X
বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১, ১১ কার্তিক ১৪২৮

সেকশনস

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (২)

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৮:০৮

মাকসুদুল হক ‘তোমার এই খেলাঘরে শিশুকাল কাটিল রে,

তোমারি ধুলামাটি অঙ্গে মাখি ধন্য জীবন মানি’– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

১. গেলো সপ্তাহের লেখায় দৃঢ় প্রত্যয়ে বলেছিলাম, বাংলাদেশ নিয়ে কোনও ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব না; ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম এই সপ্তাহে তা নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করবো। তবে, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ যখন লিখতে বসেছি, কাকতালীয়ভাবে একটা ‘ভীতিকর’ ভবিষ্যদ্বাণী ফের চোখের সামনে এসেছে।

বিশ্বব্যাংক ১৩ সেপ্টেম্বর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলছে, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০-এর ভেতরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় প্রায় ২ কোটি মানুষ অভিবাসন করবে। একই সময়ে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অর্ধেক জনগোষ্ঠী ওই একই কারণে ‘সম্ভবত’ অভিবাসন করবে।’

বাংলাদেশে সম্ভবত এই ভয়াল চিত্রের মূল কারণ বলা হচ্ছে, নদীমাতৃক দেশটি পানির স্বল্পতা বা অভাব দেখা দেবে, খাদ্যশস্য ফসলের বিনষ্ট বা ধ্বংস হবে, ভূমি হ্রাস হবে ও বঙ্গোপসাগরের পানি অধিক বৃদ্ধি পাওয়াসহ ঝড়, সাইক্লোন, সুনামি ইত্যাদির মতো চরম প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা ঘটবে।

শুধু তা-ই নয়, বলা হচ্ছে, এসব ঘটনার হটস্পট দেশগুলোকে চিহ্নিত করা যাবে ২০৩০ সালে, অর্থাৎ আগামী ৮ বছরের ভেতরে। ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বকোণে ধান চাষাবাদ করা অঞ্চলগুলো থেকে এই অভ্যন্তরীণ অভিবাসন প্রক্রিয়া সূত্রপাত হবে।

উল্লেখ্য, বহু বছর আগেই ভবিষ্যদ্বাণী দেওয়া আছে– ২০৫০ বা ২৯ বছরের ভেতরে বাংলাদেশের মাটির আয়তনের প্রায় অর্ধেক বঙ্গোপসাগরের নিচে তলিয়ে যাবে। তাই আগামী ৮ বছরে বাংলাদেশ যে জলবায়ু পরিবর্তনের হটস্পট হতে যাচ্ছে তা পশ্চিমা ‘বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ’ থেকে বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য বিশ্বাস না করা ছাড়া এই মুহূর্তে আমাদের কি কিছু করার আছে?

২. তবে আশার আলো এক জায়গায়।

বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে হাত গুটিয়ে বসে নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মতো এ নিয়ে আমাদের চলছে শক্তিশালী লবিং ও জাতিসংঘ ছাড়াও পৃথিবীর অন্যান্য ফোরামে বাংলাদেশ ও তার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরব উপস্থিতি আমাদের প্রস্তুতি ও দাবি দাওয়া বিষয়ে কোনও রকম ছাড় দিচ্ছে না।

ভবিষ্যতের এই সম্ভাব্য বিপর্যয় রুখে দেওয়ার জন্য যত রকম দেনদরবার করা তা চালিয়ে যাচ্ছে ও বাংলাদেশ অগ্রিম ‘ক্ষতিপূরণ’ দাবি করছে। যেহেতু উন্নত প্রথমা বিশ্বের ধনী দেশগুলোর পরিবেশ সংক্রান্ত দায়িত্বহীন আচরণ, তাদের ভোগবাদী সামাজিক ব্যবস্থা ও যাচ্ছেতাই ব্যবহারের জন্য আমাদের আগামীর দিনগুলো প্রশ্নবিদ্ধ– এই ক্ষতিপূরণ দাবি করা অবশ্যই যৌক্তিক, মানবিক ও আন্তর্জাতিক আইনসম্মত।

এই বিপর্যয় মোকাবিলা করার জন্য যে পরিমাণ অর্থের জোগান প্রয়োজন, তার তুলনায় প্রাপ্ত অর্থ অপ্রতুল ও স্বল্প হলেও তা নিয়েই মাঠ পর্যায়ের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। কিন্তু উন্নত দেশগুলোর ১০০ বিলিয়ন ডলার প্রদানের প্রতিশ্রুতি এখনও সুরাহা হয়নি ও এ নিয়ে তাদের গড়িমসি খুবই লজ্জাজনক।

তবে ইতিবাচক বিষয়টা হলো, বাংলাদেশ কারও কাছে কোনও দান-খয়রাত চাচ্ছে না। আবারও বলছি–চাচ্ছে উন্নত দেশগুলোর বেপরোয়া ও প্রকৃতির প্রতি যে কেয়ারলেস এবং বিধ্বংসী আচরণ, যার বলি আমাদের মতো সমুদ্র উপকূলীয় দেশের মানুষেরা তার ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও সেই প্রয়াসে তার স্বচ্ছতা, বুদ্ধিমত্তাসহ বলিষ্ঠ পররাষ্ট্রনীতির ছাপ রাখে।

৩. যেহেতু বাংলাদেশ পৃথিবীর কোনও দেশ বা জাতিকে স্বেচ্ছায় বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কোনও ক্ষতিসাধন করেনি– আমাদের স্বকীয় জলবায়ু নীতি ও ভূমিকা ‘রোল মডেল’ হিসেবে সমগ্র বিশ্ব এখন সূক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে অবলোকন করছে ও তা প্রশংসিত হচ্ছে।

তবে মূল বিষয়টা হচ্ছে– যুগ যুগ ধরে ক্ষমতার দাপট, যুদ্ধ ও দাঙ্গা বাঁধিয়ে সমগ্র অনুন্নত ও দরিদ্র দেশগুলোর ওপরে ছড়ি ঘুরিয়ে দাম্ভিকতায় মাতাল উন্নত দেশগুলো আজ প্রকৃতির ভয়াল ছোবল ও প্রতিশোধের সম্মুখীন।

ধরিত্রী মাকে ‘ক্রয়’ করে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যর্থ চেষ্টা করলেও প্রকৃতিকে যে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না ও মানুষ যে ‘প্রকৃতিরই দাস’ এই সত্যের উপলব্ধিতে আজ সমগ্র বিশ্ব শঙ্কিত।

গেলো ১৮ মাসে করোনা ও কোভিড ১৯-এর ভয়াবহতায় যখন পৃথিবী হিমশিম খাচ্ছিলো, আমরা ঠিকই লক্ষ করলাম ধনী দেশগুলোর ওপরে প্রকৃতির নিদারুণ প্রতিশোধ।

সমগ্র ইউরোপসহ অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রাজিলে অপ্রত্যাশিত বনঅরণ্যে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা, বন্যা, চরম তাপ উত্তাপ একদিকে, অপর দিকে শৈত্যপ্রবাহসহ লাগামহীন তুষারপাত ইত্যাদি ছাড়া  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গেলো মাসে ঘটে যাওয়া তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বিভীষিকাময় টর্নেডো ও বন্যা কি প্রমাণ করে না যে প্রকৃতিরও ধৈর্যের ও সহ্যের সীমা আছে, প্রকৃতি তার নিজের নিয়মে চলে, মানুষের নিয়মে না?

পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোর এত বুদ্ধি, এত মেধা, এত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, এত প্রযুক্তির নির্ভরতা, এত যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার, এত নিরীহ মানুষ হত্যা করার পর, তাদের এই ‘নব্য উপলব্ধি’ ও প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ সত্যি প্রমাণ করে বিশ্ব আজ এক অভূতপূর্ব অধ্যায়ে অনুপ্রবেশ করেছে, যা আমাদের পূর্বপুরুষ ও প্রজন্ম কখনোই কল্পনাও করতে পারেনি।

হিতার্থে একটি কথা পরিষ্কার– প্রকৃতি তার প্রতিশোধ অবশ্যই নেবে ও তা নিতে সে ঠিক এই মুহূর্তে বদ্ধপরিকর।

৪. প্রকৃতি প্রতিশোধ কেনই বা নেবে না, যখন পশ্চিমা বিশ্ব প্রযুক্তি দ্বারা দূরবর্তী দেশগুলোতে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘটনা, যেমন- ঘূর্ণিঝড় এমনকি ভূমিকম্প ঘটাবার ক্ষমতা রাখে? প্রকৃতিকে যে  ‘ওয়াপনাইজ’ করা হচ্ছে,  তার যথেষ্ট আলামত থাকা সত্ত্বেও, প্রকাশ্যে তা নিয়ে কোনও আলাপচারিতা নেই কেন?

কোভিড-১৯ ভাইরাস দ্বারা উন্নত দেশগুলোর সমগ্র মানবজাতির ওপরে চলমান জুলুমের প্রতিশোধ যে শুরু হয়ে গেছে তা সন্দেহাতীত। এই কথার সত্যতা পাওয়া যাবে আমার আগের অনেক লেখায়। উন্নত দেশগুলোর করোনার শুধু মৃত্যুর হার অনুন্নত দেশগুলোর সঙ্গে যদি তুলনা করা যায়– তা কি যথেষ্ট প্রমাণ নয়?

বাংলাদেশের মানুষকে খুন করে, আমাদের অর্থনীতি ও হতদরিদ্রের ভাগ্য ধ্বংস করার এই নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্রে–(করোনার শহীদদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি) আমাদের ৩০,০০০-এর কিছু বেশি মৃত্যু যে আলবৎ একটা ‘বিশ্ব রেকর্ড’ তা কি ‘থানাটোফোবিয়া’ (মৃত্যু আতঙ্কের মানসিক রোগ) ছড়ানো মিডিয়া স্বীকার করবে–তা নিয়ে দুই লাইন প্রশংসা কোথাও কি কেউ দেখেছেন, শুনেছেন?

৫. তাতে কি এ প্রমাণ হয় না যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘ফলো দ্য সায়েন্স’ বা বিজ্ঞানকে অনুসরণ করো প্রোপাগান্ডামূলক ভবিষ্যদ্বাণী বাংলাদেশের আপামর জনগণ প্রত্যাখ্যান কেবল করেনি, সে তা প্রতিহত করেছে তার আত্মার শক্তি দিয়ে, তার প্রকৃতি ও গরিমা সংস্কৃতি, এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ- তার মাটির খুব কাছাকাছি থেকে?

বাংলাদেশের মাটি কতটা ‘পবিত্র’ তা কি আমরা চিন্তায় রাখি?

