X
শুক্রবার, ০৮ অক্টোবর ২০২১, ২২ আশ্বিন ১৪২৮

সেকশনস

রুক্সিনী কানুর দিনযাপন || অদিতি ফাল্গুনী

আপডেট : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ১৭:৪৪

১.
মা বলতো চা পাতা আর সূর্যের আলো সতীন আছে। সূর্যের আলো বেশি কড়া হবেক ত’ চা পাতা বেশি জন্মাবে না। কি জন্মালে ঘন হবে না। ভারি হবে না।আর বৃষ্টি দ্যাখো চা পাতার দুলহান আছে বটে। আসমান ঘন করে বারিস নামে ত’ বেশুমার সবুজ চা পাতায় ভরে যায় এই লস্করপুর ভ্যালি থেকে সিলেট ভ্যালি অবধি অসঙখ্য বাগান। ডানকান বা ফিনলের মত বৃটিশ সাহেবদের তৈরি চা বাগান বলো কি এখন বাঙালী ম্যানেজারদের চা বাগান বলো…বৃষ্টি আসবে কি দেখতে দেখতে চা পাতাগুলো পুরুষ্টু আর ভারি হয়ে উঠবে। সকাল থেকে দুপুর অবধি পয়লা দফার কাজ শেষে চা পাতা মাপতে গেলে হেসে-খেলে সতেরো থেকে একুশ কেজি কি তার বেশি ঝুড়ির ভার দেখায় মেশিনে। কলম চারার চা পাতা হলে মেশিনে একুশ কেজি আর ফুলি চারা চা পাতা হলে সতেরো কেজি ভার দেখালেই ব্যস, পেয়ে গেল হাজিরার টাকা। বৃষ্টিতে একটু ভিজতে হয় বটে…সে কি বাগানিয়া মেয়েদের অভ্যাস নেই বুঝি? কিন্ত্ত ঘন্টা দুই কাজ করলেই ঝুড়ি ভরে উঠে। পহেলা দফাতেই সকাল আর বিকাল…দুই দফার কাজ উঠে যায়। সেই সাথে বাড়তি কাজের টাকা। আর দু’বেলা কাজ করলে ত’ কথাই নেই। অনেকটা বাড়তি টাকা মিলে যায়। অন্যদিকে এই চৈত্র থেকে অগ্রহায়ণ- ইঙরেজি মাসের যাকে বলে মার্চ থেকে ডিসেম্বর- যখন সূর্য থাকে চড়া তখন চা পাতা হয় না। বাগান কেমন ন্যাড়া ন্যাড়া হয়ে যায়। বহুত বল আছে যেসব বিটি বা মরদলোকের তারা পর্যন্ত বেশি চা পাতা পায় না। হাজিরার সমান মাপের পাতা সারাদিন ধরে তোলা যায় না। অথচ বৃষ্টির সময় সারাদিন চা পাতা তুলে কাজ শেষ হয় না। মরণ তক মা বৃষ্টির ভেতর খুব খাটতে পারত। কি খাটিয়ে ছিল মা! কোনদিন তবু একটু জ্বর-কাশি হয় নি তার। বৃষ্টির দিনের ভর সন্ধ্যায় ভিজে সপসপে শাড়ি-ব্লাউজে ঘরে ফিরে মা শুকনা শাড়ি পরেই চোলাই বানাতে বসে যেতো। একটু চোলাই খেলেই মা ফের চাঙা! মা ছিল যেন দশভূজা। ঐ দুর্গা মায়ের মতোই। বাগান থেকে ফিরে এক হাতে আটা মেখে রুটি বানাচ্ছে, গরম গরম রুটি তরকারি খেতে দিচ্ছে তাদের ভাই-বোনদের, চোলাই বানিয়ে বাবাকে দিচ্ছে আর নিজে একটু খেয়ে নিচ্ছে গা গরম করতে, গরুর দুধ দুয়ে বিক্রি করছে কাছের রেল লাইনের পাশের বাজারে, সকালবেলা রুক্সিনীকে স্কুলে পাঠানোর জন্য গায়ে ধাক্কা দিচ্ছে, “রুকমিনী- উঠ্ রে বিটিয়া- উঠ্! লিখা পড়াহ না করবি ত’ আমার মতই চা পাতি তুলে জিন্দেগি সারা হবে! আরে এ রুকমিনী- হায় হায় বিটিয়ার নাম হামি রাখলাম কানহাইয়া ঠাকুরের বিবি রুকমিনীর নামে আর বিটিয়া কিনা স্কুল কামাই করে ঘুমায়!’

মা’র গায়ে ছাপা শাড়ি বাম দিক থেকে ঘুরিয়ে পরা। কপালে বিন্দি। আজ মাথায় অনেকটা লম্বা হয়ে আয়নায় তাকালে নিজের ভেতর মা’র প্রতিফলন দেখে চমকে যায় রুক্সিনী। সে কি মা’র মতই দেখতে হয়ে উঠছে দিন দিন? এক বৃষ্টির দুপুরে বাগানের অনেকটা গভীরে অনেক বেশি চা পাতা তোলা আর সপ্তাহের তলপে বাড়তি টাকার স্বপ্নে বিভোল মা’কে একটি বিষধর সাপ ছোবল দেবার পর লেবার কলোনীর উঠোনে এনে রাখার পর লম্বা আর ফ্যাকাশে ফর্সা মা’র মতই কি দেখতে লাগছে না রুক্সিনী কে? ফুলবাড়ি চা বাগানের সেই লেবার কলোনীতে তারা ছিল মাত্র ছয়/সাত ঘর উত্তর প্রদেশের মানুষ। পদবিতে তারা কানু। ভূমিজ, পাত্র, রাজবঙশী, মুণ্ডা এমন নানা জাতের বাগানিয়ার ভেতর ইউপিঅলা কি উত্তর প্রদেশ থেকে আসা তারা ছিল মাত্র কয়েক ঘর। অন্যদের দেখে তারা দেখতে একটু আলাদা। সটান লম্বা আর বেতস লতার মত ছিপছিপে, গৌরবর্ণা কানু মেয়েদের দেখলে বাগানের সাফ-সুতরো, ভদ্রলোক ম্যানেজারদের পর্যন্ত নি:শ্বাস ঘন হয়ে আসে। রুক্সিনীর মা যৌবন পুরোপুরি পার না হতেই বিধবা হয়েছিল। সেটা রুক্সিনী যেবার ছয় ক্লাস থেকে সাত ক্লাসে উঠছে সেসময়ের কথা। মা’র নাম ছিল যশোদা। বাবা মারা গেলে যশোদা মা তখন মা আর বাবা দুইই একসাথে হয়ে উঠছে। কিসে যেন মারা গেছিল বাবা? ঐ চা বাগানের লেবাররা যেভাবে মারা যায়। খাটুনি আর মদ। মদ আর খাটুনি। তখন ত’ বড় দাদা এগারো ক্লাসের পড়া ছেড়ে বাবার কাজে নেমে গেলো। মা চা পাতা তোলে আর দাদা বাগানে বাবা যে ভারি কাজগুলো করতো, সেই কাজগুলোয় হাত লাগায়। বাগানে ড্রেন তৈরি, শণ কাটা, বৃষ্টির দিনে নতুন চারাগাছ লাগানো, শেডট্রি লাগানো…দেখতে দেখতে রঘু দাদার হাত-পাগুলো শক্ত, খসখসে হতে থাকে। শক্ত-পোক্ত পুরুষালি গড়নের চেহারা পেতে থাকে রঘু দাদা।
“শুন্ বেটা- তোর নজর খারাপ আছে। সতারো উমর পুরা হয় নাই তোর আর তু ঐ বাকতি লেড়কির পিছ নিয়েছিস? আরে- উ কালা লেড়কিকে ত’ হামি ঘরের বহু মানব না- আমরা ইউপিঅলা। তাতে উর বাবা ত’ গতবার খ্রিষ্টান ধর্ম লিয়েছে।ইউপি থেকে তোর বাপ-দাদা এই বাগানে আসে সেই শ পঞ্চাশ সাল আগে- হৃষিকেশ যেখানে গঙ্গা মাঈয়ের ঘর…সেই হৃষিকেশের আদমি তারা। রামজি কিষেনজির পূজা করি আমরা কানুরা আর তু কিনা এক খ্রিষ্টান লেড়কির পিছ ঢুড়িস?”
রঘু দা কিছু বলে না। ক্রুদ্ধ মা রুটি-তরকারি পাতে বেড়ে দেবার পর নির্লিপ্ত ঢঙ্গে এক গ্লাস হাড়িয়া রঘু দা’র দিকে এগিয়ে দেয় যেমন আগে বাবাকে দিত। যেন দিনের কাজের ক্লান্তি চলে যায়, শরীরের ব্যথা-বেদনা ভুলে যেতে পারে। বিধবা হবার পর থেকে মা আর হাড়িয়া খায় না। শরীরে যত ব্যথা হোক! লক্ষ্য করেছে রুক্সিনী। শুধু লবণ আর আদা দিয়ে চা বানানোর বহর বেড়েছে মায়ের। এক কাপ চা ঠকাস করে রুক্সিনীর সামনে রাখে মা, “খা লবাবের বিটিয়া! তুদের বাপ মরে স্বর্গে গিয়াছে কি বৃন্দাবন গিয়াছে তা’ কানহাইয়া ঠাকুরই জানে! যতদিন পারব তুকে স্কুলে পড়াবো আর তারপর বিহা দেব। ইখন চা খেয়ে আমাকে মন্দকিনী পার কর্। বৈকুণ্ঠ কি পাশ যাব কিনা!”
তারপর সেই ভর রাতে চাপকল থেকে বালতিতে তোলা জলে দিনে দ্বিতীয়বারের মত স্নান করতো মা। বিধবা হবার পর স্নান করা কি পূজা করার বাতিক বেড়ে গেছিলো মা’র। দ্বিতীয় দফা স্নান সেরে মাটির ঘরে বঙশী হাতে বালগোপালের ছবির সামনে মা ধূপ-ধূনা জ্বালিয়ে ভজন গাইতো গুনগুন করে, “আজো শাম মোহোলিয়ো বানশরি বজালো কে? বানশরি বজালো কানহাইয়া, মুরলী শুনালো কে? হর হর শিব করতো যাত, গাগরি শির ভরত যাত, নির নার ভরণ চলি, সুধ নার হি হার কে!”
সে কোন্ হৃষিকেশ নামের গঙ্গা মাঈয়ের তীরের এক ছোট্ট শহর। মেয়েরা সেখানে ঘাগড়া চোলি পরে ঘুরে বেড়াতো। কানহাইয়ার বানশরি শুনতে রাধা নামে এক মেয়ে গাগরি ভরার ছলে, শিবের নাম নিয়ে বারিস টুপটাপ নদীয়ায় যাচ্ছে একা একা। রুক্সিনী- সে কে? গোয়ালা যাদব বঙশের পুত্র কানহাইয়া ভগবান যাকে রথে তুলে নিয়ে পালিয়েছিলেন, তুমি কি সেই রুক্সিনী? মা কি বাবা ডাকতো রুকমিনী বলে? বাঙলা স্কুলে সবাই ডাকে রুক্সিনী? এখন এই ঝমঝম বৃষ্টির ভেতর টুকরিতে পাতা ভরতে ভরতে রুক্সিনীর মনে হতে থাকে যদি একটি সাপ এসে মা’র মত তার পায়ে আলতো চুমু খায়? রঘু দাদা আজ ছয় মাস হয় জেলে। মা’র মৃত্যুর পর বাকতি ঘরের কালো মেয়ে নির্মলা জুলিয়েট বাকতিকেই রঘু দাদা ঘরে আনলো। তা’ নিয়ে পঞ্চায়েতের বিচার বসলো। মা’র কানের এক জোড়া রূপোর মাকড়ি বেচে জরিমানার পয়সা দেয়া হলো। বড় দাদার খ্রিষ্টান মেয়ে শাদি করার জরিমানা। কানহাইয়া ঠাকুরই জানে ঐ কালো মেয়েকে নিয়ে দাদার এত সন্দেহ বাতিক কেন আর এত পেয়ার কেন? মানে পেয়ার না থাকলে, বিবিকে খুব দামি মনে না করলে এত অকারণ সন্দেহ হয় না কোন পুরুষের। তবে বহু মানে ভাবি কিন্ত্ত তার ভাল চরিত্রের মেয়ে। দাদারই থেকে থেকে অকারণ সন্দেহ। একবার ভাবির এক মামাতো ভাই এসেছিলো বহু দূরের এক চা বাগান থেকে। দাদা তাকে আগে দ্যাখে নি। সন্ধ্যা বেলায় কাজ থেকে বাড়ি এসে সেই ভাইয়ের সাথে ভাবিকে হাসতে দেখে হাতের হাসুয়া দিয়ে পেয়ারের বিবিকে এমন আঘাত করলো যে ভাবি প্রায় মরে মরে! কি রক্ত আর কি জখম! সেই জেল হয়ে বসলো দাদার। ভাবির আবার বাচ্চা হবে। সে কাজ করতে পারছিল না। ছোট ভাইটির স্কুল, সঙসারের খরচ, ভাবির পেটে রঘু দাদার বাচ্চা...সব ভার মাথায় নিয়ে লম্বি বা দীর্ঘাঙ্গিনী যশোদা কানুর তেম্নি লম্বি বিটিয়া রুক্সিনী কানু একদিন তার মা’র মতই টানটান, দীর্ঘ পদক্ষেপে পিঠে টুকরি নিয়ে চা পাতা তোলার কাজে বের হয়ে পড়লো। সন্ধ্যা বেলায় বাড়ি ফিরলে কাম থেকে ফেরা মরদ মানুষকে যেমন আদর-যত্ন করা হয়, তেমন আদর-যত্নে ভাবি তাকে চা বানিয়ে দেয়, ভাত বেড়ে দেয় আর হাসুয়া দিয়ে তাকে জখম করা স্বামীর জন্য কান্নাকাটি করে, “পেয়ারের বাড়াবাড়ি। এ ত’ অত্যাচার! তবু তোমার ভাইকে জেলে না নিতে পুলিশ বাবুর পা ধরলাম- পুলিশ আমার কথা শুনল না। জেল থেকে খালাস হলে বাড়ি এসে বাচ্চার মুখ দেখবে ত’ বুঝবে কত অন্যায় করেছে- বাচ্চার মুখ দেখো ঠিক বাপের মতই হবে!”
অভিমানে ভাবির চোখে জল টলমল করে আর তখন রুক্সিনীর তার নিজের থেকে এই কালো ভাবিকে ঢের বেশি সুন্দরীতর মনে হয়। রুক্সিনী গোরি, রুক্সিনী লম্বি...দশ ক্লাস পড়া রুক্সিনীকে রাস্তায় কি বাগানে বাঙালী কি বাগানিয়া সবাই অবাক হয়ে দ্যাখে...তবু রুক্সিনী জানে আজো তার দেহে-মনে সেই রঙ লাগে নি যা কেবল একজন পুরুষই লাগাতে পারে একজন নারীর দেহে-মনে...আর সেই রঙ কি সেই ঘোর যখন কোন নারীর দেহে-মনে লাগে, তখন তার রূপের পাশে কে সিধা হতে পারে? রুক্সিনী যে আজো পারছে না! ইসশ্...দ্যাখো ভাবির চোখে কেমন মায়া...মুখ লজ্জা আর আবেশে লাল...যেন ফাগুয়া পরবের সব রঙ, লাল পরবের সব আবির ভাবির নাকে-মুখে কে লাগিয়ে দিয়েছে! যে মরদ তাকে অন্যায্য সন্দেহ করে, অন্তসত্ত্বা অবস্থায় হাতে আর পিঠে হাসুয়ার কোপ দিয়েছে, চা বাগানের হাসপাতালে তিন দিনের স্যালাইন থেকে উঠতে না উঠতে ডাক্তাররা ভাবির বুকে নল চেপে জেনেছে যে সে বাচ্চার মা হতে চলেছে...রুক্সিনীর সেই রঘু দাদার কথাই চব্বিশ ঘণ্টা ভাবে মেয়েটি। সেই মরদের বাচ্চার জন্যই সে কাথা সেলাই করে, সারাক্ষণ স্বপ্ন ঢালা চোখ-মুখ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। রুক্সিনীর মনে অমন পেয়ার নেই কেন? কাকেই বা পেয়ার করবে রুক্সিনী? এই বাগানে কানু যে কয়েক ঘর আছে তারা, সব ঘরের পুরুষগুলো হয় বিবাহিত পুরুষ অথবা বাচ্চা ছেলে যারা কিনা রুক্সিনীর চেয়ে বয়সে ছোট। দাদা ইউপির ছেলে হয়ে আসাম থেকে আসা কালো বাকতি মেয়ে বিয়ে করেছিল বলে মা’র আপসোষ ছিল খুব। রুক্সিনী ভিন জাতে বিয়ে বসবে না। তবে কাকেই বা বিয়ে করবে সে? আবার সবাই ত’ তারা লেবার জাত বটে। শ্রমিকের জাত। তবে এত ভেদই বা কেন? তার সমান ঘরে পাত্র পেতে হলে তাকে ত’ ফিরে সেই ইউপি চলে যেতে হবে। ইউপি গেছে সে দু/একবার। এখনো কিছু আত্মীয় আছে সেখানে। তবে বেশিদিন মন লাগে নি। আবার এই চা বাগানেই ফিরে এসেছে।
“রুকমিনী- রুকমিনী!”
এত গভীর রাতে তার ঘরে কড়া নাড়ে কে? না, দুই নারীকণ্ঠই। দরজা খুললে দ্যাখে সাগরী আর বেহুলা পাত্র।
‌‌‌‌‌‌‌“কি নিদ্ রে বাবা- বাগানে আগুন আর তুই নিদ যাস?”
সত্যিই ত’ ফুলবাড়ি চা বাগানে আগুন জ্বলে উঠেছে। কে ধরালো আগুন? ভারি উদর নিয়ে ক্লান্ত ভাবি ঘুমিয়ে ছিল রুকমিনীর পাশেই। সে ঘুম ভেঙ্গে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলো।
‌‌“মহাদেবের শাপ-মহাদেবের শাপ-বাগান ত’ আগুনে খেয়ে নিবে”— বলে শোরগোল তুলছে বাগানের প্রবীণেরা। সেই রাতটা কেটেছিল আগুনের আলো আর লেবার কলোনী জুড়ে তুমুল হৈ চৈয়ের ভেতর। আর সকাল বেলাই ভাবির উঠেছিল ব্যথা। তীব্র ব্যথা। লেবার পেইন। ভাবির দু’বছরের ছোট, অবিবাহিত ননদ সে। তখনো তার নিজের বিয়ে হয় নি। পুরো পরিবারের সে-ই যেন পুরুষ মানুষ। এর তার হাত-পা ধরে, একটা ভ্যানগাড়ি এনে ভাবিকে নিয়ে সে ছুটলো হাসপাতালের পথে। যেতে যেতে দেখলো ফুলবাড়ি চা বাগানের সামনে রেল লাইনের পাশে পড়ে আছে অসঙখ্য দগ্ধ আর অর্দ্ধ-দগ্ধ হারো, বাতারু, ডুপি, ময়না আর টিয়া পাখির শব।
“রুকমিনী দিদি-রুকমিনী দিদি!”
চা বাগানের সামনে রেল লাইনের পাশে তাম্বু খাটিয়ে যারা কিছুদিন ধরে কাজ করছিল তাদের একজন ঐ ময়মনসিঙহ থেকে আসা রহিম নামের ছেলেটি। নিজে থেকে রুকমিনীর সাথে কয়েকদিন কথা বলতে এসেছে। মাঝে মাঝেই রুকমিনীকে সে ফুল দেয়।
“দিদি- তোমার জইন্য এই চাম্পা ফুল পাড়লাম” কি “দিদি-দরো, তোমার জইন্য দুইডা জবা ফুল পাড়লাম।“
একদিন রহিমকে তার তাম্বুর এক বয়েসী লোক ঠাট্টাই করে বসলো, “রহিম বাদশা আর রূপবানের কেস হইলো নাকি তর, অ রহিম?” ঠাট্টাটা বুঝেছে রুকমিনী। সেই থেকে রহিমকে দেখলে অস্বস্তি হয় তার।
“দিদি গো- কই যাইবাইন?”
“হাসপাতাল। এখন সময় নাই।’’
ভ্যানে চেপে এবঙ দাদার বউকে চাপিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটতে ছুটতে পথেই রুকমিনী দ্যাখে রুণা নিয়া, নাইয়ো লাঙ, সরি খঙলা আর রেমি পনঙকে। খাসি মেয়েরা বলতে গেলে পানপুঞ্জি থেকে বেরই হয় না। ঐ এক স্কুলে যা দেখা হতো। আজ পানপুঞ্জি থেকে বের হয়েছে কেন?
‌প্রসবের ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতেই নির্মলা জুলিয়েট বাকতি জিজ্ঞাসা করে আগুনে খাসি মেয়েদের পানপুঞ্জি পুড়েছে কিনা? সেবার আগুন লাগার পর ঢাকা থেকে অনেক সাঙবাদিক এসেছিল। তারা ইনোকল (ইউনোকল), মাগুরছড়া এসব শব্দ মিলিয়ে আশপাশের সবাইকে নানা প্রশ্ন করতো যার কোন উত্তরই রুক্সিনী জানত না। সে শুধু জানতো তাদের চা বাগানের অনেকটা জায়গা পুড়ে গেছিল, সামনে বিধ্বস্ত হয়েছিল রেললাইন, অনেক পাখি মরে গেছিল আর খাসি মেয়েদের পানপুঞ্জিতে অনেক পান গাছ পুড়ে গেছিলো।

 

২.
প্রথমে ফাড়ি বাগানের ছোট্ট টিনের শেডের হাসপাতাল থেকে মূল চা বাগানের হাসপাতাল হয়ে উপজেলার হাসপাতাল ঘুরে শেষতক রঘু দাদার বউয়ের কোলে ছেলে এলো বটে। সেই লবকুমারের বয়স এখন বারো। রঘু দাদা জেল থেকে ছাড়া পেল মাস চারেক পর। ছেলের মুখে নিজের মুখ কেটে বসানো দেখার পর থেকে আর সে বউকে সন্দেহ করে নি। ঘরে ফেরার দু’মাসের মাথায় রঘু দাদা মৌলভিবাজার থেকে অনেক দূরে হবিগঞ্জের চান্দপুর চা বাগানের অর্জুন কানুর সাথে রুক্সিনীর বিয়ে ঠিক করলো। অজুর্ন কানু অবশ্য বিয়ে ঠিক হবার মাস খানেক আগে এই ফুলবাড়ি চা বাগানে এসেছিলো মামা বাড়ি বেড়াতে। হাতে তীর নিয়ে একটি পাখির দিকে তাক করার সময় রুক্সিনীর সাথে তার দেখা হয়।
“এই ধেনুকে (ধনুক) দ্যাখ্। ত্রেতায় রামের ধেনু আর দ্বাপরে অর্জুনের এই ধেনু। সব জুলুমের জবাব এই ধেনু! রাম ত’ সীতা মাঈকে শাদি করেছিলেন ভারি একটা ধেনুক উঠিয়ে...”
কেন জানি লজ্জিত হয়েছিল রুক্সিনী। জীবনে কখনো মাথা নীচু না করা রুক্সিনী সহসাই অবনত হয়েছিল লজ্জায় আর সেই প্রথম সে অনুভব করে যেন এক আশ্চর্য আবির তার চুল থেকে কপাল হয়ে গাল বেয়ে আর গলা হয়ে ক্রমাগত বাহিত হচ্ছে গোটা শরীরে। ফাগুয়ার সব রঙ, লাল পরবের সব আবির তার গায়ে লেগে যাচ্ছে! তবু শাদির বছর না ঘুরতে সেই রুক্সিনীর গায়েই উঠলো কিনা সাদা থান? ট্রেড ইউনিয়নের যে নেতাকে বিশ্বাস করে স্ট্রাইকে গেছিল অর্জুন, সেই নেতাই যখন লেবারদের ইজ্জত বেচে দিল মালিকের কাছে...কারখানা থেকে চাকরি যাবার পর এক ভোর রাতে কখন সে রুক্সিনীর কাছ থেকে উঠে গিয়ে নিজের হাতে জীবন শেষ করলো কে জানে! চাকরি গেছে বলে রুক্সিনী ত’ তাকে গাল-মন্দ করে নি।বরঙ সেই রাতে ভালবাসা দিয়ে অজুর্নকে সব দুঃখ ভুলাতে চেয়েছিল। নিথর অর্জুন সেই রাতে ভালবাসা নেয় নি। শুধু বলেছিল যে তার বড় মজবুরি হয়েছে আর রাতটা সে ভাল মত ঘুমাতে চায়।রুক্সিনীর গর্ভের সন্তানের কথা একবার ভাবল না অর্জুন?
“মাঈ!‘
অধিরথ স্কুল শেষ করে ঘরে ঢুকছে। বাগানে এখন স্ট্রাইক চলছে। প্রতিদিন সকালে দু’ঘণ্টা স্ট্রাইক চলে। তারপর কাজ শুরু হয়। রুক্সিনীকে এখন কাজে যেতে হবে। এর ভেতর অধিরথের জন্য দুপুরের রান্না সেরেছে সে।
“বড় রাস্তার পাশে হাজার হাজার মানুষ রে মাঈ! কেউ ইকোনো জোন চায় না! বাপার তিন কিয়াড় জমি কি বেহাত হবে মাঈ?”
“শুধু জমি না রে বেটা...তোর বাপের শ্মশান যে ঐ জমিতে!”
“কাল যে ডিসি অফিসে নাকি যাবে সব- তুই যাবি মাঈ?”
“যাব বেটা-’’
“কি করিস মাঈ? কি ঘসিষ?”
অর্জুনের মরিচা পড়া তীর-ধনুক তখন মাত্রই ঘষে ঘষে চকচকে করে তুলছিল তার বিধবা স্ত্রী রুক্সিনী। কপালে লেপ্টে থাকা একগাছি চুল ডান হাতে তুলে ছেলের দিকে তাকিয়ে চোখ নাচায় রুক্সিনী, “তোর জন্য বেটা। এগারো বছর বয়স হলো না তোর? বাপা নাই-এই ধেনুক এখন তোর!”

সম্পর্কিত

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ২০:২০

এবছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন ৭৩ বছর বয়সী তানজানিয়ার ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ। তিনি ১০টি উপন্যাস লিখেছেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য : প্যারাডাইস (১৯৯৪), বাই দ্য সি (২০০১) এবং ডেজারশন (২০০৫)। ইতোপূর্বে তার উপন্যাস ‘প্যারাডাইস’ বুকার প্রাইজের শর্টলিস্টে এবং ‘বাই দ্য সি’ লংলিস্টে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গুরনাহর লেখায় ঔপনিবেশিকতার দুঃখ-দুর্দশা এবং শরণার্থীর কষ্টকর জীবনধারার গল্প উঠে এসেছে। ২০১৬ সালের ২১ জানুয়ারি, ফ্রাঙ্কফুটে তার এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন ফেবিয়ান রোথ, মারা হোলজেনথল, লিসা জিংগেল। 


প্রশ্ন : বিশ্বসাহিত্য, উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্য এবং গ্লোবাল সাউথের মতো সাহিত্যের লেবেল সম্পর্কে আপনি কী ভাবছেন? আপনি কি মনে করেন এগুলো সাহিত্য বা একইসঙ্গে আপনার লেখা বিচারে উপযোগী কিছু? আপনি কি লেখক হিসেবে নিজেকে বিবেচনা করার সময় এই মানদণ্ডে বিচার করেন কিনা?
আবদুলরাজাক গুরনাহ : লেবেল অবশ্যই দরকারি, প্রথমত, তা প্রাতিষ্ঠানিক কারণেই। কেউ তাদের বিদ্যায়তনে তুলনা করতে, বাণিজ্যিক কারণে বা প্রকাশনার স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। আপনি মানুষকে বোঝাতে পারেন এটি এমন একটি বিশেষ কিছু, যাতে তারা আগ্রহী হয়ে উঠবে। যাই হোক, আমি নিশ্চিত নই তাদের সাংগঠনিক উদ্দেশ্য ছাড়াও এগুলোর দরকার কতটুকু। নিজেকে বর্ণনা করার জন্য আমি এই মানদণ্ড ব্যবহার করবো না, এগুলো সংস্কৃতি উৎপাদনের প্রক্রিয়া নয়। এইসব লেবেল সাহিত্যকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে, উত্তর-ঔপনিবেশিক রীতি-নির্ভর সমালোচনা করে এবং কিছু বলতে ও কিছু শনাক্ত করতে সহায়তা করে। অন্যদিকে এইসব লেবেল সাহিত্যের ব্যাখ্যাকে একপ্রকার সীমাবদ্ধই করে। কারণ সাহিত্যে বর্ণনার চেয়েও বেশি কিছু রয়েছে।

প্রশ্ন : তাহলে আপনি কি নিজেকে উত্তর-ঔপনিবেশিক বা বিশ্বসাহিত্যের লেখক মনে করেন? 
আবদুলরাজাক : আমি এইসব প্রপঞ্চের কোনোটিই ব্যবহার করব না। আমি নিজেকে কোনো ধরনের লেখক বলিও না। আসলেই আমি নিশ্চিত নই যে, আমি আমার নাম ছাড়া অন্য আর কী বলার আছে। আমি অনুমান করি, যদি কেউ আমাকে চ্যালেঞ্জ করে—‘আপনি কি একজন ...এর মধ্যে একটি ...?’ আমি সম্ভবত ‘না’ বলব। আমি চাই না আমার সঙ্গে কিছু জুড়ে থাকুক। অন্যদিকে এটি নির্ভর করে কিভাবে এই প্রশ্ন উত্থাপন করা হবে—উদাহরণ স্বরূপ যদি একজন সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেন ‘আপনি কি একজন বিশ্বসাহিত্যের লেখক’, তখন তিনি প্রশ্নের উত্তরে তিনি কী লিখবেন? কিন্তু আমি তা নই। আমি এরমধ্যেরও জটিল একটা কিছু।

প্রশ্ন : এই বর্ণনা কি অপরিহার্য?
আবদুলরাজাক : এটি এমন কোনো অপরিহার্য পদ্ধতি নয়, যা আমি নিজে মনে করি, কিন্তু সাংবাদিকের জন্য এই জিজ্ঞাসা অপরিহার্য হতে পারে। তিনি আমাকে তার বোর্ডে তর্জনী তুলে বলতে পারেন, উনি একজন বিশ্বসাহিত্যের লেখক। আমি ধারণাকে এভাবেই দেখি। এই ধরনের গোষ্ঠীগুলোকে প্রতিহত করার একপ্রকার প্রাকৃতিক প্রবণতা রয়েছে, যেমন আমি আপনাকে এখন একটু জটিল করে উত্তর দিচ্ছি।

প্রশ্ন : আমাদের পরবর্তী প্রশ্ন পূর্ববর্তী প্রশ্নের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত—বিশ্বসংস্কৃতি প্রায়শই দক্ষিণ এবং উত্তর গোলার্ধের সংস্কৃতি থেকে আলাদা। আপনি এই লেবেলগুলোকে কীভাবে দেখেন, বিশেষ করে সাহিত্যের ক্ষেত্রে?
আবদুলরাজাক : পৃথিবী সত্যিই উত্তর এবং দক্ষিণ হিসেবে তৈরি করা হয়নি। তবে এটিকে এমন করে বর্ণনা করা ফ্যাশনেবল মনে হচ্ছে। ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড’ বা ‘অনুন্নত বিশ্ব’-এর মতো বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করার প্রচেষ্টা ছিল, কিন্তু উত্তর এবং দক্ষিণ শব্দ দুটি অন্যান্য শব্দের তুলনায় আরো চলনসই বলে মনে হচ্ছে। যাইহোক, এটিই বাস্তবতাকে বর্ণনা করে, ঐতিহাসিক পার্থক্য বর্ণনা করে এবং অবশেষে এটি অন্য আরেকটি কুৎসিত শব্দ ‘উপনিবেশবাদ’ থেকে পরিত্রাণ দেয়। তাই এই বিষয়গুলি সম্পর্কে কথা বলার জন্য উত্তর-দক্ষিণ শব্দ ব্যবহার করা ভালো। ঐতিহাসিক সাম্রাজ্যবাদ তথাকথিত উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যকার এই পার্থক্যগুলো একীভূত করেছে এবং উপনিবেশিকতার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং সংহত সমস্ত ধ্যানধারণার কারণে আমি মনে করি এসব এখনও অব্যাহত আছে। তাই আমি বলতে চাই যে, হ্যাঁ, পার্থক্য আছে এবং উত্তর ও দক্ষিণ শব্দদুটি পুরোপুরি যথার্থ না হলেও, এই পার্থক্যগুলোর বর্ণনা করার সর্বশেষ এবং সবচেয়ে নিরপেক্ষ উপায় এই শব্দদুটির মধ্যে রয়েছে। আপনার এই শব্দদুটিকে স্থান হিসাবে বিবেচনা করা উচিত নয় : এগুলো মনোভাব, বোঝাপড়া, প্রত্যাশা প্রভৃতির সাথে সম্পর্কযুক্ত। তাই চীনের এমন কিছু অংশ থাকতে পারে যা পশ্চিমের মতো সমৃদ্ধ এবং কিছু অংশ সমৃদ্ধ নয়। এটা আসলে জায়গার বিষয় নয়। যখন আপনি নিরপেক্ষ বা মধ্যবর্তী থাকার চেষ্টা করেন, তখন এটি স্থানের দিক থেকে কিছুটা বিবেচনা করে। যখন ‘মধ্যবর্তী’ সত্যিই উত্তর এবং দক্ষিণের মধ্যে নয়, কিন্তু এই দুটি লেবেলের মধ্যে এক ধরনের মধ্যবর্তী বা অনির্দিষ্টতা আছে। সেখানেই আমি মনে করি, আপনি নিজেকে উদার মানুষ হিসেবে ভাবেন, নিজেকে বিশ্বের মানুষ হিসেবে এবং সর্বোপরি মানুষ হিসেবে দেখার চেষ্টা করেন। যাইহোক, এখানে আসল পার্থক্য আছে—আসুন আমরা বলি আপনার জীবনের ধরন—আপনি যেই হন না কেন, আপনি উত্তর দিকেরই হন বা দক্ষিণ দিকেরই হন আমাদের জীবন ভিন্ন হবে, আপনি চান বা না চান। এই সংস্কৃতিতে রাষ্ট্র আপনাকে হাসপাতাল, স্কুলসহ নানান সেবা ও সুবিধা দিয়ে থাকে। কিন্তু অন্যান্য দেশে [অনুন্নত দেশ] তাদের কাছে এরকম কিছুই নেই, তাই এই জায়গাগুলির মধ্যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য রয়েছে। যার ফলে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক ঘটনা বিভিন্ন সমাজে ঘটেছে।

প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন ‘শরণার্থী সংকট’ অনেক পরিবর্তন এনেছে? যদি তথাকথিত দক্ষিণ দেশগুলোর লোকেরা জার্মানিতে আসে—উদাহরণ স্বরূপ, তারাও জার্মানির পরিবর্তন করে—যেমন অন্যান্য অনেক দেশ পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। 
আবদুলরাজাক : ঠিক আছে, আমি বলছি না যে সবকিছু চিরকালের মতো একই থাকবে; অবশ্যই সবকিছুর পরিবর্তন ঘটছে। অন্যদিকে, কী বা কারা পরিবর্তিত হবে বলে আপনি মনে করেন? যদি বলা যায়, এক মিলিয়ন শরণার্থী জার্মানিতে আসলো, কাদের বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি—জার্মানির নাকি শরণার্থীর? সুতরাং এই প্রশ্নে আমার মত হলো, কিছুটা হলেও এটি একটি পার্থক্য তৈরি করবে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ভবিষ্যতে যেকোনও প্রত্যাবাসনের একটি শর্ত : তারা সরাসরি ইংরেজি শিখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যদিও এতে কোনো সমস্যা নেই, তবে এটাকে ইতোমধ্যে একটি শর্ত হিসেবে তৈরি করাই বলে দেয় যে, অন্যরা যখন এখানে আসবে তাদেরকে আমাদের মতোই হতে হবে। চলবে

/জেডএস/

সম্পর্কিত

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ১৭:২৭

১৯৬৯ সাল। গণঅভ্যুত্থান চলছে। এমন সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র লিখে ফেললেন ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ নামে একটি কবিতা, যার প্রথম দুটি লাইন স্লোগানের মতো মানুষের মুখে মুখে—‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’
কবিতাটি তখনকার কোনো পত্রিকা প্রকাশ করার সাহস না পেলেও আহমদ ছফা’র কল্যাণে রাতারাতি এ-দুটি লাইনে ছেয়ে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব দেয়াল। এ দুটি লাইন গণঅভ্যুত্থানকে যেন বারুদের মতো উসকে দেয়। ফলশ্রুতিতে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে যান এই কবিতার স্রষ্টা, কবি হেলাল হাফিজ। সিক্ত হতে থাকেন অজস্র মানুষের ভালোবাসায়। এবং অবিশ্বাস্যভাবে, এর পরপরই তিনি হয়ে যান নীরব। ১৯৬৯ থেকে ’৮৬, দীর্ঘ ১৭ বছরের অপেক্ষা শেষে ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তার ১ম কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে। বাংলা কাব্যগ্রন্থের ইতিহাসে সর্বাধিক বিক্রিত এই বইয়ের তুমুল জনপ্রিয়তার জোয়ারে ভেসে না-গিয়ে বরং আবারো নীরবতা এবং তার প্রিয় আলস্যকেই প্রশ্রয় দিলেন কবি। কাটিয়ে দিলেন গুনে গুনে আরো ৩৪ টি বছর। ১ম বই প্রকাশের জন্য যা সময় নিয়েছিলেন, ২য় বইয়ের ক্ষেত্রে নিলেন তার দ্বিগুণ! অবশেষে নীরবতার অবসান ঘটিয়ে ২০১৯ সালের শেষে, ৩৪ বছর পর ঠিক ৩৪ টি কবিতা নিয়েই হাজির হলেন তিনি।
গত ৫ ও ২৪ জানুয়ারি ‘বাংলা ট্রিবিউন’-এর সঙ্গে জাতীয় প্রেসক্লাবের অতিথি-কক্ষে চলা দীর্ঘ এক আলাপে কবি হেলাল হাফিজ খোলাসা করেন তার জীবনের নানা বিষয়াদি। বলেছেন বহু আকাঙ্ক্ষিত ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ নিয়ে বিস্তারিত আলাপের পাশাপাশি নিজের জীবনের দর্শন ও নানান অভিজ্ঞতার কথাও।
'বাংলা ট্রিবিউন'-এর হয়ে এই আলাপ চালিয়েছেন তরুণ চলচ্চিত্রকর্মী, নির্মাতা শাহনেওয়াজ খান সিজু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আই.ই.আর. বিভাগের শিক্ষার্থী, তরুণ লেখক রেজওয়ান হাবিব রাফসান এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাদিরা ভাবনা


শাহনেওয়াজ খান সিজু : বিয়ে তো আর করলেনই না, এখন যদি কেউ প্রস্তাব দেয়, কী করবেন?
হেলাল হাফিজ : এখন? এখন বিয়ে-টিয়ে করাটা যে খুব অন্যায় হবে তা নয়। কিন্তু বিয়ে বলতে আমাদের মনে প্রথম যে ধারণা আসে, সে বয়স তো আর নাই।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : একজন সঙ্গী হিসেবে?
হেলাল হাফিজ : এই পড়ন্ত বেলায় মন তো চায় একজন বন্ধু পাশে থাকুক। যতটা না শারীরিক কারণে তার চেয়ে বেশি মানসিক।
 
নাদিরা ভাবনা : যেমন?
হেলাল হাফিজ : এই মনে করো চোখের সামনে একজন মানুষ আছে। ঔষধ খাবো, প্যাকেটটি এগিয়ে দিলো। পানি খাবো, গেলাসটি নিয়ে এলো। এই যা।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : বিকেলে চায়ে একসাথে চুমুক দেওয়া…
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, হ্যাঁ।
 
নাদিরা ভাবনা : এখন কি তার জন্য অনুতাপ হয়?
হেলাল হাফিজ : অনুতাপ না ঠিক, তবে এখন প্রয়োজনীয়তা বোধ করি খানিকটা। একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো। কিন্তু আমি, আমি তো আমার একাজীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি একদম শৈশব থেকেই। মা চলে যাওয়ার পর থেকে।
 
নাদিরা ভাবনা : মানে একদম ছোটবেলা থেকেই?
হেলাল হাফিজ : An Outsider!
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : মায়ের শাসন না পাওয়াটা কি আপনার বোহেমিয়ান জীবনের মূল কারণ?
হেলাল হাফিজ : না, না, না—আমার ক্ষেত্রে যা হয়েছে সেটা বাধ্যতামূলক। এইভাবে জীবনযাপনে আমি বাধ্য, আর কোনো উপায় ছিলো না আমার।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : জীবনানন্দ দাশের কবি হয়ে ওঠার পেছনে তার মা কুসুমকুমারি দাশের সান্নিধ্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো তেমনি হেলাল হাফিজের কবি হয়ে ওঠার মূল কারণ কি তার মাতৃবিয়োগ?
হেলাল হাফিজ : আমার মনে হয় বিষয়টা এরকমই, মাতৃহীনতা। তোমাদের আমি খুব স্পষ্টভাবেই বলে দিচ্ছি যে, আমার কবি হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ এই মাতৃহীনতার বেদনা। এটা আমাকে প্রতিনিয়ত পুড়িয়েছে। আজকে যে হেলাল হাফিজকে দেখছো তোমরা, তার এই অবস্থানে আসা এবং তাকে তৈরি করার রাস্তাটা মাতৃহীনতার বেদনাই পরিষ্কার করে গেছে।
 
নাদিরা ভাবনা : আমাদের জীবনে এরকম হয় যে, আমরা যখন কারো দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হই, তখন বেদনা নতুন করে জেগে ওঠে।
হেলাল হাফিজ : আমি তো অনেক মেয়ের দ্বারাই প্রত্যাখ্যাত হয়েছি, নিজেও করেছি অনেককে। অনেকের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। কী রকম? আমি ভেবেছি মেয়েটি বোধহয় আমাকে ভালোবাসে। আসলে তা নয়, সে আমার কবিতাকে ভালোবাসে। আমি সেটাকে মনে করেছি হয়তো আমাকে ভালোবাসে! ফলে এই মুগ্ধতার দেয়ালটা যখন উঠে গেছে তখন বিরহ ছাড়া আর কোনো উপায় আসলে থাকেনি।
আবার এর উল্টাও হয়েছে। মেয়েটি হয়তো আমাকেই ভালোবাসে। কিন্তু আমি ভাবছি, ও আমাকে আর কি ভালোবাসবে? ও তো আমার কবিতাই বোঝে না, কিংবা বুঝতে চেষ্টাও করে না। যে রকম হয়েছে রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর ক্ষমতাই ছিলো না যে তাকে বুঝবে।
খুব প্রতিভাবান মানুষ সে নারী হোক বা পুরুষ—প্রেমহীন সে থাকে কী করে! একজন লেখিকা আছেন না, সুইসাইড করলো?
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : সিলভিয়া প্লাথ?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, সিলভিয়া প্লাথ। কত সুন্দর মহিলা ছিলেন, ফুলের মতো। সে তো পুরুষকে ভালোবাসতেই চেয়েছিলো। প্রত্যাখ্যাত না হলেও হয়তো বনিবনা হয়নি এমন বেদনা থেকে একটি মেয়ে সুইসাইড করতে পারে? ভাবা যায়! ওর ছবি দেখলেই তো ইচ্ছে হয় প্রেম করি! প্রেম আসলে নারী-পুরুষের ব্যাপার না, মানুষের ব্যাপার। এটা আসার হলে এমনিই আসবে। জোর করে আর যাই হোক ভালোবাসা হয় না।
 
নাদিরা ভাবনা : আচ্ছা, আপনার কবিতা নিয়ে যদি কেউ গান করতে চায়?
হেলাল হাফিজ : হয়েছে তো।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : না মানে, আপনার কি কখনো শুধু গানের কথা ভেবে কিছু লিখতে ইচ্ছে করেনি? যে রকমটা বব ডিলান, গুলজার বা শ্রীজাত করছেন?
হেলাল হাফিজ : না না না। আমি শুধু কবিতা নিয়েই থাকতে চেয়েছি আজীবন।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্ত্বিক ঘটক বলেছিলেন, তার নিজের বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য যদি সিনেমার চাইতে ভালো কোনো মাধ্যম তিনি পেতেন তবে সেই মাধ্যমকেই তিনি বেছে নিতেন। আপনি কেন কবিতার বাইরে গল্প, উপন্যাস, চিত্রনাট্য কিংবা অন্য কোনো শিল্প-মাধ্যমের দিকে ঝুঁকলেন না? সব ছেড়ে কেন শুধু কবিতা নিয়েই থাকছেন?
হেলাল হাফিজ : কবিতা ছাড়া অন্য কোনো কিছু আসলে টানেনি তেমনভাবে। আমার মনে হয়েছে যে, জীবনে আমার অল্প কিছু যদি করার থাকে তাহলে হয়তো এই মাধ্যমটিতেই আমি পারবো। আর আমি সত্যিই খুব কম প্রতিভাবান, নিজের সম্পর্কে আমি উচ্চ কোনো ধারণা আসলে পোষণই করি না। সুতরাং আমি নিজের লাগাম নিজে টেনে ধরার এই অভ্যাসটা খুব ভালোভাবেই আত্মস্থ করেছি।
 
নাদিরা ভাবনা : এটাকে পরিমিতিবোধ বলবেন?
হেলাল হাফিজ : পরিমিতিবোধ, Exactly এই শব্দটা। পরিমিতিবোধ এবং কোথায় কখন কতটুকু থামতে হবে, অধিকাংশ বাঙালিই এটা জানে না। এখানে তোমরা বলতে পারো যে, আপনি কি একটু বেশিই থেমে গেছেন? উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ। আমি একটু বেশিই থেমে গেছি। এটার কারণ আমি কম প্রতিভাবান এবং আলস্য আমার অসম্ভব প্রিয়। এই দুটো মিলে এবং ‘যে জলে আগুন জ্বলে’র প্রবাদপ্রতিম খ্যাতি ও মানুষের ভালোবাসা আমাকে অস্থির করে ফেলেছে একদম। আনন্দ যেমন দিয়েছে তেমনি আতঙ্কিতও করেছে যথেষ্ট। রাতের পর রাত আমার ঘুম হয়নি।
 
নাদিরা ভাবনা : নতুন বই ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যেই তো দ্বিতীয় সংস্করণ চলে এসেছে। এই যে এত খ্যাতি, আপনার কথায় মানুষের ভালোবাসা…
হেলাল হাফিজ : এটা অসম্ভব বিক্রি হচ্ছে। অসম্ভব ভালো বিক্রি হচ্ছে।
 
নাদিরা ভাবনা : আমি কিন্তু আপনার বই দুটোর মধ্যে এক ধরনের যোগসূত্র দেখতে পাই। প্রথমটা ছিলো আমি জ্বলছি, ‘যে জলে আগুন জ্বলে।’ আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে আমি এখন নিজেকেই সান্ত্বনা দিচ্ছি কিংবা আমি এখন কিছুটা স্তিমিত কিছুটা শান্ত, তাই ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’। ঠিক আছে না ব্যাখ্যাটা?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, ঠিক আছে।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : বইটা প্রকাশ করতে এত সময় নিলেন কেন?
হেলাল হাফিজ : ভেতরে ভেতরে একটা ভয় কাজ করেছে যে, আরেকটা বই যদি প্রকাশ করি সেটা প্রথম বইয়ের ধার-কাছেও যেতে পারবে কি না। ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’র জন্য প্রায় ২০০ কবিতা থেকে ৩৪ টি কবিতা আমি বেছে নিয়েছি।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : বইটা পড়েছি আমি। এক লাইনের কবিতাও আছে এতে। একরকম experiment-ই করলেন বোধহয়!
হেলাল হাফিজ : এই বইয়ে আমি দুটো বিষয়ে কাজ করতে চেয়েছি—একটা হলো বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যে নেশা…
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : স্মার্টফোন?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ। সেই স্মার্টফোনকে কাব্যাকারে মলাটবন্দি করতে চেয়েছি। এই বইটা পড়তে কারো ২০ মিনিটের বেশি সময় লাগবে না, কিন্তু পড়ে সে আর বেরুতে পারবে না। একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে যাবে। এবং একটু পরেই আবার সে প্রথম থেকে পড়তে শুরু করবে—এই হলো এক। আর একটা বিষয় যা করতে চেয়েছি—এই যে আমরা একটা অস্থির সময় পার করছি, সমাজে হানাহানি—দুর্নীতি, একটা মেয়ে ঘর থেকে একা বের হতে পারছে না, অসহনশীলতা, রাজনীতি বিপথে চলে গেছে, সেইখানে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমি ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’-তে কেবলই প্রেমের কথা বলেছি, কেবলই বিরহের কথা বলেছি, কেবলই ভালোবাসার কথা বলেছি। আমি বোঝাতে চেয়েছি যে, প্রেমও প্রতিবাদের একটা ভাষা, প্রেম দিয়েও জয় করা যায়। আমার এই কোমলতায় কিছু মানুষও অনুপ্রাণিত বা প্রভাবিত হয় সেখানেই আমার সার্থকতা। চলমান সময়ের বিপরীতে দাঁড়িয়ে অনবরত আমি প্রেমের জয়গান গেয়েছি, বিরহের কথা বলেছি। বিরহ কিন্তু প্রেমেরই বড় অংশ, বিরহ মানুষকে নষ্টও করতে পারে আবার তৈরিও করতে পারে। বিরহ উপভোগের বিষয়।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : বইটির আর কোনো বিশেষত্বের কথা কি জানতে পারি?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ। একটা কবিতা আমার বাবার। কবিতাটির নাম পিতার পত্র—‘রেটিনার লোনাজলে তোমার সাঁতার/পিতৃদত্ত সে মহান উত্তরাধিকার।’
একটি চিঠিতে এই কবিতাটি লেখার পর বাবা আরও লিখেছিলেন, ‘এই কষ্ট, এই বেদনা তুমি লালন করবে, শুশ্রূষা করবে এদের, এবং চেষ্টা করবে এই বেদনাকে শিল্পে রূপান্তরিত করতে।’ আমি সেই চেষ্টাটাই করেছি, আর কিছু না। আব্বাকে সম্মান জানানোর জন্য ওনার এই কবিতাটি আমি ইনভার্টেড কমার ভেতরে আমার বইয়ে স্থান দিয়েছি। যেন একশো বছর পরে পাঁচজন লোকের হাতেও যদি এই বইটা থাকে, তারা যেন আমার পাশাপাশি আমার বাবাকেও পান।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : বাহ্, চমৎকার! আরেকটা প্রশ্ন করি?
হেলাল হাফিজ : নিশ্চয়ই। 
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : কবিতা অন্যান্য শিল্প মাধ্যমের সাথে কীভাবে সম্পর্কিত বলে আপনি মনে করেন?
হেলাল হাফিজ : শুধু সাহিত্যের বিভিন্ন শাখার মধ্যেই নয় বরং সমস্ত শিল্প মাধ্যমের মধ্যে—যেমন গান, চলচ্চিত্র, নাটক, উপন্যাস—সবচেয়ে উঁচু স্তরের শাখা হলো কবিতা। এখন ধরো একজন ঔপন্যাসিক তার কোনো বিষয় বোঝাতে, কোনো সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে উনি ৭ পৃষ্ঠা লিখে ফেলতে পারেন। কিন্তু একজন কবির জন্য তা বোঝাতে দুটি পঙক্তিই যথেষ্ট। এজন্যই তুমি দেখবে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি স্বরণীয় হয়ে আছেন প্রথমত কবিরা, তারপরে বিজ্ঞানী-সহ অন্য সবাই।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : Visual Poetry’র ব্যাপারে আপনার কী ধারণা?
হেলাল হাফিজ : বুঝিনি। আবার বলো।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : আন্দ্রেই তারকোভস্কির মতো অনেক চলচ্চিত্রকারই তাদের সিনেমাতে Seen-এর পর Seen সাজিয়ে কবিতা বলে গেছেন, সেই Visual Poetry-কে আপনি কীভাবে দেখেন? আপনি যা লিখে প্রকাশ করছেন ওনারা তা Visually বলছেন। আপনার কবিতা বোঝার জন্য পাঠকের নির্দিষ্ট একটা ভাষায় পারদর্শী হওয়া আবশ্যক, কিন্তু সিনেমার ক্ষেত্রে বিষয়টা আলাদা। একেবারে বর্ণজ্ঞানহীন কোনো দর্শকের সঙ্গেও সিনেমা খুব সহজে Communicate করতে পারে।
হেলাল হাফিজ : আমি তো সেটাই বললাম, কবিতা হচ্ছে সবচেয়ে উঁচুস্তরের শিল্পমাধ্যম। কবিতা না লিখেও একজন কবি হতে পারে। ভালো ছবি এঁকে, ছবি তুলে, ভালো রাজনীতি কিংবা সিনেমা করেও কবি হওয়া যায়। কবিতা লেখার চাইতে Poetic হওয়াটা বেশি জরুরি। আর কবিতার ব্যাপারটা কি, ধরো প্রথমত বর্ণজ্ঞান থাকতে হবে। তারপর শুধু বর্ণজ্ঞান থাকলেই হবে না, ভালো লেখাপড়াও জানতে হবে। শুধু লেখাপড়া জানলেই হবে না, আগ্রহ থাকতে হবে কবিতার প্রতি। এ কারণেই পাঠককেও অনেকটা তৈরি হয়েই নামতে হবে যে আমি কবিতা পড়বো। কবিতাকে বোধগম্য করা কবির একার কাজ নয় পাঠকেরও কিছু কাজ আছে।
 
নাদিরা ভাবনা : আপনার কথা শুনে এখন মনে হচ্ছে যে, ‘Poetry is the mirror, where we can see the whole sky!’
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ এবং সেটা এতই সংক্ষেপিত যে তোমাকে বারবার ঘোরে ফেলে দেবে।
 
নাদিরা ভাবনা : আমি নিজেও যখন লিখতে যাই তখন মনে হয় যে ‘এটা সম্ভবত বুঝবে না কেউ।’ একারণেই Elaboration হয়ে যায়। অথচ আপনার কবিতা এক লাইন পড়লেই বুঝে যাই তার Background-টা কী বা কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা।
হেলাল হাফিজ : এটা হচ্ছে মুন্সিয়ানা এবং এটা আমার কবিতার একটা বড় Plus Point. তুমি রবীন্দ্রনাথের গীতবিতান ধরো, এতবড় গানের বইটা নিয়ে যদি বসো এবং প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ৩০০০ বা ৩৫০০ গান তুমি করলে। তুমি দেখবে একটি গানও তোমার বোধের অগম্য নয়। সবকটা গান মনে হবে যে, আরে এটা তো আমিও লিখতে পারি!
 
নাদিরা ভাবনা : আমারই কথা…
হেলাল হাফিজ : আমার কথা তো পরে, ওনার লেখা পড়ে মনে হবে যে আমি তো নিজেও এমন লিখতে পারি। একটা কঠিন শব্দ নাই, যুক্তাক্ষর যথাসম্ভব কম। তোমাকে খুঁজে খুঁজে যুক্তাক্ষর বের করতে হবে। মানে কতবড় প্রতিভাবান হলে এটা সম্ভব! বুঝতেই পারছো ব্যাপারটা। উনি নিজেই তো বলেছেন, ‘সহজ কথা কইতে আমায় কহ যে, সহজ কথা যায় না বলা সহজে।’ সহজ কথা বলাই তো সবচেয়ে কঠিন কাজ।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : আপনার সম্বন্ধে আমরা যতটুকু জানি, একজন আবুল হাসান হতে চেয়ে আপনি হেলাল হাফিজ হয়ে উঠেছেন, একজন কবির স্বাতন্ত্র্য গড়ে ওঠার প্রথম ধাপ কি তবে অনুসরণ, অনুপ্রাণিত কিংবা ঈর্ষান্বিত হওয়া?
হেলাল হাফিজ : যেকোনো শিল্পীরই শৈল্পিক ঈর্ষা থাকতে হবে। নোংরা ঈর্ষা হলে হবে না।
 
নাদিরা ভাবনা : অনুকরণ না, তাইতো?
হেলাল হাফিজ : অনুকরণ, অনুসরণ কোনোটাই না। আমি তো বলেছিই যে, আমার সমসাময়িক কবিদের মধ্যে একমাত্র আবুল হাসানকেই আমি ঈর্ষা করি। আর কাউকে ঈর্ষা করি না। তার মানে কী? সবচেয়ে বেশি ভালোওবাসি তাকে।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : শিল্প তো মনুষ্যত্বের জয়গান গায়, পৃথিবীর দুঃখের অবসান চায়। কিন্তু তারপরেও এই সমগ্র পৃথিবীর এত এত মহান সব শিল্পী, শিল্পকর্ম, বিশ্বমোড়লদের প্রভাবিত করতে পারেনি বা পারছে না কেন? কেন পৃথিবীর সর্বত্র এখনো অন্ধকারের জয়?
হেলাল হাফিজ : না, এইখানে তোমার পুঁজিবাদের প্রভাব আছে। কারণ পুঁজিবাদ তো শিল্পের বিকাশ ঘটতে দেবে না।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : না, মানে ঠিক কী কারণে বব ডিলান বা জন লেননের গান কিংবা পৃথিবীর এত এত মহান শিল্পীদের শিল্পকর্মগুলোর মূলভাষ্য বিশ্বনেতাদের প্রভাবিত করতে পারছে না? ডোনাল্ড ট্রাম্পও তো দিনশেষে একজন মানুষ, কেন তাকে ডিলান কিংবা বব মার্লে ছুঁয়ে যায় না?
হেলাল হাফিজ : সব মানুষ আলাদা, সবার শিল্পবোধ এক নয়।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : সমসাময়িক কবিদের মধ্যে কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের সাথে সম্ভবত পরিচিত আপনি। ওনার কবিতা নিয়ে আপনার ভাবনা জানতে চাই।
হেলাল হাফিজ : ইমতিয়াজ মাহমুদ আমার ভক্ত, আমিও তার ভক্ত। ওর লেখার মধ্যে আলাদা একটা ব্যাপার আছে।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে কোনো স্মৃতি কি মনে পড়ে?
হেলাল হাফিজ : পারিবারিকভাবে তসলিমার সঙ্গে আমার খুবই অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিলো, একে তো মাটির টান, তার ওপরে অনুজ রুদ্র’র প্রেমিকা। ওদের মধ্যে এটা-সেটা নিয়ে সাংসারিক ঝামেলা লেগেই থাকতো, তখন আমিই যেতাম সেসব মেটাতে। এবং এই করতে করতেই আমি তসলিমার প্রেমে পড়ে যাই, তবে ব্যাপারটা একপাক্ষিক ছিলো। এইখানে তোমাদের বলে রাখি, আমার 'বেদনাকে বলেছি কেঁদো না'র প্রথম যে কবিতা, ‘ব্রক্ষ্মপুত্রের মেয়ে’, সেটা কিন্তু তসলিমাকে ভেবেই লেখা। ওকে আমি ‘তনা’ নামে ডেকেছি।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : আপনি বরাবরই বলেছেন যে, একজন প্রকৃত শিল্পী যদি হতে হয় তবে ক্ষমতা থেকে তার দূরে থাকাই ভালো।
হেলাল হাফিজ : আমি এটা সবসময়েই বলি। পাওয়ারের সঙ্গে কবির মেশা কখনো ঠিক না। কবি হলো একটা সার্বভৌম সত্তা Sovereign identity. একটা সমাজ বা জনগোষ্ঠী কী অবস্থায় আছে, এটা সেই সমাজের কবিদেরকে দেখে বোঝা যায়। কবি হলো একটি সমাজের ব্যারোমিটার, সমাজটা কি নষ্ট-ভ্রষ্ট না কি ভালো, কতটুকু সভ্য আর উন্নত তা কবিদের আচরণ দেখলেই বোঝা যায়। সমাজের কবিরা যদি পোষা পাখি হয়ে যায়, তাহলে ধরে নিতে হবে সে সমাজ দ্রুত গতিতে অধঃপতনের দিকে যাচ্ছে। কবি একটি জনগোষ্ঠীকে স্বপ্ন যেমন দেখাবে, তেমনি সেই জনগোষ্ঠীর স্বপ্নভঙ্গের বেদনাকেও সে চিহ্নিত করে দেবে। কোথায় ভুল-ত্রুটি হচ্ছে তা দেখিয়ে দেয়াও কবির দায়িত্ব। এর অর্থ এই না যে কেউ রাজনীতি করতে পারবে না। নিশ্চয়ই পারবে। একজন কবির একটি রাজনৈতিক সংগঠন করার যাবতীয় অধিকার অবশ্যই আছে। নিশ্চয়ই করবে সে। কিন্তু আমার ধারণা যে, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সক্রিয় সদস্য হলে একধরনের চিন্তাগত সীমাবদ্ধতা Automatically-ই আরোপিত হয়ে যায়।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : সক্রিয় রাজনীতিতে একধরনের সহিংস, কঠোর মনোভাব আছে যার প্রতি একজন শিল্পীর নরম মন সহজে সায় দিতে চায় না।
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, ঠিক এই কারণেই একজন কবির রাজনীতি থেকে একটু দূরে থাকতে পারাই ভালো। কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে তার রাজনৈতিক সংগঠন করারও সম্পূর্ণ অধিকার আছে। অবশ্যই আছে। সুকান্ত করেছে না? তারপরে ঐ যে ‘ফুল ফুটুক আর না ফুটুক আজ বসন্ত’ যিনি লিখলেন?
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : সুভাষ মুখোপাধ্যায়?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়। উনি তো সক্রিয় রাজনীতিই করতেন। সুকান্ত করতেন। এমনকি কাজী নজরুল ইসলামও। আমি এই যে বারবার বলছি, আমি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য না। তুমি দশজন কবির বই নিয়ে বসো, সবচাইতে বেশি রাজনৈতিক কবিতা পাবে আমার লেখায়।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : প্রয়াত কবি মাহবুবুল হক শাকিল, আপনার ঘনিষ্ঠজন বলেই চিনি আমরা। উনিও কিন্তু সক্রিয় রাজনীতিতে ছিলেন।
হেলাল হাফিজ : মাহবুবুল হক শাকিল—ও তো আমার কবিতা অসম্ভব পছন্দ করতো। এবং ময়মনসিংহ গেলে বাড়িতে যাওয়া-আসা ছিলো। এবং শাকিলই আমার চোখের চিকিৎসার সময়ে শেখ হাসিনার সাথে আলাপ করে পুরো বিষয়টা নিজে একক দায়িত্বে সামলিয়েছিলো। আমাকে সে বলেছে যে, আপা মানে নেত্রী তো আপনাকে খুব পছন্দ করে কিন্তু আপনি এত দূরে দূরে থাকেন কেন? আমি তখন বলেছি যে, ভাই দূরে-কাছে তো ব্যাপার না। আমি আমার কাজ করছি, উনি ওনার কাজ করছেন।
তো আমি যখন বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেলাম ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তখন ৪৫ বছর পর শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার মুখোমুখি দেখা।
 
নাদিরা ভাবনা : নতুন কবি বা লেখকদের লেখা কি পড়েন?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, সেটাই তো বেশি জরুরি। আমার সময়কে আমি কীভাবে ধরবো? আমার তো ৭২ বছর বয়স। তুমি আমার কবিতা পছন্দ করো বলে তোমার হয়তো আমাকে একটু কাছে বসতে দিয়েছো, নাহলে তো আমাকে কেউ ধারে কাছেও বসতে দেবে না। তাই না? আমি তোমাকে না পড়লে বুঝবো কীভাবে? কাছাকাছি থাকলে হয়তো একটু বন্ধুত্ব হতে পারে। কিন্তু এর বেশি তো আর সম্ভব না। তাহলে আমি আমার সময়কে বুঝবো কীভাবে? তোমার কবিতা পড়ে, গান শুনে কিংবা পেইন্টিং দেখেই তো বুঝতে হবে তোমাকে, তাই না?
 
নাদিরা ভাবনা : তার মানে নতুনদের ভালো লাগে। অনুপ্রাণিতও হন তাদের দ্বারা?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। হবো না কেন? কোনো ভালো লেখা পড়লে দারুণ লাগে। এইতো কিছুদিন আগে একটা মেয়ের লেখা দেখলাম Facebook-এ। তার সঙ্গে আমার পরিচয় নাই সেভাবে। আমিই তাকে Friend Request পাঠিয়ে বন্ধু হয়েছি। তাকে বলেছি যে আমার Inbox-এ কিছু লেখা দাও তোমার। আমি হাতের কাছে তরুণদের যত লেখা পাই, পড়ি। এখন হয়েছে কী! একটা কাল্ট বা ঘরানা মানে একটা স্বতন্ত্র ধারা জন্ম নিয়েছে, যা কিনা বছরে বছরে হবে না এমনকি যুগে যুগেও না। যেমন জীবনানন্দ দাশ একটা ঘরানা। রবীন্দ্রনাথ একটা ঘরানা।
 
নাদিরা ভাবনা : নজরুল?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ, নজরুলও একটা ঘরানা। কিছুটা ঘরানা আবুল হাসানও। আবুল হাসানের কবিতার কোনো নাম-টাম না থাকলেও বোঝা যাবে যে এটা আবুল হাসান।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : Signature?
হেলাল হাফিজ : Exactly, একজন কবির যে স্বাতন্ত্র্য, কবিসত্তা, এটা থাকা জরুরি।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : স্যার, জীবনে তো অনেক অনেক রূপসী নারীরই সান্নিধ্য পেলেন। একটা বিষয় জানতে চাই যে, একজন নারীর রূপ নাকি ব্যক্তিত্ব, কোনটা আপনাকে বেশি টানে?
হেলাল হাফিজ : দুটোই, আমি মনে করি যে দুটোই জরুরি। শুধু বাহ্যিক রূপ দিয়ে তো কোনোকিছু চিরস্থায়ী হবে না। এটার সঙ্গে যদি ভেতরের ভালো সংমিশ্রণ ঘটে তাহলে ব্যাপারটা জমে আরকি। এটা কেবল নারী নয় বরং পুরুষদের ক্ষেত্রেও একই।
 
নাদিরা ভাবনা : কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে বোধহয় রূপের বিষয়টা একটু বেশিই জরুরি?
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ এটাও সত্য। কিন্তু এটাই সর্বেসর্বা না। এটাই সবকিছু না। আমি নিজেই তো একসময় সুদর্শন ছিলাম, কিন্তু এখন? তুমি আমার কবিতা ভালোবাসো বলেই আমার পাশে বসেছো, আমি যদি না লিখতাম তাহলে কেউই আমাকে এই বয়সে এতটা গুরুত্ব দিতো না। যাই হোক, কিছুদিন আগে ‘প্রথম আলো’ জিজ্ঞাসা করেছিলো যে, আপনার এত এত নারী ভক্ত। তারা আপনাকে উপহার হিসেবে কী দেয়? উত্তর দিলাম, সবচেয়ে বেশি পেয়েছি চুমু। একসময় প্রচুর পেতাম। এখন তো পড়ন্ত বেলা, এখন মালা পাই, ব্রেসলেট পাই, ফুল পাই।
 
নাদিরা ভাবনা : চুমুও পান?
হেলাল হাফিজ : একেবারে যে পাই না তা না, তবে পাই। পাবার একটা জায়গা তো হলোই এখন! (ভাবনাকে ইঙ্গিত করে)
 
নাদিরা ভাবনা : তা তো বটেই।
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : এখন একজন মহান মানুষকে নিয়ে আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে যাচ্ছি, যাকে শুধু রাজনীতির ফ্রেমে আমরা আবদ্ধ রাখতে পারি না। উনি সার্বজনীন, উনি সবার। অন্তত একজন বাঙালি যদি হয়ে থাকি আমরা। বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ, এ দুটো আপনার কাছে সমার্থক কিনা স্যার?
হেলাল হাফিজ : বাঙালি জাতির জন্য একজন মানুষ, কেবল একজন মানুষই স্বতন্ত্র, স্বাধীন এবং সার্বভৌম একটি ভূখণ্ডের স্বপ্ন দেখেছেন, তার নাম শেখ মুজিবুর রহমান। আর কোনো বাঙালি বাঙালির জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমির কথা চিন্তা করেনি। কোনো কবি করেনি, কোনো রাজনীতিবিদ করেনি, কেউ করেনি।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : একমাত্র বাঙালি...
হেলাল হাফিজ : একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমানই বাঙালির জন্য একটি স্বতন্ত্র, স্বাধীন, সার্বভৌম আবাসভূমির স্বপ্ন দেখেছেন এবং তা শুধু দেখেনই নয় বরং সারাজীবনের সংগ্রাম দিয়ে সেটা বাস্তবায়িত করেছেন।
 
রেজওয়ান হাবীব রাফসান : বারবার জেল খেটেছেন…
হেলাল হাফিজ : তার সমকক্ষ আর কেউ নাই। কেউ নাই। এটা একদম বিনা বাক্যব্যয়ে মানে এই শব্দকে কোনোভাবেই Ignore করা সম্ভব না। এটা যদি কেউ অস্বীকার করতে চায় সে হয়তো বাঙালিই না। করেনি যে তা নয়, অনেকেই করছে। কিন্তু সেটা খুবই অযৌক্তিক, খুবই অপরিশীলিত মনের পরিচয়। তার রাজনীতির বিরুদ্ধতা হতে পারে কিন্তু তার যে অবদান, কাজ…
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : তার বিরোধীতা করা সম্ভব না।
হেলাল হাফিজ : একদম।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : আপনার গুরুই বলা যায়—আহমদ ছফা—তার প্রভাব কেমন আপনার ওপরে?
হেলাল হাফিজ : ছফা ভাই অনেক অনেক আদর করতেন আমাকে। এবং আমার ঐ যে কবিতাটা যখন বেরুলো ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’, তখন হুমায়ুন কবির নামে একজন কবি ছিলেন, বরিশাল বাড়ি তার। আমাকে নিয়ে ছফা ভাই আর হুমায়ুন ভাই গিয়েছিলেন দৈনিক পাকিস্তানের সম্পাদক আহসান হাবীবের কাছে। তখনকার দৈনিক পাকিস্তান পরে দৈনিক বাংলা হয়। হাবীব ভাইয়ের কাছে গিয়ে ছফা ভাই বললেন, এই যে হেলাল হাফিজ আর এই তার কবিতা। হাবীব ভাই কবিতাটি পড়ে আর আমার দিকে তাকান।
 
নাদিরা ভাবনা : বাচ্চা এই ছেলেটা করেছেটা কী?
হেলাল হাফিজ : যাইহোক, পরে হাবীব ভাই বললেন, ছফা ও তো বাচ্চা ছেলে কষ্ট পাবে, কিন্তু কবিতাটি আমি ছাপতে পারবো না। আমার চাকরি থাকবে না, এমনকি কাগজও বন্ধ করে দিতে পারে। সরকারি কাগজ তখন পাকিস্তানের। তবে এরপরেই বলেন তিনি যে, হেলালের আর কবিতা না লিখলেও চলবে, তার অমরত্ব নিশ্চিত হয়ে গেছে। এইতো এখনও কানে বাজে কথাটা। তখন ছফা ভাই এসে হুমায়ুন কবিরকে সাথে নিয়ে, ওনারা তখন লেখক-শিবির করতেন, বাম ঘরানার Underground সশস্ত্র বিপ্লবী ছিলেন। দুই রাতে সমস্ত ক্যাম্পাসের দেয়াল ভরে গেলো এই কবিতার পঙক্তিতে।
‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’
মাঝরাতে চিকা মেরে মেরে করেছিলো এসব। পুরো ক্যাম্পাস। কার্জন হল, আর্টস বিল্ডিং। তখন তো এতকিছু ছিলো না ক্যাম্পাসে। এই দুটিই বড়, মূল বিল্ডিং। সমস্ত দেয়ালে চিকা মারার এই কাজের নেতৃত্বে ছিলেন ছফা ভাই। উনি ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক স্যারের শিষ্য।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : আব্দুর রাজ্জাক স্যারকে নিয়ে তো উনি একটা বইও লিখেছিলেন, ‘যদ্যপি আমার গুরু’।
হেলাল হাফিজ : হ্যাঁ। আচ্ছা শোনো, আমি আর কথা বলতে পারবো না, এই যে আমার কাশি হচ্ছে বারবার। তোমরা ৩ জন মিলে এটা গুছিয়ে লিখো আর কোনো তথ্যের যদি ঘাটতি পড়ে কিংবা কিছু নিয়ে কোনো দ্বিধা যদি হয় তবে আমাকে ফোন করো।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : স্যার, একটা শেষ প্রশ্ন করি?
হেলাল হাফিজ : আচ্ছা করো।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : পিডিএফ বনাম কাগুজে বই, কার পক্ষে আপনি?
হেলাল হাফিজ : অনেকের ধারণা যে বই বোধ হয় উঠে যাবে, বই থাকবে না। কিন্তু আমার মনে হয় বই থাকবে। কারণ বইয়ের কাগজের যে গন্ধটা লাগে নাকে এটা কিন্তু খুবই হৃদয়গ্রাহী একটা ব্যাপার। এবং তুমি যতই অনলাইন পড়ো না কেন, এই যে বাইন্ডিং করা বই, এটা হাতে নিলে মনে হয় যেন লেখককেই ধরে আছো। এই স্পর্শ, আবেদনটা তুমি অন্য কোথাও পাবে না। আমাকে তো কত ছেলে-মেয়েই বলেছে যে, ঘুমানোর সময় ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ তাদের বালিশের নিচে থাকে।
 
নাদিরা ভাবনা : আমারও তো থাকে।
হেলাল হাফিজ : এই যে দেখো জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। চিন্তা করো কেমন লাগে তখন? কথাটা কত মানুষ যে বলেছে আমাকে!
 
নাদিরা ভাবনা : ব্যাপারটা এমন না যে শুধু পড়েই রেখে দিলাম, একটা ঘোরের বিষয় আছে।
হেলাল হাফিজ : এজন্যই আমি ১৭ বছর অপেক্ষা করেছিলাম বইটার জন্য আর এই ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ এটার জন্য ৩৪ বছর। এটা এমন না যে বেশি সময় নিয়ে বের করেছি বলে এটা সমকক্ষ তার, বরং আমি স্বীকারই করি যে এটা দূর্বল খানিকটা। ৩-৪ টা টিভি অনুষ্ঠান করেছি বইটা বেরুবার পরে এবং প্রতিটাতেই স্বীকার করেছি।
 
শাহনেওয়াজ খান সিজু : প্রথম বই সবসময়েই প্রিয়।
হেলাল হাফিজ : না না, যেটা বাস্তব সেটা তো বলতেই হবে। ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ যখন আমি লিখেছি, তখনকার সময় আর এখন কি এক? ঐ সময় আমি কোথায় পাবো? কবিতা তো আর হাওয়ায় হাওয়ায় হয়ে ওঠে না।
 
নাদিরা ভাবনা : এবার চা খাব।
হেলাল হাফিজ : শুধু চা কেন? তার আগে কাবাব-নান খাবো এবং আমি খাওয়াবো। চলো, এতক্ষণে ক্যান্টিন খুলে গেছে...

/জেডএস/

সম্পর্কিত

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ১৭:৪৩

২০২১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জিতে নিলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ। ৭ অক্টোবর বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় বিকেল পাঁচটায় এই পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করে রয়েল সুইডিশ অ্যাকাডেমি।

তানজানিয়ার নাগরিক আবদুলরাজাক গুরনাহ যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। তিনি মূলত ইংরেজিতে লেখেন। তার  বিখ্যাত কয়েকটি উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে প্যারাডাইস (১৯৯৪), বাই দ্য সি (২০০১), এবং ডেজারশন (২০০৫)।

১৯৪৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন আবদুলরাজাক গুরনাহ। তানজানিয়ায় বেড়ে উঠলেও ১৯৬০ সালের পর শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাজ্যে যান এই সাহিত্যিক। অবসর নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি ক্যান্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। সুইডিশ একাডেমি বলেছে, আবদুলরাজাক গুরনাহের আপোষহীন ও দরদী লেখায় উপনিবেশিকতার দুর্দশা আর শরণার্থীদের জীবনের নানা কষ্ট-ব্যাঞ্জনার গল্প ফুটে উঠেছে।

২০২০ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জিতে নেন আমেরিকান কবি লুইস গ্লাক। সুইডিশ অ্যাকাডেমির পক্ষ থেকে বলা হয়, গ্লাককে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে তার নিরাভরণ সৌন্দর্যের ভ্রান্তিহীন কাব্যকণ্ঠের কারণে, যা ব্যক্তিসত্তাকে সার্বজনীন করে তোলে। ২০১৯ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন অস্ট্রিয়ান লেখক পিটার হান্দক। তার বিরুদ্ধে সার্বিয়ার নেতা স্লোবোদান মিলোসেভিচের বলকান যুদ্ধ সমর্থনের অভিযোগ রয়েছে।

২০১৮ সালে নোবেল কমিটির এক সদস্যের স্বামী ও জনপ্রিয় আলোকচিত্রী জ্যঁ ক্লদ আর্নোর বিরুদ্ধে যৌন কেলেঙ্কারির অভিযোগ আনা হয়। পরে ওই ঘটনায় তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে আদালত। যৌন কেলেঙ্কারির পাশাপাশি বিজয়ীর নাম ফাঁস করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিতর্কের মুখে স্থগিত করা হয় ২০১৮ সালের সাহিত্যে নোবেল প্রদান।

কেলেঙ্কারির কারণে ২০১৯ সাল থেকে অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে শুরু করে রয়েল সুইডিশ একাডেমি। পাল্টে যায় নোবেল কমিটির কাঠামোও। সে বছর ২০১৯ সালের বিজয়ীর পাশাপাশি ঘোষণা করা হয় ২০১৮ সালের স্থগিতকৃত বিজয়ীয় নামও। ২০১৮ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান পোলিশ লেখক ওলগা তোকারজুক।

সরাসরি নোবেল ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১৮ সালেই প্রথমবারের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা বাতিল করা হয়। এর আগে দ্বিতীয় ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ও এ বিভাগে পুরস্কার দেওয়া হয়নি। তবে ওই সময় যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে দেওয়া হয়নি।

২০১৭ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জিতে নেন জাপানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক কাজু ইশিগুরো। ২০১৬ সালে অ্যাকাডেমি আমেরিকান রক সংগীতের কিংবদন্তি বব ডিলানকে এই পুরষ্কার দেওয়া হয়।

এর আগে ১৪ জন নারী সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন। প্রয়াত টনি মরিসন একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ নারী যিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন।

প্রসঙ্গত, ১৮৯৫ সালের নভেম্বর মাসে আলফ্রেড নোবেল নিজের মোট উপার্জনের ৯৪% (৩ কোটি সুইডিশ ক্রোনার) দিয়ে তার উইলের মাধ্যমে নোবেল পুরস্কার প্রবর্তন করেন। এই বিপুল অর্থ দিয়েই শুরু হয় পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান।

১৯৬৮ সালে তালিকায় যুক্ত হয় অর্থনীতি। সে বছর পুরস্কার ঘোষণার আগেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন আলফ্রেড নোবেল। আইনসভার অনুমোদন শেষে তার উইল অনুযায়ী নোবেল ফাউন্ডেশন গঠিত হয়। তাদের ওপর দায়িত্ব বর্তায় আলফ্রেড নোবেলের রেখে যাওয়া অর্থের সার্বিক তত্ত্বাবধান করা এবং নোবেল পুরস্কারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা করা। বিজয়ী নির্বাচনের দায়িত্ব সুইডিশ অ্যাকাডেমি আর নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটিকে ভাগ করে দেওয়া হয়।

/জেজে/

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২১, ২০:৪৮

শিশুরা খেলবে
এই তো নিয়ম
বুড়োরা দেখবে
তাই বুঝি কম
হঠাৎ দেখছি
হলদিয়া মাঠে
বদলিয়ে গেছে
আগম নিয়ম :

বুড়োরা খেলছে
শিশুরা দেখছে

(আগম-নিয়ম/ লঘু সংগীত ভোরের হাওয়ার মুখে)

আমাদের জীবন যে সব সময় শৈশবকে বহন করে চলেছে, এই কবিতার মধ্যে সেই বার্তা পাই। বয়স্ক মাত্রই একদিন শিশু ছিল, কিন্তু বুড়ো হয়ে অনেকে ভুলে যান সে-কথা। কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ভোলেননি! সে-জন্যই বোধ হয় আমাদের মনোজগতের 'আগম-নিয়ম' বদলে দিতে চেয়েছিলেন তিনি! 'হলদিয়া'র ঠিক পরের লাইনে 'বদলিয়ে' শব্দটি কী মাধুর্য এনেছে! তাঁর মনের বয়স যে বাড়েনি, কাছে গেলেই সে-কথা টের পাওয়া যেত। মধুর-আনন্দে ভরিয়ে দিতেন আমাদের ছেলেবেলা!

কখনও মজার গল্প বলতেন। একবার তাঁর বাড়িতে গিয়ে মুখোমুখি বসেছি, ওমনি তাঁর পায়ে এসে বসল একটা মশা! 'ঠাস' শব্দে মশাটাকে মেরে অলোকরঞ্জন বললেন :
—আমাদের বন্ধু তারাপদকে চেনো?
—তারাপদ রায়? বহু কবিতা পড়েছি তাঁর।
—আমাদের শৈশবে ওর একটা ডেরা ছিল কলকাতায়। রাতে মশার বাড়বাড়ন্ত। মশারি টাঙিয়ে ঘুমোত তারপদ।
—তাই?
—রাত দু'টোর মধ্যে ঘরের সমস্ত মশা ঢুকে পড়ত ওর মশারির ভেতর।
—সেকি! তারপর?
—তারাপদ তখন আলত করে মশারি থেকে বেরিয়ে এসে খোলা মেঝেতে ঘুমিয়ে দিব্যি কাটিয়ে দিত বাকি রাতটা!

কী আশ্চর্য! ১৭ নভেম্বর অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর চলে যাওয়ার দিনটিতেই তারাপদ রায়ের জন্মদিন। কীরকম তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গিয়েছে দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু। আজ অলোকদার জন্মদিনে তাঁর কথাগুলো কানের কাছে বেজে উঠছে পিয়ানোর সুরের মতো। আর ভাবনার অতল মিলিয়ে যাচ্ছে জলের গভীরে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে নবনীতা দেবসেনের মৃত্যুর পর তিনি আমাকে বলেছিলেন যে, বুদ্ধদেব বসুর চলে যাওয়ার দিনটিতে নবনীতা ঘটনাচক্রে ছিলেন অলোকরঞ্জনের জার্মানি বাড়িতে। সেদিন সারা রাত তাঁরা শুধু বুদ্ধদেবের স্মৃতিচারণ করেছিলেন, তারপর এক সময় জানালা দিয়ে আলো আসতে শুরু করে, ভোর হয়ে যায়।

বাজে রে গুপীযন্ত্র বাজে মহাঅন্ধকারে

চটকা ভেঙে সংসারীরা গণপিটুনি দিতে
আছিলা চোর খুঁজে বেড়ায়, নাগরদোলা থেকে
দুঁদে সয়তান ধার্য করে কোনজন সজ্জন,
বাকিরা প্রাণ খোয়ায় তার একটি ইঙ্গিতে,
নবারুণের বদলে দেখি শুধুই রাত বাড়ে—

তবুও গুপীযন্ত্র বাজে মহাঅন্ধকারে

(গুপীযন্ত্র বাজে/ শুনে এলাম সত্যপীরের হাটে)

তখন কি ভেবেছিলাম ঠিক তার পরের বছর নভেম্বরে তিনিও চলে যাবেন আমাদের ছেড়ে! কবি আলোকরঞ্জন দশগুপ্তর প্রয়াণ আমাদের কাছে রাত বাড়ার মতোই 'মহাঅন্ধকার' এনে দিয়েছে। প্রয়াণের পর এই তাঁর প্রথম জন্মদিন। কাছের মানুষকে হারালে, কেন জানি না, তাঁর সঙ্গে যাপনের দিনগুলোই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বারবার। পর্দায় দেখা সিনেমার দৃশ্যের মতোই, একের পর এক। যদবপুরে শক্তিগড়ের মাঠের কাছে তাঁর ফ্ল্যাটে আমাদের আড্ডা হয়েছে বহুবার। টের পেতাম শব্দ প্রবাহের রূপান্তর। শক্তিগড় শব্দটির মধ্যে একটা স্পেস দিয়ে উচ্চারণ করতেন তিনি। শক্তি (স্পেস) গড়ের মাঠ! কিন্তু কেন? একটা স্পেসের মধ্যে দাঁড়িয়ে কি তিনি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কোনও মেধাবী-মজা করতেন? তা ধরার সাধ্য আমার নেই। তবে তিনি শক্তির কবিতার কাছে বারবার যেতে বলতেন, সেকথা মনে আছে। যখন তাঁর কাছে 'বৈষব পদাবলি' বুঝতে গিয়েছি, তখনও তিনি বলেছিলেন-- 'শক্তির কবিতা বৈষ্ণব পদাবলির জঙ্গম উত্তরাধিকার বহন করেছে'। এই নিয়ে তাঁর একটি লেখাও রয়েছে। সেই লেখা পাওয়া যায় 'যা হয়েছে যা হতেছে এখুনি যা হবে' বইয়ে।

২০১২ সালের ডিসেম্বরে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির আয়োজনে লিটল ম্যাগাজিন মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল শিলিগুড়ির বাঘাযতীন পার্কে। সেখানে কবিতা পড়তে যাব জেনে অলোকদা বললেন, 'আমার বন্ধু অশ্রুকুমার সিকদার শিলিগুড়িতে থাকেন। ওঁর সঙ্গে দেখা করে এসো। বলবে আমি পাঠিয়েছি।' সেই মতো ফোন করে অশ্রুবাবুর বাড়িতে গেলাম। তাঁর 'আধুনিক কবিতার দিগবলয়' কত ছোটবেলায় পড়েছিলাম। বইটা আমার বাবার সংগ্রহে ছিল। এবার অশ্রুবাবু উপহার দিলেন 'গাংচিল' থেকে প্রকাশিত তাঁর 'এক কুড়ি প্রবন্ধ'। বইটা পড়ে কী ভীষণ ঋদ্ধ হই এখনও! শেষ দিন পর্যন্ত অশ্রুবাবুর সঙ্গে সুযোগাযোগ থেকে গিয়েছিল একমাত্র অলোকঞ্জনের সৌজন্যেই!

এর কিছুদিন পর নন্দন চত্বরে লিটল ম্যাগাজিন মেলায় অলোকরঞ্জন দশগুপ্তর কবিতাপাঠ শুনেছিলাম :

প্রজাপতির পরনে ছিল হলুদ টাই,
তুমি কিন্তু দেখলে শুধু হলুদটাই।

যেদিকে চাও এখন শুধু ঘূর্ণিঝড়,
উড়তে গিয়ে গাছগুলিও দূর-শিকড়।

বরণডালায় কেউ রেখেছে বিষবারুদ,
যজ্ঞের চাল নষ্ট-করা কপিশ দুধ

খেতের মধ্যে ছলকে  যায়, এমন সময়
ভয় সাহস এবং কিনা সাহস ভয়।

এর ভিতরে ছোট্ট বুকে সাহসভরে
একটুখানি রং-বদলের আড়ম্বরে

পাড়ার প্রজাপতি আঁচল হলুদ টাই,
তুমি কিন্তু দেখলে শুধু হলুদটাই!

'হলুদ টাই'-এর সঙ্গে 'হলুদটাই'-এর আশ্চর্য অন্তমিল ভাবা যায়! কিংবা 'ঘূর্ণিঝড়' এর সঙ্গে দূর-শিকড়-এর? আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত তাঁর 'তুষার জুড়ে ত্রিশূলচিহ্ন' বইয়ে আছে এই কবিতা। নিজেকে 'আড় ভাবুক' বলতেন তিনি। একবার এর মানে জানতে চেয়েছিলাম তাঁর কাছেই। বলেছিলেন, যেকোনো বিষয়কে আড়াআড়ি ভাবা। অলোকরঞ্জনের সঙ্গ না-পেলে মনে হয় জীবনটাই বিবর্ণ থেকে যেত।

২০১৮ সালে অক্টোরব মাসে দিল্লি থেকে ফোন করে বললেন : 'দেশ পত্রিকায় তোমার কবিতাটা ভালো লেগেছে। আমার বোনের বাড়িতে বসে লেখাটা পড়লাম।' একজন তরুণের কাছে এর চেয়ে বেশি পাওয়া আর কী হতে পারে! আজ, তাঁর 'পদ্ধতি ও খণ্ড খণ্ড মেঘ' আবার খুলে বসেছি। বইটা এক সময় তাঁর সংগ্রহে ছিল না। কলেজ স্ট্রিট বাটার তিন তলায় 'বিকল্প' প্রকাশনা থেকে একটা কপি সংগ্রহ করে আমি দিয়েছিলাম তাঁকে। এই বই আমার চোখের সামনে খুলে দিয়েছিল জার্মান সাহিত্যের জানলা। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত আমার কাছে খোলা জানালার মতোই। যে-জানালা দিয়ে আমার ঘরে সব সময় আলো-বাতাস আসছে...।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

আপডেট : ০৫ অক্টোবর ২০২১, ১২:৪৭

এ বছর ‘দ্য বুকার প্রাইজ’-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছে শ্রীলঙ্কার ৩৩ বছর বয়সী লেখক অনুক অরুদপ্রাগাসামের উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’। বইটি চলতি বছরের ১৩ জুলাই যৌথভাবে প্রকাশ করেছে আমেরিকার হোগার্থ প্রেস এবং হামিশ হ্যামিল্টন। আমেরিকার পাশাপাশি ইংল্যান্ডের গ্রান্টা বুকস থেকেও ১৫ জুলাই উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়।

উপন্যাসের বিষয়বস্তু গৃহযুদ্ধোত্তর শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি।

‘২০২১ বুকার প্রাইজ’-এর সংক্ষিপ্ত তালিকা ঘোষণা করা হয় ১৪ সেপ্টেম্বর।

উপন্যাসর মূল চরিত্র কৃষ্ণ, যাকে কেন্দ্র করেও গল্প গড়ে ওঠে। দেখানো হয়, কৃষ্ণ বর্তমান সময়ের কলম্বোর একটি এনজিওতে চাকরি করে। যে এক সময় শ্রীলঙ্কার উত্তরে যাত্রা করে– যেখানে গৃহযুদ্ধের কুরুক্ষেত্র ছিলো– সেখানে সে তার দাদীর তত্ত্বাবধায়কের শ্মশান যাত্রায় যোগ দেয়।

‘এ প্যাসেজ নর্থ’ একটি গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন দার্শনিক উপন্যাস। কাহিনিটি প্রাথমিকভাবে গড়ে উঠেছে দীর্ঘ বাক্য ও পার্টিসিপেল ফ্রেইজ ও সাবঅডিনেট ক্লজ দিয়ে। সংলাপ গঠিত হয়েছে সরাসরি প্রশ্ন না করে পাস্ট পারফেক্ট টেনস দিয়ে।

অনুক অরুদপ্রাগাসাম এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি চেয়েছেন কৃষ্ণর সঙ্গে তার দাদীর আবেগমথিত সম্পর্কের স্বরূপ তুলে ধরতে।

যাই হোক, উপন্যাসের শেষে দেখা যায় দাদী-নাতির সম্পর্ক প্রাসঙ্গিক থাকলেও কৃষ্ণ আছন্ন হয়ে পড়ে রানীর বিষণ্নতায়, যিনি তার দুটি সন্তান হারিয়েছেন এমনকি আঞ্জুমের সঙ্গে সম্পর্কও তার অতীত।

উপন্যাসটি একই সঙ্গে রাজনৈতিকও, সংলাপের ভেতরে প্রকাশ পেয়েছে তামিল জনগণের উপর শ্রীলঙ্কার সরকারের অত্যাচারের বিষয়ে নিন্দা।

অনুক অরুদপ্রাগাসাম শ্রীলঙ্কার তামিল লেখক, তিনি ইংরেজি ও তামিল ভাষায় লেখেন। 

তার প্রথম উপন্যাস ‘এ স্টোরি অব এ ব্রিফ ম্যারেজ’ প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালে, অনূদিত হয় ফরাসি, জার্মান, চেক, মান্দারিন, ডাচ এবং ইতালিয় ভাষায়। এই উপন্যাসটি ২০০৯ সালের গৃহযুদ্ধের চূড়ান্ত অবস্থা নিয়ে লেখা, যা দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যের জন্য লাভ করে ডিএসসি প্রাইজ এবং ডিলান টমাস পুরস্কার। এছাড়া জার্মান আন্তর্জাতিক সাহিত্য পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পায়। 

অরুদপ্রাগাসাম ১৯৮৮ সালে শ্রীলঙ্কার কলোম্বোর একটি তামিল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়তে ১৮ বছর বয়সে তিনি আমেরিকা গমন করেন। লেখাপড়া শেষ করে তিনি ভারতের তামিল নাড়ুতে বসবাস করছেন। এছাড়াও তিনি কলোম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেছেন।

অরুদপ্রাগাসামের প্রথম উপন্যাস ‘এ স্টোরি অব এ ব্রিফ ম্যারেজ’ ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের সময়কালে লেখেন। এতে দীনেশ ও গঙ্গার একটি দিন ও রাতের বর্ণনা করা হয়, যারা শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর উত্তর-পূর্ব উপকূলের ক্যাম্পে বোমা বর্ষণের কারণে বিয়েতে বাধ্য হয়।

অনুক এখন তার তৃতীয় উপন্যাস লিখছেন, এর কাহিনি গড়ে উঠেছে মা ও তার মেয়ের তামিল ডায়াসপোরা নিয়ে, যার কিছুটা নিউইয়র্কে ও কিছুটা টরেন্টোতে।

২০২১ বুকার প্রাইজ-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পাওয়া বাকি ৫টি বই হলো : দক্ষিণ আফ্রিকার লেখক ড্যামন গালগুটের ‘দ্য প্রমিজ’; যুক্তরাষ্ট্রে প্যাট্রিসিয়া লকউডের ‘নো ওয়ান ইজ টকিং অ্যাবাউট দিস’; সোমালিয়ান/যুক্তরাজ্যের নাদিফা মোহাম্মাদের ‘দ্য ফরচুন মেন’; যুক্তরাষ্ট্রের রিচার্ড পাওয়ার্সের ‘বিউইলপডারমেন্ট’ এবং ম্যাগি শিপস্টেডের ‘গ্রেড সার্কেল’ উপন্যাসটি।

আগামী ৩ নভেম্বর ‘২০২১ বুকার প্রাইজ’-এর বিজয়ীর নাম প্রকাশ করা হবে।

/জেডএস/

সম্পর্কিত

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

‘একজন কেউ পাশে থাকলে ভালো হতো’

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

সাহিত্যে নোবেল পেলেন ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

প্রসঙ্গ অলোকরঞ্জন : তরঙ্গদ্রাঘিমায় মিলে গেল দুই বন্ধুর জন্ম-মৃত্যু

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

বুকারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় শ্রীলঙ্কান উপন্যাস ‘এ প্যাসেজ নর্থ’

সেন্ট লুইস লিটারারি অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছেন অরুন্ধতী রায়

সেন্ট লুইস লিটারারি অ্যাওয়ার্ড পাচ্ছেন অরুন্ধতী রায়

দোলা যে রাতে সেলিমের ফ্লাটে যায়

দোলা যে রাতে সেলিমের ফ্লাটে যায়

জব্দ করো নোবেল

জব্দ করো নোবেল

সাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

পর্ব—পাঁচসাহিত্যতত্ত্ব : একটি সংক্ষিপ্ত পরিক্রমা

কে পাচ্ছেন সাহিত্যে নোবেল?

কে পাচ্ছেন সাহিত্যে নোবেল?

সর্বশেষ

৫ গোলের ম্যাচে বেলজিয়ামকে হারিয়ে ফ্রান্স ফাইনালে

৫ গোলের ম্যাচে বেলজিয়ামকে হারিয়ে ফ্রান্স ফাইনালে

আফগানিস্তানে বিক্রি হচ্ছে অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্র

আফগানিস্তানে বিক্রি হচ্ছে অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্র

ফাইনালে খেলার আশা ছাড়ছেন না বাংলাদেশ কোচ

ফাইনালে খেলার আশা ছাড়ছেন না বাংলাদেশ কোচ

শিগগিরই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার ঘোষণা তালেবানের

শিগগিরই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার ঘোষণা তালেবানের

মধ্যরাতে ভূমিকম্পে কেঁপে উঠলো দেশ

মধ্যরাতে ভূমিকম্পে কেঁপে উঠলো দেশ

© 2021 Bangla Tribune