X
বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

দায় এড়াতে পারবে না নতুন তালেবান

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৫:৩৮

আনিস আলমগীর

নাইন ইলেভেনের দিন শপথগ্রহণের ঘোষণা করেও তালেবান গঠিত আফগানিস্তানের নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পিছিয়ে এসেছে। কারণ হিসেবে তারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, অভিষেক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শেষ করা যায়নি। এছাড়া চীন-রাশিয়াসহ আমন্ত্রিত দেশগুলোর পক্ষ থেকেও আসেনি যোগদানের ইতিবাচক সাড়া। ক্ষমতা দখলের এক মাস পরেও তারা সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করতে না পারাটা ব্যর্থতা। তারচেয়েও বড় ব্যর্থতা নতুন সরকারের চেহারায় নতুনত্ব না দিয়ে পুরনো চেহারা দেওয়া।

কয়েক সপ্তাহ ধরে তালেবান একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ সরকার উপহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যেটি শরিয়তের সীমাবদ্ধতার মধ্যে হলেও নারীর অধিকারকে সম্মান করবে, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করবে এবং আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেবে না। ১৫ আগস্ট ২০২১ ক্ষমতা দখলের পর, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতৃত্ব ঘোষণা করে তালেবান। সেখানে দেখা যাচ্ছে, সরকারে স্থান পেয়েছে সব পুরুষ এবং ১৯৯৬ থেকে ২০০১-এর নৃশংস তালেবান শাসনের প্রবীণরা প্রাধান্য পেয়েছে। এরা প্রায় সবাই দেশের প্রভাবশালী জাতিগত গোষ্ঠী পশতুন, একজন এফবিআইর মোস্টওয়ান্টেড তালিকায় রয়েছেন, চার জন এক দশকেরও বেশি সময় গুয়ান্তানামো বে কারাগারে কাটিয়েছেন এবং অধিকাংশই জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন।

এদের মধ্যে সীমান্ত ও উপজাতীয় বিষয়ক নতুন মন্ত্রী মোল্লা ফজল ও মোল্লা নরুল্লাহ নুরিকে মনে করা হয়, তালেবানরা যখন ক্ষমতায় ছিল তখন তারা হাজার হাজার সংখ্যালঘু শিয়াকে হত্যা করেছিল। নতুন গোয়েন্দা প্রধান আব্দুল হক ওয়াসিকের বিরুদ্ধে আল কায়েদার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী মোল্লা খায়রুল্লাহ খাইরখোয়াকে ফাঁস হওয়া মার্কিন সামরিক নথিতে আফগানিস্তানের আফিমের অন্যতম মাদক সর্দার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। খোস্টের নতুন গভর্নর মোহাম্মদ নবী ওমারি হাক্কানি নেটওয়ার্কের সন্দেহভাজন নেতা।

তারা কাবুলে স্বাধীনতার দাবিতে নারীদের বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করেছে এই অপরাধে দুই সাংবাদিককে বর্বর কায়দায় পিটিয়েছে। এসবের মাধ্যমে তালেবান গোষ্ঠী বার্তা দিলো যে আমরা বদলাইনি।

১৫ আগস্ট তালেবানের কাবুল দখলের পর মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনীর সঙ্গে ২০ বছরের যুদ্ধের বিজয়ী সমাপ্তি ঘটেছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, মোল্লারা আন্তর্জাতিক উদ্বেগকে কোনও ছাড় দিয়ে তাদের কাঙ্ক্ষিত সপ্তম শতাব্দীর ইসলামি আমিরাতি শাসনের দৃষ্টিভঙ্গিকে দুর্বল করতে চাচ্ছে না। মনে হয় তারা ভাবছে যে দু'দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘাত থেকে তালেবান এগিয়ে যাবে বলে পশ্চিমা বিশ্ব যেভাবে আশান্বিত হয়েছে, সেটাই তাদের বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা আনার জন্য যথেষ্ট।

মনে হচ্ছে তালেবানের পাশাপাশি পশ্চিমাদের জন্যও এটি একটি পরীক্ষা। যদি আফগানিস্তানের জনগণ আরও একবার নিপীড়নের শিকার হয়, তাহলে বৈদেশিক সাহায্য ও স্বীকৃতির জন্য ক্ষুধার্ত তালেবানকে অবশ্যই পরাভূত হতে হবে। নয়তো মানবাধিকারের সর্বজনীন নিয়মগুলোর কোনও মানে হবে না। এমনকি দেশে কোনও সৈন্য বা দূতাবাস না থাকলেও কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক সব ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সুযোগ উন্মুক্ত থাকবে।

তালেবান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর দেশটিতে অর্থপ্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। আফগানিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের প্রায় এক হাজার কোটি ডলার আটকে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে জরুরি সহায়তা তহবিলের ৪৪ কোটি ডলারও আটকে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। আফগানিস্তান সম্পর্কিত জাতিসংঘের বিশেষ দূত ডেবোরাহ লিওনস গত ১৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আফগানিস্তানে অর্থপ্রবাহ চালুর একটি উপায় বের করার অনুরোধ জানিয়েছেন। এমন প্রেক্ষাপটে দেশটি মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।

শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তালেবানের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারকারী দেশগুলোর মধ্যে কাতার অন্যতম। তালেবান ক্ষমতা দখলের পরে প্রথম বিদেশি অতিথি হিসেবে ১২ সেপ্টেম্বর কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আব্দুলরহমান আল থানি আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল সফর করে নবগঠিত তালেবান সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী মোল্লা মোহাম্মদ হাসান আখুন্দ, সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই ও দেশটির জাতীয় পুনর্মিলন পরিষদের প্রধান আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

দীর্ঘ সময়ব্যাপী কাতারের রাজধানী দোহায় আমেরিকা ও তালেবানের মধ্যে শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ছিলেন বিশেষ মার্কিন দূত জালমে খলিলজাদ আর তালেবানদের পক্ষে ছিলেন তালেবান উপনেতা মোল্লা আবদুল গনি বারাদার। বারবার ভেঙে যাওয়া আলোচনা জোড়া লাগিয়েছে কাতার। শেষ পর্যন্ত ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ উভয় পক্ষ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। বর্তমান সমস্যা থেকে নতুন তালেবানদের উদ্ধারে কাতার কতটা সফল হয় এখনও দেখার আছে।

আফগানদের পূর্ব পুরুষের নাম ‘আফাগেনা’, যিনি বনি-ইসরাঈলের বাদশা তালুতের পৌত্র ছিলেন। আফগানরা ইহুদি বংশোদ্ভূত জাত। এ জন্য পশতু ভাষায় বহু হিব্রু শব্দের সংমিশ্রণ ঘটেছে। আফগানরা যে ইসরায়েলের পুত্রগণের শাখা-প্রশাখা, এ কথা তার এক লেখায় বলেছেন আল্লামা ইকবাল।

ইহুদি বংশধারার লোকেরা রক্ষণশীল। অত্যন্ত আধুনিক ধ্যান-ধারণার মানুষ হয়েও ইহুদিরা ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। তালেবানরাও দেখা গেছে যে ধর্মীয় অনুশাসনে অনুরক্ত। কিন্তু তাদের আধুনিক ধ্যান-ধারণা সীমিত। তালেবানদের এই বোধোদয় হলে ভালো হতো যে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তারা সারা জীবন যুদ্ধ করেও পারবে না। কাতারের শান্তিচুক্তি তাদের জন্য সর্ব অবস্থায় মানা ‘ওয়াজিব’। কী কূটনৈতিক, কী ধর্মীয়- উভয় দিক থেকে পালনীয় কর্তব্যকে অবহেলা করলে তালেবান গোষ্ঠী আবারও পিছিয়ে যাবে। তারা সবকিছু যুদ্ধের আয়না দিয়ে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এ কারণে তারা সব সময় দৌড়ের ওপর থাকছে।

