একটা নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার ক্ষমতায় এসেছে। যদিও নির্বাচন নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠেছে— তবুও মানুষ ভোট দিতে পেরেছে এবং দীর্ঘদিন পরে সেই সুযোগ ঘটেছে। নিঃসন্দেহে এটা আশাব্যঞ্জক। আমি সরকারকে স্বাগত জানাই, দেরিতে হলেও অভিনন্দন জানাই এবং তাদের সফলতা কামনা করি।
তবে আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে যে, সরকার একটি অত্যন্ত জটিল সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের ফলে জ্বালানি খাতে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রভাব আমাদের অর্থনীতি, মুদ্রাস্ফীতি এবং নাগরিক জীবনের ওপর পড়বে। এই বাস্তবতা সরকারের জন্য একটি অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতি কেউ আগে থেকে আশা করেনি, ফলে প্রস্তুতিও ছিল না। এখন এই নতুন বাস্তবতা মাথায় রেখেই সরকারকে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
তবে এর বাইরেও সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে— যেগুলোর মাধ্যমে কিছু অগ্রগতি দেখা গেছে। কিন্তু একইসঙ্গে কিছু বিষয়ে তাদের অনীহাও স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে গণভোটে পাস হওয়া কিছু সংস্কার এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তারা যথেষ্ট গুরুত্ব দেখায়নি। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার ক্ষেত্রেও অনীহা দেখা গেছে। আরও উদ্বেগজনক হলো— অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ১৩০টি অধ্যাদেশের মধ্যে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ সরকার অনুমোদন করেনি। এর মধ্যে ছিল বন আইন, মানবাধিকার, সুপ্রিম কোর্টের স্বাধীন সচিবালয় এবং বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ।
এসব বিষয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছিল। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনি ইশতেহার এবং একুশ দফাতেও এসব প্রতিশ্রুতি ছিল। যদিও তারা বলেছে— ভবিষ্যতে আরও উন্নত আইন প্রণয়ন করা হবে। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের খুব আশাবাদী হতে দেয় না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে আমরা বহু দশক ধরে শুধু প্রতিশ্রুতিই শুনে আসছি, বাস্তবায়ন দেখিনি।
গণতন্ত্র শুধু সংসদ নির্বাচন নয়, গণতন্ত্র মানে সর্বস্তরে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক শাসন। ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশন—সব জায়গায় নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকা সাংবিধানিক আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সরকার নির্বাচন না করে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে দলীয় বা নির্বাচনে পরাজিত ব্যক্তিদের বসানো হয়েছে। এটি হতাশাজনক।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। শিক্ষার মানের অবনতির একটি বড় কারণ শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি। প্রধানমন্ত্রী নিজেও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু তারপরও দলীয় ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ক্রিকেট বোর্ড কিংবা বিভিন্ন কমিটিতে দলীয় নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাও মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করেছে। এগুলো পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই পুনরাবৃত্তি।
সরকারের প্রথম দিককার ভাষণে প্রধানমন্ত্রী একটি পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। কিন্তু তিন মাস পেরিয়ে গেলেও সেই পরিকল্পনার সুস্পষ্ট রূপরেখা আমরা দেখতে পাইনি। যদি পরিকল্পনা বলতে শুধু ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড বা নদী খননকে বোঝানো হয়, তাহলে সেটি নতুন কিছু নয়। আমাদের দেশে আগে থেকেই অসংখ্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি রয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এখন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। প্রতিবছর হাজার হাজার তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করছে। তাদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। একইসঙ্গে রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে— দল ক্ষমতায় এলে তাদের জীবন-জীবিকার সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের সম্পদ সীমিত। তাই অন্যায় সুবিধা দেওয়া কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং দরকার এমন অর্থনৈতিক পরিবেশ, যেখানে বেসরকারি খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে।
এই কারণে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করা অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ, বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে এখনও প্রবাসীদের প্রতি একধরনের নেতিবাচক মনোভাব কাজ করে। অথচ পূর্ব এশিয়ার উন্নয়নের পেছনে প্রবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
বেসরকারি খাতের বিকাশের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো আইনের শাসন, সুশাসন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক অধ্যাদেশ অনুমোদন না করার মাধ্যমে সরকার একটি নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে। সিঙ্গাপুরের উন্নয়নের পেছনে মূল শক্তি ছিল কঠোর আইনপ্রয়োগ, সুশাসন এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থা। আমাদেরও সেই শিক্ষা নেওয়া উচিত।
বর্তমানে আমাদের অর্থনীতি বহু চ্যালেঞ্জের মুখে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে, জ্বালানি সংকট রয়েছে, সরকারি আয় ঝুঁকির মধ্যে। এই পরিস্থিতিতে উচ্চাভিলাষী বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকেও সহায়তা পাওয়া অনিশ্চিত। কর আদায়ের ক্ষেত্রেও দুর্নীতি ও অদক্ষতা বড় বাধা। আর টাকা ছাপিয়ে সংকট মোকাবিলা করতে গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।
তাই এখন দরকার বাস্তববাদী বাজেট। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, শিক্ষার মানোন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা এবং তরুণদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি— এসবকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে হলে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতির বর্তমান ধারা বন্ধ করতে হবে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সসহ আধুনিক প্রযুক্তির দিকে আমাদের নজর বাড়াতে হবে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো ক্রনি ক্যাপিটালিজম। অতীতে আমরা এমন একদল অলিগার্ক তৈরি করেছি, যারা ব্যাংক লুট, দুর্নীতি, ওভার ইনভয়েসিং ও বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ক্ষমতা দখল করেছে। এখনও সেই প্রবণতার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে। সংসদ সদস্যদের স্থানীয় ক্ষমতার কেন্দ্র বানানো হলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা দুর্বল হবে এবং সংসদও অকার্যকর হয়ে পড়বে।
সংসদ সদস্যদের জন্য আচরণবিধি আইন প্রয়োজন— যেখানে তাদের সম্পদ, স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ক প্রকাশ বাধ্যতামূলক হবে। একইসঙ্গে সংবিধানে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার আইন এখনও প্রণয়ন করা হয়নি। এই আইন হলে দুর্নীতি বা অসদাচরণের জন্য সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হতো।
সংসদ সদস্যদের মূল কাজ হওয়া উচিত— আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ, বাজেট অনুমোদন এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। স্থানীয় উন্নয়নের কাজ নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের হাতে থাকা উচিত। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনও অত্যন্ত জরুরি।
আমরা এখন একটি জটিল সময় অতিক্রম করছি। সরকার যেন এসব বিষয়ে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। আমরা সমালোচনার জন্য সমালোচনা করছি না, বরং সরকারকে সঠিক পথে উৎসাহিত করতেই এসব কথা বলছি। সরকার যদি এগুলোকে সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে তা হবে রাষ্ট্র ও নাগরিক— উভয়ের জন্যই মঙ্গলজনক।
লেখক: স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