X
শুক্রবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সেকশনস

ক্ষোভের আগুনে পুড়ুক সব অনিয়ম

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২০:১৮

প্রভাষ আমিন ঢাকায় প্রয়োজনের চেয়ে রাস্তা অনেক কম। আর সেই রাস্তায় ধারণ ক্ষমতার চেয়েও গাড়ি অনেক বেশি। তাই যানজট আমাদের নিত্যসঙ্গী। রাস্তায় নামলেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। অপরিসর রাস্তা, অপরিকল্পিত যান চলাচল, আর অতিরিক্ত মানুষ ও যানবাহনের চাপে ঢাকা পরিণত হয়েছে একটি স্থবির মহানগরে। বাসযোগ্যতার নানান সূচকেও ঢাকার অবস্থান তলানিতে। নানান চেষ্টা, উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আনা যায়নি। বাসে বাসে টক্কর আর আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় ঢাকার রাস্তায় রচিত হয়েছে অনেক বেদনার উপাখ্যান। অ্যাপভিত্তিক যান আসার পর কিছুটা শৃঙ্খলা আসার আশা করা হলেও শুরুতেই শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ না করায় পুরো সুফল পায়নি জনগণ।

ঢাকার রাস্তার এই অনিয়ন্ত্রিত যান চলাচলের সবচেয়ে বড় কারণের নাম মোটরসাইকেল। সাধারণ মানুষ মজা করে মোটরসাইকেলকে বলে রাস্তার রাজা। তাদের যেন নিয়ম-কানুন বা লেনের কোনও বালাই নেই। পুরো রাস্তাটাই যেন তাদের। যখন যেদিকে ইচ্ছা সেদিকেই চলেন তারা। ফুটপাত করা হয়েছে পথচারী চলাচলের জন্য। কিন্তু ঢাকার অধিকাংশ ফুটপাত থাকে মোটরসাইকেলের দখলে। মোটরসাইকেল ঠেকাতে ফুটপাতে রীতিমতো প্রতিবন্ধকতা বসাতে হয়েছে অনেক জায়গায়। তারপরও ঠেকানো যায় না। বাংলাদেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা কম বেশি চার লাখ। তবে ধারণা করি আরও অনেক মোটরসাইকেল চলে রাস্তায়। কারণ, নম্বর প্লেটে ‘আবেদিত’ লেখা অনেক মোটরসাইকেলও দেখি রাস্তায়। এরমধ্যে ঢাকায় কত মোটরসাইকেল চলে, সে সংখ্যাটা জানি না। কাকের সংখ্যার মতো, কম হলে বাইরে চলে গেছে, বেশি হলে বাইরে থেকে এসেছে। মোটরসাইকেলের এই অরাজকতায় নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং বাইক। এখন রাস্তার মোড়ে মোড়ে মোটরসাইকেলের জটলা। সবাই যাত্রী ধরার জন্য বসে থাকে। অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিংয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবেও অনেকে বাণিজ্যিকভাবে যাত্রী পরিবহন করেন। যদিও এর কোনও অনুমোদন নেই।

মোটরসাইকেল যদি রাস্তার রাজা হয়, তাহলে মহারাজা হলো ট্রাফিক পুলিশ। অনিয়ম দেখলেই তারা আটকায়, অনেক সময় অনিয়ম না থাকলেও আটকায়। তারপর কাগজপত্র পরীক্ষা, মামলা, জরিমানা। এই রাজা আর মহারাজাদের লড়াইয়ে চিড়েচ্যাপ্টা সাধারণ মানুষ।