তালেবানদের অস্থায়ী রাজধানী ছিল হেলমান্দ প্রদেশের মুসাকালা। সে এলাকা আফিম ব্যবসার জন্য বিখ্যাত। দুনিয়ার ৯০ শতাংশ আফিম উৎপাদন হয় আফগানিস্তানে। তালেবানদের প্রধান আয়ের উৎস হচ্ছে আফিম। আফিম ব্যবসার টাকা দিয়ে তালেবানরা চলে, অথচ এই ব্যবসার রোজগারের বৈধতা নিয়ে ইসলামি পণ্ডিতদের মাঝে বিতর্ক রয়েছে। বিতর্কজনক রোজগার থেকে বিরত থাকা খোদাভীতির লক্ষণ। ক্ষুধার্ত মানুষের মৃত প্রাণীর মাংস খাওয়া জায়েজ, এমন সিদ্ধান্তে যদি তালেবানরা আফিম ব্যবসার টাকা ব্যবহার করে থাকে, তবে অনুরূপ সিদ্ধান্তে আধুনিক জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ করাও জায়েজ। কারণ, মুসলিম সমাজ আধুনিক জীবন ব্যবস্থা থেকে পিছিয়ে গেলে হারিয়ে যাবে। অথচ তালেবানরা আধুনিকতাকে গ্রহণ করতে খুবই শঙ্কিত। আধুনিকতাকে গ্রহণ করলে তারা আফিমের অবৈধ চাষ থেকে বৈধ চাষের দিকেও হাঁটতে পারে।

ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক শের শাহ সুরি ছিলেন আফগানেরই সন্তান। যে জাতির আত্মগ্লানির পরিবর্তে আত্মবিস্মৃতির প্রাদুর্ভাব হয়, সে জাতি আর টিকে থাকে না। এখন আফগানদের টিকে থাকার জন্য নিজেদের মাঝে বিরোধের অবসান ঘটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে নতুন তালেবান সরকারের ভূমিকা রয়েছে সবচেয়ে বেশি। নয়তো যুদ্ধে যুদ্ধে দিন যাবে তাদের।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত
 [email protected]

/এমওএফ/

সম্পর্কিত

রাজনৈতিক দলের বিদেশি ‘দোকান’ বন্ধ হোক

রাজনৈতিক দলের বিদেশি ‘দোকান’ বন্ধ হোক

ই-কমার্স প্রতারণা থামানোর উপায়

ই-কমার্স প্রতারণা থামানোর উপায়

জিয়ার কবর নিয়ে রাজনীতি

জিয়ার কবর নিয়ে রাজনীতি

তালেবানের আফগান দখলে পাকিস্তানের লাভ-ক্ষতি

তালেবানের আফগান দখলে পাকিস্তানের লাভ-ক্ষতি

দরিদ্র মৃত্যুপথযাত্রী ছাত্র যদি ‘মেধাবী’ না হয়?

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৭:৫৯
ডা. জাহেদ উর রহমান মাসখানেক আগে, ১৩ আগস্ট ছিল গুণী নির্মাতা তারেক মাসুদের মৃত্যুবার্ষিকী। তার সঙ্গে মারা যাওয়া আরেকজন মানুষের নামও আমাদের মনে আছে– মিশুক মুনীর। এ বছর সেই ঘটনার এক দশক পূর্ণ হয়েছে বলে মিডিয়ায় সেটি উল্লেখ করে সবাই গুরুত্ব দিয়ে সংবাদটি প্রকাশ করেছে। সেই বছরই এই দুর্ঘটনার ঠিক এক মাস আগে ঘটা আরেকটি ভয়ংকর দুর্ঘটনার কথা কি মনে আছে আমাদের? সেই দুর্ঘটনাটির এক দশক পূর্তি হয়েছে। প্রিয় পাঠক, মনে করার চেষ্টা করুন। একটু পরে আসছি সেই দুর্ঘটনার কথায়।

খুব স্পষ্টভাবে আমি তারেক মাসুদের দুর্ঘটনা এবং তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের কথা মনে করতে পারি। মনে আছে, সে সময়ে কী অবিশ্বাস্য তোলপাড় ঘটে গিয়েছিল সারাদেশে। ভীষণ গুণী এই দুই জন মানুষের মৃত্যু আমাদের কাঁপিয়ে দিয়ে যায় ভীষণভাবে। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সবাই শোকে মুহ্যমান হন। অবহেলাজনিত সড়ক দুর্ঘটনাকে ‘হত্যা’ দাবি করে মানুষ ফুঁসে ওঠে, প্রতিবাদ করে ওই ‘হত্যাকাণ্ডের’। এ ঘটনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার ছিল – আমাদের বুদ্ধিজীবী, শিল্পসাহিত্য আর সংস্কৃতির মানুষদের ‘অসাধারণ প্রতিবাদী’ হয়ে ওঠা। মিডিয়ায় অনেক খবর, অনেক আলোচনা, অনেক প্রতিবাদ, অনেক ধিক্কার। সারাদেশে মানববন্ধন হলো, এমনকি ঈদের দিন শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি হলো। টিভি ক্যামেরার সামনে সবার শোকের মধ্যেও ছাপিয়ে উঠলো যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি।

ওই দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাদের সামষ্টিক উন্মাদনা এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছেছিল যে সেটা একজন মানুষের জীবনের ওপর এক বড় সংকট তৈরি করেছিল। এই দুর্ঘটনায় জড়িত বাসটির চালক জামিরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। গত বছর কাশিমপুর কারাগারে থাকা অবস্থায় তার হার্ট অ্যাটাক হয় এবং তিনি মারা যান।

জমিরের মৃত্যুর পেছনে আমাদের এক সংকটও উন্মোচিত হয়েছে। সেই দুর্ঘটনার ব্যাপারে দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক (সাবেক পরিচালক, দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউট, বুয়েট) দীর্ঘ নিবন্ধ লিখেছেন একটি বিদেশি সংবাদ সংস্থার বাংলা ভার্সনে। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন এই দুর্ঘটনার জন্য জমিরের বাসটি দায়ী ছিল না। তিনি আদালতে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সাক্ষ্যের সঙ্গে টেকনিক্যাল মতামতের প্রতিও গুরুত্ব আরোপ করেন। এই দুর্ঘটনার দায়ভার নিয়ে তিনি তার বিশ্লেষণ শেয়ার করেছেন তারেক মাসুদের মামলার আইনজীবী, অ্যাটর্নি জেনারেল এবং আইনমন্ত্রীর সঙ্গে। কিন্তু এরপরও প্রক্রিয়াগত কারণে পারেননি সেই বাসচালকের শাস্তি ঠেকাতে।

সড়ক দুর্ঘটনা কি এই দেশে খুব কম হয়? দেশে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো যে সংখ্যা আমাদের জানায়, সেটা পত্রিকায় প্রকাশিত সংখ্যা। বাস্তব সংখ্যা আরও অনেক বেশি। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশ সরকার পরিচালিত হেলথ ইঞ্জুরি সার্ভে-২০১৬-তে জানা যায়, এই দেশে প্রতিদিন গড়ে ৬৪ জন মানুষ প্রাণ হারায়। অর্থাৎ বছরে এই সংখ্যা ২৩ হাজারের বেশি। ‘মজার’ ব্যাপার হলো, এই সংখ্যাগুলো আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় না, জাগিয়ে তোলে না। আমাদের কাছে ‘নিছকই কতগুলো সংখ্যা, পরিসংখ্যান’।

তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনীরের প্রাণ কেড়ে নেওয়া দুর্ঘটনাটির মাসখানেক আগের যে দুর্ঘটনাটির কথা বলছিলাম মনে পড়েছে সেটার কথা? ২০১১ সালের ১১ জুলাই মিরসরাইয়ে ঘটেছিল সেই দুর্ঘটনাটি। মারা গিয়েছিল নিতান্ত ‘সাধারণ’ কিশোররা। দুর্ঘটনায় ‘সাধারণ’ মানুষের মৃত্যু অত্যন্ত তুচ্ছ খবর আমাদের দেশে। কিন্তু তখন এ খবরটি বেশ বড় হয়েছিল। শুধু একটি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৪ জন কিশোর মারা গিয়েছিল। স্কুলের ফুটবল দলের খেলা দেখে পিকআপে করে ফিরছিল তারা। পিকআপটি গিয়ে একটি পুকুরে পড়ে।

