X
শুক্রবার, ৩০ জুলাই ২০২১, ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮

সেকশনস

রুক্সিনী কানুর দিনযাপন || অদিতি ফাল্গুনী

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ১৭:৪৪

১.
মা বলতো চা পাতা আর সূর্যের আলো সতীন আছে। সূর্যের আলো বেশি কড়া হবেক ত’ চা পাতা বেশি জন্মাবে না। কি জন্মালে ঘন হবে না। ভারি হবে না।আর বৃষ্টি দ্যাখো চা পাতার দুলহান আছে বটে। আসমান ঘন করে বারিস নামে ত’ বেশুমার সবুজ চা পাতায় ভরে যায় এই লস্করপুর ভ্যালি থেকে সিলেট ভ্যালি অবধি অসঙখ্য বাগান। ডানকান বা ফিনলের মত বৃটিশ সাহেবদের তৈরি চা বাগান বলো কি এখন বাঙালী ম্যানেজারদের চা বাগান বলো…বৃষ্টি আসবে কি দেখতে দেখতে চা পাতাগুলো পুরুষ্টু আর ভারি হয়ে উঠবে। সকাল থেকে দুপুর অবধি পয়লা দফার কাজ শেষে চা পাতা মাপতে গেলে হেসে-খেলে সতেরো থেকে একুশ কেজি কি তার বেশি ঝুড়ির ভার দেখায় মেশিনে। কলম চারার চা পাতা হলে মেশিনে একুশ কেজি আর ফুলি চারা চা পাতা হলে সতেরো কেজি ভার দেখালেই ব্যস, পেয়ে গেল হাজিরার টাকা। বৃষ্টিতে একটু ভিজতে হয় বটে…সে কি বাগানিয়া মেয়েদের অভ্যাস নেই বুঝি? কিন্ত্ত ঘন্টা দুই কাজ করলেই ঝুড়ি ভরে উঠে। পহেলা দফাতেই সকাল আর বিকাল…দুই দফার কাজ উঠে যায়। সেই সাথে বাড়তি কাজের টাকা। আর দু’বেলা কাজ করলে ত’ কথাই নেই। অনেকটা বাড়তি টাকা মিলে যায়। অন্যদিকে এই চৈত্র থেকে অগ্রহায়ণ- ইঙরেজি মাসের যাকে বলে মার্চ থেকে ডিসেম্বর- যখন সূর্য থাকে চড়া তখন চা পাতা হয় না। বাগান কেমন ন্যাড়া ন্যাড়া হয়ে যায়। বহুত বল আছে যেসব বিটি বা মরদলোকের তারা পর্যন্ত বেশি চা পাতা পায় না। হাজিরার সমান মাপের পাতা সারাদিন ধরে তোলা যায় না। অথচ বৃষ্টির সময় সারাদিন চা পাতা তুলে কাজ শেষ হয় না। মরণ তক মা বৃষ্টির ভেতর খুব খাটতে পারত। কি খাটিয়ে ছিল মা! কোনদিন তবু একটু জ্বর-কাশি হয় নি তার। বৃষ্টির দিনের ভর সন্ধ্যায় ভিজে সপসপে শাড়ি-ব্লাউজে ঘরে ফিরে মা শুকনা শাড়ি পরেই চোলাই বানাতে বসে যেতো। একটু চোলাই খেলেই মা ফের চাঙা! মা ছিল যেন দশভূজা। ঐ দুর্গা মায়ের মতোই। বাগান থেকে ফিরে এক হাতে আটা মেখে রুটি বানাচ্ছে, গরম গরম রুটি তরকারি খেতে দিচ্ছে তাদের ভাই-বোনদের, চোলাই বানিয়ে বাবাকে দিচ্ছে আর নিজে একটু খেয়ে নিচ্ছে গা গরম করতে, গরুর দুধ দুয়ে বিক্রি করছে কাছের রেল লাইনের পাশের বাজারে, সকালবেলা রুক্সিনীকে স্কুলে পাঠানোর জন্য গায়ে ধাক্কা দিচ্ছে, “রুকমিনী- উঠ্ রে বিটিয়া- উঠ্! লিখা পড়াহ না করবি ত’ আমার মতই চা পাতি তুলে জিন্দেগি সারা হবে! আরে এ রুকমিনী- হায় হায় বিটিয়ার নাম হামি রাখলাম কানহাইয়া ঠাকুরের বিবি রুকমিনীর নামে আর বিটিয়া কিনা স্কুল কামাই করে ঘুমায়!’

মা’র গায়ে ছাপা শাড়ি বাম দিক থেকে ঘুরিয়ে পরা। কপালে বিন্দি। আজ মাথায় অনেকটা লম্বা হয়ে আয়নায় তাকালে নিজের ভেতর মা’র প্রতিফলন দেখে চমকে যায় রুক্সিনী। সে কি মা’র মতই দেখতে হয়ে উঠছে দিন দিন? এক বৃষ্টির দুপুরে বাগানের অনেকটা গভীরে অনেক বেশি চা পাতা তোলা আর সপ্তাহের তলপে বাড়তি টাকার স্বপ্নে বিভোল মা’কে একটি বিষধর সাপ ছোবল দেবার পর লেবার কলোনীর উঠোনে এনে রাখার পর লম্বা আর ফ্যাকাশে ফর্সা মা’র মতই কি দেখতে লাগছে না রুক্সিনী কে? ফুলবাড়ি চা বাগানের সেই লেবার কলোনীতে তারা ছিল মাত্র ছয়/সাত ঘর উত্তর প্রদেশের মানুষ। পদবিতে তারা কানু। ভূমিজ, পাত্র, রাজবঙশী, মুণ্ডা এমন নানা জাতের বাগানিয়ার ভেতর ইউপিঅলা কি উত্তর প্রদেশ থেকে আসা তারা ছিল মাত্র কয়েক ঘর। অন্যদের দেখে তারা দেখতে একটু আলাদা। সটান লম্বা আর বেতস লতার মত ছিপছিপে, গৌরবর্ণা কানু মেয়েদের দেখলে বাগানের সাফ-সুতরো, ভদ্রলোক ম্যানেজারদের পর্যন্ত নি:শ্বাস ঘন হয়ে আসে। রুক্সিনীর মা যৌবন পুরোপুরি পার না হতেই বিধবা হয়েছিল। সেটা রুক্সিনী যেবার ছয় ক্লাস থেকে সাত ক্লাসে উঠছে সেসময়ের কথা। মা’র নাম ছিল যশোদা। বাবা মারা গেলে যশোদা মা তখন মা আর বাবা দুইই একসাথে হয়ে উঠছে। কিসে যেন মারা গেছিল বাবা? ঐ চা বাগানের লেবাররা যেভাবে মারা যায়। খাটুনি আর মদ। মদ আর খাটুনি। তখন ত’ বড় দাদা এগারো ক্লাসের পড়া ছেড়ে বাবার কাজে নেমে গেলো। মা চা পাতা তোলে আর দাদা বাগানে বাবা যে ভারি কাজগুলো করতো, সেই কাজগুলোয় হাত লাগায়। বাগানে ড্রেন তৈরি, শণ কাটা, বৃষ্টির দিনে নতুন চারাগাছ লাগানো, শেডট্রি লাগানো…দেখতে দেখতে রঘু দাদার হাত-পাগুলো শক্ত, খসখসে হতে থাকে। শক্ত-পোক্ত পুরুষালি গড়নের চেহারা পেতে থাকে রঘু দাদা।
“শুন্ বেটা- তোর নজর খারাপ আছে। সতারো উমর পুরা হয় নাই তোর আর তু ঐ বাকতি লেড়কির পিছ নিয়েছিস? আরে- উ কালা লেড়কিকে ত’ হামি ঘরের বহু মানব না- আমরা ইউপিঅলা। তাতে উর বাবা ত’ গতবার খ্রিষ্টান ধর্ম লিয়েছে।ইউপি থেকে তোর বাপ-দাদা এই বাগানে আসে সেই শ পঞ্চাশ সাল আগে- হৃষিকেশ যেখানে গঙ্গা মাঈয়ের ঘর…সেই হৃষিকেশের আদমি তারা। রামজি কিষেনজির পূজা করি আমরা কানুরা আর তু কিনা এক খ্রিষ্টান লেড়কির পিছ ঢুড়িস?”
রঘু দা কিছু বলে না। ক্রুদ্ধ মা রুটি-তরকারি পাতে বেড়ে দেবার পর নির্লিপ্ত ঢঙ্গে এক গ্লাস হাড়িয়া রঘু দা’র দিকে এগিয়ে দেয় যেমন আগে বাবাকে দিত। যেন দিনের কাজের ক্লান্তি চলে যায়, শরীরের ব্যথা-বেদনা ভুলে যেতে পারে। বিধবা হবার পর থেকে মা আর হাড়িয়া খায় না। শরীরে যত ব্যথা হোক! লক্ষ্য করেছে রুক্সিনী। শুধু লবণ আর আদা দিয়ে চা বানানোর বহর বেড়েছে মায়ের। এক কাপ চা ঠকাস করে রুক্সিনীর সামনে রাখে মা, “খা লবাবের বিটিয়া! তুদের বাপ মরে স্বর্গে গিয়াছে কি বৃন্দাবন গিয়াছে তা’ কানহাইয়া ঠাকুরই জানে! যতদিন পারব তুকে স্কুলে পড়াবো আর তারপর বিহা দেব। ইখন চা খেয়ে আমাকে মন্দকিনী পার কর্। বৈকুণ্ঠ কি পাশ যাব কিনা!”
তারপর সেই ভর রাতে চাপকল থেকে বালতিতে তোলা জলে দিনে দ্বিতীয়বারের মত স্নান করতো মা। বিধবা হবার পর স্নান করা কি পূজা করার বাতিক বেড়ে গেছিলো মা’র। দ্বিতীয় দফা স্নান সেরে মাটির ঘরে বঙশী হাতে বালগোপালের ছবির সামনে মা ধূপ-ধূনা জ্বালিয়ে ভজন গাইতো গুনগুন করে, “আজো শাম মোহোলিয়ো বানশরি বজালো কে? বানশরি বজালো কানহাইয়া, মুরলী শুনালো কে? হর হর শিব করতো যাত, গাগরি শির ভরত যাত, নির নার ভরণ চলি, সুধ নার হি হার কে!”
সে কোন্ হৃষিকেশ নামের গঙ্গা মাঈয়ের তীরের এক ছোট্ট শহর। মেয়েরা সেখানে ঘাগড়া চোলি পরে ঘুরে বেড়াতো। কানহাইয়ার বানশরি শুনতে রাধা নামে এক মেয়ে গাগরি ভরার ছলে, শিবের নাম নিয়ে বারিস টুপটাপ নদীয়ায় যাচ্ছে একা একা। রুক্সিনী- সে কে? গোয়ালা যাদব বঙশের পুত্র কানহাইয়া ভগবান যাকে রথে তুলে নিয়ে পালিয়েছিলেন, তুমি কি সেই রুক্সিনী? মা কি বাবা ডাকতো রুকমিনী বলে? বাঙলা স্কুলে সবাই ডাকে রুক্সিনী? এখন এই ঝমঝম বৃষ্টির ভেতর টুকরিতে পাতা ভরতে ভরতে রুক্সিনীর মনে হতে থাকে যদি একটি সাপ এসে মা’র মত তার পায়ে আলতো চুমু খায়? রঘু দাদা আজ ছয় মাস হয় জেলে। মা’র মৃত্যুর পর বাকতি ঘরের কালো মেয়ে নির্মলা জুলিয়েট বাকতিকেই রঘু দাদা ঘরে আনলো। তা’ নিয়ে পঞ্চায়েতের বিচার বসলো। মা’র কানের এক জোড়া রূপোর মাকড়ি বেচে জরিমানার পয়সা দেয়া হলো। বড় দাদার খ্রিষ্টান মেয়ে শাদি করার জরিমানা। কানহাইয়া ঠাকুরই জানে ঐ কালো মেয়েকে নিয়ে দাদার এত সন্দেহ বাতিক কেন আর এত পেয়ার কেন? মানে পেয়ার না থাকলে, বিবিকে খুব দামি মনে না করলে এত অকারণ সন্দেহ হয় না কোন পুরুষের। তবে বহু মানে ভাবি কিন্ত্ত তার ভাল চরিত্রের মেয়ে। দাদারই থেকে থেকে অকারণ সন্দেহ। একবার ভাবির এক মামাতো ভাই এসেছিলো বহু দূরের এক চা বাগান থেকে। দাদা তাকে আগে দ্যাখে নি। সন্ধ্যা বেলায় কাজ থেকে বাড়ি এসে সেই ভাইয়ের সাথে ভাবিকে হাসতে দেখে হাতের হাসুয়া দিয়ে পেয়ারের বিবিকে এমন আঘাত করলো যে ভাবি প্রায় মরে মরে! কি রক্ত আর কি জখম! সেই জেল হয়ে বসলো দাদার। ভাবির আবার বাচ্চা হবে। সে কাজ করতে পারছিল না। ছোট ভাইটির স্কুল, সঙসারের খরচ, ভাবির পেটে রঘু দাদার বাচ্চা...সব ভার মাথায় নিয়ে লম্বি বা দীর্ঘাঙ্গিনী যশোদা কানুর তেম্নি লম্বি বিটিয়া রুক্সিনী কানু একদিন তার মা’র মতই টানটান, দীর্ঘ পদক্ষেপে পিঠে টুকরি নিয়ে চা পাতা তোলার কাজে বের হয়ে পড়লো। সন্ধ্যা বেলায় বাড়ি ফিরলে কাম থেকে ফেরা মরদ মানুষকে যেমন আদর-যত্ন করা হয়, তেমন আদর-যত্নে ভাবি তাকে চা বানিয়ে দেয়, ভাত বেড়ে দেয় আর হাসুয়া দিয়ে তাকে জখম করা স্বামীর জন্য কান্নাকাটি করে, “পেয়ারের বাড়াবাড়ি। এ ত’ অত্যাচার! তবু তোমার ভাইকে জেলে না নিতে পুলিশ বাবুর পা ধরলাম- পুলিশ আমার কথা শুনল না। জেল থেকে খালাস হলে বাড়ি এসে বাচ্চার মুখ দেখবে ত’ বুঝবে কত অন্যায় করেছে- বাচ্চার মুখ দেখো ঠিক বাপের মতই হবে!”
অভিমানে ভাবির চোখে জল টলমল করে আর তখন রুক্সিনীর তার নিজের থেকে এই কালো ভাবিকে ঢের বেশি সুন্দরীতর মনে হয়। রুক্সিনী গোরি, রুক্সিনী লম্বি...দশ ক্লাস পড়া রুক্সিনীকে রাস্তায় কি বাগানে বাঙালী কি বাগানিয়া সবাই অবাক হয়ে দ্যাখে...তবু রুক্সিনী জানে আজো তার দেহে-মনে সেই রঙ লাগে নি যা কেবল একজন পুরুষই লাগাতে পারে একজন নারীর দেহে-মনে...আর সেই রঙ কি সেই ঘোর যখন কোন নারীর দেহে-মনে লাগে, তখন তার রূপের পাশে কে সিধা হতে পারে? রুক্সিনী যে আজো পারছে না! ইসশ্...দ্যাখো ভাবির চোখে কেমন মায়া...মুখ লজ্জা আর আবেশে লাল...যেন ফাগুয়া পরবের সব রঙ, লাল পরবের সব আবির ভাবির নাকে-মুখে কে লাগিয়ে দিয়েছে! যে মরদ তাকে অন্যায্য সন্দেহ করে, অন্তসত্ত্বা অবস্থায় হাতে আর পিঠে হাসুয়ার কোপ দিয়েছে, চা বাগানের হাসপাতালে তিন দিনের স্যালাইন থেকে উঠতে না উঠতে ডাক্তাররা ভাবির বুকে নল চেপে জেনেছে যে সে বাচ্চার মা হতে চলেছে...রুক্সিনীর সেই রঘু দাদার কথাই চব্বিশ ঘণ্টা ভাবে মেয়েটি। সেই মরদের বাচ্চার জন্যই সে কাথা সেলাই করে, সারাক্ষণ স্বপ্ন ঢালা চোখ-মুখ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। রুক্সিনীর মনে অমন পেয়ার নেই কেন? কাকেই বা পেয়ার করবে রুক্সিনী? এই বাগানে কানু যে কয়েক ঘর আছে তারা, সব ঘরের পুরুষগুলো হয় বিবাহিত পুরুষ অথবা বাচ্চা ছেলে যারা কিনা রুক্সিনীর চেয়ে বয়সে ছোট। দাদা ইউপির ছেলে হয়ে আসাম থেকে আসা কালো বাকতি মেয়ে বিয়ে করেছিল বলে মা’র আপসোষ ছিল খুব। রুক্সিনী ভিন জাতে বিয়ে বসবে না। তবে কাকেই বা বিয়ে করবে সে? আবার সবাই ত’ তারা লেবার জাত বটে। শ্রমিকের জাত। তবে এত ভেদই বা কেন? তার সমান ঘরে পাত্র পেতে হলে তাকে ত’ ফিরে সেই ইউপি চলে যেতে হবে। ইউপি গেছে সে দু/একবার। এখনো কিছু আত্মীয় আছে সেখানে। তবে বেশিদিন মন লাগে নি। আবার এই চা বাগানেই ফিরে এসেছে।
“রুকমিনী- রুকমিনী!”
এত গভীর রাতে তার ঘরে কড়া নাড়ে কে? না, দুই নারীকণ্ঠই। দরজা খুললে দ্যাখে সাগরী আর বেহুলা পাত্র।
‌‌‌‌‌‌‌“কি নিদ্ রে বাবা- বাগানে আগুন আর তুই নিদ যাস?”
সত্যিই ত’ ফুলবাড়ি চা বাগানে আগুন জ্বলে উঠেছে। কে ধরালো আগুন? ভারি উদর নিয়ে ক্লান্ত ভাবি ঘুমিয়ে ছিল রুকমিনীর পাশেই। সে ঘুম ভেঙ্গে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলো।
‌‌“মহাদেবের শাপ-মহাদেবের শাপ-বাগান ত’ আগুনে খেয়ে নিবে”— বলে শোরগোল তুলছে বাগানের প্রবীণেরা। সেই রাতটা কেটেছিল আগুনের আলো আর লেবার কলোনী জুড়ে তুমুল হৈ চৈয়ের ভেতর। আর সকাল বেলাই ভাবির উঠেছিল ব্যথা। তীব্র ব্যথা। লেবার পেইন। ভাবির দু’বছরের ছোট, অবিবাহিত ননদ সে। তখনো তার নিজের বিয়ে হয় নি। পুরো পরিবারের সে-ই যেন পুরুষ মানুষ। এর তার হাত-পা ধরে, একটা ভ্যানগাড়ি এনে ভাবিকে নিয়ে সে ছুটলো হাসপাতালের পথে। যেতে যেতে দেখলো ফুলবাড়ি চা বাগানের সামনে রেল লাইনের পাশে পড়ে আছে অসঙখ্য দগ্ধ আর অর্দ্ধ-দগ্ধ হারো, বাতারু, ডুপি, ময়না আর টিয়া পাখির শব।
“রুকমিনী দিদি-রুকমিনী দিদি!”
চা বাগানের সামনে রেল লাইনের পাশে তাম্বু খাটিয়ে যারা কিছুদিন ধরে কাজ করছিল তাদের একজন ঐ ময়মনসিঙহ থেকে আসা রহিম নামের ছেলেটি। নিজে থেকে রুকমিনীর সাথে কয়েকদিন কথা বলতে এসেছে। মাঝে মাঝেই রুকমিনীকে সে ফুল দেয়।
“দিদি- তোমার জইন্য এই চাম্পা ফুল পাড়লাম” কি “দিদি-দরো, তোমার জইন্য দুইডা জবা ফুল পাড়লাম।“
একদিন রহিমকে তার তাম্বুর এক বয়েসী লোক ঠাট্টাই করে বসলো, “রহিম বাদশা আর রূপবানের কেস হইলো নাকি তর, অ রহিম?” ঠাট্টাটা বুঝেছে রুকমিনী। সেই থেকে রহিমকে দেখলে অস্বস্তি হয় তার।
“দিদি গো- কই যাইবাইন?”
“হাসপাতাল। এখন সময় নাই।’’
ভ্যানে চেপে এবঙ দাদার বউকে চাপিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটতে ছুটতে পথেই রুকমিনী দ্যাখে রুণা নিয়া, নাইয়ো লাঙ, সরি খঙলা আর রেমি পনঙকে। খাসি মেয়েরা বলতে গেলে পানপুঞ্জি থেকে বেরই হয় না। ঐ এক স্কুলে যা দেখা হতো। আজ পানপুঞ্জি থেকে বের হয়েছে কেন?
‌প্রসবের ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতেই নির্মলা জুলিয়েট বাকতি জিজ্ঞাসা করে আগুনে খাসি মেয়েদের পানপুঞ্জি পুড়েছে কিনা? সেবার আগুন লাগার পর ঢাকা থেকে অনেক সাঙবাদিক এসেছিল। তারা ইনোকল (ইউনোকল), মাগুরছড়া এসব শব্দ মিলিয়ে আশপাশের সবাইকে নানা প্রশ্ন করতো যার কোন উত্তরই রুক্সিনী জানত না। সে শুধু জানতো তাদের চা বাগানের অনেকটা জায়গা পুড়ে গেছিল, সামনে বিধ্বস্ত হয়েছিল রেললাইন, অনেক পাখি মরে গেছিল আর খাসি মেয়েদের পানপুঞ্জিতে অনেক পান গাছ পুড়ে গেছিলো।

 

২.
প্রথমে ফাড়ি বাগানের ছোট্ট টিনের শেডের হাসপাতাল থেকে মূল চা বাগানের হাসপাতাল হয়ে উপজেলার হাসপাতাল ঘুরে শেষতক রঘু দাদার বউয়ের কোলে ছেলে এলো বটে। সেই লবকুমারের বয়স এখন বারো। রঘু দাদা জেল থেকে ছাড়া পেল মাস চারেক পর। ছেলের মুখে নিজের মুখ কেটে বসানো দেখার পর থেকে আর সে বউকে সন্দেহ করে নি। ঘরে ফেরার দু’মাসের মাথায় রঘু দাদা মৌলভিবাজার থেকে অনেক দূরে হবিগঞ্জের চান্দপুর চা বাগানের অর্জুন কানুর সাথে রুক্সিনীর বিয়ে ঠিক করলো। অজুর্ন কানু অবশ্য বিয়ে ঠিক হবার মাস খানেক আগে এই ফুলবাড়ি চা বাগানে এসেছিলো মামা বাড়ি বেড়াতে। হাতে তীর নিয়ে একটি পাখির দিকে তাক করার সময় রুক্সিনীর সাথে তার দেখা হয়।
“এই ধেনুকে (ধনুক) দ্যাখ্। ত্রেতায় রামের ধেনু আর দ্বাপরে অর্জুনের এই ধেনু। সব জুলুমের জবাব এই ধেনু! রাম ত’ সীতা মাঈকে শাদি করেছিলেন ভারি একটা ধেনুক উঠিয়ে...”
কেন জানি লজ্জিত হয়েছিল রুক্সিনী। জীবনে কখনো মাথা নীচু না করা রুক্সিনী সহসাই অবনত হয়েছিল লজ্জায় আর সেই প্রথম সে অনুভব করে যেন এক আশ্চর্য আবির তার চুল থেকে কপাল হয়ে গাল বেয়ে আর গলা হয়ে ক্রমাগত বাহিত হচ্ছে গোটা শরীরে। ফাগুয়ার সব রঙ, লাল পরবের সব আবির তার গায়ে লেগে যাচ্ছে! তবু শাদির বছর না ঘুরতে সেই রুক্সিনীর গায়েই উঠলো কিনা সাদা থান? ট্রেড ইউনিয়নের যে নেতাকে বিশ্বাস করে স্ট্রাইকে গেছিল অর্জুন, সেই নেতাই যখন লেবারদের ইজ্জত বেচে দিল মালিকের কাছে...কারখানা থেকে চাকরি যাবার পর এক ভোর রাতে কখন সে রুক্সিনীর কাছ থেকে উঠে গিয়ে নিজের হাতে জীবন শেষ করলো কে জানে! চাকরি গেছে বলে রুক্সিনী ত’ তাকে গাল-মন্দ করে নি।বরঙ সেই রাতে ভালবাসা দিয়ে অজুর্নকে সব দুঃখ ভুলাতে চেয়েছিল। নিথর অর্জুন সেই রাতে ভালবাসা নেয় নি। শুধু বলেছিল যে তার বড় মজবুরি হয়েছে আর রাতটা সে ভাল মত ঘুমাতে চায়।রুক্সিনীর গর্ভের সন্তানের কথা একবার ভাবল না অর্জুন?
“মাঈ!‘
অধিরথ স্কুল শেষ করে ঘরে ঢুকছে। বাগানে এখন স্ট্রাইক চলছে। প্রতিদিন সকালে দু’ঘণ্টা স্ট্রাইক চলে। তারপর কাজ শুরু হয়। রুক্সিনীকে এখন কাজে যেতে হবে। এর ভেতর অধিরথের জন্য দুপুরের রান্না সেরেছে সে।
“বড় রাস্তার পাশে হাজার হাজার মানুষ রে মাঈ! কেউ ইকোনো জোন চায় না! বাপার তিন কিয়াড় জমি কি বেহাত হবে মাঈ?”
“শুধু জমি না রে বেটা...তোর বাপের শ্মশান যে ঐ জমিতে!”
“কাল যে ডিসি অফিসে নাকি যাবে সব- তুই যাবি মাঈ?”
“যাব বেটা-’’
“কি করিস মাঈ? কি ঘসিষ?”
অর্জুনের মরিচা পড়া তীর-ধনুক তখন মাত্রই ঘষে ঘষে চকচকে করে তুলছিল তার বিধবা স্ত্রী রুক্সিনী। কপালে লেপ্টে থাকা একগাছি চুল ডান হাতে তুলে ছেলের দিকে তাকিয়ে চোখ নাচায় রুক্সিনী, “তোর জন্য বেটা। এগারো বছর বয়স হলো না তোর? বাপা নাই-এই ধেনুক এখন তোর!”

সম্পর্কিত

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২১, ২৩:১৩

[তৌহিন হাসানের প্রথম উপন্যাস ‘উড়ালপঙ্খী’ বইমেলা ২০২১-এ পেন্সিল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বইটি পড়ার ইচ্ছে হয়েছিল প্রচ্ছদ দেখে। নিজের দেশ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মাইল দূরে বসে স্পর্শ করে, দেখেশুনে বই কেনার সুযোগ কোথায়! কিন্তু ‘উড়ালপঙ্খী’ আমাকে একবিন্দুও নিরাশ করেনি। সহজ, সাবলীল গদ্যশৈলীর সাথে কাব্যময়তার পাশাপাশি ভালো লেগেছে উপন্যাসের বুনন। এক্ষেত্রে লেখকের স্বাতন্ত্র্যের ছাপ সুস্পষ্ট। কোনো টাইমলাইন বা ক্রনোলোজি না মেনে একেবারে ভিন্ন আঙ্গিকে ঘটনাগুলোকে উপস্থাপন করেছেন। মূল চরিত্র পঙ্খীর জীবনের নানা ঘটনাকে ঘিরেই পুরো কাহিনি আবর্তিত হয়েছে।
একটা গল্প বা উপন্যাস পড়ার পর সেটা নিয়ে স্বয়ং লেখকের সাথে কথা বলা বা মত বিনিময়ের সুযোগ পাওয়াটা এক অনন্যসাধারণ অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার কথাই তুলে ধরা হয়েছে।]


প্রশ্ন : এটি আপনার প্রথম উপন্যাস। কবে, কখন এই উপন্যাস লেখার ভাবনা মাথায় এলো?
উত্তর : ‘উড়ালপঙ্খী’ আমার প্রথম উপন্যাস। এটি লেখার পরিকল্পনা প্রথম মাথায় আসে আজ থেকে পাঁচ-ছয় বছর আগে। গল্পের কাঠামোটা তখনই ভেবে রেখেছি। কিন্তু লেখা শুরু করেছি অনেক দেরিতে, ২০২০ সালের নভেম্বরে।

প্রশ্ন : উপন্যাসের বিষয়বস্তু গতানুগতিকতার বাইরে এবং বেশ অপ্রচলিত। মনস্তত্ত্ব জটিল একটা বিষয়। প্রেম, বিরহ এসব নিয়ে না লিখে এই কনসেপ্টটাই কেন বেছে নিলেন?
উত্তর : আসলে গতানুগতিকতার বাইরে কি না জানি না! আমার ভেতর থেকে যেভাবে এসেছে, যেভাবে স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেছি, সেভাবেই লিখে গেছি৷ আর উপন্যাসের ঘটনা বা চরিত্রগুলো যে কল্পনাপ্রসূত তা-ও কিন্তু না! এই চরিত্রগুলোকে আমি বাস্তব জীবনে বিভিন্নভাবে দেখেছি, জেনেছি, বিশ্লেষণ করেছি। চেনা চৌহদ্দির মধ্যে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা থেকে তুলে এনে উপন্যাসে সন্নিবেশ করেছি৷

প্রশ্ন : বইটির প্রচ্ছদ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার ভাবনা শুনতে চাই।
উত্তর : আমি যেহেতু প্রফেশনালি বইয়ের প্রচ্ছদ করি, নিজের বইয়ের প্রচ্ছদ করাটা আমার জন্য বেশ কঠিন। একটা দ্বিধা কাজ করে। উপন্যাস লেখার মাঝামাঝি সময়ে এসে প্রচ্ছদে ছবি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেই৷ যেহেতু মূল চরিত্রের আবেগটাকে আমি খুব ভালো করে জানি, তার চেহারার নির্লিপ্ততাকে প্রচ্ছদে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি। বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী অনেকেই বলেছে কাভারে কেন একটা মেয়ের মুখ! প্রচ্ছদ তো এবস্ট্রাকট হয়, তাতে নানা রকমের আর্টিস্টিক মোটিফ থাকে! কিন্তু আমার মনে হয়েছে একজন পাঠক যখন বইটা পড়ে মূল চরিত্রটাকে অনুধাবন করবে তখন বুঝতে পারবে কেন এই প্রচ্ছদ ব্যবহার করেছি। বই না পড়ে আগে থেকে সেটা বোঝা যাবে না।
একজন পাঠক হিসেবে আমারও কিন্তু একই অনুভূতি হয়েছে৷ ‘উড়ালপঙ্খী’ পড়ে শেষ করার পর প্রচ্ছদের দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছে এই বইয়ের এরচেয়ে উত্তম প্রচ্ছদ আর হতে পারে না!

প্রশ্ন : পঙ্খী প্রথা ভাঙায় বিশ্বাসী। সমাজ-সংসারের প্রচলিত নিয়মগুলো তাকে বেঁধে রাখতে পারেনি। সে জায়গা থেকে ‘উড়ালপঙ্খী’ নামটা আমার কাছে যথার্থ মনে হয়েছে। আপনারও কি নামকরণের ক্ষেত্রে এরকম ভাবনা ছিল?
উত্তর : নামকরণের ক্ষেত্রে আমার ভাবনাটা খুবই সরল ছিল। যেহেতু মেয়েটার নাম উড়ালপঙ্খী, নামটা তার বাবার দেওয়া এবং গল্পটা তাকে ঘিরেই, তাই উপন্যাসের নামও উড়ালপঙ্খী। তাছাড়া সে সব সময় মুক্ত থাকতে চাইত, কারো কথা শুনত না। সামাজিক বিধিনিষেধ মানেনি। নিজের যেটা ভালো লাগে তাই করে। এসব কারণেই উড়ালপঙ্খী নামটা বেছে নেওয়া।

প্রশ্ন : উপন্যাসের বুনন সম্পর্কে কিছু বলুন।
উত্তর : ব্যক্তিগত জীবনে আমি প্রচুর কথা বলতে পছন্দ করি। একটা বিষয়ে কথা বলার মাঝখানে বিভিন্ন উদাহরণ, সাবক্যাটাগরি, ক্রস-রেফারেন্স চলে আসে৷ এটা আমার কথা বলার ধরন বা অভ্যাস। লেখার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে৷ উপন্যাসের সংজ্ঞা এখনও আমার কাছে দুর্বোধ্য। ঔপন্যাসিক, কবি, সাহিত্যিক—এই শব্দগুলো পছন্দ করি না। নিজেকে স্টোরি টেলার ভাবতে ভালোবাসি। আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই৷ গল্পের তো শাখা থাকে, ঘটনা একটা হতে পারে কিন্তু তাকে বর্ণনা করার সময় অনেক ডালপালার বিস্তার হয়। পঙ্খীর গল্পটা বলার সময় টুকরো টুকরোভাবে নানা গল্প প্রাসংঙ্গিকভাবেই চারপাশ থেকে চলে এসেছে। হয়তো অন্যভাবে বলতে পারতাম! কিন্তু আমার কাছে যেভাবে কমফোর্টেবল মনে হয়েছে, আমি সেভাবেই বলে গেছি। 

প্রশ্ন : কতদিনে উপন্যাসটা শেষ করেছেন? নির্মাণের  সময়ের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথা শুনতে চাই।
উত্তর : খুব অল্প সময়ের মধ্যে শেষ করতে হয়েছে, প্রায় আড়াই মাসের মতো। যেহেতু পাঁচ বছর ধরে গল্পটা মাথায় ছিল অনেকটা প্রি-প্রোডাকশনের মতো, তাই লেখার সময় খুব একটা ভাবতে হয়নি৷ পার্শ্বচরিত্র, বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা আগে থেকেই মাথায় ছিল। ব্যাপারটা আসলে অনেকটা রান্না করার মতো! উপকরণগুলো আগে থেকে প্রস্তুত থাকলে রান্নায় বেশি সময় লাগে না।
আর অভিজ্ঞতা বলতে যেটা হয়েছে কখনো একটানা লিখতে পারিনি। আবার লেখার নির্দিষ্ট কোনো সময়ও ছিল না৷ রাত-দিন এক হয়ে গিয়েছিল। জীবনযাপনে একটু ব্যাঘাত হয়েছে৷ খানিকটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল সবকিছু।

প্রশ্ন : পড়া শেষ হবার পরেও একটা অদ্ভুত বিষণ্নতা আর ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম। পঙ্খীর মনোজগতের যে টানাপড়েন, তার জীবন পরিক্রমায় যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে—আমার মনে হয়েছে এর মাধ্যমে পাঠকের মনে প্রভাব বিস্তার করতে চান। এটা কী সচেতনভাবে করেছেন নাকি অবচেতনে ঘটেছে?
উত্তর : শুধু আমার ক্ষেত্রে না, যেকোনো লেখকের ক্ষেত্রেই এটা সত্য যে তারা সচেতনভাবে পাঠকের মনে প্রভাব বিস্তার করতে  চান না। আমি শুধু আমার  মতো করে নিজের ভাষায় একটা চরিত্র সম্পর্কে লিখে যেতে চেয়েছিলাম। পাঠকের মনোজগতে এর কী প্রভাব পড়বে সেটা পাঠকের মস্তিষ্কপ্রসূত। একজন পাঠক কিভাবে পঙ্খীকে গ্রহণ করেছে সেটা একান্তই তার ব্যাপার। অনেক পাঠক হয়তো বিষণ্ন চরিত্রই পছন্দ করেন না। আবার অনেকেই পঙ্খীর জীবনের বিভিন্ন ঘটনার সাথে নিজের মিল খুঁজে পাবেন। 
 
প্রশ্ন : আজকাল যেটা দেখা যাচ্ছে অনেক লেখকই উপন্যাস প্রকাশের আগে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে সেটা লিখছেন যা পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশ হচ্ছে। লেখার সময় কোনো চরিত্রকে রাখবেন, কার কি পরিণতি হবে সেটা পাঠকদেরই জিজ্ঞেস করছেন। এটা কেন হচ্ছে?
উত্তর : মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভাব বিনিময় করা। লেখক, কবি, সাহিত্যিকরা যেকোনো শিল্প-মাধ্যমের দ্বারা নিজের দর্শন প্রকাশ করেন। শিল্প তো চর্চার ব্যাপার। চিন্তা ও চর্চা—এই দুটোর সমন্বয়ে শিল্পের বিকাশ ঘটে। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়টা খুব অস্থির। এখন ভাব বিনিময়ের অসংখ্য মাধ্যম। সব সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় প্র‍্যাকটিসটা পাল্টে গেছে। যার ফলে ভাব প্রকাশ করতে গিয়ে লেখকরা হোঁচট খাচ্ছেন। বাধ্য হয়ে তখন পাঠকের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে। অনেকে দেখা যাচ্ছে প্রচ্ছদ আপলোড করছেন তিনটা। পাঠককে বাছাই করার অপশন দেওয়া হচ্ছে। এটা খুবই আশঙ্কার বিষয়। এটা কারোর দোষ না, শুধুই চর্চার অভাব।

প্রশ্ন : তিমির একজন বিপ্লবী হতে চেয়েছিল, কর্পোরেট কালচারের অংশ হতে চায়নি। ছাত্রজীবনে তাকে দেখা গেছে যথেষ্ট দায়িত্বহীন। আবার পঙ্খীর স্বামী হিসেবে সে যথেষ্ট দায়িত্বশীল ছিল। এই চরিত্র নিয়ে আপনার ভাবনা শুনতে চাই।
উত্তর : বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা ক্লাসে ৪০-৪৫ জন ছাত্রের মধ্যে কেউ থাকে বিপ্লবী, কেউ খুব সিরিয়াস, কেউ কবি অথবা শিল্পী, আবার দু-চারজন থাকে খুব বোকাসোকা যাদের নিয়ে সবাই স্যাটায়ার করে। আজকাল কোনো সামাজিক সমস্যা হলে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী টিএসসিতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। তিমির তাদেরই একজন, কোনো কল্পিত চরিত্র না। সে অন্যায় সহ্য করতে পারত না। বামপন্থি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। ছাত্রজীবনে তিমির প্রেমবন্ধন এসবে আস্থা রাখত না। কিন্তু একটা সময় হোঁচট খায়। সামাজিক, অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে তার ভাবনায় পরিবর্তন আসে। তখন পঙ্খীকে বিয়ে করে সংসারী হয়। এমনকি কর্পোরেট কালচারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। একটা প্রাইভেট ফার্মের জন্য বিজ্ঞাপন লেখা শুরু করে। তিমির আসলে বাইরের কেউ না, আমাদের সমাজেরই একজন।

প্রশ্ন : ‘উড়ালপঙ্খী’ পড়ে মনে হয়েছে জেনেটিক সায়েন্স, সাইকোলজি, নারীদের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারগুলো সম্পর্কে আপনার বেশ ভালো দখল আছে। এই বিষয়গুলোতে কী আগে থেকেই আগ্রহ ছিল?
উত্তর : এই বিষয়গুলোতে আমার আলাদা আগ্রহ ছিল। বিভিন্ন বিষয়ে আমার পড়াশোনা শুরু হয় ক্লাস নাইন থেকে। তখন প্রথম মহাকাশবিজ্ঞান নিয়ে পড়া শুরু করি। সে সময় নিজে টেলিস্কোপ বানাই। ধর্ম সম্পর্কে বিভিন্ন বই, জেনেটিক সায়েন্স ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ জাগে। এরপর ধীরে ধীরে পরিচিত হই সিগমন ফ্রয়েড, সিমন দ্য বোভোয়ারের সাথে।
আমি তখন সরকারি স্কুলের ছাত্র। প্রাইভেটে ইংরেজি পড়তাম অঞ্জন ভদ্র নামে পাশের স্কুলের একজন শিক্ষকের কাছে। পড়া শেষে স্যার আধা ঘণ্টার একটা বাড়তি ক্লাস নিতেন অন্যান্য বিষয়ে। এর সাথে সিলেবাসের পড়ার কোনো সম্পর্ক ছিল না। আমি জানার আগ্রহ থেকে সেই ক্লাসে থাকতাম। এরিস্টটল, জ্যোতির্বিজ্ঞান, শারীরতত্ত্ব, জেনেটিক সায়েন্স, মনস্তত্ত্ব, রবীন্দ্রনাথ, লালনসহ বিভিন্ন বিষয়ে স্যার কথা বলতেন যার আশিভাগই বুঝতাম না। স্যার বলতেন—শুধু শুনে যাও, কোনো প্রশ্ন করবে না। এখন না বুঝলেও আজ থেকে ১০ বছর পরে আমার কথাগুলো ঠিকই বুঝবে। যারা বুঝতে পারবে তারা কেউ লেখক হবে, কেউ-বা দার্শনিক'। তখন এসব বিষয় নিয়ে বেশি বেশি পড়া শুরু করি। এই বাড়তি  জানার আগ্রহের কারণে আমার পড়াশোনায় কোনো ক্ষতি হয়নি বরং সব সময় ভালো রেজাল্ট করেছি। আর ১০ বছর পর স্যারের কথাগুলোর মানেও আমি ঠিকই বুঝতে পেরেছি।

প্রশ্ন : ‘উড়ালপঙ্খী’কে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন? যে ভাবনাটা আপনার মাথায় ছিল কাগজে-কলমে কী সেটাকে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন?
উত্তর : আমার বিশ্বাস নিজের ভাবনাটাকে কাগজে-কলমে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি। এ বিষয়ে আমার আত্মতৃপ্তি আছে। কোনো আক্ষেপ নেই। যদিও অনেকে বলেন লেখকের আত্মতৃপ্তি বলে কিছু নেই। কিন্তু এই উপন্যাসের ক্ষেত্রে আমার মনে হয় আমি সব ঘটনা এবং চরিত্রকে ভাবনা অনুযায়ী ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি।
আর নিজস্ব মূল্যায়নের কথা যদি বলি তবে বলব এখানে পাঠকরা নিজের আশপাশের নানা ঘটনাকেই খুঁজে পাবেন। চিরচেনা সমাজের বিভিন্ন বিষয়, জেনেটিক্স, মনোজাগতিক টানাপড়েন, সোশ্যাল ট্যাবুসহ নানা ঘটনা এখানে উঠে এসেছে। অনেক চরিত্রের সাথে পাঠকরা নিজেদের রিলেট করতে পারবেন। আমার বিশ্বাস অনেক পাঠক নিজেকে তিমির ভাববেন। তিমিরের মতো চরিত্র বা সিকদার চাচার মতো যৌন নির্যাতকরা আমাদের সমাজে বাস করে। আবার অনেক মেয়ের জীবনের অভিজ্ঞতা হয়তো পঙ্খীর সাথে মিলে যাবে। হিন্দু-মুসলিম বিয়ে কিংবা হুট করে বিয়ে করে ফেলা—এসব ঘটনাও তো আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে!

প্রশ্ন : শেষটা হয়েছে একটা ধোঁয়াশার মাঝে। এমন একটা সমাপ্তিই কী চেয়েছিলেন?
উত্তর : হ্যাঁ, এমন একটা সমাপ্তিই চেয়েছিলাম। এমন বেশকিছু ঘটনা আমার চেনাজগতেই ঘটে গেছে। আমাদের সমাজে বহুগামিতা বেড়েছে—এটা একটা বড় সামাজিক সংকট। আমি সচেতনভাবেই উপন্যাসের শেষে তিমির এবং ফরহাদকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছি। শেষটা হয়েছে ক্লিফহ্যাঙ্গারের মতো যা পাঠককে অপেক্ষায় রাখবে। এর আরেকটা কারণ হচ্ছে আগামীতে ‘উড়ালপঙ্খী'র পরবর্তী খণ্ড আসবে।
 
[একজন পাঠক হিসেবে পরবর্তী খণ্ডটি পড়ার জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করব। ‘উড়ালপঙ্খী’ আমাকে এক বিষণ্ণ-সুন্দর অনুভূতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। পড়া শেষ হবার বহুদিন পরও এর রেশটুকু মনে থেকে গেছে। 'রামের সুমতি', 'পরিনীতা', 'পথের পাঁচালী' কিংবা 'পুঁইমাচা'—এসব গল্প-উপন্যাস পড়ে যেমন মনে হয়েছিল যতবার পড়ব ততবারই চোখ ভিজে যাবে, ‘উড়ালপঙ্খী’ও একইভাবে আমার মন ছুঁয়ে গেছে। একজন শক্তিশালী লেখকই কেবল পারেন পাঠককে এই অনুভূতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে।
মনস্তাত্ত্বিক ঘরানার উপন্যাস ‘উড়ালপঙ্খী’ সমকালীন বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারে একটি চমৎকার সংযোজন। যারা গতানুগতিকতার বাইরে ভিন্ন স্বাদের কিছু পড়তে চান তাদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে সুখপাঠ্য হবে। পঙ্খীর জীবনের অন্ধকার চোরাগলিগুলোতে ভ্রমণ করতে করতে পাঠকের মনে সমাজের ভয়ানক কিছু অসঙ্গতির চিত্র ফুটে উঠবে। শিশু-কিশোরদের যৌন নির্যাতন, ভিক্টিম ব্লেমিং, স্টেরিওটাইপস, ট্যাবু, পুঁজিবাদসহ নানা রকমের সামাজিক সমস্যা সচেতন পাঠকমাত্রের মনে ভাবনার উদ্রেক করবে। আমাদের সমাজে 'সিকদার' রূপী মামা, চাচা, ভাই অনেক মেয়েরই থাকে। অথচ নির্ভয়ে এসব বলার মতো জায়গা থাকে না বলেই পঙ্খীদের জীবন এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন! 'আলোয় আলোয় মুক্তি' চেয়েও পঙ্খীরা অন্ধগলিতে হারিয়ে যায় বারবার। পঙ্খীর মনোজগতের সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। একজন মানু্ষের জীবনের ভিত তৈরিতে তার শৈশব এবং কৈশোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা অপরিসীম।
তিমির চরিত্রটি আমাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেছে। তিমিরের বয়ানে জীবন ও সমাজ নিয়ে যেসব ভাবনা ও দর্শন লেখক তুলে ধরেছেন তার বেশিরভাগের সাথেই একাত্ব হতে পেরেছি। খুব মন খারাপ হয়েছে, কিছুটা রাগও—যখন তিমির আর পঙ্খীর পথ আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু এটাও মনে হয়েছে এমনটা না করলে হয়তো একটা গতানুগতিক সমাপ্তিই ঘটত।
প্রাঞ্জল বর্ণনায় প্রতিটি চরিত্র চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। জেনেটিক সায়েন্স, সাইকোলজির পাশাপাশি মেয়েদের মনোজগৎ সম্পর্কে লেখকের জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটেছে পুরো উপন্যাসজুড়ে। পঙ্খী স্রোতের বিপরীতে চলা এক অসীম সাহসী তরুণী। সে চেয়েছিল কন্যা মুক্তি অপরিসীমার জন্য চার দেয়ালের ভেতরে একটা আলোকময় জগৎ গড়ে তুলতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কতটুকু পেরেছিল! সেটা খোঁজার দায়টুকু আগ্রহী পাঠকদেরই থাকুক!—শা. মি.]

/জেডেএস/

সম্পর্কিত

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১২:৫১

মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬-২০১৬) লেখক পরিবার থেকেই এসেছিলেন। পিতৃমাতৃ—দুকূলই লেখক ছিলেন। এমনকি শ্বশুরকূলও। পুরুষানুক্রমেই এঁরা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মহাশ্বেতা দেবীর জীবনটা সাহিত্যের কাছেই সঁপে দিয়েছিলেন। লিখেছিলেন দুহাত খুলে। ‘হাজার চুরাশির মা’ (১৯৭৪) তার অন্যতম আলোচিত উপন্যাস। গ্রন্থখানির পাঠপরিক্রমায় কিছুটা সাবধানী মনে এগুতে হয়। মাঝেমধ্যেই নিত্যনতুন চরিত্রের দেখাসাক্ষাৎ ঘটে। সিংহভাগ চরিত্রই দিব্যনাথ-সুজাতা পরিবারের। উপন্যাসখানি বুঝে নিতে চাইলে এদের মধ্যকার পারষ্পারিক সম্পর্ক স্মরণে রাখা খুবই জরুরি। পরিবারটি অনেকটা উনিশ শতকের ক্লাব-কালচারের ন্যায় সামন্তধারায় গড়ে ওঠে। ভোগবাদী প্রবৃত্তি এদের মধ্যে তীব্রতর। দিব্যনাথের নিজস্ব ‘চার্টার্ড অ্যাকাউনটেনসির আফিস।’ প্রতিনিয়ত মোটা টাকা আসে। জ্যোতি, নীপা অথবা তুলির স্বামীরাও কর্পোরেট কর্পোরেশনে হাই সেলারির জব করে। সবাই ভোগবিলাসে মত্ত। এদের চারিত্রিক স্খলনও কম নয়। অফিসের টাইপিস্ট মেয়েকে নিয়ে দিব্যনাথের ঢলাঢলি, মাঝেমধ্যেই রক্ষিতা নিয়ে বাইরে সান্ধ্য কাটানো। ঢেকেঢুকে নয়, প্রকাশ্য দিবালোকে সর্বসম্মুখে সহাস্যে এসব ফষ্টিনষ্টি করে বেড়ায়। এসব সে পৌরুষ-অধিকার বলেই জানত। কেবল বর্তমান নয়, চিরকালই দিব্যনাথ নারী নিয়ে নোংরামি করে আসছে। শাশুড়িও কম প্রশ্রয় দেয়নি। ছেলে তার ‘পুরুষ বাচ্চা’, স্ত্রৈণ নয় বলে অহংকারও করত। দিব্যনাথের পিতাও নাকি যৌবনকালে এমনই ছিল। প্রায়শই সন্ধ্যাবেলা নারী নিয়ে বাইরে কাটাত। পরপর দুই পুরুষের নৈতিক অধঃপতন তৃতীয় পুরুষ জ্যোতি অথবা নিপাদের কাছেও সমভাবেই সমর্থন পায়। সামন্ত প্রভুর ন্যায় দিব্যনাথ নিজেকে পরিবারের ‘বস’ বলে বিবেচনা করত। সন্তানেরা অনেকেই ইনিয়েবিনিয়ে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে বাবাকে ‘বস’ বলেই সম্বোধন করত। এমনকি কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতীও। তবে এই সন্তানের মেজাজটা ছিল খানিকটা ভিন্ন ধার ও ধারার।

২.
অর্থবিত্তে স্বচ্ছল হলেও পরনারীতে অভ্যস্থ হওয়ায় দিব্যনাথ-সুজাতার দাম্পত্য-সম্পর্ক সুখের ছিল না। দিব্যনাথ সুজাতাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতো না। বরং যৌন পার্টনার হিসেবেই বিবেচনা করত। অসুখবিসুখ হলে খোঁজখবর নিত না। নবজাতকের কান্না থেকে বাঁচার জন্য তেতলায় ঘুমাত। প্রসূতি স্ত্রী থেকে দূরে অবস্থান করত। শাশুড়িমাও ছিল নারীবিদ্বেষী মহিলা। সুজাতার সন্তান জন্মদান সইতে পারত না। প্রসবকাল দেখলেই বাড়ি ছেড়ে চলে যেত। তীব্র প্রসবযন্ত্রণা নিয়ে সুজাতাকে একা একাই নার্সিং হোমে যেতে হতো। দিব্যনাথের নজর কেবল একদিকে—‘আবার মা হবার যোগ্য শরীর হচ্ছে কি না সুজাতার।’ দুবছর পরপর সুজাতার চার সন্তান জন্মে। জ্যোতি, নীপা, তুলি। সর্বশেষ ব্রতী। প্রথম ও শেষে পুত্রসন্তান, মাঝখানে দুটি কন্যাসন্তান। ব্রতীর দুবছর বয়সকালে সুজাতা লম্পট দিব্যনাথের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ করেছিল। লেখকের ভাষায়—দিব্যনাথ কিছুতেই ওঁকে পঞ্চমবার ‘মা’ হতে বাধ্য করতে পারেনি। দিব্যনাথ সুজাতাকে ফার্মের কাজ ছেড়ে দিতে বলেছিল। সুজাতা মানেনি। ‘কাজ না-ছাড়া সুজাতার দ্বিতীয় বিদ্রোহ।’ 
বাবামায়ের মধ্যকার এই টানাপড়েন ব্রতী খানিকটা বুঝতে পারত। বুঝতে পারত মাতৃবক্ষের সুগভীরে লুকানো তীব্র গোপন ব্যথা। ব্রতীর মনটা কম্পাসের কাটার ন্যায় মমতাময়ী মাতা জগজ্জননী সুজাতার দিকে হেলে থাকত। ব্রতী সর্বদা মায়ের ওপর চোখদুটো সুস্থির রাখত। দশ বছর বয়সেও খেলাধুলা ফেলে বাড়ি চলে আসত। শিয়রে বসে মায়ের মাথায় বাতাস করত। এজন্য দিব্যনাথ ব্রতীকে সইতে পারত না। কনিষ্ঠ সন্তান হলেও শত্রু বিবেচনা করত। ব্রতীকে টিপ্পনি কেটে দিব্যনাথ কখনো বলত ‘মাদার্স চাইল্ড’ কখনো বলত ‘মেয়েমার্কা ছেলে। নো ম্যানলিনেস।’                 
মতাদর্শিক দ্বন্দ্বে এই পুঁজিবাদী পরিবারের চরিত্রগুলো দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে পারিবারিক ‘বস’ দিব্যনাথ ও জ্যেষ্ঠ তিন সন্তান জ্যোতি, নীপা, তুলি। সেইসঙ্গে এদের পূর্বপ্রজন্ম ঠাকুরমাও। অপরদিকে সুজাতা ও তার কনিষ্ঠ সন্তান ব্রতী। এই দ্বন্দ্ব কেবল একটি পরিবারের নয়, এটি সমসাময়িক সমাজ অথবা রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব। এমনকি বৈশ্বিকও। বিশ্বজগৎ সংসার তখন ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দুধারায় দ্বিধাবিভক্ত। দ্বন্দ্বটা এতই জটিল ছিল যে, ভাই-বোন, পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রীর সমুদয় সামাজিক ও আত্মিক বন্ধন শিথিল হয়ে যায়। এমনকি রক্তের বন্ধনও।
 
৩.
দিব্যনাথপুত্র ব্রতী পিতার পুঁজিবাদী আদর্শে আস্থা হারিয়েছিল। আস্থা হারিয়েছিল সমসাময়িক সমাজ ব্যবস্থাপনায়। আস্থা হারিয়েছিল মুনাফাখোর ব্যবসায়ী ও স্বার্থান্ধ নেতাদের ওপর। পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থার পরিবর্তে সমাজতান্ত্রিক জীবনব্যবস্থার স্বপ্ন লালন করত। সমতাভিত্তিক একটি সুন্দর সুষম সমাজ বিনির্মাণের লক্ষে হৃদয় তার জেগে উঠেছিল। লেখকের ভাষায়, তখন সত্তর দশক। মুক্তির কাল। মুক্তির দশকে জনমুক্তির আন্দোলনে অনেকটা সংগোপনেই সংযুক্ত হয়েছিল ব্রতীরা। তখন সাম্রাজ্যবাদী শোষক সরকার ক্ষমতায়। জেলের পাঁচিল উঁচু করে। নতুন নতুন ওয়াচ টাওয়ার বসায়। বন্দিদের জন্য ফটকঅবন্দি খোলে না। সুগভীর রাতে ভ্যানভর্তি বন্দি এলে লেখকের ভাষায়—‘ওপর থেকে ক্রেন নামে। জন্তুর মত বন্দীকে যন্ত্রের নখে আঁকড়ে ক্রেন উঠে যায়, জেলের ভেতর নামিয়ে দেয়।’ জন্তুর মতো হলেও যারা জেলে যায়, তারা অন্তত প্রাণে বেঁচে যায়। কিন্তু বাইরের ব্রতীরা নিদারুণভাবে প্রাণটা হারায়। রাষ্ট্রযন্ত্র নানা উপায়ে নির্মম নির্যাতন অব্যাহত রাখে। নির্জন সলিটারি সেলে নির্যাতন চালায়। লেখকের ভাষায়—‘সাউন্ডপ্রুফ। দরজা-জানালায় ফেলটমোড়ানো ফাঁপা রবারের নল বসিয়ে সাউন্ডপ্রুফ করা। ঘরের আর্তনাদ, গোঙানি, মারের আওয়াজ, জেরাকারীর গর্জন, সব শব্দ ঐ নলের জন্য ঘরের ভেতরেই বন্দী থাকে।’

৪.
বিজিত, প্রার্থ, লালটু, সমু ব্রতীর বিপ্লবী বন্ধু। এরাও চেয়েছিল স্বসমাজটিকে বদলে দিতে। সহযোদ্ধা বন্ধুদের বাঁচাতেই সেদিন ব্রতী গিয়েছিল সমুদের বাড়িতে। কিন্তু বাঁচাতে পারেননি। নিজেও বাঁচতে পারেনি। গভীর রাতে সমুদের বাড়ি ঘেরাও করে গুন্ডারা। হিংস্র গলায় বলে—‘বের করে দিন, লয়তো ঘরে আগুন দিমু!’ ব্রতীর কণ্ঠ শুনে কেউ একজন বলে ওঠে—‘হালায় আরেক মালটারে জুটাইছে। বাইর হ ঘটির পোলা।’ হাতে হাত রেখে স্লোগান দিতে দিতে ব্রতীরা বেরিয়ে আসে। বাইরে অন্ধকার। ঘুটঘুটে আধার মুখ হাসি-উল্লাসে ফেটে পড়ে। ভয়ংকর গন্ডগোল। ‘বাড়ী বাড়ী আলো নিভে যাচ্ছে, দরজা জানালা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, চমকে সরে যাচ্ছে ভয়চকিম মুখ।’ সহসা স্লোগান থেমে যায়। সমবেত ঘাতকেরা খটখট গুলির শব্দ করতে করতে চলে যায়। সমুর দরিদ্র বাবা থানায় গেলে আততীয়দের নাম শুনে ধমকে ওঠে পুলিশ। পুলিশভ্যান আসতে আসতে সরে যায় ঘাতকেরা। নিতু ওরফে দীপুর মতো ভদ্রছেলেকে তো থানার সামনেই পিটিয়ে হত্যা করে। ‘প্রকৃত খুনি কখনো বন্দুক ধরে না।’ ব্রতী-সমুদের হত্যা-পরিকল্পনাকারীরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এমনকি প্রত্যক্ষ ঘাতকদেরও বিচার হয় না। বুক ফুলিয়ে এরা নির্বিবাদে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। সমুর দিদিকে দেখে নির্মম ব্যঙ্গ করে, হাহা করে হাসে আর বলে—‘তর ভাইয়ের ছাদ্দ করলি না ক্যান? ভাল কইরা খাইতাম!’ সুজাতার মনে কত প্রশ্ন—যে শহরে এমন সব জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়, সেখানে পরপর কী করে সংস্কৃতিমেলা, রবীন্দ্রমেলা অনুষ্ঠিত হয়?

৫.
সুজাতা টেলিফোনেই ব্রতী হত্যার খবর পায়। অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে—‘কাটাপুকুরে আসুন।’ পিতা দিব্যনাথ কাটাপুকুরে না গিয়ে দৌড়ায় পত্রিকা-অফিসে। পুত্রহত্যার খবর ধামাচাপা দিতে দিব্যনাথ ‘দড়ি টানাটানি করে বেড়াচ্ছিলেন।’ সফলও হয়েছিলেন। লেখক বলছেন—‘দিব্যনাথের ছোটাছুটি দড়ি টানাটানি সফল হয়েছিল। পরদিন খবরের কাগজে চারটি ছেলের হত্যার খবর বেরোয়। নাম বেরোয়। ব্রতীর নাম কোন কাগজে ছিল না।’ পত্রিকাপাতা থেকে ব্রতীকে মুছে দিয়েছিল দিব্যনাথ। মুছতে পারেনি মর্গ থেকে। সেখানে  ব্রতীর অবস্থান ‘হাজার চুরাশি’ নম্বরে। সেদিন ব্রতীর মৃত্যু পিতার কাছে কলঙ্কজনক মৃত্যুরূপে বিবেচিত হয়েছিল। মমতাময়ী মা সুজাতা সুস্থির থাকতে পারেননি। ছুটে গিয়েছিলেন কাটাপুকুরের লাশ ঘরে। প্রাণধন পুত্র ব্রতীর মৃত্যু নিয়ে কোথাও একটু সংশয় ছিল। তাই মুখটুকু দেখতে চেয়েছিলেন। অসীম করুণায় ডোম জানিয়েছিল—‘কি আর দেখবেন মাইজী? মুখ কি আর আছে কিছু?’ সীমাহীন মমতায় সুজাতা সবলে ব্রতীর মুখের আবরণ সরিয়ে দেয়। ‘শানিত ও ভারী অস্ত্রের উলটো পিট দিয়ে ঘা মেরে থেঁতলানো, পিষ্ট, ব্রতীর মুখ।’ আঙুল বোলানোর মতো ইঞ্চি পরিমাণ জায়গাও মসৃণ ছিল না। সবই দলিত, মোথিত, থেঁতলানো। তবু সুজাতা ব্রতী! ব্রতী! বলে আঙুল বোলায়। 
ব্রতীদের অপরাধ, ওরা দেয়ালে দেয়ালে বয়ান লিখত। ওরা লাল অক্ষরে লাল শব্দে দেয়াল রঙিন করে তুলত। কেবল মুক্তকণ্ঠে সমবেত স্লোগানই ধারণ করত না, প্রাণভরে বিশ্বাসও করত। দেবীর ভাষায়—‘ব্রতীরা এই এক নতুন জাতের ছেলে। স্লোগান লিখলে বুলেট ছুটে আসে জেনেও ব্রতীরা স্লোগান লেখে। কাটাপুকুর যাবার জন্যে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেয়।’ ব্রতীরা এতটাই সমাজবিরোধী যে, দিব্যনাথের ন্যায় পিতারা মুখাগ্নিও করতে আসে না। ব্রতীদের লাশ কাটাপুকুরের মর্গে পড়ে থাকে। রাতে পুলিশ গাদাগাদি করে শ্মশানে বয়ে আনে। এরপর আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। শ্রাদ্ধে বিশ্বাসীজনও যথানিয়মে শ্রাদ্ধ করার সুযোগটুকুও পায় না। স্ফীত লাল চোখে বসে থাকতে হয় সারাটা দিন।

৬.
নকশাল আন্দোলনকে (১৯৭০) কেন্দ্র করে মহাশ্বেতা দেবী উপন্যাসটির আখ্যানভাগ সাজিয়েছেন। কল্পনার সঙ্গে সমসাময়িক সমাজ বাস্তবতার দরকারি সমন্বয় ঘটয়েছেন। সেই সঙ্গে কলকাতার বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তির সংগ্রামে (১৯৭১) কলকাতার বুদ্ধিজীবীরা ‘বাংলাদেশের সহায় ও সমর্থনকল্পে পশ্চিমবঙ্গ তোলপাড় করে ফেলেছিল।’ কিন্তু নকশাল আন্দোলনের হত্যাকাণ্ড তাদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়নি অথবা এরমধ্যে পৈশাচিকতা খুঁজে পাননি। যদি পেতেন, ‘তাহলে ত কলকাতার কবি ও লেখক ওপারের পৈশাচিকতার সঙ্গে এপারের পৈশাচিকতার কথাও বলতেন।’ কিন্তু বলেননি। মূলত প্রান্তজনের বেঁচে থাকার লড়াই, লড়াই শেষে নিদারুণ পরিণতিই তুলে আনতে চেয়েছেন মহাশ্বেতা দেবী। দেবীর গদ্যশেলীতে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও অসীম মমতায় সেটি কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। উপন্যাস হয়ে উঠছে উপভোগ্য সেইসঙ্গে সাব-অলটার্ন হিস্ট্রির দরকারি দালিলিক শিল্পকর্ম। ২৮ জুলাই প্রয়াণদিবসে লেখকের প্রতি অশেষ প্রণতি।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২১, ১৮:৩৬

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা। কাঁটাবনে অবস্থিত প্রকাশনা সংস্থা ‘উজান’ এমন ঘোষণা দিয়েছে তাদের প্রকাশিত ‘কোরিয়ার কবিতা’ ও ‘কোরিয়ার গল্প’ নিয়ে আলোচনার জন্য।
এই বই দুটিতে রয়েছে কোরিয়ার বিশ ও একুশ শতকের উল্লেখযোগ্য কবিদের কবিতা এবং একই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ কথাসাহিত্যিকদের ছোটগল্প। 
উজানের এই আয়োজনে সহযোগিতা করছে লিটারেচার ট্রান্সলেশন ইনস্টিটিউট অব কোরিয়া। 
বই আলোচনার সর্বোচ্চ পুরস্কার ২০ হাজার টাকা। এছাড়া দ্বিতীয় পুরস্কার ১৫ হাজার এবং তৃতীয় পুরস্কার ১০ হাজার টাকা। এই প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত সর্বোচ্চ ১০ আলোচকের প্রত্যেককে দেওয়া হবে ৫ হাজার টাকা মূল্যমানের বই। 
আলোচনাগুলো বাছাই করবেন দেশের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও অনুবাদকদের সমন্বয়ে গঠিত বিচারক কমিটি। একজন একটি বই নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন। আলোচনা বাংলাভাষায় লিখিত বা ভিডিও মাধ্যমে হতে হবে। 
অংশগ্রহণে ইচ্ছুক অনলাইনে ফরম পূরণ করতে করতে পারবেন এসব লিংকে www.ujaninfo.com, www.porospor.info। ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আলোচনা জমা দিতে হবে [email protected] এ।
বিস্তারিত জানতে এবং বই সংগ্রহ করতে পারবেন www.ujaninfo.com, www.facebook.com/UjanPrakashan, https://www.facebook.com/UjanBooks থেকে।  

/জেডএস/

সম্পর্কিত

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

কথা হয় জানি না 

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২১, ১৯:৪৪

কিছু ছবি এখনও আছে বলে কথা বলার দু-একটা মানুষ পাওয়া যায়>প্রতিবার মেঘ হলে মেঘমল্লার শুনে বৃষ্টি ভোলা যায় না>নিহত পশুররক্ত আর মাংস বাতাসে>দুঃখ আছে বলে কয়েকটা কবিতা এরপরও লেখা হবে>সকালগুলো ঘুমিয়ে কাটে বলে আর অপরাধবোধ জাগে না>রাত পেয়ে যাই>বাতাস কিন্তু ঘুরে যাচ্ছে>সময়ে সব বদলায় এ তত্ত্ব এখনও প্রমাণের চেষ্টা চলে>ঘরের মধ্যেও এক নেশা আসে বাইরেও এক নেশা যায়>নেশা>হেই হ্যালো, আমি হাস্নাহেনার গন্ধও পাচ্ছি>মাংসের গন্ধের সাথে>ছবি কিন্তু সব কথার উত্তর দেয়>হুহু করে উত্তর>থেকে বাতাস আসবে দুমাস পরেই>যদি বলি ছবিকে, কী, সে পাল্টা প্রশ্ন করে না>যদি বলি, কেন ও ইত্যাদি, পাল্টা প্রশ্ন করে না>যার যা উত্তর তা বুঝিয়ে দেয় আজকাল প্রতি রাতেই প্রায়>উত্তর পেতে পেতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে…>চরাচরে পাখি থাকলে বলে দিয়ো তাদের পাখায় আর কোনো শব্দ নেই>তাদের ওড়ায় আর কোনো নীরবতা নেই<

/জেডএস/

সম্পর্কিত

বোকা দুপুরের নাম

বোকা দুপুরের নাম

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

চন্দ্র গুরুং-এর কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

বব কফম্যানের কবিতা

করেছি নোঙর... ও অন্যান্য ।। ফিলিপ দনিস

করেছি নোঙর... ও অন্যান্য ।। ফিলিপ দনিস

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২১, ১২:১৮

বিকালের মেঘ ভেদ করে ঠোঁটজুড়ে আসে স্নিগ্ধ জলধারা। বহমান শান্ত জীবনের স্তুতি। তিনি হেসে চলেন, মন মাতানো মুগ্ধতা ছড়ায় চারপাশে। কংক্রিট শহরের মিহি আলোর অডিটোরিয়ামে মানুষ মানুষের বিশ্বস্ত চোখ খোঁজে। স্বপ্ন দেখে সরল বৈভবহীন জীবনের। যে স্বপ্নের স্পন্দন এখন ছড়িয়ে গেছে সমস্ত বাংলাদেশে। মঞ্চে যিনি অনর্গল কথা বলছেন সেই ‘আলোকিত মানুষ’ এর স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। বাগ্মী এ মানুষটির জীবন বহু কাজে বহু সৃষ্টিতে উদ্ভাসিত।

তাঁকে বুঝতে হলে তাকাতে হবে তাঁর অজস্র সৃষ্টিশীল বইয়ের দিকে, পাঠ নিতে হবে তাঁর আত্মজৈবনিক বইয়ের সরস বয়ান। জানতে হবে তাঁর ব্যাপক কর্মজীবন সম্পর্কে। চোখ খোলা রেখে আমাদের নিবিষ্ট হতে হবে সবুজ নিসর্গ, মানুষের কাছাকাছি বাংলার শ্যামল প্রান্তরে, বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যে। সেই প্রকৃত সত্য খুঁজতে গিয়ে যন্ত্র বা নাগরিকতার ছোবলে যেখানে তাঁর হৃদয়ও আশাহত হয়েছে।

তিনি কবিতায় উচ্চারণ করেছেন―

একা একা টের পাই চারপাশে―আকাশে ও নিচে―
অবিশ্রান্ত আর্তনাদে ভেঙে যায় বহুদিনকার
ধানভানানীর গান এদেশের, পাটক্ষেত, বেহুলার ঘর―
ঢেঁকির পুরনো গল্প, সাপ, ঝোপ, দোয়েলের দেশ―
বাংলাদেশের আবহমানের।
(শাব্দিত কলঘর, কাব্যগ্রন্থ―মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, পৃ. ২০)

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, জন্ম ২৫ জুলাই ১৯৩৯ সালে। অবিভক্ত ভারতে কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকায়। পিতা সেময়কার স্বনামধন্য অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ ও নাট্যকার আযীম উদ্দীন আহমেদ, মাতা করিমউন্নেসা বেগম। তাঁর পৈতৃক বাড়ি বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলায়। দেশভাগের পর আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ পরিবারের সাথে চলে আসেন তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে। পিতার চাকরি সূত্রেই তার শৈশবের কিছু সময় কাটে টাঙ্গাইলের করটিয়ায়। সেখানকার বংশী নদী তাঁর শৈশবের মনোহর চিন্তায় দারুণভাবে গেঁথে আছে। তাঁর আত্মজৈবনিক বই বহে জলবতী ধারা প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড, নিষ্ফলা মাঠের কৃষক ইত্যাদি তাঁর বহমান জীবনের নানান অভিজ্ঞতা, জীবন গল্পের সুনিপুণ বৃত্তান্ত। পিতার নাট্যচর্চা ও কবিতার খেয়াল তাকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করত। কলেজে পড়া অবস্থায় বুঁদ হয়েছেন কবিতায় ও সরল জীবনের দর্শনে। মূলত তার ব্যাপ্তিময় জীবনের ভিতটা সেসময়ই রচিত হয়েছিল। কলেজজীবনে তার কিছু শিক্ষকের অবদানও এক্ষেত্রে স্বীকার্য। কলেজজীবনেই তিনি ভ্রমণ করেন ইংরেজি কবিতা ও বাংলা কবিতার অপার সৌন্দর্যের ভূমিতে। যা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে পড়াশোনা শেষ করে ১৯৬১ সালে মাত্র বাইশ বছর বয়সে মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে যোগদানের মধ্যদিয়ে তাঁর শিক্ষকতা জীবন শুরু হয়। যা অব্যাহত ছিলো ১৯৯২ সাল পর্যন্ত। হরগঙ্গা কলেজ ছাড়াও শিক্ষকতা করেছে সিলেট মহিলা কলেজ, রাজশাহী কলেজ, ঢাকায় ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজ (বর্তমানে সরকারি বিজ্ঞান কলেজ) এবং সর্বশেষ ঢাকা কলেজে দীর্ঘসময় অধ্যাপনার পর অবসর গ্রহণ করেন। এছাড়াও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে বাংলা পড়াতেন। অধ্যাপক হিসেবে তার সফলতা ও জনপ্রিয়তা ছিল গগনচুম্বী। মূলত তাঁর সকল কাজের মাধ্যমেই তিনি মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন। উজাড় করে দিয়েছেন সবটুকু। শিক্ষক হিসেবে তাঁর নিজের কথায়―

আমি সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলাম। সাহিত্যের স্বপ্ন ও সৌন্দর্য আজীবন আমার চেতনা-জগতে যে-হীরের দীপ্তি ছড়িয়েছে আমি সেই উজ্জ্বলতাকে ছাত্রদের ভেতরে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছি। তাদের সেই আনন্দে উজ্জীবিত করতে চেয়েছি। পরীক্ষায় ছাত্রদের বেশি নম্বর পাওয়াবার জন্যে পরিশ্রম করে জীবন নিঃশেষ করাকে আমার কাছে ‘দুর্লভ মানবজন্মে’র অপচয় বলেই মনে হয়েছে। জীবন কত দীপান্বিত ও জ্যোতির্ময় তা একজন ছাত্র সবচেয়ে ভালো করে জানতে পারে তার জীবনে দীপান্বিত শিক্ষকদের কাছ থেকে। (নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, পৃ. ১১)

বর্তমান সময়ের শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে স্পষ্ট কথা বলতেও এ সফল অধ্যাপক দ্বিধা করেননি। প্রসঙ্গক্রমেই তিনি লিখেছেন―

আজ দেশের স্কুল-কলেজগুলোয় কার্যত লেখাপড়া হচ্ছেই না। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ লক্ষ শিক্ষকের অধিকাংশই শিক্ষক হওয়ার যোগ্য নন, যাঁরা যোগ্য তাঁরা ছাত্রদের দেন অতি সামান্য। ফলে অভিভাবকরা কেউই বিদ্যালয়কে আজ তাঁদের সন্তানদের বিকাশের অঙ্গন হিসেবে মনে করেন না। ফলে বাণিজ্যিক উদ্যমসম্পন্ন গৃহশিক্ষকরা আজ হয়ে উঠেছেন ছাত্রসমাজের মূল আশ্রয়। (নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, পৃ. ১৭৬)

বাংলাদেশের ষাটের দশকে নতুনধারার সাহিত্য সৃষ্টির আন্দোলনের পুরোধা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। প্রায় একযুগ ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকা সম্পাদনা করার মাধ্যমে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলা সাহিত্য বাঁকবদলের ধারায়, প্রগতিশীল সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াসে। নিশ্চিত আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন সেসময়কার তরুণ কবি-সাহিত্যিকদের। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সূচনালগ্ন হতে যুক্ত হন উপস্থাপনায়। রুচিশীল ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান, উপস্থাপনায় তার নিজস্ব ধরন ইত্যাদি কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন জনপ্রিয় উপস্থাপক খ্যাতিতে ও ব্যক্তিত্বে। তাঁর হাত ধরেই অনেক মেধাবী তরুণ উঠে আসে। তাঁর ‘আমার উপস্থাপক জীবন’ বইটিতে তিনি তুলে ধরছেন তাঁর উপস্থাপক জীবনের নানান দ্বন্দ্ব ও প্রতিকূলতা। বর্ণনা করছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে যাত্রা আর সমৃদ্ধির বিভিন্ন দিক। আমাদের মহান মুত্তিযুদ্ধে পাকসেনাদের হাতে আটক হয়েছিলেন তিনি। উপস্থাপক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা তাঁকে সে যাত্রায় প্রাণে বাঁচিয়ে ছিল বলে তিনি বইটিতে বলেছেন নির্দ্বিধায়। তাঁর ‘সংগঠন ও বাঙালি’ বই পাঠকের কাছে খুবই জনপ্রিয়। জাতীয় জীবনে সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা, বাঙালির সংগঠনের দুর্বলতা এবং তা কীভাবে আমাদের জাতীয় জীবনে উন্নতির মূলবাধা হয়ে দাঁড়ায় তার স্পষ্ট বয়ান রয়েছে বইটিতে। সংগঠনের অভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রায় ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, ব্যক্তি ডুবে থাকে তা আত্মকেন্দ্রিকতায় এসবের সত্য উপলব্ধি উঠে এসেছে তাঁর লেখায়।

১৯৭৮ সালে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’। তিনি কবিতায় লিখেছেন―

রাত্রিকে বাসে না ভালো কেউ সম্প্রতি। কেননা এ
রাত্রি সব এক করে দেয়। রাত্রির নির্বাক কাফন
জামার পৃথক রঙ, স্বতন্ত্র চুলছাঁটা, আস্তিনে মাপ
মুছে দিয়ে সবাইকে আদ্যোপান্ত এক পাতলুনের ভেতর
নিয়ে আসে।
(মৃত্যুময়ের জন্য, কাব্যগ্রন্থ―মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, পৃ. ৫৬)

হ্যাঁ, তিনি এমন রাত্রিকেই দূর করতে চেয়েছেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন সংস্কৃতিমান, মুক্ত চেতনার সৃজনশীল মানুষ না হলে আগামী বাংলাদেশ হবে অনুর্বর, অন্ধকার। তিনি বইয়ের সোনালি অক্ষরে, জ্ঞানের অমৃতবাণীতে বদলাতে চেয়েছেন সমাজকে, তরুণদের। বই পড়া আন্দোলন ও নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের লক্ষ হচ্ছে―আগামী দিনের অর্থাৎ তরুণদের বড় করে তোলা ও তাদের সংঘবদ্ধ জাতীয় শক্তিতে পরিণত করা। প্রায় বিয়াল্লিশ বছর ধরে তাঁর নেতৃত্বে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বিভিন্নভাবে কাজ করে চলেছে অবিরাম। এগুলো মধ্যে রয়েছে―দেশভিত্তিক উৎকর্ষ কার্যক্রম, পাঠাভ্যাস উন্নয়ন কর্মসূচি, ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি, আলোর ইশকুল, কেন্দ্রের লাইব্রেরি, আলোকচিত্র চক্র, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি। সারা দেশে প্রায় ২৪ লাখ ছাত্র/ছাত্রী বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কার্যক্রমের সাথে যুক্ত। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে শিক্ষাবিদ ও লেখক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন―

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের জীবনের সর্বাধিক কীর্তি হিসেবে দেখা দেয়। যেখানে আমরা অনেকে মিলে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে পারি না, সেখানে একক প্রচেষ্টায় এত বড় একটা প্রতিষ্ঠান গড়া যে তাঁর বিশেষ যোগ্যতার প্রকাশ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর ব্যাপ্তি সারা দেশ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশের সীমানা ছাড়িয়েও।…সায়ীদ লিখেছেন প্রচুর। কবিতা ও ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও ভাষণ, স্মৃতিকথা ও জার্নাল, নাটক ও অনুবাদ।…তাঁর মধ্যে মিলিত হয়েছে শিল্পী ও কর্মী, ভাবুক ও উদযোগী। তাঁর চিন্তা ও সাধনায় দেশ ক্রমাগত উপকৃত হোক। (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়, পৃ. ৩৫, ৩৬)

সত্যিকারভাবেই বহুমুখী কাজের মাধ্যমে তিনি উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশে। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩২টি। গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতায় সাহিত্যে বিভিন্ন শাখায় তিনি অবদান রেখেছেন ও রেখে চলেছেন। সামাজিক নানা কাজেই তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। যেমন ডেঙ্গু প্রতিরোধ আন্দোলন, পরিবেশ দূষণবিরোধী আন্দোলন ইত্যাদি। তিনি তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন সম্মাননা ও পুরস্কার। এগুলোর মধ্যে আছে―জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার (১৯৭৭), র‌্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার (২০০৪), একুশে পদক (২০০৫), পরিবেশ পদক (২০০৮), বাংলা একাডেমি পদক (২০১২) ইত্যাদি।

‘আলোকিত মানুষ চাই’ এর স্বপ্নদ্রষ্টা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের দেখানো পথেই আগামী দিনের তরুণদের মধ্যে ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’ বই পড়ার মাধ্যমে এমন অনুভূতির প্রবহমানতায়, চর্চায় হয়তো আমরা পাব সংঘবদ্ধ, প্রগতিশীল, আত্মকেন্দ্রিক জীবনকে পেছনে ফেলে আসা দেশপ্রেমিক বুদ্ধিদীপ্ত এক প্রজন্ম। যা বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে।

এ মহীরুহের জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা।

সহায়ক গ্রন্থ

১. বহে জলবতী ধারা (প্রথম খণ্ড), আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৩।
২. বহে জলবতী ধারা (দ্বিতীয় খণ্ড), আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০১১।
৩. মৃত্যুময় ও চিরহরিৎ, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৮৮।
৪. নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৯৯।
৫. বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ১৯৯৯।
৬. আমার উপস্থাপক জীবন, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৫।
৭, সংগঠন ও বাঙালি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ঢাকা, ২০০৩।
৮. আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়, সম্পাদনা―আতাউর রহমান, ঢাকা, ২০১৫।
৯. ইন্টারনেট।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

সর্বশেষ

পেটের চর্বি কমাতে যা খাবেন

পেটের চর্বি কমাতে যা খাবেন

বন্ধু দিবসে নকশীকাঁথার নতুন গান

বন্ধু দিবসে নকশীকাঁথার নতুন গান

বনবিড়াল পিটিয়ে হত্যাকারী সেই ব্যক্তি আটক

বনবিড়াল পিটিয়ে হত্যাকারী সেই ব্যক্তি আটক

রাশিয়া সফর শেষে দেশে ফিরলেন নৌবাহিনী প্রধান

রাশিয়া সফর শেষে দেশে ফিরলেন নৌবাহিনী প্রধান

ডোবায় মিললো শিশুর হাত-পা বাঁধা লাশ 

ডোবায় মিললো শিশুর হাত-পা বাঁধা লাশ 

‘লকডাউন কনটিনিউ’র সুপারিশ স্বাস্থ্য অধিদফতরের

‘লকডাউন কনটিনিউ’র সুপারিশ স্বাস্থ্য অধিদফতরের

কারবারিরা লেনদেন করছে ভার্চুয়াল মুদ্রায়

মাদক ভয়ংকর-৫কারবারিরা লেনদেন করছে ভার্চুয়াল মুদ্রায়

একাধিক মামলা হচ্ছে হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে

একাধিক মামলা হচ্ছে হেলেনা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে

ভারতের আরও দুই ক্রিকেটার করোনায় আক্রান্ত

ভারতের আরও দুই ক্রিকেটার করোনায় আক্রান্ত

করোনা মোকাবিলায় লকডাউন কোনও সমাধান নয়: জিএম কাদের

করোনা মোকাবিলায় লকডাউন কোনও সমাধান নয়: জিএম কাদের

বাগেরহাটে পানিবন্দি অর্ধ লক্ষাধিক পরিবার

বাগেরহাটে পানিবন্দি অর্ধ লক্ষাধিক পরিবার

করোনায় মারা গেছেন জাসদ-ছাত্রলীগনেতা মামুন

করোনায় মারা গেছেন জাসদ-ছাত্রলীগনেতা মামুন

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

আমি আসলে একটা গল্প বলতে চাই

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

বই আলোচনা লিখে পাবেন ২০ হাজার টাকা

কথা হয় জানি না 

কথা হয় জানি না 

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

আলোকিত মানুষের স্বপ্নদ্রষ্টা

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

তারাশঙ্কর : স্মরণে বরণে

উৎসবে গল্প

উৎসবে গল্প

থিয়েটার

থিয়েটার

গহন
শীতের অপেক্ষা করছি না

শীতের অপেক্ষা করছি না

© 2021 Bangla Tribune