এ প্রসঙ্গে গ্রামীণফোনের হেড অব এক্সটার্নাল কমিউনিকেশনস সৈয়দ তালাত কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা এনবিআরের নোটিশ পেয়েছি। বর্তমানে আমরা নোটিশটি পর্যালোচনা করছি, তাই এই মুহূর্তে এ সম্পর্কে আমাদের পক্ষে মন্তব্য করা সম্ভব নয়।’
এর আগে গ্রামীণ ফোনের কাছে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব ফাঁকির দাবিনামা জারি করে এনবিআর। যদিও এনবিআরের সব দাবির বিরুদ্ধে গ্রামীণফোন মামলা করায় রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি ঝুলে রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে মোট কত টাকা পাওয়া যাবে, তা হিসাব করে বলতে হবে।’
এর আগে গত ২৫ জানুয়ারি কাস্টমস দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বকেয়া রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে এনবিআর চেয়ারম্যান যত্নবান হওয়ার কথা বলেছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ‘আমাদের আপিলাত ট্রাইব্যুনাল, জোনকে অনিষ্পন্ন মামলা দ্রুত নিষ্পন্ন করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সব মামলা নিষ্পত্তি হলে সরকার অতিরিক্ত ৫০ হাজার কোটি টাকা পাবে বলেও জানিয়েছিলেন।’
এদিকে সর্বশেষ গত সোমবার এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট এলটিইউ থেকে দাবি করা হয়েছে, স্থান ও স্থাপনা ভাড়ার বিপরীতে যথাযথভাবে ভ্যাট পরিশোধ না করে গ্রামীণফোন ৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ফাঁকি দিয়েছে। দাবিতে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬ মাসে এই পরিমাণ ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে গ্রামীণফোন স্থান ও স্থাপনার ভাড়া বাবদ ৪৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা পরিশোধ করলেও বাধ্যবাধকতা থাকা ৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ভ্যাট পরিশোধ করেনি। এর আগে এই ভ্যাট পরিশোধের তাগাদা দিয়ে প্রাথমিক দাবিনামা জারি করে গ্রামীণফোনকে শুনানির জন্য ডাকা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি শুনানিতে উপস্থিত না হয়ে লিখিত বক্তব্য দেয়। এরপর আবারও শুনানিতে ডাকা হলে প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কেউ উপস্থিত না হয়েও তাদের পাঠানো লিখিত বক্তব্যই চূড়ান্ত বলে চিঠির মাধ্যমে জানায়। ওই চিঠিতে গ্রামীণফোনের পক্ষে বলা হয়েছে, ভ্যাট আইনের ৩(৩)(ঙ) অনুযায়ী, স্থান ভাড়ার ওপর ভ্যাট স্থানের মালিককে পরিশোধ করতে হবে। গ্রামীণফোনের এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ সেবাকোড এস০০৭৪.০০ অনুযায়ী, স্থান ও স্থাপনা ভাড়াদাতা নয়, বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বৃহৎ করদাতা ইউনিটের একজন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্থান ও স্থাপনা ভাড়ার বিপরীতে ভ্যাট পরিশোধ করা সংক্রান্ত এনবিআরের নির্দেশনা অমান্য করে মোবাইল ফোন কোম্পানি গ্রামীণফোন সাত কোটি টাকারও বেশি পরিমাণ ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘কেবল স্থান ও স্থাপনা ভাড়ার ক্ষেত্রেই নয়, নানাভাবে সরকারকে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকারও বেশি পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে গ্রামীনফোন।’
জানা গেছে, গ্রামীণফোন কোম্পানিটি কেবল রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে তা নয়, এক্ষেত্রে প্রভিশন রাখার নিয়মও ভঙ্গ করছে। এ কারণে এর আগে গত বছরের নভেম্বর মাসে গ্রামীণফোনের কাছে ভ্যাট বাবদ পাওনা ২ হাজার ১৫ কোটি টাকা আদায়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে সহায়তা চেয়ে চিঠি দেয় এনবিআর। চিঠিতে বলা হয়, বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায়ে ট্রাইব্যুনাল, হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে মামলা থাকলেও ভ্যাট পরিশোধে গ্রামীণফোন সাড়া দিচ্ছে না। এর পরিপ্রেক্ষিতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বিএসইসির সহায়তা দরকার।
প্রসঙ্গত, নিয়ম অনুযায়ী রাজস্ব পাওনার বিষয়ে কোম্পানির অ্যাকাউন্টে প্রভিশন রাখতে হয়। কিন্তু তা রাখেনি ফোন কোম্পানিটি। এ কারণে এই মোবাইল অপারেটরের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে বিএসইসির সহায়তা চাওয়া হয়েছে। কারণ, গ্রামীণফোন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি।
জানা গেছে, গ্রাহকের কাছে ভর্তুকি মূল্যে মোবাইল ফোনের সিম বিক্রি করে সেটিকে ব্যবসায়িক খরচ হিসেবে দেখিয়ে মুনাফা কম দেখানোর মাধ্যমে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা আয়কর ফাঁকি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিদ্যমান আয়কর আইন অনুযায়ী, এ ধরনের খরচ ‘ব্যবসায়িক খরচ’ হিসেবে দেখানো যায় না। এ কারণে এনবিআর প্রতিষ্ঠানটির কাছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ফাঁকির অর্থ দাবি করা হলেও প্রতিষ্ঠানটি মামলা করে তা ঝুলিয়ে রেখেছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে মোবাইল ফোনের সিম বিক্রিকে সিম পরিবর্তন হিসেবে দেখানোর মাধ্যমে গ্রামীণ ফোন ১ হাজার ২৩ কোটি টাকা ফাঁকি দিয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে এনবিআর। একই অভিযোগে গত ডিসম্বের মাসে নতুন করে আরও ৩৭৮ কোটি ৯৫ লাখ ৩৭ হাজার ৮২০ টাকা ২২ পয়সা দাবিনামা জারি করেছে এনবিআর। ২০০৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির সরবরাহ করা সিমের ওপর ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক মিলিয়ে ৩৪৮ কোটি টাকা পরিশোধ করেনি। নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ায় সুদযুক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ৪৫৩ কোটি টাকা দাবি করেছে ভ্যাট বিভাগ। এর বাইরে বিধি বহির্ভূতভাবে রেয়াত নেওয়ার মাধ্যমে দুই দফায় যথাক্রমে ১শ কোটি ও ২৯ কোটি টাকা ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, সিম রিপ্লেসমেন্টে (সিম পরিবর্তন) গ্রামীনফোন প্রথম দফায় ১ হাজার ২৩ কোটি ২৩ লাখ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। ২০১২-১৩ অর্থবছর, ২০১৩-১৪ অর্থবছর ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে নতুন সিম কেনার জন্য ৬০০ টাকা হারে পরিশোধ করতে হতো গ্রাহকদের। ওই সময়ে সিম বিক্রিতে মূসক ছিল ৩০০ টাকা। তবে সিম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কোনও ট্যাক্স নেওয়া হতো না। এই সুযোগের অপব্যবহার করে পুরনো সিম নতুন করে বিক্রি করে গ্রামীনফোন। এতে প্রতিষ্ঠানটি ১ হাজার ২৩ কোটি ২৩ লাখ ৩১ হাজার টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেয়।
এর আগে স্থান ও স্থাপনা ভাড়ার ১৯ কোটি ৬ লাখ টাকা, ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে। ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে আরও ১২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ফাঁকি দেয় প্রতিষ্ঠানটি। সর্বশেষ সোমবার নতুন করে আরও ৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ফাঁকির দাবির নোটিশ পাঠিয়েছে এনবিআর। এছাড়া ২০০৬ সালের আগস্ট থেকে ২০০৭ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে সিম ট্যাক্স ৪৫২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, ২০১৩ সালে বিধি-বহির্ভূত রেয়াত বাবদ ২৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা এবং ৯৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা ফাঁকি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।