কয়েকটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কৃষক ও ছোট উদ্যোক্তারা যথাসময়ে ঋণের টাকা ফেরত দিলেও দেশের প্রভাবশালীরা ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের অর্থ ফেরত দিচ্ছে না। এর ফলে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে।
প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে কয়েকটি প্রভাবশালী ব্যবসায়ীকে বিশেষ সুবিধায় নামমাত্র ডাউন পেমেন্টে খেলাপি ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশের ১১টি বড় শিল্প গ্রুপ ও প্রতিষ্ঠান ১৫ হাজার ২১৮ কোটি টাকা পুনর্গঠন (নিয়মিত) সুবিধা নেয়। এছাড়া ওই সময় আরও প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যে সব প্রভাবশালী ব্যবসায়ীকে পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল তাদের অধিকাংশই সময়মত টাকা ফেরত দেয়নি। এ কারণে ব্যাংক খাতে ফলে খেলাপি ঋণ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৫ সালের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে পুনতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ ৫০ শতাংশ বেড়েছে। শুধু তাই নয়, ব্যাংকিং খাতের বিতরণকৃত ঋণের ৪ দশমিক ৫ শতাংশই পুনতফসিল করা হয়েছে। যা মোট খেলাপি ঋণের ৫ শতাংশ এবং সমস্যাগ্রস্ত ঋণের ২৮ শতাংশ। অন্যদিকে, ২০১৫ সালে প্রথমবার বিশেষ সুবিধায় বড় ঋণগ্রহীতাদের (৫০০ কোটি টাকার বেশি) খেলাপি ঋণ পুনর্গঠনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ওই সুবিধা কাজে লাগিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাতে ১৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনের মাধ্যমে নিয়মিত করা হয়েছে। এর মধ্যেও ঝুঁকিভিত্তিক ঋণের অংশ বেশি ছিল। যার হার ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ। এছাড়া মোট বিতরণকৃত ঋণের ২ দশমিক ৮ শতাংশ ও অশ্রেণিকৃত ঋণের ৩ দশমিক ১ শতাংশ। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৫ সালে দেশের ৫৬টি ব্যাংকের ২৩টি ব্যাংক শীর্ষঋণ গ্রহীতাদের পুনর্গঠন সুবিধা দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঋণ পুনর্গঠন ও অবলোপন করায় মন্দ গ্রাহকরা ছাড় পেলেও ভালো গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণে ব্যাংকগুলো যাতে ভাল প্রজেক্টে ঋণ দেয় সে জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে।
বিআইবিএম’র প্রতিবেদনের তথ্য মতে, বড় ঋণের পরিমাণ প্রতিবছরই বাড়ছে। ২০১০ সালে ব্যাংক খাতে বিতরণ করা (৫০ কোটি টাকার বেশি) ঋণের মধ্যে বৃহৎ বা বড় ঋণ ছিল ১৮ দশমিক ৮০ শতাংশ। ২০১১ সালে তা বেড়ে হয় ২১ দশমিক ৪৩ শতাংশ, ২০১২ সালে হয় ২২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ২০১৩ সালে ২৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০১৪ সালে বড় ঋণের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৩১ দশমিক ৫৯ শতাংশ হয়।
আবার বড় বা বৃহৎ ঋণের মধ্যে ২০১০ সালে খেলাপি ঋণ ছিল সাড়ে ৪ শতাংশ, ২০১২ সালে বৃহৎ ঋণের খেলাপি বেড়ে দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৪০ শতাংশ। মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে ২০১০ সালে বড় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ। ২০১১ সালে হয় ৩৮ দশমিক ১১ শতাংশ ও ২০১২ সালে ৪০ দশমিক ৪১ শতাংশ। ২০১৩ সালে বৃহৎ খেলাপি আরও বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৪২ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ ও ২০১৪ সালে ৪৩ দশমিক ৮২ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবলোপন করা ঋণের মধ্যে বৃহৎ ঋণই বেশি। ২০১০ সালে বৃহৎ খেলাপি ঋণের মধ্যে ৪৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ অবলোপন করা হয়েছিল। ২০১১ সালে অবলোপন করা হয় ৬৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। ২০১৩ সালে অবলোপন করা হয় ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ ও ২০১৪ সালে ঋণ অবলোপন করা হয় ৩৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।
বিআইবিএমের গবেষণা অনুযায়ী, শীর্ষ ৫০০ ঋণগ্রহীতার মধ্যে ২০১০ সালে খেলাপি ছিল ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ, ২০১১ সালে তা কমে হয় ৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ, ২০১২ সালে তা বেড়ে হয় ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ, ২০১৩ সালে হয় ১৮ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ১৭ দশমিক ২০ শতাংশ।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তৈরি করা প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১০ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকা। ২০১৫ সালের জুন প্রান্তিকে ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণ ছিল ৫২ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, তিন মাস আগে মার্চ অর্থাৎ শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৫৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। এই হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা।
আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের জানুয়ারি-মার্চভিত্তিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শীর্ষ তিনজন করে ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলেই ঝুঁকিতে পড়বে দেশের ২৫টি ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর সংকটকালীন সহনক্ষমতা পরীক্ষা বা স্ট্রেস টেস্টিং পরীক্ষায় দেখা গেছে, র্শীষ তিনজন ঋণগ্রহীতার খেলাপির বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণ করার সক্ষমতা নেই ব্যাংকগুলোর। একইভাবে শীর্ষ ৭ ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে ঝুঁকিতে পড়বে ২৯টি ব্যাংক এবং শীর্ষ ১০ ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে ৩৫টি ব্যাংক মূলধন সংরক্ষণ করতে পারবে না।
এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে হলে প্রথমে ব্যাংকগুলোকে প্রভাবশালীদের থেকে মুক্ত করতে হবে। এরপর দেখতে হবে ব্যাংক যাতে যত্রতত্র ঋণ বিতরণ না করে। এ জন্য বিষয়ে তদারকি বাড়াতে হবে। যেখানে ঋণ দিলে ফেরত পাওয়া যাবে সেইসব প্রজেক্টে ঋণ বিতরণ করতে হবে।
জিএম/এমএসএম/