলে ‘গে’ শব্দের সমকামী ব্যবহারকেই এতে উল্লেখ করা হয়।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২১, ০০:০০

এল্ রেতিরো খামারবাড়ি

উঠোনে গুটিহীন শতরঞ্জ খেলে
সময়। গাছের একটি ডালের ক্যাঁচক্যাঁচ 
শব্দ ছিন্ন করে রাতকে। প্রান্তর যদি হত 
ধূলোর লীগ আর পোড়ো স্বপ্ন। 
দুই ছায়া, আমরা অনুলিপি করি যা উচ্চারণ করে
অপর ছায়ারা: হেরাক্লাইটাস্ ও গৌতম।  

(রোসা প্রোফুন্দা, ১৯৭৫; কাব্যগ্রন্থ থেকে)


বৃষ্টি

আচমকা সন্ধ্যা হল সারা
কেননা এখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি
ঝরছে বা ঝরছিল। একটা কিছু এই বৃষ্টি
নিঃসন্দেহে যা ঘটে অতীতে।

যে শোনে এই বৃষ্টির শব্দ তার মনে পড়ে 
সেই সময় যখন সুপ্রসন্ন নিয়তি
তাকে ফিরিয়ে এনেছিল এক ফুলের কাছে যার নাম গোলাপ
আর বিহ্বল-করা লালিমার লাল। 

এই বৃষ্টি যা ঢেকে দেয় জানালার শার্সিকে
বিভা ছড়াবে হারিয়ে যাওয়া শহরতলিতে
আঙুরগাছের কালো আঙুর কোনো এক

উঠোনজুড়ে যা আর নেই আজ। বৃষ্টিভেজা 
সন্ধ্যা আমাকে এনে দেয় স্বর, প্রিয় আকাঙ্ক্ষিত স্বর,
আমার বাবার, যিনি ফিরেছেন এবং মারা যাননি। 

(এল আসেদোর, ১৯৬০; প্যারাবল্ ও কবিতার গ্রন্থ থেকে)


হেরাক্লাইটাস্

দ্বিতীয় গোধূলি।
ঘুমে ঢলে পড়া রাত। 
শোধন আর বিস্মৃতি। 
প্রথম গোধূলি।
সকাল যা ছিল প্রভাত।
বহুল দিন যা হবে ক্লান্ত বিকেল।
দ্বিতীয় গোধূলি।
সময়ের অন্য স্বভাব, রাত।
শোধন আর বিস্মৃতি। 
প্রথম গোধূলি...
চোরা প্রভাত, আর প্রভাতে
গ্রীকের আশঙ্কা।
কী জাল এটা
ভবিষ্যত, বর্তমান আর অতীতের?
কী নদী এটা
যা দিয়ে বয়ে যায় গঙ্গা?
কী নদী এটা যার উৎসটা অচিন্তনীয়?
কী নদী এটা
যা বয়ে নেয় পুরাণ আর তলোয়ার?
তার কাছে ঘুমিয়ে থাকা নিরর্থক। 
দৌড়ায় ঘুমে, মরুভূমিতে, ভূভাণ্ডারে।
নদী আমাকে ধারণ করে এবং আমি ওই নদী।
এক সস্তা সারবস্তু, রহস্যময় সময় দিয়ে তৈরি আমি।
হয়তো উৎসটা আমার মাঝে। 
হয়তো আমার ছায়া থেকে 
উদ্ভুত, সর্বনাশা ও অলীক, দিনগুলি। 

(এলোহিয়ো দে লা সোমব্রা, ১৯৬৯; কাব্যগ্রন্থ থেকে)
 

/জেডেএস/

সম্পর্কিত

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

বোকা দুপুরের নাম

বোকা দুপুরের নাম

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২১, ২৩:১৩

[তৌহিন হাসানের প্রথম উপন্যাস ‘উড়ালপঙ্খী’ বইমেলা ২০২১-এ পেন্সিল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বইটি পড়ার ইচ্ছে হয়েছিল প্রচ্ছদ দেখে। নিজের দেশ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মাইল দূরে বসে স্পর্শ করে, দেখেশুনে বই কেনার সুযোগ কোথায়! কিন্তু ‘উড়ালপঙ্খী’ আমাকে একবিন্দুও নিরাশ করেনি। সহজ, সাবলীল গদ্যশৈলীর সাথে কাব্যময়তার পাশাপাশি ভালো লেগেছে উপন্যাসের বুনন। এক্ষেত্রে লেখকের স্বাতন্ত্র্যের ছাপ সুস্পষ্ট। কোনো টাইমলাইন বা ক্রনোলোজি না মেনে একেবারে ভিন্ন আঙ্গিকে ঘটনাগুলোকে উপস্থাপন করেছেন। মূল চরিত্র পঙ্খীর জীবনের নানা ঘটনাকে ঘিরেই পুরো কাহিনি আবর্তিত হয়েছে।
একটা গল্প বা উপন্যাস পড়ার পর সেটা নিয়ে স্বয়ং লেখকের সাথে কথা বলা বা মত বিনিময়ের সুযোগ পাওয়াটা এক অনন্যসাধারণ অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার কথাই তুলে ধরা হয়েছে।]


প্রশ্ন : এটি আপনার প্রথম উপন্যাস। কবে, কখন এই উপন্যাস লেখার ভাবনা মাথায় এলো?
উত্তর : ‘উড়ালপঙ্খী’ আমার প্রথম উপন্যাস। এটি লেখার পরিকল্পনা প্রথম মাথায় আসে আজ থেকে পাঁচ-ছয় বছর আগে। গল্পের কাঠামোটা তখনই ভেবে রেখেছি। কিন্তু লেখা শুরু করেছি অনেক দেরিতে, ২০২০ সালের নভেম্বরে।

প্রশ্ন : উপন্যাসের বিষয়বস্তু গতানুগতিকতার বাইরে এবং বেশ অপ্রচলিত। মনস্তত্ত্ব জটিল একটা বিষয়। প্রেম, বিরহ এসব নিয়ে না লিখে এই কনসেপ্টটাই কেন বেছে নিলেন?
উত্তর : আসলে গতানুগতিকতার বাইরে কি না জানি না! আমার ভেতর থেকে যেভাবে এসেছে, যেভাবে স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেছি, সেভাবেই লিখে গেছি৷ আর উপন্যাসের ঘটনা বা চরিত্রগুলো যে কল্পনাপ্রসূত তা-ও কিন্তু না! এই চরিত্রগুলোকে আমি বাস্তব জীবনে বিভিন্নভাবে দেখেছি, জেনেছি, বিশ্লেষণ করেছি। চেনা চৌহদ্দির মধ্যে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা থেকে তুলে এনে উপন্যাসে সন্নিবেশ করেছি৷

প্রশ্ন : বইটির প্রচ্ছদ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার ভাবনা শুনতে চাই।
উত্তর : আমি যেহেতু প্রফেশনালি বইয়ের প্রচ্ছদ করি, নিজের বইয়ের প্রচ্ছদ করাটা আমার জন্য বেশ কঠিন। একটা দ্বিধা কাজ করে। উপন্যাস লেখার মাঝামাঝি সময়ে এসে প্রচ্ছদে ছবি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেই৷ যেহেতু মূল চরিত্রের আবেগটাকে আমি খুব ভালো করে জানি, তার চেহারার নির্লিপ্ততাকে প্রচ্ছদে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি। বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী অনেকেই বলেছে কাভারে কেন একটা মেয়ের মুখ! প্রচ্ছদ তো এবস্ট্রাকট হয়, তাতে নানা রকমের আর্টিস্টিক মোটিফ থাকে! কিন্তু আমার মনে হয়েছে একজন পাঠক যখন বইটা পড়ে মূল চরিত্রটাকে অনুধাবন করবে তখন বুঝতে পারবে কেন এই প্রচ্ছদ ব্যবহার করেছি। বই না পড়ে আগে থেকে সেটা বোঝা যাবে না।
একজন পাঠক হিসেবে আমারও কিন্তু একই অনুভূতি হয়েছে৷ ‘উড়ালপঙ্খী’ পড়ে শেষ করার পর প্রচ্ছদের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছে এই বইয়ের এরচেয়ে উত্তম প্রচ্ছদ আর হতে পারে না!

প্রশ্ন : পঙ্খী প্রথা ভাঙায় বিশ্বাসী। সমাজ-সংসারের প্রচলিত নিয়মগুলো তাকে বেঁধে রাখতে পারেনি। সে জায়গা থেকে ‘উড়ালপঙ্খী’ নামটা আমার কাছে যথার্থ মনে হয়েছে। আপনারও কি নামকরণের ক্ষেত্রে এরকম ভাবনা ছিল?
উত্তর : নামকরণের ক্ষেত্রে আমার ভাবনাটা খুবই সরল ছিল। যেহেতু মেয়েটার নাম উড়ালপঙ্খী, নামটা তার বাবার দেওয়া এবং গল্পটা তাকে ঘিরেই, তাই উপন্যাসের নামও উড়ালপঙ্খী। তাছাড়া সে সব সময় মুক্ত থাকতে চাইত, কারো কথা শুনত না। সামাজিক বিধিনিষেধ মানেনি। নিজের যেটা ভালো লাগে তাই করে। এসব কারণেই উড়ালপঙ্খী নামটা বেছে নেওয়া।

প্রশ্ন : উপন্যাসের বুনন সম্পর্কে কিছু বলুন।
উত্তর : ব্যক্তিগত জীবনে আমি প্রচুর কথা বলতে পছন্দ করি। একটা বিষয়ে কথা বলার মাঝখানে বিভিন্ন উদাহরণ, সাবক্যাটাগরি, ক্রস-রেফারেন্স চলে আসে৷ এটা আমার কথা বলার ধরন বা অভ্যাস। লেখার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে৷ উপন্যাসের সংজ্ঞা এখনও আমার কাছে দুর্বোধ্য। ঔপন্যাসিক, কবি, সাহিত্যিক—এই শব্দগুলো পছন্দ করি না। নিজেকে স্টোরি টেলার ভাবতে ভালোবাসি। আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই৷ গল্পের তো শাখা থাকে, ঘটনা একটা হতে পারে কিন্তু তাকে বর্ণনা করার সময় অনেক ডালপালার বিস্তার হয়। পঙ্খীর গল্পটা বলার সময় টুকরো টুকরোভাবে নানা গল্প প্রাসংঙ্গিকভাবেই চারপাশ থেকে চলে এসেছে। হয়তো অন্যভাবে বলতে পারতাম! কিন্তু আমার কাছে যেভাবে কমফোর্টেবল মনে হয়েছে, আমি সেভাবেই বলে গেছি। 

প্রশ্ন : কতদিনে উপন্যাসটা শেষ করেছেন? নির্মাণের  সময়ের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা শুনতে চাই।
উত্তর : খুব অল্প সময়ের মধ্যে শেষ করতে হয়েছে, প্রায় আড়াই মাসের মতো। যেহেতু পাঁচ বছর ধরে গল্পটা মাথায় ছিল অনেকটা প্রি-প্রোডাকশনের মতো, তাই লেখার সময় খুব একটা ভাবতে হয়নি৷ পার্শ্বচরিত্র, বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা আগে থেকেই মাথায় ছিল। ব্যাপারটা আসলে অনেকটা রান্না করার মতো! উপকরণগুলো আগে থেকে প্রস্তুত থাকলে রান্নায় বেশি সময় লাগে না।
আর অভিজ্ঞতা বলতে যেটা হয়েছে কখনো একটানা লিখতে পারিনি। আবার লেখার নির্দিষ্ট কোনো সময়ও ছিল না৷ রাত-দিন এক হয়ে গিয়েছিল। জীবনযাপনে একটু ব্যাঘাত হয়েছে৷ খানিকটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল সবকিছু।

প্রশ্ন : পড়া শেষ হবার পরেও একটা অদ্ভুত বিষণ্নতা আর ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম। পঙ্খীর মনোজগতের যে টানাপড়েন, তার জীবন পরিক্রমায় যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে—আমার মনে হয়েছে এর মাধ্যমে পাঠকের মনে প্রভাব বিস্তার করতে চান। এটা কী সচেতনভাবে করেছেন নাকি অবচেতনে ঘটেছে?
উত্তর : শুধু আমার ক্ষেত্রে না, যেকোনো লেখকের ক্ষেত্রেই এটা সত্য যে তারা সচেতনভাবে পাঠকের মনে প্রভাব বিস্তার করতে  চান না। আমি শুধু আমার  মতো করে নিজের ভাষায় একটা চরিত্র সম্পর্কে লিখে যেতে চেয়েছিলাম। পাঠকের মনোজগতে এর কী প্রভাব পড়বে সেটা পাঠকের মস্তিষ্কপ্রসূত। একজন পাঠক কিভাবে পঙ্খীকে গ্রহণ করেছে সেটা একান্তই তার ব্যাপার। অনেক পাঠক হয়তো বিষণ্ন চরিত্রই পছন্দ করেন না। আবার অনেকেই পঙ্খীর জীবনের বিভিন্ন ঘটনার সাথে নিজের মিল খুঁজে পাবেন। 
 
প্রশ্ন : আজকাল যেটা দেখা যাচ্ছে অনেক লেখকই উপন্যাস প্রকাশের আগে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে সেটা লিখছেন যা পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশ হচ্ছে। লেখার সময় কোনো চরিত্রকে রাখবেন, কার কি পরিণতি হবে সেটা পাঠকদেরই জিজ্ঞেস করছেন। এটা কেন হচ্ছে?
উত্তর : মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভাব বিনিময় করা। লেখক, কবি, সাহিত্যিকরা যেকোনো শিল্প-মাধ্যমের দ্বারা নিজের দর্শন প্রকাশ করেন। শিল্প তো চর্চার ব্যাপার। চিন্তা ও চর্চা—এই দুটোর সমন্বয়ে শিল্পের বিকাশ ঘটে। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়টা খুব অস্থির। এখন ভাব বিনিময়ের অসংখ্য মাধ্যম। সব সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় প্র‍্যাকটিসটা পাল্টে গেছে। যার ফলে ভাব প্রকাশ করতে গিয়ে লেখকরা হোঁচট খাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে তখন পাঠকের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। অনেকে দেখা যাচ্ছে প্রচ্ছদ আপলোড করছেন তিনটা। পাঠককে বাছাই করার অপশন দেওয়া হচ্ছে। এটা খুবই আশঙ্কার বিষয়। এটা কারোর দোষ না, শুধুই চর্চার অভাব।

প্রশ্ন : তিমির একজন বিপ্লবী হতে চেয়েছিল, কর্পোরেট কালচারের অংশ হতে চায়নি। ছাত্রজীবনে তাকে দেখা গেছে যথেষ্ট দায়িত্বহীন। আবার পঙ্খীর স্বামী হিসেবে সে যথেষ্ট দায়িত্বশীল ছিল। এই চরিত্র নিয়ে আপনার ভাবনা শুনতে চাই।
উত্তর : বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা ক্লাসে ৪০-৪৫ জন ছাত্রের মধ্যে কেউ থাকে বিপ্লবী, কেউ খুব সিরিয়াস, কেউ কবি অথবা শিল্পী, আবার দু-চারজন থাকে খুব বোকাসোকা যাদের নিয়ে সবাই স্যাটায়ার করে। আজকাল কোনো সামাজিক সমস্যা হলে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী টিএসসিতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। তিমির তাদেরই একজন, কোনো কল্পিত চরিত্র না। সে অন্যায় সহ্য করতে পারত না। বামপন্থি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। ছাত্রজীবনে তিমির প্রেমবন্ধন এসবে আস্থা রাখত না। কিন্তু একটা সময় হোঁচট খায়। সামাজিক, অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে তার ভাবনায় পরিবর্তন আসে। তখন পঙ্খীকে বিয়ে করে সংসারী হয়। এমনকি কর্পোরেট কালচারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। একটা প্রাইভেট ফার্মের জন্য বিজ্ঞাপন লেখা শুরু করে। তিমির আসলে বাইরের কেউ না, আমাদের সমাজেরই একজন।

প্রশ্ন : ‘উড়ালপঙ্খী’ পড়ে মনে হয়েছে জেনেটিক সায়েন্স, সাইকোলজি, নারীদের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারগুলো সম্পর্কে আপনার বেশ ভালো দখল আছে। এই বিষয়গুলোতে কী আগে থেকেই আগ্রহ ছিল?
উত্তর : এই বিষয়গুলোতে আমার আলাদা আগ্রহ ছিল। বিভিন্ন বিষয়ে আমার পড়াশোনা শুরু হয় ক্লাস নাইন থেকে। তখন প্রথম মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে পড়া শুরু করি। সে সময় নিজে টেলিস্কোপ বানাই। ধর্ম সম্পর্কে বিভিন্ন বই, জেনেটিক সায়েন্স ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ জাগে। এরপর ধীরে ধীরে পরিচিত হই সিগমন ফ্রয়েড, সিমন দ্য বোভোয়ারের সাথে।
আমি তখন সরকারি স্কুলের ছাত্র। প্রাইভেটে ইংরেজি পড়তাম অঞ্জন ভদ্র নামে পাশের স্কুলের একজন শিক্ষকের কাছে। পড়া শেষে স্যার আধা ঘণ্টার একটা বাড়তি ক্লাস নিতেন অন্যান্য বিষয়ে। এর সাথে সিলেবাসের পড়ার কোনো সম্পর্ক ছিল না। আমি জানার আগ্রহ থেকে সেই ক্লাসে থাকতাম। এরিস্টটল, জ্যোতির্বিজ্ঞান, শারীরতত্ত্ব, জেনেটিক সায়েন্স, মনস্তত্ত্ব, রবীন্দ্রনাথ, লালনসহ বিভিন্ন বিষয়ে স্যার কথা বলতেন যার আশিভাগই বুঝতাম না। স্যার বলতেন—শুধু শুনে যাও, কোনো প্রশ্ন করবে না। এখন না বুঝলেও আজ থেকে ১০ বছর পরে আমার কথাগুলো ঠিকই বুঝবে। যারা বুঝতে পারবে তারা কেউ লেখক হবে, কেউ-বা দার্শনিক'। তখন এসব বিষয় নিয়ে বেশি বেশি পড়া শুরু করি। এই বাড়তি  জানার আগ্রহের কারণে আমার পড়াশোনায় কোনো ক্ষতি হয়নি বরং সব সময় ভালো রেজাল্ট করেছি। আর ১০ বছর পর স্যারের কথাগুলোর মানেও আমি ঠিকই বুঝতে পেরেছি।

প্রশ্ন : ‘উড়ালপঙ্খী’কে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন? যে ভাবনাটা আপনার মাথায় ছিল কাগজে-কলমে কী সেটাকে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন?
উত্তর : আমার বিশ্বাস নিজের ভাবনাটাকে কাগজে-কলমে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি। এ বিষয়ে আমার আত্মতৃপ্তি আছে। কোনো আক্ষেপ নেই। যদিও অনেকে বলেন লেখকের আত্মতৃপ্তি বলে কিছু নেই। কিন্তু এই উপন্যাসের ক্ষেত্রে আমার মনে হয় আমি সব ঘটনা এবং চরিত্রকে ভাবনা অনুযায়ী ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি।
আর নিজস্ব মূল্যায়নের কথা যদি বলি তবে বলব এখানে পাঠকরা নিজের আশপাশের নানা ঘটনাকেই খুঁজে পাবেন। চিরচেনা সমাজের বিভিন্ন বিষয়, জেনেটিক্স, মনোজাগতিক টানাপড়েন, সোশ্যাল ট্যাবুসহ নানা ঘটনা এখানে উঠে এসেছে। অনেক চরিত্রের সাথে পাঠকরা নিজেদের রিলেট করতে পারবেন। আমার বিশ্বাস অনেক পাঠক নিজেকে তিমির ভাববেন। তিমিরের মতো চরিত্র বা সিকদার চাচার মতো যৌন নির্যাতকরা আমাদের সমাজে বাস করে। আবার অনেক মেয়ের জীবনের অভিজ্ঞতা হয়তো পঙ্খীর সাথে মিলে যাবে। হিন্দু-মুসলিম বিয়ে কিংবা হুট করে বিয়ে করে ফেলা—এসব ঘটনাও তো আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে!

প্রশ্ন : শেষটা হয়েছে একটা ধোঁয়াশার মাঝে। এমন একটা সমাপ্তিই কী চেয়েছিলেন?
উত্তর : হ্যাঁ, এমন একটা সমাপ্তিই চেয়েছিলাম। এমন বেশকিছু ঘটনা আমার চেনাজগতেই ঘটে গেছে। আমাদের সমাজে বহুগামিতা বেড়েছে—এটা একটা বড় সামাজিক সংকট। আমি সচেতনভাবেই উপন্যাসের শেষে তিমির এবং ফরহাদকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছি। শেষটা হয়েছে ক্লিফহ্যাঙ্গারের মতো যা পাঠককে অপেক্ষায় রাখবে। এর আরেকটা কারণ হচ্ছে আগামীতে ‘উড়ালপঙ্খী'র পরবর্তী খণ্ড আসবে।
 
[একজন পাঠক হিসেবে পরবর্তী খণ্ডটি পড়ার জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করব। ‘উড়ালপঙ্খী’ আমাকে এক বিষণ্ণ-সুন্দর অনুভূতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। পড়া শেষ হবার বহুদিন পরও এর রেশটুকু মনে থেকে গেছে। 'রামের সুমতি', 'পরিনীতা', 'পথের পাঁচালী' কিংবা 'পুঁইমাচা'—এসব গল্প-উপন্যাস পড়ে যেমন মনে হয়েছিল যতবার পড়ব ততবারই চোখ ভিজে যাবে, ‘উড়ালপঙ্খী’ও একইভাবে আমার মন ছুঁয়ে গেছে। একজন শক্তিশালী লেখকই কেবল পারেন পাঠককে এই অনুভূতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে।
মনস্তাত্ত্বিক ঘরানার উপন্যাস ‘উড়ালপঙ্খী’ সমকালীন বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারে একটি চমৎকার সংযোজন। যারা গতানুগতিকতার বাইরে ভিন্ন স্বাদের কিছু পড়তে চান তাদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে সুখপাঠ্য হবে। পঙ্খীর জীবনের অন্ধকার চোরাগলিগুলোতে ভ্রমণ করতে করতে পাঠকের মনে সমাজের ভয়ানক কিছু অসঙ্গতির চিত্র ফুটে উঠবে। শিশু-কিশোরদের যৌন নির্যাতন, ভিক্টিম ব্লেমিং, স্টেরিওটাইপস, ট্যাবু, পুঁজিবাদসহ নানা রকমের সামাজিক সমস্যা সচেতন পাঠকমাত্রের মনে ভাবনার উদ্রেক করবে। আমাদের সমাজে 'সিকদার' রূপী মামা, চাচা, ভাই অনেক মেয়েরই থাকে। অথচ নির্ভয়ে এসব বলার মতো জায়গা থাকে না বলেই পঙ্খীদের জীবন এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন! 'আলোয় আলোয় মুক্তি' চেয়েও পঙ্খীরা অন্ধগলিতে হারিয়ে যায় বারবার। পঙ্খীর মনোজগতের সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। একজন মানু্ষের জীবনের ভিত তৈরিতে তার শৈশব এবং কৈশোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা অপরিসীম।
তিমির চরিত্রটি আমাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেছে। তিমিরের বয়ানে জীবন ও সমাজ নিয়ে যেসব ভাবনা ও দর্শন লেখক তুলে ধরেছেন তার বেশিরভাগের সাথেই একাত্ব হতে পেরেছি। খুব মন খারাপ হয়েছে, কিছুটা রাগও—যখন তিমির আর পঙ্খীর পথ আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু এটাও মনে হয়েছে এমনটা না করলে হয়তো একটা গতানুগতিক সমাপ্তিই ঘটত।
প্রাঞ্জল বর্ণনায় প্রতিটি চরিত্র চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। জেনেটিক সায়েন্স, সাইকোলজির পাশাপাশি মেয়েদের মনোজগৎ সম্পর্কে লেখকের জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটেছে পুরো উপন্যাসজুড়ে। পঙ্খী স্রোতের বিপরীতে চলা এক অসীম সাহসী তরুণী। সে চেয়েছিল কন্যা মুক্তি অপরিসীমার জন্য চার দেয়ালের ভেতরে একটা আলোকময় জগৎ গড়ে তুলতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কতটুকু পেরেছিল! সেটা খোঁজার দায়টুকু আগ্রহী পাঠকদেরই থাকুক!—শা. মি.]

/জেডেএস/

সম্পর্কিত

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১২:৫১

মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬-২০১৬) লেখক পরিবার থেকেই এসেছিলেন। পিতৃমাতৃ—দুকূলই লেখক ছিলেন। এমনকি শ্বশুরকূলও। পুরুষানুক্রমেই এঁরা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মহাশ্বেতা দেবীর জীবনটা সাহিত্যের কাছেই সঁপে দিয়েছিলেন। লিখেছিলেন দুহাত খুলে। ‘হাজার চুরাশির মা’ (১৯৭৪) তার অন্যতম আলোচিত উপন্যাস। গ্রন্থখানির পাঠপরিক্রমায় কিছুটা সাবধানী মনে এগুতে হয়। মাঝেমধ্যেই নিত্যনতুন চরিত্রের দেখাসাক্ষাৎ ঘটে। সিংহভাগ চরিত্রই দিব্যনাথ-সুজাতা পরিবারের। উপন্যাসখানি বুঝে নিতে চাইলে এদের মধ্যকার পারষ্পারিক সম্পর্ক স্মরণে রাখা খুবই জরুরি। পরিবারটি অনেকটা উনিশ শতকের ক্লাব-কালচারের ন্যায় সামন্তধারায় গড়ে ওঠে। ভোগবাদী প্রবৃত্তি এদের মধ্যে তীব্রতর। দিব্যনাথের নিজস্ব ‘চার্টার্ড অ্যাকাউনটেনসির আফিস।’ প্রতিনিয়ত মোটা টাকা আসে। জ্যোতি, নীপা অথবা তুলির স্বামীরাও কর্পোরেট কর্পোরেশনে হাই সেলারির জব করে। সবাই ভোগবিলাসে মত্ত। এদের চারিত্রিক স্খলনও কম নয়। অফিসের টাইপিস্ট মেয়েকে নিয়ে দিব্যনাথের ঢলাঢলি, মাঝেমধ্যেই রক্ষিতা নিয়ে বাইরে সান্ধ্য কাটানো। ঢেকেঢুকে নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে সর্বসম্মুখে সহাস্যে এসব ফষ্টিনষ্টি করে বেড়ায়। এসব সে পৌরুষ-অধিকার বলেই জানত। কেবল বর্তমান নয়, চিরকালই দিব্যনাথ নারী নিয়ে নোংরামি করে আসছে। শাশুড়িও কম প্রশ্রয় দেয়নি। ছেলে তার ‘পুরুষ বাচ্চা’, স্ত্রৈণ নয় বলে অহংকারও করত। দিব্যনাথের পিতাও নাকি যৌবনকালে এমনই ছিল। প্রায়শই সন্ধ্যাবেলা নারী নিয়ে বাইরে কাটাত। পরপর দুই পুরুষের নৈতিক অধঃপতন তৃতীয় পুরুষ জ্যোতি অথবা নিপাদের কাছেও সমভাবেই সমর্থন পায়। সামন্ত প্রভুর ন্যায় দিব্যনাথ নিজেকে পরিবারের ‘বস’ বলে বিবেচনা করত। সন্তানেরা অনেকেই ইনিয়েবিনিয়ে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে বাবাকে ‘বস’ বলেই সম্বোধন করত। এমনকি কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতীও। তবে এই সন্তানের মেজাজটা ছিল খানিকটা ভিন্ন ধার ও ধারার।

২.
অর্থবিত্তে স্বচ্ছল হলেও পরনারীতে অভ্যস্থ হওয়ায় দিব্যনাথ-সুজাতার দাম্পত্য-সম্পর্ক সুখের ছিল না। দিব্যনাথ সুজাতাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতো না। বরং যৌন পার্টনার হিসেবেই বিবেচনা করত। অসুখবিসুখ হলে খোঁজখবর নিত না। নবজাতকের কান্না থেকে বাঁচার জন্য তেতলায় ঘুমাত। প্রসূতি স্ত্রী থেকে দূরে অবস্থান করত। শাশুড়িমাও ছিল নারীবিদ্বেষী মহিলা। সুজাতার সন্তান জন্মদান সইতে পারত না। প্রসবকাল দেখলেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেত। তীব্র প্রসবযন্ত্রণা নিয়ে সুজাতাকে একা একাই নার্সিং হোমে যেতে হতো। দিব্যনাথের নজর কেবল একদিকে—‘আবার মা হবার যোগ্য শরীর হচ্ছে কি না সুজাতার।’ দুবছর পরপর সুজাতার চার সন্তান জন্মে। জ্যোতি, নীপা, তুলি। সর্বশেষ ব্রতী। প্রথম ও শেষে পুত্রসন্তান, মাঝখানে দুটি কন্যাসন্তান। ব্রতীর দুবছর বয়সকালে সুজাতা লম্পট দিব্যনাথের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করেছিল। লেখকের ভাষায়—দিব্যনাথ কিছুতেই ওঁকে পঞ্চমবার ‘মা’ হতে বাধ্য করতে পারেনি। দিব্যনাথ সুজাতাকে ফার্মের কাজ ছেড়ে দিতে বলেছিল। সুজাতা মানেনি। ‘কাজ না-ছাড়া সুজাতার দ্বিতীয় বিদ্রোহ।’ 
বাবামায়ের মধ্যকার এই টানাপড়েন ব্রতী খানিকটা বুঝতে পারত। বুঝতে পারত মাতৃবক্ষের সুগভীরে লুকানো তীব্র গোপন ব্যথা। ব্রতীর মনটা কম্পাসের কাটার ন্যায় মমতাময়ী মাতা জগজ্জননী সুজাতার দিকে হেলে থাকত। ব্রতী সর্বদা মায়ের ওপর চোখদুটো সুস্থির রাখত। দশ বছর বয়সেও খেলাধুলা ফেলে বাড়ি চলে আসত। শিয়রে বসে মায়ের মাথায় বাতাস করত। এজন্য দিব্যনাথ ব্রতীকে সইতে পারত না। কনিষ্ঠ সন্তান হলেও শত্রু বিবেচনা করত। ব্রতীকে টিপ্পনি কেটে দিব্যনাথ কখনো বলত ‘মাদার্স চাইল্ড’ কখনো বলত ‘মেয়েমার্কা ছেলে। নো ম্যানলিনেস।’                 
মতাদর্শিক দ্বন্দ্বে এই পুঁজিবাদী পরিবারের চরিত্রগুলো দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে পারিবারিক ‘বস’ দিব্যনাথ ও জ্যেষ্ঠ তিন সন্তান জ্যোতি, নীপা, তুলি। সেইসঙ্গে এদের পূর্বপ্রজন্ম ঠাকুরমাও। অপরদিকে সুজাতা ও তার কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতী। এই দ্বন্দ্ব কেবল একটি পরিবারের নয়, এটি সমসাময়িক সমাজ অথবা রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব। এমনকি বৈশ্বিকও। বিশ্বজগৎ সংসার তখন ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দুধারায় দ্বিধাবিভক্ত। দ্বন্দ্বটা এতই জটিল ছিল যে, ভাই-বোন, পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রীর সমুদয় সামাজিক ও আত্মিক বন্ধন শিথিল হয়ে যায়। এমনকি রক্তের বন্ধনও।
 
৩.
দিব্যনাথপুত্র ব্রতী পিতার পুঁজিবাদী আদর্শে আস্থা হারিয়েছিল। আস্থা হারিয়েছিল সমসাময়িক সমাজ ব্যবস্থাপনায়। আস্থা হারিয়েছিল মুনাফাখোর ব্যবসায়ী ও স্বার্থান্ধ নেতাদের ওপর। পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থার পরিবর্তে সমাজতান্ত্রিক জীবনব্যবস্থার স্বপ্ন লালন করত। সমতাভিত্তিক একটি সুন্দর সুষম সমাজ বিনির্মাণের লক্ষে হৃদয় তার জেগে উঠেছিল। লেখকের ভাষায়, তখন সত্তর দশক। মুক্তির কাল। মুক্তির দশকে জনমুক্তির আন্দোলনে অনেকটা সংগোপনেই সংযুক্ত হয়েছিল ব্রতীরা। তখন সাম্রাজ্যবাদী শোষক সরকার ক্ষমতায়। জেলের পাঁচিল উঁচু করে। নতুন নতুন ওয়াচ টাওয়ার বসায়। বন্দিদের জন্য ফটকঅবন্দি খোলে না। সুগভীর রাতে ভ্যানভর্তি বন্দি এলে লেখকের ভাষায়—‘ওপর থেকে ক্রেন নামে। জন্তুর মত বন্দীকে যন্ত্রের নখে আঁকড়ে ক্রেন উঠে যায়, জেলের ভেতর নামিয়ে দেয়।’ জন্তুর মতো হলেও যারা জেলে যায়, তারা অন্তত প্রাণে বেঁচে যায়। কিন্তু বাইরের ব্রতীরা নিদারুণভাবে প্রাণটা হারায়। রাষ্ট্রযন্ত্র নানা উপায়ে নির্মম নির্যাতন অব্যাহত রাখে। নির্জন সলিটারি সেলে নির্যাতন চালায়। লেখকের ভাষায়—‘সাউন্ডপ্রুফ। দরজা-জানালায় ফেলটমোড়ানো ফাঁপা রবারের নল বসিয়ে সাউন্ডপ্রুফ করা। ঘরের আর্তনাদ, গোঙানি, মারের আওয়াজ, জেরাকারীর গর্জন, সব শব্দ ঐ নলের জন্য ঘরের ভেতরেই বন্দী থাকে।’

৪.
বিজিত, প্রার্থ, লালটু, সমু ব্রতীর বিপ্লবী বন্ধু। এরাও চেয়েছিল স্বসমাজটিকে বদলে দিতে। সহযোদ্ধা বন্ধুদের বাঁচাতেই সেদিন ব্রতী গিয়েছিল সমুদের বাড়িতে। কিন্তু বাঁচাতে পারেননি। নিজেও বাঁচতে পারেনি। গভীর রাতে সমুদের বাড়ি ঘেরাও করে গুন্ডারা। হিংস্র গলায় বলে—‘বের করে দিন, লয়তো ঘরে আগুন দিমু!’ ব্রতীর কণ্ঠ শুনে কেউ একজন বলে ওঠে—‘হালায় আরেক মালটারে জুটাইছে। বাইর হ ঘটির পোলা।’ হাতে হাত রেখে স্লোগান দিতে দিতে ব্রতীরা বেরিয়ে আসে। বাইরে অন্ধকার। ঘুটঘুটে আধার মুখ হাসি-উল্লাসে ফেটে পড়ে। ভয়ংকর গন্ডগোল। ‘বাড়ী বাড়ী আলো নিভে যাচ্ছে, দরজা জানালা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, চমকে সরে যাচ্ছে ভয়চকিম মুখ।’ সহসা স্লোগান থেমে যায়। সমবেত ঘাতকেরা খটখট গুলির শব্দ করতে করতে চলে যায়। সমুর দরিদ্র বাবা থানায় গেলে আততীয়দের নাম শুনে ধমকে ওঠে পুলিশ। পুলিশভ্যান আসতে আসতে সরে যায় ঘাতকেরা। নিতু ওরফে দীপুর মতো ভদ্রছেলেকে তো থানার সামনেই পিটিয়ে হত্যা করে। ‘প্রকৃত খুনি কখনো বন্দুক ধরে না।’ ব্রতী-সমুদের হত্যা-পরিকল্পনাকারীরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এমনকি প্রত্যক্ষ ঘাতকদেরও বিচার হয় না। বুক ফুলিয়ে এরা নির্বিবাদে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। সমুর দিদিকে দেখে নির্মম ব্যঙ্গ করে, হাহা করে হাসে আর বলে—‘তর ভাইয়ের ছাদ্দ করলি না ক্যান? ভাল কইরা খাইতাম!’ সুজাতার মনে কত প্রশ্ন—যে শহরে এমন সব জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়, সেখানে পরপর কী করে সংস্কৃতিমেলা, রবীন্দ্রমেলা অনুষ্ঠিত হয়?

৫.
সুজাতা টেলিফোনেই ব্রতী হত্যার খবর পায়। অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে—‘কাটাপুকুরে আসুন।’ পিতা দিব্যনাথ কাটাপুকুরে না গিয়ে দৌড়ায় পত্রিকা-অফিসে। পুত্রহত্যার খবর ধামাচাপা দিতে দিব্যনাথ ‘দড়ি টানাটানি করে বেড়াচ্ছিলেন।’ সফলও হয়েছিলেন। লেখক বলছেন—‘দিব্যনাথের ছোটাছুটি দড়ি টানাটানি সফল হয়েছিল। পরদিন খবরের কাগজে চারটি ছেলের হত্যার খবর বেরোয়। নাম বেরোয়। ব্রতীর নাম কোন কাগজে ছিল না।’ পত্রিকাপাতা থেকে ব্রতীকে মুছে দিয়েছিল দিব্যনাথ। মুছতে পারেনি মর্গ থেকে। সেখানে  ব্রতীর অবস্থান ‘হাজার চুরাশি’ নম্বরে। সেদিন ব্রতীর মৃত্যু পিতার কাছে কলঙ্কজনক মৃত্যুরূপে বিবেচিত হয়েছিল। মমতাময়ী মা সুজাতা সুস্থির থাকতে পারেননি। ছুটে গিয়েছিলেন কাটাপুকুরের লাশ ঘরে। প্রাণধন পুত্র ব্রতীর মৃত্যু নিয়ে কোথাও একটু সংশয় ছিল। তাই মুখটুকু দেখতে চেয়েছিলেন। অসীম করুণায় ডোম জানিয়েছিল—‘কি আর দেখবেন মাইজী? মুখ কি আর আছে কিছু?’ সীমাহীন মমতায় সুজাতা সবলে ব্রতীর মুখের আবরণ সরিয়ে দেয়। ‘শানিত ও ভারী অস্ত্রের উলটো পিট দিয়ে ঘা মেরে থেঁতলানো, পিষ্ট, ব্রতীর মুখ।’ আঙুল বোলানোর মতো ইঞ্চি পরিমাণ জায়গাও মসৃণ ছিল না। সবই দলিত, মোথিত, থেঁতলানো। তবু সুজাতা ব্রতী! ব্রতী! বলে আঙুল বোলায়। 
ব্রতীদের অপরাধ, ওরা দেয়ালে দেয়ালে বয়ান লিখত। ওরা লাল অক্ষরে লাল শব্দে দেয়াল রঙিন করে তুলত। কেবল মুক্তকণ্ঠে সমবেত স্লোগানই ধারণ করত না, প্রাণভরে বিশ্বাসও করত। দেবীর ভাষায়—‘ব্রতীরা এই এক নতুন জাতের ছেলে। স্লোগান লিখলে বুলেট ছুটে আসে জেনেও ব্রতীরা স্লোগান লেখে। কাটাপুকুর যাবার জন্যে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেয়।’ ব্রতীরা এতটাই সমাজবিরোধী যে, দিব্যনাথের ন্যায় পিতারা মুখাগ্নিও করতে আসে না। ব্রতীদের লাশ কাটাপুকুরের মর্গে পড়ে থাকে। রাতে পুলিশ গাদাগাদি করে শ্মশানে বয়ে আনে। এরপর আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। শ্রাদ্ধে বিশ্বাসীজনও যথানিয়মে শ্রাদ্ধ করার সুযোগটুকুও পায় না। স্ফীত লাল চোখে বসে থাকতে হয় সারাটা দিন।

