দেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই রাজনৈতিক বিবেচনায় আরও চারটি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দিতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে কমিউনিটি পুলিশ ব্যাংকের চূড়ান্ত অনুমোদন হলেও বাকি তিনটি ব্যাংকের বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম সোমবার রাতে (২৯ অক্টোবর) এই তথ্য জানান।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আজ রাতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ সভায় কমিউনিটি পুলিশ ব্যাংককে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত বাকি তিনটি ব্যাংক দ্য বেঙ্গল ব্যাংক, পিপলস ব্যাংক, দ্য সিটিজেন ব্যাংকের বিষয়ে এখনও অনুমোদনসংক্রান্ত চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।
তিনি আরও জানান, বাকি তিনটি ব্যাংকের মধ্যে বেঙ্গল ব্যাংকের তিন জন পরিচালকের নামে কর সংক্রান্ত মামলা থাকায় সেটি নিষ্পত্তি হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অনুমতি দেওয়া হবে। আর পিপলস ব্যাংকের চেয়ারম্যানের যুক্তরাষ্ট্রে কী পরিমাণ নিট সম্পদ আছে সেটি জানতে চাওয়া হয়েছে। সিটিজেন ব্যাংকের কাগজপত্রে কিছু ত্রুটি আছে সেটি সংশোধন করে নতুন প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়েছে।
জানা গেছে, পর্যায়ক্রমে এই চারটি ব্যাংকেরই লাইসেন্স দেওয়া হবে। বর্তমানে দেশে ৫৮টি তফসিলভুক্ত ব্যাংক রয়েছে। কমিউনিটি পুলিশ ব্যাংক চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ায় এখন তফসিলি ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়ালো ৫৯টিতে। আর বাকি তিনটি ব্যাংক অনুমোদন পেলে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৬২টিতে। এছাড়াও আরও কিছু ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্যও বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন জমা রয়েছে বলেও জানা গেছে।
নতুন অনুমোদন পাওয়া ব্যাংকগুলোর মালিকানায় থাকছেন সরকারের মন্ত্রী,এমপি ও সরকারি দল সমর্থক ব্যবসায়ীরা।
আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদে নয়টি ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এমন সময়ে নতুন চার ব্যাংকের অনুমোদন দিতে যাচ্ছে— যখন পুরো ব্যাংক খাত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। শুধু তাই নয়, এর আগে রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্স পাওয়া নয়টি ব্যাংকের মধ্যে ফারমার্স ব্যাংক দেউলিয়ার পথ থেকে এখনও স্বাভাবিক ধারায় ফেরেনি। অন্য আটটির মধ্যে বেশিরভাগই এখনও খারাপ অবস্থার মধ্যে রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলে আসছেন, অর্থনীতির আকারের তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে ব্যাংক খাতে নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। খোদ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও বলছেন, ‘ব্যাংকিং খাত খুব বেশি বড় হয়ে গেছে।’
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অর্থনীতির প্রয়োজন ছাড়া অন্য কোনও বিবেচনায় নতুন ব্যাংক দেওয়া হলে— তার পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ফারমার্স ব্যাংকের মতোই হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘পুরো ব্যাংক খাত এখন নাজুক অবস্থায় রয়েছে। বেশ কয়েকটি ব্যাংক খারাপ পর্যায়ে চলে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন কোনও ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পক্ষে কোনও যুক্তি নেই।’ আরও চারটি ব্যাংক যুক্ত হলে এই খাতে আরও বিশৃঙ্খলা বাড়তে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাজনৈতিক বিবেচনায় আগের নয়টি ব্যাংক নিয়েই প্রশ্ন আছে। ওই ব্যাংকগুলোর মধ্যে তিনটির অবস্থা খুবই খারাপ। ফারমার্স ব্যাংক এখনও গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে আরও চারটি নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হচ্ছে না।’
এর আগে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পরই নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দিতে উদ্যোগী হয়। শুরুর দিকে আপত্তি থাকলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক পিছু হটে। পরে ফারমার্স ব্যাংকসহ নতুন ৯টি ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার ব্যবস্থা করে সরকার। এরও পরে অবশ্য বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) ‘সীমান্ত ব্যাংক’ নামের আরেকটি ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়। সর্বশেষ গত জুলাই মাসে বিশেষায়িত প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংককে বাণিজ্যিক লেনদেনের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতার কারণেই সম্প্রতি নতুন ব্যাংক দেওয়ার প্রশ্নে বাংলাদেশ ব্যাংক শুরুতে আপত্তি জানিয়েছিল। তবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে আগেও তারা পিছু হটেছে, যার পুনরাবৃত্তি ঘটছে এবারও।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ও ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী— ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার পুরোপুরি এখতিয়ার বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে। কিন্তু নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স পাওয়া সরকারের ইচ্ছের ওপর নির্ভরশীল।
কারা পাচ্ছেন নতুন চার ব্যাংক
কমিউনিটি ব্যাংক অব বাংলাদেশের মালিক হচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ সদস্যরা। পুলিশ সদস্যদের কল্যাণ ফান্ডের টাকায় এই ব্যাংকটি পরিচালিত হবে।
বেঙ্গল ব্যাংকের (বাংলা ব্যাংক) মালিক হচ্ছেন বেঙ্গল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন। তিনি দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সহ-সভাপতি ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মোরশেদ আলমের ভাই।
দ্য সিটিজেন ব্যাংকের মালিক হলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের মা জাহানারা হক।
অন্যদিকে,পিপলস ব্যাংকের প্রধান উদ্যোক্তা চট্টগ্রামের বাসিন্দা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এম এ কাশেম, যিনি যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি।
জানা গেছে, বেশ কিছু শর্তে নতুন ব্যাংকগুলোকে লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে— তিন বছরের মধ্যে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ইস্যু, মোট ঋণ ও অগ্রিমের অন্তত পাঁচ শতাংশ কৃষি ও পল্লিঋণ খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। লাইসেন্স পাওয়ার পর ৪০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন জোগাড় করে কার্যক্রম শুরু করতে পারবে নতুন ব্যাংকগুলো।