দুর্ঘটনাটির পরে কখনও কখনও সেই দিনটিকে স্মরণ করে আমাদের দেশের কোনও কোনও মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই বছর তারেক মাসুদের দুর্ঘটনাটির মতো সেই দুর্ঘটনার এক দশক পূর্তি হলো। খুঁজে দেখলাম হাতে গোনা একটি বা দুটি মিডিয়ায় খবরটি হয়েছে।

তবে আমি মিডিয়াকে দোষ দিচ্ছি না। মিডিয়ার সংবাদও প্রায় সব ক্ষেত্রেই মেনে চলে অর্থনীতির 'চাহিদা-জোগান তত্ত্ব'। আসলেই আমরা ‘শিক্ষিত’ মধ্যবিত্তরা মিরসরাইয়ের খবরটি ভুলে যেতে চেয়েছি। নিতান্ত গ্রামের নিম্ন-মধ্যবিত্ত থেকে দরিদ্র কিশোররা ছিল এই দুর্ঘটনার শিকার। ঘটনার সময় সংখ্যার ওজনটা আমাদের কিছুটা প্রভাবিত করলেও সময়ের সঙ্গে ফিকে হয়ে গেছে সব।

অথচ দুর্ঘটনার কথা যদি আমরা ভাবি তাহলে দেখবো একজন বিখ্যাত বা সামর্থ্যবান মানুষের দুর্ঘটনায় মৃত্যুর চেয়ে একটা অতি সাধারণ মানুষের মৃত্যু অনেক বেশি ভয়ংকর। তারেক মাসুদের মৃত্যুর পর তার পরিবার পথে বসে যায়নি কিংবা সেটা ঘটেনি মিশুক মুনীরের পরিবারের ক্ষেত্রেও। কিন্তু সেই দুর্ঘটনায় তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসের চালকও মারা গিয়েছিল; তার পরিবারের কথা কি আমরা ভাবি?

বাসচালক জমিরের পরিবারের কী অবস্থা, সেই খোঁজ কি আমরা নিয়েছি? কীভাবে চলছে পরিবারগুলোর জীবিকা? বহু দুর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি মারা যায় কিংবা বিকলাঙ্গ হয় এবং পরিবারটির জীবন তছনছ হয়ে যায়। কিন্তু এভাবে আমরা কখনও ভাবি না। তাই এসব মৃত্যু আমাদের ক্ষুব্ধ করে না। তাই আমরা সোচ্চারও হই না সড়ক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে।

এই মানসিকতা রয়েছে আমাদের চিন্তার অনেক ক্ষেত্রেই। মাঝে মাঝেই পত্রিকায় চিকিৎসার জন্য সাহায্য চেয়ে বিজ্ঞাপন দেখা যেত আগে; কমে গেলেও এখনও দেখা যায়। এখন তো আবার সামাজিকমাধ্যম আছে এর জন্য। জটিল, দুরারোগ্য কোনও রোগে আক্রান্ত মানুষটি যদি কোনও ছাত্র হয় তাহলে খুব টিপিক্যালি লেখা হতো এভাবে- একজন দরিদ্র, মেধাবী ছাত্রকে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন। বাংলাদেশে নিশ্চয়ই জটিল-কঠিন রোগে আক্রান্ত সব ছাত্র মেধাবী নয়; অনেকেই আছে মাঝারি, খুব কম মেধার মানুষ।

এই চর্চাও নিশ্চয়ই অর্থহীন নয়। মানুষের আবেগের সঙ্গে কানেক্টেড হওয়ার জন্য কোনও সাধারণ 'কম মেধার/বোকা ছাত্রের’ মৃত্যুপথযাত্রী হাওয়া হয়তো ঠিকঠাক কাজ করে না। আমরা হয়তো দায়বদ্ধতা বোধ করি ‘মেধাবী’দের বাঁচানোর জন্য। তাই সবাইকে গায়ের জোরে ‘মেধাবী’ বানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলতেই থাকে।

কথাগুলো এভাবে বলা হয়তো অর্থহীনই। বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বেশি মূল্য কিংবা কম মূল্যের ধারণা তো থাকারই কথা। কিন্তু একই রকম অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পশ্চিমা দেশগুলোর পরিস্থিতি তো এতটা ভয়ংকর নয়। সাধারণ মানুষের জীবন সেখানে এতটা মূল্যহীন নয়। সেখানে এতটা মর্যাদাহীন নয় সাধারণ মানুষ।

বাজারে সব পণ্য যেমন একই মূল্যে বিকায় না, তেমনি প্রতি মানুষের ‘মূল্যও’ সমান নয়। কিন্তু তবু কথা থেকে যায়, মূল্য একটা পারসেপশন। পুরোপুরি না হোক সেই পারসেপশন কিছুটা হলেও পাল্টালে এই সমাজটা হয়তো আরেকটু ভালো হতে পারতো। কিন্তু না, আমরা হাঁটছি না সেই পথে, যাচ্ছি উল্টো দিকে।
 
লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

পরীমণি’র মুক্তির আন্দোলন কি কেবলই ‘স্টান্টবাজি’?

পরীমণি’র মুক্তির আন্দোলন কি কেবলই ‘স্টান্টবাজি’?

‘টিকটক অপু’র ‘জাতে ওঠা’ নিয়ে গাত্রদাহ

‘টিকটক অপু’র ‘জাতে ওঠা’ নিয়ে গাত্রদাহ

সাংবাদিক নির্যাতনে ডিসিকে শাস্তির ‘আইওয়াশ’

সাংবাদিক নির্যাতনে ডিসিকে শাস্তির ‘আইওয়াশ’

পরীমণির মামলা আর বিচারাঙ্গনে ‘পপুলিজম’

পরীমণির মামলা আর বিচারাঙ্গনে ‘পপুলিজম’

কন্যা সন্তানের জন্ম উদযাপিত হোক

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:২৮

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা করোনা সংক্রমণে বদলেছে জীবন। ভয়ংকর ভাইরাস প্রভাব রেখে গেছে বা যাচ্ছে আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে। এই আবহে দারিদ্র্য বেড়েছে, বেড়েছে বাল্যবিবাহও। দীর্ঘ ১৮ মাসের করোনা অতিমারিকালে স্কুল বন্ধ থাকায় সারাদেশে বাল্যবিয়ের মহামারি লেগেছে। বাংলাদেশে বরাবরই বাল্যবিয়ের হার বেশি, করোনাকালে সেটা যেন আরও গতি পেয়েছে। ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সারা বিশ্বে সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থান করছে। বাংলাদেশে শতকরা ২৯ ভাগ মেয়েরই বিয়ে হয় ১৫ বছরের কম বয়সে৷ এরমধ্যে শতকরা দুই ভাগ মেয়ের বিয়ে হয় ১১ বছরের কম বয়সে।  

অবস্থাটা কেমন তার কিছু চিত্র উঠে এসেছে গণমাধ্যমে। করোনার বন্ধে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আলীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ৫০ জন ছাত্রীর বাল্যবিয়ে হয়েছে। এরকম আরও অসংখ্য স্কুলের একই চিত্র। কোনও কোনও উপজেলায় শতাধিক মেয়ের এই পরিণতি হয়েছে। নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারগুলোয় এখন অর্থাভাব। ফলে, কিশোরী মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেওয়াকেই নিরাপদ ভাবছে এসব পরিবার। স্কুল বন্ধ থাকা, পরিবারের আয় কমে যাওয়া ও নিরাপত্তাহীনতায় মেয়ে শিশুদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন অভিভাবকরা। করোনার আগে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে যে রকম প্রশাসনিক এবং সামাজিক উদ্যোগ ছিল, সেই উদ্যোগে ভাটা পড়েছে, এমনটা অনেক জনপ্রতিনিধিই বলছেন। এর বাইরে আছে অর্থনৈতিক কারণ। বেশিরভাগ পরিবার তাদের কর্মসংস্থান হারিয়েছে, তারা অসম্ভব দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। ২০১৪ সালে সরকার ঘোষণা করেছিল, ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ে সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে। তবে এর পর পর সরকার নিজেই মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ থেকে ১৬-তে নামিয়ে আনে।

স্থানীয় স্তরে সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয়তা, জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতার ফলে অনিয়ন্ত্রিত বাল্যবিয়ে। কোনও কোনও জেলা-উপজেলায় প্রশাসনের লোকজন জানতে পারলে কিছু বিয়ে ঠেকাতে উদ্যোগী হন। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অভিভাবকরা এগুলো করেন সমাজপতিদের ম্যানেজ করে। করোনাকালে এই প্রবণতা বাড়লেও, কিছু অঞ্চলে বরাবরই বাল্যবিয়ের হার বেশি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ব্যাপক প্রবণতা যেসব উপকূলীয় অঞ্চলে বেশি, সেখানকার মেয়েরা এই ঝুঁকির মধ্যে বেশি নিপতিত।  এসব দুর্যোগ তাদের পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়, যা পরিবারগুলোকে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।

অর্থনৈতিক কারণ অবশ্যই আছে। করোনাকালে সেটা আরও বড় হয়েছে। কিন্তু বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রে নানা কুযুক্তিও চালু আছে সমাজে। ছোটবেলা থেকে শেখানো হয় বিয়ে আসলে ভাগ্য-নির্ধারিত। সেখানে কারও হাত নেই। বেশিরভাগ পরিবার এবং তাদের শুভাকাঙ্ক্ষীরা বলে, ভালো ছেলে পাওয়া গেছে, দাবিদাওয়া নেই, তাই  এমন পাত্র হাতছাড়া করা যায় না। আরেকটা বড় কারণ গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের নিরাপত্তা।  তারা একটু বড় হলেই বখাটে ও মাস্তানদের নজরে পড়ে, এ নিয়ে একেকটা পরিবার অনিরাপদ হয়ে পড়ে।  নিরাপত্তা তো পায়ই না, উল্টো এলাকা ছাড়ার অবস্থা হয় অনেক সময়।

বাল্যবিয়ে রোখার পথটা সুগম নয়। আইন প্রণীত হয়। কিন্তু অনেক ধীরগতিতে মানুষের মনে পরিবর্তন আসে।  পুরুষতান্ত্রিকতা ও বয়ঃপ্রাপ্ত মেয়েদের নিয়ে এক গভীর সামাজিক অনিশ্চয়তাই বাল্যবিয়ের মতো রোগকে প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। এর সঙ্গে যোগ হয় মেয়েদের উপার্জনক্ষম মানবসম্পদ হিসেবে ভাবতে না পারার সামাজিক ব্যর্থতা।

বাল্যবিয়ে নামের যে সামাজিক ব্যাধি বাংলাদেশকে গ্রাস করছে, তা থেকে রেহাই পেতে হলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক জাগরণ প্রয়োজন।  প্রশাসনিক পদক্ষেপ অবশ্যই দরকার, কিন্তু তার সঙ্গে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন। সামাজিক মাধ্যমে মৌলবাদী গোষ্ঠী নিরন্তর বাল্যবিয়ের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। এর বিপরীতে দীর্ঘ ও নিরবচ্ছিন্ন প্রচার প্রয়োজন সরকার ও সমাজের সচেতন মহল থেকে।  প্রশাসনের সক্রিয় অবস্থান এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সহযোগিতায় এতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।  স্কুলে-স্কুলে, পাড়ায়-পাড়ায় বাল্যবিয়েবিরোধী ক্লাব করা প্রয়োজন।  উদ্যোগটা আগে শুরু হতে পারে সরকারি স্কুলগুলোতে। ধর্মীয় নেতা, ইমামসহ সমাজপতিদের এ বিষয়ে দায়বদ্ধ করে তুলতে হবে।

একসময়ের নিয়মিত প্রচারে বাল্যবিয়ের কুফল যেভাবে মানুষ জানতে পেরেছিল সেগুলো যেন এখন ভুলতে বসেছে। অনেক শিক্ষিত পরিবারও মেয়েদের দ্রুত পাত্রস্থ করার পক্ষে। বাল্যবিয়ে নারী শরীরের পরিপূর্ণ বৃদ্ধি ও পুষ্টিতে অন্তরায়। বাল্যবিয়ে সুস্থ সন্তান জন্মের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। বাল্যবিয়ে শ্বশুরবাড়িতে নারীর সম্ভ্রম-সম্মান-গুরুত্ব কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বনেরও অন্তরায়- এ কথাগুলো নতুন করে জোরেশোরে বলার সময় এসেছে আবার।  
তাই বলছি, বাল্যবিয়েবিরোধী প্রচারে যে পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল সেটা আবার বদলে যাচ্ছে। পথ এখনও দুর্গম এবং গন্তব্য দূরবর্তী। নতুন নতুন প্রবণতা তৈরি হচ্ছে প্রশাসনকে ফাঁকি দেওয়ার। যেখানে বাল্যবিয়ে ঠেকানো হচ্ছে সেখানে কোনও স্থানীয় প্রভাবশালীর নেতৃত্বে পাত্রপাত্রীকে অন্যত্র নিয়ে গিয়ে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এই বিষয়ে সংবেদনশীল করে তুলতে না পারলে প্রবণতা ঠেকানো কঠিন।

বাংলাদেশে তো নানা প্রকল্প হয়। এবার নতুন একটি প্রকল্প হোক। প্রতিটি ঘরে প্রতিটি কন্যার জন্মকে উদযাপন করে তাকে আদরের সঙ্গে বরণ করে নেওয়ার প্রকল্প বাস্তবায়িত হোক।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

কাজের কথা

কাজের কথা

স্কুল যখন খুলছে

স্কুল যখন খুলছে

৪৩ বছরে বিএনপি

৪৩ বছরে বিএনপি

জনপ্রতিনিধি ও জনপ্রশাসক

জনপ্রতিনিধি ও জনপ্রশাসক

খুলেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রয়েছে শঙ্কাও

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২০:১২

ড. প্রণব কুমার পান্ডে ১৭ মার্চ ২০২০ সাল থেকে বাংলাদেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করোনা অতিমারির বিপর্যয়ের কারণে বন্ধ থাকায় শিক্ষা ব্যবস্থা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। শিক্ষার্থীরা তাদের প্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে না যেতে পেরে অলস সময় অতিবাহিত করেছে প্রায় দেড় বছর। এ সময় অনেকের মধ্যে উৎকণ্ঠা বাড়তে থাকে তাদের শিক্ষা জীবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাকালীন  শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অনলাইন ক্লাস এবং অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রম চলমান থাকলেও অনেকেই এই কার্যক্রমের আওতায় বাইরে ছিল বলে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার মাধ্যমে জানা যায়। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বাংলাদেশে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি হলেও এখন পর্যন্ত দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেটের গতি ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে গ্রামীণ অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ডিভাইসের অপ্রতুলতা।

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে সরকারি বিভিন্ন ধরনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম সফল করার জন্য শিক্ষকমণ্ডলীরও দায় রয়েছে। কারণ, শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক শিক্ষক রয়েছেন যারা এখনও নিজেদের অনলাইন কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচিত করে উঠতে পারেননি। বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকলেও সরকার বারবার চেষ্টা করেছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়ার জন্য। কিন্তু কিছু সময় বিরতির পর কোভিড-১৯ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করায় বারবার সরকারি সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হয়েছে। যাহোক, করোনার তৃতীয় ঢেউ যখন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে ঠিক সেই সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।  সিদ্ধান্তটি সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার কিছু গাইডলাইন বা নির্দেশনা প্রস্তুত করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিতরণ করেছে। পঞ্চম শ্রেণি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ছাত্রছাত্রীদের প্রত্যেক দিন ক্লাসের ব্যবস্থা রেখে অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য একদিন স্কুলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক বলে মনে হয়। কারণ, শিক্ষার্থীরা একদিন স্কুলে গেলেও তাদের মানসিক বিপর্যস্ততা কাটিয়ে ওঠে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।
 
