X
মঙ্গলবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৬ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

কবিতা || তসলিমা নাসরিন

আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০১৬, ১৯:১১
তসলিমা নাসরিন 
 
 
‘কবিতা পালিয়ে যাচ্ছে খলসেখালি গ্রাম থেকে অনেক দূরে। সে আর ফিরবে না গ্রামে। তখনও রাত্তির, সোজা মাঠ ধরে হেঁটে গেলে সকাল সকাল পিচরাস্তা পেয়ে যাবে। প্রথম বাসটা ধরেই শহরের দিকে চলে যাবে। মিশে যাবে মানুষের থিকথিকে ভিড়ে। কতদিন পর বুকের ভেতর ছলাৎ ছলাৎ শব্দ হয়। মুহূর্তে সে পেতে থাকে সোঁদা মাটির গন্ধ, পেতে থাকে গাজনের বাজনা, যতদূর চোখ যায় সবুজ আর সবুজ, আর পালা ধানের নাচ।’
ওই ভিড়ে কে কাকে খুঁজে পায়! কবিতা যে শহর চেনে না তা নয়, চেনে সে, সন্তোষের সঙ্গে শহরেই বেঁধেছিল ঘর, সোনারপুরেই ছিল তার সোনার সংসার।
কবিতা ফিরবে না আর এই গ্রামে। ফিরতে চাইলেও বোধহয় তাঁকে আর ফিরতে দেবে না কেউ। সন্তোষকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করেছে সে, রক্তের হাত দুটো বাড়ির কলের জলেই ধুয়ে নিয়েছে। জীবনে এটা কবিতার প্রথম খুন। খুন করলে শুনেছে সে গা কাঁপে, কিন্তু কবিতার, প্রায় দু’ঘণ্টা হলো খুন করেছে, এখনও কিছুই কাঁপছে না। নিজেকে এত ভারমুক্ত হতে আর কখনও সে দেখেনি। গ্রামের লোকেরা পিছু নিতে পারে, পুলিশে খবর হতে পারে, এসব যে সে ভাবছে না তা নয়। ভাবলেও এসব তাকে মনের ভেতর কোনও ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছে না। যদি তাঁকে কেউ জিজ্ঞেস করে ‘সন্তোষকে খুন করেছিস?’, সে বলবে, ‘হ্যাঁ করেছি।’
কবিতা বলে দেখলো কেমন শুনতে লাগে, ‘হ্যাঁ করেছি।’ বেশ কয়েকবার সে বলে ‘হ্যাঁ করেছি।’ অসম্ভব ভালো লাগছে তার উচ্চারণ করতে ‘হ্যাঁ করেছি’। ওই রাত্তিরেই সে দিগন্ত ছোঁয়া মাঠে চিৎকার করে এলোমেলো ছড়িয়ে থাকা দুটো তিনটে তারার আকশটির দিকে মুখ করে বলে, ‘হ্যাঁ করেছি’।
ষোল বছরের শরীর কবিতার। সাপের ফণার মতো ধারালো শরীর। শরীরটার দিকে লোলুপ চোখে তাকায় খলসেখালির বারো থেকে বাহাত্তর সবাই। নিজের বাপেও তাকাতো। তাকিয়ে তাকিয়ে জিভের রস গিলে বলত, ‘মেয়ের তো বিয়ের ব্যবস্থা করতে হয়।’ ‘তা করতে হয় বৈকি, করলে খলসেখালির পুরুতঠাকুরের ছেলে সন্তোষ চক্কোত্তির সাথে কর।’ বাবা মা দুজনেই জিভ কাটে। ‘ও নাম মুখে নিসনি। ওরা তো বাম্মন।’ ‘বাম্মন তো কী হয়েছে, বাম্মনের ছেলের সাথে আমি যে যা নয় তা করে বেড়াচ্ছি।’ এর কোনও উত্তর কারও কাছে নেই। কবিতা, সাপের ফণা, বেরিয়ে যায় সমুদ্রের ধারে। সন্তোষকে খুঁজে বেড়ায়। ঘন্টা দুই বসে থাকার পর মাছ ধরতে আসে সন্তোষ। কালো ছিপছিপে শরীরে সাদা পৈতেটা চিকচিক করে, ধুতিখানা লেঙটি করে বাঁধা। ‘ও সন্তোষ, বাবা তো বিয়ের কথা বলছে।’
‘বিয়ের কথা বলছে তো বলছে।’
‘বলছে তো বলছে মানে? বিয়ে যদি দিয়ে দেয়!’
‘দেয় তো দেবে!’
‘যদি তোমার সাথে না দেয়!’
‘আমার সাথে না দিলে কার সাথে দেবে, শুনি!’
‘কী করে দেবে তোমার সাথে। তুমি তো বাম্মনের ছেলে।’
‘তাতে কী! বাম্মনের ছেলে হয়েছি বলে কী ভালোবাসা করিনি!’
সন্তোষ মাছ ধরা বন্ধ করে কবিতাকে সেদিন শুনিয়েছিল পালা গান। যাত্রা দলে গান গায় সন্তোষ। একলা নদীর ধারে সেইসব সুরেলা গান কবিতার মন ছুঁয়ে যায়। গত শীতেই সে শুনেছিল যাত্রাদলে সন্তোষের গলা। আগে থেকেই ছেলেটাকে চিনত সে। পুরুতঠাকুরের ওইটুকুন ছেলে সে অতটা ডাঙর হয়ে গেছে জানত না। ওই গান কবিতাকে এমন কাঁপিয়েছিল যে পুরুতঠাকুরের বাড়ি গিয়ে সে সন্তোষের খোঁজ করেছে।
‘কী রে তুই কে রে?’
‘মাধব মন্ডলের মেয়ে।’
‘কী চাস?’
‘গান খুব ভালো গেয়েছ।’
 সন্তোষ এক গাল হেসে তাকে ঘরে ডেকেছিল। সেদিনই আরও দুটো গান ওকে শুনিয়ে বলেছিল, ‘তুই দেখতে তো খুব সুন্দর হয়েছিস! তুই গা না আমার সাথে।’
কবিতা লজ্জায় লাল হয়ে শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে বলেছিল, ‘কী করে গাইতে হয় জানিই না।’
সন্তোষ কবিতার গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলেছিল, ‘শিখিয়ে দেব। শিখবি?’ গান শেখানো শুরু হয়ে যায়। প্রতিদিন সন্তোষের বাড়ির সময়ে অসময়ে যেতে থাকে কবিতা। একদিন দেরি হয়ে গেল, তো সন্তোষ ছুটে আসে। সন্তোষের বাড়ির কিনারে ছোট্ট বেড়ার ঘরটিতে দুজন গানে গল্পে কাটাতে কাটাতে দেখে সমুদ্রের জোয়ারের চেয়ে আরও দ্বিগুণ জোয়ার উঠেছে কবিতার শরীরে। সেই জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সন্তোষ কবিয়ালকে। খলসেখালি গ্রামে জেনে যায় কবিতার সঙ্গে কবিয়ালের ভাবের কথা। খলসেখালি গ্রাম, গ্রাম ছাড়িয়ে আরও কয়েক গ্রাম জেনে যায়, ছোটজাত বড়জাতে ভাব হতে পারে, বিয়ে হবে না।
হ্যাঁ, বিয়ে অসম্ভব। শূদ্রে আর বামুনে বিয়ে হয় না। কবিতাকে ধরে বেঁধে খলসেখালির গায়ে লাগা গ্রাম মিঠেখালির দিনমজুরের ছেলে হারাধনের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়ে গেল। নগদ এক হাজার টাকা পণ দিয়ে কানের একটা সোনার দুল গড়িয়ে দিয়ে লাল একটা শাড়ি পরিয়ে বিয়ে হলো। মনে মনে যাকে শ্বশুরমশাই ডেকেছে কবিতা, সে-ই এসে বিয়ে পড়িয়ে গেল। বিশ্বনাথ চক্রবর্তী। সন্তোষের বাপ। হেঁটে হেঁটেই খলসেখালি থেকে কবিতাকে যেতে হয়েছিল মিঠেখালির শ্বশুরবাড়ি। গিয়েই উদয়াস্ত সংসারের কাজ। মাটির ঘর গোবর দিয়ে মোছো, গোবর চাবড়া দিয়ে ঘুঁটে বানাও, ধান ঝাড়ো, সেদ্ধ করো, কাঠ কেটে আনো, নাড়া খড় ঘুঁটে জ্বালিয়ে রান্না করো, কলমিশাক তুলে আনো, শাক আলু বেগুন দিয়ে লাবড়া রান্না করো।আর বাড়ির বেবাককে খাওয়াও দাওয়াও।দিন রাত্তির দম ফেলার সময় নেই। এত খেটে গা যখন ভেঙে আসে, মাঝে রাত্তিরে চুল্লু খেয়ে এসে হারাধন-স্বামী ভোর রাত্তির অবধি লাথি গুঁতো দিয়ে গা পচিয়ে ফেলে।এহেন সংসার থেকে বাপের বাড়ির নাম করে কবিতা পালায় বারবার।ছুটে ছুটে যায় সন্তোষের কাছে। ‘ও কাবিয়াল, আমি আর ফিরবো না ওই অসুরের বাড়ি।’
সন্তোষ হাঁ করে চেয়ে থাকে সুন্দরীর মুখে। কী করবে সে ভেবে পায় না।বুকের মধ্যে পুরে রাখবে কবিতাকে! বাপ ঠাকুরদার সঙ্গে সে তর্ক করে, ‘ব্রাহ্মণ তো কী হয়েছে, যাকে মনে লেগেছে, তাকে কেন বে করতে পারবো না?’ বাপের বাড়ি তো বটেই, পাড়ার লোকও ছি ছি করলো। কবিতা স্বামীর ঘর করছে এখন এসব কথা মুখে নেওয়াও তো পাপ। কবিতার বদনাম গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে যায়। ভাতার নাকি মারে। হয়েছাটা কী তাতে? ভাতারই তো মারে, অন্য কেউ তো নয়! গাল টিপলে দুধ বেরোয়, এত দেমাগ কোত্থেকে পেলো মেয়ে! সন্তোষকে নিরুত্তর দেখে কবিতা ঝাঁপ দিতে যায় নদীতে। সেই মরণকে দু’হাত দিয়ে ঠেকায় সন্তোষ। বুকের মধ্যে জাপটে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে, ‘কবিতা, এইবার তুই ফিরে যা। আমি কিছু টাকা জোগাড় করে নিই। তোকে নিয়ে পালিয়ে যাবো।’
 ‘সত্যি তো?’
‘সত্যি। তুই দেখে নিস।’
যাত্রাদলের কাছে শ’দুয়েক টাকা সন্তোষ চাইবে। এতদিন যে মাগনা মাগনা গান গেয়েছে, পেলেও পাঁচ দশ টাকা ছাড়া তো কিছু পায়নি! সন্তোষ নিজে বুঝিয়ে সুঝিয়ে কবিতাকে শ্বশুরবাড়ি রেখে আসে। জেনেই রেখে আসে যে হারাধনের বাড়িটা বাড়ি নয়, নরক। হারাধনের বাড়ির কীর্তিকলাপ জেনেও বাপের বাড়ির কেউই কবিতাকে একটি রাত্তিরও রাখে না। গ্রামে নাকি তাহলে আর তিষ্ঠোনো যাবে না। তিষ্ঠোক গ্রামে ওরা, কবিতা মার খেয়ে খেয়ে মরুক। কতবার যে ইচ্ছে হয়েছে তার নদীতে ভেসে যেতে। বাপের বাড়ির কাউকে আর কবিতা একবিন্দু বিশ্বাস করে না। যারা নিজের মেয়েকে হাত পা বেঁধে নরকে ফেলে দিয়ে স্বস্তিতে ঘুমোচ্ছে, তাদের মুখ দেখবার ইচ্ছে তার নেই। সন্তোষই ভরসা দিচ্ছে। সন্তোষই দুটো আশার কথা শোনাচ্ছে। কবিয়ালের শেখানো গান সে গুনগুন করে শ্বশুরবাড়ির খাটাখাটনির ভেতরে নিভৃতে গেয়ে যায়।
স্বপ্ন একদিন সফল হল কবিতার। ভোর রাত্তিরে সে পালায় সন্তোষের সঙ্গে। সন্তোষের বুক পকেটে দুশো টাকা। আর কারও হাতে কিছু নেই। মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে পিচের রাস্তা। ভোর রাত্তিরে রওনা হলে পিচের রাস্তায় এসে সোনারপুরের বাস ধরা যায়। সোনারপুরে থাকে কবিতার বাপের পিসি, তার মায়ের পিসশাশুড়ি, তার ঠাকুমা, মঙ্গলা। মঙ্গলার বাড়ি কোনওদিন আসেনি কবিতা। তার মা এসেছে, মায়ের কাছেই গল্প শুনেছে সে মঙ্গলা ঠাকুমার। ঠাকুমার বাড়ি যখন পৌঁছায় কবিতা, সঙ্গে সন্তোষ, রাত এগারোটা বেজে গেছে। মঙ্গলার পাড়া জেগে উঠলো।
‘এত রাত্তিরে কে এল?’
‘জামাই নিয়ে নাতনি এসেছে।’
মঙ্গলার ঘরের কাছে ঘর ভাড়া নিয়ে কবিতা থাকতে শুরু করেছে। সঙ্গে স্বামী। লোকে তাই জানে। মঙ্গলা কবিতাকে নিয়ে কলকাতায় ঠিকে কাজে লাগিয়ে দিল। নিজেও সে ঠিকের কাজই করে। জামাইকে নিয়ে যোগালির কাজে গেল হরিচরণ, মঙ্গলার স্বামী। কবিতার সিঁথিতে মোটা করে সিঁদুর। হাতে শাঁখা পলা, হাতে লোহা। এক মঙ্গলা আর হরিচরণ ছাড়া আর কেউ জানে না এ আসলে কবিতার স্বামী নয়, স্বামীকে ফেলে কবিতা এর সঙ্গে পালিয়ে এসেছে। সন্তোষের কাজ আজ জোটে, কাল জোটে না। কিন্তু কবিতা ঠিকের কাজ করে মাসে হাজার বারাশো টাকা পায়। সকাল আটটায় যায়, দুপুর বারোটায় ফিরে আসে। প্রথম প্রথম মঙ্গলার সঙ্গে যেত, এরপর ভিড়ের ট্রেনে একা একাই যেতে শিখে গেছে। গ্রামেও যেমন, শহরেও সাপের ফণার দিকে হাঁ করে লোকে তাকিয়ে থাকে। কবিতা কারও দিকে ফিরে তাকায় না। উল্কার মতো হেঁটে যায়। ঘর ভাড়া, খাওয়া খরচ, কাপড় জামার খরচ-এসব বাদ দিয়ে যত টাকা জমলো, সবই মাটির তলায় পিতলের ঘটিতে রেখে দেয় কবিতা। তার বড় শখ এই সোনারপুরেই এক কাঠা জায়গা কিনে একটা ঘর তুলবে। বড় শখ সোনারপুর বাজারে একটা ফলের দোকান দেবে। মঙ্গলা অনেকদিন বলেছে, ‘ব্যাংকের বই করে টাকাগুলো রেখে দে রে কবিতা।’
কবিতা শোনে না। রাত্তিরে নিজের চোখে টাকাগুলো একবার না দেখলে তার ঘুম হয় না। ব্যাংকে রাখলে চোখের এই সুখটুকু তো সে পাবে না।
এতদিনে গ্রামেও জানাজানি হয়ে গেছে সন্তোষের সঙ্গে কবিতার সংসার করার কথা। গ্রামের মেয়েদের অত আলদা করে বে থা হতে হয় না। সন্তোষই তার সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিয়েছে সোনারপুরের ঘরে, সন্তোষই তার স্বামী। সাক্ষী আকাশ বাতাস। কবিতার মা বাবা বৌদি এসে দেখে গেছে সংসার। হপ্তাখানেক থেকেও গেছে। জামাইকে আদর যত্নও করে গেছে প্রাণ ভরে। এভাবেই কাটছিল সুখে স্বস্তিতে কবিতার জীবন। হঠাৎ একদিন সন্তোষের খুশি খুশি গলা শোনে, ‘ও কবিতা, তোর ননদের তো বিয়ে, দেশে চল।’
‘দেশে?’
আমোদে চিকচিক করে কবিতার চোখ। কতদিন পর বুকের ভেতর ছলাৎ শব্দ হয়। মুহূর্তে সে পেতে থাকে সোঁদা মাটির গন্ধ, পেতে থাকে গাজনের বাজনা, যতদূর চোখ যায় সবুজ আর সবুজ, আর পাকা ধানের নাচ। হ্যাঁ, দেশে তো যাবেই কবিতা। তবে সন্তোষের আবদার বোনের বিয়েতে তার তো টাকা ঢালতে হবে, অত টাকা তড়িঘড়ি জোগাড় করা তার পক্ষে এখন সম্ভব হবে না। সে টাকা কবিতার কাছ থেকে নিয়ে সে দেবে, পরে কবিতার এক কাঠা জমি কেনার স্বপ্নের ভেতর গুঁজে দিলেই হবে দু’হাজার।
পিতলের ঘটি থেকে টাকা বের করে দিয়ে দেয় সে সন্তোষকে। বেড়ার ঘরটা তালাবন্ধ করে আঁচলে চাবি নিয়ে কবিতা চলল তার স্বামী নিয়ে দেশে ননদের বিয়েতে। কবিতার আনন্দ আর ধরে না। এই প্রথম সন্তোষের বাড়িতে সে বউ হয়ে ঢুকবে। ব্রাহ্মণের বাড়ির বউ, তার পুলক পুলক লাগে। চণ্ডালের বাড়িতে বিয়ে হয়েছিল, ওই নরককুন্ডে কম মরা সে মরেনি। পুরুতঠাকুর গরিব হোক, মানুষ তো! বড় জাতের মানুষেরা অসুর হয় না। কবিতাকে সারাপথ দোলায় স্বপ্ন। সারাপথ সে স্বপ্নের ঘোরে।
কবিতাকে তার বাপের বাড়ি নামিয়ে দিয়ে গেল সন্তোষ। কথা, কাল সকালে বাপ ঠাকুরদাকে বলে ঘরে তুলবে তাকে। গ্রামের ক’টা লোককে না খাওয়ালে লোকে বলবে কী! বাপের বাড়িতে কবিতার আদর যত্নের শেষ নেই। ননদের বিয়েতে এসেছে কবিতা। ব্রাহ্মণের বাড়ির বউ। কম কথা নাকি। কবিতাকে মান্য গণ্য করে সবাই। বাপও পর্যন্ত চোখ তুলে কথা বলে না। এক ফাঁকে বৌদি জানিয়ে দেয়, হারাধন বিয়ে করে নিয়েছে পাড়াগাঁয়ের এক চাষির মেয়েকে। শুনে চুকচুক করে চাষির মেয়েটার জন্য দুঃখ করে কবিতা।
কিন্তু পরদিন তো সন্তোষ আসে না কবিতাকে নিতে। ব্রাহ্মণের বাড়ির বউ, আগের মতো তো মাঠে পাড়ে ছুটোছুটি করতে পারে না। লোকে মন্দ বলবে। বাপ মায়েরা বলে, শান্ত হয়ে বসতে। সন্তোষ নিশ্চয়ই বোনের বিয়ের কাজে ব্যস্ত। তাই বউকে ঘরে তুলতে পারছে না। বিয়ের দিনই একেবারে তুলবে। আশায় বসে থাকে কবিতা। উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকে পথের দিকে তাকিয়ে। ঘরের জানালায় চোখ রেখে নাওয়া খাওয়া ভুলে বসে থাকে। স্বামী তার এই আসবে, এই আসছে বলে।
কোথায় স্বামী! স্বামীর খবর নেই। চারদিন পার হয়ে গেলে কবিতা বেরোয়। বাড়িতে তার ননদের বিয়ের তোড়জোড় চলছে। কেউ তাকালো না বাড়ির বউটির দিকে। বাড়ির সবাই তো জানে যে শহরে গিয়ে ছেলে বিয়ে করে নিয়েছে কবিতাকে, তারা সংসার পেতেছে সোনারপুরে, এখনও তালার চাবিটি কবিতার আঁচলে বাঁধা! না শ্বশুর, না শাশুড়ি, না ননদ— কেউ ফিরে তাকালো না। যেন চেনেই না। যেন এ গাঁয়ের মেয়ে নয় কবিতা। কবিতার গায়ে যে জৌলুস বেড়েছে শহরের জল হাওয়া লেগে, তার দিকেও কারও নজর নেই। কবিতা ঠিক বোঝে, এ ইচ্ছাকৃত অবজ্ঞা, সন্তোষকে সে পাগলের মতো খোঁজে। খুঁজতে খুঁজতে নদীর পাড়। ওখানে মাছ ধরছে কবিয়াল জেলে। জাল ধরে টান দিয়ে কবিতা চেঁচিয়ে বলে, ‘কী হয়েছে তোমার? চারদিন ধরে বসে আছি কোনও খবর নেই? বাড়ি নিচ্ছ না কেন?’
সন্তোষ জালটি কবিতার হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলেম ‘তুই কে?’
‘মানে?’কবিতা কোমরে দু’হাত রেখে দাঁড়ায়। মাছে মন দেয় সন্তোষ, কথা বলে না।
‘কী ব্যাপার? হয়েছে কী তোমার, বলো। ননদের বিয়ে, কাজ কম্ম করতে হবে না?’
সন্তোষ আবারও বিস্ময়ে তাকায় কবিতার দিকে, বলে, ‘তুই কে? তোকে আমি চিনি না।’
‘আমাকে চেনো না?’
‘না।’
‘আমি তোমার বউ। বউ। বউ।’
‘আমি তোকে চিনি না। সরে যা সামনে থেকে।’
কবিতা হেঁচকা টানে সন্তোষকে জল থেকে সরিয়ে এনে আঙুল দিয়ে নিজের সিঁথির সিঁদুর দেখিয়ে বলে, ‘এই যে সিঁদুর দেখছো, এ তুমি আমায় পরিয়েছো।আমাকে বিয়ে করেছো। তুমি আমার বর। বুঝলে? আমি তোমার বউ। গাঁয়ের সবাই জানে। শহরের লোক জানে। ভগবান জানে।’
‘সরে যা। সরে যা।’ অবজ্ঞায়, ঘৃণায় সন্তোষের মুখ বিকৃত হয়ে থাকে।
‘কেন সরবো? বিয়ে করেছ, ঘরে তোলো। বাপের বাড়ি কদ্দিন ফেলে রাখবে আমাকে। ননদের বিয়ের জন্য তো টাকাও নিলে দু’হাজার। চেনো না আমাকে? খুব চেনো।’
সন্তোষ ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় কবিতাকে। সে চেনে না তাকে। কোনওদিন দেখেনি আগে। অচেনা মাগ-এত সাথে কোনও কথাও সে কইতে নারাজ। হনহন করে বাড়ির দিকে সে হেঁটে যায়।
কবিতা জল কাদা থেকে নিজেকে তুলে আনে। সামনে ফুঁসে উঠতে থাকা জোয়ার। ফুঁসতে থাকে কবিতা। একবার, শুধু একবারই কবিতা ভেবেছিল জোয়ারে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে বলে, না। না, সে মরবে না। সে তার স্বামীর পেছন পেছন হাঁটবে না, তাকে আর কাতর অনুনয় করবে না। সে বরং নদীর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে নদীর সঙ্গে মনের কিছু কথা বলবে। বলল সে কথা। বলল সোনারপুরে তার সোনার সংসারের কথা। বলল তার কবিয়াল স্বামীর কথা। মন-ভুলো স্বামীকে নদী যেন ক্ষমা করে দেয়।
ক্ষমা কিন্তু সে নিজে করলো না। রাত্তিরেই দরজা খুলে, সবাই যখন ঘুমে মরে আছে, চুপচপ করে বেরিয়ে পড়ল, হাতে দা। সেই দা হাতে নিয়েই সন্তোষের ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে বড় নিশ্চিন্তে বড় সুখে ঘুমোতে থাকা সন্তোষের মাথায় কোপ দেয়। এক কোপ, দুই কোপ, তিন কোপ। ক্যোৎ ক্যোৎ করে সামান্য শব্দ বেরোয় মূখ দিয়ে। তারপর মুখ আর মুখ থাকে না, রক্তে ভাসতে থাকে। বীভৎস সেই মুখ। কবিতার মনে হয়, সন্তোষের আসল চেহারা আসলে এই। ঠিক এরকমই বীভৎস সে। এরকমই অসুর।
কবিতা মাঠ পেরোতে থাকে, পালিয়ে যাচ্ছে সে। ঠিক এরকম ভোর হওয়ায় আগে আগেই সন্তোষের সঙ্গে পালিয়েছিল সে, ছ’মাস আগে এই পথে। পিচরাস্তা পেতে আরও দু’মাইল হাঁটতে হবে তাকে, তার ঠিক মনে আছে। একদিন ঠিক এভাবে এই পথ ধরেই পালিয়েছিল তারা দু’জন। এবার সে একাই। কবিতা বুঝে গেছে একা হাঁটলেই সবচেয়ে নিশ্চিন্তের হাঁটা হয়। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ এক খাল পেয়ে খালের পাড়ে সে দাঁড়ায়। আঁচলা ভরে জল নিয়ে সিঁথিতে ঘসে ঘসে সিঁদুর মোছে। হাত থেকে শাঁখা পলা লোহা সব খুলে ছুঁড়ে দেয় খালের জলে। এবার হাঁটতে থাকে। বড় ভারমুক্ত লাগে নিজেকে।
 
 
 

সম্পর্কিত

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমার B ও ৯

আমার B ও ৯

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৭:০০

আমি সাহিত্যের কোনো মনোযোগী পাঠক নই। পড়াশোনা নিতান্তই কম। আর খাপছাড়া। ভালো লাগা-খারাপ লাগা, সবটাই ব্যক্তিগত। পেছনে কার্যকারণের ধারাবাহিকতার দিকে নজর পড়ে সামান্যই। আর, আজকাল ইচ্ছাটাও মরতে বসেছে। চোখ-কান-মাথা জুড়ে আলসেমির দাপট। বাধা দেই না। স্বেচ্ছায় তাতে গা ভাসাই।
          ক’বছর আগে একটা বই পড়ি। দক্ষিণে সূর্যোদয়। লেখক, রাজু আলাউদ্দিন। আমি চমকে যাই। এই নামটার সঙ্গে সে-ই প্রথম পরিচয়। অথচ পরে জানতে পাই, তিনি অজ্ঞাত কুলশীল নন। কবিতা লেখেন। গদ্যও। কোনোটিই গতানুগতিক নয়। তেমন যে নয়, বইটির পাতায়-পাতায় তার ছাপ। মেক্সিকোয়-দক্ষিণ আমেরিকায় স্প্যানিশ ভাষার বিশাল সাম্রাজ্যে রবীন্দ্রনাথ যে একসময় আলোড়ন জাগিয়েছিলেন, তাই নিয়ে এই বই। অবশ্য সুতোর টানে খোদ স্পেনে হিমেনেথ দম্পতির ও আরো ক’জনের আগ্রহের ও আত্মস্থ করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আসে। এতদিন আমার জানা ছিল শুধু ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো-কথা। তাও স্প্যানিশ প্রেক্ষাপট মনে করে নয়। রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা ও ব্যক্তিমায়ার তৃপ্তিকর তথ্য হিসেবে। এখানে কিন্তু বিষয়মুখটা ঘুরিয়ে দেওয়া। দক্ষিণ আমেরিকায় স্প্যানিশ সাহিত্যের সৃষ্টিকুশলময় রবীন্দ্রনাথ কতটা প্রেরণা জুগিয়েছেন, অথবা, প্রতিহত হয়েছেন, সেটি ওই ভাষার সমকালীন সাহিত্যকাণ্ড বা পরবর্তী তর্ক-বিতর্ক থেকে আপন নিরাসক্তি পুরোপুরি বজায় রেখে তিনি সাবলীল দক্ষতায় সর্বাঙ্গীন করে ফুটিয়ে তুলেছেন। এমন বই আমি আগে পড়িনি। পরেও না। কিন্তু আমাদের দেখবার চোখ পুরোপুরি খুলে দেওয়ায় এ যে কী অসাধ্য-সাধন করে, তা ভেবে মনে বিস্ময় জাগে, কৃতজ্ঞ থাকি। তাঁর এই কাজের পেছনে একটা প্রেরণা, প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে, অনুমান, তাঁর জীবনসঙ্গিনী মেক্সিকো-কন্যা, যাঁর মাতৃভাষা স্প্যানিশ, বেড়ে উঠেছেন যিনি ওই আবহেই। সম্ভবত এর একটা পরিণাম, জেনে, অথবা না জেনে, রাজু আলাউদ্দিন এখন বহন করছেন বাংলা ও স্প্যানিশ, উভয় সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহ্যের স্বাভাবিক উত্তরাধিকার। বাংলায় তাঁর কাজে আলোর মিশ্র প্রকাশ ঘটে। তা আভিনব ও সমৃদ্ধ। আমাদের দৃষ্টি প্রসারিত হয়।
          শুধু এই কথাগুলো বলা আমার লক্ষ্য নয়। আসলে মূল কথায় আসার জন্য বলা যেতে পারে, এ গৌরচন্দ্রিকা। তিন বছর আগে তাঁর কবিতার বই একটি প্রকাশ পেয়েছে। নাম : ‘আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি’—সবই বাংলা কবিতা-ঐতিহ্যে বাগবিধিতে, স্বপ্নকল্পনায়, আত্মস্বরূপে নির্ভুল এই পরিচয়। কিন্তু তার পরেও ফল্গুধারার মতো শৃংখলা, সংযমও পরিমিতিবোধ যেন অন্তঃসলিলা বয়ে যায়, যা কবিকে আলাদা করে চেনায়। মনে হয় বাড়তি কিছু আছে।
          বইটির আর এক বৈশিষ্ট্য, এ দ্বিভাষিক। প্রতিটি কবিতার সঙ্গে তার ইংরেজি অনুবাদ আছে। তবে অনুবাদক আর একজন, নাম, বিনয় বর্মন। শুরুতে ভূমিকাও ইংরেজিতে তাঁর লেখা। অনুষঙ্গে, এই সময়ে বাংলাভাষার অন্যতম সেরা কবি মোহাম্মদ রফিকের সপ্রশংস মূল্যায়ন,—ইংরেজিতেই। যারা বাংলা জানেন না, তাঁরাও ইংরেজি মাধ্যমে কবিতাগুলোর সুর স্বাদ ও মূল্যায়ন একসঙ্গে পাবেন। আজকের বহুভাষিক বাস্তবতায় এর মূল্য কম নয়। এখানে এই বইটি নিয়েই আমার কথা। তবে তা শুরুর আগে আরো একটু আবোলতাবোল বকবক করে নেই। লেখার সবটাই যে তেমন হবে না, ঐ নিশ্চয়তা কিন্তু দিতে পারি না। ‘পড়েছি মোগলের হাতে…’ এই প্রবাদ বাক্যটির সবটা যেন অগত্যা যাঁরা পড়ছেন, তাঁরা অনিচ্ছাতে হলেও হজম করতে রাজি থাকেন। মিনতি আমার এইটুকু।
          আমরা জানি, কবিতার অনুবাদে তার অনেক লাবণ্য, অনেক সৌকর্য হারিয়ে যাবার আশংকা থেকে যায়। বিশেষ করে মূল ভাষা ও অনুবাদের ভাষা যদি দুই পরস্পর বিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক বলয়ে বিকশিত হয়ে থাকে। গীতাঞ্জলি পর্ব থেকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর কিছু কবিতা নিজেই ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। কিন্তু এতে তাঁর আত্মবিশ্বাস কখনোই খুব প্রবল ছিল না। শেষে হাল ছেড়ে দেন। যেটুকু অনুবাদ তিনি করেছেন একটু খুঁটিয়ে সেদিকে দৃষ্টি দিলে সহজেই ধরা পড়ে, বাংলায় পেলব বা গভীর অনুভবের দ্যোতনা ইংরেজিতে আসেনি। অনেক জায়গায় আক্ষরিক অনুবাদ কষ্টার্জিত বা কৃত্রিম। কোথাও কোথাও সংক্ষেপিত, ফলে তুলনায় আড়ষ্ট। উপমা-বা রূপকল্পনা হাস্যকরভাবে আবেগরিক্ত, ফলে মরা ডালের মতো নিষ্প্রাণ, অথবা আগাছার মতো শ্রীহীন। তারপরেও যদি তিনি ইংরেজি অনুবাদে নতুন মূল্য সৃষ্টি করে থাকেন, তবে তার কারণ তাঁর অলোকসামান্য প্রতিভা। একই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বিভিন্ন ভাষায় পারস্পরিক অনুবাদ সমস্যা এমন অসেতুসম্ভব হবার কথা নয়। য়োরোপ ও আমেরিকার ভাবনা ও কর্মপ্রবাহ গত প্রায় পাঁচশ বছরের যোগাযোগে বিষয়টি সেই-রকমই দেখায়। এই উপমহাদেশেও তেমনই হওয়া স্বাভাবিক। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশে এই লক্ষণ প্রত্যাশিতভাবে স্পষ্ট। কিন্তু ইংরেজির মাধ্যমে য়োরোপীয় সংযোগে এই ধারা এখন শীর্ণ। যদিও কথ্য সংস্কৃতিতে, সঙ্গীতে আদান-প্রদান আগের মতেই সচল। হয়তো যোগাযোগ আরো ব্যাপক। এখানে চলচ্চিত্রের অবদান কম নয়।
          কিন্তু য়োরোপ-আমেরিকান সাংস্কৃতিক বলয় এতটাই ভিন্ন ছিল যে সেখানে আমাদের পরম্পরার অভিঘাত প্রায় কিছুই কোনো দাগ কাটে না। যদিও উত্তমর্নের ভূমিকা এদেশের ওপরমহলে গ্রহণ-বর্জনে তারা যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। বেশ কিছু নিচু তলাতেও চুঁইয়ে পড়ে। পাশ্চাত্য সাহিত্য-সংস্কৃতির অনুবাদ ও অনুকরণ আমাদেরও কৌতূহল জাগায়। কিছুটা বা জীবনযাপনের অভ্যাসে মেশে।
          অবস্থার একটা গুণগত পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে গত শতকের আশির দশক থেকে। তার আগে সত্তরের দশকে তথ্য-প্রযুক্তিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন, চাই-বা-না চাই, পৃথিবীজুড়ে মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগে সম্ভাবনার বিচিত্র পথের দিশা চোখের সামনে এঁকে দেয়। নিজেরদের অজানতেই আমরা ঘর-বারের সীমারেখা মুছে ফেলতে থাকি। আপন-আপন ভাষায় প্রয়োগ কুশলতায় ও চিত্রকল্পনাতে এর অলক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু করে। ফলে তা সম্পূর্ণ আত্মসচেতন হয়েও বিশ্বের সংযোগে ভিড়ে যায়। অনুবাদের কাজ মূল কাঠামো ও মূল ভাবনার অনুসরণে পূর্ণ বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েও সহজ, সাবলীল ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। কবি বা অনুবাদক কাউকেই এজন্য আগের মতো সাংস্কৃতিক বিভিন্নতার দুর্ভেদ্য প্রাচীরের সামনে আটকে যেতে হয় না। অবশ্য অভিজ্ঞতা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কেউ যদি একুশ শতকে এসেও দেড় হাজার-দুজাহার বছর আগের মূল্যবোধের বোঝা ধ্রুবজ্ঞানে বয়ে বেড়াতে সদম্ভে খাড়া থাকেন, তবে তিনি এই প্রবাহে শামিল হতে পারেন না। পারেন না তাঁরাও, যাঁরা কূপমণ্ডুকতার স্বভাব থেকে বেড়িয়ে আসতে ভয় পান। রাজু আলাউদ্দিন এমন কোনোটিই নন। জীবনস্রোতে তিনি বিশ্বনাগরিক। ঘরের পরিবেশেও তারই অন্তরঙ্গ ছোঁয়া। একান্ত বাঙালি ভাবনাতেও তাঁর মিশে যায় এই সব। এদের পরিশ্রুত প্রবাহ কবিতায় তাঁর ভাষার নির্মাণ। ইংরেজি অনুবাদে তার স্বতঃস্ফূর্ত স্বাভাবিকতা ও মৌলিক সৌরভ অনেকটাই থেকে যায়। অনুবাদকের পরিচয় কিছুই জানি না। অনুমান, তিনিও একই পথের পথিক। মূল কবিতার আকর্ষণ, অনুভবের সূক্ষ্ম চলাচল, তিনি যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে বজায় রেখেছেন। এখানে অবশ্য তাদের নিয়ে আলোচনায় যাচ্ছি না। যাঁরা সত্যিকারের যোগ্য, তাঁরা তা করবেন।
          সাধারণত কবিতা ও গণিতের অহেতুসম্ভব ব্যবধান প্রসঙ্গে অনেকে বলে থাকেন, গণিতে পাই বিভিন্ন উপাদানের নানা রকম সম্পর্কে একক সমাধানের বা সমাধানরাশির প্রমাণ; আর কবিতা চলে অনুভবের মুক্তাকাশে ইচ্ছেমতো ওড়ার স্বাধীনতায়। এই বিভাজন যথার্থ কি না, এ নিয়ে সংশয় কিন্তু থেকে যায়। কবিতাও খোঁজে বাস্তবের বহুবিধ কল্পনায় অন্বয় ও অন্বয়ের অন্তর্জালে স্থিতি ও অস্থিতির বিন্যাস। প্রত্যক্ষের দৃশ্যাবলি ও কর্মচঞ্চলতা মায়া জাগায়। তাকে পূর্ণপ্রাণের সমারোহে জাগ্রত করে অন্তরালের সম্পর্ক-সম্বন্ধে কান পেতে গন্ধ-বর্ণময় ধ্বনির ঐশ্বর্যে অর্থের বা তাৎপর্যের শিল্পিত অন্বেষণে কবির অভিনিবেশ। গণিতে চলকরাশির মতি-গতি ও স্থিতি বা অস্থিতির সম্পর্কের নিষ্কাশনে যে তৃপ্তি, কবিতাতেও মায়ার আড়ালে রসের খেলায় অশেষের পেছনে ছোটায় সেই অন্তহীন যাত্রার আকর্ষণ। তবে গণিতের উপাদান বস্তুনিরপেক্ষ চিহ্ন বা সংখ্যা, যারা আত্মসাৎ করতে পারে বিশ্ব-মহাবিশ্বের যাবতীয় তাড়নার নিরাসক্তিকে; বিপরীতে কবিতার ভিত্তিভূমি ষড়ৈশ্বর্যশালিনী আসক্তির সমাহার। সেও ছোটে সচ্চিদানন্দ সমাহিতির খোঁজে। এই রকম ছোটার নমুনাই পেলাম রাজু আলাউদ্দিনের কবিতাগুলোয়। স্থান-কালের আড়াল থাকলেও বাণীরূপ তাকে অতিক্রম করতে চায়। বোধ হয় এই কারণেই এরা অধিকতর অনুবেদ্য। প্রকৃতি-পরিবেশের একান্ত সীমায় আটকে থাকে না। এই সীমাই কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে প্রতিহত করেছিল। তিনি অবশ্য আজকের প্রযুক্তিবিপ্লবে মানববাস্তবতায় প্রসারমান সমজাতীয়তা প্রত্যক্ষ করেননি।
          বইটির নাম—‘আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি’—এখানেই ‘ভালোবাসার ওক্সিমোরন’ কবিতাটির এক চরণ থেকে কেটে নেওয়া। ‘ওক্সিমোরন’ তাৎক্ষণিকভাবে শুধু ওই শব্দের ব্যবহারেই বৈপরীত্যে সামঞ্জস্যের ব্যঞ্জনা ইংগিতময় করে তোলে। এভাবে ইশারায় সমগ্রের বিশেষত্ব ফুটিয়ে তোলা, অথবা, তার কোন মেজাজে দৃষ্টি আকর্ষণ করা এই সময়ের কবিতায় নতুন তাৎপর্য আনে। অবশ্য তা প্রাণবান হলে তবেই। রাজু আলাউদ্দিনের এই কবিতাসংকলনে এর দক্ষ প্রয়োগ বারবার আমাদের মুগ্ধতা কেড়ে নেয়। প্রেক্ষাপটে বিবিধ বিচিত্র আলো ফোটে। বহুমুখে ধায়। অনুভবে প্রসারণ ও সংকোচন একই শব্দসীমায় ঘটে চলে। কৃত্রিম মনে হয় না। চেতনার স্বাভাবিকতাতেই এমনটি মানিয়ে যায়। যেমন ‘আকাঙ্ক্ষা’ অসীমের অভিসারী হতে পারে, আবার তাকে বিশেষ কোনো প্রত্যক্ষের অভিমুখীও ভাবা যায়। ‘মানচিত্রে’ সমুদ্র বইয়ের পাতায় কতটুকুই-বা জায়গা নেয়, কিন্তু বাস্তবে তার কূল-কিনারা মেলে না। ‘গোপনে আঁকা, আর, উত্তমপুরুষে বলা মুহূর্তে একে ব্যক্তির অস্তিত্বে, তার সমস্ত বৈপরীত্য ও বিপন্নতা নিয়ে, নির্দিষ্ট করে। আমরা বর্তমানের অনিশ্চিত সম্ভাবনা রাশি স্পর্শ করি। সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা, উভয়ের সামনেই প্রশ্নবোধক চিহ্ন তোলে। কবিতায় কিন্তু ভারসাম্য বজায় থাকে। তারিফ করি। নতুন কিছু পাই। তা আমাদের কল্পনায় মানববাস্তবতাকে এক ইন্দ্রয়গ্রাহ্য সম্প্রসারিত, কিন্তু অন্তর্জগতে সতত পরিবর্তনশীল, প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে। বাংলাভাষার নিজস্ব সংবেদনশীলতা ও ঐতিহ্যলালিত পরিকাঠামো কিন্তু হারিয়ে যায় না। তারা বরং অভিনব অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়। সাহসীও।
          বইটির আরো অনেক কবিতা আমাদের চেতনায় আলোড়ন তোলে। কল্পমায়া ‘নূতন আভরণে’ নূতন রূপ পায়। বিশ্বাস বা অভ্যাসের জগতেও আকস্মিক হানা দিয়ে তাতে অপ্রত্যাশিত জীবনের স্পন্দন জোগায়। ‘ঢাল-তলোয়ার ঝনঝনিয়ে’ বাজে না। লাবণ্য অটুট থাকে কিন্তু পাঠাভ্যাসে ঝাঁকি দেয়। তা কল্যাণকর। সর্বান্তঃকরণে একে স্বাগত জানাই।
          সব কবিতাই কিন্তু এক একটি পূর্ণাঙ্গ সৃষ্টি। মেদহীন, স্বয়ম্প্রভ, মার্জিত ও ব্যাকুল। রজনিগন্ধা ফুলের মতো। কোনো নমুনা খাড়া করতে চাই না। প্রত্যেক কবিতার উপলব্ধি ও উপভোগ, তার সবটা নিয়ে। বিস্ময়ের সংযোজনাও। এদের খণ্ডিত করা সংগত মনে করি না।

মূল নাম : আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি। ইংরেজি নাম : Secretly have i drawn the Map of Desire. English Translation : Binoy Barman. Edited by Khaliquzzaman Elias. Published by Kheya Prokashan. First Published Ekushe Boimela, 2017. Cover : Masuk Helal. Price : 250.

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমার B ও ৯

আমার B ও ৯

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:২৫

উদ্ভিদ

এই অপরাহ্ণে কে কার জন্যে অপেক্ষায় থাকে?
যে ড‌াঙায় ছিপ ফেলে বসে থাকে অনন্তকাল 
তার কী জলে নামার কথা ছিল? না ধুলোঝড়ে
বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে এক
ঝলক চোখে চোখ রাখবার জন্য ব্যাকুলতা ছিল
নিছক প্রেমও আজকাল ঘোড়ারোগের মতন
দাঁড়িয়ে থেকে জাবর কাটতে কাটতে বুনোঘাস
সেখানে না থাকে ঘাসফড়িং না থাকে কাচপোকা
ধুলোবালির সংসারে অপেক্ষাও হাই তুলে বসে!
যে প‌ারে সে সব পারে খড়কুটো হয়েও টিকে 
থাকতে পারে! অসীম ধৈর্য যার থাকে তার জীবনও
বড় টেকসই; মুখোশ সরিয়ে সবুজ দিগন্ত দেখতে
পায়! হে সন্দেহ এসব ছোঁয়াচে উদ্ভিদের কাছে না 
গিয়ে জ্বলন্ত আগুন ছুঁয়ে দ্যাখো, ঝলসে যাওয়া
সময়ের ভেতরে আলো-অন্ধকার মর্মতলে বাজায়
ত্রিকাল মগ্ন সুর। সুন্দরের দিকে যত ছাইভস্ম উড়ে
এসে জুড়ে বসে কিরিচ হয়ে। দ্বিধার উপকূলে ঝরা
পাতাদের বিরহসঙ্গীত। বক্ররেখা থেকে চাঁদের নদীতে
যে নামে তার ক্ষতও নীলবর্ণ হৃদয়ের মতন। কোথাও
কী আচমকা অচেনা হাওয়া বয়ে গেল? না চূর্ণ হতে
হতে যে মানুষ হারিয়েছে গন্তব্য তার জন্য কোনো পথ
নির্দিষ্ট হলো? ভাদ্রের শেষ দিনে প্রাণের ওপর দিয়ে
তীর্থ যাবার বাসনা নিয়ে যিনি আগুনের গা ঘেঁষে 
বসেন তার জ্ঞান সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই।।


বৃক্ষ
 
মায়া আছে ছায়া নেই। আজকাল 
বৃক্ষরাও বেকেচুরে বসে। স্বার্থের ঘেরা
টোপে সম্পর্করাও মুখ ফিরিয়ে নেয় 
সময়ের কার্নিশ বেয়ে যে যায় সে যায়
শরতের এমন দিনে প্রগাঢ় শব্দে বাজে
আগুন লিরিক। পথের ওপর দিয়ে পথ
চলে যায়। জলের ক্রন্দনে ভাসে আলোর
গোলক, আত্মার ধ্বনি। তারপর একা
একা বহুদূর। যেদিকে তাকাই মুখোশ
ভর্তি মুখ আর বিষজল।সব জ্বালিয়ে
পুড়িয়ে ঘাতক থিতু হয়ে বসে।অস্তিত্বের
ভেতরে এত দাহ এত শূন্যতা বুঝিনি 
আগে। লোভের অনলে খাক হয়ে যাচ্ছে
মন, সময় ও বৃক্ষ। কৃতঘ্নর লোলুপ ক্ষুধা
রক্ত‌াক্ত করে তোলে দিগন্ত। যথারীতি
পরমায়ু খেয়ে ফ্যালে লোভার্ত কুমির
ভাবনার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে খণ্ডখণ্ড
পাথর, গন্তব্যের ওপর উৎকণ্ঠা হাঁ-মুখ
খুলে বসে। সব উপমা, ঘ্রাণ, সৌন্দর্য
অদৃশ্য হতে হতে অনিশ্চিত করে তোলে
মুহূর্ত। গন্তব্য বলতে দূরত্ব, হলুদ বৈভব


শহর

একটি শহর কীভাবে মানুষের মস্তিষ্ক ভোঁতা
করে দিতে পারে তা কী তুমি জানো? নানা
পদের মানুষ শহরভর্তি। মুখোশের আড়ালে
হিংস্রতা না দেখা অভিশাপ ধূসরতা বাঁচার
বিশ্বাস। চোখহীন চোখের যাতনা লোভের
আঙটায় ঝুলিয়ে অন্ধত্ব বরণ করে নিয়েছে
যে তাকে চক্ষুষ্মান করাও বড় কঠিন আজ
ডানা ভেঙে গেলে পাখিও মুখ থুবড়ে পড়ে
শহরের উপকণ্ঠে! নীলাভ শূন্যতা কয়েদির
ম্লান হাসির সাথে দগ্ধ হতে হতে বিমূঢ় হতে
থাকে। সেই আমার বলতে আমি! নিঃসঙ্গতা
দগ্ধ পথরেখা ভাদ্রের ধূম্রজাল করোনার ক্ষীণ
ইতস্তত দ্রোহ জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে শহরকে
বৈষম্যে মুড়িয়ে দিতে উদ্যত। কী অনুচিত তা
কী শহর বোঝে? না তুমি? মধ্যদুপুরে ভাঙা
চশমার আর্তনাদ না দেখা অরণ্য ন্যায় ও
অন্যায়ের মুখোমুখি বসে। এত জটিলতা 
ভালো নয় জেনো, বিবরণের সরলীকরণ
ভালো যদিও প্রত্যাশার পরিমাপ নীতিশাস্ত্র
বোঝে না। কালের আয়নায় দ্যাখো সংসার 
সঙ সেজে উঠে যাচ্ছে যাত্রামঞ্চে। চারদিকে
এত অসঙ্গতি এত লোভ কোনো নিবৃত্তি নেই

/জেডএস/

সম্পর্কিত

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমার B ও ৯

আমার B ও ৯

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সুমোহিনী ভেনাস

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:২০

নেফারতিতি

জানি, রাজ্ঞী নেফারতিতি, চৌষট্টি কলায় পারদর্শী।
ক্ষীণকটি তনু তন্ত্রে জগৎ এখনও মন্ত্রমুগ্ধ,
ফারাওর রক্তস্রোত বাঁধা ছিল তোমার স্নানদৃশ‍্যে
শারীরিক অনুবাদে কত কবি বিষণ্ণ উন্মাদ।
স্বপ্নোপম রূপজ্ঞানে যত বাক‍্যাবলি অধীনস্থ
বহ্নি রহস‍্য কান্তায় ঝলসে ওঠে পুরুষ হৃদয়।
নয় মিথ্যা অহংকার। মিশরীয় সভ‍্যতার মাথা
নত সম্রাজ্ঞী চরণে। দূর ভবিষ্যৎ দ‍্যুতিময়।
কী করে সম্ভব হলো! চিরন্তন পুরুষ শাসনে
সে আয়ত্তাতীত দেবী গূঢ় রাজকার্যে সর্বেসর্বা!
দু’চোখের নীল শর্তে আখনাতেন সম্মোহিত, যেন
ভ্রুভঙ্গের স্থিতি ফুঁড়ে ছুটে আসে ধনুকচ‍্যুত তির।
জাদুবিদ্যা দৃশ‍্যভ্রম। প্রাচীন ধর্মের কড়া নেড়ে
জাগছে দেবতা আতেন! তরুণ সূর্যের প্রেমে রানি!
পুরুষ–প্রধান দেশ অধিষ্ঠিত নারীর আশ্রয়ে!
মনুষ্য নখের ধারে ছিন্নভিন্ন ক্ষমতা বিন‍্যাস।
নির্বাক, নিস্পন্দ চোখে শবাধারে মিশর সুন্দরী!
প্রিয় দেবী নেফারতিতি অসতর্কে প্রস্তর পুত্তলি।

               
সুমোহিনী ভেনাস

হে স্বর্ণকেশী সুন্দরী, তুমিই কী মোহিনী ভেনাস!
অপরূপা চুপ কেন? অমন কটাক্ষে কোটি কোটি
পুরুষের নিদ্রাভঙ্গ। তন্বী, তুমি শিখরদশনা
চিত্রশিল্পী বতিচেল্লি বিমুগ্ধ বিস্ময়ে এঁকেছেন
ওই সৌন্দর্য-ফোয়ারা। নগ্ন দেহে সমুদ্র জাতিকা।
কুচযুগ পক্ব আতা, রতিমন্ত্রে শ্রেষ্ঠ সুমোহিনী
যেন অনন্ত কৌতুক খেলা করে বিম্ব ওষ্ঠাধরে।
যোনিপুস্প ঢাকা দিতে নিজ কেশ টানো দিগম্বরী!
কী অমেয় রূপরাশি! মোহে বুঁদ ত্রিলোক-পুরুষ
তুমি জগৎ বন্দিতা, শশিবাক‍্যে শ্রেষ্ঠ হে বিদূষী।
তবে কোন্ অভিশাপে রাজকুমারী মিরহা শ্রান্ত বৃক্ষ?
এত ঈর্ষাপরায়ণ! মহোদয়া এত, এত ক্রোধ!
কোথাও উঠেছে প্রশ্ন, পরঃকামে স্খলিতা ভেনাস।
যতসব ক্ষুদ্র মনা বিশ্ব নিন্দুকের কথা থাক।
জানি, হে প্রসন্নময়ী, ভুল তব শৃঙ্গারশতকগাথা।
এসো দেবী বঙ্গদেশে। স্থিত হও মাতৃকা আমার,
বিশ্বখ্যাত আ্যডোনিস ধীরে ধীরে নিঃশব্দ প্রণয়ে
ধ্রুব বিষ্ণু অবতার। তুমি তার প্রিয়া বরণাভী।
দেখো পবিত্র গোলাপ দেব মন্ত্রে প্রফুল্ল কমল
অপরূপ পুন্যব্রতে তব হংসী শ্বেত লক্ষ্মীপেঁচা 
আফ্রোদিতি কেন ভাবো এ তোমার দীর্ঘ পরবাস!
সুবর্ণ আপেল নয়, স্পর্শ নাও ধান‍্যের সুবাস।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

পৃথিবী

পৃথিবী

মাছ ও রন্ধনশালা

মাছ ও রন্ধনশালা

জীবনে-মরণে মহীয়সী

জীবনে-মরণে মহীয়সী

আমার B ও ৯

আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২৩:৫৬

The most beautiful experience we can have is the mysterious. It is the fundamental emotion that stands at the cradle of true art and true science.’… Albert Einstein

শুনতে পায় সব্যসাচী। শুনতে পায় তার মতোই অনেকে।

সেই রহস্যের মধ্যে বিভোর এক শৈশব। তাকিয়ে থাকে। এক মহাসঙ্গীত বাজে। বিস্ময়ভ্রমণ আর ফুরোয় না।

সেই চলা। কত বই! পংক্তি, শব্দ, ধ্বনি …

  • কে আছো পথ দ্যাখাও।
  • খোঁজো, খোঁজো, খোঁজো, খোঁজো, খোঁজো, খোঁজো

মাথা ঝনঝন ক’রে ওঠে। এও সম্ভব! বিস্ফোরণ ঘটবে?

পা ঠক ঠক করে। তবুও পা ঠুকে উঠে পড়ে সে। পাঠক! পাঠক!

Golden eggs! সে কেমন?

‘…তবুও নক্ষত্র নিজে নক্ষত্রের মত জেগে রয়! –

তাহার মতন আলো হৃদয়ের অন্ধকার পেলে

মানুষের মত নয়, – নক্ষত্রের মত হতে হয়!...’

ওই ‘!’ নিয়েই জীবনানন্দ থেকে বিনয়ে ঢুকেছিলো সব্যসাচী।

বলেছিলো ‘বিনয় আপনি আমার B ও ৯’

‘নক্ষত্রের আলোয়’ পড়েছিলো ‘চাঁদ নেই দেখি দূরে নক্ষত্রেরা জ্বলে।’

  • সব্যসাচী তোমার কাছে বিনয়
  • বিনয়ের সাথেই বলি, সে ঘোর কাটাতে গেলে তাঁকে আরও গভীরে পড়তে হয়।

 

বিশ্রাম 

‘চোখে তার
যেন শত শতাব্দীর নীল অন্ধকার;
স্তন তার
করুণ শঙ্খের মতো— দুধে আৰ্দ্র— কবেকার শঙ্খিনীমালার;
এ-পৃথিবী একবার পায় তারে, পায়নাকো আর।’
… জীবনানন্দ দাশ

সেখানেই কি জুড়ে গ্যালো—

‘রূপকথা শুনেছি সে—কঙ্কাবতী, পদ্মমালা, শঙ্খিনীমালার।/ …/ভিজে অন্ধকারে ব’সে পরস্পর সেইসব রূপকথা বলি।’… বিনয় মজুমদার

‘কিন্তু কেউ আমার কবিতা সম্বন্ধে উচ্চবাচ্য সুরু করলো না, প্রশংসাও করলো না’

‘সব চুপচাপ, যেন আমার বই প্রকাশিত হয়নি’

‘কেউ ভালো ক’রে রিভিউও করলো না।’

 

নীরবতা!

হাসছি আমি। নীরবতাই আমাদের অলংকার। উচ্চবাচ্যই যদি শুরু না হয়, তাহলে প্রশংসার প্রশ্ন আসছে কেন, বিনয়! প্রশংসার শংসাপত্র প্রথম বইয়ের ক্ষেত্রে এক ফুয়েল অবশ্যই। আপনি নিশ্চই জানেন আপনার পূর্বে এবং সমসাময়িক বহু কবির লেখা, আর আমরা জানি আপনার পরে বহু উৎকৃষ্ট কাজ নীরবতায় ডুবে গ্যাছে। আপনি তবু আপনার জীবদ্দশায় স্বীকৃতির আলো পেয়েছেন, বাকিদের! থাক।

‘এই বিরাট দূরত্ব থেকে নক্ষত্রদের অস্তিত্বের খবর এনে দিচ্ছে কিসে। সহজ উত্তর হচ্ছে আলো।’… (বিশ্বপরিচয়/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

‘আমার কবিতা বেশ পুরোনো ধাঁচের, সেগুলিকে ঠিক আধুনিক কবিতা বলা চলে না।’

‘অন্যান্য তরুণ কবির ঢঙে লেখা তো আর চাইলেই হয়ে ওঠে না। ফলে এরূপ চিন্তা আমি করতাম না।’

—কবিতা কতবার কাটাছাঁটা ক’রে বুঝলেন ‘জীবনানন্দকে নকল করা এত সহজ ব্যাপার নয়’?

যদিও অনেকের ক্ষেত্রেই আমি দেখলাম তাকে নকল করা বেশ সহজ। কেউ বলছেন মরীচিকা, কেউ বলছেন চোরাবালি। কেউ বলছে ডুবডুবডুব, কেউ বলছে খালি। যদিও আপনার পরম্পরার প্রতি আস্থা প্রবলভাবে দেখি যখন আপনি বলেন—‘অগ্রজকে অস্বীকার করে কিছুই সম্ভব নয়’।

 

কেউ স্বয়ম্ভু নয়, আপনার অগ্রজরাও নয়, আপনার অনুজরাও নয়।

 

‘ধূসর জীবনানন্দ, তোমার প্রথম বিস্ফোরণে/ কতিপয় চিল বলেছিলো, ‘এই জন্মদিন’।’

 

জীবনানন্দের ঝ’রে যাওয়া নিয়ে আপনার জিজ্ঞাসা ও প্রাপ্ত উত্তর পাঠক আরেকবার প’ড়ে ফেলুক।

আপনার আত্মোপলব্ধি আপনার জ্বালানি হোলো। ঢঙ নয় ঢং ঢং ক’রে ব্রেক হোলো। শুরু হোলো আরেক যাত্রা।

রচনার পদ্ধতিতে নির্মাণের আলো পড়লো, আপনি সচেতন হলেন, যা সন্ধানী মানুষের সুনির্দিষ্ট শিল্পযাত্রা। হৃদয়ঙ্গম ও আত্তীকরণ, সেই সাথে পূর্বসূরির কাজগুলোকে চিহ্নিত ক’রে ব্যাপক প্রভাব কাটিয়ে ওঠা, নিজস্ব ভাষা-সন্ধান আপনাকে ‘বিনয়’ করলো।

সাঁচি, অমরাবতী, অজন্তা নিয়ে ভাবি।

তর্ক থাকুক। তা স্বাস্থ্যকর। তবুও elimination, analogy, editing, substitution, standard elements, dimension এই অনুষঙ্গে জীবনানন্দের ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ কবিতাটি সেই আত্মস্থ করার প্রমাণ বললে অত্যুক্তি হবে না। যা ইউনিক স্টাইলেই গতিময়।

রেখা রেখা রেখা

রঙ রঙ রঙ

আলো আলো আলো

স্পেস স্পেস স্পেস

অশোক মিত্র ‘নকশা’ প্রবন্ধে বলছেন—‘রসবিচারে রেখার মূল্য নিরূপণ হয় তা অন্যান্য চিত্র উপাদানের সঙ্গে কেমন মিলেছে, মিশেছে, তারই উপর।’

চোখের চেনাজানার প্রসঙ্গে Leonardo ও Raphael পেইন্টিং প্রসঙ্গে শ্রী মিত্রের লেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আমি তখনই আপনার elimination—এর প্রসঙ্গ নিয়ে ভাবছিলাম।

যে প্রথম বারে বারে ফিরে আসে বিশ্বের সৃষ্টিতে
কখনো-বা অগ্নিবর্ষী প্রচণ্ডের প্রলয় হুংকারে,
কখনো-বা অকস্মাৎ স্বপ্নভাঙা পরম বিস্ময়ে
শুকতারানিমন্ত্রিত আলোকের উৎসবপ্রাঙ্গণে।’

রবীন্দ্রনাথের ‘প্রান্তিক’ যা কবির রোগমুক্তির পর, তা তো আপনার আশ্রয়। শুরু -> শেষ -> শুরু… এই আলো-ছায়াতেই সে সম্পর্কিত।

গায়ত্রী আপনার কল্পনা নয়।

 

বিশ্রাম 

‘তবুও পাইন গাছ, ঋজু হয়ে ক্রমে বেড়ে ওঠে,/প্রকৃত লিপ্সার মতো, আকাশের বিদ্যুতের দিকে।’

১। চাকার ইতিহাস নয়, আপেক্ষিক স্থিতির মুক্তিতে আপেক্ষিক গতিময়তায় আপনি আলো ফেললেন।

২। প্রকরণ আপনাকে দিয়েছে মিলন ও বিচ্ছেদের গুণ।

৩। ‘জড় হইতে জন্তু এবং জন্তু হইতে মানুষ পর্যন্ত যে একটি অবিচ্ছেদ্য ঐক্য আছে এ কথা আমাদের কাছে অত্যদ্ভুত বোধ হয় না; কারণ বিজ্ঞান এ কথার আভাস দিবার পূর্বে আমরা অন্তর হইতে এ কথা জানিয়াছিলাম;…'—(পঞ্চভূত / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

৪। মাটি, গাছ, জল, আকাশ সবাই কি কথা বলতো কবির সাথে? কী কথা বলতো?

৫। জড় ও মনুষ্যআত্মা, দূরত্ব মাপবে কে? —

৬। ‘পাথর হোক লোহা হোক বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় তাদের মধ্যে কোনো নড়াচড়া নেই। তারা যেন স্থিরত্বের আদর্শস্থল। কিন্তু এ কথা প্রমাণ হয়ে গেছে যে তাদের অণু পরমাণু, অর্থাৎ অতি সূক্ষ্ম পদার্থ, যাদের দেখতে পাই নে অথচ যাদের মিলিয়ে নিয়ে এরা আগাগোড়া তৈরি, তারা সকল সময়েই ভিতরে ভিতরে কাঁপছে। ঠান্ডা যখন থাকে তখনো কাঁপছে, আর কাঁপুনি যখন আরো চড়ে ওঠে তখন গরম হয়ে বাইরে থেকেই ধরা পড়ে আমাদের বোধশক্তিতে।’… (বিশ্বপরিচয়/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

৭।’ আমরা জড়বিশ্বের সঙ্গে মনোবিশ্বের মূলগত ঐক্য কল্পনা করতে পারি সর্বব্যাপী তেজ বা জ্যোতিঃ-পদার্থের মধ্যে। অনেক কাল পরে বিজ্ঞান আবিষ্কার করেছে যে আপাতদৃষ্টিতে যেসকল স্থূল পদার্থ জ্যোতির্হীন, তাদের মধ্যে প্রচ্ছন্ন-আকারে নিত্যই জ্যোতির ক্রিয়া চলছে। এই মহাজ্যোতিরই সূক্ষ্ম বিকাশ প্রাণে এবং আরো সূক্ষ্মতর বিকাশ চৈতন্যে ও মনে। বিশ্বসৃষ্টির আদিতে মহাজ্যোতি ছাড়া আর কিছুই যখন পাওয়া যায় না, তখন বলা যেতে পারে চৈতন্যে তারই প্রকাশ। জড় থেকে জীবে একে একে পর্দা উঠে মানুষের মধ্যে এই মহাচৈতন্যের আবরণ ঘোচাবার সাধনা চলেছে। চৈতন্যের এই মুক্তির অভিব্যক্তিই বোধ করি সৃষ্টির শেষ পরিণাম।’ …(বিশ্বপরিচয়/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

তুলনামূলক জায়গা থেকে ঢুকে পড়ি—

৮। জগতের সঙ্গতি ও অসঙ্গতির মধ্যে এক সম্পর্কের সূত্র উপলব্ধি করা, জড়, উদ্ভিত, মানুষ যে এক অবিচ্ছেদ্য ধারায় প্লাবিত—এই বিশেষ ভাবনা আপনাকে দিলো ব্যতিক্রমী নির্মাণ।

৯। আপনি বললেন এভাবে—‘সৃষ্টির মূল যে সূত্রগুলি তা জড়ের মধ্যে প্রকাশিত, উদ্ভিদের মধ্যে প্রকাশিত, মানুষের মধ্যেও প্রকাশিত… অতএব জড় এবং উদ্ভিদের জীবন অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করতে লাগলাম আমি। এবং তাদের জীবনের ঘটনাকে মানুষের জীবনের ঘটনা ব’লেই চালাতে লাগলাম’।

১০। এভাবেই যা চিন্তায় ছিলো তাকে বিশেষ ক’রে আনলেন আপনি। নিজস্বতা ভাবনার গুণে আলোকিত হোলো।

১১। মনে পড়ছে Empedocles মিলিয়ে দিলেন Heraclitus, Thales, Anaximenes।

১২। রবীন্দ্রনাথ বললেন ‘এ তরু খেলিবে তব সঙ্গে,/সংগীত দিয়ো এরে ভিক্ষা/ দিয়ো তব ছন্দের রঙ্গে/পল্লবহিল্লোল শিক্ষা।’

‘বৃক্ষ ও প্রাণীরা মিলে বায়ুমণ্ডলকে সুস্থ, স্বাস্থ্যকর রাখে।

এই সত্য জানি, তবু হে সমুদ্র, এ অরণ্যে কান পেতে শোনো—

ঝিঁঝি পোকাদের রব—যদিও এখানে মন সকল সময়

এ-বিষয়ে সচেতন থাকে না, তবুও এই কান্না চিরদিন

এইভাবে রয়ে যায়, তরুমর্মরের মধ্যে অথবা আড়ালে।’

                                ১২ অক্টোবর ১৯৬০

১৩। সবকিছুর শেষে—‘আমি এখন যা লিখছি সে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক।’—বিনয় এ ইচ্ছে কেন!

 

বিশ্রাম

বিজ্ঞান, বিনয়, benign কি?, উৎপন্ন জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা! মিথস্ক্রিয়া? কবিতার সার্থকতা?

Isaac Asimov মহাবিশ্বের কাছে দাঁড়ালেন।

পড়তে পড়তে পৌঁছে গেলাম আবির্ভাব ও বিলয়ে।

আপনার লেখায় প’ড়ে ফেলি জন্মের রহস্য—

‘পাখি থেকে পাখি জন্মে, গাছ থেকে গাছ জন্মে, যন্ত্র থেকে যন্ত্র জন্মে, কবিতার থেকে

সকল কবিতা জন্মে, তারা থেকে সেইভাবে কেবল তারাই জন্মে—এ এক নিয়ম।

নিয়মিত গর্ভ হয়ে মাতৃগর্ভে এ-সকল—সকলই চিরকাল জন্মলাভ করে…’

জননী তারা, সন্তান তারা, ‘পিতাকে আসলে এক তারা হতে হয়—সন্তানলাভের জন্য হতে হয়…’

 

আপনি বিস্মিত হতে জানেন, তাই তো আমরা আপনার লেখায় বিস্মিত হই।

 

‘একটি চুম্বক ভেঙে খণ্ড খণ্ড করা হলে তার/প্রত্যেক খণ্ডই এক সম্পূর্ণ চুম্বক হয়ে যায়’

‘তপ্ত লৌহদণ্ড জলে প্রবিষ্ট হবার শান্তি আচম্বিতে নামে।’

‘জলীয় গান বাষ্পীভূত হয়ে যায়’

‘তবু সব বৃক্ষ আর পুষ্পকুঞ্জ যে—যার ভূমিতে দূরে দূরে/চিরকাল থেকে ভাবে মিলনের শ্বাসরোধী কথা।’

‘শুনেছি যে কতিপয় পতঙ্গশিকারী ফুল আছে’

‘আলোকসম্পাতহেতু বিদ্যুৎসঞ্চার হয়, বিশেষ ধাতুতে হয়ে থাকে।’

‘আকাশআশ্রয়ী জল বিস্তৃত মুক্তির স্বাদ পায়, পেয়েছিলো।'

‘…ক্ষত সেরে গেলে পরে ত্বকে/ পুনরায় কোশোদ্গম হবে না…’

‘বাষ্পের সহিত যদি বাতাসের মতো নাই মেশো’

‘জরায়ু ত্যাগের পরে বিস্তীর্ণ আলোকে এসে শিশু/ সৃষ্টির সদর্থ বোঝে, নিজস্ব পিপাসা, ক্ষুধা পায়’

‘শাশ্বত, সহজতম এই দান—শুধু অঙ্কুরের/ উদগমে বাধা না দেওয়া, নিষ্পেষিত অনালোকে রেখে/ফ্যাকাশে হলুদবর্ণ না—ক’রে শ্যামল হতে দেওয়া।’

‘দুপুরে মেঘের রঙ সাদা কিম্বা কালো হয় অন্য কোনো রঙের হয় না। / রাত্রি এলে সন্ধ্যাবেলা মেঘগুলি বহুবর্ণ হয়/ সোনালি রুপালি হয়, শুধুমাত্র রাত্রি এলে এ প্রকার হয়।’

‘জন্মের সময়ে সব মানুষের—শিশুদের ওজন অত্যন্ত কম থাকে।’

‘উদয়ের কালে সূর্য বৃহৎ, রক্তাভ হয়ে ওঠে।/… /মৃত্তিকা জলের চেয়ে দ্রুত তপ্ত হয় ব’লে সমুদ্রোপকূলে/সকালে স্থলের থেকে সাগরে দিকে এক বায়ু বয়ে যায়।…।’

পড়তে পড়তে শুধুই ঢুকে পড়ে এরা। আপনি যা লিখলেন কোনোটিও অজানা নয়, তবুও আপনি জানা ও দ্যাখার মধ্যে নির্মাণের গুণে বুনে দ্যান সেই রহস্য, ঢুকিয়ে দ্যান সেই রস আপনার নির্দিষ্ট ফর্মুলায় যা নতুন ক’রে দৃষ্টিকে শানিত করে, ভাবনাকে ভাস্বর করে, চেতনায় দ্যায় বিদ্যুতের চমক।

‘এই মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনাই সমগ্র বিশ্বব্যাপারের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনোটিই বিচ্ছিন্ন নয় কিছু নয়।’ এই সারকথা আপনি বললেন—‘এই বিপুল বিশ্ব—তার সম্পর্কে বিস্ময়বোধ করা ছাড়া একজন কবি আর কি করতে পারে!’

আপনি যাই মনে করুন, আমি গাইছি—‘তাই, দুলিছে দিনকর চন্দ্র তারা,/চমকি কম্পিছে চেতনাধারা,/আকুল চঞ্চল নাচে সংসারে, কুহরে হৃদয়বিহঙ্গ।’ আপনি আমার সঙ্গে গলা মেলান।

 

কেন আমি উৎপন্ন জ্ঞান বলেছি?

এককথায় আপনার ইন্দ্রিয়ানুভূতির ফসল অনুভবে উজ্জ্বল হয়েছে আপনারই প্রকাশে যা আপনার ভেতরে উদ্ভূত দর্শন।

এ বিষয়ে : নির্দিষ্ট à সাধারণ, এবং সেই সাধারণ থেকে সার্বিক সূত্রের দিকে যাত্রা আপনাকে বিশেষ করেছে সাধারণ থেকে।

আপনি নির্দিষ্টকে সাধারণ করতে গিয়ে, লেখায় সাধারণ ভাবনাকে টপকে বিশেষ দর্শনে উপনীত হলেন যা আপনার কবিতাকে মহৎ গুণ দিলো।

খুব সহজ কিন্তু জহবাবু ও সহবাবু নিয়ে এলো ‘হাসপাতালে লেখা কবিতাগুচ্ছ’—তে ‘কলা দিয়ে গেছে’ কবিতাটা—

‘মনে হয় শব্দ দিয়ে, শব্দের চেহারা এই ফল/সিঙাপুরী, মর্তমান এইসব বিশেষণে ফলের চেহারা নানারূপ/হয়ে যায়, চাঁপাকলা নামেও তো কলা আছে এক।’

আপনার ‘প্রাণী সৃষ্টি’ কবিতার দিকে তাকাই—

‘ঙুঙৃ’, ‘ঙাঙুঙা’, ‘ঞাঞ’ এই তিনটি শব্দ নিয়ে দেবতা বানিয়েছিলেন ও পাখি বসিয়েছিলেন। শব্দ তাকে যেমন অপিরিচিত থেকে পরিচিত করাচ্ছেন, তার সাথে সাথে আপনি artistic imperfection-এ তাকে সচেতন ভাবেই ব্যতিক্রমী স্থানে বাঁধছেন। ‘আকাশের দিকে তাকান। দেখুন একটি পাখি বসে আছে।’—এই পাখিকে আকাশে বসানোতে আমি আজও রোমাঞ্চিত হই।

আরেকটা দিক ‘আপনিও এরকম নতুন দেবতা বা দেবী সৃষ্টি করতে পারেন, যদিও আপনি মানুষ।’

এই লাইনটি লেখার আগে আপনি ইতিমধ্যেই মানুষ হয়ে দেবতা সৃষ্টি ক’রে ফেলেছেন, তার পরেই সৃষ্টির সমস্ত আলিঙ্গনে স্রষ্টা হিসেবে পাঠকের মধ্যদিয়ে যেকোনো মানুষকে সেই আসনে বসিয়ে দিচ্ছেন। শুধু রচনায় নয় পরীক্ষাগারে পাঠককে আপনি আপনার সহকর্মী ক’রে তুলছেন।

‘হ্বিয়াতুলি’ গাছের কথা ভাবি, ‘ফরাই-হা’ শব্দের কথা।

‘বিশেষণ’ কবিতাটা পাঠককে আরেকবার পড়তে বলি।

এগুলো ভাবতে ভাবতেই মনে হয় প্রচল অর্থবোধকতার ঘেরাটোপ টপকে শ্রাব্য ও দৃশ্যের আলোয় আপনি সৃষ্টির উৎসধ্বনিকে স্পর্শ করেছিলেন বিস্তৃতির পথে, যা আমাকে আলোড়িত করেছিলো গভীরভাবে।

আপনার লেখা পড়তে পড়তে সেই কথা—‘ঘ্রাণেন অর্ধভোজনং’ হয়েছে কি না জানি না, তবে এটা জানি—পাঠক তার শিক্ষায় দীক্ষায় অভিজ্ঞতায় যাপনে আপনার লাইনে হাঁটবে না। সে তার অনুভবে ও বোধে নিজস্ব রাস্তায় আপনার রচনাটি থেকে নিজের আলো জ্বালবে। যিনি লিখলেন আর যিনি পড়লেন তাদের চলা অর্ধেক বা গোটায় দাঁড়িয়ে থাকে ব’লে মনে হয় না।

কানে বাজছে আপনার লাইন—‘ধ্বনি শুধু ধ্বনি শুনে এবং না দেখে/আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি কাঠে শিরীষ ঘষা ধ্বনি।’

 

বিশ্রাম

 

‘কবিতাগুলি বিকশিত হয়ে বিশুদ্ধ গণিত হয়ে গেছে’

আপনি Mechanical Engineering এর ছাত্র ছিলেন। এরকম বহু ছাত্রই ছিলো, আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। কিন্তু আপনাকে যে বিষয় ভাবিয়েছে তা আমাদের ভাবিয়েছে। আপনার উদ্দেশ্য সফল।

‘I became more and more convinced that even nature could be understood as a relatively simple mathematical structure. This lucidity and certainty made an indescribable impression upon me.’ … Albert Einstein

এই উক্তি নিয়ে আপনার কাছে আসি। আপনার মডেলে ঢুকি বহির্বিশ্বকে ধারণ করার জন্য।
গণিত ও কবিতা, তাদের সঙ্গম ও বিচ্ছেদ সারা পৃথিবীতেই বহু চর্চিত। সেখানে আপনি নতুন নন, আপনার সংযোজন নতুন। ব্যক্তিগতকে বিশ্বগতকে করার প্রক্রিয়ায় সেই গণিতের শিখাটি আপনি জ্বেলে রেখেছিলেন নিরন্তর।

‘স্মরণে আসে অনেক কাল পড়েছি বিজ্ঞান,/ গণিত দিয়ে বেঁধেছে নর বিপুল বিশ্বের/সকল কিছু…’

‘ত্রিগুণে বিশ্লিষ্ট হলে ইনটারপোলেশন সিরিজের মতো/টার্মের পরেই টার্ম হয়ে যেন এ-সকল ঘ’টে যায় ঘ’টেই চলেছে

‘জ্যামিতি জমিতে ছিলো, পঙক্তিতে-পঙক্তিতে শুধু জ্যামিতিই ছিলো।’

‘আমাদের জ্ঞানদণ্ডে এক প্রান্ত শুদ্ধতম গণিত নামক শাস্ত্র আর/অন্য প্রান্ত আমাদের সকলের পরিচিত কবিতা ও কাব্য-কাব্যগুলি।/ এ এক নিয়মমাত্র, গণিত যে-ধারে থাকে আসলে বিশ্বের সব রস–/বিশ্বের সকল রস জড়ো হয়ে এসে জমা হয়ে থাকে রসের আকারে।/অন্য ধার যেই ধারে কবিতা রয়েছে তার মুখ দিয়ে এই রস পড়ে,/ বার হয়ে এসে পড়ে বাহিরের জগতে ও জগতের মোহনাগুলিতে।’

‘সঙ্গত কারণে শেষে মনে হয়, মনে হতে থাকে / চিরায়ত গণিতের সর্বোচ্চ শাখাটি আমি এবং ঈশ্বরী—/সর্বত্র বিরাজমান, বিশ্বের সকল কিছুতেই/ রূপ ও শক্তি হয়ে বিদ্যমান আছি দুজনেই।’

‘ক্রিয়াশীল থিওরেম অথবা নিয়মটিকে খুঁজে পেতে হলে সমাধান/হয়তো গণিতমতে ট্রায়াল মেথড দিয়ে বার করা, অজ্ঞাতের মান।’

‘তাহলে এক্সের বর্গ এবং ওয়াইয়ের বর্গ এবং জেডের বর্গ যোগ ক’রে নিলে—/ এই যোগফল তার ব্যাসার্ধের বর্গ হয়, এই হলো বেলুনের আকারের সূত্র তার পরে…’

‘যে কোনো গণিতসূত্র নিয়ে তার পরবর্তীদের।/বাঁ পাশে আনার পরে সে সমীকরণে/সমান চিহ্নের পরে–ডান পাশে শূন্য হয়ে যায়।’

এভাবে পড়তে পড়তে…

‘দৈর্ঘ্য, ভর ও সময় এই তিন এককের কথা/প্রায়শই উচ্চারিত হয় পৃথিবীতে,/ যেন আর কিছু নেই এই তিন একক ব্যতীত/অন্যান্য একক নেই এইরূপ কথা শোনা যায়।’

‘আমিই গণিতের শূন্য’

‘ধরিত্রীর সব প্রাণী’-র মধ্যে আমিও ভাবছি কীভাবে ঢুকে গণিতচেতনা কবিতার শরীরে, গণিতের দর্শন ইউনিভার্সাল সেটে খেলা করছে, আর তার রূপ, রস, গতি-প্রকৃতি একজন মানুষ নিবিড় অবলোকনে ও হাতে, কলমে মিশিয়ে দিচ্ছে থিওরি ও প্র্যাক্টিকালের পারস্পরিক বিনিময়ে। অখণ্ডের মতো খণ্ড, অভেদের মধ্যে ভেদ, অভিন্নতার মধ্যে ভিন্নতা, জেনারেলের মধ্যে পার্টিকুলার। এই জেনারেল প্রবলেমকে সমাধান করাই অনুভূতির সবচেয়ে বড় কাজ এবং সেখানেই থিওরেমের প্রাসঙ্গিকতা। এখান থেকেই বহির্বিশ্বের সংযোগ ও রসসিক্ত কবিতার জন্ম। আমরা এই সংযোগ থেকেই আত্মীয়তায় পৌঁছোই, ভেতর ও বাইরের নিরলস বিনিময় টের পেতে শুরু করি। ফর্মুলা বা থিওরেমের এই প্রয়োজনীয়তার প্রয়োগ আপনি কবিতায় করেছেন নিরন্তর যা আপনার কবিতাকে দিয়েছে ব্যাপ্ত (শূন্য ও পূর্ণতার) আলিঙ্গন। আমার তুলে ধরাগুলো আলাদা ক’রে দ্যাখালেও এর সম্পূর্ণ পাঠ বুনন শব্দকে কতটা প্রাধান্য দিয়েছে টের পাই, যদিও কোথাও ধারাবাহিক এই বুনন আপনার নিজস্ব জিজ্ঞাসা ও বিশ্বাসের উপর আলো ফেলতে ফেলতে বড় বেশি রকমের দীর্ঘ হয়েছে। ওই দীর্ঘ যাত্রায় যদিও আপনি ক্লান্ত হননি। আমি পাঠক হিসেবে হয়েছি কখনো।

আপনি আমাকে বললেন—‘দেখেছ গণিত আর কবিতা হুবহু মনে থাকে।’

আপনি আস্বাদ নিয়েছেন particular problem থেকে theorem এ পৌঁছনো পর্যন্ত। এই ব্যুৎপত্তি, এই সমীকরণ।

কিছু বলবেন Bertrand Russell ও Emily Dickinson?

কিছু বলবেন William Rowan Hamilton?

‘রুবাইয়াৎ’-এর ওমর খৈয়াম, আপনি?

রোমানিয়ান কবি ও গণিতবিদ Ion Barbu আপনাকে নিয়েও ভাবছি।

আর এগোতে এগোতেই অনিন্দ্য রায়ের কথা মতো ঘুরে এলাম KAZ MASLANKA-র ব্লগে। পড়লাম ‘Polyaesthetics and mathematical poetry’, এবং পরিচিত হোলাম তাঁর দেওয়া ‘Mathematical Poetry’-র সংজ্ঞার সাথে।

বিনয় আপনি জানেন এই বাংলাতেও গণিত ও কবিতা নিয়ে অনেক কাজ হচ্ছে? অনিন্দ্য রায়ের ‘অঙ্ক কবিতা’ ব’লে গবেষণামূলক কাজটি পড়তে পারেন। লেখার শুরুতে আছে—‘বব গ্রুম্যান ও বিনয় মজুমদারকে’।

একটা মজার জায়গা দিয়ে এই পর্ব শেষ করি—

‘ভোলানাথ লিখেছিল,
তিন-চারে নব্বই

গণিতের মার্কায়
কাটা গেল সর্বই।
তিন চারে বারো হয়,
মাস্টার তারে কয়;
‘লিখেছিনু ঢের বেশি’
এই তার গর্বই।’
… রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পাঠক এরও শেষে আপনারা আরেকবার বিনয়ের ‘কবিতা বুঝিনি আমি’ থেকে ‘প্রায় প্রত্যহই আমি’ প’ড়ে ফেলুন আরেকবার।

 

বিশ্রাম

 

‘সমুদ্র, নক্ষত্র, চাঁদ, নদী, ফুল সহজেই একসঙ্গে কলরব করে’

কবিতা সংযোগ বিশ্বব্রহ্মাণ্ড --> রসসিক্ত কবিতা

কবিতা সংযোগহীন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড --> রসবিরহিত কবিতা

এই রসপূর্ণতার উপলব্ধিতে স্টিমুলাস ও রেসপন্সের কথা আমি ভাবি।

‘রসাত্মক বাক্য লেখা কবে যে আয়ত্ত হবে, ভাবি’—আর তা আয়ত্তের পর বহির্বিশ্বের সঙ্গে সংযোগের কথা ভাবেন। ‘বহির্বিশ্ব কবিতা নামক পাত্রে রসনিষেক করে’।

এই সংযোগের কথা আপনি বারংবার বলছেন।

‘কোনো ফলের রসই—আম, লিচু প্রভৃতি ফলের রসে স্বয়ংসম্পূর্ণ রস থাকে না, মুখগহ্বরের লালার সহিত মিলনেই ও-রস মিষ্ট হয়, হয়ে যায়…’

এই আদিম, অকৃত্রিম রসের ধারা আপনাকে প্লাবিত করেছে শেষ দিন পর্যন্ত বুঝতে পারি। আপনি নিজেই কবিতায় সচেষ্ট হন, সেই লোভটুকু জাগিয়ে রাখেন। সেখানে জ্যোৎস্নাকামী এক চিন্তন যেমন দেখি, তেমনই দেখি বারংবার ‘মাংস’ শব্দের আশ্রয়, দেখি ‘শূন্যলেহন’, ‘তমোরস’, ‘আহার্যের ঘ্রাণ’, ‘লাস্যময়ী অগ্নি’, ‘পিপাসার্ত তুলি’, ‘মাতালের আর্ত নেশা’, ‘সুগভীর মুকুরের প্রতি ভালোবাসা’, ‘মিলনচিৎকার’, ‘আশ্চর্য ফুল’, ‘রসাবিষ্ট হরিতকী ফল’,‘সেতু শুয়ে থাকে ছায়ার উপরে’ ‘কুসুমের শব্দময় হাসি’, ‘তেলের খনির নিচে ভালোবাসাবাসি’, ‘যৌনাঙ্গ’, যুবক ও যুবতীর ভাব, রমণ, ‘নরম-নরম লাগে চাঁদের পাহাড়’, ‘মদিরা’, ‘গুহার রস’, ‘ভুট্টার কাত হয়ে পড়া’, ‘দেখি, টিপি, টানি, ঘষি’…

রস তার আদি মধ্যে অন্তে একাকার। সে কাব্যের প্রাথমিক গুণগুলোর একটি।

এমন কি আপনার ‘অঘ্রানের অনুভূতিমালা’ নারীভূমিকা বর্জিত আপনার কথায়, কিন্তু একাকিত্বের মধ্যেও আদিরস বর্জিত ব’লে আমার মনে হয় না। প্রকৃতির মধ্যেও আমি রসসন্ধানী হয়ে সেই রূপ, রস, গন্ধ, বর্ণের কাছে যাচ্ছি। আপনার অবগাহন আমার বাইরেটাকে ভেতরের আলিঙ্গন দিচ্ছে। আমিও সেই সংযোগে বুঁদ হয়ে মোহানা মোহানা মোহানা মোহানা বলতে বলতে কাত হয়ে পড়ছি। আমার কল্পনাবিস্তার আমারই। আপনার হাত নেই।

‘প্রতি অঙ্গ লাগি  কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর’ 

‘‘বাল্মীকির কবিতা’ বইখানির কথা মনে পড়লেই আমি খুব লজ্জা পাই। তার কারণ অত্যন্ত অশ্লীল গোটা কয়েক কবিতা এই বইতে আছে।’

আপনি অন্যদিকে তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠিতে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার উদাহরণ দিয়ে লিখেছিলেন ‘এতো অশ্লীল কবিতা। সমস্ত ডাক্তারী বইও অশ্লীল।…’

সঙ্গম ও প্রশান্তি। চুম্বন, লেহন, স্পর্শ, মর্দন। সৃষ্টি ও সম্ভাবনার মধ্যে আমরা ঝুঁকে পড়ি।

বিশ্বসাহিত্যের বহু লেখাই তবে অশ্লীল!

আপনি তো যৌনতার অবগুণ্ঠন খুললেন, দ্যাখালেন এইভাবেও লেখা হয়। একে জড়তামুক্তি হিসেবেই দেখছি।

আপনিই তো লিখলেন—‘—এই ব্যাপারের তুল্য অন্য কোনো কীর্তি মানুষের নেই বলে স্পষ্ট টের পাই।’

কবি নিষ্কাম নন।

কবির যৌন আকাঙ্ক্ষা আছে বাকিদের মতোই। ফলে ‘অশ্লীল’ শব্দটাকেই আজ বড় বেশি অশ্লীল মনে হয়।

কুমারসম্ভবের কবি কালিদাস কী বলছেন?

Nudity নিয়ে চিত্রশিল্পীরা, চলচ্চিত্রশিল্পীরা?

 

পাশাপাশি দুটো ছবি—Claude Monet—এর ‘Lady in the garden’ আর Paul Cezanne-র ‘The smoker’। ব্যক্তির উপস্থিতি দুরকম সংযোগের মধ্যে আছে, অথচ এই দুজনের জড়িয়ে থাকার উপর ছবির ফ্রেমমুক্তি দাবি করছে দুটো অবস্থা। ছবির রসাস্বাদনের সময় একজনের উপস্থিতি তার চারপাশকে প্রকট করছে, আরেকটিতে চারপাশ—ব্যক্তিটিকে প্রকট করছে।

 

বিশ্রাম

 

সংযোগ

১। নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে একজন মানুষ সমস্ত রহস্যের মুখোমুখি হচ্ছেন।

২। দিনপঞ্জী তাঁর কবিতাকে আশ্রয় করছে।

৩। পারিপার্শ্বিক জগতের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করছেন।

৪। পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধির আলো কল্পনাশ্রয়ী হচ্ছে।

৫। বিষয়বস্তুকে অবলম্বন ক’রে নিজস্ব যুক্তি ও বিচারের আলোয় অধীত শিক্ষাকে মিশিয়ে দিচ্ছেন।

৬। অবয়ব থেকে অনুভূতির ক্ষরণ ঘটছে, চুইয়ে পড়ছে বলা ভালো।

৭। সঞ্জাত সিদ্ধান্ততে উপনীত হচ্ছেন।

৮। বস্তুর সাথে মানসিক সম্পর্ক।

৯। বৈশ্বিকতার দিকে অগ্রসর হতে গিয়ে বর্ণনার মধ্যদিয়ে বিশেষকে সাধারণ করা।

১০। concrete to abstract

১১। জীবন ও জগৎ একই শরীরে মিশে খুঁড়ে চলেছে রহস্যের পথ। এক শিশুর মনস্তাত্ত্বিক ক্রমবিকাশও জায়গা নিয়েছে।

১২। ভাব শব্দের অধীনে ‘যন্ত্রের অন্তর্নিহিত তত্ত্ব, দেহবিধৃত অনুভূতি, গণিতের দর্শন, কবিতার অনুভূতি’ লেখার বীজ হয়েছে।

১৩। Psychological association, দর্শনসমীকরণ, হৃদয়াবেগ সমীকরণ।

১৩। ঘুম, ক্ষত, রহস্য, জন্ম, যৌবন, অসুখ, আলিঙ্গন, মিলন, জ্বলা, জেগে ওঠা, নিরাময়, মাধুর্য, মৃত্যু, বার্ধক্য, সুখ, আত্মহত্যা, বিরহ, নেবা, আপেক্ষিক স্থিতি, আপেক্ষিক গতি, যোগ, বিয়োগের এক আশ্চর্য সমীকরণ।

১৪। শরীর যার আছে, ভাবনাও তার আছে।

১৫। মহাকালো ও আলোর মাঝে এক পর্যটন। সম্পর্কিত কার্যকারণের ছায়ায় এসে বসে।

বলা যায় এ যা কিছু, তার রসায়নই আপনার লেখার সজীব উপস্থিতি। আপনার কাব্যরচনার উপকরণ যা আপনাকে দিয়েছে নিজস্ব রাজপথ। সময়ের মধ্যে থেকে বৃহত্তর উম্নীলন।

 

বিশ্রাম

 

‘চিরকাল একত্রিত হয়ে থাকো’

আপনার নির্মাণ সেই পথেই চলেছে। কারণ আপনি আপনার ভাবনার প্রয়োগ করেছেন আপনার লেখায়।

দেহ ও অন্তর এক এবং অভিন্ন এই ভাবনায় আপনি পৌঁছে যান অবয়ব ও ভাবের একাত্মরক্ষায়।

নারীদেহের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ ও কবিতার যোগ নিয়ে আপনার লেখাটার কাছে দাঁড়াই।

উত্তেজনাপূর্ণ, যৌনতাপূর্ণ এবং রহস্যময় অনুভূতি?

আপনার প্রেম একমুখী?

গায়ত্রী? ঈশ্বরী?

শারীরিক?

মানসিক?

আত্মিক?

বিকৃত?

গুপ্ত?

নগ্ন?

না?

হ্যাঁ?

প্রেম প্রেমই।

‘শুধু কৌতুকে কেন মনোলীনা অমন দুললে?’

‘মানুষীর আকৃতির মতো তুমি দেখা দিয়েছিলে’

‘আর অন্ধকার নয়, আর নয় অবাঞ্ছিত ছায়া।’

‘প্রত্যাখ্যাত প্রেম আজ অসহ ধিক্কারে আত্মলীন।’

‘পর্দার আড়ালে থেকে কেন বৃথা তর্ক ক’রে গেলে—’

‘সফল কবিতা আজ নিপুণিকা প্রেমিকার মতো’

‘ছবি আঁকবার কালে, কোনো যুবতীর ছবি আঁকার সময়ে/ তার সব প্রত্যঙ্গকে হাজির রাখাই হলো বেশি দরকারি—’

‘পরস্পর ভালোবেসে শুয়ে আছি ঈশ্বরী ও আমি ও সময়’

‘যে-কোনো সহসম্পর্ক স্থাপন প্রকৃতপক্ষে, সখি, লেহন মর্দন ঠাপ চুম্বনের মতো মান রূপে…’

‘ভুট্টাটি সহজভাবে ঢুকে গেল সঙ্গে সঙ্গে ধাক্কা শুরু করি।’

‘আমার ঠিকানা আছে তোমার বাড়িতে,/ তোমার ঠিকানা আছে আমার বাড়িতে,/চিঠি লিখব না।/আমরা একত্রে আছি বইয়ের পাতায়।’

পাঠক যে কবিতাগুলো থেকে এই লাইন তুলেছি সেগুলো খুঁজে আরেকবার পড়তে পড়তে উপরে করা পশ্নগুলোর উত্তর খুঁজুন।

প্রেম প্রেমই।

 

বিশ্রাম

 

আপনার অভিজ্ঞ ছন্দ

‘আমাদের পুরাণে ছন্দের উৎপত্তির কথা যা বলেছে তা সবাই জানেন। দুটি পাখির মধ্যে একটিকে যখন ব্যাধ মারলে তখন বাল্মীকি মনে যে ব্যথা পেলেন সেই ব্যথাকে শ্লোক দিয়ে না জানিয়ে তাঁর উপায় ছিল না। যে পাখিটা মারা গেল এবং আর যে একটি পাখি তার জন্যে কাঁদল তারা কোনকালে লুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু এই নিদারুণতার ব্যথাটিকে তো কেবল কালের মাপকাঠি দিয়ে মাপা যায় না। সে-যে অনন্তের বুকে বেজে রইল। সেইজন্যে কবির শাপ ছন্দের বাহনকে নিয়ে কাল থেকে কালান্তরে ছুটতে চাইলে। হায় রে, আজও সেই ব্যাধ নানা অস্ত্র হাতে নানা বীভৎসতার মধ্যে নানা দেশে নানা আকারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু সেই আদিকবির শাপ শাশ্বতকালের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে রইল। এই শাশ্বতকালের কথাকে প্রকাশ করবার জন্যেই তো ছন্দ।’… রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

(আপনার ছন্দ নিয়ে বলতে যাওয়া অতিরিক্ত। আপনিই সব বলেছেন প্রবন্ধে।)

কয়েকটি কথা

১। আপনিও প্রকাশ করলেন ছন্দে।

২। বাঁধলেন মুক্তি দিতেই।

৩। আপনি গণিতের মানুষ, গাণিতিক মডেল আপনার ভেতরে। আপনার ছন্দ তাই ভারসাম্য বজায় রেখেই সাবলীল।

৪। আপনার মাত্রাজ্ঞান স্মরণীয়।

৫। পরিমাপে আপনি সিদ্ধহস্ত।

৬। মিশ্রকলাবৃত্তর মতো বনেদি ছন্দের ব্যবহার আপনাকে মানাল। সংযত ও গম্ভীর ভাব তাকে মান্যতা দিলো। ঘোড়দৌড় কি আপনার কবিতায় মানায়?

 ৭। ওই ২মাত্রার জিরিয়ে নেওয়া।

৮। ছন্দের সঙ্গে জিহ্বার সম্পর্ক।

৯। আট-ছয় আট-ছয় পয়ারের ছাঁদ কয় …

১০। আপনি কানে কানে বললেন—‘কেউ নিখুঁত পয়ার লিখতে পারলেই তাকে কবি ব’লে স্বীকার করা যায়, স্বীকার করা উচিত।’

আমি হেসে মনে মনে বললাম—‘এ আপনার পয়ার লেখার নিখুঁত পদ্ধতি আবিষ্কারের আনন্দ মাত্র’।

এক বিশ্বপথিক এভাবেই হাঁটে, এক বিস্ময়বালক এভাবেই খ্যালে, এক মহামস্তিষ্ক এভাবেই চলে,

এক অবিরাম ঘড়ি থামে না

থামে না।

অসীমতায় হাত রাখে সীমায় ব’সে।

মহাবিশ্বর স্পন্দন মাপে নিজের তৈরি স্টেথোস্কোপ দিয়ে।

এক নক্ষত্র দেখি আমি।

বিনয় আপনি—

শুধু গণিতে নয়

শুধু গায়ত্রীতে নয়, ঈশ্বরীতে নয়

শুধু সঞ্জাত দর্শনে নয়

শুধু বিজ্ঞানে নয়

শুধু ছন্দে নয়

শুধু ভুট্টায় নয়

শুধু ‘প্রকৃত প্রস্তাবে’, ‘মুকুরে প্রতিফলিত’ নয়

আপনি আমার B ও ৯। আপনি কবিতাময়, কবিতাময়…

মৌমাছির রসনা মিষ্টতাকে পূর্ণ ক’রে নিলো। পান করলো।

মনে পড়ছে

একটা প্রশ্ন ক’রে আপনাকে বিব্রত ক’রে ও আপনার একটি কবিতা দিয়ে শেষ করি—

‘কে কত বড় গুরু তা বিচার হয় তার শিষ্য দিয়ে।’—আপনার গুরু হওয়ার বাসনা জেগেছিলো কেন?

 

এ জীবন / বিনয় মজুমদার

পৃথিবীর ঘাস, মাটি, মানুষ, পশু ও পাখি—সবার জীবনী লেখা হলে

আমার একার আর আলাদা জীবনী লেখা না-হলেও চলে যেতো বেশ।

আমার সকল ব্যথা প্রস্তাব প্রয়াস তবু সবই লিপিবদ্ধ থেকে যেতো।

তার মানে মানুষের, বস্তুদের, প্রাণীদের জীবন প্রকৃতপক্ষে পৃথক পৃথক

অসংখ্য জীবন নয়, সব একত্রিত হয়ে একটি জীবন মোটে; ফলে

আমি যে আলেখ্য আঁকি তা বিশ্বের সকলের যৌথ সৃষ্টি এই সব ছবি।

বল্কলে আঙুল রেখে আমি বলি ‘এ কী বলো’ এবং উত্তর পাই ‘গাছ’।

পাতায় আঙুল রেখে আমি বলি ‘এ কী বলো’ তখন উত্তর পাই ‘গাছ’।

শিকড়ে আঙুল রেখে আমি বলি, ‘এ কী বলো’ তবুও উত্তর পাই ‘গাছ’।

কুসুমে আঙুল রেখে আমি বলি ‘এ কী বলো’, এবারো উত্তর পাই ‘গাছ’।

তা সত্ত্বেও পৃথিবীতে অত্যন্ত বিশিষ্ট ব’লে ফুলকে পৃথক ক’রে ভাবি—

প্রণয়িনী ফুল বলি, এ রীতিও রয়ে গেছে; প্রকৃতিতে ব্যক্তি আছে,

                                                        ব্যক্তি পূজা আছে।

জীবন ফুরিয়ে এল, এই সব জেনে খ্যাতি তৃপ্তি প্রণয়ের সেঁক

চেয়ে চেয়ে শালবনে বাঁশবনে এ জীবন কাটিয়ে দিয়েছি।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

পর্ব—তিন

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২৩:৫৪

পূর্বপ্রকাশের পর

এরিস্টটলের সাহিত্যতত্ত্ব

এরিস্টটল (৩৮৪ খ্রি. পূ.-৩২২ খ্রি. পূ.) ছিলেন প্লেটোর সবচেয়ে বিখ্যাত ছাত্র। তাঁর জন্ম মেসিদোনিয়ায়। ১৭ বছর বয়সে তিনি এথেন্সে এসে প্লেটোর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ৩৪৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্লেটোর মৃত্যুর পরে তিনি এথেন্স ত্যাগ করেন। ৩৩৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে তিনি পুনরায় এথেন্সে ফিরে আসেন এবং তাঁর স্কুল লাইসিয়াম শুরু করেন। ৩২২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে তিনি লাইসিয়াম থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন এবং ঐবছরই ক্যালচিস নামক শহরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বলতে গেলে জ্ঞানবিজ্ঞানের এমন কোনো শাখা যার ওপর এই ৬২ বছরের জীবনে এরিস্টটল কাজ করেননি। জ্ঞানবিজ্ঞানের এই সকল শাখায় তিনি যে বইগুলো রচনা করেছিলেন সেগুলো হারিয়ে গেছে। যা আছে তা সম্ভবত তার লেখা বই নয়, বরং খুব সম্ভবত তাঁর কাছ থেকে নেওয়া বিভিন্ন লেকচার নোটের সংকলন। ফলে এগুলো প্লেটোর ‘দি রিপাবলিক’-এর মতো সুলিখিত নয় এবং সাহিত্যগন্ধীও নয়। সাহিত্য বিষয়ে ‘পোয়েটিকস’ নামে তাঁর যে বইটি আমাদের কাছে আছে সেটিও সেরকম একটি লেকচার নোটের সংকলন। নোটগুলো তিনি হয়তো তাঁর লাইসিয়ামে লেকচারের জন্য তৈরি করেছিলেন। ফলে গ্রন্থভুক্ত বিষয়গুলোর আলোচনায় সুসংগঠিত পরম্পরা নেই, এবং ক্ষেত্রবিশেষে অনেক অস্পষ্টতা ও দুর্বোধ্যতা রয়েছে। তারপরও এটিই সাহিত্যতত্ত্ব বিষয়ে দুনিয়ার সকল দেশে সবচেয়ে বেশি রেফারেন্স দেওয়ার একটি বই। এরিস্টটলের সাহিত্যতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা মানে হলো এই বইটি নিয়েই আলোচনা।

‘পোয়েটিকস’ গ্রন্থের পরিচ্ছেদগুলোকে তিনটি পর্বে ভাগ করা যায়। পরিচ্ছেদ-১ থেকে পরিচ্ছেদ-৫ পর্যন্ত বিস্তৃত প্রথম পর্বটিকে বলা যেতে পারে গ্রন্থটির সূচনা পর্ব যেখানে মাইমেসিস বা শিল্পের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য অনুকরণের অর্থ ও প্রকরণের আলোচনা রয়েছে। দ্বিতীয় পর্বের বিস্তৃতি পরিচ্ছেদ-৬ থেকে পরিচ্ছেদ-২২ পর্যন্ত। এ পর্বে মাইমেটিক আর্ট বা অনুকরণ শিল্পের একটি রূপ হিসেবে ট্র্যাজেডির গঠন ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা রয়েছে। পরিচ্ছেদ ২৩ থেকে ২৬ পর্যন্ত তৃতীয় পর্বে রয়েছে ট্র্যাজেডির সাথে মহাকাব্যের তুলনা। আমরা এখানে বইটির পরিচ্ছেদ ধরে আলোচনা করব না। আমরা এখানে বরং ‘মাইমেসিস’ বিষয়ে এরিস্টটল ও প্লেটোর ভাবনার পার্থক্য এবং সেই পার্থক্যের সূত্র ধরে এরিস্টটল কর্তৃক সূচিত সাহিত্যবিষয়ক নতুন ভাবনার গতিপথ দেখব।

একথা বহু পণ্ডিত বলেছেন যে, এরিস্টটলের পোয়েটিকস ভিতরে ভিতরে প্লেটোর মাইমেসিস থিয়োরির একটি সমালোচনা এবং মাইমেসিসের বিরুদ্ধে প্লেটোর উচ্চারিত অপবাদগুলোর একটি জবাব। তবে সে জবাব সরাসরি নয়, হয়তো তাতে গুরুনিন্দা হয় বলেই এরিস্টটল সরাসরি প্লেটোর নামও উচ্চারণ করেননি এবং প্লেটোর অপবাদের ধরে ধরে একটি একটি করে জবাবও দেননি।

প্লেটোর আলোচনার মতোই এরিস্টটলও তাঁর আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছেন মাইমেসিসকে, তবে মাইমেসিসের কোনো সংজ্ঞা দেওয়ার তিনি প্রয়োজন করেননি। সংজ্ঞা দিলে সে সংজ্ঞা গুরুর ভাবনার প্রতি সরাসরি দ্রোহ রূপে উচ্চারিত হবে সে ভাবনায়ও তিনি মাইমেসিসের সংজ্ঞা না দিয়ে থাকতে পারেন। তবে সংজ্ঞায় না বললেও আলোচনায় এরিস্টটল ধীরে ধীরে স্পষ্ট করেছেন তিনি কীভাবে মাইমেসিস বিষয়ে প্লেটো থেকে আলাদাভাবে ভাবছেন। প্লেটো বারবার বলেছেন যে, মাইমেসিস হলো প্রকৃতিকে এবং প্রকৃত বস্তুকে সত্য ও সঠিক রূপ থেকে ধাপে ধাপে বিকৃত করার একটি প্রয়াস। অথচ এরিস্টটল তাঁর পোয়েটিকসের ৪ নং পরিচ্ছেদে লিখেছেন ‘Poetry in general seems to have sprung from two causes, each of them lying deep in our nature. First, the instinct of imitation is implanted in man from childhood, one difference between him and other animals being that he is the most imitative of living creatures, and through imitation he learns his earliest lessons; and no less universal is the pleasure felt in things imitated.’

আশ্চর্যের সাথে লক্ষণীয় যে এই বাক্যদুটোতে এরিস্টটল যতগুলো অবধারণকে প্রকাশ করেছেন তার সবকটাই প্রায় সরাসরি মাইমেসিস বিষয়ে প্লেটোর অবধারণগুলোকে অস্বীকার করে। প্লেটো বলেছেন মাইমেসিস প্রকৃতিকে তথা প্রকৃত সত্যকে একধাপ বিকৃত করে। তার মানে প্লেটোর মতানুযায়ী মাইমেসিস একটি প্রকৃতিবিরুদ্ধ প্রক্রিয়া। কিন্তু এরিস্টটলের মতে মাইমেসিস প্রকৃতির গভীরে প্রোথিত এবং প্রকৃতির গভীর থেকে উৎসারিত (lying deep in our nature)। এরিস্টটলের মতে অনুকরণের প্রবৃত্তি মানবের জন্ম থেকে অর্জিত। তাই এ প্রবৃত্তি পরিহার্য তো নয়ই বরং এই প্রবৃত্তিই মানুষকে পশুজগতের থেকে আলাদা করেছে, অর্থাৎ এটি মানবজন্মকে মহীয়ান করে তুলতে পারে এমন এক চর্চা। অথচ প্লেটো বলেছিলেন মাইমেসিস বা অনুকরণ মানুষকে অজ্ঞানতার অন্ধকারের দিকে চালিত করে। আরো এক ধাপ এগিয়ে এরিস্টটল বলেছেন অনুকরণ একটি সার্বজনীন নান্দনিক আননন্দের উৎস। প্লেটো বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই অনুভব করতেন যে, তাঁর সুযোগ্য শিষ্য এই অবধারণগুলোর প্রতিটির মধ্যদিয়ে তাঁকে একটি করে চপেটাঘাত করছেন। 

মাইমেসিসকে এভাবে মহীয়ান করে তুলে এরিস্টটল ইহাকে শিল্পের জন্য অপরিহার্য ঘোষণা করলেন। তিনি বললেন শিল্পের যতরূপ আছে সবই আদিতে অনুকরণ। শিল্পের রূপ নির্ধারিত হয় অনুকরণের মাধ্যমের ওপর ভিত্তি করে। অনুকরণের মাধ্যম ভাষা হলে শিল্পরূপটির নাম হয় সাহিত্য, মাধ্যম সুর হলে তার নাম হয় সঙ্গীত, মাধ্যম ছন্দ (rhythm) হলে তার নাম হয় নৃত্য। অনুকরণের মাধ্যমের পরে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনুকরণের বস্তু বা বিষয়টি। অনুকরণের বিয়য়বস্তু মহৎ মানুষের কর্মকাণ্ড হলে নির্মিত হয় মহাকাব্য বা ট্র্যাজেডি আর নিচশ্রেণি বা খল চরিত্রের মানুষের অনুকরণের মধ্যদিয়ে নির্মিত কমেডি। অনুকরণের অন্তর্গত এই সকল বিষয় বিবেচনায় রেখেই মাইমেসিস সম্পর্কে ভাবতে হবে। মাইমেসিসকে ভাবতে হবে অনুকরণের মাধ্যম, বিষয় ও চারিত্র্যের সাথে সংশ্লিষ্ট করে, প্লেটোর ‘ফরম’ সম্পর্কিত মতবাদের সাথে সংশ্লিষ্ট করে নয় কিংবা মিরর ইমেজের উৎপাদক হিসেবে জ্ঞান করে নয়। ‘ফরম’ সম্পর্কিত প্লেটোর মতবাদের সাথে মেলাতে গেলেই মাইমেসিসের দায় হয়ে পড়ে যে বস্তুকে সে অনুকরণ করছে তার একটি দার্পণিক প্রতিবিম্ব বা মিরর ইমেজ তৈরি করা। কিন্তু মাইমেসিস তার মাধ্যম, বিষয়বস্তু আর চরিত্রগত আচার (manner) দ্বারা এমনভাবে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন একটি বিষয় যে তার দায় পড়েনি বস্তুর দার্পণিক প্রতিবিম্ব তৈরি করা। এভাবে ভাবতে পারলে মাইমেসিসকে মুক্ত করা যাবে প্লেটোর আরোপিত অপবাদগুলো থেকে। এ কথা বোঝাতেই এরিস্টটল ‘পোয়েটিকস’-এর একদম শুরুতেই বলেছেন ও I propose to treat of poetry in itself| এই in itself এর ইঙ্গিত হলো মাইমেসিসকে প্লেটোর ‘ফরম’ সম্পর্কিত মতবাদের সাথে সংশ্লিষ্ট করে ভাবা যাবে না। এভাবে এরিস্টটল প্লেটোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে মাইমেসিসকে শুধু শিল্প অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিতই করেননি, মাইমেসিসের মাধ্যমে অর্জিত শিল্পের রূপ ও প্রকরণ সম্বন্ধেও তিনিই প্রথম তাত্ত্বিক ধারণা দিয়েছেন।

এরিস্টটলের তত্ত্বমতে সাহিত্য মাইমেটিক আর্ট হিসেবে দার্পণিক প্রতিবিম্ব তৈরি করে না, বরং বস্তুর আইকন তৈরি করে। এরিস্টটল ‘পোয়েটিকস’-এর ৪র্থ পরিচ্ছেদে লিখেছেন ‘Thus the reason why men enjoy seeing a likeness is that in cotemplating it they find themselves learning or inferring, saying perhaps ‘Ah, that is he’. For if you happen not to have seen the original, the pleasure will be due not to the imitation as such, but to the execution, the colouring, or some such other cause.’ এরিস্টটল এখানে বলেছেন যে, মাইমেসিসের কাজ হলো সাদৃশ্যভিত্তিক, সাদৃশ্যের মাধ্যমে অনুকৃত বস্তুর কাছাকাছি যাওয়া (seeing a likeness), মোটেই অবিকল বস্তুটি উৎপাদন করা নয়। আর এই সাদৃশ্যের জন্য মূল বস্তুটি আদৌ দরকারিও নাও হতে পারে। কারণ মূল বস্তু আদৌ না দেখেও, শুধু অনুকৃত বস্তু দেখেও আনন্দ লাভ ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে অনুকরণ নয়, কাজটির সম্পাদন (execution), সে সম্পাদনে রঙের ব্যবহার বা অন্য কোনো বিষয়ের কারণেও আনন্দটি লাভ করা যেতে পারে। মোটের ওপরে এরিস্টটল পুরোপুরি সরে গেছেন প্লেটোর সেই আপ্ত ধারণা থেকে যে, মাইমেটিক আর্টের কাজ হলো বস্তুর প্রতিবিম্ব উৎপাদন। এরিস্টটল বরং বলতে চান অনুকৃত বস্তু কোনো দিন না দেখেও বস্তুর এই অনুকরণশিল্পের সাধনা সম্ভব। কথাটি আরো স্পষ্ট হয় ‘পোয়েটিকস’-এর ২৫তম পরিচ্ছেদে। সেখানে এরিস্টটল বলছেন not to know that a hind has no horns is a less serious matter than to paint it inartistically । দেখা যাচ্ছে, শিংসমেত একটি হরিণী অংকন করা যা বস্তু সত্যের পুরো লঙ্ঘন তা-ও মাইমেটিক আর্টে মেনে নেওয়া সম্ভব। তার মানে হলো মাইমেটিক আর্টের কাজ নয় প্রকৃতির প্রতিবিম্ব নির্মাণ, তার কাজ হলো অনুকরণের নিজস্ব রীতি-বৈশিষ্ট্যের মধ্যে থেকে নান্দনিক আনন্দ সৃষ্টির লক্ষ্যে বস্তুর প্রতীকী উপস্থাপন বা বস্তুর আইকন নির্মাণ।

আইকন মানে ঠিক বস্তুটি নয়, বরং বস্তুর সাথে অপরিহার্য সম্পর্কযুক্ত এমন কিছু যা ঐ বস্তুকে বোঝায়। ‘গাছ’ দ্বারা আমরা যে বস্তুটি বুঝি তার সাথে ‘গাছ’ ধ্বনির কোনো অপরিহার্য সম্পর্ক নেই, বরং যে সম্পর্কটি আছে তা সম্পূর্ণ খামখেয়ালি গোছের। ফলে ‘গাছ’ শব্দটি বস্তু গাছের কোনো আইকন নয়। কিন্তু একটি মুখমণ্ডলের ছবি মুখমণ্ডলটির আইকন কারণ এর সাথে মুখমণ্ডলটির অনস্বীকার্য ও অপরিহার্য সম্পর্ক রয়েছে। একটি মুখমণ্ডলের ছবি, সত্যিকারের কোনো মুখমণ্ডলের প্রতিকৃতি না হয়েও আইকনিক হওয়ার মধ্যদিয়ে আনন্দ সৃষ্টিতে সক্ষম হয়, যেমন কার্টুনের জন্য আঁকা মুখমণ্ডলগুলো আমাদেরকে আনন্দ দিয়ে থাকে। কার্টুনরূপ মনুষ্য চেহারা মানুষের চেহারার সাথে ন্যূনতম সাদৃশ্য নিয়েই মাইমেটিক আর্ট হতে পারছে, কোনো নির্দিষ্ট চেহারার সাথে আদৌ সাদৃশ্যপূর্ণ হতে হচ্ছে না। ঐ ন্যূনতম সাদৃশ্য থেকেই দর্শক চিনতে পারছে আইকনটি কিসের? আর চিনতে পারার মধ্যদিয়েই তার মধ্যে এক আনন্দ অনুভবের অনুরণন ঘটছে। আইকনিক উপস্থাপনার দ্বারা এরিস্টটল এরূপ মাইমেটিক আর্টের কথা বলেছেন যা প্লেটোর বলা মাইমেটিক আর্টের ভাবনা থেকে যোজন যোজন দূরের ভাবনা। প্লেটো মাইমেটিক আর্টকে বর্জনীয় বলছেন কারণ, এই আর্ট বস্তুর প্রতিবিম্বে খুঁত তৈরি করে (flawed image), আর এরিস্টটল মাইমেটিক আর্টের নান্দনিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে সেই খুঁতকেই মূল্যায়ন করছেন। এই ভাবনা দ্বারা এরিস্টটল নিশ্চিত করছেন যে, মাইমেটিক আর্টের উৎকর্ষের পরিমাপক মোটেই সাদৃশ্যের সঠিকতা নয় বা নিখুঁত সাদৃশ্য নয়। বরং এর উৎকর্ষের পরিমাপক হবে আর্ট হিসেবে চর্চার জন্য এর উপযোগী বিভিন্ন কলাকৌশল ও রীতিনিয়ম। যা ঘটে তার নিখুঁত বর্ণনা মাইমেটিক আর্ট হলে ইতিহাস হতো ট্র্যাজেডি বা কমেডির চেয়ে উঁচু সাহিত্য। অথচ, আমরা জানি ইহিতাস সাহিত্য নয়, বরং ট্র্যাজেডিই সাহিত্য। ট্র্যাজেডি যা ঘটেছে তার বয়ান নয়, যা ঘটতে পারে তার বয়ান। যা ঘটেছে তা নয়, বরং যা ঘটতে পারে বা পারত মাইমেসিসের মাধ্যমে তার অনুকরণের দিকেই এরিস্টটলের আহ্বান।

প্লেটো সাহিত্য বা মাইমেটিক আর্টকে নিষিদ্ধ করার পেছনে একটি যুক্তি দেখিয়েছিলেন এই যে, ইহা মানুষের অনুভবগুলোকে জাগিয়ে তুলে তার যুক্তিবুদ্ধিকে (Reason) বিনষ্ট করে। প্লেটোর এই বক্তব্যের বিপরীতে রয়েছে এরিস্টটলের ‘ক্যাথারসিস’ তত্ত্ব। এরিস্টটলের ক্যাথারসিস তত্ত্ব অনুযায়ী ট্র্যাজেডি মানুষের মাঝে ‘করুণা’ ও ‘ভীতি’র অনুভব (pity and fear) জাগিয়ে মানুষের যুক্তিবুদ্ধিকে (Reason) বিনষ্ট তো করেই না, বরং এই অনুভূতিগুলো প্রবলভাবে জাগিয়ে তুলে তা মানুষের অনুভবরাজ্য থেকে সরিয়ে দিয়ে অর্থাৎ মানুষের অনুভরাজ্যের অপদ্রব্য সরিয়ে দিয়ে মানুষটিকে বিশুদ্ধ করে তোলে এবং এর মাধ্যমে মানুষটির যুক্তিবুদ্ধি (Reason) আরো পরিষ্কার হয়, শানিত হয়। এভাবেই এরস্টিটল তাঁর পোয়েটিকসে পরোক্ষে সাহিত্যের বিরুদ্ধে তাঁর গুরুর উত্থাপিত অভিযোগসমূহ খণ্ডন করেছেন এবং অনুকরণধর্মী শিল্প হিসেবে সাহিত্যের জয়গান উচ্চারণ করেছেন যা সাহিত্যের পাঠকদেরকে সাহিত্য বুঝতে ও সাহিত্যের রসাস্বাদনে হাজার হাজার বছর চিন্তার আশ্রয় হিসেবে কাজ করেছে। সাহিত্য সম্পর্কে এরিরস্টলের এই ভাবনার পরে আমরা আসবো রোমান যুগের আর এক সাহিত্যবোদ্ধার ভাবনার সাথে পরিচিত হতে। তিনি হলেন লঞ্জাইনাস, যাঁর নাম আমরা অনেকে লঙিনুস রূপে উচ্চারণ করে থাকি। চলবে

/জেডএস/

সম্পর্কিত

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমার B ও ৯

আমার B ও ৯

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমার B ও ৯
সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

পর্ব—তিনসাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

তুমি নামের অচেনা কেউ

তুমি নামের অচেনা কেউ

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

শেকড়ে ও সত্তায় শাহাবুদ্দিন

শেকড়ে ও সত্তায় শাহাবুদ্দিন

সর্বশেষ

করোনা মোকাবিলা করে এসডিজি অর্জনে বৈশ্বিক রোডম্যাপের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

করোনা মোকাবিলা করে এসডিজি অর্জনে বৈশ্বিক রোডম্যাপের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

কর্তৃপক্ষের ‘অবহেলায়’ সন্তানের মৃত্যু, বিচারের দাবিতে ঘুরছেন বাবা

কর্তৃপক্ষের ‘অবহেলায়’ সন্তানের মৃত্যু, বিচারের দাবিতে ঘুরছেন বাবা

বদলে গেছে শান্তির মানে

বদলে গেছে শান্তির মানে

টেকনাফে মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের হামলায় ১৩ পুলিশ হাসপাতালে 

টেকনাফে মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের হামলায় ১৩ পুলিশ হাসপাতালে 

দিঘলিয়ায় নৌকার প্রার্থীদের ভরাডুবি

দিঘলিয়ায় নৌকার প্রার্থীদের ভরাডুবি

© 2021 Bangla Tribune