৬.
নকশাল আন্দোলনকে (১৯৭০) কেন্দ্র করে মহাশ্বেতা দেবী উপন্যাসটির আখ্যানভাগ সাজিয়েছেন। কল্পনার সঙ্গে সমসাময়িক সমাজ বাস্তবতার দরকারি সমন্বয় ঘটয়েছেন। সেই সঙ্গে কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তির সংগ্রামে (১৯৭১) কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা ‘বাংলাদেশের সহায় ও সমর্থনকল্পে পশ্চিমবঙ্গ তোলপাড় করে ফেলেছিল।’ কিন্তু নকশাল আন্দোলনের হত্যাকাণ্ড তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়নি অথবা এরমধ্যে পৈশাচিকতা খুঁজে পাননি। যদি পেতেন, ‘তাহলে ত কলকাতার কবি ও লেখক ওপারের পৈশাচিকতার সঙ্গে এপারের পৈশাচিকতার কথাও বলতেন।’ কিন্তু বলেননি। মূলত প্রান্তজনের বেঁচে থাকার লড়াই, লড়াই শেষে নিদারুণ পরিণতিই তুলে আনতে চেয়েছেন মহাশ্বেতা দেবী। দেবীর গদ্যশেলীতে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও অসীম মমতায় সেটি কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। উপন্যাস হয়ে উঠছে উপভোগ্য সেইসঙ্গে সাব-অলটার্ন হিস্ট্রির দরকারি দালিলিক শিল্পকর্ম। ২৮ জুলাই প্রয়াণদিবসে লেখকের প্রতি অশেষ প্রণতি।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১৮:৩৬

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা। কাঁটাবনে অবস্থিত প্রকাশনা সংস্থা ‘উজান’ এমন ঘোষণা দিয়েছে তাদের প্রকাশিত ‘কোরিয়ার কবিতা’ ও ‘কোরিয়ার গল্প’ নিয়ে আলোচনার জন্য।
এই বই দুটিতে রয়েছে কোরিয়ার বিশ ও একুশ শতকের উল্লেখযোগ্য কবিদের কবিতা এবং একই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিকদের ছোটগল্প। 
উজানের এই আয়োজনে সহযোগিতা করছে লিটারেচার ট্রান্সলেশন ইনস্টিটিউট অব কোরিয়া। 
বই আলোচনার সর্বোচ্চ পুরস্কার ২০ হাজার টাকা। এছাড়া দ্বিতীয় পুরস্কার ১৫ হাজার এবং তৃতীয় পুরস্কার ১০ হাজার টাকা। এই প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত সর্বোচ্চ ১০ আলোচকের প্রত্যেককে দেওয়া হবে ৫ হাজার টাকা মূল্যমানের বই। 
আলোচনাগুলো বাছাই করবেন দেশের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও অনুবাদকদের সমন্বয়ে গঠিত বিচারক কমিটি। একজন একটি বই নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন। আলোচনা বাংলাভাষায় লিখিত বা ভিডিও মাধ্যমে হতে হবে। 
অংশগ্রহণে ইচ্ছুক অনলাইনে ফরম পূরণ করতে করতে পারবেন এসব লিংকে www.ujaninfo.com, www.porospor.info। ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আলোচনা জমা দিতে হবে [email protected] এ।
বিস্তারিত জানতে এবং বই সংগ্রহ করতে পারবেন www.ujaninfo.com, www.facebook.com/UjanPrakashan, https://www.facebook.com/UjanBooks থেকে।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

সর্বশেষ

আফগান প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বাড়িতে বন্দুকধারীদের হামলা

আফগান প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বাড়িতে বন্দুকধারীদের হামলা

আমিরাতি জাহাজ ছিনতাই, অভিযোগ ইরানের বিরুদ্ধে  

আমিরাতি জাহাজ ছিনতাই, অভিযোগ ইরানের বিরুদ্ধে  

পেন্টাগনের কাছে হামলায় পুলিশ কর্মকর্তা নিহত

পেন্টাগনের কাছে হামলায় পুলিশ কর্মকর্তা নিহত

নাসুমের সাফল্যে গর্বিত সুনামগঞ্জবাসী

নাসুমের সাফল্যে গর্বিত সুনামগঞ্জবাসী

নিউ ইয়র্ক গভর্নরের বিরুদ্ধে একাধিক নারীকে যৌন হয়রানির প্রমাণ

নিউ ইয়র্ক গভর্নরের বিরুদ্ধে একাধিক নারীকে যৌন হয়রানির প্রমাণ

ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রাজশাহী মেডিক্যালে ভর্তি

ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রাজশাহী মেডিক্যালে ভর্তি

মিতু হত্যা মামলা: গায়ত্রী সম্পর্কে পিবিআইকে তথ্য দিয়েছে ইউএনএইচসিআর

মিতু হত্যা মামলা: গায়ত্রী সম্পর্কে পিবিআইকে তথ্য দিয়েছে ইউএনএইচসিআর

স্বামীর ৪ ঘণ্টা পর শ্বাসকষ্টে স্ত্রীরও মৃত্যু

স্বামীর ৪ ঘণ্টা পর শ্বাসকষ্টে স্ত্রীরও মৃত্যু

দশ টাকার ভাড়া নিয়ে রিকশাচালককে রডের আঘাতে হত্যা

দশ টাকার ভাড়া নিয়ে রিকশাচালককে রডের আঘাতে হত্যা

কাবুলে শক্তিশালী বিস্ফোরণ, গোলাগুলি, নিহত ৩

কাবুলে শক্তিশালী বিস্ফোরণ, গোলাগুলি, নিহত ৩

বৃদ্ধ বাবা-মাকে আশ্রয়হীন করায় ৩ ছেলেকে পুলিশে দিলেন ইউএনও

বৃদ্ধ বাবা-মাকে আশ্রয়হীন করায় ৩ ছেলেকে পুলিশে দিলেন ইউএনও

মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের বাইরে গোলাগুলি

মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের বাইরে গোলাগুলি

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

ক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

ধারাবাহিক—একক্লিশিতে শান্ত দিন ।। হেনরি মিলার

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর কবিতা

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

উৎসবে গল্প

উৎসবে গল্প

থিয়েটার

থিয়েটার

© 2021 Bangla Tribune