যানজটের এই শহরে দ্রুত কোথাও যেতে বা একটু সস্তায় পরিবহনের জন্য অনেকেই অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেল সুবিধা নেন। এই অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং ব্যবস্থা বেকার সমস্যার একটা তাৎক্ষণিক সমাধান নিয়ে এসেছে। বেকার তরুণ, ছাত্ররা কোনও রকমে একটা মোটরসাইকেল কিনে নেমে পড়েন রাস্তায়। তাতে কোনও রকমে চলে যায় দিন। আমরা শুধু আমাদের সমস্যাগুলো বড় করে দেখি। কিন্তু যারা আমাদের রাইড শেয়ারিং সেবা দিচ্ছে তাদের সুবিধা-অসুবিধাগুলো আমাদের চোখেই পড়ে না। রাইড শেয়ার এখন ঢাকার বাস্তবতা। এটাকে অস্বীকার করার বা ঠেকানোর কোনও সুযোগ নেই, উচিতও নয়। তাই রাইড শেয়ারিং ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হবে। তবে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার নামে যেন আমরা তাদের শৃঙ্খলিত না করি। আগেই যেমন বলেছি, ঢাকার রাস্তার মোড়ে মোড়ে রাইড শেয়ারিংয়ের মোটরবাইকের জটলা থাকে। যেটা যানজট বাড়ায় এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। তাই পুলিশ ভুল জায়গায় দাঁড়াতে দেখলেই আটক করে, মামলা দেয়। এখন ট্রাফিক আইন ভঙ্গের সাজা বেশ কঠিন। জরিমানা হয় মোটা অঙ্কের। মাসে একাধিকবার মামলা খেতে হলে সেই চালকের আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। তাদের লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়। তাই মামলা দেওয়ার আগে তাদের দাঁড়ানোর জন্য কিছু জায়গা ঠিক করে দিতে হবে। তারপরও কেউ নিয়ম ভাঙলে তখন মামলার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। মোটরসাইকেল চালকদের যেমন নিয়ম-কানুন না মেনে যা ইচ্ছা তাই করার অধিকার নেই, আবার পুলিশেরও কথায় কথায় মামলা দেওয়া উচিত নয়। পেটের দায়ে রাস্তায় নামা রাইড শেয়ারিংয়ের চালকদের বিষয়টি অবশ্যই সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। ট্রাফিক পুলিশের ওপরও মামলার টার্গেট থাকে। তাই তারাও মামলা করার জন্য খুঁত খুঁজে বেড়ান। লঘু পাপে দিয়ে দেন গুরু দণ্ড।

গত আগস্ট মাসেই সারাদেশে ৮০ হাজারের ওপর মামলা হয়েছে। জরিমানা হয়েছে ২৫ কোটি টাকার ওপরে। এক মাসে রাস্তা থেকে সরকারের আয় ২৫ কোটি টাকা! কোটি টাকা দামের গাড়ি যখন নিয়ম ভেঙে চোখের সামনে দিয়ে চলে যায়, পুলিশ অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে। আর সস্তা গাড়ি বা মোটরসাইকেলকে বেছে নেয় টার্গেট পূরণের হাতিয়ার হিসেবে। আইন হতে হবে সবার জন্য সমান।  

যেমন বলছিলাম, রাইড শেয়ারিং বেকার সমস্যার এক তাৎক্ষণিক সমাধান। তেমনই এক সমাধান বেছে নিয়েছিলেন কেরানীগঞ্জের শওকত আলী। করোনার আগে তিনি স্যানিটারি সামগ্রীর ব্যবসা করতেন। তা দিয়ে সংসার চলছিল ভালোই। কিন্তু করোনা আসায় সব তছনছ হয়ে যায়। ৯ লাখ টাকা লস দিয়ে তার পথে বসার উপক্রম হয়। তখন তিনি শেষ অবলম্বন হিসেবে একটি মোটরসাইকেল কিনে রাস্তায় নেমে পড়েন। এটাই তার সংসার চালানোর একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু অ্যাপ কোম্পানির বাড়তি কমিশন আর পুলিশের হয়রানিতে অতিষ্ঠ হয়েছিলেন।

সোমবার সকালে রাজধানীর বাড্ডা লিংক রোড এলাকায় পুলিশ তার গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে নেয়। অনুরোধ করেও ফিরে না পেয়ে রাগের-ক্ষোভে নিজের মোটরসাইকেল আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেন শওকত। একজন মানুষ কতটা ক্ষুব্ধ হলে নিজের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বনটি পুড়িয়ে দিতে পারেন, আমরা কি সেটা একটু হৃদয় দিয় অনুভব করতে পারি। ক্ষুব্ধ শওকত আলী সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘রাইড শেয়ারিং অ্যাপগুলো প্রতি রাইডে ২৫ ভাগ টাকা কেটে নেয়। যাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার কাজটুকু শুধু করে অ্যাপগুলো। এ জন্য তারা এই টাকা কেটে নেয়। অ্যাপে চালালে মামলা দেয় না পুলিশ, কিন্তু অ্যাপে না চালিয়ে যাত্রী বহন করলে মামলা খেতে হয়। অ্যাপের জন্য কেন আমি মামলা খাবো? আমি কি রাস্তায় চুরি করতে নেমেছি?’

শওকত আলীর এই প্রশ্নের জবাব কি দিতে পারবেন পুলিশ, অ্যাপ প্রতিষ্ঠান বা নীতিনির্ধারকরা?

শওকত আলীর এই ক্ষোভের আগুন সামনে এনেছে অনেক দিক। ক্ষোভের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘করোনায় ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সংসার চালাতে ও পেটের দায়ে মোটরসাইকেল নিয়ে রাস্তায় নামি। কিন্তু রাইড শেয়ারিং অ্যাপের কারণে রাস্তায় প্রায় সময় মামলা খেতে হয়। দুই সপ্তাহ আগেও মামলা খেয়েছি। সারা দিন রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে যাত্রী আনা-নেওয়া করি। আর যাত্রীদের সঙ্গে শুধু যোগাযোগ করিয়ে অ্যাপগুলো নেয় ২৫ ভাগ টাকা। অ্যাপে চললে মামলা খাবো না, না চললে খাবো এ কেমন অন্যায়।'

শওকত আলী যেদিন তার মোটরবাইকটি পুড়িয়ে দেন, তার পরদিনই সারাদেশে প্রেসক্লাবের সামনে রাইড শেয়ার চালকদের বিক্ষোভ কর্মসূচি ছিল। শওকত আলীর ক্ষোভের সঙ্গে তাদের সম্মিলিত বিক্ষোভের কোনও সম্পর্ক নেই। বিষয়টি নিছকই কাকতালীয়। তবে শওকত আলীর এই আগুন দেওয়া, তাদের বিক্ষোভকে আরও যৌক্তিক করেছে এবং তাদের বঞ্চনার কথা সবার কানে পৌঁছে দিয়েছে। রাইড শেয়ারের চালকরা অ্যাপ কোম্পানির কমিশন ২৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা, পুলিশি হয়রানি বন্ধ, তাদের দাঁড়ানোর জন্য নির্ধারিত জায়গা, আগাম আয়করমুক্ত রাখা এবং শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি চেয়েছেন। শওকত আলীর মতো অনেকে আবার আগ বাড়িয়ে অ্যাপভিত্তিক সেবা তুলে দেওয়ারও দাবি করেছেন।

অ্যাপভিত্তিক সেবা তুলে দেওয়াটা কোনও সমাধান নয়। কমিশন যৌক্তিক করতে হবে, দাঁড়ানোর জায়গা দিতে হবে, হয়রানি বন্ধ করতে হবে। সব মিলিয়ে ঢাকার এই বাস্তবতাকে শৃঙ্খলায় আনতে হবে। তবে শৃঙ্খলার নামে যেন তাদের শৃঙ্খলিত করা না হয়। রাস্তায় শৃঙ্খলা আনতে আইনের কঠোর প্রয়োগ আমরাও চাই। তবে তা যেন মানবিক হয়। শওকত আলীর ক্ষোভের আগুন যেন পুড়িয়ে দেয় এই খাতের সব অনিয়ম, বঞ্চনা আর বিশৃঙ্খলা।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমওএফ/

সম্পর্কিত

একা নয়, ভালো থাকতে হবে সবাই মিলে

একা নয়, ভালো থাকতে হবে সবাই মিলে

মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা!

মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা!

‘আমি ক্রসফায়ারের পক্ষে’

‘আমি ক্রসফায়ারের পক্ষে’

‘খলের কখনও ছলের অভাব হয় না’

‘খলের কখনও ছলের অভাব হয় না’

অভিবাসী শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি জরুরি

আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০২১, ১৭:৩০

মো. আখতার হোসেন জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রতি বছর বিশ্বের অগণিত মানুষ নিজ দেশ ছেড়ে পাড়ি জমান বিভিন্ন দেশে। বিশ্ব অর্থনীতিতে অভিবাসন তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটেও অভিবাসনের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। আশির দশকের শুরু থেকেই দেশের কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলায় ও দারিদ্র্য বিমোচনে অভিবাসন উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। কোভিড-১৯ ও লকডাউনের প্রভাবে সারা বিশ্বের অর্থনীতি যখন চরম সংকটের মুখোমুখি, তখন অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা ভর করেছে দেশের অভিবাসন খাতেও।  

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো’র (বিএমইটি) তথ্যমতে, গত বছর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়ায় ২১,৭৫২.২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মার্চ-মে মাসে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হলেও জুন থেকে এর ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে, যা করোনাভাইরাসের অভিঘাত থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। প্রবাসী শ্রমিকরা মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার দেশসহ প্রায় মোট ১৬৮টি দেশে বসবাস করছেন। তারা মূলত বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের স্বল্পমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে কাজ করেন এবং চুক্তি শেষে দেশে ফিরে আসেন।

প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের তথ্য সংরক্ষণের কোনও যথাযথ প্রক্রিয়া নেই বলে প্রতি বছর কতজন দেশে ফিরছেন এর সঠিক সংখ্যা বের করা বেশ কঠিন।

তবে, করোনা বৈশ্বিক মহামারি উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে অন্য যেকোনও বছরের তুলনায় গত বছর দেশে ফেরত আসা প্রবাসী শ্রমিকের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। আইওএম’র হিসাব অনুসারে, গত বছরের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর মাসে প্রায় চার লাখ প্রবাসী শ্রমিক কোভিড-১৯ এর কারণে দেশে ফেরত আসেন। কোভিড-১৯-এর বিস্তার ঠেকাতে বেশিরভাগ দেশে লকডাউন ঘোষণা করায় এবং জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ায় সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ অভিবাসী শ্রমিকদের নিজ দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

এই প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ঋণদায়গ্রস্ত এবং দেশে তারা বেকার অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। তাই, বিদেশে যেমন তারা কষ্টে দিনযাপন করছিলেন, দেশে এসেও তারা পড়েছেন এক দুর্দশাপূর্ণ পরিস্থিতিতে। আইওএম’র গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে ফেরত আসা ৭৫ শতাংশ প্রবাস শ্রমিক করোনাভাইরাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার বিদেশে ফেরত যেতে আগ্রহী।

সেক্ষেত্রে আমাদের দরকার প্রবাস ফেরত এই শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য একটি কাঠামোভিত্তিক রি-স্কিলিং ও আপস্কিলিং প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত করা, যেটি পরবর্তীতে দক্ষতার বিচারের মাপকাঠিতে প্রবাসে চাকরি নিশ্চিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।

দক্ষতার বিচারে বাংলাদেশ থেকে সাধারণত তিন রকমের অভিবাসন হয়– দক্ষ, স্বল্প দক্ষ এবং অদক্ষ। সাধারণত আমাদের দেশের প্রবাসী শ্রমিকরা অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত কাজ, পরিবহন, হোটেল-রেস্টুরেন্টের কাজ, স্বাস্থ্য সেবা, ঘরের কাজসহ স্বল্প দক্ষ ও নিম্ন উৎপাদনশীল কাজে নিয়োজিত থাকায় যেকোনও ধরনের অর্থনৈতিক অভিঘাতে তারা সমস্যার সম্মুখীন হন। করোনায় বেশিরভাগ দেশে এসব কাজের চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক প্রবাসী শ্রমিকই চাকরি হারিয়েছেন।

বিদেশ গমন করা অধিকাংশ শ্রমিকই কোনও প্রশিক্ষণ ছাড়া বিদেশে যান। অথচ ছয় মাস কিংবা এক বছরের একটি প্রশিক্ষণ বিদেশে তাদের পারিশ্রমিক দুই থেকে তিনগুণ বাড়িয়ে দিতে সক্ষম। তাই দেশে ফেরত আসা শ্রমিকরা যাতে ফের বিদেশ গমনের পর অধিক উপার্জন করতে পারেন, সেজন্য বহির্বিশ্বের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী যেসব খাতে দক্ষ জনবল প্রয়োজন, সেসব খাতে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন, করোনা পরিস্থিতি শ্রমবাজারের রূপ অনেকটাই পাল্টে দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে প্রযুক্তি নির্ভরতা ও উদ্ভাবন এবং নতুন দক্ষতার সুযোগ সৃষ্টি কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। কোভিড-১৯ যেমন কাজের ক্ষেত্রকে বিভিন্নভাবে পরিবর্তন করেছে, একইসাথে অনেক নতুন সুযোগও সৃষ্টি করেছে। দেশের অভিবাসী শ্রমিকদের বেশিরভাগেরই ভাষাগত দক্ষতা ও প্রযুক্তি জ্ঞান কম থাকায় তারা বিদেশে কাজ করতে গিয়ে বিভিন্ন রকম সমস্যার সম্মুখীন হন।

এসব ক্ষেত্রে বিদেশ ফেরত শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে শ্রম পরিস্থিতি আরও সুসংহত করা যেতে পারে। এছাড়া, অবকাঠামো নির্মাণ সংক্রান্ত কাজ, অটোমোবাইল ও ডিজিটাল খাতের কাজে বিদেশে অধিক চাহিদা থাকায়, তাদের এসব কাজ সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ প্রদান করার ব্যাপারে নজর দেওয়া যেতে পারে। আমাদের নারী প্রবাসী শ্রমিকদের একটি বড় অংশই বিদেশে ঘরের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের যদি ভারতের কেরালা, ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের মতো নার্সিং কোর্স করানো হয়, অথবা দক্ষভাবে গৃহপরিচালনা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তবে তা তাদের জন্য যেমন মঙ্গলজনক হবে, তেমনি আমাদের সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামোও সুনিশ্চিত হবে।

অভিবাসীদের জন্য বৈশ্বিক মহামারি সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সরকার কয়েক ধাপে নগদ সহায়তাসহ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও এর মাত্র পাঁচ শতাংশ প্রবাস ফেরত শ্রমিকরা কাজে লাগিয়েছেন। প্রবাসীদের সহায়তার প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনায় সুফল পেতে তাই নীতিনির্ধারকদের নতুন করে চিন্তাভাবনা করা জরুরি।  আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ তৈরির ব্যাপারে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কাকে উদাহরণ বিবেচনা করা যেতে পারে। এসব দেশ, বিদেশ ফেরত শ্রমিকদের নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদানসহ তাদের দক্ষ করে তুলতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে এগিয়ে আসতে পারে।

করোনাকালীন ও পরবর্তী দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবলের বিকল্প নেই। তাই, দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি ও নতুন সম্ভাবনাময় বাজার অনুসন্ধান একসঙ্গে দুটোই চালিয়ে যেতে হবে। আর এটা করা সম্ভব হবে বহুমুখী অংশীদারিত্বের মাধ্যমেই।

লেখক: সিনিয়র সচিব, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, ‎গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

ঐশীর অভিষেক: গত কয়েক রাত ঘুমাতে পারিনি

চার মহাদেশে ‘মিশন এক্সট্রিম’ঐশীর অভিষেক: গত কয়েক রাত ঘুমাতে পারিনি

ঢাকা আসছেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব

ঢাকা আসছেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব

ভিয়েতনামে বন্যা-ভূমিধসে নিখোঁজ ১৮

ভিয়েতনামে বন্যা-ভূমিধসে নিখোঁজ ১৮

পঞ্চম ধাপে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের ইউপিতে আ. লীগের প্রার্থী ঘোষণা

পঞ্চম ধাপে রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের ইউপিতে আ. লীগের প্রার্থী ঘোষণা

বাংলাদেশকে জানতে হলে বঙ্গবন্ধুকে জানতে হবে: আতিকুল ইসলাম

বাংলাদেশকে জানতে হলে বঙ্গবন্ধুকে জানতে হবে: আতিকুল ইসলাম

দুই ডোজের আওতায় পৌনে ৪ কোটি মানুষ

দুই ডোজের আওতায় পৌনে ৪ কোটি মানুষ

কারখানা থেকে ৩০ কোটি টাকার সার গায়েব

কারখানা থেকে ৩০ কোটি টাকার সার গায়েব

কালি বাড়ির সিসিটিভির হার্ডডিস্ক চুরি, সন্দেহের চোখ যেদিকে

কালি বাড়ির সিসিটিভির হার্ডডিস্ক চুরি, সন্দেহের চোখ যেদিকে

বাল্যশিক্ষায় কী শিখছে শিশু?

বাল্যশিক্ষায় কী শিখছে শিশু?

বিএনপি নেতারা আইনের তোয়াক্কা করেন না: ওবায়দুল কাদের

বিএনপি নেতারা আইনের তোয়াক্কা করেন না: ওবায়দুল কাদের

একসঙ্গে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন ৫০ আ.লীগ নেতাকর্মী

একসঙ্গে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন ৫০ আ.লীগ নেতাকর্মী

দুবাই চলে গেছেন ভারতে প্রথম ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত ব্যক্তি

দুবাই চলে গেছেন ভারতে প্রথম ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত ব্যক্তি

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune