X
বুধবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৭ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

জীবনানন্দের ‘পৃথিবীলোক’ : নগর পতনেরও শব্দ শুনি

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:০৬

‘দূরে কাছে কেবলি নগর, ঘর ভাঙ্গে 
গ্রাম পতনের শব্দ হয়;’
                         
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীর অস্বাভাবিক নগরায়ণ দেখে কি জীবনানন্দ-কবি ওপরের পঙক্তিদুটি লিখেছিলেন? 
আর পরক্ষণেই আরো ছ-পঙক্তিতে তিনি বিশদ করছেন :
‘মানুষেরা ঢের যুগ কাটিয়ে দিয়েছে পৃথিবীতে, 
দেয়ালে তাদের ছায়া তবু 
ক্ষতি, মৃত্যু, ভয় 
বিহ্বলতা ব’লে মনে হয়।
এসব শূন্যতা ছাড়া কোনোদিকে আজ 
কিছু নেই সময়ের তীরে।’

আজ এই করোনাকরুণ সময়ে দাঁড়িয়ে সত্যিই মনে হয়, মানুষ যদিও ‘ঢের যুগ কাটিয়ে দিয়েছে পৃথিবীতে’ এবং তার অর্জনও অসীম, তবু, তার সেরা উপার্জন মনে হয় কবি-কথিত ‘ক্ষতি, মৃত্যু, ভয়, বিহ্বলতা’ ছাড়া আর কিছুই নয়! আর এত নগর, এত প্রযুক্তি, ভোগ-সুখের এত অপার অপচয়ের সুযোগ, তবু যেন সত্যিই ‘শূন্যতা ছাড়া কোনোদিকে আজ কিছু নেই’। কারণ পৃথিবীর তাবৎ মানুষের দানবীয় শক্তিও এই অদৃশ্য ভাইরাসের কিচ্ছুটি করতে পারছে না, বরং বছরজুড়ে তার হাতে মার খেয়েই চলেছে। মানবজাতির তাবৎ জ্ঞান-বুদ্ধি-বিজ্ঞানের কেরদানিকে সে যেন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেছে। অথচ মানবজাতি তার বিপুল ধরিত্রীমাতাকে শতবার বিনাশ করার প্রযুক্তি করায়ত্ত করেছে, প্রতিদিন পৃথিবীর বুক ছিঁড়েখুঁড়ে তার সুখের প্রাসাদ নির্মাণ করছে, সমুদ্র থেকে আকাশ-বাতাস-মাটি-অরণ্য সবকিছুকে দূষিত করে, লক্ষ-লক্ষ প্রাণ ও বৃক্ষলতাকে প্রতিনিয়ত হত্যা করে তার অসীম প্রভুত্ব বিস্তার করেছে। এই আত্মগর্বী, জ্ঞানপাপী মানবকুল এবং তাদের মদমত্ত, বলদর্পী, ক্ষমতা ও ধনলোভী শাসক ও বণিকদল পৃথিবীকে যেন ভোগ আর মুনাফার ভাগাড় বানিয়ে ছেড়েছে। কিন্তু পৃথিবীও তার অদৃশ্য অস্ত্র দিয়ে আমাদের গালে চপেটাঘাত করে দেখিয়ে দিচ্ছে, মানুষ নিজেকে যতটা বড় মনে করে, তত বড় হতে তার ঢের বাকি আছে!

অবশ্য মানুষ যে আদতেই সামান্য, সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া প্রকৃতিরই তুচ্ছ অংশমাত্র, সে-কথাও মানুষই তার জ্ঞান-বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে হাজার হাজার বছর ধরে বুঝেছে এবং চিন্তা-দর্শন-ধর্ম-সংস্কৃতি ও ব্যাবহারিকতার মাধ্যমে তার চর্চা করেছে। তবে কী এক বিপন্ন-বিকারে মানুষ যত ‘সভ্য’ হয়েছে, প্রকৃতির প্রতি তার ‘অসভ্যতা’ মাত্রাহীনতা পেয়েছে। কেবল তা-ই নয়, উনিশ শতক থেকে শুরু হয়েছে উৎকট-নগরায়ণ এবং আজকের এই একুশ শতকে প্রতিদিনই তীব্রগতিতে গ্রামের ভিতর শহর ঢুকে পড়ছে, প্রতিদিনই চলছে বৃক্ষ-নদী-ভূমিহত্যার উৎসব। নগরায়ণের সঙ্গে আছে ক্ষমতা, পুঁজি ও মুনাফার সম্পর্ক। আর তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উদগ্র লোভ-ভোগ-দখলের বিচারবোধহীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ কেবল যে প্রকৃতির ভারসাম্যকেই বিনষ্ট করে তা নয়, বরং মানবিক ভারসাম্যকেও ধ্বংস করে দেয়। পরিণামে কেবল মাটিই ইট-পাথরে রূপান্তরিত হয় না, বরং মানুষ নিজেকেও শুষ্ক করে তোলে; তার সজল আত্মা মরুতে পরিণত হয় এবং তা ভেতরে ভেতরে তাকে শিকড়হীন-উন্মূল করে তোলে; নানা ব্যাধি ও বিকার তাকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।

এ কথা মনে করেই হয়তো জীবনানন্দ-কবি তাঁর এই ‘পৃথিবীলোক’ কবিতার শেষ চার পঙক্তিতে লেখেন :            
‘তবু ব্যর্থ মানুষের গ্লানি ভুল চিন্তা সংকল্পের 
অবিরল মরুভূমি ঘিরে 
বিচিত্র বৃক্ষের শব্দে স্নিগ্ধ এক দেশ 
এ পৃথিবী, এই প্রেম, জ্ঞান আর হৃদয়ের এই নির্দেশ।’

কী চমৎকারভাবেই না জীবন-কবি বলেছেন, ‘বিচিত্র বৃক্ষের শব্দে স্নিগ্ধ এক দেশ এ পৃথিবী’! তবু মানবজাতি ‘এই প্রেম, জ্ঞান আর হৃদয়ের এই নির্দেশ’ কী অবলীলায় ভুল মেরে বসে আছে। অথচ আর কোনো প্রাণ-প্রজাতি নয়, কেবল মানবপ্রাণির জন্যই কত-না ঊর্ধ্বলোক থেকে কত-না গর্জন-বর্ষণ যুগে যুগে এসেছে বারবার। তবু মানুষ আজও হলো না মানুষ। কবে যে হবে কিংবা হবে কোনো দিন!
এই পৃথিবীলোক তবে কি মানুষের হাতেই হবে শহিদ! একদিন পতন হবে সব নগরের, মিলিয়ে যাবে তার সকল গৌরব!! 

[উৎসর্গ : প্রণম্য প্রকৃতিসাধক দ্বিজেন শর্মা]

/জেডএস/

সম্পর্কিত

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:৫১

অন্নজল

গনগনে রোদ ঠেলে এসে ফকির দাস বটের নিচে বসে।
ঘষা চশমার সামনে হলুদ প্রজাপতি নাচে দাঁতরাঙা ফুলে। 
মাঠে পাকা ধান। পাখি ওড়ে হরেক কিসিম।
ফকির দেখে আর ভাবে, আহা কী রঙ কী রঙ! 
এ বছর ভালো ভিখ মিলবে গো!
বলেই জিভ কাটে, কিরে দেয়, চোখ বুঁজে আকাশে তাকায় জোড় হাতে, মোনাজাতে।
কী যে ভেবে ফেলল সে; এসব ভাবতে নেই!
ভাবলেই মেঘ জমে, ধানের দাম পড়ে যায়, দেনদারি হয় চাষি, দেশে ওঠে রোগের বালাই।

সেও তো চাষিই ছিল একদিন।
এইসব ভেবেটেবে চুপচাপ ঝোলা থেকে ছেঁড়া পুঁটলিটা বের করে আনে।
খুলে ফেলে বিঁচিকলা দুটো সরিয়ে রাখে, থাক।
কাল খাওয়া যাবে। আজ সে নুন ঘষে নেবে রুটির কানায়।
হরি হে, দিন দিয়ো, দেখো তুমি খোদা। এই বলে সে মুখে অন্ন দেয়। 
অন্নই তো হরি। অন্নই তো মালিক গো! সে দিন না দিলে কেমনে চলবে তার?
খাওয়া দেখে বটের তলায় সাঁৎ সাঁৎ করে শালিক নামে দুটো।
ওটা শালিক না রোদ? ফকির ঘষা কাচে ঠাওর পায় না। 
রুটি চিবোয় আর ভাবে, ভেবে যায়।
আজ ধুনিপাড়ায় কার বাড়ি যেন ভোজ আছে না? 
বিকেলে যেতে হবে। সেও তো দেশেরই লোক, দুটো এঁটোকাঁটা পাবে না কি আর?
ধুলোর ঘূর্ণি কুটো নিয়ে ঘোরে। ঘুরতে ঘুরতে উপরে উঠে যায়।
ফকির গামছা পাতে। একটু জিরোতে তো হবে। কত যে রাস্তা বাকি!


ফড়িং

একটা ফড়িং জলের ওপর মুখ দেখবে বলে থমকে দাঁড়ালো।
কী দেখতে চাইল সে? কতটা ব্যথার ভারে স্থির হয়ে থাকে জীবনের মুখ? 
অথবা ফেলে আসা উড়ানের পথ
স্মৃতির পরম জলে দাগ রেখে গেছে কিনা এইসব?
ঘরে এখন অন্ধকার, বিদ্যুৎ নেই
ঝড়ের সময়ে ভাঙা জানালাটা খোলা যাবে না।
অথচ এই অন্ধকারেই তো দেখা যায় সব–
পুকুরের জল, থমকে দাঁড়ানো ফড়িং, 
স্মৃতির শালুকপাতায় টলমল ব্যথার মিনার।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

পৃথিবী

পৃথিবী

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৪:৫৭

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

ছোটরা বড়দের কাজ করলে
আর বড়রাও ছোটদের ভূমিকায় থাকলে
বিষয়টা মজার।

বেটিদের পোশাক বেটা পরলে
আর পুরুষদের ড্রেস নারী পরলে হাস্যকর।

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে এবং রাতে সূর্য উঠবে।


তিনটি মেয়ের জামা-কাপড়

তিনটি মেয়ে ঝর্নাজলে
মনের পাখা মেলছে,
নগ্নস্নানে কী আনন্দে
জলের সাথে খেলছে।

বনপরিদের ভাগ্নি যেন
জলপরিদের কন্যা,
ঝর্না জলে জল সাঁতারে
ছড়ায় সুখের বন্যা।

হঠাৎ একটি হেলিকপ্টার
ভটভট করে এলো,
মেয়ে তিনটির স্বাধীনতা
করল এলোমেলো।

হেলিকপ্টার গুলি ছোড়ে
হারায় তারা দিশে,
একটি মেয়ে গুলিবিদ্ধ
রক্তজলে মিশে।

বাকি দুজন বন্দি হলো
সেই শিকারির খাঁচায়,
তিনটি মেয়ের জামা-কাপড়
পড়ে থাকে মাচায়।


পরাজয়

আজ কানাডায় নির্বাচন।
কোথাও ‘আমার ভাই/ তোমার ভাই, আমার নেতা/ তোমার নেতা…’নেই
কোথাও স্লোগান, মিটিং, মিছিল, পোস্টার নেই,
মাইকিং নেই।
কিন্তু শরৎ-হেমন্তের সন্ধিক্ষণে
কোথায় যেন কি হচ্ছে!

আজ কানাডার নির্বাচন।
আজ আমি খুব নীরবে হেরে গেলাম তোমার কাছে!


দেশ বিভাগের গান

আমি তুমি যুক্তাক্ষর
একই সাথে মুক্তাক্ষর।

আমরা থাকি ভালোবাসার বন্ধনে।

আমি তুমি পানি-জল
মা-জননী নির্মল—

মায়ের মুগ্ধ আঁচল থেকে গন্ধ নে!

আমি তুমি এক-দুই
দুই দেশের এক ভূঁই,

নিজ দেশটা পরবাসী, ক্রন্দনে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

পৃথিবী

পৃথিবী

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৭:০০

আমি সাহিত্যের কোনো মনোযোগী পাঠক নই। পড়াশোনা নিতান্তই কম। আর খাপছাড়া। ভালো লাগা-খারাপ লাগা, সবটাই ব্যক্তিগত। পেছনে কার্যকারণের ধারাবাহিকতার দিকে নজর পড়ে সামান্যই। আর, আজকাল ইচ্ছাটাও মরতে বসেছে। চোখ-কান-মাথা জুড়ে আলসেমির দাপট। বাধা দেই না। স্বেচ্ছায় তাতে গা ভাসাই।
          ক’বছর আগে একটা বই পড়ি। দক্ষিণে সূর্যোদয়। লেখক, রাজু আলাউদ্দিন। আমি চমকে যাই। এই নামটার সঙ্গে সে-ই প্রথম পরিচয়। অথচ পরে জানতে পাই, তিনি অজ্ঞাত কুলশীল নন। কবিতা লেখেন। গদ্যও। কোনোটিই গতানুগতিক নয়। তেমন যে নয়, বইটির পাতায়-পাতায় তার ছাপ। মেক্সিকোয়-দক্ষিণ আমেরিকায় স্প্যানিশ ভাষার বিশাল সাম্রাজ্যে রবীন্দ্রনাথ যে একসময় আলোড়ন জাগিয়েছিলেন, তাই নিয়ে এই বই। অবশ্য সুতোর টানে খোদ স্পেনে হিমেনেথ দম্পতির ও আরো ক’জনের আগ্রহের ও আত্মস্থ করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আসে। এতদিন আমার জানা ছিল শুধু ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো-কথা। তাও স্প্যানিশ প্রেক্ষাপট মনে করে নয়। রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা ও ব্যক্তিমায়ার তৃপ্তিকর তথ্য হিসেবে। এখানে কিন্তু বিষয়মুখটা ঘুরিয়ে দেওয়া। দক্ষিণ আমেরিকায় স্প্যানিশ সাহিত্যের সৃষ্টিকুশলময় রবীন্দ্রনাথ কতটা প্রেরণা জুগিয়েছেন, অথবা, প্রতিহত হয়েছেন, সেটি ওই ভাষার সমকালীন সাহিত্যকাণ্ড বা পরবর্তী তর্ক-বিতর্ক থেকে আপন নিরাসক্তি পুরোপুরি বজায় রেখে তিনি সাবলীল দক্ষতায় সর্বাঙ্গীন করে ফুটিয়ে তুলেছেন। এমন বই আমি আগে পড়িনি। পরেও না। কিন্তু আমাদের দেখবার চোখ পুরোপুরি খুলে দেওয়ায় এ যে কী অসাধ্য-সাধন করে, তা ভেবে মনে বিস্ময় জাগে, কৃতজ্ঞ থাকি। তাঁর এই কাজের পেছনে একটা প্রেরণা, প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে, অনুমান, তাঁর জীবনসঙ্গিনী মেক্সিকো-কন্যা, যাঁর মাতৃভাষা স্প্যানিশ, বেড়ে উঠেছেন যিনি ওই আবহেই। সম্ভবত এর একটা পরিণাম, জেনে, অথবা না জেনে, রাজু আলাউদ্দিন এখন বহন করছেন বাংলা ও স্প্যানিশ, উভয় সাহিত্য-সংস্কৃতির ঐতিহ্যের স্বাভাবিক উত্তরাধিকার। বাংলায় তাঁর কাজে আলোর মিশ্র প্রকাশ ঘটে। তা আভিনব ও সমৃদ্ধ। আমাদের দৃষ্টি প্রসারিত হয়।
          শুধু এই কথাগুলো বলা আমার লক্ষ্য নয়। আসলে মূল কথায় আসার জন্য বলা যেতে পারে, এ গৌরচন্দ্রিকা। তিন বছর আগে তাঁর কবিতার বই একটি প্রকাশ পেয়েছে। নাম : ‘আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি’—সবই বাংলা কবিতা-ঐতিহ্যে বাগবিধিতে, স্বপ্নকল্পনায়, আত্মস্বরূপে নির্ভুল এই পরিচয়। কিন্তু তার পরেও ফল্গুধারার মতো শৃংখলা, সংযমও পরিমিতিবোধ যেন অন্তঃসলিলা বয়ে যায়, যা কবিকে আলাদা করে চেনায়। মনে হয় বাড়তি কিছু আছে।
          বইটির আর এক বৈশিষ্ট্য, এ দ্বিভাষিক। প্রতিটি কবিতার সঙ্গে তার ইংরেজি অনুবাদ আছে। তবে অনুবাদক আর একজন, নাম, বিনয় বর্মন। শুরুতে ভূমিকাও ইংরেজিতে তাঁর লেখা। অনুষঙ্গে, এই সময়ে বাংলাভাষার অন্যতম সেরা কবি মোহাম্মদ রফিকের সপ্রশংস মূল্যায়ন,—ইংরেজিতেই। যারা বাংলা জানেন না, তাঁরাও ইংরেজি মাধ্যমে কবিতাগুলোর সুর স্বাদ ও মূল্যায়ন একসঙ্গে পাবেন। আজকের বহুভাষিক বাস্তবতায় এর মূল্য কম নয়। এখানে এই বইটি নিয়েই আমার কথা। তবে তা শুরুর আগে আরো একটু আবোলতাবোল বকবক করে নেই। লেখার সবটাই যে তেমন হবে না, ঐ নিশ্চয়তা কিন্তু দিতে পারি না। ‘পড়েছি মোগলের হাতে…’ এই প্রবাদ বাক্যটির সবটা যেন অগত্যা যাঁরা পড়ছেন, তাঁরা অনিচ্ছাতে হলেও হজম করতে রাজি থাকেন। মিনতি আমার এইটুকু।
          আমরা জানি, কবিতার অনুবাদে তার অনেক লাবণ্য, অনেক সৌকর্য হারিয়ে যাবার আশংকা থেকে যায়। বিশেষ করে মূল ভাষা ও অনুবাদের ভাষা যদি দুই পরস্পর বিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক বলয়ে বিকশিত হয়ে থাকে। গীতাঞ্জলি পর্ব থেকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর কিছু কবিতা নিজেই ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। কিন্তু এতে তাঁর আত্মবিশ্বাস কখনোই খুব প্রবল ছিল না। শেষে হাল ছেড়ে দেন। যেটুকু অনুবাদ তিনি করেছেন একটু খুঁটিয়ে সেদিকে দৃষ্টি দিলে সহজেই ধরা পড়ে, বাংলায় পেলব বা গভীর অনুভবের দ্যোতনা ইংরেজিতে আসেনি। অনেক জায়গায় আক্ষরিক অনুবাদ কষ্টার্জিত বা কৃত্রিম। কোথাও কোথাও সংক্ষেপিত, ফলে তুলনায় আড়ষ্ট। উপমা-বা রূপকল্পনা হাস্যকরভাবে আবেগরিক্ত, ফলে মরা ডালের মতো নিষ্প্রাণ, অথবা আগাছার মতো শ্রীহীন। তারপরেও যদি তিনি ইংরেজি অনুবাদে নতুন মূল্য সৃষ্টি করে থাকেন, তবে তার কারণ তাঁর অলোকসামান্য প্রতিভা। একই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বিভিন্ন ভাষায় পারস্পরিক অনুবাদ সমস্যা এমন অসেতুসম্ভব হবার কথা নয়। য়োরোপ ও আমেরিকার ভাবনা ও কর্মপ্রবাহ গত প্রায় পাঁচশ বছরের যোগাযোগে বিষয়টি সেই-রকমই দেখায়। এই উপমহাদেশেও তেমনই হওয়া স্বাভাবিক। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশে এই লক্ষণ প্রত্যাশিতভাবে স্পষ্ট। কিন্তু ইংরেজির মাধ্যমে য়োরোপীয় সংযোগে এই ধারা এখন শীর্ণ। যদিও কথ্য সংস্কৃতিতে, সঙ্গীতে আদান-প্রদান আগের মতেই সচল। হয়তো যোগাযোগ আরো ব্যাপক। এখানে চলচ্চিত্রের অবদান কম নয়।
          কিন্তু য়োরোপ-আমেরিকান সাংস্কৃতিক বলয় এতটাই ভিন্ন ছিল যে সেখানে আমাদের পরম্পরার অভিঘাত প্রায় কিছুই কোনো দাগ কাটে না। যদিও উত্তমর্নের ভূমিকা এদেশের ওপরমহলে গ্রহণ-বর্জনে তারা যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। বেশ কিছু নিচু তলাতেও চুঁইয়ে পড়ে। পাশ্চাত্য সাহিত্য-সংস্কৃতির অনুবাদ ও অনুকরণ আমাদেরও কৌতূহল জাগায়। কিছুটা বা জীবনযাপনের অভ্যাসে মেশে।