শিক্ষার্থীরা হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রাণ। শিক্ষার্থীশূন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মরুভূমির মতো। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্তে নিশ্চিতভাবেই প্রাণের সঞ্চার হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। তবে আমাদের মধ্যেও এক ধরনের শঙ্কাও সব সময় কাজ করছে। আমরা নিকট অতীতে আমেরিকার অভিজ্ঞতার দিকে যদি দৃষ্টি দেই তাহলে দেখবো, সেখানে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর শিক্ষার্থীদের করোনা আক্রান্তের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। এমনকি আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশকে আইসিইউতেও ভর্তি করতে হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা সত্যিই আমাদের শঙ্কার মধ্যে ফেলেছে। আর এ কারণেই মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী  যে বার্তাটি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তা হলো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলায় কিংবা করোনা পরিস্থিতি আবার যদি খারাপ হয় তাহলে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শঙ্কা থাকলেও গত কয়েক দিন ধরে যেভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম চলছে তাতে সত্যিই আনন্দিত আমরা।

তবে শিক্ষার্থীদের পাঠদান এবং পরীক্ষা চলমান রাখার ক্ষেত্রে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের বিষয় আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুযোগ-সুবিধা উন্নত দেশের মতো নয়। তবে অত্যন্ত আশার খবর হচ্ছে, খোলার পর থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সরকারের গাইডলাইন মেনে চলার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঢুকতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা গেলেও ক্লাসরুমগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মানার মতো সক্ষমতা বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের নেই। কারণ, ছোট ছোট শ্রেণিকক্ষে অনেক বেশি শিক্ষার্থীর ক্লাস নেওয়া হয় বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে।

স্বীকার করতে হবে, এসব বিষয় মাথায় রেখেই একই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কয়েকটি ভাগ করে পাঠদান করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে, যা সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, দেড় বছর বাসায় অবস্থান করায় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এখন তারা কতটা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারবে সেটাই বিচার্য। অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ করেছি, শিক্ষার্থীরা পরস্পরকে আলিঙ্গন করছে, মাস্ক খুলে গল্প করছে এবং এমনকি নিজেদের টিফিন ভাগাভাগি করছে।  এসব অবশ্য তারা আবেগে করছে। এখন স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন করে শিক্ষার্থীরা যদি দূরত্ব বজায় না রাখে, তবে  নিজেরা আক্রান্ত হতে পারে, তেমনি পরিবার এবং দেশে আক্রান্তের হার বৃদ্ধি পেতে পারে। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষাবিধি মানার বিষয়টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে আরও সতর্ক থাকতে হবে।

সুরক্ষাবিধি মেনে চলার জন্য শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।  অভিভাবকরা সন্তানদের যদি বোঝাতে সক্ষম হন স্কুলে সহপাঠী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকার কাছ থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে ক্লাস করতে হবে, মাস্ক পরতে হবে এবং বারবার হাত ধুয়ে পরিষ্কার রাখতে হবে, তবেই আক্রান্তের হার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এসব না মানলে করোনা পরিস্থিতি ব্যাপক আকার ধারণ করতে পারে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি নিশ্চিত করা যেমন একটি চ্যালেঞ্জ, তেমনি অভিভাবকদের সুরক্ষাবিধি মেনে স্কুলের বাইরে অবস্থান করার বিষয়টি নিশ্চিত করা আরেকটি চ্যালেঞ্জ। মিডিয়ায় এসেছে, স্কুল গেটের বাইরে গাদাগাদি করে অবস্থান করছেন অভিভাবকরা, যা অত্যন্ত ভয়ের একটি বিষয়।  অস্বীকার করার উপায় নেই অভিভাবকরা অনেক দূর থেকে সন্তানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়ে আসেন এবং বসে থেকে স্কুল শেষে বাসায় নিয়ে যান। একবার স্কুলে আসার পরে বাসায় ফিরে পুনরায় স্কুলে আসা তাদের জন্য কঠিন। এ জন্যই তারা স্কুলের বাইরেই অপেক্ষা করেন।

মনে রাখতে হবে, অভিভাবকরা যদি নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে না পারি, তাহলে সন্তানদের সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে না। অনেক অভিভাবক মিডিয়ায় বলেছেন, স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের বসার কোনও ব্যবস্থা করেনি। তবে, এখানে স্কুল কর্তৃপক্ষকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। বাংলাদেশে অনেক স্কুল রয়েছে, বিশেষ করে যেগুলো শহরে অবস্থিত, সেই স্কুলগুলো অল্প জায়গার ওপরে নির্মিত। তাদের পর্যাপ্ত জায়গা নেই, যেখানে বসার ব্যবস্থা করতে পারে। ঢাকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেখানে বিভিন্ন ভবনে স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে অভিভাবকরা স্কুলের বাইরে গাদাগাদি করে অবস্থান করেন। অভিভাবকরা যদি এরইমধ্যে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তবে খুব দ্রুত অন্যরা আক্রান্ত হবেন এবং পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করবে।

তবে এসব চ্যালেঞ্জ নিয়েই এগোতে হবে। কেউই এখন সঠিকভাবে বলতে পারবো না কবে আমরা করোনামুক্ত পৃথিবীতে বাস করতে পারবো। ফলে, করোনা পরবর্তী নিউ নরমাল জীবন পদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যদি খাপ খাইয়ে চলতে না পারি তাহলে আমরা পিছিয়ে পড়বো। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এ পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে ঠিকই এগিয়ে চলেছে। আমাদেরও উচিত তা করা। এটা করতে পারলেই করোনা সৃষ্ট বিপর্যয় থেকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবো।

শিক্ষা ব্যবস্থায় উন্নত দেশের সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাশা করা কখনোই সমীচীন হবে না। দীর্ঘদিন  শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ধ্বংস করাও ঠিক হবে না। এখন পরিস্থিতি যেহেতু কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তাই আমরা যদি নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করি, তাহলে একদিকে শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে, তেমনি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন রক্ষা করা যাবে।


লেখক: অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজন অনলাইন-অফলাইন সমন্বয়

শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজন অনলাইন-অফলাইন সমন্বয়

‘বিপদে আমি না যেন করি ভয়’

‘বিপদে আমি না যেন করি ভয়’

গ্রামাঞ্চলে টিকা কার্যক্রম: কিছু সুপারিশ

গ্রামাঞ্চলে টিকা কার্যক্রম: কিছু সুপারিশ

মহামারির বিপর্যয় মোকাবিলায় স্থানীয় সরকারের সম্পৃক্ততা জরুরি

মহামারির বিপর্যয় মোকাবিলায় স্থানীয় সরকারের সম্পৃক্ততা জরুরি

ডু নট টাচ মাই ক্লথস: আমাদের জন্য কেন জরুরি?

