শর্ত পূরণের পরও তৈরি পোশাক কারখানাকে চাপ দেওয়া হচ্ছে: বাণিজ্যমন্ত্রী

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ (ফাইল ছবি)বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ‘অপ্রত্যাশিত রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর ক্রেতাদের আরোপিত সব শর্ত পূরণ করা হয়েছে। এরপরও তারা অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স দিয়ে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ‘দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্য বিনিয়োগে বাংলাদেশের লক্ষ্য নির্ধারণের প্রতিবন্ধকতা ও নীতিমালা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।

ঢাবির ব্যবসা শিক্ষা অনুষদ আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ব্যবসা ও অর্থনীতি বিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রথমদিন সোমবার (৩০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ওই গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

সেখানে তিনি বলেন, ‘দেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোকে গ্রিন ফ্যাক্টরিতে রূপান্তর করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল বিশ্বের যে দশটি তৈরি পোশাক কারখানাকে এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন (এলইইডি) সার্টিফিকেট দিয়েছে তার মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়সহ সাতটিই বাংলাদেশের। আমাদের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো এখন নিরাপদ ও কর্মবান্ধব। এজন্য ব্যবসায়ীরা বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু পোশাকের দাম বাড়েনি বরং ইউরোর অবমূল্যায়নের কারণে দর কম পাওয়া যাচ্ছে। অথচ পণ্য রফতানি বৃদ্ধি পেয়েছে।’

দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অগ্রযাত্রা রোধ করার জন্য অনেকবার চেষ্টা চালানো হয়েছিল উল্লেখ করে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘বিভিন্ন অজুহাতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। ১৯৯০ সালে শিশুশ্রমের অভিযোগ আনা হয়েছিল, ২০০৫ সালে কোটা প্রথা বাতিল করা হয়। বাংলাদেশ সফলভাবে এসব পরিস্থিতি মোকাবেলা করে এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে শতভাগ ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি খাতে সাত শতাংশ এবং বেসরকারি খাতে ৩৫ শতাংশ কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এলডিসিভুক্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ উন্নত বিশ্বের কাছ থেকে ডিউটি ও কোটা ফ্রি রফতানি বাণিজ্য সুবিধা পাওয়ার কথা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অনেক উন্নত দেশ এ সুবিধা দিলেও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে এ সুবিধা দেয় না। ডিউটি দিয়ে বাংলাদেশ সেখানে রফতানি বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বড় বাজার।’

মন্ত্রী বলেন, ‘তৈরি পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। বাংলাদেশ এখন প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রফতানি করছে। এর প্রায় ৮১ ভাগ আসে তৈরি পোশাক রফতানি থেকে। ২০২১ সালে দেশের মোট রফতানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় হাজার কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে তৈরি পোশাক রফতানি থেকে আসবে পাঁচ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। এ কারণেই আমাদের তৈরি পোশাক রফতানির ওপর এত চাপ।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ‘ভিশন-২০২১’ সফল করতে সরকার দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সফলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক রফতানি বাণিজ্যে বাংলাদেশ পেপারলেস ট্রেড করার সক্ষমতা অর্জন করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ এখন লাভজনক স্থান। সরকার ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক জোন গড়ে তুলছে। সরকার আইন প্রণয়ন করে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করেছে। তারা শতভাগ বিনিয়োগ করতে পারবে এবং লাভসহ যেকোনও সময় মূলধন প্রত্যাহার করে নিতে পারবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য সরকার বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ও বাণিজ্য সহযোগিতা দিচ্ছে। বিশ্বের অনেক বিনিয়োগকারী এখন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে এগিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক, সামাজিকসহ সব ক্ষেত্রে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। যারা এক সময় বলতো-বাংলাদেশ তলাবিহীন ঝুড়ি, বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে দরিদ্র দেশের মডেল, বাংলাদেশের উন্নয়ন হলে বিশ্বে আর কোনও দরিদ্র দেশ থাকবে না– আজ তারাই বলছেন বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল। ২০২১ সালে বাংলাদেশ হবে ডিজিটাল মধ্য আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালে হবে উন্নত দেশ। সে লক্ষ্যকে সামনে রেখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।’

ঢাবির ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলামের সভাপতিত্বে বৈঠকে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক। সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। বৈঠকে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলংকা, অস্ট্রেলিয়াসহ ১৩টি দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।