যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে দেশটির সঙ্গে চলমান আলোচনা দীর্ঘায়িত করছে ইরান। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে তেহরান এ কৌশল নিয়েছে বলে জানিয়েছেন ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন করে সামরিক হামলার আশঙ্কা এবং ওয়াশিংটনের প্রতি গভীর অবিশ্বাসের কারণে দ্রুত যুদ্ধ অবসানের চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী নয় ইরান। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
ট্রাম্পকে রাজনৈতিক সুবিধা দিতে চায় না তেহরান
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা ও দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অবগত একজন ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, অচলাবস্থা কাটাতে ট্রাম্প আবারও সামরিক হামলার পথ বেছে নিতে পারেন বলে মনে করছে তেহরান। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানোর পরিবর্তে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে ইরান।
একজন ইরানি কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার চুক্তির প্রস্তুতি নয়, বরং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্ব ট্রাম্পকে রাজনৈতিক বিজয়ের সুযোগ দিতে চায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তেহরানের বিশ্লেষক সাঈদ লেইলাজের মতে, আলোচনা দীর্ঘায়িত করার মাধ্যমে কোনো বেআইনি পদক্ষেপ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে প্রভাব রাখছে ইরান।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে জটিলতা
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে। গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এতে তেলের সরবরাহ ও জ্বালানির দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, নির্বাচনের পর তেলের দাম কমবে বলে তিনি আশা করছেন। তবে যুদ্ধ বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়ে তিনি এখনো বিস্তারিত পরিকল্পনা দেননি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের তেল রপ্তানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবু ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে—এমন কোনো ছাড় দিতে রাজি নয় তেহরান। ইরানি কর্মকর্তাদের ধারণা, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির সম্ভাবনা কম।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মতবিরোধ
যুক্তরাষ্ট্র চায়, আলোচনার শুরুতেই ইরানের দীর্ঘদিনের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হোক। ওয়াশিংটন ও পশ্চিমা দেশগুলো এ কর্মসূচির সম্ভাব্য সামরিক দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তবে ইরানের দাবি, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, পারমাণবিক আলোচনা শুরুর আগে নিজেদের সাত দিনের পরিকল্পনার শর্ত পূরণের দাবি জানিয়েছে তেহরান। কাতারের মধ্যস্থতায় দেওয়া ইরানের প্রস্তাবে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের তেল রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ শিথিল, জব্দ করা সম্পদ ছাড় এবং সব ফ্রন্টে শত্রুতা বন্ধের শর্ত দেওয়া হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি এখনো বহাল রয়েছে এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান চলছে।
ওয়াশিংটনের ওপর আস্থা নেই ইরানের
আগের কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো সামরিক হামলার কারণে ভেস্তে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারিয়েছে তেহরান। ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেশটির নেতৃত্ব মনে করে, আলোচনার মধ্যেও নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরানবিষয়ক কর্মসূচির পরিচালক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেছেন, ইরানের নেতৃত্ব মনে করে ট্রাম্প দেশটির সরকারব্যবস্থার পরিবর্তন চান এবং এ ক্ষেত্রে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নীতির সঙ্গে তাঁর অবস্থানের মিল রয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সোমবার ইসরায়েল সফরে নেতানিয়াহুর সঙ্গে ইরান নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে জানিয়েছেন তিন ইসরায়েলি কর্মকর্তা।
অর্থনৈতিক সংকটে চাপে ইরান
আলোচনা দীর্ঘায়িত করার কৌশল ইরানের জন্যও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তায় দেশটির দুর্বল অর্থনীতি আরও চাপে পড়ছে এবং জনসাধারণের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে দেশটির বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৭৩ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এ ছাড়া জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ পুনর্বহালের পর ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের দর প্রায় ৩৫ শতাংশ কমেছে।
জ্বালানি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভরটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ইরানের সমুদ্রপথে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি শূন্যে নেমে আসে। অক্টোবরের ৫ তারিখ পর্যন্ত তা শূন্যই ছিল।
বিশ্লেষক সাঈদ লেইলাজের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাসের কারণে ট্রাম্প প্রশাসনের পরেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর ভাষ্য, যুদ্ধের আগের পরিস্থিতিতে আর ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না।
সূত্র: রয়টার্স