এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঈদের সময় ব্যাংক বন্ধ থাকে। এই বন্ধের সময় যেন কোনও দুষ্টচক্র কোনও ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে, সে জন্য ব্যাংকগুলোকে সাইবার নিরাপত্তাসহ সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
ঈদুল-ফিতর উপলক্ষে ঘোষিত ছুটির দিনে ব্যাংকের সব ব্যবসা কেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর সাইবার নিরাপত্তাসহ সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাতে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের প্রতি বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অবশ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সতর্কতা জারির মধ্যেই একটি বিদেশি চক্র ডাচ বাংলা ব্যাংকের বুথ থেকে অভিনব প্রযুক্তি ব্যবহার করে টাকা বুথ থেকে চার লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। যদিও ব্যাংকের সার্ভারে কোনও তথ্য যায়নি। এই ঘটনায় ছয় বিদেশি নাগরিককে আটক করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। আটকরা সবাই ইউক্রেনের নাগরিক।
ব্যাংক কর্মকর্তারা এভাবে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে সাইবার ক্রাইম বলছেন। এ প্রসঙ্গে একটি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সাইবার অপরাধীরা বিভিন্ন ধরনের ছুটির সময়কে বেছে নেয়। তারা সব সময়ই অভিনব প্রযুক্তি ব্যবহার করে টাকা চুরি করার চেষ্টা করে।
সূত্র জানায়, গত শুক্রবার (৩১ মে) রাজধানীর খিলগাঁও এলাকার ডাচ বাংলা ব্যাংকের একটি বুথ থেকে দুই জন বিদেশি নাগরিক তিন লাখ টাকা তুলে নিয়ে যায়। যাওয়ার সময় তারা কিছু টাকা বুথে ফেলে যায়। বিষয়টি বুথের নিরাপত্তারক্ষী ব্যাংক কর্মকর্তাদের জানালে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ দেখেন। সেখানে দুই বিদেশি নাগরিকের টাকা তোলার দৃশ্য দেখা গেলেও ব্যাংকের সার্ভারে এই টাকা তোলার কোনও হিসাব জমা পড়েনি। বিষয়টিতে তাদের সন্দেহ হয়। পরে শনিবারও দুই বিদেশি নাগরিক আবারও একই বুথে টাকা তুলতে যায়। তাদের মুখে মাস্ক ও মাথায় ক্যাপ এবং টাকা তুলতে বেশি সময় নেওয়ার কারণে নিরাপত্তারক্ষী আশপাশের লোকজন ডেকে জড়ো করেন। বিষয়টি টের পেয়ে দুই বিদেশি নাগরিক পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে একজনকে হাতেনাতে আটক করা হয়। পরে আটক ব্যক্তির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হোটেল ওলিও ড্রিম হ্যাভেনে অভিযান চালিয়ে আরও ছয় জনকে আটক করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ছুটির দিনসহ ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর রাতে আকস্মিক ভিত্তিতে কর্মকর্তা দিয়ে শাখা পরিদর্শন করার ব্যবস্থা করতে হবে। ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘোষিত ছুটির দিনগুলোতে ব্যাংকের আইটি সিস্টেম, বিভিন্ন স্থাপনা ও ভল্টের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পালাক্রমে তদারকির ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া ব্যাংকের সব ব্যবসা কেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিকটবর্তী থানা অর্থাৎ পুলিশ স্টেশন, র্যাব অফিস ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বাংলাদেশ ডিজিটালাইজেশন যুগে প্রবেশ করায় অন্যান্য প্রযুক্তির পাশাপাশি আইসিটি প্রযুক্তি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। প্রযুক্তির ক্রমোন্নতির এ ধারায় বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধিত হলেও এতদ্সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি ধীরে ধীরে জটিলতর হচ্ছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আইটি সম্পৃক্ত ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন যথাযথভাবে মেনে চলতেও ব্যাংকগুলোকে বলা হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, দেশের অর্ধেক ব্যাংকই এখনও সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। মোট ব্যাংকের ৫০ ভাগ সাইবার নিরাপত্তায় নেক্সট জেনারেশন ফায়ারওয়্যাল (এনজিএফডব্লিউ) সফটওয়্যার স্থাপনে সক্ষম হয়েছে। বাকি ৫০ শতাংশের মধ্যে ৩৫ শতাংশ ব্যাংকে আংশিক এবং ১৫ শতাংশ ব্যাংকে এটি স্থাপন অনুমোদন পর্যায়ে রয়েছে। ফলে এই ৫০ শতাংশ ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তা বিষয়টি ঝুঁকিতে আছে।