ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এই বছরে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হলেও ২০২৪ সাল পর্যন্ত সব সুযোগ পাওয়া যাবে। তবে মসৃণ উত্তরণের জন্য জাতিসংঘ তিন বছর পর্যবেক্ষণ করবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সুশাসন যদি না থাকে, তাহলে দেশে স্থিতিশীলতা থাকবে না। সেক্ষেত্রে নীতির গুণগত মান এবং যে সব প্রতিষ্ঠান আমাদের সমাজকে ধরে রাখে সেগুলোয় দুর্বলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। দেশের ভেতরে স্থিতিশীলতা ও ঐক্যবোধ না থাকে, তাহলে উত্তরণকে সুফল হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না।’
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের ঘটনাকে সাম্প্রতিক উন্নয়ন ইতিহাসের একটি অনন্য ঘটনা উল্লেখ করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এর আগে যে সব দেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়েছে, সেগুলো খুব ছোট দেশ ছিল। জনসংখ্যা কম ছিল, উৎপাদনের পরিমাণও কম ছিল।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘বাংলাদেশের এই উত্তরণে সঙ্গে আরও একাধিক উত্তরণ যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ স্বল্প আয়ের দেশ থেকে ইতোমধ্যে বের হয়ে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ এখন এসডিজি বা বৈশ্বিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছে। এখন বাংলাদেশ উন্নত দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এই রকম একটা পর্যায়ে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হওয়াটা এক ধরনের নতুন তরল দেবে।’
বাংলাদেশ রফতানি খাত নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এই রফতানি হচ্ছে একটি মাত্র পণ্যের ওপর ভর করে। সেই ক্ষেত্রে এই রফতানি খাতের শ্রমের উৎপাদনশীলতা সর্ব নিম্ন পর্যায়ে আছে। এটা বিষয়টা চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে।’ দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ‘বাংলাদেশ আগে যে রেয়াতি সুদে ঋণ পেতো, বৈদেশিক সাহায্য পেতো, সেখান থেকে বাংলাদেশ বের হয়ে যাবে। এতে বাংলাদেশকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হবে। এতে ঋণের বোঝা দেশের সাধারণ মানুষকে বহন করতে হতে পারে। বাংলাদেশ যে সব শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পেতো, সেটা বন্ধ হয়ে যাবে। শুল্ক দিয়ে রফতানি করতে হবে। এতে রফতানি ব্যয় বেড়ে যাবে। এ কারণে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। আবহাওয়াজনিত বিভিন্ন প্রতিকুলতা মোকাবিলা করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভৌগলিক ও কৌশলগত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে। এ কারণে বাংলাদেশকে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকে মাথায় রেখে একটি উত্তরণকালীন একটি কৌশল দাড় করানো খুবই গুরুত্বপুর্ণ। এই কৌশলের ভেতরে শুধু পরিসংখ্যানগত বিষয় আছে তা নয়, এর সঙ্গে বাংলাদেশে যে বৈষম্য বাড়ছে, তার সমাধান করতে হবে। নারীর প্রতি বৈষম্য, বিভিন্ন ছোট ছোট জনগোষ্ঠী আছে, সেখানে যে বৈসম্য রয়েছে, তার সমাধানে কৌশল বের করতে হবে। সেটা করা না গেলে এই উত্তরণের সুফল সবাই পাবে না। সবাই সুখী হতে পারবে বলে মনে হয় না।’
রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান নিজেদেরই করতে হবে বলে মন্তব্য করে দেবপ্রিয় বলেন, ‘এই উত্তরণের ফলে টেকসইভাবে মসৃণভাবে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে আগাতে হলে অবশ্য উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। নতুন নতুন শিল্প গড়ে তুলতে হবে। কৃষি খাতে নবায়ন দরকার হবে। আমাদের মানবসম্পদের উন্নয়নের ধারাকে আরও জোরদার করতে হবে। জলবায়ু সংক্রান্ত প্রতিকূলতা মোকাবিলা কতে হবে। রোহিঙ্গা নামক নতুন ধরনের উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধান নিজেদেরই করতে হবে। নতুন ধরনের অর্থায়ন খুজে বের করতে হবে। রফতানি বাজারে আমাদের প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে।’
সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে সংলাপে আরও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, সিপিডির সম্মানীত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রমুখ।