এই মাটিতে প্রতি ৫ কিলোমিটার অন্তর অন্তর হাজারও মহামানব, আধ্যাত্মিক সাধক, পীর, গুরু, সন্ন্যাসী, আউলিয়া, কামেল, সাঁই,  ফকির, দরবেশ, ওলামায়ে একরামগণ ‘চিরজাগ্রত নিদ্রায়’ শায়িত আছেন। এই বুজুর্গরা যে আমাদের দরিদ্রের ভাগ্যের ওপর সব সময় কড়া নজর রাখছেন তা আমরা না বিশ্বাস করি, না আছে আমাদের কোনও প্রকার ভক্তি-শ্রদ্ধা।

বলুন দেখি– কোন পশ্চিমা দেশে তাদের নিজস্ব পবিত্র আত্মাগণ তাদের মাটি পবিত্র করেছেন? যা আছে অতি নগণ্য, বা নেই বলা যায়। নেই বিধায় সেই দেশগুলোতে ভারতীয় উপমহাদেশের শত শত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিবর্গ, গুরু, সুফিদের আনাগোনা।

৬. এসব কথা কেবল চিন্তার খোরাক নয়, এ বাস্তব উপলব্ধির দর্শন, যা আমাদের ‘অতি ফ্যাশনেবল’ শহুরে না রাজধানীকেন্দ্রিক মানুষের নেই কোনও জ্ঞান, নেই কোনও জানার আগ্রহ বা প্রচেষ্টা।

সব কিছুই ‘অবৈজ্ঞানিক ও কুসংস্কর’ বলে গরিমা সংস্কৃতিকে তুচ্ছ করে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিশ্বাসকে অবজ্ঞা করে, আজকের সমাজের, আজকের প্রজন্মের কৃত্রিমতায় সৃষ্ট অসংবেদনশীলতা গেলো ১৮ মাসে আমরা দুঃখভারাক্রান্ত চিত্তে নীরবে প্রত্যক্ষ করলাম।

‘মূল্যবোধের অবক্ষয়’– তা নিয়ে না হয় কিছুই বললাম না। নিজেদের জাতি, নিজের মাটি বা নিজেদের মূল্য আসলেই কী, তা যেহেতু জানা, বোঝার ইচ্ছাটুকুই নেই, মূল্যবোধের এসব ‘ফাঁকা বুলি’ আওড়ানোর কোনোই অর্থ হতে পারে না।

৭. আমি বারবার বলেছি, কোভিড-১৯ কোনও ভাইরাস নয়, এ হচ্ছে ‘মনস্তাত্ত্বিক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ এবং তা যে শেষ হয়ে গেছে, তা মনে করা অকালপক্বতা বা ভুল হবে না, তা হবে ক্ষমা অযোগ্য পাপ। শত্রু আমাদের সহজে ছাড়বে না এবং নতুন নতুন ‘প্যাকেজড’ মৃত্যু ও জীবন জীবিকা হারানোর আতঙ্ক ছড়িয়ে আমাদের ‘দৌড়ের ওপরে’ রাখবে।

একই ধারাবাহিকতায় বিশ্বব্যাংকের এই নতুন ভবিষ্যদ্বাণী যে সেদিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে তা বুঝতে নিঃসন্দেহে আমাদের খুব বেশি বেগ পেতে হবে না।

সব ভালোর যেমন শেষ আছে, সব খারাপেরও শেষ আছে– প্রশ্ন হচ্ছে সব সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের হাজার বছরের অধিক দুর্দিনের সমাপ্তি কি ঘটবে না?

তার নিপীড়িত, হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের কি কখনও কোনও দৃশ্যমান ও উপযুক্ত পরিবর্তন আমরা আশা করতে পারবো না?

আমাদের জীবনদশায় স্থায়ী পরিবর্তন আমরা কি দেখে যেতে পারবো, নাকি ‘দারিদ্র্য মোচন’র কথা বলার পর দরিদ্র প্রান্তিক জনগাষ্ঠীর ‘ভিক্ষার থালা’ পেটের ক্ষুধা, ও শিশুদের আর্তনাদ হয়ে থাকবে সব সময়কার জন্য জাতির ‘স্থায়ী প্রতীক’?

আমাদের ধনী গরিবের যে আকাশচুম্বী বৈসাদৃশ্য, যা দেখে আমরা বহুকাল ধরে অভ্যস্ত হয়ে গেছি- বা ‘গরিব তো না খেয়ে মরবেই’র মতো অপবিত্র উচ্চারণ, তা কি হয়ে যাবে আমাদের ‘জাতীয় মুদ্রাদোষ’?

‘সোনার বাংলা’র স্বপ্ন কি জাতীয় সংগীতের ৮ লাইন পর্যন্ত সৌজন্যমূলক সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ থাকবে, নাকি সমগ্র বাঙালি জাতি বিশেষ করে তার ৯০ ভাগ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আরেকবার সব অন্যায়, সব জুলুম, সব অবিচার, সব বৈষম্যের বিরুদ্ধে মাথাচাড়া দিয়ে ফের জেগে উঠবে তার ন্যায্য হিস্যা বুঝে নিতে?

যে ভবিষ্যদ্বাণী পশ্চিমা বিজ্ঞান আমাদের দিচ্ছে তার উল্লেখযোগ্য ও পরিতৃপ্তির বিষয়টা হলো, ‘যাহা কিছু ঘটিবে তা রাতারাতি ঘটিবে না’– ঘটবে ধীরে বহু ধীরে, বলা হচ্ছে ৮ থেকে ২৪ বছর সময়কাল ধরে।

তা খুবই ভালো কথা, কারণ এর উপসংহার: আজকের, এই মুহূর্তের পৃথিবীর বায়ুদূষণের মাত্রা, তা সত্য হোক আর মিথ্যাই হোক, তা নির্ণয় করেই এসব ফাজুল কথা বলা হচ্ছে।

৯. কিন্তু এমন কোনও গ্যারান্টি কি বিজ্ঞান আমাদের দিতে পারবে যে মানুষসৃষ্ট কোনও ‘আকস্মিক ঘটনা’ যেমন পারমাণবিক বোমা বা কোনও ‘অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনার’, আরেকটি প্যান্ডামিক, আরেকটি ছোট মাঝারি বা বড় যুদ্ধের কারণে প্রকৃতির এই ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়া ‘ত্বরান্বিত’ হবে না?

প্রথমা বিশ্বের সব কথা, নির্দ্বিধায়, বিনা প্রশ্নে আমরা কি কারণে এতটা ‘অকুণ্ঠ ইমান’ নিয়ে বিশ্বাস করছি, যখন অতীত ও সাম্প্রতিক ইতিহাস বলছে তার কোনও কথাই বিশ্বাসযোগ্য না, এবং এই ‘নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার’-এর সবচেয়ে দুর্বিষহ অস্ত্র হলো মিথ্যা?

তাছাড়া রয়েছে মিডিয়া ও হাতের গণনায় অতি নগণ্য তথাপি তোষামোদকারী ‘চামচা শ্রেণি’র ‘ক্ষমতাবান ও প্রতিপত্তিশালী’ মানুষ ও তাদের হীন চক্রান্ত ও ব্যক্তিস্বার্থ, যে শ্রেণির বাংলাদেশেও কোনও কমতি নেই।

আমরা কি এতটাই ‘বেকুব’ যে এও জানি না সমগ্র বিশ্বের অর্ধেক সম্পদের মালিকানা মাত্র ৮ জন ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত? তারা ট্যাক্স ফাঁকি দেয় ও দরিদ্রের মজুরি সর্বনিম্নে নামিয়ে, রক্ত চুষে মুনাফা করে ও ক্ষমতার জোর খাটিয়ে রাজনীতি, রাষ্ট্র ও সমাজকে প্রভাবিত করে– নিয়ন্ত্রণ করে?

বাংলাদেশে যাদের আমরা ‘বহুজাতিক কোম্পানি’ বলি ও তাদের গোলামি করার সুযোগ পেলে নিজেদের ধন্য মনে করে বাহবা দিতে থাকি– তারাও যে ওই একই গরিবের রক্তচোষা যন্ত্রের ‘চালিকাশক্তি’- তা কি আমরা টের পাই?

১০. দয়াল আমাদের ক্ষমা করুক– যদি আসলেই কোনও অভাবনীয় বা অকল্পনীয় ঘটনা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঘটে যায়, যদি আক্ষরিক অর্থে বাংলাদেশের অর্ধেক জনগণ বুঝতে পারে তাদের ‘পায়ের নিচে মাটি নেই’ বা জল এসে তার ‘পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে’, তখন সে কি ‘ইয়া নপসি ইয়া নপসি’ জিকির করবে নাকি অন্যত্র, অন্য দেশে পালাবে?

কার সঙ্গে সে তখন যুদ্ধ করবে যখন শত্রু কোভিড-১৯-এর মতো ‘অদৃশ্য’, যখন শত্রু তার একটি মিথ্যা বাঁচিয়ে রাখার জন্য হাজারও নতুন মিথ্যা, ঘণ্টায় ঘণ্টায়, মিনিটে মিনিটে, সেকেন্ডে সেকেন্ডে আবিষ্কার করে প্রয়োগ ও নির্বিচারে ব্যবহার করবে?

আদতে আমাদের পালানোর কোনও পথ কি খোলা আছে, নাকি আমরা ‘এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি’ গাইতে গাইতে চোখ বুজে ‘না ফেরার দেশে’ গমন করবো?

১১. আপনারাই ভেবে বলুন তো– কোন পার্শ্ববর্তী ‘বন্ধুপ্রতিম’ দেশ বা রাষ্ট্র আমাদের ২ কোটি মানুষকে স্থায়ীভাবে থাকার জন্য জায়গা বা কর্মসংস্থান করে দেবে, যখন সবাই নিজেদের আখের গোছানো নিয়ে থাকবে ব্যস্ত?

উদাহরণস্বরূপ– প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা এসে আমাদের সীমান্তে প্রাণ বাঁচানোর দায়ে পৌঁছানো মাত্রই আমরা দ্বার খুলে দিয়ে ‘মানবিক’ আচরণ করি।

‘ও মা গরিবের ধন যা আছে তাই দিবো চরণ তলে’– আমাদের গরিবের সীমিত সম্পদের চাপ থাকা সত্ত্বেও তাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে চলছি বছরের পর বছর।

এই মানুষগুলোকে না মিয়ানমার ফেরত নিচ্ছে, না কোনও পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র, না বিশ্বের অন্য কোনও দেশের আছে মাথা ব্যথা, না কেউ এগিয়ে আসছে তাদের অভিবাসনে সাহায্য করার জন্য।

বলা হচ্ছে, তারা মুসলিম হওয়ার কারণেই তাদের ভিটামাটি থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে, তাদের ওপরে চলেছে গণহত্যার মতো জঘন্যতম অপরাধ।

সবই সত্য, সবকিছুই মেনে নিলাম– কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ‘এক দেহ, এক মন, এক ভাগ্য’ দাবিদার বিশ্বভ্রাতৃত্ব, তথাকথিত ‘মুসলিম উম্মাহ’ আজ কোথায়?

১২. কোনও রোহিঙ্গাকে এ পর্যন্ত কি কোনও মুসলিম রাষ্ট্র নিয়ে গেছে? যখন মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশের সম্পদ, বা জমি তাদের চাহিদার অতিরিক্ত আছে, যখন তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, চাষ আবাদ থেকে শুরু করে গৃহপরিচারিকা, ড্রাইভার, মালি, দোকানপাটের সেলসম্যান পর্যন্ত সবই বিদেশি শ্রমিকদের ওপরে ৮০ ভাগ বা তার ঊর্ধ্বে নির্ভরশীল?

যখন সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভিনদেশের অভিবাসীর সংখ্যা তার নিজস্ব নাগরিকের চেয়ে অনেক বেশি।

খুবই দুঃখজনক হলেও কথাটা সত্য; যতই আমরা ইসলাম বা মুসলিমত্ব নিয়ে বড়াই করি না কেন, অঢেল ধন সম্পদ, তেল, স্বর্ণ, হীরা, জহরত এমন কি সুলাইমান নবীর গুপ্তখনি আরব দেশে আবিষ্কার হয়েছে এ গুজব থাকলেও, অন্য মুসলিমের বিপদে এসব মুসলিম সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে, তেমনটা দেখা যায় না।

অতি সম্প্রতি ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান ইত্যাদি দেশগুলোর মুসলিম জনসাধারণ যুদ্ধ থেকে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে পায়ে হেঁটে হলেও হাজার হাজার মাইল পথ ধরে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা তার জাতশত্রু ‘ইহুদি, খ্রিষ্টান, নাসারা’র দেশ তথা ইউরোপ বা আমেরিকাতে ছুটবে। ভুলেও দেখবেন না তার পার্শ্ববর্তী কোনও মুসলিম রাষ্ট্র স্থায়ীভাবে তাদের থাকার কোনও সুবিধা করছে বা তার কষ্টের ভাগ নিচ্ছে।

গেলো মাসেই আমরা দেখলাম ১ লাখ ২০ হাজারের ও বেশি আফগান মুসলিম প্রাণ নিয়ে কাবুল থেকে ইউরোপ ও আমেরিকার বিমানে চড়ে পালিয়েছে– কোনও মুসলিম দেশে নয়।

ধর্ম আজ রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার হচ্ছে, কিন্তু ইসলামসহ প্রতিটি ধর্ম আদতে এসেছে মানব কল্যাণের উদ্দেশ্যে।

ধর্মীয় শিক্ষা, ধর্মীয় অনুভূতি, ধর্মীয় অনুশাসন, ধর্মীয় জিহাদ, এমনকি ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’ আমরা মুখে মুখে ঠাওরালেও ধর্মের মূল বাণী থেকে পশ্চিমা প্রহসন, উসকানি ও বেকুবির কারণে আমরা বহু দূর সরে গেছে।

আজ পশ্চিমা দেশগুলোর শক্তির মূল সম্বল ও সম্মান তার জনগণের আর্থিক সচ্ছলতা।

যদিও পবিত্র কোরআন বলছে, ‘সৃষ্টিকর্তা ব্যক্তিদারিদ্র্য বরদাশত করেন না’– এই সমমাত্রিক মূল বাণীটি মুসলিম নয়– অমুসলিম ইউরোপীয় দেশগুলো (কানাডা) কাজে লাগিয়ে - সৃষ্টি করেছে ‘সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার স্টেট’ বা সামাজিক কল্যাণ রাষ্ট্র।

প্রতিটি নাগরিকের জীবন, জীবিকা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা সুনিশ্চিত করে রাষ্ট্র। তার ওপরে আছে বেকারত্বের ভাতা।

তেমন সামাজিক কল্যাণ রাষ্ট্র কোনও মুসলিম দেশে আজ ১৫০০ বছরেও দেখা যায়নি।

মুসলিম প্রধান বাংলাদেশ কি সে রকম একটা রাষ্ট্র সৃষ্টি করে সমগ্র বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিতে পারবে না?

আমি মনে করি, সদিচ্ছা থাকলে ইনশাআল্লাহ পারবে!

(চলবে)

লেখক: সংগীত শিল্পী

 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (১)

করোনার করুণ কাহিনি: ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ (১)

করোনার করুণ কাহিনি: গালি, তালি, পরীমণি ও প্রজন্মের বিদ্রোহ

করোনার করুণ কাহিনি: গালি, তালি, পরীমণি ও প্রজন্মের বিদ্রোহ

করোনার করুণ কাহিনি: করোনা কি বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়েছে?

করোনার করুণ কাহিনি: করোনা কি বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়েছে?

করোনার করুণ কাহিনি: তালেবানের কাবুল দখল ও ‘ইয়াঙ্কি জিহাদি’

করোনার করুণ কাহিনি: তালেবানের কাবুল দখল ও ‘ইয়াঙ্কি জিহাদি’

পুলিশি পাহারায় ধর্মচর্চা!

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১৬:৩৩

আনিস আলমগীর কবি নির্মলেন্দু গুণ ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়ে বলেছেন- ‘পুলিশ প্রটেকশনে নো দুর্গাপূজা।’ এখানে ক্ষান্ত হননি বাংলাদেশের জনপ্রিয় কবি। তিনি যুক্তি হিসেবে বলেছেন, ‘আগামী বছর থেকে হিন্দুরা যদি পুলিশ প্রটেকশন ছাড়া দুর্গাপূজার আয়োজন করে, তবেই শুধু আমি দুর্গামণ্ডপে পূজা দেখতে যাবো। অন্যথায় নয়। পাকিস্তান আমলে, আমার ছোটবেলায় পুলিশ প্রটেকশন ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা হতে দেখেছি। দুর্গাপূজার পবিত্রতা রক্ষার দায়দায়িত্ব বাংলাদেশের সব মানুষের ওপর চোখ বন্ধ করে ছেড়ে দিতে হবে। পুলিশ, মন্ত্রী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতানেত্রীরা চাইলে আসতে পারেন, তাঁরা পূজা দেখার জন্য আসবেন, পূজা পাহারা দেওয়ার জন্য নয় বা পূজারীদের মনে সাহস বাড়ানোর নামে সাহস কমিয়ে দিতে নয়।’

আমি গুণদার এই মনোভাব সমর্থন করি। ধর্মীয় উৎসব যদি পুলিশ প্রটেকশনেই করা হয় তাহলে এখানে উৎসব কোথায়! একে আবার গালভরা বুলিতে কেউ কেউ বলছেন সর্বজনীন উৎসব। সব জনের উৎসবে পুলিশি পাহারার দরকার হবে কেন! মুসলিমরা প্রতিমা ভাঙতে যাবে কেন! পূজা উদযাপন নিয়ে হিন্দুদের ভয় পেতে হবে কেন! তার মানে যা বলা হয়, ধর্মীয় সম্প্রীতি উপচে পড়ছে বলে যে ঢোল বাজানো হচ্ছে- সেসব মিথ্যা এবং ভণ্ডামি।

তাহলে আমাদের পক্ষে কি পুলিশি পাহারা ছাড়া, আশ্রয় ছাড়া পূজা উৎযাপন সম্ভব? আমার দৃষ্টিতে সেটা সব জায়গায় সম্ভব না। গুণদা’র পাকিস্তান আমলের অবস্থায় ফিরে যাওয়াটা বোধহয় দুঃসাহসিক কর্মপ্রচেষ্টা হবে। কারণ, আমাদের সমাজ এবং রাষ্ট্রে এখন ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বেড়েছে। ক্রমান্বয়ে ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের দূরত্ব বাড়ছে। আগে এক গ্রামের ঘটনা অন্য গ্রামে খবর হতো, এখন এক দেশের ধর্মীয় নির্যাতন আরেক দেশে প্রভাব পড়ছে। ইন্টারনেট দুনিয়া সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে সম্প্রীতি বিনষ্টের ঘটনাকে আরও রঙ লাগিয়ে উত্তেজনায় ঘি ঢালছে।

একজন মানুষ যদি ধর্মীয় স্বাধীনতায় বিশ্বাসী না হয়, অন্য ধর্মের মানুষকে ঘৃণা করা বন্ধ না করে, তাহলে ধর্মীয় উৎসব নির্বিঘ্নে হবে কী করে! বিশেষ করে বাংলাদেশের হিন্দুদের তাদের ধর্মীয় উৎসবে শামিল হওয়া আরও কঠিন হয়ে যাবে। অবশ্য ক্ষেত্রবিশেষে পুলিশি পাহারা ছাড়া বাংলাদেশে মুসলিমরাও আজকাল ধর্মীয় উৎসব করতে পারছে না। মসজিদে, ঈদগাহে বোমা নিয়ে প্রবেশ করছে ইসলামি জঙ্গিরা। দেখা যাচ্ছে কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠানই পুলিশ প্রটেকশন ছাড়া হতে পারছে না। গুণদা’র ছোটকাল বাদ দিলাম, আমাদের ছোটকালেও আমরা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পাহারা দিতে কোনও পুলিশ দূরে থাক, চকিদারকেও দেখিনি।

এরমধ্যে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, খুব দ্রুত একটি নতুন আইন করতে যাচ্ছে সরকার, যাতে কোনও মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সাক্ষীর সুরক্ষা এবং তার গোপনীয়তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকবে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনার বিচারের জন্য সরকার এই আইনগত উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বলে বলেছেন আইনমন্ত্রী। আমার জানা মতে, মন্দির, বিগ্রহ নষ্ট বা হামলা করার বিরুদ্ধে কঠোর আইন এর আগেই সরকার করেছে। প্রস্তাবিত আইন হয়তো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা কমিয়ে আনবে।

নতুন এই আইন করার পক্ষে আইনজীবী ও অধিকারকর্মীদের যুক্তি হচ্ছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে শেষই করা যায় না সাক্ষীর অভাবে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় অধিকাংশ সময় সাক্ষী হন হয়তো ওই পরিবারের প্রতিবেশী আরেকটি সংখ্যালঘু পরিবারের মানুষ। কিন্তু মামলার বিচার প্রক্রিয়ার সময় সাক্ষী দিতে যাওয়াটা তাদের জন্য ভয়ের, এজন্য তারা সাক্ষ্য দিতে আসেন না।

আইনমন্ত্রী বলেছেন, সাক্ষীদের গোপনীয়তা রক্ষার ব্যবস্থা থাকবে এই আইনে। এটা কতটা বাস্তব হবে ভেবে দেখার বিষয় আছে। আইনের অপব্যবহারের সুযোগ থাকবে হয়তো। বর্তমানে মন্দির ভাঙা এবং বিগ্রহ নষ্ট করার যে আইন আছে সেটাও অপব্যবহারের চেষ্টা হয়। তবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, এই ধরনের হামলা রোধ করতে বিশেষ করে মন্দির আর মূর্তি আক্রমণ করার আগে ধর্মীয় উত্তেজনার নামে, তৌহিদি জনতার নামে, দুষ্কৃতকারীদের হামলা থেকে সংখ্যালঘুদের জানমাল রক্ষা করতে হবে।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্টের ভিত্তিতে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র তাদের সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে বলেছে, ২০১৩ সাল থেকে গত ৯ বছরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সাড়ে তিন হাজারের বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে হিন্দুদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং পূজামণ্ডপ, মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ অন্যতম। সংখ্যাটা চোখ বুজে থাকার মতো নয়।

গুণদা’র ‘পুলিশ প্রটেকশনে নো দুর্গাপূজা’ স্ট্যাটাসে আবার ফিরে আসি। সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানোর, অভয়দানের দরকার হচ্ছে এখন। কিন্তু সেটি লাগছে কেন– রাষ্ট্রকে এর মূলে যেতে হবে। অনেকে মনে করেন, হিন্দুদের প্রতি বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তাদের জন্য ক্ষেত্রবিশেষে দুঃখের কারণ হচ্ছে, যেমনটা পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে ‘মুসলমান তোষণ’-এর অভিযোগ করে আসছে সে দেশের একশ্রেণির মানুষ। তাদের মতে, এতে সংখ্যালঘুদের প্রকৃত কল্যাণের চেয়ে তাদের ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংখ্যাগুরুরা নিজেদের ডিপ্রাইভ ভাবছে কিনা, সরকারবিরোধী ক্ষোভ ভেন্টিলেশনের সুযোগ হিসেবে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ হচ্ছে কিনা, এসবও গবেষণার দরকার আছে।

প্রায় ৩২ হাজার মণ্ডপে এবার পূজা হয়েছে, সেটি একটি প্রশংসার দিক। কিন্তু সে তুলনায় সামান্য ক’টি মণ্ডপে হামলার ঘটনা দেশে-বিদেশে সরকারের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কারণ, এক মণ দুধে এক ফোঁটা চনাই যথেষ্ট। পূজামণ্ডপের সংখ্যা ও জৌলুস তাহলে বড় বিষয় নয়, শান্তিপূর্ণভাবে পূজা করতে পারছে কিনা সেটাই বড় বিষয়। মৌলবাদীরা বরং এসব জৌলুসকে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হিন্দুদের বাড়বাড়ন্ত হিসেবে দেখছে। বলছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকায় হিন্দুরা অনেক বেশি দাপট দেখাচ্ছে। এসব কারণে অসাম্প্রদায়িক আওয়ামী লীগ শাসনামলেও সাম্প্রদায়িকতা কমেছে দাবি করা যাচ্ছে না। পাশের দেশের হিন্দু মৌলবাদী সরকারের শাসন, সোশাল মিডিয়াও এই বিষবাষ্প বাড়ানোর ক্ষেত্রে আগুনের মধ্যে ঘি হিসেবে কাজ করছে। সমাজ বিজ্ঞানীদের এসবও হিসাবে ধরতে হবে।

সংখ্যালঘু বিষয়টি এত সংবেদনশীল যে এক লাইন লিখতে গিয়ে চারবার ভাবতে হয়। সরকারকেও সংখ্যালঘু প্রশ্নে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে হলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া চিন্তা করতে হবে। সংখ্যালঘুদের কল্যাণ চাইলে তাদের সুযোগ-সুবিধা নয় শুধু, সবার আগে দেশের মধ্যে আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এই সম্প্রীতি বিনষ্টে সংখ্যালঘুরাও বিপথে যাচ্ছে কিনা সেটাও দেখতে হবে। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ আর হেফাজতে ইসলামের মধ্যে তফাৎ কী দেখতে হবে।

অন্যদিকে রাজধানীতে বসে আমরা যারা প্রগতিশীলতা, অসাম্প্রদায়িকতার যে বুলি দিচ্ছি তার ছিটেফোঁটা কি গ্রামে পৌঁছছে সেটাও দেখতে হবে। আগে গ্রামে সাংস্কৃতিক যে আবহ ছিল, গান-বাজনা, নাটক, চলচ্চিত্র, জারি সারি, যাত্রাপালা ছিল- তার স্থান তো এখন ইউটিউব মোল্লারা দখল করেছে। অন্যদিকে চলছে ভারতীয় সিরিয়ালে বউ-শাশুড়ি প্যাঁচাল এবং সূক্ষ্মভাবে হিন্দুত্ববাদী প্রচারণা। এমন কোনও সিরিয়াল নেই যেখানে ধর্মীয় সুড়সুড়ি নেই। এর মাধ্যমে আমরা একটি ধর্মান্ধ বিশাল অসহিষ্ণু প্রজন্ম তৈরি করছি।

যতদিন এসবের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে আমরা যাবো না ততদিন ধর্মীয় সম্প্রীতি ফিরে আসবে না। সংখ্যালঘুদের নিরাপদে ধর্ম পালন সম্ভব হবে না। যতদিন সব নাগরিককে রাষ্ট্র সমান চোখে দেখবে না, কোথাও সংখ্যালঘুদের অত্যাচার করে, কোথাও আলগা পিরিতি দেখিয়ে নিজেদের ভোটের অঙ্ক ঠিক রাখার চেষ্টা করবে– ততদিন বাংলাদেশে পুলিশ প্রটেকশনে পূজা, ভারতে পুলিশ প্রটেকশনে নামাজ পড়ার দৃশ্য দেখবো আমরা। সবকিছু ভোটের খেলা।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া না যাওয়া

৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া না যাওয়া

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন তৃণমূলে সন্ত্রাস-দুর্নীতি বাড়িয়েছে

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন তৃণমূলে সন্ত্রাস-দুর্নীতি বাড়িয়েছে

মিডিয়ার সংকট এবং বিদেশি টিভি চ্যানেল

মিডিয়ার সংকট এবং বিদেশি টিভি চ্যানেল

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা হতাশার

রোহিঙ্গা ইস্যুতে কূটনৈতিক তৎপরতা হতাশার

‘গেলে জমি থাকলে ভোট, এই চক্র বন্ধ হোক’

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১৫:১৩

রুমিন ফারহানা খুব অস্থির সময় পার করছি আমরা। করোনা-বিভীষিকার রেশ মানুষের শরীর, মন, স্বজন হারানো, চাকরি হারানো সবটা এখনও আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এর মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, রাজনীতির মাঠের অস্থিরতা, নির্বাচন কমিশন গঠন বিতর্ক, একতরফা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, সব মিলিয়ে অস্বস্তিকর অস্থির এক সময়। শারদীয় দুর্গোৎসব তাই তার চিরচেনা আনন্দময় রূপে আসবে, তা হয়তো আশা করেনি কেউ। কিন্তু তাই বলে দাবানলের মতো আগুন, ৭০টির বেশি মণ্ডপ-মন্দির ভাঙচুর, সাত জনের প্রাণহানি, হিন্দু বাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুট; এতটা বিভীষিকাময় দুর্গোৎসবও কারও কল্পনায় ছিল না, কিন্তু তা-ই হলো।

পূজার সপ্তমীর দিন কুমিল্লার এক পূজামণ্ডপে কোরআন অবমাননাকে কেন্দ্র করে যে তাণ্ডব শুরু হয়েছিল, মুহূর্তে তা ছড়িয়ে পড়ে চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, রংপুরসহ দেশের অনেক জায়গায়। অথচ ঘটনাটি শেষ হওয়ার কথা ছিল কুমিল্লাতেই। কুমিল্লায় এই ঘটনা একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে ঠেকানো গেলে দেশের আর কোথাও এমন ঘটনা হয়তো আর ঘটতো না। ঘটনার সূত্রপাত যে ফেসবুক লাইভ থেকে সেটিতে দেখা যায়, যিনি ভিডিও করছেন তিনি ওসির একেবারে সামনে রীতিমতো ধারাবর্ণনা করে ঘটনাটি দেখাচ্ছেন।  

ফেসবুক লাইভ দূরেই থাকুক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ফেসবুক স্ট্যাটাসের জেরে এই দেশের বহু জায়গায় অতীতে যে তাণ্ডব ঘটে গেছে, সেটার ভিত্তিতে ওসির না বোঝার কোনও কারণ নেই এই ঘটনার প্রভাব কী হতে পারে। অথচ ওসি ছিলেন নির্বিকার। এমনকি পরবর্তীতে ভাঙচুর ঠেকানোর ক্ষেত্রে পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা প্রথম আলো কুমিল্লায় সরেজমিন রিপোর্ট করে বলেছে, সেখানকার প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষায়, প্রথমেই পর্যাপ্ত পুলিশ এনে বিক্ষুব্ধ লোকজনকে সরিয়ে দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসতে পারতো।

প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রাথমিক বয়ানে জানা যায়, ‘এমন অশান্তি গত ৫০ বছরে দেখেননি। সেদিন বিক্ষোভ করতে আসা লোকজনের বেশিরভাগই ছিল বয়সে তরুণ, অচেনা। তাদের মূল লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কী, বোঝা যাচ্ছিল না। একেকজন একেক দাবি করছিল। তাদের শান্ত করতে আশপাশের মসজিদের মাইকে আহ্বান জানানো হয়। এরপরও কীভাবে যেন তা পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে।’

পুলিশ সূত্র বলছে, ‘নানুয়া দিঘির পাড়ে দিনভর উত্তেজনায় একসঙ্গে ৫০০ মানুষের বেশি উপস্থিত ছিল না। শহরের বিভিন্ন স্থানে যেসব মন্দির ও পূজামণ্ডপে হামলা হয়েছে, তাতে বেশি মানুষের অংশগ্রহণ ছিল না। তাদের ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পর্যাপ্ত কঠোর অবস্থান নেয়নি।’ (দৈনিক প্রথম আলো, ২০ অক্টোবর, ২০২১)

