আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর করার কথা। আইএমএফ -এর সঙ্গে সরকারের পরামর্শ এমনই। কিন্তু নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর করতে আরও দুই বছর সময় চান ব্যবসায়ীরা। এ দাবি নিয়ে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্লাটফরম সরকারের অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর সঙ্গে কখনও যৌথ আবার কখনও পৃথক বৈঠক করেছেন। তবে কোনও বৈঠকেই সরকারের তরফ থেকে সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়টি নিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। বৈঠকের পর এ বিষয়ে জানতে চাইলেও কেউ মুখ খোলেননি। নতুন ভ্যাট আইন আগামী অর্থবছরের প্রথমদিন ১ জুলাই থেকে বাস্তবায়ন করার তারিখ নির্ধারিত থাকলেও তা নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব রয়েছে সর্বত্র। নির্ধারিত তারিখ থেকে ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কঠোর অবস্থানে থাকায় বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।
সরকারের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে জোরালো আপত্তির মুখে ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে আগের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসছে সরকার। সরকারের উচ্চ মহলে এ বিষয়ে এক রকম নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ মুখ খুলছেন না। সবাই প্রত্যাশা করছে হয়তো আগামী ২ জুন বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার দিনই অর্থমন্ত্রী এ বিষয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দেবেন।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফের) পরামর্শে প্রণয়ন করা হয়েছে নতুন ভ্যাট আইন। এজন্য আইএমএফ’র কাছ থেকে সরকার সহজ শর্তে ১০০ কোটি ডলার সমপরিমাণ ৮ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে। এ শর্তেই সরকার এটি চূড়ান্ত করেছে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। একইসঙ্গে সারাদেশের ভ্যাট অফিসগুলো আধুনিকায়নের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে সাড়ে ৫শ কোটি টাকা। ২০১২ সালে আইনটি করা হলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করতে না পারার জন্য আইএমএফ’র কাছ থেকে এক ধরনের চাপে রয়েছে সরকার।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, নতুন ভ্যাট আইনে ‘সমতা ভিত্তিক' ভ্যাট আদায়ের বিধান রাখা হয়েছে। সেই নতুন আইন কার্যকর হলে দেশের বড়, ছোট মাঝারিসহ সব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। কিন্তু বর্তমান আইনে কয়েকটি ধাপে অর্থাৎ কয়েকটি স্তরে কমিয়ে বিদ্যমানের চেয়ে কম হারে ভ্যাট আদায় করা হয়। একইসঙ্গে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য ভ্যাট প্রদানে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়। ব্যবসায়ীরা চলমান এসব সুবিধা বহাল রেখেই নতুন ভ্যাট আইন সংশোধন চান।
উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের নির্দেশনায় দেশে প্রথম ভ্যাট চালু হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে বাজেটে কিছু সংশোধন করা হয়েছে। এ যাবৎকালে এই আইনে তেমন কোনও বড় পরিবর্তন হয়নি। ২০১২ সালে নতুন ভ্যাট আইন জাতীয় সংসদে পাস হয়।
এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন দি ফেডারেশন অব চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এফবিসিসিআই’র পরিচালক হেলাল উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, আমরা এ আইনের বিপক্ষে নই। নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন নিয়ে আমাদের কোনও আপত্তিও নাই। ভ্যাট পরিশোধেও আমাদের কোনও অনাগ্রহ নাই। আমরা সরকারকে ভ্যাট দিতে চাই। যেহেতু আইনে অনেক জটিলতা রয়েছে, তাই জটিলতা নিরসন না করে এই মুহূর্তে জোর করে আইনটি বাস্তবায়নের জন্য ব্যবসায়ীদের ওপর চাপিয়ে দিলে রাজস্ব আহরণে জটিলতা তৈরি হবে। এতে রাজস্ব আদায় বাধাগ্রস্ত হবে। ব্যবসায়ীরা রাস্তায় নেমে আসতে পারেন। তাতে সরকারের ইমেজ ক্ষুণ্ন হবে। সমাজে অস্থিরতা তৈরি করবে। বড় ব্যবসায়ীদের চেয়ে ছোট ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়বেন।
তিনি বলেন, নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে মূল সমস্যা হচ্ছে- আইনটি অনেক বড়। সেখানে ভ্যাট আইনের বিধিটি অনেক ছোট। এটি সমস্যা তৈরি করবে। এ আইনের বাস্তবায়ন শুরু হলে সেই সমস্যা নিরসন কঠিন হবে। জটিলতা নিরসনে আমরা ৭ দফা সুপারিশ তুলে ধরেছিলাম। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হোক। এনবিআর এর ৫ জন এবং এফবিসিসিআই’র ৫ জনের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি ২০১৪ সালে তিন মাস ব্যাপক আলাপ-আলোচনা করে ওই ৭টি সুপারিশ পেশ করেছিলাম। সরকারের পক্ষ থেকে সেইসব সুপারিশের একটিও মানা হয়নি। তাই এই মুহূর্তে সরকারের কাছে আমাদের দাবি- জটিলতা নিরসন না হওয়া পর্যন্ত পুরনো আইনটি বহাল থাকুক। নতুন আইনের খুঁটিনাটি বিচার-বিশ্লেষণ করে তা বাস্তবায়নের উপযোগী করে তুলতে ব্যবসায়ীদের অন্তত দুই বছর সময় দেওয়া হোক। আইনটি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পরিবর্তে ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে চালু করা হোক।
হেলাল উদ্দিন বলেন, নতুন আইনে বলা হয়েছে- সব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ হারে ট্যাক্স দিতে হবে। এটি ন্যায় বিচার নয়। কারণ সব ব্যবসায়ী একই হারে ব্যবসা করেন না। এক্ষেত্রে আমরা ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলেছিলাম এর মার্জিন ১০ থেকে ১৫ শতাংশ করার জন্য। সরকার সেটিও মানেনি।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে হেলালউদ্দিন বলেন, সারাদেশের ব্যবসায়ীরা সরকারের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদেরকে পাশ কাটিয়ে সরকার এটি করতে পারেই না। আমাদের বিশ্বাস, ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস- সরকার এটি করবে না। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার হচ্ছে ব্যবসাবান্ধব সরকার। আমরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থা রেখে আগামী ২ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ না হওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে আছি। দেখি অর্থমন্ত্রী ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে কী নির্দেশনা দেন।
নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন ও ব্যবসায়ীদের আপত্তি বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, এই মুহূর্তে কিছু বলা ঠিক হবে না। আমার বাজেট বক্তৃতায় এ বিষয়ে দিক নির্দেশনা থাকবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, হতাশ হওয়ার কিছু নাই। ব্যবসায়ীদের সমস্যা হয় এমন কোনও সিদ্ধান্ত সরকার নেবে না। একটা ভালো দিক নির্দেশনা থাকবে। কারণ বর্তমান সরকার ব্যবসাবান্ধব সরকার।
আরও পড়ুন:
বিনা পরোয়ানায় আটক, পুলিশি রিমান্ড চলছে
অনিবন্ধিত সিম বন্ধ: কাস্টমার কেয়ারে ভিড়
মহিবুরের ফাঁসি, মজিবুর ও রাজ্জাকের আমৃত্যু কারাদণ্ড
/এসআই /এএইচ / আপ- এপিএইচ/