ভারতের রাজস্থান রাজ্যের কিশানগড়ে মার্বেল বর্জ্যের বিশাল স্তূপ। দূর থেকে দেখলে মনে হবে বরফে ঢাকা পাহাড়, যেন এক টুকরো কাশ্মির। প্রতিদিন শত শত পর্যটক ভিড় করছেন সেখানে। নবদম্পতিরা ছবি তুলছেন, হবু দম্পতিরা করছেন প্রাক-বিয়ের ফটোশুট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট নির্মাতাদেরও নিয়মিত দেখা মিলছে সেখানে। তবে পর্যটকদের কাছে এই মনোরম দৃশ্যের আড়ালে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য অপেক্ষা করছে ভয়াবহ স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত বিপর্যয়।
রাজস্থানের আজমির জেলার কিশানগড়ে অবস্থিত ৩০০ একর বা ১২১ হেক্টর আয়তনের এই বর্জ্যভূমি এশিয়ার সবচেয়ে বড় মার্বেল বর্জ্য ফেলার স্থান। স্থানীয়ভাবে এটি ‘স্নো ইয়ার্ড’ নামে পরিচিত। সাদা বর্জ্যের পাহাড় আর পানিতে ভরা কৃত্রিম জলাশয় মিলে তৈরি হয়েছে অদ্ভুত এক দৃশ্যপট। এখানে প্রবেশের জন্য পর্যটকদের কোনও ফি দিতে হয় না।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বর্জ্যভূমি থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরে ভোগিয়াওয়াস গ্রাম। সেখানে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের বসবাস। পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় এই স্থানটির আশপাশের বাসিন্দারা ভুগছেন শ্বাসকষ্ট, বুকে সংক্রমণ, দাঁতের সমস্যা ও ত্বকের নানা রোগে।
৫৩ বছর বয়সী কৃষক বাঘারাম গুর্জার নিজের ভুট্টাখেতে আগাছা পরিষ্কারের সময় পাশেই স্ত্রী ক্রনিকের কাশির শব্দ শুনে অস্থির হয়ে ওঠেন। ধুলো জমে জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়া নিয়ে আক্ষেপ করতেই স্ত্রীর জবাব, ‘ঈশ্বর সব ঠিক করে দিন, নইলে ফসল ফলানো কঠিন হয়ে যাবে’।
গুর্জার জানান, বর্জ্যভূমির কারণে অন্তত ছয়টি গ্রামের বাসিন্দারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তার ভাষায়, ‘কত সমস্যার কথা আর বলব? সমস্যা যদি এক-দুটি হতো, তাহলে মোকাবিলা করা যেত। কিন্তু এই বর্জ্যভূমির কারণে প্রায় সবকিছুই খারাপের দিকে যাচ্ছে। আমার মতো মানুষ বুকে সংক্রমণ, দাঁতের সমস্যা ও ত্বকের অ্যালার্জিতে ভুগছেন। শিশু হোক কিংবা বৃদ্ধ- সবাই আক্রান্ত হচ্ছেন।’তিনি আরও জানান, বুকে সংক্রমণ ও ত্বকের সমস্যার কারণে তাকে এবং তার স্ত্রীকে নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়।
কিশানগড়ের মার্বেল ও গ্রানাইটশিল্পের অন্যতম কেন্দ্র। ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান গ্রানাইট অ্যান্ড স্টোন ইন্ডাস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ১ হাজার ২০০টি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় প্রতিদিনের মোট ব্যবসার পরিমাণ ১৬ কোটি রুপির বেশি। এ শিল্পে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের। প্রতিদিন এসব কারখানা থেকে প্রায় এক হাজার ট্যাংকারে করে বর্জ্যবাহী তরল পদার্থ সরকারি নির্ধারিত স্থানে নেওয়া হয়। সেখানে প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার ৫০০ টন বর্জ্য ফেলা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য এই বর্জ্যভূমিই এখন স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজমিরের গঙ্গা নারায়ণ হাসপাতালের চিকিৎসক অদিতি গোয়েল জানান, কারখানা থেকে আসা বিষাক্ত ধুলোর কারণে গত কয়েক বছরে ওই এলাকায় শ্বাসকষ্ট ও ত্বকের সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
রাজস্থান কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক লক্ষ্মীকান্ত শর্মার এক গবেষণায় দেখা গেছে, কিশানগড়ের মাটিতে সীসা সিলিকেটের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ বেশি, যা চরম দূষণের ইঙ্গিত দেয়। বর্জ্যের কণাগুলো ৭৫ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট হওয়ায় বাতাস ও মাটিতে সহজে ছড়িয়ে পড়ে জমিকে অনূর্বর করে ফেলছে এবং বায়ুমণ্ডলে পিএম২.৫-এর পরিমাণ নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
৬৫ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা উগম সিং জানান, ক্রমাগত বর্জ্য ফেলার ফলে ভূগর্ভস্থ পানির মানও খারাপ হয়ে গেছে। পানিতে ফ্লোরাইডের মাত্রা এত বেশি যে তা নোনতা লাগে, যার ফলে তার দাঁত ক্ষয় হয়ে গেছে এবং হাড় দুর্বল হয়ে পড়েছে।
দূষণ প্রতিরোধে রাজস্থান রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের (আরএসপিসিবি) কাছে বারবার অভিযোগ করেও কোনও প্রতিকার পাননি গ্রামবাসীরা। উগম সিং বলেন, ‘কোন সরকার ক্ষমতায় আছে তাতে কিছু যায় আসে না। গরিবের কথা কেউ শোনে না। ধনীদের আরও ধনী করতেই সরকার আমাদের জীবন বলি দিচ্ছে’।
গত বছর পরিবেশবিদ দ্রুপদ মালিক ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করলে আদালত অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ফেলার বিষয়ে আরএসপিসিবি-কে নিয়মিত নজরদারি ও জরিমানার নির্দেশ দেয়। যদিও এ বিষয়ে আরএসপিসিবি-র স্থানীয় কর্মকর্তা আল জাজিরার কাছে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অধ্যাপক লক্ষ্মীকান্ত শর্মা জানান, এই এলাকাটি মানুষের বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তিনি স্থানটি লোকালয় থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া এবং বর্জ্য টাইলস তৈরিতে ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
এদিকে টোকরা গ্রামের বাসিন্দা রাম লাল জানান, দীর্ঘদিনের বায়ুদূষণে ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র মানুষদের জন্য সরকারের অবিলম্বে বিনামূল্যে চিকিৎসা শিবিরের আয়োজন করা উচিত এবং ডাম্পিং ইয়ার্ডটি দ্রুত অন্যত্র স্থানান্তর করা প্রয়োজন।
সূত্র: আল জাজিরা
অনুর্বর জমিতে ৩০ দিনেই ফুটলো জাফরান, লাদাখে কৃষির নতুন সম্ভাবনা