X
বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১, ১১ কার্তিক ১৪২৮

সেকশনস

করোনার করুণ কাহিনি: তালেবানের কাবুল দখল ও ‘ইয়াঙ্কি জিহাদি’

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২১, ১৫:২৪

মাকসুদুল হক ‘তুমি চোর’রে কও চুরি করো, গৃহস্থরে কও ধরো ধরো
তবু কেন মাটির সন্তান হইলো গুনাহগার গো
মানুষও বানাইয়া খেলছো যারে লইয়া’।

– গ্রাম্য প্রবাদ ভিত্তিক গান
 
 
আফগানিস্তান প্রশ্নে ২০ বছরের অধিক সময় আমাদের পশ্চিমা শক্তিগুলো যেমন ঢালাও ভাবে তাদের মিথ্যাকে গুণকীর্তন করা শিখিয়েছে– অপর দিকে সত্যকে মিথ্যা বলে বুঝতে, বোঝাতে ও বলতেও বাধ্য করেছে। অথচ সত্য আজ এসে রুঢ়ভাবে আমাদের সবার মুখমণ্ডলে নির্বিচারে চপেটাঘাত করছে।

তালেবান নামের সেই ‘ভয়ানক ও বর্বরোচিত শত্রু’ কাবুল দখল করেছে। এবার কী হবে?
 
যেখানে পশ্চিমা শক্তি ও তার লেজুড়বৃত্তি করা আফগানিস্তানের আশরাফ ঘানি সরকার ঘোষণা করেছিলো– তালেবান যতই অন্যান্য প্রদেশ দখল করুক, রাজধানী কাবুল ঘেরাও করে দখল করতে তাদের লাগবে নিদেনপক্ষে ৯০ দিন। অথচ সকল জল্পনা-কল্পনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তালেবান কাবুল ১০ দিনেই দখল করে ফেললো।
 
পৃথিবীর রণযুদ্ধের ইতিহাসে এটি একটা বিরল ঘটনা– কারণ খুবই স্বল্প মৃত্যুর ঘটনা বা ক্ষয়ক্ষতি এবার ঘটেছে। একভাবে চিন্তা করলে– বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তালেবান কাবুল অব্দি পৌঁছাতে পেরেছে। আপাত দৃষ্টিতে সম্ভাব্য রক্তগঙ্গা প্রতিহত করা হয়েছে কেবল তালেবানদের তথাকথিত ‘ভদ্র ও স্বাভাবিক’ আচরণের কারণে।

এক সপ্তাহে কিছু উশৃঙ্খল ঘটনা ছাড়া ব্যাপক কোনও তালেবান দ্বারা কুৎসিত তৎপরতা খবরে অনুপস্থিত। যুদ্ধ শেষে তারা মিডিয়াতে ‘চার্ম অফেন্সিভ’-এ ব্যস্ত। সমগ্র বিশ্বকে তাদের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টি লক্ষে এই মুহূর্তের সকল কর্মকাণ্ড সীমিত।
 
তবে এই অব্দি তাদের চিরাচরিত ইসলামি শারিয়া আইন প্রয়োগ করে প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ এমনকি নারী নির্যাতন, নারীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা, নারীরা ঘর থেকে বের হয়েছে বলে পথঘাটে বেদম প্রহার, ধর্ষণ এসবের কোনও খবর গণমাধ্যমে একেবারে পাওয়া যাচ্ছে না বললে ভুল হবে– তবে খুবই কম পাওয়া যাচ্ছে।
 
বলা হচ্ছে পাল্টানো সময়ে এ এক ‘সংশোধিত ও নবজাগ্রত তালেবান’ যার সাথে ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত যে তালেবান সরকার ক্ষমতায় ছিল তার কোনোরকম মিল নেই। আইফোনের ন্যায় এ নাকি ‘তালেবান ২.০’–  অর্থাৎ নব্য অত্যাধুনিক তালেবান।
 
বিগত তালেবান সরকারের প্রকাশ্যে বর্বরোচিত আচরণ যথা নারীদের চাবুক দিয়ে প্রহার করা,ব্যাভিচার বা ‘জেনাহ’র দায়ে পাথর ছুড়ে মৃত্যদণ্ড কার্যকর করা, চুরির দায়ে হাত কাঁটা ও অদ্ভুত সব কায়দা-কানুন যার সাথে ইসলামের কোনও সম্পর্ক নেই– সমগ্র বিশ্বে যেমন ক্ষোভ সৃষ্টি হয়, একই রকম ক্ষোভ ও শঙ্কা সৃষ্টি হয় বহু ইসলামিক ও মুসলিম প্রধান দেশে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়।

মধ্যযুগীয় বর্বরতা এই পরিবর্তিত পৃথিবীতে মানব মনে শিহরণ, ভয় ও আতঙ্ক জাগানো খুবই স্বাভাবিক আর তা যখন ইসলামের নামে সংঘটিত হয়–  তার ফলে পশ্চিমাদের ভেতরে জঘন্য মুসলিম বিদ্বেষ বা ‘ইসলামোফোবিয়া’র প্রকটভাবে যে আবির্ভাব ঘটেছে তা আমাদের সমষ্টিগত চিন্তা থেকে সরিয়ে দেওয়াটাও অসম্ভব।
 
পাশাপাশি তালেবানের ওসামা বিন লাদেন ও আল কায়দাকে তাদের মাটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালানোর জন্য ঘাঁটি ও মদদ দেওয়াই আফগানিস্তানের ভাগ্যে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। যদিও এ নিয়ে বহু মত, দ্বিমত ও বিতর্ক আছে। আল কায়েদার নিউ ইয়র্ক শহরে ২০০১ এর ১১ সেপ্টেম্বর আক্রমণের কারণে, কেবল তালেবান নয়, সমগ্র বিশ্বে মুসলিম জনগণের ওপরে নেমে আসে অবর্ণনীয় জুলুম, ধিক্কার ও নির্যাতন।
 
রাতারাতি ইসলাম ‘শান্তির ধর্ম’ থেকে হয়ে উঠলো ‘জঙ্গি সন্ত্রাসবাদীদের ধর্ম’ ও পশ্চিমা বিশ্ব ঘোষণা দিলো এই ‘গ্লোবাল জিহাদ’ তারা যেকোনও মূল্যে প্রতিহত করবে। ইসলাম ও মুসলিম যে পৃথক দুটো বিষয় সেই আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণে সে সময় অনেকেই দেওয়ার চেষ্টা করলেও– সেই চেষ্টার অর্থ ছিল নিজেদের পশ্চিমা মিডিয়া দ্বারা বোকা বনা– কারণ পশ্চিমারা ইতিমধ্যে মুসলমানদের পুরো দস্তুর স্টেরিওটাইপিং করা শুরু করে দিয়েছিলো যা এখনও চলমান।
 
এই ঘৃণা,এই মানুষ মানুষে দ্বন্দ্ব গেলো ২০ বছরে কেবল তীব্র হয়নি– মুসলিম মুসলিম সংঘাত, বিদ্বেষ, দাঙ্গা ও যুদ্ধ বেড়েই চলেছে। জঙ্গিবাদ প্রতিহত করতে মার্কিন হস্তক্ষেপের আগের ও পরের চিত্র- ইরাক, লিবিয়া, ইয়েমেন বা সিরিয়ার অবস্থা কী ছিল, এবং এখনকার দুরবস্থা, তা সকলের নিশ্চয়ই বোধগম্য।

এই কাজে একটা ‘বিশেষ সুবিধা’ হয়ে গেলো পশ্চিমাদের। ওপরের দেশগুলোর কথা বিবেচনায় রাখলে একটা বিষয় অন্তত পরিষ্কার: আজ পশ্চিমা শক্তি সমূহ নিজেরা মানুষ খুন করে নিজেদের হাত আর নোংরা করে না। সে সম্ভাব্য সব রকম কৌশল নিয়োগ করছে মুসলিম দ্বারা মুসলিমদের নিধন - ও আফগানিস্তান ও তার ভবিষ্যৎ সেদিকেই যে এগুচ্ছে তা দৃঢ়ভাবে আমি বিশ্বাস করি। তালেবান বা পশ্চিমাদের এই মুহূর্তের ‘শান্তির জুজু’ অত্যন্ত সীমিত সময়ের জন্য ও এরপর যা ঘটবে তার জন্য আমাদের কারো কোনও মানসিক প্রস্তুতি আছে বলে আমি মনে করি না।
 
প্রশ্ন হচ্ছে এরপর কী?

কয়েক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে তৈরি করা ৩,০০,০০০ সৈন্যর ভারী অস্ত্র, ট্যাংক, বিমান বাহিনী ইত্যাদি সুসজ্জিত আফগান সামরিক বাহিনী কেন যুদ্ধ না করে তালেবানের কাছে আত্মসমর্পণ করলো বা যুদ্ধ ময়দান ছেড়ে পলায়ন করে অন্যত্র সরে গেলো? তাও আবার সংখ্যায় ৭০,০০০ স্বল্প ও হাল্কা অস্ত্র সজ্জিত অনিয়মিত এক তালেবান গেরিলা বাহিনীর অগ্রসর হওয়ার মুখে?

এর পেছনে কাজ করেছে যুদ্ধের ক্লান্তি সহ তিক্ততা ও তালেবানের প্রতি লাগামহীন ভয়। হয়তোবা আরেকটা কারণ ছিল বিদেশিদের ইন্ধনে আফগানরা ভাইয়ে ভাইয়ে কতল করতে আর ইচ্ছা প্রকাশ করছিলো না।

তবে যে বিষয়টা উপেক্ষিত তা হলো তালেবানের প্রতি জনসমর্থনেরও কোনও কমতি ছিল না। একটি বিদেশি শক্তির তোষামোদি করা বাহিনীকে ২০ বছর জনগণ সহ্য করেছে– এ-কি কম? এমনি এক ভয় যা দেশের প্রেসিডেন্টকে বাধ্য করেছে জনগণকে ভাগ্যের ওপর ফেলে দিয়ে, রাতারাতি পালিয়ে যেতে।

এখন প্রতি ঘণ্টায় টেলিভিশন পর্দায় দেখা যাচ্ছে কাবুল এয়ারপোর্টের করুণ ও অসহায় চিত্র। লাখো মানুষ পালানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। কাবুল এয়ারপোর্টে মার্কিন, ব্রিটিশ ও অন্য পশ্চিমা দেশের সেনারা ‘লোহার বেষ্টনী’ সৃষ্টি করে সবাইকে ঘিরে রেখেছে।

অপর দিকে তালেবান বাহিনী তাদেরকেও আরেক বিশাল বেষ্টনী দিয়ে পাল্টা ঘেরাও করে রেখেছে। ধারণা করা হচ্ছে এ অবস্থা চলতে থাকবে ৩১ আগস্ট ২০২১ অব্দি। এই থমথমে পরিস্থিতিতে যে কোনও দুর্ঘটনা ঘটে গেলে অবাক হওয়ার কিছুই নেই।
 
এ কার ব্যর্থতা? আফগানিস্তান দেশটির, তার জনগণ নাকি পশ্চিমা শক্তিদের? এ নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা যে চলতে থাকবে তা অবধারিত।
 
তবে আমাদের বিশ্লেষণের প্রথম প্রশ্ন থাকবে– ভাই একটু থামেন। এই তালেবান, এই আল কায়েদা, এই আইসিস, এই হেজবুল্লাহ– এসকল তথাকথিত ‘জঙ্গি সংগঠন’ সৃষ্টি করলো কে? এই সকল গোমূর্খদের ‘যুদ্ধ করে শান্তি আন্তে হবে’ এ দীক্ষা কে দিয়েছে? কোথায় তাদের রসদ, কোথায় তাদের অর্থ, কোথায় তাদের যুদ্ধে টিকে থাকার মানব সম্পদ?

সব কিছুর মূলে মার্কিনি ও বিভিন্ন পশ্চিমা শক্তি, তাদের দালাল, গুপ্তচর ও গোয়েন্দা সংস্থা। এসকল মুসলমান নামধারী ‘ইয়াঙ্কি জিহাদি’ তারা নিজেরাই সৃষ্টি করে ও নিজেরাই ধ্বংস করে– এ আর ‘নতুন’ কী? মাঝামাঝি সুযোগ করে নেয় বিরতিহীন নিরীহ মুসলমান কতল করার মচ্ছব - যদিও মুখেমুখে দাবি করে ‘এই যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে নয়, এ যুদ্ধ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে।’
 
একটু ভেবে দেখেন তো– জর্জ বুশ, বিল ক্লিনটন ও বারাক ওবামা এই তিন মার্কিনি প্রেসিডেন্ট সম্মিলিতভাবে ২৩ বছরে ‘গ্লোবাল জিহাদ’ রুখার বাহানায় বিশ্বের ৯টি ইসলামি বা মুসলিম প্রধান দেশ দখল করে ১ কোটি ১০ লাখ মুসলমান নির্বিচারে হত্যা করলো। অথচ তাদেরকে কেউ ‘সন্ত্রাসী’ বা ‘জঙ্গি’ বলে না।
 
পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’এর  প্রধান ও প্রথম মহাপরিচালক জেনারেল হামিদ গুল অবসর গ্রহণের পর মার্কিন সৈন্য বাহিনীর ১৯৯৬ সালে আগমনের কিছু দিন আগে বলেছিলেন–
 
‘মার্কিনিরা এক বিশাল ভুল করতে যাচ্ছে। তারা জানে না যে স্বাধীনচেতা আফগানরা কোনও বিদেশি শক্তিকে বরদাশত করে না। ইতিহাসে ঘটলে দেখা যাবে ওরা  ব্রিটিশ, রাশিয়ান সব বিদেশি সামরিক বাহিনীদের নাকানি-চুবানি খাইয়ে বিতাড়িত করেছে। আফগানরা এক যুদ্ধবাজ জাতি। ওরা যুদ্ধে অত্যন্ত আনন্দ থাকে। যুদ্ধই ওদের শান্তি। যুদ্ধ না থাকলে ওরা অশান্তিতে থাকে–
 
এমনি একটা ‘অদ্ভুত’ জাতি সমগ্র বিশ্বের আলোচনার আজ  কেন্দ্রবিন্দু। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে তালেবানের প্রভাবে কী ঘটতে পারে তা নিয়ে বিশ্লেষকদের আলোচনা ও পর্যালোচনাও শুরু হয়েছে। তবে আমরা যেটা জানি না তা হলো তালেবান আর আফগান সমার্থক শব্দ নয়।
 
পাশতুন, হাজারা, উজবেক, নুরিস্তানি, আইমাক, বালুচ, তুর্কমান সহ আরও একাধিক উপজাতীয় ও নৃগোষ্ঠী সম্মিলিত দেশ আফগানিস্তান। পুশতু ও দারি রাষ্ট্র স্বীকৃত সরকারি ভাষা। এই তালিকায় খুবই স্পষ্ট যে আফগানিস্তান ও তালেবান পৃথক দুটি বিষয়। একটি জাতি অপরটি এক ক্ষীণদৃষ্টি সম্পন্ন সত্তা– যা ইসলামকে অপব্যবহার করছে পশ্চিমা ইন্ধনে। আফগনিস্তানকে যুগযুগ ধরে পশ্চাৎপদতা ও অন্ধকারে আচ্ছন্ন রেখেছে।  
 
একটু ফিরে তাকালেই এর নেপথ্যের কাহিনি বোঝা সম্ভব।

১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ এই ১০ বছর সোভিয়েত রাশিয়া আফগানিস্তান দখল করলে যুদ্ধে প্রায় ২০ লক্ষ লোক মারা যায়। এর মূল কারণ ছিল আফগানিস্তানের কমিউনিস্টদের ১৯৮৯ সালে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থান ও ক্ষমতা দখল যা নস্যাৎ করতে মার্কিনি গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ সহায়তা নিয়েছিলো পাকিস্তানি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর। আফগানিস্তানের সাহায্যে এগিয়ে আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য সহ চীন এমনকি ইসরায়েল।
 
ইসলামি ইতিহাসে এই প্রথম একটি ‘জিহাদ’ ঘোষণা দিয়েছিলো অমুসলিম রাষ্ট্রসমূহ ও মুজাহিদীন গেরিলা নেতাদের হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান তাদের ভূয়সী প্রশংসায় ছিলেন পঞ্চমুখ। ইসলাম বা আফগানিস্তানের পক্ষে নয় বরং সোভিয়েত রাশিয়াকে পরাজিত করতে অস্ত্র সহ যত রকম সহায়তা দেওয়া সম্ভব তা পশ্চিমা শক্তিরা দিয়েছিলো। আফগানদের জন্য এটা ছিল ‘কমিউনিস্ট নাস্তিকতা বিরোধী জিহাদ’– ও সমগ্র মুসলিম জাহান থেকে শতশত বিদেশি যোদ্ধা যোগ দিয়েছিলো এই জিহাদে। এমনকি বাংলাদেশ থেকেও।
 
কিন্তু যুদ্ধে শেষ হওয়ার সাথে সাথে পশ্চিমারা হাত গুটিয়ে সরে পড়লেন অর্থাৎ বাঁদরকে গাছে চড়িয়ে দিয়ে গোড়া কর্তন করলেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯ কাবুল সোভিয়েত রাশিয়া থেকে মুক্ত হলেও শান্তি নামের বস্তুটি কেবল মরীচিকা রয়ে গেলো।
 
উদহারণ স্বরূপ ১৯৯১ এ সোভিয়েত রাশিয়ার পতন ঘটলে ১৯৯২ সালে কাবুল মুজাহিদীন গেরিলারা দখল নেয়। কিন্তু ইতিমধ্যে তাদের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে যুদ্ধ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। যুদ্ধবাজ নেতা গুলবুদ্দীন হেকমাটিয়ার কাবুলের ওপরে লাগাতার হামলার কারণে ৫০ হাজারের ঊর্ধ্বে মানুষ মারা যায় ও কাবুল শহর প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। বিশৃঙ্খলা, অভ্যন্তরীণ হানাহানির কারণে রক্তপাত ও লাখ লাখ লোক পাকিস্তান ও ইরানে শরণার্থী হিসেবে পলায়ন করা শুরু করে।
 
এ অবস্থায় একেবারে আকস্মিকভাবে ১৯৯৪ সালে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্ররা ‘তালেবান’ নাম আত্মপ্রকাশ করে দক্ষিণ আফগানিস্তানের কান্দাহার শহর দখলে নিয়ে নেয়। ১৯৯৬ এর সেপ্টেম্বর ২৬ তারিখে তালেবান যোদ্ধারা কাবুল শহর দখলে নিয়ে নেয়।
 
বাকিটা ইতিহাস যা আমি নিশ্চিত নতুন করে আর বলার বা বোঝানোর কোনও অবকাশ এখানে নেই।

আফগানিস্তানের সম্ভাব্য ভবিষৎ দৃশ্যবিবরণী:
 
১. কাবুল এয়ারপোর্ট এই মুহূর্তে এক অভয় অরণ্য। তার টারমাকে ও রানওয়ে কোনোটাই তালেবানদের নিয়ন্ত্রণে নেই। এমনকি কে আসছে আর কে যাচ্ছে তারও কোনও হিসাব তাদের কাছে নেই। আটকে পড়া বিদেশি ও আফগান পশ্চিমা দালালদের উদ্ধার ও পলায়নের চেষ্টায় ব্যবহৃত যে সকল বেষ্টনী এয়ারপোর্ট ও তার আশপাশের অঞ্চলে সৃষ্টি হচ্ছে- তা যে কোনও মুহূর্তে ভেঙে পড়ার জোর সম্ভাবনা।
 
২. যে বিমানগুলো বিদেশ থেকে আসছে মানুষ উদ্ধার করতে তা কি বিনা যাত্রী নিয়ে আসছে? না, বহু দেশের সেনা ও ভাড়াটে সৈনিকরা গোপনে আসছে তালেবানদের আকস্মিক ও বিশাল এক ধাক্কা দিতে। সাধারণ ও বেসামরিক মানুষ কী পরিমাণ মারা যেতে পারে তা কেবল অনুমেয়।
 
৩. ইতিমধ্যে পশ্চিমা মিডিয়া প্রচার করছে যে তালেবান বিরোধী ছোট ছোট বিক্ষোভ সমাবেশ সমগ্র আফগানিস্তানে ছেয়ে গেছে। তালেবান পতাকাকে উপেক্ষা করে প্রাক্তন আফগান রাষ্ট্রের পতাকা নিয়ে সম্মিলিত নারী-পুরুষ পথে ঘাটে নেমে পড়েছে, এমনকি বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে।
 
৪. পাশাপাশি পাঞ্জশির সহ বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল যেখানে পূর্বে রুশ, পশ্চিমা শক্তি কিংবা তালেবান কখনই দখলে নিতে পারেনি সেখানে হাজারো তালেবান বিরোধী যোদ্ধারা সমবেত হচ্ছে।

উভয় ক্ষেত্রে যে বিষয়টা লক্ষণীয়– আফগানিস্তানের সকল মুক্তিকামী মানুষ ‘পশ্চিমা সাহায্যের’ মুখাপেক্ষী। এর অর্থ গিয়ে দাঁড়াচ্ছে আফগানিস্তান সম্পর্কে শেষ দাবার গুটিটি পশ্চিমারাই দান খেলবে। আফগান বা তালেবানরা নয়।
 
৫. তালেবান বলছে তাদের ইসলামি রাষ্ট্রের ধরন ও বাস্তবিক চিত্র কী হবে তা তারা বিদেশি সন্যরা ৩১ আগস্টে ত্যাগ করার পর ঘোষণা দেবে। ইতিমধ্যে পশ্চিমারা ৩১ আগস্ট বাঁধা সময় ছাড় দিয়ে দু’সপ্তাহ বিলম্ব করা যায় কিনা তা তালেবানদের সাথে আলোচনা করছে। আপাতত বলা হচ্ছে এটি ‘ইসলামি আমিরাত আফগানিস্তান’ হবে; আইসিস-এর মতো ‘খেলাফত’ না। এই সম্ভাব্য ইসলামি আমিরাত সমগ্র বিশ্ব সহ ইসলামি ও মুসলিম প্রধান দেশরা কীভাবে গ্রহণ করে– তা দু’সপ্তাহের অন্তর বোঝা যাবে। এই মুহূর্তে তা বলা সম্ভব না।
 
৬. মূলত তালেবানের কাবুল তথা আফগানিস্তান দখল পশ্চিমাদের ‘জাত শত্রু’ রাশিয়া, চীন ও ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, বেকায়দায় ফেলে এক ধরনের ‘ঘোলা জলে মাছ শিকার’ এর উপক্রম মাত্র। পাকিস্তান একটি দালাল ও বেঈমান রাষ্ট্র - তা আমরা ১৯৭১ সালে টের পেলেও বিশ্ববাসী, বিশেষ করে তথাকথিত ইসলামিক রাষ্ট্র সমূহ এখনও টের পাইনি। আফগানিস্তান প্রশ্নে পাকিস্তানের ভূমিকা সব সময় প্রশ্নবিদ্ধ ছিল ও পশ্চিমাদের কাছে কখনোই তা পরিষ্কার বা স্বচ্ছ ছিল না। তবে তার তাবেদারী,দালালি ও পশ্চিমা পরাশক্তির কাছে নতজানু থাকা - এ নতুন কোনও বিষয় না।

৭. তালেবান পাকিস্তানের সৃষ্টি কেবল নয়, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেনাজির ভুট্টো ‘তালেবান জননী’ বলেও আখ্যায়িত। ইমরান খান তার দেশের অর্থনৈতিক দেউলিয়াপনা থেকে উদ্ধার হতে আফগানিস্তান পরিস্থিতি যে সকল ‘শুভ ও অশুভ’ সুযোগ নেবেন তার কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।
 
৮. আফগানিস্তান দেশটি তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদের কোনও অভাব নেই। তাকে ইচ্ছাকৃত ভাবে শতশত বছর ধরে দেশটাকে দরিদ্র রাখা হয়েছে কেবল মাত্র পশ্চিমা শক্তিদের ইন্ধনে। প্রচণ্ড স্বাধীনচেতা জাতি হলেও আফগানিস্তানকে দিকভ্রান্ত করে রেখেছে যুদ্ধের পর যুদ্ধের মাঝে। যুদ্ধ তার আর শেষ হওয়ার নয়। প্রকৃত স্বাধীনতা থেকে এই দেশটি বহুকাল ধরে বঞ্চিত। তবে তার দুর্ভাগ্যের অন্ত নেই কারণ এত কিছু সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আফিম উৎপাদন তার ভাগ্যকে নিদারুনভাবে ক্ষতি সাধিত করে এসেছে। বিশ্বের সব চাইতে বৃহৎ আফিম রফতানিকারী আফগানিস্তান। তবে এই ব্যবসা সবটাই চোরাই পথে চলে ও এই নিষিদ্ধ দ্রব্যের ক্রেতা মূলত পশ্চিমা দেশগুলো।

আফিম থেকে সৃষ্ট মরফিন ও হেরোইনের ৭০ ভাগ চালান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ বিশ্বের নারকোটিক মাফিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। কত হাজার কোটি বা ট্রিলিয়ন ডলারের এই ব্যবসা তা বলা মুশকিল কিন্তু তথাকথিত ‘ইসলামি জঙ্গি সংগঠন’ তালেবানও এই ব্যবসায় মধ্যস্বত্বভোগী বহু বছর ধরে। তার অস্ত্র কেনার অর্থ, তার বাণিজ্যিক পুঁজি, তার চাঁদার উৎস সবই আফিম। সবই হেরোইন থেকে। আফগানিস্তানের ভাগ্য মাদক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। কাবুল দখল হওয়া আর না হওয়ায় কোনও কিছুই যায় আসে না। এখন দেখার অপেক্ষায় থাকলাম– এই আফিম, হেরোইন ব্যবসা শেষমেশ কে দখলে নিতে পারে। তবে তাতে শান্তি যে ফিরে আসবে তেমন কোনও গ্যারান্টি নেই ।

লেখক: সংগীত শিল্পী

/এসএএস/

সম্পর্কিত

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (২)

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (২)

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (১)

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (১)

করোনার করুণ কাহিনি: গালি, তালি, পরীমণি ও প্রজন্মের বিদ্রোহ

করোনার করুণ কাহিনি: গালি, তালি, পরীমণি ও প্রজন্মের বিদ্রোহ

করোনার করুণ কাহিনি: করোনা কি বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়েছে?

করোনার করুণ কাহিনি: করোনা কি বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়েছে?

পাকিস্তানি মদতে তালেবানদের কাবুল দখলে সতর্ক বাংলাদেশ

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২১, ১৮:১২

ফারাজী আজমল হোসেন তালেবান কাবুল দখল করায় বাংলাদেশি মৌলবাদীরা খুবই উল্লসিত। বাংলাদেশি কট্টরবাদীরা তালেবানদের জয়কে ইসলামিক শক্তির আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয় হিসেবে দেখছে। গলা ফাটিয়ে তাদের খুশিতে বলতে শোনা গেছে, ‘আলহামদুলিল্লাহ’! কিন্তু তালেবান উত্থানে আন্তর্জাতিক রাজনীতির নয়া সমীকরণ আমাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। দেশের নিরাপত্তার জন্য ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে তালেবানদের কাবুল দখল। কারণ, নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া নজরে থাকা বিভিন্ন জঙ্গিবাদী সংগঠন এখন পাকিস্তানের সহযোগিতায় নতুন করে অস্থিরতা তৈরির মতলব কষছে।

বিএনপির আমলে বাংলাদেশ থেকে অনেকে মুজাহিদিন বা তালেবান কট্টরপন্থীদের মদত জোগাতে আফগানিস্তানে গিয়েছিল। ফিরে এসে জেএমবির সহযোগিতায় বাংলাদেশে প্রচুর সন্ত্রাসী হামলা চালায় তারা। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত কট্টরবাদীরা বাংলাদেশের মাটিতে নিরাপদেই ছিল। ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে বহু বাংলাদেশি আফগানিস্তানে তালেবানদের কাছ থেকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেয়। এদের কেউ কেউ ১৯৯৬ সালে আফগানিস্তানে ইসলামিক আমিরাত প্রতিষ্ঠার পর ফিরে আসে বাংলাদেশে। আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশের মাটিতে শেখ আবদুস সালাম গড়ে তোলে হুজির (বি) মতো জঙ্গিবাদী সংগঠন। ১৯৮৮ সালে মুফতি আব্দুল হান্নান আফগানিস্তান যায় এবং ১৯৯৪ সালে ফিরে এসে হুজির (বি) সংগঠন শক্তিশালী করতে সক্রিয় ভূমিকা নেয়। ১৯৮৮ সালে জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আব্দুর রহমানও তালেবান ও আল-কায়েদার কাজকর্মে অনুপ্রাণিত হয়েছিল।

তাই অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে সতর্ক সরকার। আফগানিস্তানে তালেবান উত্থানে পাকিস্তানপন্থীরা ফের অস্থিরতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মৌলবাদীরা ফের কিছু বাংলাদেশিকে আফগানিস্তানে প্রশিক্ষণে পাঠাবে। এখনও জেএমবির হাজার দুয়েক সদস্য রয়েছে। এরা আবার আনসার আল ইসলামের হয়েও কাজ করে। কাজের ধরন এক হওয়ায় এরাই আবার কাজ করে ভারতীয় উপমহাদেশে আল কায়েদা (আকিজ) হিসেবেও। ইসলামিক স্টেটে (আইএস) অনুপ্রাণিত নব্য জেএমবি বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, রংপুর, বগুড়া, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বহু এলাকায় তারা বেশ সক্রিয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তালেবানি ভাবধারা প্রচারকদের সতর্ক করে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছেন পাকিস্তানপন্থী মৌলবাদীদের। জঙ্গিবাদী প্রচারের বিরুদ্ধেও দেশবাসীকে সতর্ক করেছেন।  বিএনপির আমলে বাংলাদেশের মাটিতে স্লোগান উঠেছিল,  ‘আমরা সবাই তালেবান/ বাংলা হবে আফগান’। কিন্তু বাংলাদেশ টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী জানিয়ে দেন, বাংলাদেশ সৃষ্টির মূলনীতির ওপর জোর দিয়ে তালেবান মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন তালেবানদের কাবুল দখলের পর জানান, আফগান-প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসীদের বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে। তাদের চিহ্নিত করে উপড়ে ফেলা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের কর্মকর্তারা মনে করেন, জেএমবি এখন আনসার আল ইসলাম এবং নিউ-জেএমবি সংগঠনের মাধ্যমে সক্রিয় রয়েছে। আনসার আল ইসলাম আকিজ নামেও পরিচিত। তাদের দলে শ-তিনেক নারীও রয়েছে। সদস্য সংখ্যা হাজার দুয়েক। সামাজিক গণমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচারণাও চালাচ্ছে তারা। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, ১২টি জেলায় বেশ সক্রিয় শায়খ আব্দুর রহমানের হাতে তৈরি সংগঠনটি। ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। আন্তর্জাতিক দুনিয়া রোহিঙ্গা সমস্যার কোনও সমাধান করতে পারেনি।

যুক্তিসঙ্গত কারণেই আফগান শরণার্থীদের আশ্রয়ের প্রশ্নে আমেরিকার অনুরোধ রাখেনি বাংলাদেশ। তাই মৌলবাদীরা রোহিঙ্গা শরণার্থীদেরও জঙ্গিবাদী কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদীরা বেশ কোণঠাসা। তাদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু সাফল্য এসেছে নিরাপত্তা বাহিনীর। দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা জেএমবি, নিউ-জেএমবি, আনসার আল ইসলাম, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি), হেফাজতে ইসলাম এবং অন্যান্য জঙ্গিবাদী সংগঠনের সঙ্গে জড়িত অনেককেই গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৬ সালে সমকামী অধিকারকর্মী জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু মাহবুব তনয়কে কুপিয়ে হত্যার অপরাধে ৩১ আগস্ট ঢাকার একটি আদালত ৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। ৬ সেপ্টেম্বর জামায়াতে ইসলামীর (জেআই) মহাসচিব মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ইয়াছিন আরাফাতকে তাদের ধ্বংসাত্মক কাজের জন্য গ্রেফতার করা হয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর সিলেট জেলা থেকে জেআই-নেতা নিজাম উদ্দিন সিদ্দিকীকে গ্রেফতার করা হয়। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) ৪২ কর্মীকে দিনাজপুর থেকে গ্রেফতার করা হয় ১৭ সেপ্টেম্বর। সেদিনই ঢাকা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) বাসাবো থেকে গ্রেফতার করে হেফাজতে ইসলাম নেতা রেজওয়ান রফিককে। সাতক্ষীরা জেলা থেকেও জেআইর ১০ নারী সদস্যকে গ্রেফতার করা হয় একই দিনে।

২০০৫ সালে চট্টগ্রাম আদালতে বোমা হামলার ঘটনায় অক্টোবরের ৩ তারিখে চট্টগ্রাম অ্যান্টি-টেরোরিজম স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল নিষিদ্ধ জেএমবি নেতা জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমা মিজানকে মৃত্যুদণ্ড এবং জাবেদ ইকবাল ওরফে মোহাম্মদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। জেএমবির বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ মিজান ওরফে কাউসার ওরফে বোমা মুন্না গত আগস্টে ভারতে গ্রেফতার হয়। ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর বর্ধমান বিস্ফোরণে জড়িত তিনি। বুদ্ধগয়া বিস্ফোরণেও ‘বোমা মুন্না’ জড়িত ছিল। মিয়ানমারে ২০০২ সালে রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে রোহিঙ্গাদেরই জেএমবির হয়ে প্রশিক্ষণ দিতো মুন্না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জঙ্গিবাদের প্রতি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি শুধু মুখের কথা নয়। হেফাজতে ইসলাম এবং আফগানিস্তানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের নিয়ে গড়া তাদের উপ-দল মানহাজির বিরুদ্ধে নেওয়া কড়া ব্যবস্থা নিয়ে সেটা ফের প্রমাণ করেছে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

শেখ হাসিনার হাত ধরে আওয়ামী লীগ প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে আজ প্রতিষ্ঠিত। তার সরকারের প্রধান কাজই হচ্ছে জঙ্গিবাদকে দেশ থেকে নির্মূল করা। দক্ষিণ এশিয়া থেকে জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে ঢাকা দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক এবং বহুমাত্রিক সমঝোতা ও সমন্বয়ে বিশ্বাসী। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশনে ভাইস-প্রেসিডেন্ট নির্বাচন শুধু অর্থনৈতিক বিকাশের হাত ধরেই হয়নি, সন্ত্রাস নির্মূল এবং দক্ষিণ এশীয় ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে স্থিরতা রক্ষায় বাংলাদেশের দায়বদ্ধতাও কাজ করেছে। আফগানিস্তান নিয়ে বাংলাদেশি মৌলবাদীরা যাই বলুন না কেন, হাসিনা সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমে ৯ সেপ্টেম্বর সাফ জানিয়েছেন, ‘আমরা কিছুতেই সন্ত্রাসীদের মদত দেবো না। আমরা গণতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল।’

বাংলাদেশেরই শুধু নয়, তালেবানদের উত্থান আঞ্চলিক স্থিরতা ও শান্তির জন্যও বিপজ্জনক। মৌলবাদীরা নতুন করে উৎসাহিত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে অবগত রয়েছে বাংলাদেশ সরকারও। তাই সরকারও চাইছে কড়া হাতে মৌলবাদীদের দমন করে উপমহাদেশ থেকে জঙ্গিবাদকে নির্মূল করতে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

দুর্বৃত্তরাই আফগানিস্তানে সরকার চালাবে

দুর্বৃত্তরাই আফগানিস্তানে সরকার চালাবে

বঙ্গবন্ধুর জীবনে 'শক্তিঘর' ছিলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব

বঙ্গবন্ধুর জীবনে 'শক্তিঘর' ছিলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব

চীনের বন্ধুত্ব, নাকি আধিপত্য

চীনের বন্ধুত্ব, নাকি আধিপত্য

বাঁধের বাধায় বন্দি চীনের ‘বন্ধুত্ব’

বাঁধের বাধায় বন্দি চীনের ‘বন্ধুত্ব’

নিখোঁজ প্রজন্ম: দায় কার?

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২১, ১৬:৫২

রেজানুর রহমান কথায় আছে ‘সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের হাজার ফোঁড়ের সমান’। অর্থাৎ সময় থাকতেই ব্যবস্থা না নিলে পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেওয়া খুব কঠিন হয়ে যায়। ধরা যাক, বন্যার পানি বাড়তে শুরু করেছে। বাঁধ না দিলেই কিন্তু গ্রাম ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। তখন যদি আমরা ভাবি, দেখি না কী হয়? তাহলে ভুল হবে। দেখি না কী হয় ভেবে বসে থাকলাম। বন্যার পানির তোড়ে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলো। তখন কি শত চেষ্টা করেও আদৌ বাঁধ রক্ষা করা যাবে? বোধকরি না।

এত কথা বলার একটি উদ্দেশ্য আছে। দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে রিপোর্ট বেরিয়েছে, শুধু ঢাকার মিরপুর এলাকা থেকে গত ৬ মাসে প্রায় ৩ শতাধিক কিশোর-কিশোরী নিখোঁজ হয়েছে। তাদের প্রায় সবাই ‘বন্ধু’র কাছে যাচ্ছি অথবা একটু কাজ আছে এই কথা বলে নিজ পরিবার থেকে বেরিয়ে গেছে। থানা-পুলিশের সহায়তায় কাউকে কাউকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। বাকিরা এখনও নিখোঁজ। পুলিশ সূত্র বলছে, শুধু ঢাকার মিরপুর নয়, গোটা দেশের চিত্র আরও ভয়াবহ।

মোবাইল ফোন নাকি এই সর্বনাশের কারণ। মোবাইল ফোন এখন দেশের মানুষের কাছে অনেকটা খেলনার মতো। যার দরকার নাই সেও মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। ছোট ছোট বাচ্চাদের হাতেও দেখা যায় দামি মোবাইল ফোন। আদরের সন্তান আবদার তুলেছে তার একটা দামি মোবাইল ফোন দরকার। ‘একটা মোবাইল ফোনই তো...’– অনেক বাবা-মা গভীর আগ্রহে সন্তানকে দামি মোবাইল কিনে দিচ্ছেন। কিন্তু এর ফলে সন্তানের যে ক্ষতিটা হচ্ছে তা বোধকরি অনেকেই খেয়াল করছেন না। অথবা খেয়াল করলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। এই সুযোগে কোমলমতি শিশু-কিশোররাও মোবাইল ফোনের প্রতি অত্যধিক মাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। পড়ার টেবিলে মোবাইল ফোন, খাবার টেবিলে মোবাইল ফোন। এক হাতে খায় অন্য হাতে মোবাইল টিপে, ক্লাসেও তার হাতে মোবাইল ফোন। শিক্ষক লেকচার দিচ্ছে, ছাত্রছাত্রী লুকিয়ে লুকিয়ে মোবাইল ফোনে রঙিন দুনিয়া চষে বেড়াচ্ছে। পুলিশ সূত্র বলছে, যারা নিখোঁজ হয়েছে তাদের প্রায় সবাই মোবাইল ফোনে বন্ধুত্ব গড়েছে। বন্ধু বলেছে, চল বেরিয়ে যাই। ব্যস। বন্ধুর কথায় ঘর ছেড়েছে অনেক কিশোরীও। এই সুযোগ নিয়েছে নারী পাচারকারী চক্রও। যারা এখনও নিখোঁজ, ধারণা করা হচ্ছে তাদের অনেকেই নারী পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়েছে।

একটি ঘটনা বলি। আমার এক আত্মীয়ের পরিবারে সদস্য সংখ্যা পাঁচ। স্বামী-স্ত্রী, দুই ছেলেমেয়ে এবং একটি কাজের মেয়ে। পাঁচ জনের মোবাইল সেট রয়েছে ৭টি। স্বামী-স্ত্রী দুটি করে মোবাইল সেট ব্যবহার করেন। আর বাকিদের আছে একটি করে মোবাইল সেট। পরিবারের কনিষ্ঠতম সদস্য ৯ বছরের একটি ছেলে। স্কুলে পড়ে। তাকেও দেওয়া হয়েছে একটি দামি মোবাইল ফোন। কাজের মেয়েটিও ব্যবহার করে দামি মোবাইল ফোন। এমনও হয়, একঘর থেকে অন্য ঘরে মোবাইল ফোনেই প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সেরে নেয়। একদিন রাতে ওই বাসায় গিয়েছিলাম। খাবার টেবিলে বসা সবাই মোবাইল ফোন টিপছে। ছোট ছেলেটিও মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত। তার মা মৃদু ধমক দিল– ‘অ্যাই, এখন মোবাইল রাখো...’।

কে শোনে কার কথা? মায়ের ধমক খেয়ে সে খাবার টেবিল থেকে উঠে গেলো। ছেলেটির মা তখন আপন মনে বলতে থাকলেন- কী যে করি... ওর হাতে মোবাইল তুলে দেওয়াই ভুল হয়েছে...।

 জিজ্ঞেস করলাম– কেন এই ভুলটা করলেন? মায়ের উত্তর- ওর বয়সী সবার হাতেই তো এখন মোবাইল ফোন আছে। তাই ওর আবদার উপেক্ষা করতে পারিনি।

ছেলে কি স্কুলেও মোবাইল ফোন নিয়ে যায়?

হ্যাঁ।

স্কুল কি এটা এলাউ করে?

মা এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না। আমতা আমতা করতে থাকলেন।

বোঝা গেলো স্কুলের নিষেধ আছে, তবু ছেলের ব্যাগে মোবাইল ফোন দিয়ে দেন মা। যুক্তি দেখালেন এভাবে– ওর কাছে মোবাইল থাকলে মাঝে মাঝে খোঁজ নিতে পারি। বোঝেনই তো... চার পাশে কত কিছুই না ঘটছে...।

আরেকজন মায়ের কথা বলি। স্কুল পড়ুয়া একমাত্র ছেলেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন না। আবদার রক্ষা করতে গিয়ে ছেলের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দিয়েছিলেন। একসময় দেখলেন ছেলে মোবাইল ফোন ছাড়া কিছুই বোঝে না। সারা রাত নিজের ঘরে মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকে। সকালে স্কুলে যেতে চায় না। বাবা ছেলের কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নিলেন। তারপর ওই ফোনে যা দেখলেন তা সত্যিকার অর্থে খুবই ভয়াবহ। অশ্লীল দৃশ্যে ভরা ছিল ফোনটি। ছেলের কাছ থেকে ফোন কেড়ে নেওয়া হলো। ফলে বাধলো বিপত্তি। মোবাইল ফোন না দিলে ছেলে নাকি বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেবে...।

এ কথা সত্য, তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর এই যুগে মোবাইল ফোন খুবই জরুরি অনুষঙ্গ। মোবাইল ফোন ছাড়া যেন জীবন চলেই না। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মোবাইল ফোনই গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। হাতে যদি থাকে একটি মোবাইল ফোন তাহলে পৃথিবীর যেকোনও প্রান্ত থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য করা সম্ভব। এটাই সময়ের দাবি। কিন্তু কোমলমতি শিশু-কিশোরদের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেওয়াও কি সময়ের দাবি? পৃথিবীর অনেক দেশে শিশু-কিশোরদের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেওয়ার বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট একটি বয়সের আগে কেউ মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবে না– এমন নির্দেশ আছে অনেক দেশে। আমরা কেন এ ব্যাপারে সোচ্চার হচ্ছি না? স্কুল ব্যাগে কেন মোবাইল ফোন থাকবে? কোন যুক্তিতে?

লেখার শুরুতে যে প্রসঙ্গটি তুলে ছিলাম সে প্রসঙ্গেই আবার ফিরে যেতে চাই। এই যে বন্ধুত্বের আহ্বানে যারা নিখোঁজ হয়েছে তারা মোবাইল ফোনেই বন্ধু খুঁজে নিয়েছে। এক্ষেত্রে দোষ কি মোবাইল ফোনের? বোধকরি উত্তরটা হবে- না! এখানে মোবাইল ফোনের দোষ কোথায়? দোষ যদি করে থাকে সেটা করেছে ফোন ব্যবহারকারী ব্যক্তি। দেশে যখন ভিসিআর প্রযুক্তি এসেছিল তখন একটা ‘ছি, ছি’ রব উঠেছিল। কারণ, ভিসিআরে নীল ছবি দেখা যায়। কিন্তু ভিসিআরে যে ভালো ছবিও দেখা যায় সে কথা জোর দিয়ে বলেননি কেউ। আসলে ব্যবহারের মানসিকতার ওপরই সবকিছু নির্ভর করে। মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটছে।

সবকিছুরই একটা বয়স আছে। স্কুলে ভর্তি হওয়ার বয়স আছে। চাকরি পাবার বয়স আছে। বিয়ে করার বয়স আছে। তেমনই দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বয়সের একটি স্তর নির্ধারণ করা উচিত। তা না হলে আরও ভয়াবহ বিপদ আসন্ন। আসুন এখনই সোচ্চার হই।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক- আনন্দ আলো

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

যখন না দেখেই অনেক কিছু বলি

যখন না দেখেই অনেক কিছু বলি

সাধে কি কেউ নিজের ঘরে আগুন দেয়?

সাধে কি কেউ নিজের ঘরে আগুন দেয়?

বিষয়টি ‘কথার কথা’ নয়

বিষয়টি ‘কথার কথা’ নয়

স্কুল যেন এবার আনন্দের হয়

স্কুল যেন এবার আনন্দের হয়

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড: আর কত পেছাবে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন?

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২১, ১৫:৩৩

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা আর ১৭ বার পেছালেই ‘সেঞ্চুরি’। সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার-মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন আবার পেছালো। এ নিয়ে মোট ৮৩ বার পেছালো এ মামলার প্রতিবেদন দাখিল। নতুন তারিখ আগামী ২৪ নভেম্বর।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারোয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনিকে হত্যা করা হয়। সে সময় তাদের পুত্র মেঘের বয়স ছিল ৫ বছর, এখন ১৪। তার মনোজগতে কী ভাবনা হচ্ছে আমরা জানি না, তবে সে বড় হচ্ছে আর আর দেখছে তার বাবা-মা’র হত্যাকাণ্ড নিয়ে রাষ্ট্রের উদাসীনতা, অদক্ষতা কিংবা অসক্ষমতা।

একটা চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের নয়টি বছর চলে গেলো, অথচ কিছুই করতে পারছে না আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রথমে এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তভার পেয়েছিল শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ। তারপর সেই দায়িত্ব দেওয়া হয় গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি)। দুই মাসের মাথায় ডিবি হাল ছেড়ে দেয়; খোদ আদালতের সামনে ব্যর্থতা স্বীকার করে। তারপর আদালত তদন্তের নির্দেশ দেয় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন – র‌্যাব-কে। র‌্যাব এলিট ফোর্স, একটা চৌকস বাহিনী বলে পরিচিত, অথচ সেই র‌্যাবও তদন্ত কোনোভাবেই শেষ করতে পারছে না। সামগ্রিক বিবেচনায় এখন পর্যন্ত সাংবাদিক-দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনির হত্যাকাণ্ডের রহস্যময়তা বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর বড় ব্যর্থতার নজির হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। এই ব্যর্থতা বিস্ময়কর; কারণ, একটা হত্যাকাণ্ডের তদন্তকাজ দীর্ঘ নয় বছরেও শেষ করা যাচ্ছে না। এটা অস্বাভাবিক এবং একই সঙ্গে অবিশ্বাস্য।

নজির আছে, প্রমাণ আছে, আমাদের পুলিশ, র‌্যাব তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক জটিল অপরাধেরও কিনারা করেছে, করতে পেরেছে। এই হত্যাকাণ্ড কী এমন কোনও হত্যাকাণ্ড যে এখনও নির্দিষ্ট কোনও সূত্র মিললো না? দুষ্কৃতকারীরা কী কোনও সূত্র রেখে যায়নি? আমাদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে এটি একটি ক্লু লেস মার্ডার।  

মামলা করেছিল রুনির ভাই। তারা হাল ছাড়েনি এখনও, কিন্তু তাদের হতাশা ব্যাপক। ঘটনার পরপরই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিরা ধরা পড়বে। সেই থেকে কত ৪৮ ঘণ্টা চলে গেলো! তাই এখন প্রশ্ন জাগছে আদৌ কি এই সাংবাদিক দম্পতি খুনের কিনারা হবে? সাংবাদিকরাও আন্দোলন করে একটা সময় হাল ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু জনগণের ক্ষোভের আঁচ টের পাওয়া যায় কান পাতলেই। বারবার মামলার প্রতিবেদন পিছিয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন মহলে দাবি উঠতে শুরু করেছে এই ধরনের ঘৃণ্যতম নারকীয় অপরাধের ক্ষেত্রে চটজলদি তদন্ত সম্পন্ন  করা ও  কঠোরতম সাজা দেওয়ার জন্য প্রয়োজন নতুন পদ্ধতি প্রণয়ন করার।

এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের বিচারের ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে অনেক বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত অর্থে মামলাটি থেমে রয়েছে। একটা সময় মামলার কিছু আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছিল। সেসব পরীক্ষার প্রতিবেদন তাঁদের হাতে আসার পরও হত্যার রহস্য উদ্ঘাটিত হলো না। এখন মানুষ ভাবতে শুরু করেছেন, দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে জটিল রহস্য যাতে বের না হয় তার জন্য অদৃশ্য কোনও হাতের কারসাজি রয়েছে।  

কয়েক বছর আগে নিহত সাগর সারোয়ারের মা হতাশা ব্যক্ত করে বলেছিলেন, তদন্তকারীদের ওপর তার আর কোনও ভরসা নেই। সন্তান হত্যার বিচারপ্রার্থী একজন বয়স্ক নাগরিকের এমন হতাশাময় উপলব্ধি আমাদের আইন প্রয়োগ ব্যবস্থা, সরকার ও খোদ রাষ্ট্রকেই বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। সাগর ও রুনির একমাত্র সন্তান মেঘও বড় হচ্ছে। রাষ্ট্র যদি তার মা-বাবার হত্যার বিচার করতে না পারে, তবে দেশ সম্পর্কে কি চিন্তা জাগবে ছেলেটার মনোজগতে, সেটা কি ভাবছি আমরা?

ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ায় পুলিশের ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। সেই পুলিশ যদি রাজধানীর বুকে সংঘটিত এমন একটি বড় খুনের তদন্ত শেষ করতে না পারে তাহলে আইনের শাসন কায়েম হয় না। গোটা দেশে লাখ লাখ মামলা আছে, যেগুলোর পুলিশি তদন্ত শেষ হচ্ছে না। আমরা জানি, প্রক্রিয়াগত কারণেই প্রচুর মামলার তদন্ত বকেয়া থেকে যায়। কিন্তু এমন আলোচিত একটা হত্যাকাণ্ডের মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এতবার পেছালে পুলিশের ইচ্ছা ও সক্ষমতা দুটোই প্রশ্নের মুখে পড়ে। এমন একটি মামলার তদন্ত স্থবির হয়ে থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা উন্মোচিত হচ্ছে মানুষের সামনে।

আমরা বলি দেশের প্রতিটি মানুষের বিচার চাওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি বিচার না-ই পাওয়া যায়, তবে বিচার চাওয়ার অধিকার থেকে লাভ কী? এই হত্যারহস্য অমীমাংসিত রাখার কোনও সুযোগ নেই; কালক্ষেপণের মাধ্যমে জাতির স্মৃতি থেকে ওই সাংবাদিক দম্পতির স্মৃতি মুছে ফেলাও যাবে না। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার অবশ্যই করতে হবে অথবা বলে দিতে হবে বিচার হবে না।

লেখক: সাংবাদিক 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

হিংসাকে হারানোর রাজনীতি

হিংসাকে হারানোর রাজনীতি

উদ্বেগ ও অবসাদ

উদ্বেগ ও অবসাদ

মূল্য ছ্যাঁকা

মূল্য ছ্যাঁকা

আত্মহত্যা

আত্মহত্যা

পুলিশি পাহারায় ধর্মচর্চা!

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১৬:৩৩

আনিস আলমগীর কবি নির্মলেন্দু গুণ ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়ে বলেছেন- ‘পুলিশ প্রটেকশনে নো দুর্গাপূজা।’ এখানে ক্ষান্ত হননি বাংলাদেশের জনপ্রিয় কবি। তিনি যুক্তি হিসেবে বলেছেন, ‘আগামী বছর থেকে হিন্দুরা যদি পুলিশ প্রটেকশন ছাড়া দুর্গাপূজার আয়োজন করে, তবেই শুধু আমি দুর্গামণ্ডপে পূজা দেখতে যাবো। অন্যথায় নয়। পাকিস্তান আমলে, আমার ছোটবেলায় পুলিশ প্রটেকশন ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা হতে দেখেছি। দুর্গাপূজার পবিত্রতা রক্ষার দায়দায়িত্ব বাংলাদেশের সব মানুষের ওপর চোখ বন্ধ করে ছেড়ে দিতে হবে। পুলিশ, মন্ত্রী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীরা চাইলে আসতে পারেন, তাঁরা পূজা দেখার জন্য আসবেন, পূজা পাহারা দেওয়ার জন্য নয় বা পূজারীদের মনে সাহস বাড়ানোর নামে সাহস কমিয়ে দিতে নয়।’

আমি গুণদার এই মনোভাব সমর্থন করি। ধর্মীয় উৎসব যদি পুলিশ প্রটেকশনেই করা হয় তাহলে এখানে উৎসব কোথায়! একে আবার গালভরা বুলিতে কেউ কেউ বলছেন সর্বজনীন উৎসব। সব জনের উৎসবে পুলিশি পাহারার দরকার হবে কেন! মুসলিমরা প্রতিমা ভাঙতে যাবে কেন! পূজা উদযাপন নিয়ে হিন্দুদের ভয় পেতে হবে কেন! তার মানে যা বলা হয়, ধর্মীয় সম্প্রীতি উপচে পড়ছে বলে যে ঢোল বাজানো হচ্ছে- সেসব মিথ্যা এবং ভণ্ডামি।

তাহলে আমাদের পক্ষে কি পুলিশি পাহারা ছাড়া, আশ্রয় ছাড়া পূজা উৎযাপন সম্ভব? আমার দৃষ্টিতে সেটা সব জায়গায় সম্ভব না। গুণদা’র পাকিস্তান আমলের অবস্থায় ফিরে যাওয়াটা বোধহয় দুঃসাহসিক কর্মপ্রচেষ্টা হবে। কারণ, আমাদের সমাজ এবং রাষ্ট্রে এখন ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বেড়েছে। ক্রমান্বয়ে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের দূরত্ব বাড়ছে। আগে এক গ্রামের ঘটনা অন্য গ্রামে খবর হতো, এখন এক দেশের ধর্মীয় নির্যাতন আরেক দেশে প্রভাব পড়ছে। ইন্টারনেট দুনিয়া সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে সম্প্রীতি বিনষ্টের ঘটনাকে আরও রঙ লাগিয়ে উত্তেজনায় ঘি ঢালছে।

একজন মানুষ যদি ধর্মীয় স্বাধীনতায় বিশ্বাসী না হয়, অন্য ধর্মের মানুষকে ঘৃণা করা বন্ধ না করে, তাহলে ধর্মীয় উৎসব নির্বিঘ্নে হবে কী করে! বিশেষ করে বাংলাদেশের হিন্দুদের তাদের ধর্মীয় উৎসবে শামিল হওয়া আরও কঠিন হয়ে যাবে। অবশ্য ক্ষেত্রবিশেষে পুলিশি পাহারা ছাড়া বাংলাদেশে মুসলিমরাও আজকাল ধর্মীয় উৎসব করতে পারছে না। মসজিদে, ঈদগাহে বোমা নিয়ে প্রবেশ করছে ইসলামি জঙ্গিরা। দেখা যাচ্ছে কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠানই পুলিশ প্রটেকশন ছাড়া হতে পারছে না। গুণদা’র ছোটকাল বাদ দিলাম, আমাদের ছোটকালেও আমরা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পাহারা দিতে কোনও পুলিশ দূরে থাক, চকিদারকেও দেখিনি।

এরমধ্যে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, খুব দ্রুত একটি নতুন আইন করতে যাচ্ছে সরকার, যাতে কোনও মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সাক্ষীর সুরক্ষা এবং তার গোপনীয়তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকবে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনার বিচারের জন্য সরকার এই আইনগত উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বলে বলেছেন আইনমন্ত্রী। আমার জানা মতে, মন্দির, বিগ্রহ নষ্ট বা হামলা করার বিরুদ্ধে কঠোর আইন এর আগেই সরকার করেছে। প্রস্তাবিত আইন হয়তো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা কমিয়ে আনবে।

নতুন এই আইন করার পক্ষে আইনজীবী ও অধিকারকর্মীদের যুক্তি হচ্ছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে শেষই করা যায় না সাক্ষীর অভাবে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় অধিকাংশ সময় সাক্ষী হন হয়তো ওই পরিবারের প্রতিবেশী আরেকটি সংখ্যালঘু পরিবারের মানুষ। কিন্তু মামলার বিচার প্রক্রিয়ার সময় সাক্ষী দিতে যাওয়াটা তাদের জন্য ভয়ের, এজন্য তারা সাক্ষ্য দিতে আসেন না।

আইনমন্ত্রী বলেছেন, সাক্ষীদের গোপনীয়তা রক্ষার ব্যবস্থা থাকবে এই আইনে। এটা কতটা বাস্তব হবে ভেবে দেখার বিষয় আছে। আইনের অপব্যবহারের সুযোগ থাকবে হয়তো। বর্তমানে মন্দির ভাঙা এবং বিগ্রহ নষ্ট করার যে আইন আছে সেটাও অপব্যবহারের চেষ্টা হয়। তবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, এই ধরনের হামলা রোধ করতে বিশেষ করে মন্দির আর মূর্তি আক্রমণ করার আগে ধর্মীয় উত্তেজনার নামে, তৌহিদি জনতার নামে, দুষ্কৃতকারীদের হামলা থেকে সংখ্যালঘুদের জানমাল রক্ষা করতে হবে।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্টের ভিত্তিতে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র তাদের সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে বলেছে, ২০১৩ সাল থেকে গত ৯ বছরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সাড়ে তিন হাজারের বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে হিন্দুদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং পূজামণ্ডপ, মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ অন্যতম। সংখ্যাটা চোখ বুজে থাকার মতো নয়।

গুণদা’র ‘পুলিশ প্রটেকশনে নো দুর্গাপূজা’ স্ট্যাটাসে আবার ফিরে আসি। সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানোর, অভয়দানের দরকার হচ্ছে এখন। কিন্তু সেটি লাগছে কেন– রাষ্ট্রকে এর মূলে যেতে হবে। অনেকে মনে করেন, হিন্দুদের প্রতি বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তাদের জন্য ক্ষেত্রবিশেষে দুঃখের কারণ হচ্ছে, যেমনটা পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে ‘মুসলমান তোষণ’-এর অভিযোগ করে আসছে সে দেশের একশ্রেণির মানুষ। তাদের মতে, এতে সংখ্যালঘুদের প্রকৃত কল্যাণের চেয়ে তাদের ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংখ্যাগুরুরা নিজেদের ডিপ্রাইভ ভাবছে কিনা, সরকারবিরোধী ক্ষোভ ভেন্টিলেশনের সুযোগ হিসেবে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ হচ্ছে কিনা, এসবও গবেষণার দরকার আছে।

প্রায় ৩২ হাজার মণ্ডপে এবার পূজা হয়েছে, সেটি একটি প্রশংসার দিক। কিন্তু সে তুলনায় সামান্য ক’টি মণ্ডপে হামলার ঘটনা দেশে-বিদেশে সরকারের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কারণ, এক মণ দুধে এক ফোঁটা চনাই যথেষ্ট। পূজামণ্ডপের সংখ্যা ও জৌলুস তাহলে বড় বিষয় নয়, শান্তিপূর্ণভাবে পূজা করতে পারছে কিনা সেটাই বড় বিষয়। মৌলবাদীরা বরং এসব জৌলুসকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হিন্দুদের বাড়বাড়ন্ত হিসেবে দেখছে। বলছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় হিন্দুরা অনেক বেশি দাপট দেখাচ্ছে। এসব কারণে অসাম্প্রদায়িক আওয়ামী লীগ শাসনামলেও সাম্প্রদায়িকতা কমেছে দাবি করা যাচ্ছে না। পাশের দেশের হিন্দু মৌলবাদী সরকারের শাসন, সোশাল মিডিয়াও এই বিষবাষ্প বাড়ানোর ক্ষেত্রে আগুনের মধ্যে ঘি হিসেবে কাজ করছে। সমাজ বিজ্ঞানীদের এসবও হিসাবে ধরতে হবে।

সংখ্যালঘু বিষয়টি এত সংবেদনশীল যে এক লাইন লিখতে গিয়ে চারবার ভাবতে হয়। সরকারকেও সংখ্যালঘু প্রশ্নে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে হলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া চিন্তা করতে হবে। সংখ্যালঘুদের কল্যাণ চাইলে তাদের সুযোগ-সুবিধা নয় শুধু, সবার আগে দেশের মধ্যে আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এই সম্প্রীতি বিনষ্টে সংখ্যালঘুরাও বিপথে যাচ্ছে কিনা সেটাও দেখতে হবে। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ আর হেফাজতে ইসলামের মধ্যে তফাৎ কী দেখতে হবে।

অন্যদিকে রাজধানীতে বসে আমরা যারা প্রগতিশীলতা, অসাম্প্রদায়িকতার যে বুলি দিচ্ছি তার ছিটেফোঁটা কি গ্রামে পৌঁছছে সেটাও দেখতে হবে। আগে গ্রামে সাংস্কৃতিক যে আবহ ছিল, গান-বাজনা, নাটক, চলচ্চিত্র, জারি সারি, যাত্রাপালা ছিল- তার স্থান তো এখন ইউটিউব মোল্লারা দখল করেছে। অন্যদিকে চলছে ভারতীয় সিরিয়ালে বউ-শাশুড়ি প্যাঁচাল এবং সূক্ষ্মভাবে হিন্দুত্ববাদী প্রচারণা। এমন কোনও সিরিয়াল নেই যেখানে ধর্মীয় সুড়সুড়ি নেই। এর মাধ্যমে আমরা একটি ধর্মান্ধ বিশাল অসহিষ্ণু প্রজন্ম তৈরি করছি।

যতদিন এসবের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে আমরা যাবো না ততদিন ধর্মীয় সম্প্রীতি ফিরে আসবে না। সংখ্যালঘুদের নিরাপদে ধর্ম পালন সম্ভব হবে না। যতদিন সব নাগরিককে রাষ্ট্র সমান চোখে দেখবে না, কোথাও সংখ্যালঘুদের অত্যাচার করে, কোথাও আলগা পিরিতি দেখিয়ে নিজেদের ভোটের অঙ্ক ঠিক রাখার চেষ্টা করবে– ততদিন বাংলাদেশে পুলিশ প্রটেকশনে পূজা, ভারতে পুলিশ প্রটেকশনে নামাজ পড়ার দৃশ্য দেখবো আমরা। সবকিছু ভোটের খেলা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া না যাওয়া

৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া না যাওয়া

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন তৃণমূলে সন্ত্রাস-দুর্নীতি বাড়িয়েছে

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন তৃণমূলে সন্ত্রাস-দুর্নীতি বাড়িয়েছে

মিডিয়ার সংকট এবং বিদেশি টিভি চ্যানেল

মিডিয়ার সংকট এবং বিদেশি টিভি চ্যানেল

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা হতাশার

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা হতাশার

‘গেলে জমি থাকলে ভোট, এই চক্র বন্ধ হোক’

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১৫:১৩

রুমিন ফারহানা খুব অস্থির সময় পার করছি আমরা। করোনা-বিভীষিকার রেশ মানুষের শরীর, মন, স্বজন হারানো, চাকরি হারানো সবটা এখনও আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এর মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, রাজনীতির মাঠের অস্থিরতা, নির্বাচন কমিশন গঠন বিতর্ক, একতরফা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, সব মিলিয়ে অস্বস্তিকর অস্থির এক সময়। শারদীয় দুর্গোৎসব তাই তার চিরচেনা আনন্দময় রূপে আসবে, তা হয়তো আশা করেনি কেউ। কিন্তু তাই বলে দাবানলের মতো আগুন, ৭০টির বেশি মণ্ডপ-মন্দির ভাঙচুর, সাত জনের প্রাণহানি, হিন্দু বাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুট; এতটা বিভীষিকাময় দুর্গোৎসবও কারও কল্পনায় ছিল না, কিন্তু তা-ই হলো।

পূজার সপ্তমীর দিন কুমিল্লার এক পূজামণ্ডপে কোরআন অবমাননাকে কেন্দ্র করে যে তাণ্ডব শুরু হয়েছিল, মুহূর্তে তা ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, রংপুরসহ দেশের অনেক জায়গায়। অথচ ঘটনাটি শেষ হওয়ার কথা ছিল কুমিল্লাতেই। কুমিল্লায় এই ঘটনা একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে ঠেকানো গেলে দেশের আর কোথাও এমন ঘটনা হয়তো আর ঘটতো না। ঘটনার সূত্রপাত যে ফেসবুক লাইভ থেকে সেটিতে দেখা যায়, যিনি ভিডিও করছেন তিনি ওসির একেবারে সামনে রীতিমতো ধারাবর্ণনা করে ঘটনাটি দেখাচ্ছেন।  

ফেসবুক লাইভ দূরেই থাকুক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ফেসবুক স্ট্যাটাসের জেরে এই দেশের বহু জায়গায় অতীতে যে তাণ্ডব ঘটে গেছে, সেটার ভিত্তিতে ওসির না বোঝার কোনও কারণ নেই এই ঘটনার প্রভাব কী হতে পারে। অথচ ওসি ছিলেন নির্বিকার। এমনকি পরবর্তীতে ভাঙচুর ঠেকানোর ক্ষেত্রে পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা প্রথম আলো কুমিল্লায় সরেজমিন রিপোর্ট করে বলেছে, সেখানকার প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষায়, প্রথমেই পর্যাপ্ত পুলিশ এনে বিক্ষুব্ধ লোকজনকে সরিয়ে দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসতে পারতো।

প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রাথমিক বয়ানে জানা যায়, ‘এমন অশান্তি গত ৫০ বছরে দেখেননি। সেদিন বিক্ষোভ করতে আসা লোকজনের বেশিরভাগই ছিল বয়সে তরুণ, অচেনা। তাদের মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কী, বোঝা যাচ্ছিল না। একেকজন একেক দাবি করছিল। তাদের শান্ত করতে আশপাশের মসজিদের মাইকে আহ্বান জানানো হয়। এরপরও কীভাবে যেন তা পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে।’

পুলিশ সূত্র বলছে, ‘নানুয়া দিঘির পাড়ে দিনভর উত্তেজনায় একসঙ্গে ৫০০ মানুষের বেশি উপস্থিত ছিল না। শহরের বিভিন্ন স্থানে যেসব মন্দির ও পূজামণ্ডপে হামলা হয়েছে, তাতে বেশি মানুষের অংশগ্রহণ ছিল না। তাদের ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পর্যাপ্ত কঠোর অবস্থান নেয়নি।’ (দৈনিক প্রথম আলো, ২০ অক্টোবর, ২০২১)

একই পত্রিকার আরেকটি প্রতিবেদনে ২০ অক্টোবর বলা হয়, ‘খোঁজ নিয়ে স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ পৌর এলাকার বাসিন্দা হৃদয় হাসান ওরফে জাহিদ (২০) ওই স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। তিনি হাজীগঞ্জ পৌর ছাত্রলীগের কর্মী। তার মা শাহিদা বেগম ২০১৪-২০১৯ মেয়াদে হাজীগঞ্জ পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর ছিলেন। আওয়ামী লীগের সমর্থনে তিনি নির্বাচনে জিতেছেন।’

প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা অভিযোগ করেছেন, মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া কিশোর ও তরুণেরা পৌর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসানের অনুসারী। হাজীগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহবুব-উল-আলমও ওই দৈনিকটিকে বলেন, হামলাকারীদের মধ্যে মেহেদী হাসানের অনুসারীও ছিলেন বলে তিনি শুনেছেন। তবে তিনি নিশ্চিত নন। এই ব্যাপারে জনাব মেহেদির বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি আবার অভিযুক্ত করেন আরেক ছাত্রলীগ নেতাকে। তিনি বলেন, ‘হাজীগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি খোকন বলির অনুসারী ও পরিবারের সদস্যরা হামলায় অংশ নিয়েছেন, সেই প্রমাণ আমাদের কাছে আছে।’

একই রকম পরিস্থিতি হয়েছে দেশের অন্যান্য এলাকায়ও। রংপুরের ঘটনার সঙ্গে ছাত্রলীগ কর্মী জড়িত, সরকার নিজেই তা স্বীকার করেছে এবং সেই কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ঘটনাগুলোর পর বাংলাদেশে আর সবসময় যা ঘটে ঠিক তাই ঘটেছে। মামলাগুলোতে হাজার হাজার অজ্ঞাত আসামিকে রাখা হয়েছে। কারণ, এসব মামলায় এরপর যে কারও নাম অন্তর্ভুক্ত করা যায়। অন্তর্ভুক্ত করার ভয় দেখিয়ে কিংবা অন্তর্ভুক্ত নাম বাদ দেওয়ার জন্য টাকা কামানো যায়। পুলিশের ‘গ্রেফতার-বাণিজ্য’ গত কয়েক বছরের খুব পরিচিত ব্যাপার।

এই মামলাগুলোর আরেকটা উদ্দেশ্য হচ্ছে বিরোধী দলকে দমন-পীড়ন করা। প্রতিবারের নাশকতার মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় অসংখ্য বিএনপি কর্মীকে। মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের শুরু করে এসব ক্ষেত্রে ‘হুকুমের আসামি’ হওয়া থেকে বাঁচেন না দলের সর্বোচ্চ পর্যায়, স্থায়ী কমিটির সদস্য, এমনকি দলের মহাসচিবও। এবারও তার ব্যত্যয় হয়নি। বিএনপি’র নেতাকর্মীদের আসামির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে গিয়ে খোঁজ রাখা হয়নি বহু কিছু। বিদেশে অবস্থানরত বিএনপির কর্মী যেমন তালিকায় আছেন তেমনি তালিকায় আছেন ৬ মাস ধরে জেলে থাকা বিএনপি কর্মীও।

চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপে হামলার মামলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন এমন তিন জন বিএনপি কর্মী, যারা গত ছয় মাস থেকে জেলে আছেন। সেগুলোও ছিল নাশকতার মামলা, যখন নরেন্দ্র মোদি দেশে আসার কারণে বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতা হয়েছিল। এসব কাজের অসারতা সরকারি আইনজীবী ঠিকই বুঝেছেন। কারাগারে থাকা বন্দিদের ভাঙচুরের মামলায় আসামি করা পুলিশের খামখেয়ালিপনা বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর সরকারি কৌঁসুলি (পিপি)।

এসব মানতে নারাজ মূল হোতা, পুলিশ। মামলার তদন্তকারী এসআই এই ব্যাপারে কথা বলতে না চাইলেও কথা বলেছেন পুলিশ সুপার, যিনি জানান– জেল থেকেও হুকুম দিতে পারে। তবে জেল থেকে কোনও আসামির হুকুম দেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়ে চট্টগ্রাম কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক বলেন, বন্দিরা কড়া নিরাপত্তার মধ্যে থাকেন। বর্তমানে স্বজনদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ বন্ধ রয়েছে।

দেশের দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে, ডলারের বিপরীতে টাকা মূল্য হারাচ্ছে প্রতিদিন, সঙ্গে সরকার সমর্থিত সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, চাঁদাবাজি তো আছেই। ফলে সামনের দিনগুলোতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়ে উঠবে। ওদিকে সামনের নির্বাচন কমিশন গঠনের আলোচনা হচ্ছে সমাজে। একটি সুস্পষ্ট আইন ছাড়া, নির্বাচন কমিশন গঠনে যতই ‘সার্চ কমিটি’ তৈরি করা হোক, সেটা সংবিধানের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক– এটা জেনে গেছে এখন রাজনীতি সচেতন মানুষ। প্রতিটি সংসদ অধিবেশনে বহু আইন পাস হলেও এই আইনটি সরকার কেন পাস করেনি সেই সমালোচনা হচ্ছে। একই সঙ্গে চাপ আছে সামনের চার মাসে এ আইনটি করে ফেলার।

এই আলোচনাগুলো হাওয়ায় উবে গেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর এই হামলাগুলো সরকারকে অসাধারণভাবে সাহায্য করেছে মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে।

স্বল্পমেয়াদে এটা অসাধারণ লাভ ক্ষমতাসীনদের জন্য। মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদেও এই পরিস্থিতি সরকারকে বিরাট সুবিধা দিতে পারে।

নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করার সূত্র আরেকটি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা সামনে আসছে। নানা চাপে সেই নির্বাচন যদি সরকার ২০১৮-এর স্টাইলে করতে ব্যর্থ হয়, সেই আশঙ্কাকে মাথায় রেখে প্রধান বিরোধীদলকে যতটা সম্ভব দুর্বল করে ফেলার চেষ্টা করতে হবে সরকারকে। এই ঘটনাগুলোর মাধ্যমে সরকারের সুবিধামতো, সুবিধাজনক সময়ে বিএনপি’র যেকোনও পর্যায়ের নেতৃত্বকে ফাঁসিয়ে দেওয়া যাবে। এটাই মধ্যমেয়াদে এসব ঘটনার লাভ।

 
বাংলাদেশের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী আছে, জঙ্গিবাদ আছে, এসব আন্তর্জাতিক প্রচারণা দীর্ঘদিন থেকে সরকার করছে। এই প্রচারণার উদ্দেশ্য হচ্ছে, এগুলোকে দেখিয়ে যেকোনও মূল্যে ক্ষমতায় থাকার ন্যারেটিভ আন্তর্জাতিকভাবে তৈরি করা। দেশের মানুষের কাছেও এই বয়ানের ‘বাজারমূল্য’ আছে। এটাই হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতাসীন দলের কাছে এসব ঘটনার উপযোগ।

এই সরকারের আমলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপরে যত হামলা হয়েছে তার একটিরও বিচার তারা করেনি। বিচার অবশ্য না করারই কথা, সরকার যে আসলে এই ঘটনাগুলো ঘটাতে চায়, তার প্রমাণ হলো এসব ঘটনা যারা ঘটায় তাদের ক্ষমতাসীন দল বরং পুরস্কৃত করে।

নাসিরনগরের ঘটনার চার্জশিটভুক্ত তিন আওয়ামী লীগ নেতাকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন দিতে আমরা দেখেছি। মিডিয়ায় তীব্র সমালোচনার মুখে দুই আসামির মনোনয়ন বাতিল করা হয়।

এখন শুধু বিরোধী দলই না, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংগঠন নির্বিশেষে বলছেন, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই, প্রশাসনের সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণেই এবার এই বীভৎস কাণ্ডগুলো ঘটেছে। তারাই এসব ঘটনা বারবার ঘটার পেছনে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে দায়ী করছেন। তারাই এখন স্পষ্টভাবে বলছেন, এই সরকারের আশ্বাসে তারা এখন আর কোনও আস্থা রাখেন না।

সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। মোট জনসংখ্যায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ক্রমশ কমে আসা অনুপাত চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, এ দেশে তারা ভালো নেই । ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য সবচেয়ে ভালো সরকার হিসেবে দাবি করা আওয়ামী লীগের শাসনামলের গত ৯ বছরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে ৩ হাজার ৬৭৯টি। এই হিসাব বিএনপি করেনি, করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র।

হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রতিক হামলার পর এই সম্প্রদায়ের বহু মানুষ খুব স্পষ্টভাবেই বলেছেন, এই দেশে তারা আর থাকতে পারবেন কিনা সেই চরম অনিশ্চয়তায় তারা পড়েছেন। তারা যাই করুক না কেন, ক্ষমতাসীন দলটির জন্য সেটাই সুবিধাজনক। তারা দেশ ছেড়ে চলে গেলে তাদের জমি দখল করে নেওয়া যাবে প্রভাব খাটিয়ে। আবার তারা যদি দেশে থাকেন, তাহলে এদের সব ভোট পড়বে তাদের বাক্সে, আদৌ যদি কোনও দিন সত্যিকারের ভোট হয় এই দেশে।

শুধু বিরোধীদলীয় কর্মী বলেই নয়, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার চাওয়া একটাই- গেলে জমি, থাকলে ভোট; এই চক্র বন্ধ হোক।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি দলীয় হুইপ

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

বাণিজ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চাই না যে কারণে

বাণিজ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চাই না যে কারণে

স্বাস্থ্যমন্ত্রী কি একাই ব্যর্থ?

স্বাস্থ্যমন্ত্রী কি একাই ব্যর্থ?

‘আমি রাজনীতি করা মেয়ে, আমি কিন্তু ভদ্র না’

‘আমি রাজনীতি করা মেয়ে, আমি কিন্তু ভদ্র না’

আশ্রয়ণ প্রকল্প: দুর্নীতি কি আর্থিক নাকি ‘তেলবাজি’র?

আশ্রয়ণ প্রকল্প: দুর্নীতি কি আর্থিক নাকি ‘তেলবাজি’র?

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

৩১৯০ কেজি সরকারি চালসহ ট্রাকচালক গ্রেফতার

৩১৯০ কেজি সরকারি চালসহ ট্রাকচালক গ্রেফতার

দেশের চার বিভাগে মৃত্যু নেই  

দেশের চার বিভাগে মৃত্যু নেই  

সুদানের সদস্যপদ স্থগিত করলো আফ্রিকান ইউনিয়ন

সুদানের সদস্যপদ স্থগিত করলো আফ্রিকান ইউনিয়ন

জামালপুরে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে সমাবেশ

জামালপুরে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে সমাবেশ

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনের প্রয়োজন আছে: ইনু

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনের প্রয়োজন আছে: ইনু

বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যেও সুসম্পর্ক চায় রাশিয়া

বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যেও সুসম্পর্ক চায় রাশিয়া

হতাশা বাড়ছে মাহমুদউল্লাহদের

হতাশা বাড়ছে মাহমুদউল্লাহদের

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা: সাংবাদিক ইমন কারাগারে

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা: সাংবাদিক ইমন কারাগারে

ভিডিও গেমের লিওনা চরিত্রে মেহজাবীন!

ভিডিও গেমের লিওনা চরিত্রে মেহজাবীন!

‘২০২২ সালের পর রাজধানীতে উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য থাকবে না’

‘২০২২ সালের পর রাজধানীতে উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য থাকবে না’

বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ডের নিবন্ধন শুরু

বেসিস আউটসোর্সিং অ্যাওয়ার্ডের নিবন্ধন শুরু

কুড়িয়ে পাওয়া ২ লাখ টাকা ফিরিয়ে দিলেন ভ্যানচালক

কুড়িয়ে পাওয়া ২ লাখ টাকা ফিরিয়ে দিলেন ভ্যানচালক

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune