সৌদিতে আগুনে একসঙ্গে স্বজনহারা ১২ পরিবার, নওগাঁয় ঘরে ঘরে কান্না

আব্দুর রউফ পাভেল, নওগাঁ প্রতিনিধি
১১ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩৭ আপডেট : ১১ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩৭

চার বছর আগে ভাগ্য বদলের আশায় সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন ফরিদ শেখ। বিদেশ যাওয়ার খরচ জোগাতে বাড়ির এক শতাংশ জমি বিক্রি করতে হয়েছিল পরিবারকে। বড় বোনেরাও ঋণ করেছিলেন। স্বপ্ন ছিল, প্রবাসের আয় দিয়ে ঋণ শোধ করবেন, সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরবে, দুই সন্তানকে ভালোভাবে বড় করবেন।

সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। রিয়াদের শিফা থানাধীন মুসা সানাইয়া শিল্প এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ আগুনে প্রাণ হারিয়েছেন ফরিদ। শুধু ফরিদ নন, ওই অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১৬ জনের মধ্যে ১২ জনই নওগাঁর বাসিন্দা। তাদের মধ্যে ১১ জনের বাড়ি আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে।

ফরিদের মৃত্যুর খবর আসার পর থেকেই উদনপৈ গ্রামের বাড়িতে চলছে কান্না। স্ত্রী সুখি বেগমের সামনে এখন একদিকে স্বামী হারানোর শোক, অন্যদিকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ঋণ। দুই সন্তানকে নিয়ে কীভাবে সংসার চালাবেন, কীভাবে সেই ঋণ শোধ করবেন—কোনো উত্তরই খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি।

ফরিদ ছিলেন পরিবারের একমাত্র ছেলে। চার বোনের পর তিনিই ছিলেন পরিবারের ভরসা। তার সংসারে রয়েছেন দুই মা, স্ত্রী এবং এক ছেলে ও এক মেয়ে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় প্রায় চার বছর আগে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল তাকে।

এখন সেই পরিবারের সামনে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।

ফরিদের মতোই একই পরিস্থিতি অন্য নিহতদের পরিবারেও। জীবিকার সন্ধানে সৌদি আরবে গিয়ে বছরের পর বছর পরিশ্রম করেছেন তারা। কেউ চার বছর, কেউ ছয় বা আট বছর ধরে সেখানে ছিলেন। কেউ আবার মাত্র কয়েক মাস আগে গিয়েছিলেন।

আত্রাইয়ের বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। পরিবারের সদস্যরা একদিকে প্রিয়জন হারানোর শোক সামলাতে পারছেন না, অন্যদিকে পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। পাশাপাশি এসব পরিবারকে সরকারি আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। যেসব পরিবার ঋণ করে স্বজনদের বিদেশে পাঠিয়েছিল, তাদের ঋণ মওকুফ বা পরিশোধে বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থার দাবিও জানিয়েছেন তারা।

আত্রাই উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। সোমবার বিকেলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের তালিকাও প্রকাশ করা হয়।

নিহতদের মধ্যে রয়েছেন কালিকাপুর ইউনিয়নের গন্ডগোহালী গ্রামের গুফফার প্রামাণিকের দুই ছেলে মো. মোহন আলী ও মো. সুমন। মোহন আট বছর এবং সুমন চার বছর ধরে সৌদি আরবে ছিলেন। একই গ্রামের সাইদুর প্রামাণিকের ছেলে মো. রুবেল প্রামাণিক প্রায় সাত বছর ধরে সৌদিতে ছিলেন। মৃত বজলুর রহমানের ছেলে কলিমউদ্দিনও প্রায় আট বছর ধরে সেখানে ছিলেন।

বিশা ইউনিয়নের ডুবাই গ্রামের বাদল তরফদারের ছেলে মো. সোহেল রানা ওরফে সুমন এবং একই গ্রামের চঞ্চলের ছেলে মো. হাসিবুল হাসানও নিহত হয়েছেন। দুজনই প্রায় আট বছর ধরে সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন।

সাধনগর গ্রামের আজাহার আলীর ছেলে মো. সাগর আলী মাত্র ছয় মাস আগে সৌদি আরবে যান। মাধবপুর গ্রামের মজনু আলীর ছেলে মো. মজিদুল সরদার সজীব প্রায় দুই বছর ধরে সেখানে ছিলেন।

পাঁচুপুর ইউনিয়নের পারকাসুন্দা গ্রামের তমেজ উদ্দিন সরদারের ছেলে মো. জলিল সরদার এবং মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের আক্কাস প্রামাণিকের ছেলে মিনহাজ প্রামাণিকও অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন। দুজনই প্রায় আট বছর ধরে সৌদি আরবে ছিলেন।

অপরদিকে, নওগাঁ সদর উপজেলার পার-নওগাঁ এলাকার মৃত মজনুর ছেলে শাহীনও নিহত হয়েছেন। জীবিকার সন্ধানে মাত্র পাঁচ মাস আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি।

নিহতদের স্বজনরা জানান, তাদের অনেকেই পরিবারের আর্থিক সংকট কাটাতে বিদেশে গিয়েছিলেন। কেউ জমি বিক্রি করেছেন, কেউ ঋণ করেছেন। পরিবারের উপার্জনের বড় অংশই আসত প্রবাসে থাকা স্বজনদের কাছ থেকে। এখন তাদের মৃত্যুতে পরিবারগুলো আর্থিকভাবেও বড় সংকটে পড়েছে।

আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান নিহতদের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের সমবেদনা জানিয়েছেন এবং পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নিয়েছেন।

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, নিহত ১২ প্রবাসীর পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। মরদেহগুলো দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের জন্য ঢাকায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারের জন্য কোনো সহায়তা এলে তা যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়া হবে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

প্রিয়জন হারানোর শোকের সঙ্গে এখন নতুন করে যোগ হয়েছে বেঁচে থাকার লড়াই। স্বজনদের দাবি, এই কঠিন সময়ে শুধু মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনাই নয়, পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে তাদের ভবিষ্যৎও নিশ্চিত করতে হবে।

নওগাঁর এসব পরিবার এখন অপেক্ষায়—কখন ফিরবে তাদের প্রিয়জনের মরদেহ, আর কখন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসবে এই অসহায় পরিবারগুলোর জন্য সহায়তার হাত।

/এম/
সম্পর্কিত
ঢাকা থেকে বাতিল ১০৭ ফ্লাইট, আটকা সাড়ে ১৬ হাজারের বেশি যাত্রী
ডিজিটাল রূপান্তরে দ্রুত অগ্রগতি সৌদি আরবের
ড্রাইভিং প্রশিক্ষণে জোর, ৩ মাস পর অগ্রগতি দেখতে চান মন্ত্রী
সর্বশেষ খবর
মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার দুই প্রতিপক্ষের নাম ঘোষণা
মেসি-পরবর্তী আর্জেন্টিনার দুই প্রতিপক্ষের নাম ঘোষণা
‘মব’ তকমায় আড়াল হচ্ছে পরিকল্পিত অপরাধ?
৯ মাসে ১৭১ মৃত্যু ‘মব’ তকমায় আড়াল হচ্ছে পরিকল্পিত অপরাধ?
মিষ্টির শূন্য আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিলেন ৬৭ জন
মিষ্টির শূন্য আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিলেন ৬৭ জন
সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও আনন্দ-উৎসবে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও আনন্দ-উৎসবে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
সর্বাধিক পঠিত
মৃত্যুর ৪ দিন পর দাফন, নাসিমা খানের জানাজায় ছিলেন না বড় কোনও তারকা
মৃত্যুর ৪ দিন পর দাফন, নাসিমা খানের জানাজায় ছিলেন না বড় কোনও তারকা
ডিসির নির্দেশে রাতারাতি বদলে গেলো দেশলাই কাঠির প্রতিমা
ডিসির নির্দেশে রাতারাতি বদলে গেলো দেশলাই কাঠির প্রতিমা
প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে সচিবালয়ে রাতে থাকছেন আমিনুল হক
প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে সচিবালয়ে রাতে থাকছেন আমিনুল হক
সরকারি মাঠ দখলের অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে, বললেন ‘এখন আমাদের সময়’
সরকারি মাঠ দখলের অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে, বললেন ‘এখন আমাদের সময়’
বিএসএফের ধরে নিয়ে যাওয়া ২ পুলিশ সদস্য কেমন আছেন, জানালেন বিজিবি পরিচালক 
বিএসএফের ধরে নিয়ে যাওয়া ২ পুলিশ সদস্য কেমন আছেন, জানালেন বিজিবি পরিচালক