X
সোমবার, ১৪ জুন ২০২১, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮

সেকশনস

অন্যরকম শিক্ষার সন্ধানে: বয়ঃসন্ধিকালের শিক্ষা

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ১১:৩৯

ফারহানা মান্নানছেলেমেয়েদের বয়ঃসন্ধিকালে অভিভাবকদের মধ্যে সন্তানদের দিয়ে নানা উদ্বেগ আর চিন্তায় ভুগতে দেখা যায়। এই চিন্তা কোনওভাবেই অস্বাভাবিক নয়। যে ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তারা যায় আর তার ফলে তাদের মধ্যে আচরণের যে সকল সমস্যার সৃষ্টি হয় তাতে করে অভিভাবকদের কপালে চিন্তারেখা দেখা দেওয়া স্বাভাবিক।
আমি অভিভাবকদের বলবো না যে, চিন্তামুক্ত থাকুন। বরং বলব, চিন্তা করুন। ভাবুন। তবে ছেলে বা মেয়ের বয়ঃসন্ধিকালীন সমস্যা নিয়ে নয় বরং ভাবুন কি করে সন্তানদের জন্য বয়ঃসন্ধিকালীন সময়টা সহজ করা যায়। ভাবুন কি করে বয়ঃসন্ধিকালের নানা পরিবর্তনের সঙ্গে তাদের খাপ খাইয়ে নেওয়া যায়। বন্ধু নয়, তবে প্রয়োজনীয় সময়ে বন্ধুর মতো আচরণ করে সন্তানদের অনুভব আর অনুভূতির সাথে কী করে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া যায়; তার কথাই ভাবুন। তবে তার আগে অভিভাবক হিসেবে বয়ঃসন্ধিকাল সম্পর্কে জানুন।
অভিভাবক হিসেবে বলতে পারেন, এ সময় আমরা পার করেছি, জানি। কিন্তু অনেক সময় দেখবেন পরিবর্তন সম্পর্কে আপনি যা জানেন তার বাইরেও আরও অনেক রকম আছে। প্রত্যেকটি মানুষইতো ভিন্ন। তাই না? আপনি জন্ম দিতে পারেন, তবু প্রত্যেকটি মানুষ জন্মগতভাবে কিছু সহজাত স্বভাব নিয়ে জন্মায়। কাজেই বয়ঃসন্ধিকাল সম্পর্কে আরও জানতে বই, ইন্টারনেট সহ যে কোনও মাধ্যমের শরণাপন্ন হোন। দেখুন, গাছ থেকে আপেল (অন্য কিছুও হতে পারে) পড়তে দেখে অনেকেই কিন্তু এর সঙ্গে জড়িত মধ্যাকর্ষন শক্তির কথা ভেবেছেন একজন। একথা বলার উদ্দেশ্য হলো, মানুষভেদে দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টি বোঝানো। আপনার সন্তানের বয়ঃসন্ধিকালের আচরণের সমস্যার সঙ্গে অন্য অভিভাবকের সন্তানের পার্থক্য থাকতেই পারে। যদিও কিছু কমন সমস্যা, পরিবর্তন আছে যা সে সময়ের সকল ছেলেমেয়ের জন্য একই। তবু কমন বলুন বা আনকমন, পরিবর্তন সম্পর্কে আরও জানতে বই পড়া চাই। বইতে হুবহু আপনার সন্তানের সমস্যার জন্য বিশেষ সমাধান হয়তো পাবেন না কিন্তু সমস্যাভেদে সামাধানের জন্য চিন্তাভাবনার একটা ধারা পাবেন। সে আলোকেই সন্তানের জন্য নিজের মতো করেই উপযুক্ত সমাধানের ব্যবস্থা করবেন। অন্য অভিভাবকদের সাথেও কথা বলতে পারেন, তবে জানবেন আপনার সন্তানকে সব থেকে ভালো চিনবেন আপনি। কাজেই যে কোনও সমাধানের ক্ষেত্রেই নিজের সন্তানের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে সবার আগে মূল্যায়ন করুন।
আমার নিজের এক ভাই বয়ঃসন্ধিকাল যাপন করছে। কিছুদিন আগে জানতে পারলাম স্কুলের এক শিক্ষকের অন্যায় আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে সে শিক্ষককে এমন কিছু বলেছে যা তার বলা উচিৎ হয়নি। আমার এই আত্মীয়কে দেখি হঠাৎ বিষন্ন হয়ে যেতে, দেখি সে শারীরিকভাবে ধাইধাই করে বেড়ে উঠছে। ও যখন ১০ বছর বয়সের; একদিন কম্পিউটারের ইন্টারনেটে ঢুকে দেখি সে সার্চ দিয়েছে বিশেষ শব্দ দিয়ে। দেখে বুঝলাম শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে তার মধ্যে কৌতুহল শুরু হয়েছে। বয়ঃসন্ধিকালে আমার এক বোনকে দেখেছি হঠাৎ বেশ চুপচাপ হয়ে যেতে। সবসময় ওড়না দিয়ে নিজের শরীরকে আড়াল করার চেষ্টা তার মধ্যে কাজ করছে। কেমন যেন সঙ্কুচিত ভাব। আমার এক পরিচিতের (ছেলে) বয়ঃসন্ধিকালে দেখেছি কোনওভাবেই স্কিন টাইট পোশাক পরবে না। অর্থাৎ শরীরের আকার বোঝা যায় এমন পোশাক সে পড়বে না। ছেলেটির স্বাস্থ্য ভালো। অন্য বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেদের তুলনায় তার শরীরের পরিবর্তন বেশ স্পষ্ট। এটা নিয়ে সে বেশ লজ্জিত এবং শঙ্কিত। ঢিলে শার্ট পড়েও তাকে দেখেছি কুঁজো হয়ে হাঁটতে। এরকম আরও বহু পরিবর্তনের বাস্তব উদাহরণ আছে। একটু লক্ষ করলেই আপনাদের চারপাশে দেখতে পাবেন। এই সকল পরিবর্তন স্বাভাবিক। কিন্তু লক্ষ করবেন একই পরিবর্তনে এক এক জনের প্রকাশভঙ্গী হচ্ছে এক এক রকম। যেমন আমার নিজের গায়ের রঙ আমার বোনের তুলনায় চাপা। আমার বয়ঃসন্ধিকালে এ নিয়ে বহু কথা শুনেছি। কিন্তু এ নিয়ে আমার নিজের কোন আক্ষেপ ছিল না। বরং নিজেকে আরও ভালো দেখাতে চেষ্টা করতাম। কিন্তু এমনও আছে যারা বয়ঃসন্ধিকালের সময়ে চাপা বর্ণের কারণে আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগে। কাজেই বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেমেয়েদের প্রকাশভঙ্গী একই রকম নাও হতে পারে।

আমাদের দেশে অভিভাবকদের মধ্যে আমি সমস্যা দেখে সমাধানের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া যেমন দেখি তেমন দেখি হা-হুতাশ করবার প্রবণতা। আমার মনে পড়ে আমার বয়ঃসন্ধিকালের সময়েই মায়ের বকা খেয়েছি সব থেকে বেশি। ভেবে, চিন্তা করে খুব সূক্ষ্মভাবে ছেলেমেয়েদের মন বুঝতে তারা অত সময় ব্যয় করতেন না। করতে চাইতেনও না। আসলে এটার জন্য আমাদের সমাজ ব্যবস্থা অনেকখানি দায়ী। আমাদের সমাজ এই বিষয়ে খুব বেশি চিন্তিত নয়। নয় বলেই যৌন শিক্ষার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনও আলোচনার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠতে পারলো না। আর ‘জেন্ডার’ সম্পর্কিত বিষয়েও যথেষ্ট সচেতনতা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। সম্ভব হয়নি স্কুলগুলোতে ‘কাউন্সিলিং’ এর ধারণা প্রবর্তন করা! এখন প্রশ্ন হতে পারে বয়ঃসন্ধিকালের সঙ্গে এগুলোর সম্পর্ক কী?

যৌন শিক্ষা হলো বিষয়ভিত্তিক নির্দেশনা যা কিনা মানুষের যৌনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এটা আরও আলোচনা করে প্রজননতন্ত্র, যৌন কার্যক্রম, প্রজনন স্বাস্থ্য, আবেগিক সম্পর্ক, প্রজনন সংক্রান্ত অধিকার ও দায়িত্ব, যৌন সম্পর্ক তৈরি করা থেকে বিরত থাকা এবং জন্ম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। কাজেই বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। যৌন শিক্ষা সমাজে বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েদের অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে আনতে ভূমিকা রাখে। নিশ্চিতভাবেই এটা কেবল যৌন কার্যক্রম নিয়ে কথা বলে না। তবে স্পর্শকাতর এই বিষয়টি খুব সতর্কতার সঙ্গে (সামাজিক, পারিপার্শিক ও ধর্মীয় বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে) ছেলেমেয়েদের সামনে তুলে ধরতে হবে। এজন্য অভিভাবকরাই সবার আগে প্রাথমিক দায়িত্ব পালন করবেন। প্রয়োজনে স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদের এই বিষয় ধারণা দেবে। এবং বলবে যে কত সুন্দর ও মার্জিতভাবে এই বিষয়ে ছেলেমেয়েদের ধারণা দেওয়া যায়।

আর জেন্ডার সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা বয়ঃসন্ধিকালের একটা ছেলের মধ্যে একটা মেয়ে সম্পর্কে সম্মান তৈরি করবে। কারণ জেন্ডার নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলে। জেন্ডার বৈষম্য রোধে পদক্ষেপ নেয় এবং সেই সাথে নারী ও পুরুষের মধ্যে জেন্ডার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করে। একই সঙ্গে নারীর প্রতি সহিংসতা বা নারী নির্যাতন রোধেও ভূমিকা রাখে। যেমন শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, এসিড নিক্ষেপ, তালাক, যৌতুক, মানসিক নির্যাতন, আর্থিকভাবে নির্যাতন, নারী পাচার, গণিকা বৃত্তি, অশ্লীল সাহিত্য, বিজ্ঞাপনে ও সুন্দরী প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নারীকে পণ্যে পরিণতকরণ, পরিবারে নারীর প্রতি অবহেলা, অপহরণ ও উত্যক্ত করা সহ আরও নানা ধরনের নির্যাতনের কথা বলে। এগুলো সম্পর্কে একটা ছেলে যদি তার বয়ঃসন্ধিকালেই জানতে পারে তাহলে পথচলা একটা মেয়েকে দেখে ইভটিজিং এর ভাবনা হয়তো তার মধ্যে আসবে না। এই বিষয়টি যৌন শিক্ষার মতো স্পর্শকাতর নয় তবে গুরুত্বপূর্ণ। আনুষ্ঠানিকভাবে না করে গল্প বা নাটক বা কথাচ্ছলে ক্লাসে এই সকল বিষয়ে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের জানাতে পারেন। আর বোঝানোর ক্ষেত্রে শিক্ষকের চাইতেও বড় হচ্ছেন অভিভাবক। এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

আর স্কুলে কাউন্সেলিং-এর ব্যবস্থা গ্রহণতো করতেই হবে। বয়ঃসন্ধিকালের একটা ছেলে বা মেয়েকে মানসিকভাবে যে কোনও সাপোর্ট দিতে পারেন। যে কথা অনেক সময় অভিভাবককে বলা মুশকিল হয় সেটা বলার জন্য একজন কাউন্সিলর পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখবেন। এটা অল্প বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিদ্যমান আত্মহত্যার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।

আসলে বয়ঃসন্ধিকালের পরিবর্তনকে সমাজে স্বাভাবিকরূপ দিতেই এত ভাবনা। বলছি না এই সময়ে সব ছেলেমেয়েই অস্বাভাবিক আচরণ করবে! কিন্তু যারা করে তাদের জন্য প্রতিকারতো চাই? যারা করতে পারে তাদের জন্যও চাই আর যারা একেবারেই স্বাভাবিক তারা জানলেও কিন্তু কোনও ক্ষতি নেই! সাবধানের মার নেই। কারণ একটা দূর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না। অভিভাবক হিসেবে তাই দায় ও দায়িত্ব দুটোই আছে। কাজেই একজন সতর্ক নাগরিক হওয়ার পাশাপাশি একজন সতর্ক ও বিচক্ষণ অভিভাবক হোন।

লেখক: শিক্ষা বিষয়ক গবেষক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

সর্বশেষ

বিরোধ দূর করতে মাঠে আওয়ামী লীগ

বিরোধ দূর করতে মাঠে আওয়ামী লীগ

এসডিজি বাস্তবায়নে অগ্রগতির শীর্ষ তিনে বাংলাদেশ

এসডিজি বাস্তবায়নে অগ্রগতির শীর্ষ তিনে বাংলাদেশ

এরদোয়ান-বাইডেন রুদ্ধদ্বার বৈঠক

এরদোয়ান-বাইডেন রুদ্ধদ্বার বৈঠক

নেইমার ভালো থাকলে ভালো কিছু হয়: ব্রাজিল কোচ

নেইমার ভালো থাকলে ভালো কিছু হয়: ব্রাজিল কোচ

তিতাসের ৫ হাজার অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন

তিতাসের ৫ হাজার অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন

গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন ইনিশিয়েটিভের সদস্য হলেন ডা. নিজাম

গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন ইনিশিয়েটিভের সদস্য হলেন ডা. নিজাম

আর্জেন্টিনার ম্যাচ কখন, দেখবেন কোথায়

আর্জেন্টিনার ম্যাচ কখন, দেখবেন কোথায়

হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পরীক্ষা স্থগিত

হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পরীক্ষা স্থগিত

আইসিসির মাসসেরা হওয়ার পর যা বললেন মুশফিক

আইসিসির মাসসেরা হওয়ার পর যা বললেন মুশফিক

বিমানবন্দর ও দূতাবাসের নিরাপত্তা নিয়ে বিদেশিদের উদ্বেগের জবাব দিলো তালেবান

বিমানবন্দর ও দূতাবাসের নিরাপত্তা নিয়ে বিদেশিদের উদ্বেগের জবাব দিলো তালেবান

ফ্রি বার্গার না পেয়ে পাকিস্তান পুলিশের লঙ্কাকাণ্ড

ফ্রি বার্গার না পেয়ে পাকিস্তান পুলিশের লঙ্কাকাণ্ড

খুলনা বিভাগে শনাক্ত ৪০ হাজার ছাড়ালো, মৃত্যু ৭২৬

খুলনা বিভাগে শনাক্ত ৪০ হাজার ছাড়ালো, মৃত্যু ৭২৬

সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ

© 2021 Bangla Tribune