আবদুল বাছেদ মিয়া, দেশের একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানেজার। দুই কন্যা সন্তানের জনক। বড় মেয়ে সাবিহা রাজধানীর বনানী বিদ্যা নিকেতনের ৫ম শ্রেণির ছাত্রী। ছোট মেয়ে লামিয়া একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৩য় শ্রেণির ছাত্রী। বনানীর ১১ নম্বর সড়কে নিজের বাড়িতে বসবাসকারী আবদুল বাছেদ মিয়া তার দুকন্যাকে নিয়ে রাজধানীর অভিজাত বিপনিবিতান বসুন্ধরা শপিংমলে এসেছেন ঈদের কেনাকাটা করার জন্য। কী কিনবেন? জানতে চাইলে আবদুল বাছেদ মিয়া দুমেয়েকে দেখিয়ে বলেন- সিদ্ধান্ত ওদের। ঈদের জন্য ড্রেস। সঙ্গে আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র তো রয়েছেই। তিনি জানিয়েছেন, দুমেয়েই পছন্দ করেছে লেহেঙ্গা। পছন্দও হয়েছে। দামও দেখেছি। তবে আরও বেটার খুঁজছি বলে জানান বাছেদ মিয়া। দু’মেয়ের জন্য ঈদের বাজেট কত জানতে চাইলে মুচকি হেসে বললেন- বোঝেনই তো বছরের ঈদ। বাজেট কী আর ঠিক রাখা যায়। বহু ইনিয়ে-বিনিয়ে জানালেন, পছন্দ হওয়া দুটি লেহেঙ্গার দাম চেয়েছে ৩০ হাজার টাকা। তবে হাজার পঁচিশে তো লাগবেই। বাছেদ সাহেবের দু’ মেয়ের দুটি জামার বাজেট পঁচিশ হাজার টাকা। বাকি আনুসাঙ্গিক জিনিসপত্র তো রয়েছেই। সব মিলিয়ে বাছেদ সাহেবের দুমেয়েকে খুশি করতে কত টাকা ব্যয় হবে তা শুধু অনুমানই করা যায়। এটি হচ্ছে সমাজের একটি শ্রেণির চিত্র।
সমাজের অপর শ্রেণির মানুষ আবদুল জলিল হাওলাদার। পেশায় সিএনজি অটোরিকশা চালক। রাজধানীর রামপুরায় ভাড়া বাসায় বসবাসকারী আবদুল জলিলেরও দুই মেয়ে। বড় মেয়ে নাসিমা রামপুরা একরামুন্নেছা হাই স্কুলের ৫ম শ্রেণির ছাত্রী। ছোট মেয়ে শাহিনা একই স্কুলের ৩য় শ্রেণির ছাত্রী। দুই মেয়েকে নিয়ে রাজধানীর মৌচাক মার্কেটের সামনের ফুটপাথে ঘোরাঘুরি করছেন ঈদের জামা কিনবেন বলে। ছোট মেয়ের জামা কেনা হয়েছে ৭শ টাকায়। বড় মেয়ের জন্যও বাজেট এমন। কিন্তু এই দামে পছন্দের জামা পাওয়া যাচ্ছে না, তাই ঘোরাঘুরি। পরামর্শ দিয়ে বললাম কিছু বেশি দিয়ে নিয়ে নিন। জবাবে আবদুল জলিল বাংলা ট্রিবিউনকে বললেন, সব মিলিয়ে দুই মেয়ের জন্য বাজেট ২ হাজার টাকা। বেশি দিয়ে জামা কিনলে ওদের জন্য জুতা কেনার টাকা পাবো কোথায়? এটি হচ্ছে সমাজের অপর অংশের চিত্র।
একই ঈদ উদযাপনে এভাবেই চোখে পড়ে শ্রেণিবৈষম্য। শুধু মুসলমানদের ঈদ, কোরবানি বা অন্য কোনও ধর্মীয় উৎসব নয়। সমাজের এই শ্রেণিবৈষম্য চোখে পড়ে হিন্দু ধর্মালম্বীদের পূজায়, খ্রিস্টানদের বড়দিনে এবং বৌদ্ধদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব বৌদ্ধ পূর্ণিমায়। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ধনী মানুষের ছেলেমেয়েদের উৎসব পালনে হাজার টাকা ব্যয় করার সামর্থ্য থাকলেও গরিব মানুষদের সন্তানরা উৎসব পালনে সেভাবে পছন্দসই আনন্দ করতে পারে না সম্পদের অভাবে। অভিভাবকদের সীমিত আয়ের কারণে, অর্থের অভাবে, ধর্মীয় উৎসবগুলোয় সমাজের এই শ্রেণিবৈষম্য অনেকটাই স্বচ্ছভাবে ধরা পড়ে, বৃদ্ধিও পায়।
একইভাবে ধর্মীয় উৎসব বাদ দিলেও সামাজিক উৎসবগুলোয়ও এই বৈষম্য চোখে পড়ে। বতর্মানে বাঙালির সার্বজনীন উৎসব হচ্ছে পহেলা বৈশাখের উৎসব। এ উৎসব পালনেও সমাজের বিত্তবানরা খাওয়া-দাওয়ার পাশাপাশি নতুন জামা-কাপড় কেনাকাটায় ব্যাপক অর্থ খরচ করে। কিন্তু সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষেরা সেভাবে অর্থ খরচ করে উৎসব পালন করতে পারে না। অথচ পহেলা বৈশাখের দিন উৎসব উদযাপনে ঘরের বাইরে চলে আসে সমাজের ধনী-গরিবসহ সব শ্রেণির মানুষ।
এছাড়া এই শ্রেণিবৈষম্য চোখে পড়ে রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র সমাজের। মনকাড়া বিপনিবিতানগুলো থেকে যখন একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি বা তাদের পরিবারের সদস্যরা হাজার হাজার টাকার শপিং করে বের হন, তখন দেখা যায় ফুটপাথগুলোয় নিম্ন আয়ের মানুষগুলোর পছন্দের জিনিসটি কেনার জন্য দরদাম করে শরীরের শক্তি ক্ষয় করার প্রতিযোগিতা। তাইতো নামিদামি শপিংমল এবং ফুটপাথ উভয়স্থানে সমানতালে চলে উৎসবের কেনাকাটা। চলে মধ্যরাত পর্যন্ত।
ধর্মীয় উৎসবগুলো উদযাপন এক শ্রেণির মানুষের জন্য আনন্দদায়ক হলেও সমাজে অনেক মানুষ আছেন এসব উৎসব তাদের জন্য অনেকটাই কষ্টদায়ক। সীমিত সম্পদের কারণে তাদের এই উৎসব উদযাপনে নিজের পরিবারের সদস্যদের পছন্দের জিনিসটি উপহার দিতে না পারার যন্ত্রণা তাদের কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। অথচ সমাজের এই শ্রেণিবৈষম্যের স্বীকার উভয় শ্রেণির মানুষই এক ঈদগাঁয় যায় ঈদের নামাজ পড়তে। একই মন্দিরে যায় পূজা দিতে। একই গির্জা বা প্যাগোডায় যায় ধর্মীয় রীতিনীতিগুলো অনুসরণ করতে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শফিউল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, সমাজের ধনী-গরিবের এই বৈষম্য থাকে সবসময়। চোখেও পড়ে। কিন্তু ধর্মীয় উৎসবগুলোয় শ্রেণিবৈষম্যের এই পার্থক্যটা মানুষের চোখে ধরা পড়ে প্রকটভাবে। তবে শুধু ধর্মীয় উৎসবগুলোই নয়, সমাজের সব উৎসবেই এই শ্রেণিবৈষম্য বাড়ে।
একই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজধানীর শাহজাহানপুরের ঝিল মসজিদের পেশ ইমাম আলহাজ্ব আবু বকর বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে ঈদ কোরবানিসহ সব উৎসবগুলোই মুসলমানের। এ উৎসবগুলো আনন্দের। এখানে ধনী-গরিবের পার্থক্য করা যাবে না। তবে মুসলমানরা তাদের সাধ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী আনন্দ করবেন এটাই রীতি। এখানে পার্থক্য খোঁজা ঠিক নয়।
/এসআই /এএইচ/
আরও পড়ুন:
জাকাতের কাপড় মানেই সস্তা, ‘নিন্দনীয় অপরাধ’ বলছেন আলেমরা
ঘটা করে জাকাত দিতে পুলিশের অনুমতি লাগবে
টিসিবি অকার্যকর, বাজারে কোনও প্রভাব নেই
ঢাকাতেও ক্রেতাদের চাহিদার তুলনায় সামান্য বরাদ্দ পেয়েছেন ডিলাররা