X
শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৯ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

রবীন্দ্রনাথের পারস্য মুগ্ধতা

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২১, ০০:২৯

পৃথিবীর সেরা পর্যটকের তালিকা করলে রবীন্দ্রনাথের নাম তাতে যুক্ত হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভ্রমণ করেছিলেন বলা যায়। এবং একজন কবির চোখে সে ভ্রমণের নানা বর্ণনার কথাও আমরা জানি। পৃথিবীকে, পৃথিবীর মানুষ ও জনপদ দেখা এবং তাকে উপলব্ধির আলোয় বর্ণনা করার ক্ষমতা ছিল কবি রবীন্দ্রনাথের। প্রতিটি ভ্রমণের আগে তিনি প্রস্তুতি নিতেন, ইতিহাস থেকে জেনে নিতেন সেই সব অঞ্চলের নানান তথ্য। আর পরে লিখতেন সেই ভ্রমণবৃত্তান্ত। নানা রঙে, বর্ণে, বিভায় ইতিহাস-রাজনীতি-ধর্ম-পুরাণ আর নিজের আততি নিয়ে সেই হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ। পাঠক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের এই জাতীয় রচনা খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় বিশেষত কবির অনুভবঋদ্ধ বর্ণনা আমাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। জহিরউদ্দীন মুহম্মদ বাবুর, ইবনে বতুতা, হিউয়েন সাং প্রমুখ প্রাচীন পর্যটক ও তাদের লেখাপত্রও আমাদের চিন্তাজগতে আলোড়ন তোলে। প্রাচীন জীবনযাপন, সংস্কৃতি সভ্যতা আচরণ ইত্যাদি বিষয়ে এসব লেখা আমাদের প্রাণিত করে। রাজা বা সম্রাটগণ যেসব বর্ণনা দিয়েছেন তার সামান্য অংশই আমাদের স্পর্শ করে, সেখানে রাজ্যবিস্তার, উত্তরাধিকার, সংঘাত নিয়ে বেশিরভাগ কথাবার্তা লক্ষ করা যায়। তবে মাঝে কারোর লেখায় আমরা গভীর কিছু অনুভব পেয়ে যাই যা নতুন এবং আমাদের চোখে আবিষ্কারের নেশা ধরিয়ে দেয়। যেমন, বাবুরনামায় বাবুর লিখেছেন : ‘শাবান মাসে সূর্য যখন কুম্ভ রাশিতে আমি তখন কাবুল থেকে হিন্দুস্থান পানে যাত্রা করলাম। বাদাম চশমা ও জাগদালিকের পথ ধরে ছদিনের দিন আমরা আদিনাপুর এসে পৌঁছলাম। এর পূর্বে কোনো উষ্ণ দেশ বা হিন্দুস্থান দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। আদিনাপুর এসে যখন পৌঁছলাম তখন সম্পূর্ণ অভিনব জগতের দৃশ্য আমার চোখের সম্মুখে ভেসে উঠল। আমি দেখলাম, এ জগতের ঘাস পৃথক; এখানকার বনজন্তু আলাদা, এর পাখি আলাদা। এমনকি এ নতুন জগতের যাযাবর জাতি ইল এবং উলুসদের আচার-আচারণ আলাদা। আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম।’ নিজের জন্মস্থান ফরগনার বর্ণনা তিনি দিয়েছেন একজন কবির মতো করে। প্রতিটি জেলার স্বতন্ত্র নৈসর্গিক পরিচয় দিয়েছেন, দিয়েছেন প্রাকৃতিক অবস্থানের বৈচিত্র্যপূর্ণ বর্ণনা; তার সাথে মিলিয়ে দেখেছেন পৃথিবীর অন্য জনপদকে। রবীন্দ্রনাথ ও বাবুরনামা পড়েছিলেন এবং বাবুরের অনেক মন্তব্য তিনি উদ্ধৃত করেছেন তাঁর লেখায়।
রবীন্দ্রনাথ যখন পারস্যে ভ্রমণে যান তিনিও বিস্মিত হয়ে দেখেছিলেন পারস্যের জীবন সংস্কৃতি প্রকৃতি ও মানুষের আচার-আচরণ, তাদের ধর্ম দর্শন মতাদর্শ ও জীবনযাপনপদ্ধতি। পারস্য প্রাচীন সভ্যতা সাহিত্য সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান। ফার্সি সাহিত্যের কবিরা পৃথিবীকে নতুন চিন্তার জগতে নিয়ে গেছেন। রুমি, ইবনে সিনা, ওমর খৈয়ম, সানায়ি, হাফিজ, সাদী, আত্তার থেকে অজস্র কবিরা যে কবিতা লিখেছেন তা আমাদের মানসিক জগৎকে প্রসারিত করে, আমাদেরকে চিন্ময় অনুভূতির জগতে নিয়ে যায়। ব্যাবিলনীয়, আকামেনীয়, সাসানীয় সভ্যতার অন্যতম পাদপীঠ পারস্য বহুদিন ধরে কবির মনে স্থান করে নিয়েছিল। পারস্যের রাজা রেজা শাহ পাহলভি কবিকে সে দেশ ভ্রমণের আমন্ত্রণ করলে তিনি আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন যদিও তার বয়স হয়েছিল তখন সত্তর বছর। পারস্য তার মনে কতটা স্থান জুড়ে ছিল তার উদাহরণ পারস্যে লেখার প্রতি ছত্রে ছত্রে রয়েছে। মুসলমান সমাজ সভ্যতা, বাহাই, জরথুস্ত্রু সম্প্রদায় ও তাদের ইতিহাস, যাযাবরদের জীবনযাত্রা এবং পারস্যের অতীত ইতিহাস বিশেষত ফার্সি কবিতার গভীর ভুবন কবিতে মথিত করেছিল। ১১ এপ্রিল, ১৯৩২ তিনি যাত্রা শুরু করেন। তিনি আমন্ত্রণ পবার পর লিখেছেন।‘ দেশ থেকে বেরবার বয়স গেছে এইটেই স্থির করে বসেছিলাম। এমন সময় পারস্যরাজের কাছ থেকে নিমন্ত্রণ এল। মনে হল এ নিমন্ত্রণ অস্বীকার অকর্তব্য হবে। তবু সত্তর বছরের ক্লান্ত শরীরের পক্ষ থেকে দ্বিধা ঘোচে নি। বোম্বাই আমার পারসী বন্ধু দিনশা ইরানী ভরসা দিয়ে লিখে পাঠালেন যে, পারস্যের বুশেয়ারা বন্দর থেকে তিনিও হবেন আমার সঙ্গী। তা ছাড়া খবর দিলেন যে, বোম্বাইয়ের পারসিক কনসাল কেহান সাহেব পারসিক সরকারের পক্ষ থেকে আমার যাত্রার সাহচর্য ও ব্যবস্থার ভার পেয়েছেন।’
কবি অত্যন্ত অনুপুঙ্খভাবে তার যাত্রার প্রতিটি পদক্ষেপের বর্ণনা দিয়েছেন, সাথে দিয়েছেন প্রয়োজনীয় তথ্য-ইতিহাস, জনমানুষের ব্যবহারজনিত পরিচয়, প্রকৃতির নানা উপাচার এবং নিজের মন্তব্য-প্রতিক্রিয়া। কোনো কিছু তাঁর চোখে বাদ পড়েনি। কবির সূক্ষ্ম রসবোধ, ভারতবর্ষের সাথে পারস্যের সংযোগ, পারস্যের ঐতিহ্য-গৌরবগাথার কথা আমরা খুব সবিস্তারে এখানে পাই। কবি রবীন্দ্রনাথের মনন রুচি বৈদগ্ধচেতনা এখানে প্রকাশিত হয়েছে সুন্দরভাবে। পারস্য নিয়ে কবির সার্বিক মনোভাব এখানে রয়েছে, রয়েছে তার মুগ্ধতা যা অফুরান মনে হয় কখনো কখনো। এ ক্ষুদ্র লেখায় আমরা কবির এই লেখায় পারস্য মুগ্ধতার কিছু উদাহরণ দেবার চেষ্টা করব, পাশাপাশি পারস্য সম্পর্কিত তাঁর কিছু বিশ্লেষণ পর্যালোচনা করব।
ইরানের প্রায় সব শহর ও ইরাকের বাগদাদ (কবি লিখেছের বোগদাদ) কবি এই সফরে ঘুরে দেখেছিলেন। প্রথমে ঢুকেছিলেন বুশেয়ার (১৩ই এপ্রিল) শহরে বায়ুতরিতে করে। এর আগে তিনি যেতেন সমুদ্রপথে। শরীর সায় দেবে না ভেবে বিমানে করে গিয়েছিলেন পারস্যে। তবে ভেতরের ভ্রমণ ছিলো নানা উপায়ে। কবি পুত্রবধু, কবির সচিব অমিয় চক্রবর্তী সাথে ছিলেন। কবি উড়োজাহাজ প্রসঙ্গে বাল্যের স্মৃতি জুড়ে দিয়েছেন। এই জুড়ে দেওয়া কথমালাগুলো এই রচনার মুক্তমালা যা আমাদের গভীরভাবে আকর্ষণ করে। যেমন বুশেয়ার থেকে আবার বায়ুযানে ওঠার আগে কবি লিখেছেন : মনে পড়ে ছাদের ঘর থেকে দুপুর-রৌদ্রে চিলের ওড়া চেয়ে চেয়ে দেখতাম; মনে হত দরকার আছে বলে উড়ছে না। বাতাসে যেন তার অবাধ গতির অধিকার আনন্দবিস্তার করে চলেছে। সেই আনন্দের প্রকাশ কেবল গতিসৌন্দর্যে তা নয়, তার রূপসৌন্দর্যে। নৌকার পালটাকে বাতাসের মেজাজের সঙ্গে মানান করে রেখে চলতে হয়, সেই ছন্দ রাখবার খাতিরে পাল দেখতে সুন্দর হয়েছে। পাখির পাখাও বাতাসের সাথে মিল করে চলে, তাই এমন তার সুষমা। আবার সেই পাখায় রঙের সামঞ্জস্যও কত। এই তো প্রাণীর কথা, তার পরে মেঘের লীলা—সূর্যের আলো থেকে কত রকম রঙ ছেঁকে নিয়ে আকাশে বানায় খেয়ালের খেলাঘর। মাটির পৃথিবীতে চলায় ফেরায় দ্বন্দ্বের চেহারা, সেখানে ভারের রাজত্ব, সকল কাজের বোঝা ঠেলতে হয়। বায়ুলোকে এতকাল যা আমাদের মন ভুলিয়েছে সে হচ্ছে ভারের অভাব, সুন্দরের সহজ সঞ্চরণ।’ কবি আত্মার ছবি ভেসে ওঠে এ কথামালায়। এরপর তিনি আরো গভীর করে তুলনা করেন বায়ুযানের সাথে প্রকৃতির গতিসৌন্দর্যযানের। তিনি অনুভব করেন পাখি বা নৌকার যে গতি বাতাসের সাথে মিতালি করে আধুনিক বিমান তা করতে পারে না। সেখানে প্রকৃতির সরসতা নেই আছে জোর বা অহমিকা। তিনি লিখেছেন : এতদিন পরে মানুষ পৃথিবী থেকে ভারটাকে নিয়ে গেল আকাশে। তাই তার ওড়ার যে চেহারা বেরল সে জোরের চেহারা। তার চলা বাতাসের সঙ্গে মিল করে নয় বাতাসকে পীড়িত করে; এই পীড়া আজ ভূলোক থেকে গেল দ্যুলোকে। এই পীড়ায় পাখির গান নেই, জন্তুর গর্জন আছে। ভূমিতল আকাশকে জয় করে আজ করছে।’ এই অসাধারণ তুলনা দেবার পর কবি যখন বায়ুযানে আবার উঠলেন তখন মনে এল নতুন ভাবনা। বিজ্ঞানের উন্নতিতে আকাশ দখল করে চলার যে অধিকার মানুষ পেল তা তাকে মানবতার বাইরে নিয়ে গেল, সুবিধে খানিকটা হল বটে তবে মানুষের গর্ব ও অহংকার প্রচুর পরিমাণে বেড়ে গেল। এই বেগ তাকে অমানবিকতার দিকে নিয়ে গেল। কবির এই ব্যাখ্যা সত্যি গভীর অনুসন্ধানমূলক এবং আধুনিক পৃথিবীর জন্য খুবই কার্যকরী ভাবনা। কবির মুখে তাঁর অনুভূতি শোনা যাক : বায়ুতরী যতই উপরে উঠল ততই ধরণীর সঙ্গে আমাদের পঞ্চইন্দ্রয়ের যোগ সংকীর্ণ হয়ে একটা মাত্র ইন্দ্রিয়ে এসে ঠেকল, দর্শন ইন্দ্রিয়ে, তাও ঘনিষ্ঠভাবে নয়। নানা সাক্ষ্য মিলিয়ে যে পৃথিবীকে বিচিত্র ও নিশ্চিত করে জেনেছিলুম সে ক্রমে এল ক্ষীণ হয়ে, যা ছিল তিন আয়তনের বাস্তব তা হয়ে এল দুই আয়তনের ছবি ... মনে হল, এমন অবস্থায় আকাশযানের থেকে মানুষ যখন শতঘ্নী বর্ষণ করতে বেরয় তখন সে নির্মমভাবে ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে; যাদের মারে তাদের অপরাধের হিসাববোধ উদ্যত বাহুকে দ্বিধাগ্রস্ত করে না, কেননা হিসেবের অঙ্কটা অদৃশ্য হয়ে যায়। যে বাস্তবের ‘পরে মানুষের স্বাভাবিক মমতা, সে যখন ঝাপসা হয়ে আসে তখন মমতারও আধার যায় লুপ্ত হয়ে।’
পারস্যের রাজা তাকে আমন্ত্রণ করেছিলেন বলেই নয় কবির পারস্যমুগ্ধতা ছিল বাল্যকাল থেকে। পারস্যের রাজা কবিকে অভিবাদন দেবার পর কবি যে জবাব দিয়েছিলেন তা থেকে কবির পারস্যমুগ্ধতা প্রকাশ পায়। কবি লিখেছেন : একদিন দূর থেকে পারস্যেও আমার কাছে পৌঁচেছিল। তখন আমি বালক। সে পারস্য ভাবরসের পারস্য, কবির পারস্য। তার ভাষা যদিও পারসিক, তার বাণী সকল মানুষের। আমার পিতা ছিলেন হাফেজের অনুরাগী ভক্ত। তাঁর মুখ থেকে হাফেজের কবিতার আবৃত্তি ও তার অনুবাদ অনেক শুনেছি। সেই কবিতার মাধুর্য দিয়ে পারস্যের হৃদয় আমাদের হৃদয়ে প্রবেশ করেছিল। আজ পারস্যের রাজা আমাকে আমন্ত্রণ করেছেন, সেই সঙ্গে সেই কবিদের আমন্ত্রণও মিলিত। আমি তাঁদের উদ্দেশে আমার সকৃতজ্ঞ অভিবাদন অর্পণ করতে চাই যাঁদের কাব্যসুধা জীবনকাল পর্যন্ত আমার পিতাকে এত সান্ত্বনা এত আনন্দ দিয়েছে।’ কবির আফসোস ছিল তিনি যে ভাষায় কথা বলছেন তা তারা জানেন না এবং তরজমার মাধ্যমে কবির বক্তব্য তাদেও কাছে সম্পূর্ণভাবে পৌঁছাবে না। কবি মাতৃভাষায় না বলার কারণে তাঁর বক্তব্যে কিছু আড়ষ্ঠতা ছিল সেটাও তিনি উল্লেখ করেছেন। কবি হাফিজের সমাধি দেখার সময় বলেছেন : বেরলুম. পিতার তীর্থস্থানে আমার মানস-অর্ঘ্য নিবেদন করতে। রাজাকে কবি বলেছেন তাদের অর্জন সম্পর্কে। রাজা যে সম্প্রদায়বিরোধিতার অসভ্য হিংস্রতাকে উনমূলিত করতে পেরেছেন তা জেনে কবি প্রীত হয়েছেন। কবির কিছু বই রেশমের কাপড়ে বাধাই করে রাজাকে উপহার দেওয়া হল। তাতে ছিল কবির রচিত একটি চিত্রপটে বাংলা কবিতা ও তার ইংরেজি তরজমা। বাংলায় লেখাটি এরকম : আমার হৃদয়ে অতীত স্মৃতির/ সোনার প্রদীপ এ যে/ মরিচা—ধরানো কালের পরশ/ বাঁচয়ে রেখেছি মেজে।/ তোমরা জ্বেলেছ, নতুন কালের/ উদার প্রাণের আলো—/ এসেছি, হে ভাই, আমার প্রদীপে/ তোমার শিখাটি জ্বালো।’
এশিয়ার এই রাজ্য তার শৌর্য ও উদারনৈতিক চরিত্র ছড়িয়ে দিচ্ছে সবদিকে। কবি রাজার কার্যক্রমের পর্যালোচনা করেছেন অনেক স্থানে, মূল্যায়ন করেছেন : ‘বর্তমান পারস্যরাজের চরিতকথা আমার আপন দেশের প্রান্তে বসেও শুনেছি এবং সেই সঙ্গে দেখতে পেয়েছি দূরে দিকসীমায় নবপ্রভাতের সূচনা। বুঝেছি, এশিয়ার কোনোস্থানে যথার্থ একজন লোকনেতারূপে স্বজাতির ভাগ্যনেতার অভ্যুদয় হয়েছে—তিনি জানেন কী করে বর্তমান যুগের আত্মরক্ষণ-উপযোগী শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে, কী করে প্রতিকূল শক্তিকে নিরস্ত করতে হবে, বিদেশ থেকে যে সর্বগ্রাসী লোভের চক্রবাত্যা নিষ্ঠুর বলে এশিয়াকে চারি দিকে আঘাত করতে উদ্যত কী করে তাকে প্রতিহত করা সম্ভব।’ রবীন্দ্রনাথ পারস্যকে ভালবাসতেন তার অজস্র উদাহরণ এই ভ্রমণবৃত্তান্তে রয়েছে। তিনি যে প্রস্তুতি নিয়ে এ রচনা শুরু করেছিলেন সেটা তো স্পষ্ট তবে তার পারস্যঅনুরাগ পূর্ব থেকেই ছিলো। ইরানে থাকতেই কবির জন্মদিন এসে যায় এবং তা সাড়ম্বরে পালিত হয়, বহু মানুষ কবিকে অভিনন্দন জানাতে আসেন, উপহার দেন। সবাইকে অভিবাদনের জবাবে তিনি একটি কবিতা রচনা করেন। এই কবিতার ইংরেজি তরজমাই তিনি পারস্যবাসীকে শোনান তবে কবিতাটি বাংলায়ও লিখিত হয়েছিল। কবির পারস্যমুগ্ধতার কিছু উদাহরণ এখানে স্পষ্ট হয় : ইরান, তোমার বীর সন্তান/ প্রণয়-অর্ঘ্য করিয়াছে দান/ আজি এ বিদেশী কবির জন্মদিনে,/ আপনারে বলি নিয়েছে তাহারে চিনে।’

ইরান থেকে ফেরার সময় কবি ইরানের জনগণ ও রাজার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান, তাদের অভিবাদনের উত্তর দেন। সেই উত্তরের মধ্যে কবি পারস্যদেশের প্রতি, জনগণের প্রতি কবির অকুণ্ঠ ভালোবাসা কৃতজ্ঞতা ও পক্ষপাতের কথা আবেগের সঙ্গে উচ্চারণ করেন : আজ শেষ পর্যন্ত তোমাদের কাছে বিদায় নেবার সময় এসেছে, কৃতজ্ঞতায় ভরা আমার এই হৃদয়খানি তোমাদের দেশে রেখে গেলাম... অবশেষে দেখা গেল নবজাগরণের আলোকরশ্মি। এই মহাদেশের অন্তরের মধ্যে একটা স্পন্দমান জীবনের কম্পন ক্রমেই যেন নিবিড় আত্মোপলব্ধির মধ্যে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে। এই পূর্ণ মুহূর্তে আজ আমি কবি তোমাদের কাছে এসেছি নবযুগের শুভপ্রভাত ঘোষণা করতে, তোমাদের দিগন্তের অন্ধককার ভেদ করে যে আলোক ফুটে উঠেছে সেই আলোককে অভিনন্দন করতে—আমার জীবনের মহৎ সৌভাগ্য আজ তোমাদের কাছে এলাম। জয় হোক ইরানের।’
পারস্য ভ্রমণবৃত্তান্ত লিখতে গিয়ে তিনি পৃথিবীতে মানবসভ্যতার নানা পর্ব ও উত্থানের কারণ ও উৎস সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। এশিয়াকে কীভাবে ইউরোপ দখল করল, কীভাবে প্রাচ্য জেগে উঠতে চেয়েছিল, তার ওপর কীভাবে অত্যাচার হয়েছে, জাপান ইউরোপের শৌর্যকে গ্রহণ কী ভুল করেছিল, তুর্কী তাতারদের কাণ্ড, পারস্য কীভাবে জেগে ওঠল সভ্যতার সোপান ধরে ইত্যকার নানা বিষয়ে তিনি গভীর তাৎপর্যময় কথা বলেছেন। কবির ইতিহাস পাঠ যে কত গভীর ও সমসাময়িক তা বোঝা যায় এ রচনায়। এর পাশাপাশি তিনি ভারতবর্ষ, আর্যজাতি, পারস্য সভ্যতা সম্পর্কে যে মূল্যায়ন করেছেন তা অভাবনীয়। ভ্রমণবৃত্তান্ত যে কত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে তা পারস্যে বোঝা যাবে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর টালমাটাল পৃথিবী নিয়ে কবি অনেক মন্তব্য করেছেন। ইউরোপ যে শক্তি দেখিয়েছে তার বিরুদ্ধে তিনি কথা বলেছেন যুক্তি দিয়ে। এশিয়ার জাগরণ যেভাবে হওয়ার কথা সেভাবে হয়নি বা হতে পারেনি। তিনি লিখেছেন : আমি এই কথা বলি, এশিয়া যদি সম্পূর্ণ না জাগতে পারে তা হলে য়ুরোপের পরিত্রাণ নেই। এশিয়ার দুর্বলতার মধ্যেই ইউরোপের মৃত্যুবাণ। এই এশিয়ার ভাগবাটোয়ার নিয়ে যত তার চোখ-রাঙারাঙি, তার মিথ্যে কলঙ্কিত কূটকৌশলের গুপ্তচরবৃত্তি। ক্রমে বেড়ে উঠেছে সমরসজ্জার ভার, পণ্যের হাট বহুবিস্তৃত করে অবশেষে আজ অগাধ ধনসমুদ্রের মধ্যে দুঃসহ করে তুলেছে দারিদ্র্যতৃষ্ণা।’ পারস্যের গৌরব নিয়ে তিনি বিস্তারিতভাবে বলেছেন, বলেছেন শেকড়ের কথা, আর্যসংস্রবের কথা, বীরদের কথা, ধর্মপালনের কথা, মুসলিম হওয়ার পরও তাদেও পুরনো সংস্কৃতিকে লালন করার কথা। পারস্যের সাথে ভারত বর্ষের কোথায় যোগ কোথায় অন্বয় সে কথাও কবি বলেছেন স্পষ্ট করে। পারস্য সভ্যতার গোড়ার কথা বলতে গিয়ে কবি লিখেছেন : পারস্যের ইতিহাস যখন শাহনামার পুরাণকথা থেকে বেরিয়ে এসে স্পষ্ট হয়ে উঠল তখন পারস্যে আর্যদের আগমনের হাজার বছর পেরিয়ে গেছে। তখন দেখি আর্যজাতির দুই শাখা পারস্য-ইতিহাসের আরম্ভকালকে অতিক্রম করে আছে, মীদিয় এবং পারসিক। মীদিয়রা প্রথমে এসে উপনিবেশ স্থাপন করে, তারপর পারসিক। এই পারসিকদের দলপতি ছিলেন হখমানিশ। তাঁরই নাম অনুসারে এই জাতি আকামেনিড আখ্যা পায়। খ্রিষ্টজন্মের সাড়ে-পাঁচশ পূর্বে আকামেনীয় পারসিকেরা মীদিয়দের শাসন থেকে সমস্ত পারস্যকে মুক্ত করে নিজেদের অধীনে একচ্ছত্র করে। সমগ্র পারস্যেও সেই প্রথম অদ্বিতীয় সম্রাট ছিলেন বিখ্যাত সাইরাস, তাঁর প্রকৃত নাম খোরাস। তিনি শুধু যে সমস্ত পারস্যকে এক করলেন তা নয়, সেই পারস্যকে এমন এক বৃহৎ সাম্রাজ্যের চূড়ায় অধিষ্ঠিত করলেন সে যুগে তার তুলনা ছিল না।’
বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথে পারস্যমুগ্ধতার কারণের পেছনে যুক্তিও তিনি তুলে ধরেছেন নানা উদাহরণ দিয়ে। হত্যা লুণ্ঠনের ইতিহাস তো অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই তবে পারস্য মানবতা ও সভ্যতাকে গ্রহণ করেছিল সেটাও মনে রাখা প্রয়োজন। ভারতবর্ষের মুসলমানদের নিয়ে কবি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, গল্প লিখেছিলেন সেখানে কবি মুসলিমসম্প্রদায় নিয়ে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। পারস্যে এসে তিনি পারসিক মুসলমানদের আচার-আচরণ, বা রাজাদের অসাম্প্রদায়িক আচরণ, যাযাবরদের চেতনা নিয়ে প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেছেন। এমনকি ভারতবর্ষে যে হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব তার উদাহরণ পারস্যের প্রসঙ্গে তাদের মুখের কথায় ব্যাখ্যা করেছেন। যে বোধ যাযাবরদের মধ্যে আছে তা ভারতীয়দের নেই সেটা কবি উপলব্ধি করেছেন। পারস্যের অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় কবির নজরে এসেছে। পারস্যবাসীর প্রকৃতি প্রেমের কথা কবি অনেকবার বলেছেন। একটা ছোট বর্ণনা পড়া যাক : আজ সকালে নির্মল আকাশ, স্নিগ্ধ রৌদ্র। দোতলায় একটি কোণের বারান্দায় বসেছি। নীচের বাগানে এল্ম পপলার উইলো গাছে বেষ্ঠিত ছোট জলাশয় ও ফোয়ারা। দূরে গাছপালার মধ্যে একটি মসজিদের চূড়া দেখা যাচ্ছে, যেন নীল পদ্মের কুঁড়ি, সুচিক্কণ নীল পারসিক টালি দিয়ে তৈরি, এই সকাল বেলাকার পাতলা মেঘে-ছোঁওয়া আকাশের চেয়ে ঘনতর নীল।’ এই বর্ণনার পাশে আর একটি বর্ণনা রাখা যায় যেখানে কবি স্বীকার করেছেন ধর্মীয় আচারের দিক দিয়ে মুসলমানরা বেশ উদার। তিনি মসজিদে ঢুকেছেন অনেকস্থানে। একটি স্থানের কথা বলেছেন এভাবে : এই মসজিদের প্রাঙ্গনে যাদের দেখলেম তাদের মোল্লার বেশ। নিরুৎসুক দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখলেম হয়তো মনে প্রসন্ন হয়নি। শুনলুম আর দশ বছর আগে এখানে আমাদের প্রবেশ সম্ভবপর হত না। শুনে আমি যে বিস্মিত হব সে রাস্তা আমার নেই। কারণ, আর বিশ বছর পরেও পুরীতে জগন্নাথের মন্দিরে আমার মত কোনো ব্রাত্য যে প্রবেশ করতে পারবে সে আশা করা বিড়ম্বনা।’
এই সব মোল্লারা কবির কাছে অন্য সময় নানাবিধ দার্শনিকসুলভ প্রশ্ন করেছেন। একজন মোল্লা কবিকে বললেন, নানা জাতির নানা ধর্মগ্রন্থে নানা পথ নির্দেশ করে, তার মধ্যে সত্যপথ নির্ণয় করা যায় কী উপায়ে? কবি বলেছেন : ঘরের দরজা জানালা সব বন্ধ করে যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে। আলো পাবো কী উপায়ে’ তাকে কেউ উত্তর দেয় চকমকি ঠুকে—কেউ বলে তেলের প্রদীপ, কেউ বলে মোমের বাতি, কেউ বলে ইলেকট্রিক আলো জ্বেলে। সেই-সব উপকরণ ও প্রণালী নানাবিধ, তার ব্যয় যথেষ্ট, তার ফল সমান নয়। যারা পুঁথি সামনে রেখে কথা কয় না, যাদেও সহজ বুদ্ধি, তারা বলে, দরজা খুলে দাও। ভালো হও, ভালোবাসো, ভালো করো, এইটেই পথ। যেখানে শাস্ত্র এবং তত্ত্ব এবং আচারবিচারের কড়াকড়ি সেখানে ধার্মিকদের অধ্যবসায় কথা-কাটাকাটি থেকে শুরু করে গলা-কাটাকাটিতে গিয়ে পৌঁছয়।’ পারস্য যেভাবে তাদের ধর্ম সংস্কৃতির বোধকে পাকাপোক্ত করেছে মানবিক বিবেচনায় তা কবিকে প্রাণিত করেছিল। কবি নিজেই যে মানবিক অসাম্প্রদায়িক সমাজের স্বপ্ন দেখতেন অথচ ধর্মকে অস্বীকার করতেন না সেরকম পরিবেশ তিনি পারস্যে দেখেছেন। তাদের সুফি মতাদর্শের বিকাশই প্রমাণ করে যে তারা ধর্ম দিয়ে চিন্তা বিকাশে বাধা দিতে চাননি। সুফি কবিদের এই চিন্তার স্বাধীনতা সুযোগ ছিল বলে তারা বড় কবি হতে পেরেছেন। আমরা সেটা পারিনি।
কবি এক অভিবাদনের জবাবে আরব সংস্কৃতির গৌরব ও ঐশ্বর্য নিয়ে তাঁর পক্ষপাতের কথা বলেছেন। পারস্যে গিয়েই তিনি বললেন সবার সামনে তবে একথা তাঁর মনে ছিল আগে থেকেই : একদা আরবের পরম গৌরবের দিনে পূর্বে পশ্চিমে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক ভূভাগ আরব্যের প্রভাব-অধীনে এসেছিল। ভারতবর্ষে সেই প্রভাব যদিও আজ রাষ্ট্রশাসনের আকারে নেই, তবু সেখানকার বৃহৎ মুসলমানসম্প্রদায়কে অধিকার করে বিদ্যার আকারে, ধর্মের আকারে আছে। সেই দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে আমি আপনাদের বলছি, আরবসাগর পার করে আরবের নববাণী আর একবার ভারতবর্ষে পাঠান—যাঁরা আপনাদের স্বধর্মী তাঁদের কাছে—আপনাদের মহৎ ধর্মগুরুর কাছে পূজানামে, আপনাদের পবিত্রধর্মের সুনামী রক্ষার জন্য। দুঃসহ আমাদের দুঃখ, আমাদের মুক্তির অধ্যবসায় পদে পদে ব্যর্থ; আপনাদের নবজাগ্রত প্রাণের উদার আহ্বান সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতা থেকে অমানুষিক অসহিষ্ণুতা থেকে, উদার ধর্মের অবমাননা থেকে, মানুষে মানুষে মিলনের পথে, মুক্তির পথে নিয়ে যাক হতভাগ্য ভারতবর্ষকে। এক দেশের কোলে যাদের জন্ম অন্তরে বাহিরে তারা এক হোক।’
পারস্যের পথে পথে ঘুরে, শহরে গ্রামে প্রাসাদে যাপন করে, মানুষের সাথে মিশে, তাদের আচার আচরণ পর্যবেক্ষণ করে, তাদের কথা শুনে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে থেকে তিনি পারস্যকে চিনেছিলেন; রাজা থেকে সাধারণ মানুষ, মোল্লা, নারী, শিল্পী-কবি, বেদুইন সবার সাথে মিলে, কথা বলে তিনি পারস্যের প্রকৃত রূপ চিনতে চেয়েছেন। ইতিহাসের পাঠ কবিকে সাহায্য করেছে সন্দেহ নেই তবে তাঁর উপলব্ধির আলোকে পারস্যের রূপ মুখরিত হয়ে উঠেছে। এই মুগ্ধতার ছবি তাঁর মনে আমৃত্যু ছিল। এই মুগ্ধতা অকৃত্রিম, তুলনাহীন।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৪:৫১

যুক্তরাজ্যের লিডস শহরের সেভেন আর্টস থিয়েটারে উদযাপিত হতে যাচ্ছে কবি কাজী নজরুল ইসলামের 'বিদ্রোহী' এবং টি এস এলিয়ট রচিত কবিতা 'ওয়েস্টল্যান্ড'র গৌরবময় শতবর্ষ। আগামী ২ অক্টোবর শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে এ অনুষ্ঠান হবে।
ভারতীয় মার্গসঙ্গীত ও দক্ষিণ এশীয় শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীতের শীর্ষ সংস্থা সৌধ সোসাইটি অব পোয়েট্রি অ্যান্ড ইন্ডিয়ান মিউজিকের ব্যবস্থাপনায় এই বিশেষ উদযাপনে মঞ্চায়িত হবে কবি টি এম আহমেদ কায়সার পরিচালিত বিশেষ কাব্য-আলেখ্য দ্য রেবেল অ্যান্ড দ্য ওয়েস্টল্যান্ড। এতে এলিয়টের চরিত্র রূপায়ন করছেন কবি ও নাট্যকার জন ফার্নডন এবং নজরুলের চরিত্রে থাকছেন আবৃত্তিকার মানস চৌধুরী। এলিয়টের সাক্ষাৎকারগ্রহণকারী অধ্যাপক শিব কে কুমারের চরিত্রে অভিনয় করবেন শান্তনু গোস্বামী। মূল কবিতা দুটির নাটকীয় পাঠ ও অভিনয়ে থাকছেন কবি বেকি চেরিম্যান, কবি এরিক শিলান্ডার, কবি মাইলস সল্টার, শ্রী গাঙ্গুলি, কানিজ ফাতেমা চৌধুরী, এহসান আহমাদ রাজ, মোহাম্মদ সাদিফ, মিলি বসু, অভ্র ভৌমিক প্রমুখ। সঙ্গীত ব্যবস্থাপনায় থাকছেন প্রীতম সাহা। আলোক প্রক্ষেপণ ও ব্যবস্থাপনায় পাবলো খালেদ।
এই কবিতা দুটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত এবং বিশ্ব-কবিতায় এর প্রভাব নিয়ে বক্তব্য রাখবেন লিডস ট্রিনিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক কবি ওজ হার্ডউইক।
বাংলা ও ইংরেজি দুই সমৃদ্ধ কাব্য-ঐতিহ্যের প্রখ্যাত দুই কবিতার শতবর্ষ উদযাপনে দ্য রেবেল এবং দ্য ওয়েস্টল্যান্ড মঞ্চায়িত হবে ১৪ মার্চ লন্ডনের রিচমিপ থিয়েটারে এবং পরবর্তীতে ম্যানচেস্টার মিউজিয়াম, হাউজ অব কমন্স, ব্রিটিশ লাইব্রেরিসহ ব্রিটেনের বিভিন্ন শিল্পমঞ্চে, কয়েকটি শহরে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৫:০৭

কিশোর বয়স থেকে রাজনীতি করেছেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৮৭-এর পর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক-শোষকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে সকল ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত রেখেছে, তা তিনি নিজের জীবনেই অনুভব করেছেন। ক্ষমতায় যাবেন কি না তা নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা না থাকলেও দেশের মানুষের জন্য কোন কোন কাজ করা দরকার সেই ভাবনা সব দক্ষ রাজনীতিবিদেরই থাকে। বঙ্গবন্ধুর আরো বেশি ছিল। কারণ তিনি নিজে ছিলেন স্বাপ্নিক এবং স্বপ্নদ্রষ্টা। বিরোধী রাজনীতি করার সময় দেশের অর্থনীতি কীভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত তা যেমন ভাবতেন, তেমনই ভাবতেন জনগণের স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য কোন পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হওয়া উচিত। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, কর্মসংস্থান—সবকিছু নিয়েই গভীরভাবে ভাবতেন। জানতেন ঔপনিবেশিক আমলের নীতি এবং অবকাঠামো দিয়ে জনগণের জীবনের মূল চাহিদাগুলো পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই ক্ষমতায় গেলে কী করবেন, সে বিষয়ে প্রায় পূর্ণাঙ্গ ধারণা ছিল তাঁর। ছিল হয়তো লিখিত পরিকল্পনার ছকও। তাই তো দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের শেষে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ দেশের মাটিতে পা দিয়েই তিনি কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। এবং প্রথমেই হাত দিয়েছেন দেশের মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করার ক্ষেত্রেগুলিতে। স্বাস্থ্য তেমনই একটি মৌলিক প্রয়োজন এবং অধিকার। সীমিত সংখ্যক সুবিধাভোগী মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবাকে বন্দি না রেখে দেশের সাত কোটি জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নির্মিত হয়েছে তাঁর হাত ধরে। 
          এই বইয়ের লেখক অধ্যাপক ডা. হারিসুল হক পাঠকদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন, দেশে ফেরার ২১ দিনের মাথায় বঙ্গবন্ধু গঠন করলেন পরিকল্পনা কমিশন। হাত দিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজে।
          কেমন ছিল সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য-অবকাঠামো? লেখক হারিসুল হকের বই থেকে জানা যাচ্ছে, সারা দেশে সাত কোটি মানুষের জন্য হাসপাতালে শয্যা ছিল মাত্র ১২৩১১টি। দেশে ডাক্তারের সংখ্যা মাত্র ৭০০ জন। তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন ৭০ জন। বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ২৫৯ জন। তাদের সবার অবস্থান ছিল রাজধানী ঢাকাতে এবং মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলিতে। তার মানে, ঢাকার বাইরে কোনো রোগীর বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সেবা পাওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না।
          চিকিৎসাব্যবস্থা মানে কেবল ডাক্তার নয়। নার্স, ল্যাব টেকনিশিয়ান, ওয়ার্ড বয়, প্যারামেডিক, অ্যাম্বুলেন্সচালক, হেলথ ভিজিটর, সেনিটারি ইন্সপেক্টর, ফার্মাসিস্টসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যসেবাদানকারীদের নিয়ে গড়ে ওঠে একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা। সেইসব টেকনিক্যাল মানুষের সংখ্যাও ছিল নিতান্তই অপ্রতুল। সারা দেশে নার্স ছিলেন ৭০০ জন, মিডওয়াইভস ছিলেন ২৫০ জন, স্বাস্থ্য পরিদর্শিকা ২৫০ জন। কমপাউন্ডার ছিলেন ১০০০ জনেরও কম। সারাদেশে নামমাত্র রুরাল হেলথ সেন্টার ছিল ১৫০টি। নামমাত্র বলা হচ্ছে এইজন্য যে সেগুলোতে কোনো ডাক্তার তো দূরের কথা, প্যারামেডিকেরও পদায়ন ছিল না।  এই সংখ্যাগুলোই বলে দেয় এই দেশের মানুষের জন্য কার্যত কোনো স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার ইচ্ছাই ছিল না পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর। তাদের জীবন পুরোটাই ছিল নিয়তির ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় হাতুড়ে, কবিরাজ, হেকিমদের ওপর নির্ভর করতে হতো সর্বাংশে।
          এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য ব্যাপক পরিকল্পনা করলেন বঙ্গবন্ধু। রাতারাতি তো একটা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নত করা সম্ভব নয়। তাই কিছু ছিল আশু লক্ষ্য, কিছু মধ্যম মেয়াদী, এবং কিছু সুদূরপ্রসারী। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কিউরেটিভ এবং প্রিভেনটিভ চিকিৎসাকে সমন্বিত করা হয়েছিল। বিশুদ্ধ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, এনভায়রনমেন্টাল হেলথ, গর্ভবতী মা ও প্রসূতি পরিচর্যা, জনগণকে স্বাস্থ্যশিক্ষা দেওয়া, বিভিন্ন রোগের টিকা ছিল প্রিভেনটিভ চিকিৎসার অন্তর্গত। এছাড়া যেহেতু স্বাস্থ্যখাত অনেককিছুর সাথে সমন্বিত একটি বিষয়, তাই স্বাস্থ্যের সাথে পরিবার পরিকল্পনা এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে একীভূত করা হয়েছিল।
          স্বাস্থ্যখাতে জরুরি ভিত্তিতে কিছু ক্রাশ প্রোগ্রাম নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭২ সালে ৪৫০ জন ছাত্রীকে রির্বাচন করে দ্রুত নার্সিং ট্রেনিং সেন্টারে পাঠানো হলো। একটিমাত্র নার্সিং ট্রেনিং ইনস্টিউট ছিল ঢাকাতে। জরুরি ভিত্তিতে রাজশাহীতে খোলা হলো আরেকটি ট্রেনিং সেন্টার। ডাক্তার-সংখ্যা তো রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়। একজন ছাত্রের এমবিবিএস কোর্স সম্পন্ন করার জন্য ছয় বৎসর সময় লাগে। তাই অন্তত জনগণের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য কিউবার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে একবছর মেয়াদি কোর্সের মাধ্যমে প্যারামেডিক তৈরির ব্যবস্থা নেওয়া হলো।
          বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরিকল্পনা কমিশন এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এমনভাবে পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছিল, যাতে করে দেশের যেকোনো অঞ্চলের প্রতিটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্কের আওতায় আসতে পারে। বেসিক হেলথ ওয়ার্কার বা মৌলিক স্বাস্থ্যকর্মী নামে একটি পদ সৃষ্টি করা হয়। এরাই জনগণের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত স্বাস্থ্যসেবক। লেখক তার বইতে তুলে ধরেছেন মৌলিক স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজের বিবরণ—‘৪০০ মানুষের স্বাস্থ্যের দেখভালের দায়িত্বে থাকবেন একজন মৌলিক স্বাস্থ্যকর্মী। তাঁরা সিডিউল অনুযায়ী মাসে অন্তত একবার প্রতিটি বাড়ি পরিদর্শন করবেন। পরিদর্শনকালে তাঁরা টিকাদান কর্মসূচি (গুটি বসন্ত, কলেরা, টাইফয়েড এবং যক্ষ্মা)-তে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করবেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যশিক্ষা (সঠিক পয়ঃনিষ্কাশন, পানীয় জল বিশুদ্ধকরণ, পরিবার পরিকল্পনা) সম্বন্ধে জনগণকে অবহিত করবেন, তাঁরা ম্যালেরিয়া শনাক্ত করার জন্য রোগীদের রক্ত ও সম্ভাব্য যক্ষ্মা আক্রান্তদের কফের নমুনা সংগ্রহ করে রুরাল হেলথ সেন্টারের ল্যাবরেটরিতে জমা দেবেন। তাঁরা ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা ও কুষ্ঠরোগীদের ঔষধ রোগীদের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবেন। তাঁরা ম্যালেরিয়া নির্মূল অভিযানে সম্পৃক্ত থাকবেন এবং মহামারিকালে সরকার গৃহীত বিবিধ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হবেন। তাঁরা পারিবারিক স্বাস্থ্যকার্ড ও পরিবার পরিকল্পনা গ্রহীতাদের কার্ড যথাযথভাবে পূরণ এবং সংরক্ষণ করবেন—পরবর্তীকালে সেখান থেকে পরিসংখ্যানের জন্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা যাবে।’ [পৃষ্ঠা ৩৬]
          এই ধরনের পরিকল্পনাকে বলা যায় গণমুখী স্বাস্থ্য পরিকল্পনা। শিক্ষার মতো স্বাস্থ্যও কারো সুযোগ নয়, বরং অধিকার। এই ধারণাতেই বিশ্বাসী এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেজন্য স্বাস্থ্যখাতে যেসব পরিকল্পনা তিনি গ্রহণ করেছিলেন সেগুলির বর্ণনা পাওয়া যাবে ডা. হারিসুল হকের লেখা এই গ্রন্থে।
          বঙ্গবন্ধু সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন। কারণ, তাঁর বিশ্বাস ছিল একমাত্র সমাজতন্ত্রেই সকল মানুষের মুক্তি সম্ভব। দারিদ্র্য থেকে মুক্তি, অশিক্ষা থেকে মুক্তি, স্বাস্থ্যহীনতা থেকে মুক্তি। সেই লক্ষ্যেই এই ধরনের স্বাস্থ্য পরিকল্পনা। সমাজতন্ত্র গড়ে না উঠলেও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অন্তত একটি কল্যাণরাষ্ট্র পেতে যাচ্ছিল বাংলাদেশের মানুষ। 
          এখন পৃথিবীতে স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য ভাবনায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। ঔষধ, রোগনির্ণয়, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা, জটিল স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত হয়েছে অনেক নতুন নতুন আবিষ্কার। সেগুলি বয়ে এনেছে মানুষের রোগমুক্তি এবং দীর্ঘ জীবনের আশ্বাস। কিন্তু মুক্তবাজার পুঁজিবাদ এখন কেবল ধনীদের জন্যই নিশ্চিত করেছে উপযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী এখন আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। বিশাল বিশাল সরকারি স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। তবু সেখানে চিকিৎসা পায় দেশের মাত্র শতকরা ৩০ ভাগ মানুষ। বাকি ৭০ ভাগ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা কিনতে হয় বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, নার্সিং হোম থেকে। মুক্তবাজার পুঁজিবাদের নিয়ম অনুসারে স্বাস্থ্যখাতে গড়ে উঠেছে প্রতিযোগিতা। তবে সেই প্রতিযোগিতা রোগীদের জন্য সহায়ক হয়নি। হয়েছে উদ্যোক্তা এবং দালাল শ্রেণির জন্য। টাকার অঙ্কে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি বরাদ্দ বেড়েছে। তবে অন্যখাতের তুলনায় বেদনাদায়করূপে কম। বঙ্গবন্ধুর সময়ে যেখানে বাজেটের প্রায় ৫% বরাদ্দ ছিল স্বাস্থ্যখাতে, এখন সেখানে বরাদ্দ ২%-এরও কম। বিশ্বব্যাংকের নির্দেশনায় সরকারকে জনগণের স্বাস্থ্য প্রতিদিন বেশি বেশি করে ছেড়ে দিতে হচ্ছে বেসরকারি খাতে। এই প্রবণতা বঙ্গবন্ধুর চিন্তা এবং আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক।
          আমরা কৃতজ্ঞ ডা. হারিসুল হকের কাছে এমন একটি গ্রন্থ প্রণয়নের জন্য। তার এই গ্রন্থের মাধ্যমে আমরা অন্তত এটুকু বুঝতে পারছি যে স্বাস্থ্যখাতে আমাদের কোনদিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, আর এখন আমরা হাঁটছি তাঁর নির্দেশিত পথের বিপরীত দিকে। বঙ্গবন্ধুর প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের একমাত্র উপায় হচ্ছে বর্তমানের ভুলযাত্রা থেকে বিরত হয়ে তাঁর আদর্শের পথকে অনুসরণ করা।

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা। অধ্যাপক ডা. হারিসুল হক। প্রকাশক : কবিতাসংক্রান্তি, ঢাকা। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। পৃষ্ঠা : ৮৮। মূল্য :  ৩০০ টাকা।

 

/জেডএস/

সম্পর্কিত

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:৩৯

অন্নজল

গনগনে রোদ ঠেলে এসে ফকির দাস বটের নিচে বসে।
ঘষা চশমার সামনে হলুদ প্রজাপতি নাচে দাঁতরাঙা ফুলে। 
মাঠে পাকা ধান। পাখি ওড়ে হরেক কিসিম।
ফকির দেখে আর ভাবে, আহা কী রঙ কী রঙ! 
এ বছর ভালো ভিখ মিলবে গো!
বলেই জিভ কাটে, কিরে দেয়, চোখ বুঁজে আকাশে তাকায় জোড় হাতে, মোনাজাতে।
কী যে ভেবে ফেলল সে; এসব ভাবতে নেই!
ভাবলেই মেঘ জমে, ধানের দাম পড়ে যায়, দেনদারি হয় চাষি, দেশে ওঠে রোগের বালাই।

সেও তো চাষিই ছিল একদিন।
এইসব ভেবেটেবে চুপচাপ ঝোলা থেকে ছেঁড়া পুঁটলিটা বের করে আনে।
খুলে ফেলে বিচিকলা দুটো সরিয়ে রাখে, থাক।
কাল খাওয়া যাবে। আজ সে নুন ঘষে নেবে রুটির কানায়।
হরি হে, দিন দিয়ো, দেখো তুমি খোদা। এই বলে সে মুখে অন্ন দেয়। 
অন্নই তো হরি। অন্নই তো মালিক গো! সে দিন না দিলে কেমনে চলবে তার?
খাওয়া দেখে বটের তলায় সাঁৎ সাঁৎ করে শালিক নামে দুটো।
ওটা শালিক না রোদ? ফকির ঘষা কাচে ঠাওর পায় না। 
রুটি চিবোয় আর ভাবে, ভেবে যায়।
আজ ধুনিপাড়ায় কার বাড়ি যেন ভোজ আছে না? 
বিকেলে যেতে হবে। সেও তো দেশেরই লোক, দুটো এঁটোকাঁটা পাবে না কি আর?
ধুলোর ঘূর্ণি কুটো নিয়ে ঘোরে। ঘুরতে ঘুরতে উপরে উঠে যায়।
ফকির গামছা পাতে। একটু জিরোতে তো হবে। কত যে রাস্তা বাকি!


ফড়িং

একটা ফড়িং জলের ওপর মুখ দেখবে বলে থমকে দাঁড়ালো।
কী দেখতে চাইল সে? কতটা ব্যথার ভারে স্থির হয়ে থাকে জীবনের মুখ? 
অথবা ফেলে আসা উড়ানের পথ
স্মৃতির পরম জলে দাগ রেখে গেছে কিনা এইসব?
ঘরে এখন অন্ধকার, বিদ্যুৎ নেই
ঝড়ের সময়ে ভাঙা জানালাটা খোলা যাবে না।
অথচ এই অন্ধকারেই তো দেখা যায় সব–
পুকুরের জল, থমকে দাঁড়ানো ফড়িং, 
স্মৃতির শালুকপাতায় টলমল ব্যথার মিনার।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

পৃথিবী

পৃথিবী

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৪:৫৭

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

ছোটরা বড়দের কাজ করলে
আর বড়রাও ছোটদের ভূমিকায় থাকলে
বিষয়টা মজার।

বেটিদের পোশাক বেটা পরলে
আর পুরুষদের ড্রেস নারী পরলে হাস্যকর।

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে এবং রাতে সূর্য উঠবে।


তিনটি মেয়ের জামা-কাপড়

তিনটি মেয়ে ঝর্নাজলে
মনের পাখা মেলছে,
নগ্নস্নানে কী আনন্দে
জলের সাথে খেলছে।

বনপরিদের ভাগ্নি যেন
জলপরিদের কন্যা,
ঝর্না জলে জল সাঁতারে
ছড়ায় সুখের বন্যা।

হঠাৎ একটি হেলিকপ্টার
ভটভট করে এলো,
মেয়ে তিনটির স্বাধীনতা
করল এলোমেলো।

হেলিকপ্টার গুলি ছোড়ে
হারায় তারা দিশে,
একটি মেয়ে গুলিবিদ্ধ
রক্তজলে মিশে।

বাকি দুজন বন্দি হলো
সেই শিকারির খাঁচায়,
তিনটি মেয়ের জামা-কাপড়
পড়ে থাকে মাচায়।


পরাজয়

আজ কানাডায় নির্বাচন।
কোথাও ‘আমার ভাই/ তোমার ভাই, আমার নেতা/ তোমার নেতা…’নেই
কোথাও স্লোগান, মিটিং, মিছিল, পোস্টার নেই,
মাইকিং নেই।
কিন্তু শরৎ-হেমন্তের সন্ধিক্ষণে
কোথায় যেন কি হচ্ছে!

আজ কানাডার নির্বাচন।
আজ আমি খুব নীরবে হেরে গেলাম তোমার কাছে!


দেশ বিভাগের গান

আমি তুমি যুক্তাক্ষর
একই সাথে মুক্তাক্ষর।

আমরা থাকি ভালোবাসার বন্ধনে।

আমি তুমি পানি-জল
মা-জননী নির্মল—

মায়ের মুগ্ধ আঁচল থেকে গন্ধ নে!

আমি তুমি এক-দুই
দুই দেশের এক ভূঁই,

নিজ দেশটা পরবাসী, ক্রন্দনে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

পৃথিবী

পৃথিবী

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৭:০০

আমি সাহিত্যের কোনো মনোযোগী পাঠক নই। পড়াশোনা নিতান্তই কম। আর খাপছাড়া। ভালো লাগা-খারাপ লাগা, সবটাই ব্যক্তিগত। পেছনে কার্যকারণের ধারাবাহিকতার দিকে নজর পড়ে সামান্যই। আর, আজকাল ইচ্ছাটাও মরতে বসেছে। চোখ-কান-মাথা জুড়ে আলসেমির দাপট। বাধা দেই না। স্বেচ্ছায় তাতে গা ভাসাই।
          ক’বছর আগে একটা বই পড়ি। দক্ষিণে সূর্যোদয়। লেখক, রাজু আলাউদ্দিন। আমি চমকে যাই। এই নামটার সঙ্গে সে-ই প্রথম পরিচয়। অথচ পরে জানতে পাই, তিনি অজ্ঞাত কুলশীল নন। কবিতা লেখেন। গদ্যও। কোনোটিই গতানুগতিক নয়। তেমন যে নয়, বইটির পাতায়-পাতায় তার ছাপ। মেক্সিকোয়-দক্ষিণ আমেরিকায় স্প্যানিশ ভাষার বিশাল সাম্রাজ্যে রবীন্দ্রনাথ যে একসময় আলোড়ন জাগিয়েছিলেন, তাই নিয়ে এই বই। অবশ্য সুতোর টানে খোদ স্পেনে হিমেনেথ দম্পতির ও আরো ক’জনের আগ্রহের ও আত্মস্থ করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আসে। এতদিন আমার জানা ছিল শুধু ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো-কথা। তাও স্প্যানিশ প্রেক্ষাপট মনে করে নয়। রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা ও ব্যক্তিমায়ার তৃপ্তিকর তথ্য হিসেবে। এখানে কিন্তু বিষয়মুখটা ঘুরিয়ে দেওয়া। দক্ষিণ আমেরিকায় স্প্যানিশ সাহিত্যের সৃষ্টিকুশলময় রবীন্দ্রনাথ কতটা প্রেরণা জুগিয়েছেন, অথবা, প্রতিহত হয়েছেন, সেটি ওই ভাষার সমকালীন সাহিত্যকাণ্ড বা পরবর্তী তর্ক-বিতর্ক থেকে আপন নিরাসক্তি পুরোপুরি বজায় রেখে তিনি সাবলীল দক্ষতায় সর্বাঙ্গীন করে ফুটিয়ে তুলেছেন। এমন বই আমি আগে পড়িনি। পরেও না। কিন্তু আমাদের দেখবার চোখ পুরোপুরি খুলে দেওয়ায় এ যে কী অসাধ্য-সাধন করে, তা ভেবে মনে বিস্ময় জাগে, কৃতজ্ঞ থাকি। তাঁর এই কাজের পেছনে একটা প্রেরণা, প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে, অনুমান, তাঁর জীবনসঙ্গিনী মেক্সিকো-কন্যা, যাঁর মাতৃভাষা স্প্যানিশ, বেড়ে উঠেছেন যিনি ওই আবহেই। সম্ভবত এর একটা পরিণাম, জেনে, অথবা না জেনে, রাজু আলাউদ্দিন এখন বহন করছেন বাংলা ও স্প্যানিশ, উভয় সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহ্যের স্বাভাবিক উত্তরাধিকার। বাংলায় তাঁর কাজে আলোর মিশ্র প্রকাশ ঘটে। তা আভিনব ও সমৃদ্ধ। আমাদের দৃষ্টি প্রসারিত হয়।
          শুধু এই কথাগুলো বলা আমার লক্ষ্য নয়। আসলে মূল কথায় আসার জন্য বলা যেতে পারে, এ গৌরচন্দ্রিকা। তিন বছর আগে তাঁর কবিতার বই একটি প্রকাশ পেয়েছে। নাম : ‘আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি’—সবই বাংলা কবিতা-ঐতিহ্যে বাগবিধিতে, স্বপ্নকল্পনায়, আত্মস্বরূপে নির্ভুল এই পরিচয়। কিন্তু তার পরেও ফল্গুধারার মতো শৃংখলা, সংযমও পরিমিতিবোধ যেন অন্তঃসলিলা বয়ে যায়, যা কবিকে আলাদা করে চেনায়। মনে হয় বাড়তি কিছু আছে।
          বইটির আর এক বৈশিষ্ট্য, এ দ্বিভাষিক। প্রতিটি কবিতার সঙ্গে তার ইংরেজি অনুবাদ আছে। তবে অনুবাদক আর একজন, নাম, বিনয় বর্মন। শুরুতে ভূমিকাও ইংরেজিতে তাঁর লেখা। অনুষঙ্গে, এই সময়ে বাংলাভাষার অন্যতম সেরা কবি মোহাম্মদ রফিকের সপ্রশংস মূল্যায়ন,—ইংরেজিতেই। যারা বাংলা জানেন না, তাঁরাও ইংরেজি মাধ্যমে কবিতাগুলোর সুর স্বাদ ও মূল্যায়ন একসঙ্গে পাবেন। আজকের বহুভাষিক বাস্তবতায় এর মূল্য কম নয়। এখানে এই বইটি নিয়েই আমার কথা। তবে তা শুরুর আগে আরো একটু আবোলতাবোল বকবক করে নেই। লেখার সবটাই যে তেমন হবে না, ঐ নিশ্চয়তা কিন্তু দিতে পারি না। ‘পড়েছি মোগলের হাতে…’ এই প্রবাদ বাক্যটির সবটা যেন অগত্যা যাঁরা পড়ছেন, তাঁরা অনিচ্ছাতে হলেও হজম করতে রাজি থাকেন। মিনতি আমার এইটুকু।
          আমরা জানি, কবিতার অনুবাদে তার অনেক লাবণ্য, অনেক সৌকর্য হারিয়ে যাবার আশংকা থেকে যায়। বিশেষ করে মূল ভাষা ও অনুবাদের ভাষা যদি দুই পরস্পর বিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক বলয়ে বিকশিত হয়ে থাকে। গীতাঞ্জলি পর্ব থেকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর কিছু কবিতা নিজেই ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। কিন্তু এতে তাঁর আত্মবিশ্বাস কখনোই খুব প্রবল ছিল না। শেষে হাল ছেড়ে দেন। যেটুকু অনুবাদ তিনি করেছেন একটু খুঁটিয়ে সেদিকে দৃষ্টি দিলে সহজেই ধরা পড়ে, বাংলায় পেলব বা গভীর অনুভবের দ্যোতনা ইংরেজিতে আসেনি। অনেক জায়গায় আক্ষরিক অনুবাদ কষ্টার্জিত বা কৃত্রিম। কোথাও কোথাও সংক্ষেপিত, ফলে তুলনায় আড়ষ্ট। উপমা-বা রূপকল্পনা হাস্যকরভাবে আবেগরিক্ত, ফলে মরা ডালের মতো নিষ্প্রাণ, অথবা আগাছার মতো শ্রীহীন। তারপরেও যদি তিনি ইংরেজি অনুবাদে নতুন মূল্য সৃষ্টি করে থাকেন, তবে তার কারণ তাঁর অলোকসামান্য প্রতিভা। একই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বিভিন্ন ভাষায় পারস্পরিক অনুবাদ সমস্যা এমন অসেতুসম্ভব হবার কথা নয়। য়োরোপ ও আমেরিকার ভাবনা ও কর্মপ্রবাহ গত প্রায় পাঁচশ বছরের যোগাযোগে বিষয়টি সেই-রকমই দেখায়। এই উপমহাদেশেও তেমনই হওয়া স্বাভাবিক। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশে এই লক্ষণ প্রত্যাশিতভাবে স্পষ্ট। কিন্তু ইংরেজির মাধ্যমে য়োরোপীয় সংযোগে এই ধারা এখন শীর্ণ। যদিও কথ্য সংস্কৃতিতে, সঙ্গীতে আদান-প্রদান আগের মতেই সচল। হয়তো যোগাযোগ আরো ব্যাপক। এখানে চলচ্চিত্রের অবদান কম নয়।
          কিন্তু য়োরোপ-আমেরিকান সাংস্কৃতিক বলয় এতটাই ভিন্ন ছিল যে সেখানে আমাদের পরম্পরার অভিঘাত প্রায় কিছুই কোনো দাগ কাটে না। যদিও উত্তমর্নের ভূমিকা এদেশের ওপরমহলে গ্রহণ-বর্জনে তারা যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। বেশ কিছু নিচু তলাতেও চুঁইয়ে পড়ে। পাশ্চাত্য সাহিত্য-সংস্কৃতির অনুবাদ ও অনুকরণ আমাদেরও কৌতূহল জাগায়। কিছুটা বা জীবনযাপনের অভ্যাসে মেশে।
          অবস্থার একটা গুণগত পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে গত শতকের আশির দশক থেকে। তার আগে সত্তরের দশকে তথ্য-প্রযুক্তিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন, চাই-বা-না চাই, পৃথিবীজুড়ে মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগে সম্ভাবনার বিচিত্র পথের দিশা চোখের সামনে এঁকে দেয়। নিজেরদের অজানতেই আমরা ঘর-বারের সীমারেখা মুছে ফেলতে থাকি। আপন-আপন ভাষায় প্রয়োগ কুশলতায় ও চিত্রকল্পনাতে এর অলক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু করে। ফলে তা সম্পূর্ণ আত্মসচেতন হয়েও বিশ্বের সংযোগে ভিড়ে যায়। অনুবাদের কাজ মূল কাঠামো ও মূল ভাবনার অনুসরণে পূর্ণ বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েও সহজ, সাবলীল ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। কবি বা অনুবাদক কাউকেই এজন্য আগের মতো সাংস্কৃতিক বিভিন্নতার দুর্ভেদ্য প্রাচীরের সামনে আটকে যেতে হয় না। অবশ্য অভিজ্ঞতা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কেউ যদি একুশ শতকে এসেও দেড় হাজার-দুজাহার বছর আগের মূল্যবোধের বোঝা ধ্রুবজ্ঞানে বয়ে বেড়াতে সদম্ভে খাড়া থাকেন, তবে তিনি এই প্রবাহে শামিল হতে পারেন না। পারেন না তাঁরাও, যাঁরা কূপমণ্ডুকতার স্বভাব থেকে বেড়িয়ে আসতে ভয় পান। রাজু আলাউদ্দিন এমন কোনোটিই নন। জীবনস্রোতে তিনি বিশ্বনাগরিক। ঘরের পরিবেশেও তারই অন্তরঙ্গ ছোঁয়া। একান্ত বাঙালি ভাবনাতেও তাঁর মিশে যায় এই সব। এদের পরিশ্রুত প্রবাহ কবিতায় তাঁর ভাষার নির্মাণ। ইংরেজি অনুবাদে তার স্বতঃস্ফূর্ত স্বাভাবিকতা ও মৌলিক সৌরভ অনেকটাই থেকে যায়। অনুবাদকের পরিচয় কিছুই জানি না। অনুমান, তিনিও একই পথের পথিক। মূল কবিতার আকর্ষণ, অনুভবের সূক্ষ্ম চলাচল, তিনি যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে বজায় রেখেছেন। এখানে অবশ্য তাদের নিয়ে আলোচনায় যাচ্ছি না। যাঁরা সত্যিকারের যোগ্য, তাঁরা তা করবেন।
          সাধারণত কবিতা ও গণিতের অহেতুসম্ভব ব্যবধান প্রসঙ্গে অনেকে বলে থাকেন, গণিতে পাই বিভিন্ন উপাদানের নানা রকম সম্পর্কে একক সমাধানের বা সমাধানরাশির প্রমাণ; আর কবিতা চলে অনুভবের মুক্তাকাশে ইচ্ছেমতো ওড়ার স্বাধীনতায়। এই বিভাজন যথার্থ কি না, এ নিয়ে সংশয় কিন্তু থেকে যায়। কবিতাও খোঁজে বাস্তবের বহুবিধ কল্পনায় অন্বয় ও অন্বয়ের অন্তর্জালে স্থিতি ও অস্থিতির বিন্যাস। প্রত্যক্ষের দৃশ্যাবলি ও কর্মচঞ্চলতা মায়া জাগায়। তাকে পূর্ণপ্রাণের সমারোহে জাগ্রত করে অন্তরালের সম্পর্ক-সম্বন্ধে কান পেতে গন্ধ-বর্ণময় ধ্বনির ঐশ্বর্যে অর্থের বা তাৎপর্যের শিল্পিত অন্বেষণে কবির অভিনিবেশ। গণিতে চলকরাশির মতি-গতি ও স্থিতি বা অস্থিতির সম্পর্কের নিষ্কাশনে যে তৃপ্তি, কবিতাতেও মায়ার আড়ালে রসের খেলায় অশেষের পেছনে ছোটায় সেই অন্তহীন যাত্রার আকর্ষণ। তবে গণিতের উপাদান বস্তুনিরপেক্ষ চিহ্ন বা সংখ্যা, যারা আত্মসাৎ করতে পারে বিশ্ব-মহাবিশ্বের যাবতীয় তাড়নার নিরাসক্তিকে; বিপরীতে কবিতার ভিত্তিভূমি ষড়ৈশ্বর্যশালিনী আসক্তির সমাহার। সেও ছোটে সচ্চিদানন্দ সমাহিতির খোঁজে। এই রকম ছোটার নমুনাই পেলাম রাজু আলাউদ্দিনের কবিতাগুলোয়। স্থান-কালের আড়াল থাকলেও বাণীরূপ তাকে অতিক্রম করতে চায়। বোধ হয় এই কারণেই এরা অধিকতর অনুবেদ্য। প্রকৃতি-পরিবেশের একান্ত সীমায় আটকে থাকে না। এই সীমাই কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে প্রতিহত করেছিল। তিনি অবশ্য আজকের প্রযুক্তিবিপ্লবে মানববাস্তবতায় প্রসারমান সমজাতীয়তা প্রত্যক্ষ করেননি।
          বইটির নাম—‘আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি’—এখানেই ‘ভালোবাসার ওক্সিমোরন’ কবিতাটির এক চরণ থেকে কেটে নেওয়া। ‘ওক্সিমোরন’ তাৎক্ষণিকভাবে শুধু ওই শব্দের ব্যবহারেই বৈপরীত্যে সামঞ্জস্যের ব্যঞ্জনা ইংগিতময় করে তোলে। এভাবে ইশারায় সমগ্রের বিশেষত্ব ফুটিয়ে তোলা, অথবা, তার কোন মেজাজে দৃষ্টি আকর্ষণ করা এই সময়ের কবিতায় নতুন তাৎপর্য আনে। অবশ্য তা প্রাণবান হলে তবেই। রাজু আলাউদ্দিনের এই কবিতাসংকলনে এর দক্ষ প্রয়োগ বারবার আমাদের মুগ্ধতা কেড়ে নেয়। প্রেক্ষাপটে বিবিধ বিচিত্র আলো ফোটে। বহুমুখে ধায়। অনুভবে প্রসারণ ও সংকোচন একই শব্দসীমায় ঘটে চলে। কৃত্রিম মনে হয় না। চেতনার স্বাভাবিকতাতেই এমনটি মানিয়ে যায়। যেমন ‘আকাঙ্ক্ষা’ অসীমের অভিসারী হতে পারে, আবার তাকে বিশেষ কোনো প্রত্যক্ষের অভিমুখীও ভাবা যায়। ‘মানচিত্রে’ সমুদ্র বইয়ের পাতায় কতটুকুই-বা জায়গা নেয়, কিন্তু বাস্তবে তার কূল-কিনারা মেলে না। ‘গোপনে আঁকা, আর, উত্তমপুরুষে বলা মুহূর্তে একে ব্যক্তির অস্তিত্বে, তার সমস্ত বৈপরীত্য ও বিপন্নতা নিয়ে, নির্দিষ্ট করে। আমরা বর্তমানের অনিশ্চিত সম্ভাবনা রাশি স্পর্শ করি। সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা, উভয়ের সামনেই প্রশ্নবোধক চিহ্ন তোলে। কবিতায় কিন্তু ভারসাম্য বজায় থাকে। তারিফ করি। নতুন কিছু পাই। তা আমাদের কল্পনায় মানববাস্তবতাকে এক ইন্দ্রয়গ্রাহ্য সম্প্রসারিত, কিন্তু অন্তর্জগতে সতত পরিবর্তনশীল, প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে। বাংলাভাষার নিজস্ব সংবেদনশীলতা ও ঐতিহ্যলালিত পরিকাঠামো কিন্তু হারিয়ে যায় না। তারা বরং অভিনব অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়। সাহসীও।
          বইটির আরো অনেক কবিতা আমাদের চেতনায় আলোড়ন তোলে। কল্পমায়া ‘নূতন আভরণে’ নূতন রূপ পায়। বিশ্বাস বা অভ্যাসের জগতেও আকস্মিক হানা দিয়ে তাতে অপ্রত্যাশিত জীবনের স্পন্দন জোগায়। ‘ঢাল-তলোয়ার ঝনঝনিয়ে’ বাজে না। লাবণ্য অটুট থাকে কিন্তু পাঠাভ্যাসে ঝাঁকি দেয়। তা কল্যাণকর। সর্বান্তঃকরণে একে স্বাগত জানাই।
          সব কবিতাই কিন্তু এক একটি পূর্ণাঙ্গ সৃষ্টি। মেদহীন, স্বয়ম্প্রভ, মার্জিত ও ব্যাকুল। রজনিগন্ধা ফুলের মতো। কোনো নমুনা খাড়া করতে চাই না। প্রত্যেক কবিতার উপলব্ধি ও উপভোগ, তার সবটা নিয়ে। বিস্ময়ের সংযোজনাও। এদের খণ্ডিত করা সংগত মনে করি না।

মূল নাম : আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি। ইংরেজি নাম : Secretly have i drawn the Map of Desire. English Translation : Binoy Barman. Edited by Khaliquzzaman Elias. Published by Kheya Prokashan. First Published Ekushe Boimela, 2017. Cover : Masuk Helal. Price : 250.

/জেডএস/

সম্পর্কিত

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

লিডসে এলিয়টের 'ওয়েস্টল্যান্ড' ও নজরুলের 'বিদ্রোহী' কবিতার শতবর্ষ

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমার B ও ৯
সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

পর্ব—তিনসাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

তুমি নামের অচেনা কেউ

তুমি নামের অচেনা কেউ

সর্বশেষ

১৯৭৩ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আবারও নতুন পদক্ষেপ নিতে হয়

১৯৭৩ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আবারও নতুন পদক্ষেপ নিতে হয়

সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনায় ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে: ইরান

সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনায় ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে: ইরান

আসিয়ানের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করলো যুক্তরাষ্ট্র

আসিয়ানের প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করলো যুক্তরাষ্ট্র

সুম্বা দ্বীপের নাচুনে গাছ! (ফটোফিচার)

সুম্বা দ্বীপের নাচুনে গাছ! (ফটোফিচার)

ভোক্তা প্রতারণা বন্ধে কার্যকর উপায় বের করার নির্দেশ রাষ্ট্রপতির

ভোক্তা প্রতারণা বন্ধে কার্যকর উপায় বের করার নির্দেশ রাষ্ট্রপতির

© 2021 Bangla Tribune