কী, কেন, কীভাবে

হাম ঠেকাতে লড়ছে বাংলাদেশ, কেন বিশ্বকে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক 
১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৩৪ আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৩৪

বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশ। দুর্বল তথ্যব্যবস্থা, পর্যাপ্ত প্রচারের অভাব এবং টিকাদানে ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ২ লাখ ২ হাজার সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ২২ হাজার রোগীর হাম নিশ্চিত হয়েছে। চলতি বছরে বিশ্বের অন্য যেকোনও দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা বেশি। 

ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, অত্যন্ত ছোঁয়াচে এই রোগে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে ৯৪ শতাংশ মৃত শিশুরাই পাঁচ বছরের কম বয়সী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের হার কমে গেলে প্রাণঘাতী এই রোগের প্রাদুর্ভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি তার সতর্কবার্তা।। 

ডব্লিউএইচওর মতে, প্রাদুর্ভাব রোধ করতে টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশের ওপরে থাকা প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে রুটিন টিকাদান কর্মসূচি ২০২৫ সালে হোঁচট খাওয়ার ফলে কভারেজ সেই নির্ধারিত স্তরের নিচে নেমে যায়। সংস্থাটির নথি পর্যালোচনা এবং এক ডজনেরও বেশি বিজ্ঞানী, স্বাস্থ্যকর্মী ও কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জরুরি পরিস্থিতিতে সঠিক তথ্যের অভাব লক্ষাধিক শিশুকে টিকাদানের বাইরে রেখেছিল। এছাড়া প্রস্তুতিতে ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত তথ্য বাবা-মার কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ায় জরুরি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়।

নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল পাবলিক হেলথের অধ্যাপক ও ডব্লিউএইচওর ভ্যাকসিন বিষয়ক উপদেষ্টা মার্ক জিট বলেছেন, ‘এটি প্রতিটি দেশের জন্য একটি বাস্তব সতর্কতা’। তিনি উল্লেখ করেন, জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়ার চেয়ে টিকাদানের মাধ্যমে প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধ করা অনেক সহজ, সস্তা ও নিরাপদ।

‘আমার ছেলেকে দাফন করার পরই স্বাস্থ্যকর্মীরা এসেছে’

১৭ কোটি ৮০ লাখ জনসংখ্যার দেশের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট অঞ্চলে গত জুলাই মাসে টিকা না পাওয়া দুই বছরের শিশু আরমান হোসেন হাসপাতালে ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মারা যায়। তার চিকিৎসা খরচ মেটাতে পরিবারটি তাদের একমাত্র সম্বল অটোরিকশা বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিল। তবে তার টিকা না পাওয়া চার বছরের বোন বেঁচে গেছে।

শিশুটির বাবা আমিন মিয়া জানান, সিলেটে তাদের গ্রামে সময়মতো টিকা দিতে কোনও স্বাস্থ্যকর্মী আসেননি। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে দাফন করার পরই কেবল তারা এসেছে’।

বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে মা রাজিয়া বেগমের কাঁধে ঘুমাচ্ছে হাম থেকে বেঁচে ফেরা দুই বছর বয়সী আল রাইয়ান তোহা। ছবি: রয়টার্স, মোহাম্মদ পোনের হোসেন

ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, হাম সাধারণত প্রতি ১ হাজার আক্রান্তে দুই থেকে তিন জনের প্রাণ কেড়ে নেয়। তবে পুষ্টিহীনতার মতো নানা কারণের ফলে দরিদ্র দেশগুলোতে এই রোগ আরও মারাত্মক রূপ নেয়।

সিলেটের ছাতক শহরের ৩০ বছর বয়সী কাঠমিস্ত্রি হুমায়ুন রশিদের নয় মাস বয়সী মেয়ে লাবিবা আকতারও গত জুনে টিকা ছাড়াই মারা যায়। এপ্রিলে জরুরি টিকাদান কর্মসূচিতে টিকাদানের বয়স ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাস করা হলে সেও এই টিকা পেতে পারতো। তার বাবা আক্ষেপ করে বলেন, ‘কোনও স্বাস্থ্যকর্মী আমাদের তা জানাতে আসেনি’।

গত মে মাসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন দাবি করেছিলেন, জরুরি অভিযানের কারণে হটস্পটগুলোতে হামের সংক্রমণ ‘প্রায় শূন্যের কোঠায়’ নেমে এসেছে এবং প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অথচ গত সেপ্টেম্বরে উচ্চ জ্বর, কাশি ও সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি সৃষ্টিকারী হামের দৈনিক গড়ে ১ হাজার ১৯৮ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়, যা মে মাসের পর সর্বোচ্চ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে টিকা নিয়ে দ্বিধার চেয়ে টিকা পাওয়ার সুযোগ এবং সচেতনতার অভাব বড় বাধা। অন্যদিকে ধনী দেশগুলোতে টিকা নিয়ে অনীহা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের মতো ব্যক্তিদের সংশয়বাদী অবস্থানও এ প্রবণতাকে প্রভাবিত করছে।

একসময় টিকাদানে সফল দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল বাংলাদেশ। ডব্লিউএইচও ও জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের হিসেবে, ২০২৪ সালে দেশে হামের টিকার প্রথম ডোজ গ্রহণের হার ছিল ৯৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ৯৩ শতাংশ। প্রথম ডোজ নেওয়ার পর অল্পসংখ্যক শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি না হওয়ায় দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়।

চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে হামের টিকার প্রথম ডোজ নেওয়ার হার কমে ৯০ শতাংশে এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ৮৬ শতাংশে নেমেছে। প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ৯৫ শতাংশ টিকাদানের হারের চেয়ে এ দুটি হারই বেশ কম।

জরুরি কর্মসূচির বাইরে রয়ে গেছে লক্ষাধিক শিশু

হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর বাংলাদেশ দ্রুত পদক্ষেপ নেয় এবং এপ্রিলে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার মাধ্যমে শুরুতে সংক্রমণ কিছুটা কমে আসে। সরকার দাবি করেছিল, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে।

ডব্লিউএইচও এবং সরকারের মধ্যকার এপ্রিল ও আগস্ট মাসের নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাড়াহুড়োয় প্রস্তুতির ক্ষেত্রে নানা ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। সময় স্বল্পতার কারণে সাধারণত চার ধাপের পরিবর্তে মাত্র এক ধাপ প্রস্তুতি যাচাই করেই জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়েছিল। হামে আক্রান্ত হয়ে পরীক্ষাগারে রোগ নিশ্চিত হওয়া শিশুদের মধ্যে টিকা না নেওয়ার হার কর্মসূচির আগে ৮২ শতাংশ এবং পরে ৮৫ শতাংশ ছিল। অর্থাৎ, কর্মসূচির পরও টিকাদানের ঘাটতি কার্যত দূর হয়নি। 

হাম ও রুবেলা নির্মূলে বাংলাদেশের ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটির সভাপতি এবং মহামারি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, যখন যথাযথভাবে প্রস্তুতি যাচাই করা হয় না, তখন প্রায়শই সবচেয়ে দরিদ্র ও দুর্গম অঞ্চলের শিশুরা টিকাদানের বাইরে থেকে যায় এবং এর চড়া মূল্য দিতে হয়।

ডব্লিউএইচওর বাংলাদেশ প্রতিনিধি ডা. রাজেশ নারওয়াল জানিয়েছেন, ঝুঁকিতে থাকা প্রতিটি শিশুকে টিকাদানের লক্ষ্য অর্জনে তারা সরকারকে সহযোগিতা করতে বদ্ধপরিকর।

বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের একটি হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) পাঁচ মাস বয়সী ছেলে এসার হামের চিকিৎসা চলার সময় পাশে অপেক্ষায় মা-বাবা। ছবি: রয়টার্স, মোহাম্মদ পোনের হোসেন

সিলেটে সরকারি হিসাবে ১৮০ শিশুর মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। রয়টার্সের সাক্ষাৎকারে নেওয়া ১৬টি পরিবারের ৮টি পরিবারই জানায়, তারা কোনও স্বাস্থ্যকর্মীকে টিকা দিতে দেখেননি। অন্তত ছয়টি পরিবার জানিয়েছে, তাদের কমিউনিটিতে হামে শিশুর মৃত্যুর পরেই কেবল স্বাস্থ্যকর্মীরা সেখানে গেছেন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সেপ্টেম্বর মাসের শেষে সরকার বাদ পড়া ৩৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে নতুন একটি কর্মসূচি শুরু করেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, কোনও শিশুই যেন বাদ না পড়ে সেজন্য গ্রাম পর্যায়ে লোকজনকে সম্পৃক্ত করা হবে।

তবে প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছানো এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, প্রায় ৪০ শতাংশ শিশুর জন্ম নিবন্ধন করা হয় না, আর সরকারি ডেটা অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রায় এক তৃতীয়াংশ পদ খালি রয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পাঁচ বছরের বেশি বয়সীদেরও টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়ে আসছেন। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, এই বয়সের শিশুরা মোট হাম আক্রান্তের এক তৃতীয়াংশের প্রতিনিধিত্ব করে। পাশাপাশি, ছয় মাস বা তার কম বয়সী শিশুদের শরীরে কেন প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি কমে যাচ্ছে, তা নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছেন দেশের বিজ্ঞানীরা।

ডব্লিউএইচও সতর্ক করে বলেছে, ডেঙ্গু মহামারির সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি হামের রোগীদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও সমানভাবে জরুরি। 

সূত্র: রয়টার্স

/এএস/ 
সম্পর্কিত
ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভে বলপ্রয়োগের অভিযোগ, ভারত সফরে রুবিওকে হস্তক্ষেপের আহ্বান
কার্যকরের আগেই রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক স্থগিত করলেন ট্রাম্প
হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১০৩৫
সর্বশেষ খবর
নিম্নআয়ের দেশগুলোর জন্য আইএমএফের বার্তা কী
নিম্নআয়ের দেশগুলোর জন্য আইএমএফের বার্তা কী
রাজধানীর নিউমার্কেটে এলাকায় ফুটপাতে উচ্ছেদ অভিযান
রাজধানীর নিউমার্কেটে এলাকায় ফুটপাতে উচ্ছেদ অভিযান
হার্ট অ্যাটাক ও কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট কি এক?
হার্ট অ্যাটাক ও কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট কি এক?
ছয় বছরের শিশুকে যৌন হয়রানি, পলাতক আসামির ১০ বছরের কারাদণ্ড
ছয় বছরের শিশুকে যৌন হয়রানি, পলাতক আসামির ১০ বছরের কারাদণ্ড
সর্বাধিক পঠিত
অপুর সঙ্গে দ্বিতীয় ইনিংস, কে এই আদনান
অপুর সঙ্গে দ্বিতীয় ইনিংস, কে এই আদনান
শনিবার জবিতে আবারও গরুভোজের আয়োজন, থাকছে কাওয়ালি সন্ধ্যা
শনিবার জবিতে আবারও গরুভোজের আয়োজন, থাকছে কাওয়ালি সন্ধ্যা
সরকারি মাঠ দখলের অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে, বললেন ‘এখন আমাদের সময়’
সরকারি মাঠ দখলের অভিযোগ জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে, বললেন ‘এখন আমাদের সময়’
আমাদের দলের প্রার্থী পাস না করলে সেই ইউনিয়নে কোনও কাজ হবে না: চিফ হুইপ
আমাদের দলের প্রার্থী পাস না করলে সেই ইউনিয়নে কোনও কাজ হবে না: চিফ হুইপ
এক জেলাতেই ৭১০ কোটি টাকার সুপারি, চাষে লাভবান কৃষক
এক জেলাতেই ৭১০ কোটি টাকার সুপারি, চাষে লাভবান কৃষক