চলতি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে শেষ ষোলোর ম্যাচে আর্জেন্টিনার কাছে ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে মিসর। তবে এই নাটকীয় হারের পর মাঠের ফুটবল ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে রেফারিং ও ভিএআর বিতর্ক। মিসরের কোচ হোসাম হাসান সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন, বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সুবিধা দিতে এবং লিওনেল মেসিকে টুর্নামেন্টে টিকিয়ে রাখতে ম্যাচটিতে কারচুপি করা হয়েছে। তার এই বিস্ফোরক মন্তব্য ফুটবল বিশ্বে তীব্র আলোড়ন তৈরি করেছে, যা নিয়ে থিয়েরি অঁরি, রয় কিন ও জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের মতো কিংবদন্তিরাও দ্বিমুখী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
আটলান্টায় অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে দুই গোলের লিড নিয়েও শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় হেরে যায় মিসর। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ উগরে দিয়ে হোসাম হাসান বলেন, আমি এটিকে সান্ত্বনাদায়ক শব্দ দিয়ে আড়াল করতে চাই না যে আমাদের ভাগ্য খারাপ ছিল। আজ আমাদের সঙ্গে অন্যায়ভাবে প্রতারণা করা হয়েছে, আমরা অবিচারের শিকার হয়েছি।
ফলাফল যাই হোক না কেন নিজের মনের কথা বলবেন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এটি স্পষ্টতই একটি পাতানো ম্যাচ ছিল এবং পুরো বিশ্ব তা দেখেছে। আমি আরও একটি কথা বলতে চাই, তারা যদি এতটাই চায় যে আর্জেন্টিনা জিতুক, তবে সবাইকে ডেকে এনে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার দরকার কী ছিল?
পরবর্তীতে বিইন স্পোর্টস-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাসান অভিযোগ করেন, রেফারিরা লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনাকে টুর্নামেন্টে টিকিয়ে রাখার চাপে ছিলেন। তিনি বলেন, হয়তো তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের প্রতিযোগিতায় রাখতে চেয়েছিল। হয়তো তারা চেয়েছিল মেসি লড়াইয়ে থাকুক। ফুটবলে কখনও কখনও এমন কিছু বাহ্যিক উপাদান থাকে যা টেকনিক্যাল দিককেও ছাড়িয়ে যায়। বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা প্রতিটি স্তরেই সমর্থন পেয়েছে।
শুধু রেফারিং নয়, ফিফার ম্যাচ শিডিউল নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মিসরীয় কোচ। শেষ বত্রিশের ম্যাচ জেতার মাত্র চার দিন পর দুপুর ১২টায় ম্যাচ রাখা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, যে এই ম্যাচের সময়সূচি নির্ধারণ করেছে, সে কখনও ফুটবল খেলেনি। কেউ দুপুর ১২টায় ম্যাচ দেয় না। দুপুরে মানুষ হাঁটতে যায় বা সকালের খাবার খেতে যায়, ফুটবল খেলতে নয়। খেলোয়াড়েরা তাহলে কখন খাবে? সকাল সাড়ে ৭টায়? মাঠ ও মাঠের বাইরে প্রশ্ন তোলার মতো অনেক কিছুই ঘটেছে।
নাটকীয় ম্যাচ ও মিসরের ক্ষোভ
মিসরের ফুটবল ইতিহাসে প্রথম নকআউট ম্যাচটিতে ইয়াসির ইব্রাহিম ও মোস্তফা জিকোর গোলে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল তারা। কিন্তু ৭৯ মিনিটে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো আর্জেন্টিনার পক্ষে প্রথম গোল শোধ করেন এবং চার মিনিট পর লিওনেল মেসি সমতা ফেরান। এরপর অতিরিক্ত সময়ে এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোলে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা।
তবে মিসরের দাবি, বেশ কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে তারা ম্যাচ থেকে ছিটকে গেছে। ম্যাচের একপর্যায়ে মোস্তফা জিকোর একটি দুর্দান্ত গোল ভিএআর-এর মাধ্যমে বাতিল করা হয়। বিল্ড-আপের সময় লিসান্দ্রো মার্তিনেসের ওপর মারওয়ান আতিয়ার ফাউল খুঁজে পায় ভিএআর। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, গোল হওয়ার আগের মুহূর্তে আক্রমণভাগের দল কোনও ফাউল করলে গোল বাতিল হতে পারে।
বিশ্লেষক অ্যালি ম্যাককোইস্ট অবশ্য স্বীকার করেছেন যে আতিয়া মার্তিনেসের জার্সি টেনেছিলেন এবং পায়ে পা দিয়েছিলেন। তবে সমালোচক ও মিসরীয় শিবিরের মতে, এই সংস্পর্শ খুবই মৃদু ছিল এবং তা গোলপোস্ট থেকে অনেক দূরে মাঠের অন্য প্রান্তে ঘটেছিল। ইংলিশ সাংবাদিক হেনরি উইন্টার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৌতুক করে লিখেছেন, ভিএআর যদি মিসরের ওই আক্রমণের আরও পেছনে যেত, তবে তুতেনখামেনকেও (মিসরীয় ফারাও) হয়তো এর সঙ্গে জড়িয়ে ফেলা হতো।
গোলটি বাতিল না হলে জিকোর ফিনিশিংটি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোল হতে পারত বলে মন্তব্য করেন উইন্টার।
বিবিসি সাংবাদিক ডেল জনসনও এই ভিএআর সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, মিসরের গোল বাতিল করার সিদ্ধান্তটি এই টুর্নামেন্টের সাধারণ রেফারিং স্ট্যান্ডার্ডের সম্পূর্ণ পরিপন্থি ছিল। সামান্য স্পর্শের জন্য যেখানে ফাউল দেওয়া হচ্ছে না, সেখানে সামান্য জার্সি টানার কারণে ভিএআর দিয়ে গোল বাতিল করা যায় না।
এছাড়া পেনাল্টি বক্সে মোহামেদ সালাহকে ফাউল করার পরও মিসরের পেনাল্টির আবেদন খতিয়ে দেখা হয়নি। ম্যাচের শেষ দিকে হামদি ফাথির জার্সি টেনে ধরেন আর্জেন্টিনার অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, যার পরপরই পাল্টা আক্রমণ থেকে এনজো ফার্নান্দেজ আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলটি করেন। এই ঘটনাটিও বিস্তারিত রিভিউ করা হয়নি, যা মিসরের ডাগআউটকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।
ম্যাচ শেষে আবেগপ্রবণ হয়ে ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকো বলেন, আমরা বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত খেলেছি। দ্বিতীয় হাফে কী হলো জানি না। এমন অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটলো যা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট ছিল। রেফারি পুরো একটি জাতির পরিশ্রমকে ডাকাতি করেছে। আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতার জন্য অভিনন্দন।
তিনি আরও বলেন, বিতর্ক ছাড়া আর্জেন্টিনা নিজেদের যোগ্যতায় জিতলে এটি মেনে নেওয়া সহজ হতো।
কিংবদন্তিদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
আর্সেনাল ও ফ্রান্সের সাবেক স্ট্রাইকার থিয়েরি অঁরি মিসরের হতাশা বুঝতে পারলেও ষড়যন্ত্রের অভিযোগকে সমর্থন করেননি। তিনি বলেন, আসুন শান্তভাবে বিষয়টি বুঝি। সবাই চিৎকার করছে, কিন্তু সবাই এক ঘটনা দেখছে না। আমি রিপ্লে বেশ কয়েকবার দেখেছি এবং মিসরের হতাশার কারণ বুঝতে পারছি। আবার আর্জেন্টিনাও কেন বিশ্বাস করে যে সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল, তাও বুঝছি। এই কারণেই বিতর্ক এত তীব্র।
অঁরির মতে মূল সমস্যা সিদ্ধান্ত ভুল বা সঠিক হওয়া নয়, বরং রেফারিংয়ের ধারাবাহিকতা। তিনি বলেন, মিসর যখন গোল করল, ভিএআর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তা রিভিউ করে বাতিল করলো। কিন্তু পরে মিসরের পেনাল্টির আবেদনের সময় সেই একই রকম পুঙ্খানুপুঙ্খ রিভিউ দেখা যায়নি, খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখানেই সমর্থকেরা প্রশ্ন তুলতে শুরু করে। ফুটবল বিশ্ব ভিএআর গ্রহণ করেছে ধারাবাহিকতার আশায়, নিখুঁত হওয়ার জন্য নয়। সমর্থকেরা শুধু চায় প্রতিটি দলের জন্য যেন একই নিয়ম প্রযোজ্য হয়।
তবে অঁরি দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য আর্জেন্টিনার মানসিকতা এবং বীরোচিত লড়াইয়ের জন্য মিসরের প্রশংসা করেন।
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক অধিনায়ক রয় কিন মিসর কোচের অভিযোগকে পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ম্যাচ হারার পর এমন অজুহাত সমর্থকেরা দিতে পারে, কোনও জাতীয় দলের কোচ নয়। আপনার দল যদি ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ২-০ ব্যবধানের লিড হাতছাড়া করে, তবে সবার আগে নিজের আয়নায় মুখ দেখা উচিত।
কিন আরও বলেন, মেসি জিতলেই মানুষ ফুটবলের কথা বাদ দিয়ে ষড়যন্ত্রের গল্প খোঁজে। এটি অলসতা। পরাজয় মেনে নিন, কোথায় ভুল হয়েছে বিশ্লেষণ করুন এবং দলের উন্নতি করুন। রেফারি বা মার্কেটিং স্কিমকে দোষ দিয়ে লাভ নেই যে আপনাদের দল ম্যাচটি ধরে রাখতে পারেনি। নেতাদের দায়িত্ব নিতে হয়, অজুহাত খুঁজতে হয় না।
সুইডেনের সাবেক তারকা জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচও মেসির জনপ্রিয়তার কারণে আর্জেন্টিনা সুবিধা পাচ্ছে, এমন দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, মেসি জিতলেই মানুষ ষড়যন্ত্রের কথা বলে। এটি একই পুরানো গল্প। পরাজয় মেনে নেওয়ার বদলে তারা অজুহাত খোঁজে। আপনি যদি ২-০ তে এগিয়ে থেকেও ম্যাচ না জিতেন, তবে মার্কেটিং, রেফারি বা টুর্নামেন্টকে দোষ দেবেন না। আগে নিজেদের দিকে তাকান। ফুটবল কোনও ভুল ক্ষমা করে না, বিশেষ করে বিশ্বকাপে।
ইব্রাহিমোভিচ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এমন অজুহাতের প্রতি আমার কোনও সম্মান নেই। একজন জাতীয় দলের কোচের উচিত দায়িত্ব নিয়ে উদাহরণ তৈরি করা, মাঠের পারফরম্যান্স থেকে মনোযোগ সরানোর জন্য গল্প তৈরি করা নয়। আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত লড়াই করে জিতেছে। হারলে সেটি মেনে নিন, শিক্ষা নিন এবং শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসুন।
ফিফা অবশ্য হোসাম হাসানের এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও মন্তব্য করেনি। কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার পরবর্তী প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড। তবে আটলান্টার এই ম্যাচের রেফারিং বিতর্ক যে সহজে থামছে না, তা নিশ্চিত।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে









