উচ্ছেদ নয়, দরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

রাজধানীকে বাসযোগ্য করে তুলতে উচ্ছেদ অভিযান কোনও সমাধান নয়। অবিলম্বে উচ্ছেদ বন্ধ করে আগামী ৬ মাসের মধ্যে একটা সমীক্ষা করা দরকার। এরপরই কেবল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে রাজধানী ঢাকার সমস্যা ও সঙ্কটগুলো নিরসন সম্ভব।

বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজনে ‘নগর পরিকল্পনা: উচ্ছেদ অভিযান, এরপর কী’ বিষয়ক বৈঠকিতে উপস্থিত নগরপরিকল্পনাবিদ, উদ্যোক্তা, রেস্তোরাঁ মালিক, আইনজীবী ও সাংবাদিকরা এসব কথা বলেন। তারা মনে করছেন, অন্তত ৫বছর মেয়াদি একটা পরিকল্পনা করে সহযোগিতা ও সমন্বয়ের ভিত্তিতে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। তারপর যারা নিয়ম মানবেন না তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

রাজউকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার এমদাদুল ইসলাম

শনিবার বাংলা ট্রিবিউনের নিজস্ব কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকিতে রাজউকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার এমদাদুল ইসলাম বলেন, রাজধানী ঢাকা ৩০ লাখ জনসংখ্যা সামাল দিতে সক্ষম। কিন্তু জনসংখ্যা অস্বাভাবিক রকমের বেশি হওয়ায় নানান ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে।

অধ্যক্ষ জিনাত চৌধুরী

সাউথব্রিজ স্কুলের অধ্যক্ষ জিনাত চৌধুরী বলেন, স্কুলের জন্য বাড়ি ভাড়া পাওয়ার প্রধান অন্তরায় এলাকাভিত্তিক সোসাইটিগুলো। সব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান উঠে যাক যারা চান তাদের ছেলেমেয়েরাও আমাদের স্কুলেওই পড়তো। যাদের ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে দেশের বাইরে গেছে তারা এখন এলাকায় যানজট চান না। তিনি আরও বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে অনেক সময় লেগেছে। একদিনে উচ্ছেদ করে দেওয়া সহজ কিন্তু গড়ে তোলা অনেক কঠিন। এসব না উঠিয়ে দিয়ে নির্দিষ্ট এলাকার শিশুরা যেন ওই এলাকার স্কুলেই পড়তে পারে এবং হেঁটে স্কুলে যাতায়াত করতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে।

সঙ্গীতা আহমেদ

উইমেন চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি সঙ্গীতা আহমেদ বৈঠকিতে সামনের দিকে কোন পথে সমাধান মিলবে সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, পেছনে কী হয়েছে না বলে সামনে সঙ্কটগুলো চিহ্নিত করতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না বেকারত্বে সামাজিক কাঠামোয় ক্ষতি করবে। উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ নিয়েছেন, তাদের জন্য ব্যাংকগুলো সমস্যায় পড়বে। তিনি আরও বলেন, আমরাও ঢাকার নাগরিক। পরিকল্পনাগুলোকে স্বাগত জানাই। কিন্তু সবদিক বিবেচনায় নিয়ে আসলেই বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তুলতে চাইলে অন্তত ৫ বছরের পরিকল্পনা দরকার। সমাধান একটাই- সুপরিকল্পনা, যেটা মানুষের উপযোগী।

ব্যারিস্টার ও গুলশান সোসাইটির মহাসচিব ওমর সাদাত

ব্যারিস্টার ও গুলশান সোসাইটির মহাসচিব ওমর সাদাত বলেন, আমরা সবসময় বলে আসছি, স্কুল-কলেজগুলো নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। স্কুলের সময়ে আবাসিক এলাকা থেকে প্রধান সড়কে বের হতে ঘণ্টা পেরিয়ে যায়। বিদেশে আমরা দেখেছি স্কুল-কলেজে হয় শিক্ষার্থীরা হেঁটে আসে বা স্কুল বাসে আসে। তিনি আরও বলেন, আবাসিক এলাকাগুলো নিয়ে আসলেই নতুন করে ভাবতে হবে। আমাদের কোনও নগর পরিকল্পনা নেই। স্কুল ও রেস্তোরাঁর জন্য তেজগাঁও বাণিজ্যিক এলাকার ফাঁকা পড়ে থাকা জায়গাগুলো দেওয়া যেতে পারে। তিনি জানান, সম্প্রতি গুলশান সোসাইটি বেশকিছু নতুন বাস ও রিকশা চালিয়ে একটা ভিন্ন পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ কাজী এম আরিফ

সাদাতের কথার সূত্র ধরে নগরপরিকল্পনাবিদ কাজী এম আরিফ বলেন, গুলশানে নতুন করে বাস ও রিকশা নামানোর পরিকল্পনাটি পেশাজীবী কোনও পরিকল্পনাবিদের মাথা থেকে এসেছে বলে আমি মনে করি না। আমার মনে হয় এতে নতুন সঙ্কট হবে। তিনি বলেন, আমাদের কোনও সমীক্ষা নেই প্রতিদিন বাইরে থেকে কতজন মানুষ গুলশানে ঢোকে। তাদের কতটা বাস, রিকশা দরকার। আমাদের সমাধান করতে হলে প্রথমে সমস্যা নিরূপন করতে হবে, রিভিউ করতে হবে, সমীক্ষার মধ্য দিয়ে বাস্তবায়নের দিকে যেতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা করতে হবে।

সিনিয়র সাংবাদিক কাশেম হুমায়ুন

সাংবাদিক কাশেম হুমায়ুন বলেন, সরকার আজ নানা কারণে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু এটা কতটুকু যৌক্তিক সেটা বিবেচনায় নিতে হবে। বিনিযোগ, বেকারত্ব এগুলো বাড়বে। রাতারাতি স্কুল সরিয়ে দিলে এরা যাবে কোথায়? আবার রাখতে গেলেও সমস্যা। ফলে সঙ্কট উভয় দিকেই। ফলে সরকারেরই দায়িত্ব একটা পরিকল্পনা করা। সম্প্রতি রাজধানীর আবাসিক এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনায় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।কোরিয়ান চেইন রেস্তোরাঁ বি বি কিউয়ের প্রধান আশরাফ উদ-দৌলা

 

কোরিয়ান চেইন রেস্তোরাঁ বি বি কিউয়ের প্রধান আশরাফ উদ-দৌলা বলেন, আমি অ্যাসোসিয়েশনের একজন হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে বলছি হোটেলগুলো কোনও ট্রাফিক ক্রিয়েট করে না। গুলশান বনানী বারিধারা উত্তরার হোটেলগুলোতে যারা মূলত আসেন তারা বিদেশি। পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি বলেন, পুরোনো কিছুকে নতুন করে তুলতে হলে প্রথমে পরিকল্পনা জরুরি। আমাদের কয়টা রেস্তোরাঁ, কয়টা স্কুল-কলেজ থাকা উচিত, কারা যায় এসব জায়গায় সেটা মাথায় রাখতে হবে। রাজউকসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থাগুলো যদি এসব বিবেচনায় নেয় তাহলে চাহিদা অনুযায়ী এগুলো নির্ধারণ করা যায়।

বাংলা ট্রিবিউনের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক জুলফিকার রাসেল

'আবাসিক এলাকা থেকে কেবল স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সরানোর কথা বলার আগে আরও কিছু বিষয়ে নজর দেওয়া উচিত উল্লেখ করে বাংলা ট্রিবিউনের সম্পাদক জুলফিকার রাসেল সরকারের উদ্দেশে প্রশ্ন ছোড়েন, গুলশান, ধানমণ্ডি, বারিধারা এলাকায় যেসব রাজনৈতিক দলের কার্যালয় রয়েছে সেগুলো উচ্ছেদ করতে পারবেন?' তিনি আরও বলেন, 'খেয়াল করে দেখবেন আমাদের রাজধানী শহর উত্তর থেকে দক্ষিণমুখী। বিশ্ববিদ্যালয়, সেনানিবাস এলাকাতো সরিয়ে দেওয়া যাবে না। এর মধ্যেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ট্রাফিক সামলানোর কোনও বিকল্প নেই।'

বৈঠকিতে বক্তারা শিশুদের জন্য যথেষ্ট খেলার মাঠ না থাকা, আবাসিক এলাকায় ফায়ার স্টেশন না থাকাসহ রাস্তাঘাটের অনিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেন। তারা বলেন, কেবল উচ্ছেদের মধ্য দিয়ে সমস্যা আরও বাড়বে। এজন্য যথাযথ পরিকল্পনা জরুরি।  

বাংলা ট্রিবিউনের এই বৈঠকির প্রচার সহযোগী হিসেবে ছিল একাত্তর টেলিভিশন ও ঢাকা ট্রিবিউন। সঞ্চালনায় ছিলেন মিথিলা ফারজানা।

/টিএন/আপ-এনএস/