জঙ্গি কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন: সতর্ক করে এক ডজন ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠি

বাংলাদেশ ব্যাংকের লোগোবাংলাদেশে জঙ্গি ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড যারা চালিয়ে যাচ্ছে তাদের নানাভাবে অর্থায়ন করছে দেশের এক ডজন ব্যাংক। সরকারি-বেসরকারি ডজনখানেক ব্যাংকে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর লেনদেনের প্রমাণও পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ)।এর মধ্যে সিরিয়ায় মার্কিন জোটের বিমান হামলায় নিহত আইএসের প্রধান হ্যাকার সাইফুল হক ওরফে সুজনের নামে দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এছাড়া মিয়ানমারের বিদ্রোহী জঙ্গিগোষ্ঠীর শীর্ষ নেতা ডা. রান উইন সোর নামেও একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এদিকে, জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগে সম্প্রতি ডজনখানেক ব্যাংককে সতর্ক হওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
আরও পড়তে পারেন: ‘জীবন দিয়ে দিস বাবা, তাও জঙ্গি হইস না’
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের প্রধান হ্যাকার সাইফুল হক ওরফে সুজনের দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া মিয়ানমারের বিদ্রোহী জঙ্গিগোষ্ঠীর শীর্ষ নেতা ডা. রান উইন সোর নামে থাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টও জব্দ করা হয়েছে। তিনি জানান, সন্ত্রাসী জঙ্গিগোষ্ঠী বাংলাদেশের ১০ থেকে ১২টি ব্যাংকে লেনদেন করছে।
এদিকে, ডজনখানেক ব্যাংককে সতর্ক হওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পাশাপাশি এই ব্যাংকগুলোর সন্দেহজনক প্রায় অর্ধশতাধিক অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫টি অ্যাকাউন্ট সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রদত্ত ক্ষমতাবলে জব্দ করা হয়েছে। জব্দ ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে বিএফআইইউ’র কর্মকর্তারা।

এ প্রসঙ্গে বিএফআইইউ’র মহাব্যবস্থাপক দেবপ্রসাদ দেবনাথ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জব্দ করা একউন্টগুলোর বিষয়ে তদন্ত শুরু করা হয়েছে। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক সংস্থা এগমন্ড গ্রুপের কাছেও এসব ব্যাংক একাউন্টে অর্থ প্রেরণকারীদের সার্বিক তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে সব ব্যাংককে সতর্ক হওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক লিমিটেড, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড, ডাচবাংলা ব্যাংক লিমিটেড ও ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড অন্যতম।
আরও পড়তে পারেন: গুলশান হামলা: অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজি হাসান বলেন, জঙ্গি অর্থায়ন বন্ধে গ্রাহকের তথ্য সঠিকভাবে ফরমে পূরণ করতে ব্যাংকগুলোকে কঠোরভাবে বলা হয়েছে। একইভাবে যেকোনও ধরনের লেনদেন সন্দেহজনক বিবেচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিএফআইইউকে অবহিত করতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, জঙ্গি অর্থায়ন ও অবৈধ অর্থ পাচারে জড়িত সব ধরনের প্রতিষ্ঠানকেই নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। এছাড়া মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে ব্যাংকগুলোকে আরও বেশি সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জঙ্গি ও রাষ্ট্রবিরোধী কাজে অর্থায়নে জড়িত থাকার অভিযোগে আরাকান আর্মির আলোচিত নেতা ডা. রান উইন সোসহ সংগঠনটির তিন সহযোগীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের অ্যাকাউন্ট খোলার ফরম, কেওয়াইসি প্রোফাইল ফরম, হিসাব বিবরণী ও আনুষঙ্গিক কাগজপত্র বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানোর জন্য ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক লিমিটেডকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে. ডা. রান উইন সো ও মংপ্রুচিং মারমা আরাকান আর্মির সদস্য এবং বর্তমানে তারা রাঙামাটি জেলা কারাগারে অন্তরীণ। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা চিংনু মারমা ডা. রান উইন সোয়ের স্ত্রী।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন অনুযায়ী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রামের দোভাসি বাজার শাখায় ডা. রান উইন সো ও মং প্রু চিং মারমা ব্যাংক হিসাব রয়েছে। যার হিসাব নং যথাক্রমে ১২৪১-২২০০-০০৬৬৩৯ ও ১২৪১-২২০০-০১১০৯৮। এছাড়া চিংনু মারমা কৃষি ব্যাংকের রাজস্থলী শাখার মাধ্যমে লেনদেন করেন। যার হিসাব নং-২৬৯৬।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রাঙামাটি পুলিশের অনুরোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে চট্টগ্রামের কয়েকটি ব্যাংকে পরিদর্শন করা হয়েছে। পরির্দশনে দেখা গেছে, ওই তিন ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক ও কৃষি ব্যাংকে রয়েছে। তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক ওইসব অ্যাকাউন্টগুলো স্থগিত রাখতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে।

অন্যদিকে ডাচ বাংলার ব্যাংকের পাঁচটি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে জঙ্গি সংগঠন শহীদ হামজা ব্রিগেডের সঙ্গে মোট ১ কোটি ৮ লাখ টাকা লেনদেনের প্রমাণ পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বিএফআইইউ’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, জঙ্গি অর্থায়নের অভিযোগে জব্দ করা হয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের কারওয়ানবাজার শাখার তাজুল ইসলামের। যার সঞ্চয়ী অ্যাকাউন্ট নম্বর-০১১৬-১২২-০০০৭৪৫১৯। একই ব্যক্তির মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ০০১৪-০৩১০০৬৯০৯৭ অ্যাকাউন্ট নম্বরটিও জব্দ করা হয়। একই অভিযোগে জব্দ করা হয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের নাহিদউদ্দোজার ১১৭১০১০১৭০৭৯১ অ্যাকাউন্ট নম্বরটিও। জঙ্গিদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আইব্যাকস টেল ইলেকট্রনিক্স লিমিটেড নামে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে  দুটি হিসাব নম্বর খোলা হয়। যাতে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রেমিটেন্সের মাধ্যমে ৬০ দশমিক ১৮ লাখ টাকা জমা হয়।

জঙ্গি অর্থায়নের জন্য সন্দেহ করা প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে, আইটিএস সলিউশন লিমিটেড, এর স্বত্বাধিকারী মো. নাহিদউদ্দোজা, ওয়াকিলুর ইসলাম ও কে এম আরমান ইমতিয়াজ, এভাতার টেকনোলজিস, আলিফ বায়োফুয়েল, আইব্যাকসটেল ইলেকট্রনিক্স ও আইব্যাকস লিমিটেড। এই চারটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আবুল হাসনাত ও তার স্বজনরা জড়িত। আলিফ বায়োফুলের নামে ৬০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত করা হয়। যা শেষ পর্যন্ত আটকে দেওয়া গেছে।

আরও পড়তে পারেন:বাসা থেকে পালিয়ে গিয়ে ‘জঙ্গি’ হয়ে ওঠে চার তরুণ
জানা গেছে, ২০১২ সাল থেকে ১৫ সাল পর্যন্ত ঢাকার আইব্যাকস লিমিটেড এবং আইব্যাকস টেলি ইলেক্ট্রনিকস লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠান দুটির ব্যাংক হিসাবে এফটিটির মাধ্যমে ২ কোটি ২২ লাখ টাকা জমা হয়েছে। এই টাকা এসেছে ব্রাজিল, সাউথ আফ্রিকা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সুরিনাম ও স্পেন থেকে। জানা গেছে, আইব্যাকসকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ইইএফ থেকে ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা মঞ্জুরও করা হয়েছিল। এ ছাড়া প্রতিবেদনে আবুল হাসনাতকে ইউরো-বাংলা এগ্রো ফিশারিজকে চেয়ারম্যান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকে তার ২০৫০৩১৬০২০০৫৭৯৮০৮ হিসাব নম্বরে ২০১৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ লাখ ৭ হাজার টাকা জমা হয়। এ ছাড়া আবুল হাসনাতের মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের একটি হিসাব নম্বরে ২০১১ সালের ২২ মে থেকে ২০১৫ সালের ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত এক কোটি এক লাখ ২০ হাজার টাকা জমা হয়। তার মধ্যে ৮২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা তুলেছেন তিনি।

জানা গেছে, আইব্যাকস লিমিটেডের একটি হিসাব নম্বরে বিদেশ থেকে ৮৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা আসে। যা বর্তমানে ওই হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন বন্ধ রাখা হয়।

দুই বছর আগে বেসরকারি ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডে (ইবিএল) আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে জড়িত চার ব্যক্তির ব্যাংক একাউন্টের সন্ধান পায় বাংলাদেশ ব্যাংক।  এসব সন্ত্রাসী পার্শ্ববর্তী একটি দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সদস্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে ড্যানিয়েল লুসাই, মনি এমলানরং, অ্যান্টনি সিং ও মার্সি সিংয়ের নামে ইবিএলের মতিঝিল শাখায় চারটি হিসাব খোলা হয়। ড্যানিয়েল লুসাইর নামে খোলা হিসাব নম্বর ০১০২১০২০০১১৪০১ এবং ৩/৩ পুরানা পল্টনকে অস্থায়ী ঠিকানা হিসেবে দেখানো হয়েছে। নকিরপুঞ্জি, পূর্ব জাফলং, গোভানীহাট, সিলেটকে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বাবার নাম দেখানো হয়েছে জদুয়া সিং। মনি এমলানরংয়ের নামে খোলা হিসাব নম্বর ০১০২১০১০০২৩০৫০। তার আর কোনও পরিচয় দেখানো হয়নি। অ্যান্টনি সিংয়ের নামে খোলা হিসাব নম্বর ০১০২১০২০০০২০৩২। প্রথম জনের মতো তার হিসাব নথিতেও ৩/৩ পুরানা পল্টনকে অস্থায়ী ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে ৩, ওয়ার্ড চাল মার্কেট কক্সবাজারকে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মার্সি সিং ও অ্যান্টনি সিংয়ের নামে একটি যৌথ হিসাব খোলা হয়েছে। যার নম্বর ০১০২১০১০০২০৮২৩। এ দুই ব্যক্তির স্থায়ী বা অস্থায়ী কোনও ঠিকানা উল্লেখ করা হয়নি। হিসাব খোলার সময় এসব ব্যক্তির পেশা হিসেবে ব্যবসা দেখানো হলেও ব্যাংকের নথিতে ব্যবসাসংক্রান্ত কোনও ট্রেড লাইসেন্স বা অন্য কোনও তথ্য পায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক।  তাৎক্ষণিকভাবে ৩০ দিনের জন্য এসব একাউন্টের সব ধরনের লেনদেন স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

/এমএনএইচ/ আপ- এমএসএম /