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৭:২৫

জোবাইদা নাসরীন আফগানিস্তানের নারীদের প্রতিবাদ এবং বিক্ষোভ দেখছে বিশ্ব। সংখ্যায় হয়তো বেশি নয়, কিন্তু তালেবানদের ভয়ভীতি উপেক্ষা করে তারা সামাজিকমাধ্যম এবং রাজপথে  সরব রয়েছেন। আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি যে আফগানিস্তানে তালেবানরা যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার করেছে সেই সরকারের মন্ত্রিসভায় নেই কোনও নারী। শুধু এটি করেই ক্ষান্ত হয়নি তালেবানরা, দেশটির নারী বিষয়ক মন্ত্রণালয় বাদ দেওয়া হয়েছে। এই মন্ত্রণালয়ের সাইনবোর্ড বদলে ফেলে সেখানে পাপ ও পুণ্য মন্ত্রণালয়ের নামে নতুন সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। সেখানে দারি ও আরবি ভাষায় লেখা হয়েছে, প্রার্থনা, নির্দেশনা এবং পুণ্যের প্রচার ও পাপ ঠেকানো মন্ত্রণালয় (বাংলা ট্রিবিউন , ১৭ সেপ্টেম্বর)।  

এমনকি মন্ত্রণালয়ের ভবনেও কোনও নারীকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন আফগান নারীরা। এর আগে নারীদের ফুটবল খেলা, নারীদের উচ্চশিক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল তারা। তালেবানেরা প্রথম যে বিষয়টির ওপর চাপ তৈরি করেছে তা হলো নারীর পোশাকের স্বাধীনতার ওপর। দেখা গেছে, রাতারাতি  দেশটির নারীরা কালো কিংবা নীল বোরকা পরে চলাচল করছে এবং তালেবানদের পক্ষে মিছিল এবং র‍্যালিতে অংশ নিচ্ছে।
 
তালেবান সরকারের এই নারীবিদ্বেষী অবস্থান এবং সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আফগানিস্তানে বুল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রদেশ বাদাখশানে কয়েক ডজন নারী রাস্তায় নেমে তালেবানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছেন। দেশটির রাজধানী কাবুল ও বাদাখশান, পারওয়ান ও নিমরুজ  প্রদেশে এই বিক্ষোভ হয়েছে। এই বিক্ষোভ অন্যান্য বিক্ষোভের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ  এ কারণেই যে আফগানিস্তানে নতুন সরকারের ঘোষণা দেওয়া নারীদের ঘরে থাকা এবং অন্যান্য বিষয়ে নিষেধাজ্ঞার মুখেও নিজেদের অধিকার আদায়ে বিক্ষোভ জারি রেখেছেন দেশটির নারীরা। শুধু বিক্ষোভই নয়, তারা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা দিয়েছেন, যে সরকারে কোনও নারী নেতৃত্ব নেই এমন সরকার তারা কোনোভাবেই গ্রহণ করবেন না। নারীকে বাদ দিয়ে তালেবানদের সরকার গঠন এবং একের পর এক নারীবিরোধী সিদ্ধান্তে  ক্ষোভ প্রকাশ করছে বিশ্বনেতৃবৃন্দও।

বিক্ষোভ যে শুধু রাজপথেই চলমান রয়েছে তা নয়, এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। নারীর পোশাক পরিবর্তনের জন্য তালেবানদের চাপের বিষয়ে ফেসবুকে একটি আন্দোলন চলেছে, আর সেই আন্দোলনের স্লোগান হলো’ #Do NotTouch My Clothes এবং #Afghanistan Culture. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই আন্দোলনকে সামনে নিয়ে আসেন আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব আফগানিস্তানের ইতিহাসের সাবেক অধ্যাপক ড. বাহার জালালি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই আন্দোলনের গুরুত্ব নিয়ে তিনি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, আফগানিস্তানের পরিচয় এবং সার্বভৌমত্ব এখন হুমকির মুখে বলে তার মনে হয়েছে, এটা নিয়ে তিনি সবচেয়ে উদ্বিগ্ন। সে কারণেই তিনি এই আন্দোলন শুরু করেছেন। এই প্রতিবাদী হ্যাশট্যাগ ফেসবুকে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং হ্যাশট্যাগের প্রতিবাদে অনেকে অনলাইনে তাদের বর্ণিল ঐতিহ্যবাহী পোশাক শেয়ার করছেন। তাতে যোগ দেন আরও অনেকে। তিনি নিজে একটি সবুজ আফগান পোশাক পরে একটি ছবি টুইটারে পোস্ট করেন এবং এর পাশাপাশি তিনি অন্য আফগান নারীদেরকেও ‘আফগানিস্তানের আসল চেহারা’ তুলে ধরার আহ্বান জানান।

শুধু আফগানিস্তানে নয়, Do Not Touch My Clothes এই আন্দোলন বাংলাদেশের জন্যও খুবই প্রাসঙ্গিক। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে যখন আফগানিস্তানে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা জারি হচ্ছিল নারীর বিরুদ্ধে, তখন কিন্তু এ দেশের অনেক নারীই মানসিকভাবে ভীত হয়ে পড়েন। কারণ, বাংলাদেশে বেশিরভাগ সময়ই বিশেষ করে নারী নিপীড়ন ব্যাখ্যা এবং বিশ্লেষণে নারীর পোশাককে অপ্রাসঙ্গিকভাবে হাজির করা হয়। তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে বিষয়গুলো নিয়ে তর্কবিতর্ক এবং নারীর প্রতি অশ্লীল বাক্য, গালিগালাজ করা হয়, তখন মনে হয় বাংলাদেশে অনেক তালেবান রয়েছে, যারা নারীকে তালেবানদের মতোই দেখতে চায় এবং নারীকে দেখার এই তালেবানি পুরুষতান্ত্রিক চোখ ভীত করে বাংলাদেশের নারীদের। এখানে এ বিষয়টিও বলে রাখা একবারেই প্রাসঙ্গিক, শুধু নিপীড়নের ক্ষেত্রেই নয়, আমরা প্রতিনিয়তই পাবলিক পরিসরে নারীর পোশাক নিয়ে, টিপ নিয়ে নানা ধরনের কটূক্তি শুনি। এই কটূক্তির পেছনে যে কারণ বা মতাদর্শ কাজ করে সেটি একভাবে যেমন নারীবিদ্বেষী এবং অন্যভাবে নারীকে বিভিন্ন পাবলিক পরিসর, চাকরিসহ নানা ধরনের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক জায়গা থেকে বাদ দেওয়ার রাজনীতি।

তাই Do Not Touch My Clothes স্লোগানকে সামনে নিয়ে যখন আফগান নারীরা তাদের বর্ণিল পোশাকগুলো তুলে একে একে বলতে থাকে ‘এটাই আমরা সংস্কৃতি, বোরকা আমার সংস্কৃতি নয় এবং ওই কালো এবং নীল বোরকা অন্য জায়গার সংস্কৃতি’ সেটি একভাবে বাংলাদেশের নারীদেরও উজ্জীবিত করে। এর পাশাপাশি আমরা আরও সাহসী কয়েকজন আফগান নারীর বিভিন্ন ধরনের প্রতিবাদ দেখেছি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আফগানিস্তানে গ্রাফিতি শিল্পী সামসিয়ার একটি ছবি। যেখানে দেখা যাচ্ছে অনেক কালো বোরকা পরা নারীর মধ্যে বইয়ের আলো হাতে দাঁড়িয়ে থাকা একজন নারী আলো ছড়াচ্ছেন।

রাস্তায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তালেবানদের নারীবিদ্বেষী আচরণ এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জারি রেখে এবং বিভিন্নভাবে এটিকে ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে আফগান নারীরা একভাবে বিশ্বের সব নারীকে শক্তি জোগাচ্ছে এবং জানাচ্ছে কীভাবে অনেক বেশি চাপের মধ্য দিয়েও আন্দোলন এবং প্রতিবাদ চালিয়ে রাখা যায়।

তাই আমাদের মনে রাখতে হবে, আফগানিস্তানে নারীর বিরুদ্ধে যা ঘটছে এবং পাশাপাশি নারীরা যেভাবে লড়ছে এই দুটোকেই বিশ্লেষণ করতে হবে সমানভাবেই। তাই এ মুহূর্তে আফগান নারীদের পাশে বাংলাদেশের নারীদের থাকতে হবে।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: [email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

আমাদের মনোযোগ বাড়াতে হবে যেখানে

আমাদের মনোযোগ বাড়াতে হবে যেখানে

বডি শেমিং ও আমাদের ‘বাজারি মন’

বডি শেমিং ও আমাদের ‘বাজারি মন’

কয়লা হয়ে বস্তায় ঢোকা জীবন

কয়লা হয়ে বস্তায় ঢোকা জীবন

তদন্ত কমিটির রিপোর্টগুলো কোথায় যায়?

তদন্ত কমিটির রিপোর্টগুলো কোথায় যায়?

রাজনৈতিক দলের বিদেশি ‘দোকান’ বন্ধ হোক

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:০৪

আনিস আলমগীর বাংলাদেশের প্রথম সারির রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রায় সবার বিদেশে রাজনৈতিক শাখা আছে। এসব শাখা রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র অনুসারে বেআইনি তবে কেন্দ্রীয় নেতাদের সম্মতিতেই চলছে। তারা বিদেশ শাখার অনুষ্ঠানে অংশ নেন, তাদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। যে কথাটা অনেকে হয়তো জানেন না, সরকারি সফর না হলে নেতাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও করেন ওইসব শাখার নেতাকর্মীরা। সরকারি-বেসরকারি যেকোনও সফরে তাদের ব্যাগভর্তি উপহার সামগ্রী এবং টাকা-পয়সা দেয় প্রবাসী রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা।

মূল দলের নেতারা ছাড়াও দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতারাও একই আদর-যত্ন পেয়ে থাকেন। অঙ্গদলের নেতারা বরং কেন্দ্রীয় নেতাদের থেকে বেশি বিদেশ ভ্রমণ করেন। যেখানে যান সংগঠনের শাখা খুলে আসেন, অনুমোদন দিয়ে আসেন। সেসব কমিটিতে স্থান পেতে স্থানীয়ভাবে চলে তীব্র প্রতিযোগিতা। বলার অপেক্ষা রাখে না, যাদের টাকা-পয়সা খরচ করার সামর্থ্য বেশি তারা উঁচু পদে আসীন হন, শিক্ষাগত যোগ্যতা, রাজনৈতিক গুণাবলি এখানে কোনও বিষয় না।

রাজনৈতিক দলের বিদেশ শাখা খোলার এই কালচার কখন থেকে চালু হয়েছে আমি জানি না। তবে এ ধরনের শাখার সঙ্গে আমি প্রথম পরিচিত হই ১৯৯৯ সালে নিউ ইয়র্কে।

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন কাভার করার জন্য গিয়েছিলাম। যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল সেবার জাতিসংঘ কর্তৃক বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের ২৫ বছরপূর্তির অনুষ্ঠান ছিল জাতিসংঘ সদর দফতরে। ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং ২৫ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে প্রথমবারের মতো ভাষণ দিয়েছিলেন। এসব স্মরণ করেই ছিল অনুষ্ঠানমালা।

আমি সরকারি সফরসঙ্গী ছিলাম না। আমার পত্রিকা আজকের কাগজের পক্ষ থেকে সেটা কাভার করতে যাই। একটি বাড়তি সুবিধা পেয়েছিলাম যে বেসরকারিভাবে গেলেও প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী একই বিমানে যেতে পেরেছি। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীর বাইরে আমার মতো আরও কিছু যাত্রীও সেখানে ছিলেন, যাদের সঙ্গে মাঝপথে প্রধানমন্ত্রী ঘুরে-ঘুরে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন। জানি না নিরাপত্তার কথা ভেবে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানে এখন বেসরকারি যাত্রী কতটা স্থান পায় এবং তিনি আগের মতো বেসরকারি যাত্রীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন কিনা।

যাক, ব্রাসেলসে বিরতি দিয়ে আমরা যখন নিউ ইয়র্ক পৌঁছি, প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানানোর জন্য ব্যানার নিয়ে আওয়ামী লীগ যুক্তরাষ্ট্র শাখার নেতারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। পরের কয়েক দিনে তাদের সরব উপস্থিতি দেখতে পাই বিভিন্ন ভেন্যুতে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানস্থল হোটেলের লবিতে-বাইরে আওয়ামী লীগ কর্মীরা ভিড় করে থাকতো। দলীয় প্রধানকে তারা একটি হোটেলে সংবর্ধনা দিয়েছিল, যেখানে মূল অংশজুড়ে ছিল গৎবাধা ‘তেল প্রদান’। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুবলীগের কিছু নেতাও গিয়েছিলেন, তাদের নিয়েও ভিড় এবং উপহার দেওয়ার ধুম লেগে ছিল।

সেই সময় প্রায় সব দলের স্থানীয় শাখার কথা জানতে পারি। জাসদ (রব) তখন ক্ষমতার অংশীদার ছিল। আশ্চর্য হই তাদেরও মোটামুটি জনবলের কমিটি সেখানে আছে। স্থানীয় বাংলা সাপ্তাহিকগুলোতে নানা দলের নেতাদের কার্যক্রম ছাপা হতো। শুধু রাজনৈতিক দল নয়, বিভিন্ন জেলা, উপজেলার শাখা, এমনকি হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের শাখাও দেখতে পাই। বিএনপির সমাবেশ দেখতে পাই জাতিসংঘের অদূরে ‘খোয়াড়ে’র মতো পুলিশি বেষ্টনীতে ঘেরা একটি জায়গায়, যেখানে তারা সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছিল।

প্রথমবার আমি প্রায় দুই মাস ছিলাম। তখনকার বাংলাদেশি জনসমাজ এবং অন্যান্য দেশের জনসমাজের চিত্র দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। আমি স্থানীয় সাপ্তাহিক ‘বাংলা পত্রিকা’র সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে রাজনৈতিক দলের এসব ‘দোকান’ বন্ধ করার অনুরোধ করেছিলাম, যাতে বাংলাদেশিরা মূলধারার রাজনীতিতে আগ্রহী হয়। আর সেটা হলে বাংলাদেশের মান বিদেশে বাড়তো, যখন ইন্ডিয়ান-আমেরিকানদের উদাহরণ আমাদের চোখের সামনেই ছিল। অবশ্য নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর অনেক স্থানে ভারতীয়রাও তাকে কালো পতাকা দেখাচ্ছে। গত ১৫ আগস্ট ভারতের জাতীয় দিবসে ‘রিজাইন মোদি’ ব্যানার টানিয়েছে লন্ডনসহ অনেক শহরে।

দুর্ভাগ্য, এর পরের বার ২০০৪ সালে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের আমন্ত্রণে আমেরিকা সফরে গিয়েও দেখেছি বাংলাদেশিদের এই কালচার অব্যাহত আছে। এখন নাকি তার পরিধি আরও বেড়েছে। জাতিসংঘের ৭৬তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্কে গেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পত্রিকায় দেখলাম এরমধ্যেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশি অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটস এলাকা। ১৮ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সফরের পক্ষে ও বিপক্ষে দিনভর কর্মসূচি চলার সময় এ ঘটনা ঘটে।

এ সময় দফায় দফায় হামলা, পাল্টা হামলা, ধাক্কাধাক্কি আর কিল-ঘুসির ঘটনা ঘটেছে। একপর্যায়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। তবে উভয় পক্ষই পুলিশ বেষ্টনীর মধ্যে আক্রমণাত্মক স্লোগান দিতে থাকে। এর ফলে সন্ধ্যা সাড়ে ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত পুরো এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তি দেখে জ্যাকসন হাইটস এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এই অপ্রীতিকর ঘটনায় এলাকার বাসিন্দারা ভয়ে পুলিশকে ফোন করেন।