          অবস্থার একটা গুণগত পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে গত শতকের আশির দশক থেকে। তার আগে সত্তরের দশকে তথ্য-প্রযুক্তিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন, চাই-বা-না চাই, পৃথিবীজুড়ে মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগে সম্ভাবনার বিচিত্র পথের দিশা চোখের সামনে এঁকে দেয়। নিজেরদের অজানতেই আমরা ঘর-বারের সীমারেখা মুছে ফেলতে থাকি। আপন-আপন ভাষায় প্রয়োগ কুশলতায় ও চিত্রকল্পনাতে এর অলক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু করে। ফলে তা সম্পূর্ণ আত্মসচেতন হয়েও বিশ্বের সংযোগে ভিড়ে যায়। অনুবাদের কাজ মূল কাঠামো ও মূল ভাবনার অনুসরণে পূর্ণ বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েও সহজ, সাবলীল ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। কবি বা অনুবাদক কাউকেই এজন্য আগের মতো সাংস্কৃতিক বিভিন্নতার দুর্ভেদ্য প্রাচীরের সামনে আটকে যেতে হয় না। অবশ্য অভিজ্ঞতা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কেউ যদি একুশ শতকে এসেও দেড় হাজার-দুজাহার বছর আগের মূল্যবোধের বোঝা ধ্রুবজ্ঞানে বয়ে বেড়াতে সদম্ভে খাড়া থাকেন, তবে তিনি এই প্রবাহে শামিল হতে পারেন না। পারেন না তাঁরাও, যাঁরা কূপমণ্ডুকতার স্বভাব থেকে বেড়িয়ে আসতে ভয় পান। রাজু আলাউদ্দিন এমন কোনোটিই নন। জীবনস্রোতে তিনি বিশ্বনাগরিক। ঘরের পরিবেশেও তারই অন্তরঙ্গ ছোঁয়া। একান্ত বাঙালি ভাবনাতেও তাঁর মিশে যায় এই সব। এদের পরিশ্রুত প্রবাহ কবিতায় তাঁর ভাষার নির্মাণ। ইংরেজি অনুবাদে তার স্বতঃস্ফূর্ত স্বাভাবিকতা ও মৌলিক সৌরভ অনেকটাই থেকে যায়। অনুবাদকের পরিচয় কিছুই জানি না। অনুমান, তিনিও একই পথের পথিক। মূল কবিতার আকর্ষণ, অনুভবের সূক্ষ্ম চলাচল, তিনি যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে বজায় রেখেছেন। এখানে অবশ্য তাদের নিয়ে আলোচনায় যাচ্ছি না। যাঁরা সত্যিকারের যোগ্য, তাঁরা তা করবেন।
          সাধারণত কবিতা ও গণিতের অহেতুসম্ভব ব্যবধান প্রসঙ্গে অনেকে বলে থাকেন, গণিতে পাই বিভিন্ন উপাদানের নানা রকম সম্পর্কে একক সমাধানের বা সমাধানরাশির প্রমাণ; আর কবিতা চলে অনুভবের মুক্তাকাশে ইচ্ছেমতো ওড়ার স্বাধীনতায়। এই বিভাজন যথার্থ কি না, এ নিয়ে সংশয় কিন্তু থেকে যায়। কবিতাও খোঁজে বাস্তবের বহুবিধ কল্পনায় অন্বয় ও অন্বয়ের অন্তর্জালে স্থিতি ও অস্থিতির বিন্যাস। প্রত্যক্ষের দৃশ্যাবলি ও কর্মচঞ্চলতা মায়া জাগায়। তাকে পূর্ণপ্রাণের সমারোহে জাগ্রত করে অন্তরালের সম্পর্ক-সম্বন্ধে কান পেতে গন্ধ-বর্ণময় ধ্বনির ঐশ্বর্যে অর্থের বা তাৎপর্যের শিল্পিত অন্বেষণে কবির অভিনিবেশ। গণিতে চলকরাশির মতি-গতি ও স্থিতি বা অস্থিতির সম্পর্কের নিষ্কাশনে যে তৃপ্তি, কবিতাতেও মায়ার আড়ালে রসের খেলায় অশেষের পেছনে ছোটায় সেই অন্তহীন যাত্রার আকর্ষণ। তবে গণিতের উপাদান বস্তুনিরপেক্ষ চিহ্ন বা সংখ্যা, যারা আত্মসাৎ করতে পারে বিশ্ব-মহাবিশ্বের যাবতীয় তাড়নার নিরাসক্তিকে; বিপরীতে কবিতার ভিত্তিভূমি ষড়ৈশ্বর্যশালিনী আসক্তির সমাহার। সেও ছোটে সচ্চিদানন্দ সমাহিতির খোঁজে। এই রকম ছোটার নমুনাই পেলাম রাজু আলাউদ্দিনের কবিতাগুলোয়। স্থান-কালের আড়াল থাকলেও বাণীরূপ তাকে অতিক্রম করতে চায়। বোধ হয় এই কারণেই এরা অধিকতর অনুবেদ্য। প্রকৃতি-পরিবেশের একান্ত সীমায় আটকে থাকে না। এই সীমাই কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে প্রতিহত করেছিল। তিনি অবশ্য আজকের প্রযুক্তিবিপ্লবে মানববাস্তবতায় প্রসারমান সমজাতীয়তা প্রত্যক্ষ করেননি।
          বইটির নাম—‘আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি’—এখানেই ‘ভালোবাসার ওক্সিমোরন’ কবিতাটির এক চরণ থেকে কেটে নেওয়া। ‘ওক্সিমোরন’ তাৎক্ষণিকভাবে শুধু ওই শব্দের ব্যবহারেই বৈপরীত্যে সামঞ্জস্যের ব্যঞ্জনা ইংগিতময় করে তোলে। এভাবে ইশারায় সমগ্রের বিশেষত্ব ফুটিয়ে তোলা, অথবা, তার কোন মেজাজে দৃষ্টি আকর্ষণ করা এই সময়ের কবিতায় নতুন তাৎপর্য আনে। অবশ্য তা প্রাণবান হলে তবেই। রাজু আলাউদ্দিনের এই কবিতাসংকলনে এর দক্ষ প্রয়োগ বারবার আমাদের মুগ্ধতা কেড়ে নেয়। প্রেক্ষাপটে বিবিধ বিচিত্র আলো ফোটে। বহুমুখে ধায়। অনুভবে প্রসারণ ও সংকোচন একই শব্দসীমায় ঘটে চলে। কৃত্রিম মনে হয় না। চেতনার স্বাভাবিকতাতেই এমনটি মানিয়ে যায়। যেমন ‘আকাঙ্ক্ষা’ অসীমের অভিসারী হতে পারে, আবার তাকে বিশেষ কোনো প্রত্যক্ষের অভিমুখীও ভাবা যায়। ‘মানচিত্রে’ সমুদ্র বইয়ের পাতায় কতটুকুই-বা জায়গা নেয়, কিন্তু বাস্তবে তার কূল-কিনারা মেলে না। ‘গোপনে আঁকা, আর, উত্তমপুরুষে বলা মুহূর্তে একে ব্যক্তির অস্তিত্বে, তার সমস্ত বৈপরীত্য ও বিপন্নতা নিয়ে, নির্দিষ্ট করে। আমরা বর্তমানের অনিশ্চিত সম্ভাবনা রাশি স্পর্শ করি। সম্ভাবনা ও প্রত্যাশা, উভয়ের সামনেই প্রশ্নবোধক চিহ্ন তোলে। কবিতায় কিন্তু ভারসাম্য বজায় থাকে। তারিফ করি। নতুন কিছু পাই। তা আমাদের কল্পনায় মানববাস্তবতাকে এক ইন্দ্রয়গ্রাহ্য সম্প্রসারিত, কিন্তু অন্তর্জগতে সতত পরিবর্তনশীল, প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে। বাংলাভাষার নিজস্ব সংবেদনশীলতা ও ঐতিহ্যলালিত পরিকাঠামো কিন্তু হারিয়ে যায় না। তারা বরং অভিনব অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়। সাহসীও।
          বইটির আরো অনেক কবিতা আমাদের চেতনায় আলোড়ন তোলে। কল্পমায়া ‘নূতন আভরণে’ নূতন রূপ পায়। বিশ্বাস বা অভ্যাসের জগতেও আকস্মিক হানা দিয়ে তাতে অপ্রত্যাশিত জীবনের স্পন্দন জোগায়। ‘ঢাল-তলোয়ার ঝনঝনিয়ে’ বাজে না। লাবণ্য অটুট থাকে কিন্তু পাঠাভ্যাসে ঝাঁকি দেয়। তা কল্যাণকর। সর্বান্তঃকরণে একে স্বাগত জানাই।
          সব কবিতাই কিন্তু এক একটি পূর্ণাঙ্গ সৃষ্টি। মেদহীন, স্বয়ম্প্রভ, মার্জিত ও ব্যাকুল। রজনিগন্ধা ফুলের মতো। কোনো নমুনা খাড়া করতে চাই না। প্রত্যেক কবিতার উপলব্ধি ও উপভোগ, তার সবটা নিয়ে। বিস্ময়ের সংযোজনাও। এদের খণ্ডিত করা সংগত মনে করি না।

মূল নাম : আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র গোপনে এঁকেছি। ইংরেজি নাম : Secretly have i drawn the Map of Desire. English Translation : Binoy Barman. Edited by Khaliquzzaman Elias. Published by Kheya Prokashan. First Published Ekushe Boimela, 2017. Cover : Masuk Helal. Price : 250.

/জেডএস/

সম্পর্কিত

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৬:২৫

উদ্ভিদ

এই অপরাহ্ণে কে কার জন্যে অপেক্ষায় থাকে?
যে ড‌াঙায় ছিপ ফেলে বসে থাকে অনন্তকাল 
তার কী জলে নামার কথা ছিল? না ধুলোঝড়ে
বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে এক
ঝলক চোখে চোখ রাখবার জন্য ব্যাকুলতা ছিল
নিছক প্রেমও আজকাল ঘোড়ারোগের মতন
দাঁড়িয়ে থেকে জাবর কাটতে কাটতে বুনোঘাস
সেখানে না থাকে ঘাসফড়িং না থাকে কাচপোকা
ধুলোবালির সংসারে অপেক্ষাও হাই তুলে বসে!
যে প‌ারে সে সব পারে খড়কুটো হয়েও টিকে 
থাকতে পারে! অসীম ধৈর্য যার থাকে তার জীবনও
বড় টেকসই; মুখোশ সরিয়ে সবুজ দিগন্ত দেখতে
পায়! হে সন্দেহ এসব ছোঁয়াচে উদ্ভিদের কাছে না 
গিয়ে জ্বলন্ত আগুন ছুঁয়ে দ্যাখো, ঝলসে যাওয়া
সময়ের ভেতরে আলো-অন্ধকার মর্মতলে বাজায়
ত্রিকাল মগ্ন সুর। সুন্দরের দিকে যত ছাইভস্ম উড়ে
এসে জুড়ে বসে কিরিচ হয়ে। দ্বিধার উপকূলে ঝরা
পাতাদের বিরহসঙ্গীত। বক্ররেখা থেকে চাঁদের নদীতে
যে নামে তার ক্ষতও নীলবর্ণ হৃদয়ের মতন। কোথাও
কী আচমকা অচেনা হাওয়া বয়ে গেল? না চূর্ণ হতে
হতে যে মানুষ হারিয়েছে গন্তব্য তার জন্য কোনো পথ
নির্দিষ্ট হলো? ভাদ্রের শেষ দিনে প্রাণের ওপর দিয়ে
তীর্থ যাবার বাসনা নিয়ে যিনি আগুনের গা ঘেঁষে 
বসেন তার জ্ঞান সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই।।


বৃক্ষ
 
মায়া আছে ছায়া নেই। আজকাল 
বৃক্ষরাও বেকেচুরে বসে। স্বার্থের ঘেরা
টোপে সম্পর্করাও মুখ ফিরিয়ে নেয় 
সময়ের কার্নিশ বেয়ে যে যায় সে যায়
শরতের এমন দিনে প্রগাঢ় শব্দে বাজে
আগুন লিরিক। পথের ওপর দিয়ে পথ
চলে যায়। জলের ক্রন্দনে ভাসে আলোর
গোলক, আত্মার ধ্বনি। তারপর একা
একা বহুদূর। যেদিকে তাকাই মুখোশ
ভর্তি মুখ আর বিষজল।সব জ্বালিয়ে
পুড়িয়ে ঘাতক থিতু হয়ে বসে।অস্তিত্বের
ভেতরে এত দাহ এত শূন্যতা বুঝিনি 
আগে। লোভের অনলে খাক হয়ে যাচ্ছে
মন, সময় ও বৃক্ষ। কৃতঘ্নর লোলুপ ক্ষুধা
রক্ত‌াক্ত করে তোলে দিগন্ত। যথারীতি
পরমায়ু খেয়ে ফ্যালে লোভার্ত কুমির
ভাবনার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে খণ্ডখণ্ড
পাথর, গন্তব্যের ওপর উৎকণ্ঠা হাঁ-মুখ
খুলে বসে। সব উপমা, ঘ্রাণ, সৌন্দর্য
অদৃশ্য হতে হতে অনিশ্চিত করে তোলে
মুহূর্ত। গন্তব্য বলতে দূরত্ব, হলুদ বৈভব


শহর

একটি শহর কীভাবে মানুষের মস্তিষ্ক ভোঁতা
করে দিতে পারে তা কী তুমি জানো? নানা
পদের মানুষ শহরভর্তি। মুখোশের আড়ালে
হিংস্রতা না দেখা অভিশাপ ধূসরতা বাঁচার
বিশ্বাস। চোখহীন চোখের যাতনা লোভের
আঙটায় ঝুলিয়ে অন্ধত্ব বরণ করে নিয়েছে
যে তাকে চক্ষুষ্মান করাও বড় কঠিন আজ
ডানা ভেঙে গেলে পাখিও মুখ থুবড়ে পড়ে
শহরের উপকণ্ঠে! নীলাভ শূন্যতা কয়েদির
ম্লান হাসির সাথে দগ্ধ হতে হতে বিমূঢ় হতে
থাকে। সেই আমার বলতে আমি! নিঃসঙ্গতা
দগ্ধ পথরেখা ভাদ্রের ধূম্রজাল করোনার ক্ষীণ
ইতস্তত দ্রোহ জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে শহরকে
বৈষম্যে মুড়িয়ে দিতে উদ্যত। কী অনুচিত তা
কী শহর বোঝে? না তুমি? মধ্যদুপুরে ভাঙা
চশমার আর্তনাদ না দেখা অরণ্য ন্যায় ও
অন্যায়ের মুখোমুখি বসে। এত জটিলতা 
ভালো নয় জেনো, বিবরণের সরলীকরণ
ভালো যদিও প্রত্যাশার পরিমাপ নীতিশাস্ত্র
বোঝে না। কালের আয়নায় দ্যাখো সংসার 
সঙ সেজে উঠে যাচ্ছে যাত্রামঞ্চে। চারদিকে
এত অসঙ্গতি এত লোভ কোনো নিবৃত্তি নেই

/জেডএস/

সম্পর্কিত

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:২০

নেফারতিতি

জানি, রাজ্ঞী নেফারতিতি, চৌষট্টি কলায় পারদর্শী।
ক্ষীণকটি তনু তন্ত্রে জগৎ এখনও মন্ত্রমুগ্ধ,
ফারাওর রক্তস্রোত বাঁধা ছিল তোমার স্নানদৃশ‍্যে
শারীরিক অনুবাদে কত কবি বিষণ্ণ উন্মাদ।
স্বপ্নোপম রূপজ্ঞানে যত বাক‍্যাবলি অধীনস্থ
বহ্নি রহস‍্য কান্তায় ঝলসে ওঠে পুরুষ হৃদয়।
নয় মিথ্যা অহংকার। মিশরীয় সভ‍্যতার মাথা
নত সম্রাজ্ঞী চরণে। দূর ভবিষ্যৎ দ‍্যুতিময়।
কী করে সম্ভব হলো! চিরন্তন পুরুষ শাসনে
সে আয়ত্তাতীত দেবী গূঢ় রাজকার্যে সর্বেসর্বা!
দু’চোখের নীল শর্তে আখনাতেন সম্মোহিত, যেন
ভ্রুভঙ্গের স্থিতি ফুঁড়ে ছুটে আসে ধনুকচ‍্যুত তির।
জাদুবিদ্যা দৃশ‍্যভ্রম। প্রাচীন ধর্মের কড়া নেড়ে
জাগছে দেবতা আতেন! তরুণ সূর্যের প্রেমে রানি!
পুরুষ–প্রধান দেশ অধিষ্ঠিত নারীর আশ্রয়ে!
মনুষ্য নখের ধারে ছিন্নভিন্ন ক্ষমতা বিন‍্যাস।
নির্বাক, নিস্পন্দ চোখে শবাধারে মিশর সুন্দরী!
প্রিয় দেবী নেফারতিতি অসতর্কে প্রস্তর পুত্তলি।

               
সুমোহিনী ভেনাস

হে স্বর্ণকেশী সুন্দরী, তুমিই কী মোহিনী ভেনাস!
অপরূপা চুপ কেন? অমন কটাক্ষে কোটি কোটি
পুরুষের নিদ্রাভঙ্গ। তন্বী, তুমি শিখরদশনা
চিত্রশিল্পী বতিচেল্লি বিমুগ্ধ বিস্ময়ে এঁকেছেন
ওই সৌন্দর্য-ফোয়ারা। নগ্ন দেহে সমুদ্র জাতিকা।
কুচযুগ পক্ব আতা, রতিমন্ত্রে শ্রেষ্ঠ সুমোহিনী
যেন অনন্ত কৌতুক খেলা করে বিম্ব ওষ্ঠাধরে।
যোনিপুস্প ঢাকা দিতে নিজ কেশ টানো দিগম্বরী!
কী অমেয় রূপরাশি! মোহে বুঁদ ত্রিলোক-পুরুষ
তুমি জগৎ বন্দিতা, শশিবাক‍্যে শ্রেষ্ঠ হে বিদূষী।
তবে কোন্ অভিশাপে রাজকুমারী মিরহা শ্রান্ত বৃক্ষ?
এত ঈর্ষাপরায়ণ! মহোদয়া এত, এত ক্রোধ!
কোথাও উঠেছে প্রশ্ন, পরঃকামে স্খলিতা ভেনাস।
যতসব ক্ষুদ্র মনা বিশ্ব নিন্দুকের কথা থাক।
জানি, হে প্রসন্নময়ী, ভুল তব শৃঙ্গারশতকগাথা।
এসো দেবী বঙ্গদেশে। স্থিত হও মাতৃকা আমার,
বিশ্বখ্যাত আ্যডোনিস ধীরে ধীরে নিঃশব্দ প্রণয়ে
ধ্রুব বিষ্ণু অবতার। তুমি তার প্রিয়া বরণাভী।
দেখো পবিত্র গোলাপ দেব মন্ত্রে প্রফুল্ল কমল
অপরূপ পুন্যব্রতে তব হংসী শ্বেত লক্ষ্মীপেঁচা 
আফ্রোদিতি কেন ভাবো এ তোমার দীর্ঘ পরবাস!
সুবর্ণ আপেল নয়, স্পর্শ নাও ধান‍্যের সুবাস।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

আমি মুখ খুলতে চাই না : নাদিয়া আঞ্জুমান

পৃথিবী

পৃথিবী

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

অন্নজল ও অন্যান্য কবিতা  

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

একদিন দিনে চাঁদ ফুটবে

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

রাজু আলাউদ্দিনের আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র…

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

বাঁশপাতার ভেতরে ভেসে যাবার প্রাক্কালে

সুমোহিনী ভেনাস

সুমোহিনী ভেনাস

আমার B ও ৯
সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

পর্ব—তিনসাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

তুমি নামের অচেনা কেউ

তুমি নামের অচেনা কেউ

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

করিমের সহজ-স্বভাবী গান

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

ভাষার নাম পাই (PIE) ।। গাস্তঁ দোরেন

সর্বশেষ

চীন কখনও কর্তৃত্ব চাইবে না: শি জিনপিং

চীন কখনও কর্তৃত্ব চাইবে না: শি জিনপিং

বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেলো স্বামী-স্ত্রীর

বিদ্যুৎস্পৃষ্টে প্রাণ গেলো স্বামী-স্ত্রীর

ঘরের আড়ায় ঝুলছিল মা, বিছানায় শিশুর লাশ

ঘরের আড়ায় ঝুলছিল মা, বিছানায় শিশুর লাশ

ভালো স্কোর করতে পারেননি রোমান সানা

ভালো স্কোর করতে পারেননি রোমান সানা

সৌদিতে বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে পড়ে বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যু

সৌদিতে বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে পড়ে বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যু

© 2021 Bangla Tribune