একই পত্রিকার আরেকটি প্রতিবেদনে ২০ অক্টোবর বলা হয়, ‘খোঁজ নিয়ে স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ পৌর এলাকার বাসিন্দা হৃদয় হাসান ওরফে জাহিদ (২০) ওই স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। তিনি হাজীগঞ্জ পৌর ছাত্রলীগের কর্মী। তার মা শাহিদা বেগম ২০১৪-২০১৯ মেয়াদে হাজীগঞ্জ পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর ছিলেন। আওয়ামী লীগের সমর্থনে তিনি নির্বাচনে জিতেছেন।’

প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা অভিযোগ করেছেন, মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া কিশোর ও তরুণেরা পৌর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসানের অনুসারী। হাজীগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহবুব-উল-আলমও ওই দৈনিকটিকে বলেন, হামলাকারীদের মধ্যে মেহেদী হাসানের অনুসারীও ছিলেন বলে তিনি শুনেছেন। তবে তিনি নিশ্চিত নন। এই ব্যাপারে জনাব মেহেদির বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি আবার অভিযুক্ত করেন আরেক ছাত্রলীগ নেতাকে। তিনি বলেন, ‘হাজীগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি খোকন বলির অনুসারী ও পরিবারের সদস্যরা হামলায় অংশ নিয়েছেন, সেই প্রমাণ আমাদের কাছে আছে।’

একই রকম পরিস্থিতি হয়েছে দেশের অন্যান্য এলাকায়ও। রংপুরের ঘটনার সঙ্গে ছাত্রলীগ কর্মী জড়িত, সরকার নিজেই তা স্বীকার করেছে এবং সেই কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ঘটনাগুলোর পর বাংলাদেশে আর সবসময় যা ঘটে ঠিক তাই ঘটেছে। মামলাগুলোতে হাজার হাজার অজ্ঞাত আসামিকে রাখা হয়েছে। কারণ, এসব মামলায় এরপর যে কারও নাম অন্তর্ভুক্ত করা যায়। অন্তর্ভুক্ত করার ভয় দেখিয়ে কিংবা অন্তর্ভুক্ত নাম বাদ দেওয়ার জন্য টাকা কামানো যায়। পুলিশের ‘গ্রেফতার-বাণিজ্য’ গত কয়েক বছরের খুব পরিচিত ব্যাপার।

এই মামলাগুলোর আরেকটা উদ্দেশ্য হচ্ছে বিরোধী দলকে দমন-পীড়ন করা। প্রতিবারের নাশকতার মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় অসংখ্য বিএনপি কর্মীকে। মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের শুরু করে এসব ক্ষেত্রে ‘হুকুমের আসামি’ হওয়া থেকে বাঁচেন না দলের সর্বোচ্চ পর্যায়, স্থায়ী কমিটির সদস্য, এমনকি দলের মহাসচিবও। এবারও তার ব্যত্যয় হয়নি। বিএনপি’র নেতাকর্মীদের আসামির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে গিয়ে খোঁজ রাখা হয়নি বহু কিছু। বিদেশে অবস্থানরত বিএনপির কর্মী যেমন তালিকায় আছেন তেমনি তালিকায় আছেন ৬ মাস ধরে জেলে থাকা বিএনপি কর্মীও।

চট্টগ্রামের পূজামণ্ডপে হামলার মামলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন এমন তিন জন বিএনপি কর্মী, যারা গত ছয় মাস থেকে জেলে আছেন। সেগুলোও ছিল নাশকতার মামলা, যখন নরেন্দ্র মোদি দেশে আসার কারণে বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতা হয়েছিল। এসব কাজের অসারতা সরকারি আইনজীবী ঠিকই বুঝেছেন। কারাগারে থাকা বন্দিদের ভাঙচুরের মামলায় আসামি করা পুলিশের খামখেয়ালিপনা বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর সরকারি কৌঁসুলি (পিপি)।

এসব মানতে নারাজ মূল হোতা, পুলিশ। মামলার তদন্তকারী এসআই এই ব্যাপারে কথা বলতে না চাইলেও কথা বলেছেন পুলিশ সুপার, যিনি জানান– জেল থেকেও হুকুম দিতে পারে। তবে জেল থেকে কোনও আসামির হুকুম দেওয়ার সুযোগ নেই বলে জানিয়ে চট্টগ্রাম কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক বলেন, বন্দিরা কড়া নিরাপত্তার মধ্যে থাকেন। বর্তমানে স্বজনদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ বন্ধ রয়েছে।

দেশের দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে, ডলারের বিপরীতে টাকা মূল্য হারাচ্ছে প্রতিদিন, সঙ্গে সরকার সমর্থিত সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, চাঁদাবাজি তো আছেই। ফলে সামনের দিনগুলোতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়ে উঠবে। ওদিকে সামনের নির্বাচন কমিশন গঠনের আলোচনা হচ্ছে সমাজে। একটি সুস্পষ্ট আইন ছাড়া, নির্বাচন কমিশন গঠনে যতই ‘সার্চ কমিটি’ তৈরি করা হোক, সেটা সংবিধানের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক– এটা জেনে গেছে এখন রাজনীতি সচেতন মানুষ। প্রতিটি সংসদ অধিবেশনে বহু আইন পাস হলেও এই আইনটি সরকার কেন পাস করেনি সেই সমালোচনা হচ্ছে। একই সঙ্গে চাপ আছে সামনের চার মাসে এ আইনটি করে ফেলার।

এই আলোচনাগুলো হাওয়ায় উবে গেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর এই হামলাগুলো সরকারকে অসাধারণভাবে সাহায্য করেছে মানুষের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে।

স্বল্পমেয়াদে এটা অসাধারণ লাভ ক্ষমতাসীনদের জন্য। মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদেও এই পরিস্থিতি সরকারকে বিরাট সুবিধা দিতে পারে।

নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করার সূত্র আরেকটি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা সামনে আসছে। নানা চাপে সেই নির্বাচন যদি সরকার ২০১৮-এর স্টাইলে করতে ব্যর্থ হয়, সেই আশঙ্কাকে মাথায় রেখে প্রধান বিরোধীদলকে যতটা সম্ভব দুর্বল করে ফেলার চেষ্টা করতে হবে সরকারকে। এই ঘটনাগুলোর মাধ্যমে সরকারের সুবিধামতো, সুবিধাজনক সময়ে বিএনপি’র যেকোনও পর্যায়ের নেতৃত্বকে ফাঁসিয়ে দেওয়া যাবে। এটাই মধ্যমেয়াদে এসব ঘটনার লাভ।

 
বাংলাদেশের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী আছে, জঙ্গিবাদ আছে, এসব আন্তর্জাতিক প্রচারণা দীর্ঘদিন থেকে সরকার করছে। এই প্রচারণার উদ্দেশ্য হচ্ছে, এগুলোকে দেখিয়ে যেকোনও মূল্যে ক্ষমতায় থাকার ন্যারেটিভ আন্তর্জাতিকভাবে তৈরি করা। দেশের মানুষের কাছেও এই বয়ানের ‘বাজারমূল্য’ আছে। এটাই হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতাসীন দলের কাছে এসব ঘটনার উপযোগ।

এই সরকারের আমলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপরে যত হামলা হয়েছে তার একটিরও বিচার তারা করেনি। বিচার অবশ্য না করারই কথা, সরকার যে আসলে এই ঘটনাগুলো ঘটাতে চায়, তার প্রমাণ হলো এসব ঘটনা যারা ঘটায় তাদের ক্ষমতাসীন দল বরং পুরস্কৃত করে।

নাসিরনগরের ঘটনার চার্জশিটভুক্ত তিন আওয়ামী লীগ নেতাকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মনোনয়ন দিতে আমরা দেখেছি। মিডিয়ায় তীব্র সমালোচনার মুখে দুই আসামির মনোনয়ন বাতিল করা হয়।

এখন শুধু বিরোধী দলই না, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংগঠন নির্বিশেষে বলছেন, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই, প্রশাসনের সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণেই এবার এই বীভৎস কাণ্ডগুলো ঘটেছে। তারাই এসব ঘটনা বারবার ঘটার পেছনে বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে দায়ী করছেন। তারাই এখন স্পষ্টভাবে বলছেন, এই সরকারের আশ্বাসে তারা এখন আর কোনও আস্থা রাখেন না।

সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। মোট জনসংখ্যায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ক্রমশ কমে আসা অনুপাত চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, এ দেশে তারা ভালো নেই । ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য সবচেয়ে ভালো সরকার হিসেবে দাবি করা আওয়ামী লীগের শাসনামলের গত ৯ বছরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে ৩ হাজার ৬৭৯টি। এই হিসাব বিএনপি করেনি, করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র।

হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সাম্প্রতিক হামলার পর এই সম্প্রদায়ের বহু মানুষ খুব স্পষ্টভাবেই বলেছেন, এই দেশে তারা আর থাকতে পারবেন কিনা সেই চরম অনিশ্চয়তায় তারা পড়েছেন। তারা যাই করুক না কেন, ক্ষমতাসীন দলটির জন্য সেটাই সুবিধাজনক। তারা দেশ ছেড়ে চলে গেলে তাদের জমি দখল করে নেওয়া যাবে প্রভাব খাটিয়ে। আবার তারা যদি দেশে থাকেন, তাহলে এদের সব ভোট পড়বে তাদের বাক্সে, আদৌ যদি কোনও দিন সত্যিকারের ভোট হয় এই দেশে।

শুধু বিরোধীদলীয় কর্মী বলেই নয়, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার চাওয়া একটাই- গেলে জমি, থাকলে ভোট; এই চক্র বন্ধ হোক।

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি দলীয় হুইপ

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

বাণিজ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চাই না যে কারণে

বাণিজ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চাই না যে কারণে

স্বাস্থ্যমন্ত্রী কি একাই ব্যর্থ?

স্বাস্থ্যমন্ত্রী কি একাই ব্যর্থ?

‘আমি রাজনীতি করা মেয়ে, আমি কিন্তু ভদ্র না’

‘আমি রাজনীতি করা মেয়ে, আমি কিন্তু ভদ্র না’

আশ্রয়ণ প্রকল্প: দুর্নীতি কি আর্থিক নাকি ‘তেলবাজি’র?

আশ্রয়ণ প্রকল্প: দুর্নীতি কি আর্থিক নাকি ‘তেলবাজি’র?

করোনাকালীন ১০ কোটি উদ্যোক্তার গল্প

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২১, ১৯:১৯

ফাতেমা আবেদীন এই শিরোনাম পড়ে নিশ্চয় পাঠক হিসেবে আপনি চোখ কুঁচকে ফেলেছেন। ১৬ কোটি (আনঅফিসিয়ালি ১৭  বা ১৯ কোটি) জনগণের দেশে ১০ কোটি উদ্যোক্তা! নিশ্চয়ই আপনি ধন্দে পড়ে গেছেন। ব্যক্তিগতভাবে একজন অনলাইন উদ্যোক্তা হিসেবে আমিও এই হিসাবের মারপ্যাঁচে পড়ে আছি।

আসলে কত অনলাইন এবং কতজন অফলাইন উদ্যোক্তা আছেন বাংলাদেশে, সেই তথ্য কারও জানা নেই। হুজুগের দেশে এই মুহূর্তের ট্রেন্ড অনলাইন উদ্যোগ। মোবাইলে ৯ টাকায় এক জিবি ডাটা, ৯৯৯ টাকার টাচফোন আর বউয়ের বা বোনের রান্না করা কৈ মাছের বাটি চচ্চরির বিনিয়োগ আপনাকে উদ্যোক্তা বানিয়ে ছাড়বে। এই হুজুগ বা ট্রেন্ডই এই মুহূর্তে চলছে।

সম্প্রতি মোবাইল অপারেটর কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, এই করোনাকালে মোবাইল কলের চেয়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ। ২০১৮ সালে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বাংলাদেশি ছিলেন ৩ কোটি, ৩ বছরে সেটি বেড়েছে তিনগুণের বেশি। এই মুহূর্তে ১০ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী।

সম্প্রতি বিটিআরসি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুলাই মাস শেষে দেশে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯ কোটি ৮৭ লাখ ৪০ হাজার। জুন মাস শেষে যা ছিল ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৫ হাজার। এই হিসাব থেকে দেখা যায়, দেশে এক মাসে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বেড়েছে ২৯ লাখ ৩৫ হাজার। তবে দেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ কোটি ৬৪ লাখ ১০ হাজার। অবশিষ্ট ৮৫ লাখ ৭১ হাজার হলো ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। (তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন।)

মনে রাখবেন, এসব ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর প্রত্যেকেই ‘ঝানু ব্যবসায়ী’। আর প্রত্যেকেই অন্তর্জালে একেকজন ‘ঝানু ব্যবসায়ী’– এই বাক্যটিকে নেহায়েত তির্যক মন্তব্য বলে বিবেচনা করলে লেখাটি সুখপাঠ্য হবে। এসব ‘ঝানু’ অন্তর্জালিক (অনলাইন) ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে পড়ার আগে কিছু তথ্য জেনে রাখা ভালো।

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) জানায়, ২০১৭ সালে অনলাইন ব্যবসা বা অন্তর্জালিক কেনাবেচার লেনদেন এক হাজার কোটির বেশি। এরমধ্যে নারী উদ্যোক্তাদের আয় ৩০০ কোটি টাকার বেশি। (তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন)। তবে পর পর দুই বছর এই লেনদেনে ২/৪ কোটির মতো বেড়েছে।

কিন্তু ২০২০ সালে এই চিত্র একেবারেই পাল্টে গেছে বলে জানিয়েছে ই-ক্যাব। এক হাজার কোটির সামান্য বেশি  লেনদেন বছরের প্রথমার্ধেই চার হাজার কোটির দিকে এগিয়েছে। এ বছর বাজারের আকার দাঁড়াচ্ছে ১৬ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে এর আকার ছিল ১৩ হাজার কোটি টাকার (তথ্যসূত্র: প্রথম আলো)।

মাত্র ৬ মাসে করোনার স্থবির হয়ে যাওয়া অর্থনীতিকে একা হাতে সচল রেখেছেন এই ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা। যিনি শিক্ষক ছিলেন, করোনায় আয় বন্ধ হয়ে গেছে, অনলাইনে কোচিং চালাচ্ছেন, বা কাঁচা তরকারি হোম ডেলিভারি দিচ্ছেন। যিনি ডাক্তার ছিলেন, চেম্বার বন্ধ, আয় বন্ধ। তিনি হোমশেফ হয়ে যাচ্ছেন। কিংবা করোনার প্রভাবে ছাঁটাই হয়েছেন, তিনিও স্টার্টআপ ব্যবসা শুরু করেছেন। করোনার এই বন্দি সময়ে যখন একদল পেশাজীবী ব্যবসায়ীতে রূপান্তরিত হয়ে অর্থনীতির লাগাম টেনে ধরেছেন, তখন সম্ভাবনার পাশাপাশি আতঙ্কও ভর করে।

নিশ্চিতভাবেই পরিস্থিতি করোনাময় থাকবে না। স্বাভাবিক সময় বা নিউ নরমালে মানিয়ে নেওয়ার অবস্থা সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই হবে। সেই সময় ছাঁটাই হওয়া বা বেতন বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো নিশ্চয়ই আবার চালু হবে। পেশায় ফিরতে হবে পেশাজীবীদের। চিকিৎসকটি নিশ্চয়ই চেম্বারে ফিরে যাবেন। গার্মেন্টসের অর্ডার কমে গেছে বলে চাকরিচ্যুত হওয়া লোকটিও নিশ্চিতভাবেই সরিষার তেল আর মধু বিক্রি বন্ধ করে কাজে ফিরে যাবেন। যেতেই হবে, কারণ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই বিশ্বে কাপড়ের চাহিদা বাড়বে। গার্মেন্টস আরও বড় ভেঞ্চারে যাবে। ট্রাভেল এজেন্সি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যিনি বাড়িতে মমো বিক্রি করছিলেন হোমমেকার হিসেবে, তিনিও নিশ্চয় আবার টিকিট/ট্রাভেল জোরদারভাবে শুরু হলে পুরনো কাজে ফিরেই যাবেন। এই ফিরে যাওয়া মানুষগুলোর সংখ্যা ৭৫ শতাংশ।

৭৫ শতাংশ করোনাকালীন স্টার্টআপ উদ্যোক্তা কীভাবে জানলাম, এই প্রশ্ন আসতেই পারে।

গত তিন বছরের ১ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা যখন মাত্র ৬ মাসে ৪ হাজার কোটিতে উন্নীত হয়, তখন সেটি ৭৫ শতাংশ আয়। তাহলে হিসাবের খাতায় বাকি থাকে ২৫ শতাংশ লোক। এই ২৫ শতাংশ মানুষও যে খুব দক্ষতার সঙ্গে ব্যবসা করছেন তা কিন্তু নয়। তাদের ৯৯ শতাংশই এফ কমার্সভিত্তিক। অর্থাৎ ফেসবুকের জোরে ব্যবসা চলছে। যদি কখনও ফেসবুক বন্ধ করা হয়, সেদিন কয়েক মুহূর্তের মধ্যে অনলাইন ব্যবসায় লেনদেন ৯০ শতাংশ বা তারও বেশি কমে আসবে।

হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ছাড়া কমবেশি সবারই অনলাইন ব্যবসা এফ কমার্সভিত্তিক। তাই বুঝে নিতে হবে কী তুমুল ঝুঁকির ওপর দাঁড়িয়ে আছে অনলাইনের ১৬ হাজার কোটি টাকার বাজার।  

আরও ভয়ংকর দিক হচ্ছে, অনলাইন ব্যবসার নামে সুবিশাল অঙ্ক লেনদেন হচ্ছে দেশের মূল অর্থনীতিকে স্পর্শ না করে।  ১৬ হাজার কোটি টাকার যে বাজার তৈরি হয়েছে তার ৯০ শতাংশ স্টার্টআপ উদ্যোক্তা। যাদের লাইসেন্স, ব্যবসায়িক অনুমোদন নেই। কারা এসব এফ-কমার্স, ই-কমার্সকে অনুমোদন দেবে সেই প্রতিষ্ঠানও গড়ে ওঠেনি। ই-ক্যাবের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো হয় নিজ উদ্যোগে কিছু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছে কিন্তু তাদের অনুমোদন দেবে কে, সেই হদিস গত ১০ বছরে হয়নি। এমন কোনও উদ্যোগ কোনও সংগঠন বা রাষ্ট্র থেকে নেওয়া হয়নি, যাতে এই সম্ভাবনাময় বিশাল বাজার টিকে যেতে পারে। চরম দুর্যোগ মুহূর্তে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকতে পারে।

মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যখন খুশি আসছেন, কিছু দিন ব্যবসা করছেন, এরপর পুরনো পেশায় ফিরে যাচ্ছেন। তাদের নিয়ন্ত্রণ বা অনুমোদন দেওয়ার বালাই থাকছে না। ফলে রাজস্বের বাইরে থাকছে এই ১৬ হাজার কোটি টাকার হিসাব।

তবে অনেক অনলাইন উদ্যোক্তাই নিজেদের উদ্যোগকে প্রতিষ্ঠিত করতে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার আবেদন করেন। কিন্তু সেই আবেদনপত্রে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের এস্টাবলিশমেন্ট ঠিকানা চাওয়া হয়। কিন্তু এফ-কমার্সে তো ঠিকানা বলতে ওই ফেসবুক। তাহলে তাদের ব্যবসার জন্য কেন এখনও নীতিমালা করা হলো না।

অপার সম্ভাবনার আই বাণিজ্য খাতটিকে হেলায় না হারিয়ে সামান্য কয়েকটি নিয়ম তৈরি করে বাজার নিয়ন্ত্রণে এনে অনায়াসে রাজস্ব বৃদ্ধির সুব্যবস্থা করা যাবে।

এদিকে তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রতিও একান্ত অনুরোধ, হুটহাট ব্যবসায় নেমে একটু ভ্যাকুয়াম তৈরি করার আগে কয়েকবার ভেবে নেবেন। সারা জীবন যে কৈ মাছ ফ্রি পেয়ে আসছেন, অনলাইনে ১০০ টাকায় বিক্রি করা যায় বলেই হুজুগে মেতে উঠবেন না।

যে বাজার দাঁড়াতে যাচ্ছে সেটিকে দাঁড়াতে দিন। নতুবা সেই ফেসবুকে শেয়ার করা বন্ধুর স্ট্যাটাসটিরই পুনরাবৃত্তি করি- পেইজে ইনভাইটেশন দিচ্ছেন দেন। ভালোবেসে লাইক দিবো। উদ্যোক্তা হওয়ার হোন, সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য দিবো। কিন্তু করোনা শেষ, সব ছেড়ে চাকরির লাইনে দাঁড়িয়েছেন তো...।

লেখক: সাংবাদিক ও উদ্যোক্তা।

[email protected]

 

/এসএএস/এমওএফ/

বসুরহাট ও গাজীপুরের মেয়র দেশটাকে কী মনে করেন?

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২১, ১৭:২০

ডা. জাহেদ উর রহমান গাজীপুরের মেয়র এবং গাজীপুর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম ‘ঝামেলা’য় পড়েছেন। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে থেকে জানা যায়, তিনি এক ঘরোয়া আলোচনায় দলের শৃঙ্খলাবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন। এর জেরে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এর কিছু দিন আগে তার ঘটানো আরেকটি কাণ্ডের জন্য জনাব জাহাঙ্গীরের আরও শক্ত কারণ দর্শানোর নোটিশ পাওয়া উচিত ছিল দলের পক্ষ থেকে, কিন্তু পাননি। বর্তমান বাংলাদেশে সেটা হবে এমন প্রত্যাশা করার মতো বোকা আমি নই। সে বিষয়টা জানার আগে জেনে নেওয়া যাক একই ধরনের আরেকটি ঘটনার কথা।

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা, যিনি ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদকের ভাই, অনেক দিন থেকেই নানা আলোচনা-সমালোচনায় আছেন। নানা বক্তব্য আর কাণ্ডকীর্তির কারণে মিডিয়ায় সংবাদ হন নিয়মিত। কিছু দিন আগের একটা সংবাদ মিডিয়ার বেশি মনোযোগ না পেলেও আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।

গত মাসে কোম্পানীগঞ্জের ‘হুমায়ুন টিম্বার মার্সেন্ট অ্যান্ড স মিল’ নামের প্রতিষ্ঠানটি খাসজমিতে করা হয়েছে দাবি করে কাদের মির্জার লোকজন কারখানাটি জোর করে উচ্ছেদ করে ‘শিশুপার্কের জন্য নির্ধারিত স্থান’ লেখা সংবলিত একটি সাইনবোর্ড টানিয়ে দেন।

জমির মালিক জানান, এর আগে জমি খাস দাবি করে সেখান থেকে তার স্থাপনা সরানোর আদেশ দেন জনাব কাদের মির্জা। আদেশের বিরুদ্ধে তারা জেলা জজ আদালতে গত ২৫ মার্চ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। আদালত মামলা আমলে নিয়ে বিরোধপূর্ণ ভূমিতে বিবাদী পক্ষের প্রবেশে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

এই ভূমিতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা ছিল তার প্রমাণ আছে। এই ঘটনা প্রসঙ্গে কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানান, তাকে প্রতিষ্ঠানটির মালিক ফোনে ঘটনাটি জানানোর পর তিনি পুলিশ পাঠিয়ে মেয়রকে আদালতের নিষেধাজ্ঞার বার্তাটি পৌঁছান। এরপর পুলিশ সেখান থেকে চলে আসে। অর্থাৎ ওসি নিশ্চিত করেছেন, এই জমিতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, তিনি মেয়রের লোকজনকে বাধা না দিয়ে নিষেধাজ্ঞার বার্তা পৌঁছে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন।

যে পত্রিকাটি এই রিপোর্টে করেছে তারা জানায়, নানাভাবে চেষ্টা করেও তারা জনাব কাদের মির্জা সাথে যোগাযোগ করতে পারেননি, তাই এই ব্যাপারে তার বক্তব্য জানা যায়নি। অর্থাৎ মিডিয়ার প্রশ্নের সামনে পড়ে জবাব দেওয়ার ‘সাহস’ জনাব কাদের মির্জার ছিল না। ঠিক এই জায়গায় গাজীপুরের মেয়র আবার অনেক বেশি সাহসী, আগ্রাসী।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন (জিসিসি)-এর অধীনে ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে গৃহীত দুটি প্রকল্পের অধীনে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার রাস্তা প্রশস্তকরণ এবং ড্রেন ও ফুটপাত নির্মাণের কাজ চলছে।

ভূমি অধিগ্রহণ না করেই চলতি বছরের শুরুতে সিটি করপোরেশনের কর্মীরা হয় নিজেরাই বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে দিয়েছে, না হয় মালিকদের যার যার আবাসিক ভবন, কারখানা, দোকান বা সীমানা প্রাচীর আংশিকভাবে ভাঙতে বাধ্য করেছে। 

তবে, বেশিরভাগ বাসিন্দাই কোনও ক্ষতিপূরণ পাননি। উল্টো নিজেদের জমিতে সিটি করপোরেশনের ফেলে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে শ্রমিক নিয়োগ করতে হয়েছে অনেককে। এছাড়া, ব্যক্তিগত জমির কয়েকশ’ গাছও কেটে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

অবশ্য গাজীপুর সিটি করপোরেশনের (জিসিসি) দাবি, এই প্রকল্প দুটিতে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনও বিধান নেই। ক্ষতিপূরণ ছাড়া ব্যক্তির সম্পত্তি দখল নিয়ে রাষ্ট্রীয় আইন ভাঙা হয়েছে। শুধু সেটাই নয়, এখানে ঘটেছে আরও বড় ঘটনা– লঙ্ঘন করা হয়েছে দেশের হাইকোর্টের রায়ও।

কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে হাইকোর্টের স্থিতাবস্থা ছিল, কিন্তু ভাঙা হয়েছে সেগুলোও। ঘটনার পরপরই ভুক্তভোগী কোম্পানি কোনাবাড়ী থানায় মামলা করতে যান। কিন্তু পুলিশ মামলা বা সাধারণ ডায়েরি নেয়নি। পরে তার কোম্পানি গাজীপুর আদালতে মামলা করে।

বসুরহাট পৌরসভার ঘটনাটিতে জনাব কাদের মির্জাকে চেষ্টা করেও ফোনে পাওয়া যায়নি। ভিন্ন নম্বর থেকে পাওয়া গেলেও সেই পত্রিকার পরিচয় পাবার পর ফোন কেটে দেন তিনি। মিডিয়াকে ফেইস করার ‘সাহস’ পাননি তিনি। কিন্তু গাজীপুরের মেয়র এসব ব্যাপার থোড়াই কেয়ার করেন। ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মেয়র সাফ জানিয়ে দেন, ‘আপনি যদি সরকারি আইন মেনে চলেন, তাহলে এখানে কিছু করতে পারবেন না।’

আবার একটু মনে করে নিই, বসুরহাটের ঘটনাটিতে পুলিশ আদালতের রায় কাদের মির্জার লোকজনের কাছে পৌঁছে দিয়ে ফিরে চলে এসেছিল। অথচ কথা ছিল আদালতের রায় অনুযায়ী প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করে কাদের মির্জার লোকজনকে থামানো এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা। আর গাজীপুরে পুলিশ মামলা নেয়নি ভুক্তভোগীদের।

‘মগের মুল্লুকে’র সাথে একটা আধুনিক রাষ্ট্রের পার্থক্য হচ্ছে, আধুনিক রাষ্ট্র কতগুলো আইন দ্বারা পরিচালিত হয় এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক সেই আইন মেনে চলতে বাধ্য। আইনভঙ্গ হওয়াজনিত কারণে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে সে আদালতে যাবে এবং আদালত যদি তার পক্ষে রায় দেয় তাহলে রাষ্ট্রের প্রশাসন বিভাগের অবশ্য কর্তব্য হবে আদালতের রায় অক্ষরে অক্ষরে পালন করা।

একটা রাষ্ট্রের ক্ষমতাবান মানুষ দুর্বল মানুষের ওপর, এমনকি রাষ্ট্রও কখনও নাগরিকের ওপর নিষ্পেষণ চালাতে পারে। এমন ক্ষেত্রে বিচার বিভাগই পারে হুমকির মুখে থাকা নাগরিকদের রক্ষা করতে। তাই এই রাষ্ট্রকে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক এবং জনগণের জন্য কল্যাণকর একটি রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে গেলে বিচার বিভাগেরও আমূল সংস্কার করতে হবে, কোনও সন্দেহ নেই এতে।

কিন্তু সবকিছুর পরও বিচার বিভাগের সংবিধান স্বীকৃত ক্ষমতায় অসাংবিধানিক/বেআইনি কোনও চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। অথচ এই দেশে দায়িত্বপূর্ণ পদে থেকে এক মেয়র আদালতকে ‘থোড়াই কেয়ার’ করে তার বিরুদ্ধাচরণ করেন আর আরেক মেয়র একই কাজ করার পর আবার বড় গলায় ঘোষণা করেন সরকারি আইন তিনি মানবেন না।

দুই মেয়র এই দেশটাকে কী মনে করছেন? যেটাই মনে করেন না কেন, তাদের বিরাট লাভ হতে পারে– কারণ এর ফলে তারা আইন-কানুন, রীতি-নীতি সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে করতে পারে যা খুশি তা। কিন্তু আমরা সাধারণ নাগরিকরা কেন মেনে নেবো সেটা? কেন আমরা এই দুটি ভয়ংকর ঘটনাকে ছোট বিষয় বলে মনে করবো?

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

 

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

সরকারি কর্মকর্তাদের কী নামে সম্বোধন করা হবে?

সরকারি কর্মকর্তাদের কী নামে সম্বোধন করা হবে?

প্রতিটি আত্মহত্যায় দায় আছে আপনার-আমার

প্রতিটি আত্মহত্যায় দায় আছে আপনার-আমার

দরিদ্র মৃত্যুপথযাত্রী ছাত্র যদি ‘মেধাবী’ না হয়?

দরিদ্র মৃত্যুপথযাত্রী ছাত্র যদি ‘মেধাবী’ না হয়?

পরীমণি’র মুক্তির আন্দোলন কি কেবলই ‘স্টান্টবাজি’?

পরীমণি’র মুক্তির আন্দোলন কি কেবলই ‘স্টান্টবাজি’?

এই আগুনের পেছনে কে?

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২১, ১৭:১৪

আমীন আল রশীদ এই লেখাটি যারা পড়ছেন, তাদের কাছে প্রশ্ন: ধরা যাক আপনি শুনতে পেলেন আপনার এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের কোনও একজন লোক ফেসবুকে ইসলাম সম্পর্কে খারাপ কথা লিখেছেন। আপনি কি লাঠিসোঁটা আর আগুন নিয়ে ওই লোকের বসতবাড়িতে গিয়ে হামলা চালাবেন? ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেবেন? পিটিয়ে মানুষ মেরে ফেলবেন? সহজ উত্তর হচ্ছে– না। কারণ, একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আপনি এতটা হিংস্র বা উগ্র নন। আপনি জন্মের পর থেকে যাদের সঙ্গে একই আলো-হাওয়া, একই পানি ও জলে বেড়ে উঠেছেন, কথিত ধর্ম অবমাননার গুজবে আপনি তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতে পারেন না। এটা আপনি করেননি। যদি না করেন তাহলে কুমিল্লার মন্দিরে কে কোরআন  নিয়ে গেলো এবং সেই সংবাদ বা গুজবে কারা পরবর্তীতে ওই মন্দিরে হামলা চালালো? কুমিল্লার এই আগুন কী করে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে গেলো? রংপুরের পীরগঞ্জে কারা উসকানি দিলো এবং কারা গিয়ে পুরো পল্লিটি জ্বালিয়ে দিলো?

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বরাবরই অসাম্প্রদায়িক। হাজার বছর ধরে এই ভূখণ্ডে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। কিন্তু তারপরও দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক উসকানি, মন্দিরে আগুন, প্রতিমা ভাঙচুর, হিন্দুদের কথিত ‘সংখ্যালঘু’ তকমা দিয়ে তাদের জায়গা-জমি দখল করে দেশছাড়া করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনের পরে এরকম অনাকাঙ্ক্ষিত যেসব ঘটনা ঘটেছে—সেখানে সাধারণ হিন্দু-মুসলমানের কোনও দায় ছিল না। এর নেপথ্যে বরাবরই কাজ করে ভোটের রাজনীতি। কখনও ব্যক্তিগত বিরোধও রাজনীতির মোড়কে রঙ পাল্টায়। কখনও এসব ঘটনার পেছনে থাকে ভূ-রাজনীতি। থাকে এই অঞ্চলের শক্তিমান রাষ্ট্রগুলোর নানা স্বার্থ। কিন্তু প্রশ্ন হলো,  অতীতে যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেসব ঘটনার মূল হোতাদের কি চিহ্নিত করে বিচার করা গেছে? নাকি প্রতিটি ঘটনাই রাজনীতির মারপ্যাঁচে হারিয়ে গেছে? মাঝখানে প্রাণ গেছে কিছু নিরীহ মানুষের। অনেক সময় কিছু রাজনৈতিক নেতাকর্মীও ভিকটিম হয়েছেন—যাদের সবাই হয়তো প্রকৃত অপরাধী নন।

দুর্ভাগ্যের বিষয়, যখনই এ রকম ঘটনা ঘটে, বিশেষ করে মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুর বা কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা ঘটে, তখন দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক পক্ষ পৌনঃপুনিকভাবে একইরকম কথাবার্তা বলে। কম্পিউটারের প্রোগ্রামিংয়ের মতো তাদের বক্তব্যও নির্ধারিত। ঘটনা যাই ঘটুক, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের কোনও ব্যত্যয় হয় না। এবারও তা-ই।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অভিযোগ, এর পেছনে উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী তথা তাদের ভাষায় বিএনপি-জামায়াতের লোকজন জড়িত। তারাই দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চায়। পক্ষান্তরে বিএনপির দাবি, সরকার তাদের লাগামহীন অনিয়ম-দুর্নীতি-লুটপাট থেকে মানুষের দৃষ্টি সরাতে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। মধ্যপন্থীদের অনেকে মনে করেন, এটা বিদেশি কোনও রাষ্ট্রের উসকানি। কেউ কেউ মনে করেন, বিশ্বব্যাপী যে ধর্মীয় উগ্রবাদ বিস্তৃত হচ্ছে, তারই প্রতিফলন।

অস্বীকার করার উপায় নেই, ভূ-প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর জায়গায় অবস্থান করছে। বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি কেবলই পানের অযোগ্য লবণাক্ত জলের আধার নয়। বরং এর নিচে রয়েছে বিশাল সম্পদ। ব্লু ইকোনমির বিরাট সম্ভাবনা। বাংলাদেশের রয়েছে ১৭ কোটি লোকের বাজার। বাংলাদেশ এখন উপভোগ করছে পপুলেশন ডিভিডেন্টের সুবিধা—অর্থাৎ দেশের বিরাট জনগোষ্ঠী যখন তরুণ-উদ্যমী-শক্তিশালী-সাহসী—যে সুযোগ কোনও একটি জাতির জীবনে শত বছরেও আসে না এবং যে সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে; উদযাপন করছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী; করোনার অতিমারিতে বিশ্বের অনেক শক্তিশালী অর্থনীতির দেশও যখন বিপর্যস্ত, তখন বাংলাদেশ যে বিশাল জনগোষ্ঠীর চাপ নিয়েও দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে—এসব সফলতা অনেকেরই হয়তো মন খারাপের কারণ হতে পারে।

সুতরাং কে কোথা থেকে কোন উদ্দেশ্যে কলকাঠি নাড়ছে তা বোঝা মুশকিল। তবে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে কোনও রাষ্ট্রের সঙ্গে অনেক বেশি যুক্ত হয়ে যাচ্ছে এবং তার সঙ্গে এই অঞ্চলের অন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর রসায়ন কেমন—এটিও ভাবনার বাইরে রাখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ স্থিতিশীল থাকলে; অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে থাকলে; নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের স্পর্ধা দেখাতে পারলে যদি কারও মন খারাপ হয়—তখন তারা বাংলাদেশের সেই স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করার চেষ্টা করতে পারে। তাদের সেই অর্থ-লোকবল ও কৌশল আছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ শান্ত থাকলে যদি কারও মন খারাপ হয়; কেউ যদি মনে করে যে বাংলাদেশ খারাপ থাকলেই তার ভালো—তাহলে গতকাল রামু, আজ কুমিল্লা, কাল পীরগঞ্জ—চলতেই থাকবে। সুতরাং বাংলাদেশ যদি সত্যিই কারও মন খারাপের বলি হয়ে থাকে, এবং ব্যক্তি-গোষ্ঠী-দল বা রাষ্ট্রকে চিহ্নিত করা না যায়—তাহলে এই আগুন সহজে নিভবে না।
মনে রাখা দরকার, কারণ সাধারণ মানুষ বরাবরই অসাম্প্রদায়িক। তারা তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের অবমাননা করে না। কোনও সাধারণ মুসলমান মন্দিরে কোরআন শরিফ রেখে আসে না। কোনও সাধারণ হিন্দু মন্দিরে কোরআন শরিফ নিয়ে তাদের মূর্তির পায়ের নিচে রাখে না। বরং এই কাজগুলো করেন ‘অসাধারণরা’। সেই ‘অসাধারণ’দের চেনা দরকার এবং তাদের সম্পর্কে সজাগ থাকা দরকার।

কেউ যদি ধর্মের মতো স্পর্শকাতর ইস্যু নিয়ে মানুষকে বিভক্ত করে ভোটের রাজনীতি করতে চায়—তাহলে তাদের প্রতিহত করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হচ্ছে সব ধর্মের সাধারণ মানুষের মধ্যে ঐক্য। সোশ্যাল মিডিয়ায় সৃষ্টিকর্তা, ধর্ম, ধর্মীয় গ্রন্থ বা ধর্মের অবতারের কথিত অবমাননার গুজব উঠলেই লাঠিসোঁটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে ভাবতে হবে, আপনি কার মন্দিরে আগুন দিচ্ছেন? আপনি কার বাড়িঘরে হামলা চালাচ্ছেন? আপনি কাকে পিটিয়ে মেরে ফেলছেন? সে তো আপনারই প্রতিবেশী। আপনি কেন অন্যের রাজনীতির ঘুঁটি হচ্ছেন?

এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান— সব ধর্মের মানুষের ঐক্য। কার কী ধর্মীয় পরিচয়, সেটি বিবেচনায় না নিয়ে প্রত্যেকের প্রধান পরিচয় যে ‘মানুষ’, সেই মানুষ পরিচয়টিকে সামনে নিয়ে আসা দরকার এবং মানুষ হিসেবে প্রত্যেককে সম্মান করতে পারলেই এবং হুজুগ ও গুজবে কান না দিয়ে বরং প্রত্যেকে তার নিজের ধর্ম নিজের মতো করে পালন করতে পারলেই দেশি-বিদেশি-রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক কোনও উসকানিই সফল হবে না। আর এটা করতে না পারলে আরও অনেক বিপদ দেখার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।

 লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

 
 
/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

নির্বাচন কমিশন আইন হতে বাধা কোথায়?

নির্বাচন কমিশন আইন হতে বাধা কোথায়?

অপুর মৃত্যু, শওকতের প্রতিবাদ, আমাদের ‘সিস্টেম’

অপুর মৃত্যু, শওকতের প্রতিবাদ, আমাদের ‘সিস্টেম’

সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোয় সাধারণ মানুষের ক্ষতি কতটুকু?

সঞ্চয়পত্রের সুদ কমানোয় সাধারণ মানুষের ক্ষতি কতটুকু?

ইভ্যালি: গ্রাহকের টাকা ফেরত দেবে কে?

ইভ্যালি: গ্রাহকের টাকা ফেরত দেবে কে?

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

ভারতে আতশবাজির দোকানে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত ৫

ভারতে আতশবাজির দোকানে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত ৫

পশ্চিম তীরে অবৈধ ইহুদি বসতি, কঠোর প্রতিবাদ যুক্তরাষ্ট্রের

পশ্চিম তীরে অবৈধ ইহুদি বসতি, কঠোর প্রতিবাদ যুক্তরাষ্ট্রের

সিরিয়া ও ইরাকে দু’বছর সামরিক মিশন বাড়ালো তুরস্ক

সিরিয়া ও ইরাকে দু’বছর সামরিক মিশন বাড়ালো তুরস্ক

রাঙামাটিতে নির্বাচনী সহিংসতায় প্রাণ গেলো ইউপি সদস্যের

রাঙামাটিতে নির্বাচনী সহিংসতায় প্রাণ গেলো ইউপি সদস্যের

সাতক্ষীরায় ১০ সাংবাদিক পেলেন মিডিয়া ফেলোশিপ

সাতক্ষীরায় ১০ সাংবাদিক পেলেন মিডিয়া ফেলোশিপ

বুয়েটে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার

বুয়েটে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার

বিশ্বকাপ শেষ সাইফউদ্দিনের, মূল দলে রুবেল

বিশ্বকাপ শেষ সাইফউদ্দিনের, মূল দলে রুবেল

আর কত সুযোগ পাবেন লিটন?

আর কত সুযোগ পাবেন লিটন?

কারখানা থেকে ফেরার পথে ছিনতাইকারীর কবলে পোশাক শ্রমিক

কারখানা থেকে ফেরার পথে ছিনতাইকারীর কবলে পোশাক শ্রমিক

দ্বিতীয় ধাপে ৮১ চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী

দ্বিতীয় ধাপে ৮১ চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী

ইইউ বাজারে রফতানি পণ্যের নায্যমূল্য নিশ্চিত করার আহবান

ইইউ বাজারে রফতানি পণ্যের নায্যমূল্য নিশ্চিত করার আহবান

কুমিল্লায় মন্দিরে হামলা মামলায় ১৬ জনকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ

কুমিল্লায় মন্দিরে হামলা মামলায় ১৬ জনকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune