নির্বাচনি বছরে অর্থপাচারের শঙ্কা: এনবিআর-বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কতা জারি

 

এনবিআর-বাংলাদেশ ব্যাংকএকাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পণ্য আমদানির আড়ালে অর্থপাচারের আশঙ্কা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাংলাদেশ ব্যাংক । এমন আশঙ্কা থেকে দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংককে এলসি খোলার ক্ষেত্রে অধিক সতর্ক থাকার জন্য সম্প্রতি নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি  শুল্ক কর্তৃপক্ষকে আরও সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে এনবিআর। সরকারের এই দুই প্রতিষ্ঠান সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় ব্যাংকগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) ও এলসিএ (আমদানি করার অনুমতিপত্র) ইস্যু করতে বলা হয়েছে। আবার শুল্ক কর্তৃপক্ষকেও অ্যাসেসমেন্ট করার সময় বিষয়টি খেয়াল রাখতে নির্দেশনা দিয়েছে এনবিআর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে আমদানিনীতি সঠিকভাবে অনুসরণ করতে হবে। এলসি ইস্যু করার সময় পণ্যটি আমদানি যোগ্য কিনা, এইচএস কোড ও মূল্য কী,  তা সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করতে হবে। এছাড়া এলসি ইস্যু করার সময় প্রকৃত বাজার দর যাচাই করে এলসি ইস্যু করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্বাচনের বছরে হুণ্ডির মাধ্যমে অর্থপাচার বেড়ে যাওয়ার কারণে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বেড়ে গেছে। এ কারণে ব্যাংকগুলোকে এলসি খোলার ক্ষেত্রে অধিক সতর্ক থাকার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘ভুয়া এলসি (ঋণপত্র) অথবা ওভার ইন-ভয়েসের মাধ্যমে যেন কেউ অর্থপাচারের সুযোগ নিতে না পারেন, সে জন্য ব্যাংকগুলোকে বলা হয়েছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) খোলা ও আমদানি ব্যয় বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে। চলতি অর্থবছরে প্রথম সাত মাসেই (জুলাই-জানুয়ারি) এলসি খোলায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৬৬ শতাংশ। আর গত অর্থবছরের একই সময়ে এ প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ১২ শতাংশের মতো। এদিকে, আমদানি ঋণপত্র বাড়ায় এ খাতে খরচও বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এ খাতে আমদানি ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ। কিন্তু রফতানি ও রেমিট্যান্স সে অনুপাতে না বাড়ার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

এদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি কিছু রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী এজেন্ট ও সাব-এজেন্টের মাধ্যমে টাকা ও বিদেশি মুদ্রা ভারতসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করছে। আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করায় অনেকে হুণ্ডির মাধ্যমে অর্থপাচার করছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বিএফআইইউ’র উপদেষ্টা দেবপ্রসাদ দেবনাথ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিদেশে অর্থপাচারের বিষয়ে অনেক দিন ধরে বিএফআইইউ কাজ করছে। নতুন করে এখন বিএফআইইউ’র সঙ্গে এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের গোয়েন্দারাও কাজ শুরু করেছেন।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অর্থপাচার প্রতিরোধে এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংক একসঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ব্যাংকের সন্দেহজনক লেনদেন দুই প্রতিষ্ঠানই খতিয়ে দেখবে।’ তিনি বলেন, ‘সন্দেহজনক আমদানি-রফতানি, লেনদেন, সন্দেহজনক এলসি বা ঋণপত্র খুলে অর্থপাচারের কোনও তথ্য যদি পাওয়া যায়, তাহলে এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংক মিলেই তথ্য আদান-প্রদান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে নানা উপায়ে অর্থপাচার বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অর্থনীতিবিদরাও। তাদের মতে, দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণেও অর্থপাচার বাড়ছে।

এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে যখন ডলারের পতন হচ্ছে, ঠিক ওই সময় বাংলাদেশের বাজারে ডলারের দাম বাড়ছে। এর পেছনে বড় কোনও দুর্বলতা আছে। আমদানির আড়ালে টাকা পাচার হলেও হতে পারে। কারণ, নির্বাচনের বছরে এমনটি হয়।’

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনিশ্চয়তা দেখা দিলে অর্থপাচারের শঙ্কা বাড়ে। আর নির্বাচনের বছর স্বভাবতই অর্থপাচার বেশি হয়।’ তিনি বলেন, ‘বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার হিসেবে দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ৮ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার পাচার হচ্ছে। এর মধ্যে ৮০ ভাগই আমদানি-রফতানিতে মূল্য কারসাজির মাধ্যমে।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘গত বছরই পোশাক শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে তুলা আমদানি ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। যদিও উৎপাদনে তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।  বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক  ও  এনবিআরের খতিয়ে দেখা উচিত। অবশ্য ইতিবাচক দিক হলো—অর্থপাচার রোধে বাংলদেশ ব্যাংক ও এনবিআর একটি যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে।’

এদিকে আমদানির আড়ালে অর্থপাচারের কারণে বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে ও বাজারে ডলার ছেড়েও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। এতে বেড়ে গেছে ডলারের দাম। ব্যাংকগুলো নগদ টাকা দিয়ে প্রতিনিয়ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার কিনছে। এতে একদিকে টাকার ওপর চাপ পড়ছে, অন্যদিকে ডলারের দাম বাড়ায় আমদানি খরচও বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ৩ হাজার ৩৩৬ কোটি ডলার থেকে ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলারে নেমেছে। ডলার-সংকটের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই অর্থবছরে এ পর্যন্ত প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার ডলার বিক্রি করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে একবছরে ডলারের দাম বেড়েছে চার টাকা। গত বছরের মার্চ মাসে এক ডলারের দাম ছিল ৭৮ টাকা, আর এ বছরের মার্চে তা বিক্রি হয়েছে ৮৩ টাকায়। বাংলাদেশ ব্যাংক বৃহস্পতিবার (২৯ মার্চ) ডলার বিক্রি করেছে ৮২ দশমিক ৯৬ টাকায়। দেশের অন্য ব্যাংকগুলো ৮৪ টাকায় ডলার বিক্রি করেছে। কার্ব মার্কেটে দাম আরও চড়া। খোলাবাজারে বৃহস্পতিবার মার্কিন ডলার ৮৫ থেকে ৮৬ টাকায়ও বিক্রি হয়েছে।