নৌ-ট্রানজিটকে কেন্দ্র করে যেমন অবকাঠামোগত উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল আশুগঞ্জ বন্দরের উন্নয়ন তা হয়নি। ট্রান্সশিপমেন্ট কার্যক্রম শুরুর বিষয়টিকে কেন্দ্র করে আশুগঞ্জ নৗবন্দরে তেমন কোনও অবকাঠামোই গড়ে ওঠেনি। মোটামুটি একটি ভাঙাচোরা পাকা ঘাট আছে। যা দিয়ে শুরু করা যায়। তাই করা হয়েছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বিদ্যমান নৌ-প্রটোকলের আওতায় ট্রানজিট পণ্য ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরার আগরতলায় যাবে। ট্রানজিট সবিধা চালুর পর সব চেয়ে বেশি চাপ পড়বে আশুগঞ্জ নৌবন্দর থেকে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত সড়কপথে। এ পথের দৈর্ঘ্য ৫২ কিলোমিটার। এটিকে কোনওভাবেই বর্তমান অবস্থায় রেখে ট্রানজিট চালু করা ঠিক হয়নি বলে মনে করেন স্থানীয়রা। তাদের অভিমত, রাস্তাটি চিকন। টু লেনের রাস্তা হলেও তা অতি পুরোনো হওয়ায় এখন আর টু-লেনও কাজ করে না। রাস্তার আশপাশের জায়গা দখল হয়ে গেছে বিভিন্ন পদ্ধতিতে। বর্ষার কারণে সড়কে বড় বড় খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। আশুগঞ্জ থেকে সরাইল বিশ্বরোড মোড় পর্যন্ত সিলেট মহসড়কের ১১ কিলোমিটার এবং বাকি আরও ৪১ কিলোমিটার রাস্তা খানাখন্দে ভরা, ভারী যানবাহন এ রাস্তায় চলাচলের অনুপযোগী। তাই এ রাস্তাটি ফোর লেনে উন্নীত না করে ট্রানজিট চালু করা মোটেই ঠিক হয়নি বলে তারা মনে করেন।
নৌ-প্রটোকলের আওতায় বহুমাত্রিক পথে ভারতকে ট্রানজিট দেওয়ার উদ্দেশ্যে ২০১১ সালে আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে এ পথে তিনটি পরীক্ষামূলক চালানে লোহা ও লোহাজাতীয় পণ্য আগরতলায় গিয়েছিল। পরীক্ষামূলক চালান পরিবহনের পর পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই বলে এ পথটি নিয়মিত করেনি বাংলাদেশ। তবে ভারতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে এ পথটি নিয়মিত করার তাগিদ দেওয়া হলেও বাংলাদেশ তা আমলে নেয়নি। আখাউড়া থেকে ত্রিপুরা হয়ে ভারতের অন্য প্রদেশগুলোয় যাওয়ার রাস্তা পুরোটাই খারাপ।
এগুলোর পর্যাপ্ত উন্নয়ন মোট কথা অবকাঠামো-সুবিধা না থাকলেও মেঘনা নদীর পাড়ে অবস্থিত আশুগঞ্জ নৌবন্দর দিয়ে নিয়মিত ট্রানজিট শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের নৌ ও সড়কপথ ব্যবহার করে পণ্য পরিবহন করা শুরু করেছে ভারত। ৩ জুন কলকাতা থেকে রওনা হয়ে এক হাজার টন ইস্পাতের পাত বা স্টিল শিট (লোহার রড) বোঝাই বাংলাদেশি কোম্পানি জেড (জেডইডি) ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি লিমিটেডের জাহাজ এমভি নিউটেক-৬ ইতোমধ্যে আশুগঞ্জ নৌবন্দরে ভিড়েছে। আজ ১৬ জুন বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলাকে সঙ্গে নিয়ে ফিতা কেটে, পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ট্রানজিটের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশের নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। এ সময় মন্ত্রী জাহাজ নিউটেক-৬ থেকে ক্রেনের সাহায্যে এক বান্ডিল রড তুলে আনেন নৌমন্ত্রী। এখান থেকে এই পণ্যগুলো ট্রাকে করে সড়কপথে যাবে আগরতলা। তবে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে মন্ত্রী চলে যাওয়ার পর পণ্য নামানোর কাজও বন্ধ হয়ে যায়। ট্রাকসহ আনুষঙ্গিক কাজগুলো সম্পন্ন না হওয়ায় বৃহস্পতিবারই পণ্য নামানো হবে না বলে জানিয়েছেন জাহাজের মাস্টার। শুক্রবার অথবা পরশুদিন শনিবার পণ্য নামানোর কাজ চলবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, আশুগঞ্জ বন্দর ঘাট এলাকায় ছোট একটি গুদাম ও দুটি কামরা রয়েছে। কিন্তু সেখানে কাউকে অফিস করতে দেখা যায়নি। বৃষ্টিতে ঘাট থেকে মূল সড়কে যাওয়ার জন্য আধা কিলোমিটার সংযোগ সড়কটি ভাঙা ও সরু। কোথাও কোথাও কাদা আর জলাবদ্ধতা। মন্ত্রী যাবেন বলেই সম্প্রতি সেখানে যে বালু ও খোয়া ফেলা হয়েছে, তা পরিষ্কার বোঝা যায়।
ট্রানজিটের জন্য পণ্য কলকাতা থেকে আশুগঞ্জ পর্যন্ত নৌপথে, আর আশুগঞ্জ থেকে আখাউড়া হয়ে আগরতলা যাবে সড়কপথে। কলকাতা থেকে আশুগঞ্জ হয়ে আগরতলা এ পথে মূলত তিনটি সংস্থাকে মাশুল দিতে হবে। এ জন্য প্রতি টনে বাংলাদেশ মোট মাশুল পাবে ১৯২ টাকা। যদিও এর মধ্য থেকে ১০ টাকা বিআইডব্লিউটিএও ৫২ টাকা ২২ পয়সা পাবে সড়ক বিভাগ। বাংলাদেশের কোম্পানি আনবিস ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড ত্রিপুরার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্টিল শিটের চালান কলকাতা থেকে আগরতলায় পৌঁছে দেওয়ার ঠিকাদারি পেয়েছে। তবে এর বাইরে ট্রানজিট নেওয়া প্রতিষ্ঠান পণ্যের নিরাপত্তা চাইলে প্রতি টনে আরও ৫০ টাকা এসকর্ট মাশুল দিতে হবে।
উল্লেখ্য, গত বছরের নভেম্বরে দুই দেশের সচিব পর্যায়ে সভায় কলকাতা-আশুগঞ্জ-আখাউড়া-আগরতলা পথটি ট্রানজিটের জন্য চূড়ান্ত করা হয়। এর আগে ওই বছরের ৬ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বংলাদেশ সফরে এলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে এ সংক্রান্ত সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চলতি বছরে ১৫ মে কলকাতা থেকে আশুগঞ্জ এই নৌপথে আনবিস ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডকে চালান নেওয়ার অনুমতি দেয় বিআইডব্লিউটিএ।
ভারত ট্রানজিট সুবিধা নেওয়ার ফলে কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি (পশ্চিমবঙ্গ), শিলং (মেঘালয়) হয়ে সড়কপথে আগরতলায় পণ্য পরিবহনে ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটারের রাস্তা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ট্রানজিট নেওয়ায় এখন দূরত্ব দাঁড়িয়েছে ৫০০ কিলোমিটারের মতো। কমে গেছে প্রায় এক হাজার কিলেঅমিটার রাস্তা। ফলে টনপ্রতি ১৯২ টাকা মাশুল ফি দিয়ে ভারত কম খরচে কলকাতা থেকে অন্য রাজ্যে পণ্য পাঠাতে পারছে।
বৃহস্পতিবার ট্রানজিটের কার্যক্রম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, ট্রানজিট-ট্রানশিপমেন্টের ফলে বাংলাদেশ-ভারত উভয় দেশ লাভবান হবে। এখানে বহু লোকের কর্মসংস্থান হবে। নৌ-মন্ত্রণালয়ের সচিব অশোক মাধব রায়ের সভাপতিত্বে আশুগঞ্জ ফেরিঘাট সংলগ্ন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) আশুগঞ্জ গুদামের অভ্যন্তরে এ সুধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান, ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা, এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান, স্থানীয দু’জন সংসদ সদস্য। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার।
মাশুল প্রসঙ্গে নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, বন্দর যখন আধুনিক হবে তখন স্ক্যানিং মেশিন বসানো হবে, অটোমেশন করা হবে। এসব স্থাপন করা হলে তখন ভিন্ন ভিন্ন ফি ধার্য করা হবে। সব মিলিয়ে তখন প্রতি টন পণ্য পরিবহনে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মাশুল আদায় করা হবে। এতে অবশ্যই বাংলাদেশ লাভবান হবে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান বলেন, ট্রানজিটের ফলে বাংলাদেশ-ভারত উভয় দেশই উপকৃত হবে। দেশে কর্মসংস্থান হবে। পণ্য পরিবহনে খরচ না কমলে বাণিজ্য বাড়বে না। এজন্য নৌ-প্রটোকল চুক্তিতে, স্থায়ীভাবে ট্রানজিটের বিধান রাখা হয়েছে।
ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেন, দুদেশের জনসাধারণের জন্য এ দিনকে ঐতিহাসিক একটি দিন। বাংলাদেশের এ অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে ত্রিপুরার জনগণের হৃদ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের ২০ লাখ মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিল ত্রিপুরাবাসী। সেদিন বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল ত্রিপুরার জনগণ। আগে প্রায় তিনগুণ পথ অতিক্রম করে ত্রিপুরায় মালামাল আনা হতো। ট্রানজিটের এই সুবিধার ফলে এখন তাদের সময় ও খরচ অনেক কমে আসবে। এ সুবিধা দেওয়াকে দুদেশের মধ্যে অনন্য বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে অভিহিত করেন ভারতের হাইকমিশনার।
আরও পড়তে পারেন: বৃহস্পতিবার থেকেই চালু হচ্ছে আনুষ্ঠানিক নৌ-ট্রানজিট
/এমএনএইচ/