আমার সাংবাদিক বন্ধু প্রথম আলোর নিউ ইয়র্ক সংস্করণের সম্পাদক ইব্রাহিম চৌধুরীর মতে,  ‘জ্যাকসন হাইটসের সাদা বাসিন্দারা ওই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। তারা বাংলাদেশিদের হৈ-হল্লা, মারামারি কালচারে অভ্যস্ত না। ৭৩ স্ট্রিটের হালচাল দেখে এমনকি এই প্রজন্মের বাংলাদেশিরাও ওই এলাকায় যেতে চায় না। ২০ মাইলেরও বেশি দূরে নিঝুম রাতে ম্যানহাটনের হোটেলে যখন প্রধানমন্ত্রী ঘুমাচ্ছেন তখন এখানে ট্যাক্সি না চালিয়ে, রেস্টুরেন্টের কাজে না গিয়ে সরকারি দলের সমর্থকরা কী সুখে কয়দিন ধরে জমায়েত করছে তারা জানে! অনেক নারী সমর্থকরাও আছে এই ভিড়ে। তবে বিএনপি রাতজাগা কর্মসূচিতে নেই, তারা ক্ষমতার ভাগ পাওয়ার কোনও আশা দেখে না।’

শনিবার যখন বাংলাদেশিরা ওই এলাকায় মারামারি করছে সেদিনই খন্দকার আবদুল্লাহ নামের এই প্রজন্মের একজন পুলিশ কর্মকর্তা কমান্ডিং অফিসার হয়েছেন নিউ ইয়র্কে, ভবিষ্যতে তার পুলিশ কমিশনার হওয়ার সম্ভাবনা আছে ওই শহরে। শাহানা হানিফ নামে আরেকজন তরুণী মূলধারার রাজনীতিতে অংশ নিয়ে সিটি কাউন্সিল হতে যাচ্ছেন, সোমা সাইদ নামের আরেকজন হতে যাচ্ছেন সিভিল বিচারক।

আমেরিকার মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের অবদান ক্ষীণ হলেও দ্বিতীয় প্রজন্মের অনেক স্কলার সুনাম কামাচ্ছেন অন্য সেক্টরে। তৃতীয় প্রজন্মও এগিয়ে আসছেন। কিছু দিন আগে বিখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনে ৩০ বছরের কম বয়সী ৩০ উদ্যোক্তার তালিকায় স্থান পেয়েছেন (Forbes 30 Under 30 list) বাংলাদেশি নাবিল আলমগীর। তাকে নিয়ে আমেরিকান পত্রিকায় সংবাদ বেরিয়েছে। বাংলাদেশে ঢাকা ট্রিবিউন তার একটি সংবাদ প্রকাশ করেছে। নাবিলের ‘লাঞ্চবক্স’ নামের একটি অ্যাপ রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদের লাভের মার্জিন বাড়িয়ে দিয়েছে। আগে একশ’ ডলারের অর্ডার থার্ডপার্টিকে দিয়ে কাস্টমারের বাসায় পৌঁছিয়ে যখন তাদের লাভ হতো ৫ ডলার, সেটা এখন হচ্ছে ২৫ ডলার। আর করোনাকালে নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, তার কোম্পানির ২০২০ সালের রাজস্ব আয় সাতগুণ বেড়েছে।

বাংলাদেশি-আমেরিকানদের এ ধরনের সাফল্যের খবর কিংবা যেকোনও দেশ থেকে প্রবাসীদের সাফল্যের খবর বাংলাদেশে এলে আমরা অভিভূত হয়ে পড়ি। আমাদের গর্ব হয়। অথচ আমাদের পড়তে হয় তাদের নেতিবাচক খবর, বিদেশে গিয়েও দেশি রাজনীতি নিয়ে মারামারির খবর। আমি বিশ্বাস করি, দল-মত নির্বিশেষে প্রবাসীদের এসব কর্মকাণ্ড দেশের মানুষ ভালো চোখে দেখে না। এই সংক্রান্ত খবরগুলোর নিচে মানুষের মতামত দেখলেই প্রবাসীরা বুঝতে পারবেন সেটা।

আমাদের দেশটি ছোট। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুসারে এই দশকের শেষে, মানে ২০৩০ সালে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের অষ্টম জনবহুল রাষ্ট্র এবং আমাদের প্রতিবেশী ভারত হবে বিশ্বের প্রধান জনবহুল রাষ্ট্র। এত সংখ্যক মানুষের জায়গা দেশের মাটিতে হবে না। এই জনগণকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করে বিদেশে পাঠাতে হবে। আর এই দায়িত্ব পালনে সরকার এবং সরকারি দলের ভূমিকাই বেশি। সরকারের কাছ থেকে দেশে ব্যাংক-বিমা খোলার লাইসেন্স, পাওয়ার প্ল্যান্ট বা কোনও বিদেশি টেন্ডারের কমিশন পায় বলেই এরা বিদেশে বসেও দেশের রাজনীতির দোকান খুলে বসে আছে। আগের সরকার আমলেও তা-ই হয়েছে। এসব প্রবাসী নেতা দেশি দুর্নীতিবাজ নেতাদের তাদের ব্যবসায়িক পার্টনার দেখিয়ে দেশের টাকা বিদেশে পাচার করতে সহায়তা করে আসছে। তাই সব দলের উচিত প্রবাসীদের দেশি রাজনীতিতে যুক্ত না করা এবং শুধু কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবে রাজনৈতিক দলগুলোর ‘বিদেশি দোকান’ বন্ধ করা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

দায় এড়াতে পারবে না নতুন তালেবান

দায় এড়াতে পারবে না নতুন তালেবান

ই-কমার্স প্রতারণা থামানোর উপায়

ই-কমার্স প্রতারণা থামানোর উপায়

জিয়ার কবর নিয়ে রাজনীতি

জিয়ার কবর নিয়ে রাজনীতি

তালেবানের আফগান দখলে পাকিস্তানের লাভ-ক্ষতি

তালেবানের আফগান দখলে পাকিস্তানের লাভ-ক্ষতি

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে ডিজিটাল অপরাধও বেড়েছে: টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী

ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে ডিজিটাল অপরাধও বেড়েছে: টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী

কক্সবাজারের সাথে রেল যোগাযোগ চালু হবে ২০২২ সালে: রেলমন্ত্রী

কক্সবাজারের সাথে রেল যোগাযোগ চালু হবে ২০২২ সালে: রেলমন্ত্রী

রোনালদোবিহীন ম্যান ইউর বিপক্ষে ‘প্রতিশোধ’ নিলো ওয়েস্ট হাম

রোনালদোবিহীন ম্যান ইউর বিপক্ষে ‘প্রতিশোধ’ নিলো ওয়েস্ট হাম

পিএসজিকে শেষ মুহূর্তে জেতালেন হাকিমি

পিএসজিকে শেষ মুহূর্তে জেতালেন হাকিমি

করোনার টিকাকে ‘বৈশ্বিক জনস্বার্থ সামগ্রী’ ঘোষণার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

করোনার টিকাকে ‘বৈশ্বিক জনস্বার্থ সামগ্রী’ ঘোষণার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

জ্যাকেটের হাতায় ২৫টি স্বর্ণবার, সৌদি প্রবাসী আটক

জ্যাকেটের হাতায় ২৫টি স্বর্ণবার, সৌদি প্রবাসী আটক

কাভার্ডভ্যানে জিপিএস, মহাসড়কে সিসিটিভি

গার্মেন্টস পণ্য চুরিকাভার্ডভ্যানে জিপিএস, মহাসড়কে সিসিটিভি

গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের জন্য নাদিয়া

গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের জন্য নাদিয়া

হায়দরাবাদকে হারিয়ে শীর্ষে দিল্লি

হায়দরাবাদকে হারিয়ে শীর্ষে দিল্লি

‘তালেবান শো’ কোনও কাজে আসবে না: জার্মানি

‘তালেবান শো’ কোনও কাজে আসবে না: জার্মানি

মোংলায় শিক্ষকের করোনা শনাক্ত

মোংলায় শিক্ষকের করোনা শনাক্ত

চট্টগ্রামে দিনে ১৫ ডিভোর্সের আবেদন, নেপথ্যে করোনা-ফেসবুক

চট্টগ্রামে দিনে ১৫ ডিভোর্সের আবেদন, নেপথ্যে করোনা-ফেসবুক

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune