২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকেই ফেসবুক, গুগল ও ইউটিউবে দেওয়া বিজ্ঞাপনের ওপর ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর আদায়ে উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। এরই অংশ হিসেবে সোমবার দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে এনবিআরের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া ফেসবুক, গুগলে নজরদারির জন্য ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ের অফিসগুলোকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) কমিশনার মো. মতিউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ফেসবুক, গুগল ও ইউটিউবে দেওয়া বিজ্ঞাপনের ওপর ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) কেটে নেওয়ার জন্য আমরা ব্যাংকগুলোকে চিঠি দিয়েছি। প্রাথমিকভাবে এখন ব্যাংকগুলো ভ্যাট কেটে এনবিআরে জমা দেবে। পরে আমরা ফেসবুক, গুগল ও ইউটিউবকে সরাসরি করের আওতায় নিয়ে আসবো।’ তিনি আরও বলেন, ‘ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে অন্য কোনও চ্যানেলে যাতে বিজ্ঞাপনের অর্থ না যায়, সে ব্যাপারে নজরদারি করা হবে। আর দেশের কেউ বাইরে গিয়ে যদি ফেসবুক, গুগল ও ইউটিউবের বিজ্ঞাপনে অর্থ জমা দেয়, সেটা মানিলন্ডারিং হবে।’
এ প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা মূলত যেসব প্রতিষ্ঠান অনলাইনের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, তাদের কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করব। তবে বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্মগুলো যেন বাংলাদেশে নিবন্ধন নিয়ে কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে ব্যবসা করে, সে ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা আছে।’ ঢাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের হাব অফিস স্থাপনে কাজ চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যেহেতু প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি, সেহেতু বাংলাদেশে এদের নিবন্ধন নিতে হবে। কীভাবে নিবন্ধন হবে, সেটা দেখতে হবে। বিদেশি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আমাদের সঙ্গে এরইমধ্যে যোগাযোগ করেছে।’
গত ৪ এপ্রিল এনবিআরের সম্মেলন কক্ষে সংবাদপত্রশিল্প মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) এবং অ্যাসোসিয়েশন অব টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স (অ্যাটকো) নেতাদের নিয়ে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় ফেসবুক, ইউটিউব এবং গুগলকে করের আওতায় আনার কথা বলেন এনবিআর চেয়ারম্যান। নোয়াব নেতাদের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এ কথা বলেন।
সভায় নোয়াবের সভাপতি ও দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘বিশ্বে সংবাদপত্র পুরনো শিল্প। টেলিভিশন, অনলাইন, ফেসবুক, ইউটিউব, গুগলের কারণে পাঠক হারাচ্ছে সংবাদপত্র। ফলে এ শিল্পের বিজ্ঞাপন থেকে আয় কমছে।’ তিনি সংবাদপত্রের আয় কমে যাওয়ার জন্য উপদ্রব হিসেবে ফেসবুক-ইউটিউবে বিজ্ঞাপন প্রচারকে দায়ী করেন। মতিউর রহমান আরও বলেন, ‘ফেসবুক-ইউটিউবে প্রচারিত বিজ্ঞাপনে সরকারের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। এ নিয়ে আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দিয়েছি। ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ ফেসবুক, ইউটিউব থেকে সুযোগ আদায় করেছে। ফেসবুক, ইউটিউব, গুগল থেকে রাজস্ব আয়ে কমিটি করলে তাতে সহযোগিতা লাগলে আমরা করবো।’ সভায় অ্যাটকোর চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান বলেন, ‘ফেসবুক-ইউটিউবের কারণে দেশের গণমাধ্যম সংকটে পড়েছে। এগুলোকে আইনের মধ্যে নিয়ে এলে সবাই উপকৃত হবে। সংবাদপত্রশিল্প বেঁচে থাকবে।’
এদিকে, দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একজন সদস্যকে আহ্বায়ক করে ২১ সদস্যের ‘ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন টিম’ গঠন করেছে এনবিআর। বৃহস্পতিবার এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত এক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনের লক্ষ্যে বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকে অধিকতর আকৃষ্ট করা তথা ব্যবসাবান্ধব বিনিয়োগ পরিস্থিতি অধিকতর উন্নয়নের লক্ষ্যে বিনিয়োগবান্ধব রাজস্ব নীতি প্রণয়নে সহায়তা বা সুপারিশ প্রদানের উদ্দেশ্যে এ টিম কাজ করবে। এ টিম জাতীয় বাজেট প্রণয়নের প্রাক্কালে বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য এবং অর্থবছরের অন্যান্য সময়ে একই বিষয়ে বিনিয়োগ সহায়ক রাজস্ব নীতি প্রণয়নে সহায়তা করবে। টিমের কাছে শুল্ক-কর, মূসক ও আয়কর বিষয়ক প্রস্তাবনা পর্যালোচনা করে বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য অথবা অর্থবছরের অন্যান্য সময়ে একই বিষয়ে সুপারিশ প্রদান করবে। এ টিম প্রতি তিন মাসে ন্যূনতম একবার সভা করবে। সভার লিখিত প্রস্তাব সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে প্রেরণ করবে। টিম প্রয়োজনে এক বা একাধিক সদস্য কো-অপ্ট করতে পারবে এবং প্রয়োজনে খাতভিত্তিক সংশ্লিষ্ট অংশীজন বা সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি বা বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিকে টিমের সভায় আমন্ত্রণ জানাতে পারবে। এনবিআরের সদস্যকে (কাস্টমস নীতি) এ টিমের আহ্বায়ক করা হয়েছে।