‘কোকেন আমদানির ঘটনায় তিন হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছিল’

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আয়োজিত নিরাপত্তা বিষয়ে অংশীদারিত্বমূলক সংলাপ

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান জানিয়েছেন, কোকেন আমদানিতে তিন হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছিল। মঙ্গলবার (১০ অক্টোবর) জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কার্যালয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিরাপত্তা বিষয়ে অংশীদারিত্বমূলক সংলাপে তিনি এই তথ্য জানান।

সংলাপে মূল নিবন্ধ উপস্থাপনকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজস্ব আদায় ও গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হাতে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন ড. মইনুল খান। এ ধরনের অনেক ঘটনার পেছনে বিশাল শক্তিশালী গ্রুপ থাকার বিষয়টি ইঙ্গিত করে চট্টগ্রামের আলোচিত কোকেন আটকের ঘটনাটি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘কোকেন আমদানিতে তিন হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছিল।’

ড. মইনুল খান বলেন, ‘আপন জুয়েলার্সের ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির মালিক পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।’

মূল নিবন্ধে তিনি রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার জন্য একটি বিশেষায়িত ও আলাদা নিরাপত্তা বাহিনী গঠন করার প্রস্তাব করেন। আলাদা নিরাপত্তা বাহিনী গঠনের লক্ষ্যে পুলিশসহ অন্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে সশস্ত্র ফোর্স গঠন করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের জন্য অস্ত্র বহন বা ব্যবহারের অনুমতিও চাওয়া হয় সংস্থাটির পক্ষ থেকে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনে অর্গানোগ্রাম পরিবর্তনের প্রয়োজনের কথাও বলা হয়।

এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান। এ সময় পুলিশ, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের আলাদা ও বিশেষায়িত ফোর্স গঠনের পূর্বে আরও বিশদভাবে চিন্তা করার জন্য এনবিআরকে পরামর্শ দেন।

এছাড়া, এ ধরনের ফোর্স কি সব সংস্থার সমন্বয়ে হবে, নাকি আলাদা কোনও বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে গঠিত হবে, তা নিয়েও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়। তবে এম এ মান্নান বাস্তবভিত্তিক ও যৌক্তিক যেকোনও প্রস্তাব সরকার বিবেচনা করবে বলে আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, ‘আইনের আওতায় সব ধরনের সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন এনবিআর কর্মকর্তারা।’

সভার শুরুতে এনবিআর চেয়ারম্যান রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিভিন্ন স্থানে আক্রান্ত হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘রাজস্ব ফাঁকি দিতে যারা অভ্যস্ত, সেখানে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হয়।’ এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার বনানীর বাসভবনের সামনে সন্ত্রাসীদের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘দেশব্যাপী এনবিআরের কর্মকর্তারা এ ধরনের আক্রমণের শিকার হয়েছেন। তাদের নিরাপত্তা প্রয়োজন।’

কর্মকর্তাদের নিরাপত্তায় অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের জন্য অস্ত্র সরবরাহ করা এবং ওইসব অস্ত্র বহন ও ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া, অন্য বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে আলাদাভাবে সশস্ত্র ফোর্স গঠন করার প্রয়োজনের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

আলোচনায় অংশ নিয়ে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোখলেসুর রহমান সব বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে সমন্বিত বাহিনীর গঠন না করে বরং একটি নির্দিষ্ট বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে নিরাপত্তা বাহিনী গঠনের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘সমন্বিত বাহিনীতে অনেক সমস্যা থাকে।’ পুলিশ বাহিনী থেকে সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে এনবিআরে দায়িত্ব পালন করলেও তাদের নির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণ পুলিশের হাতে থাকার পক্ষে মত দেন তিনি ।

তার এমন বক্তব্য নিয়ে মতভেদ তৈরি হয় উপস্থিত অন্যান্য বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তার মধ্যে। তারা সমন্বিতভাবেই এ ধরনের বিশেষায়িত বাহিনী তৈরির পক্ষে মত দেন। তবে কেউ কেউ এর সুবিধা ও অসুবিধা- উভয় দিক নিয়ে মত প্রকাশ করেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দিন বলেন, ‘এ ধরনের ফোর্সের সদস্যরা অনেক সময় কাউকে ধরে আনতে বললে বেঁধে নিয়ে আসেন। এজন্য এ ধরনের একটি বাহিনী গঠনের আগে আরও বিশদভাবে চিন্তার অবকাশ রয়েছে।’

বিজিবি’র অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসনাত রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তায় ঢালাওভাবে অস্ত্র সরবরাহ করা ঠিক হবে না বলে মত দেন। তিনি বলেন, ‘‘এর আগে বিষয়টি নিয়ে বিশদ পরীক্ষা-নিরীক্ষা হওয়া প্রয়োজন। তবে পুলিশ সদস্যদের সমন্বয়ে ‘এনবিআর পুলিশ’ নামে একটি বাহিনী গঠন করা যায়।’’

ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার বজলুর রহমান চৌধুরী রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ীদের আইনের আওতায় আনা গেছে কিনা, সেটি পরিষ্কার করার ওপরে গুরুত্ব দেন। এক্ষেত্রে এনবিআরের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতাকে কাজে লাগানো এবং যেকোনও কাজ সমন্বিতভাবে করার ওপর গুরুত্ব দেন। এ সময় এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কর্মক্ষেত্রে তাদের বিভিন্ন ধরণের ঝুঁকি তুলে ধরে বিশেষ বাহিনী গঠনের পক্ষে মত দেন।

আরও পড়ুন: সশস্ত্র ইউনিট চায় এনবিআর