পাইকারি বাজারে কমলেও খুচরা বাজারে পেঁয়াজের কেজি ৯০ টাকা

পেঁয়াজপাইকারি বাজারে কমলেও খুচরা বাজারে এখনও প্রতিকেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৯০ টাকা দরে। রাজধানীর শ্যামবাজার, মৌলভীবাজার ঘুরে জানা গেছে, পাইকারি বাজারে প্রতিকেজি দেশি পেঁয়াজের মূল্য ১০ টাকা কমিয়ে প্রতিকেজি দেশি পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৫৫ টাকা দরে বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু খুচরা বাজারে এর কোনও প্রভাব পড়েনি, উল্টো গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বিক্রি হওয়া ৮০ টাকার পেঁয়াজের মূল্য আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০ টাকা। কারণ ব্যাখ্যা করে খুচরা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, তারা মূল্য বাড়াননি। পাইকারি বাজার থেকে যে দামে কিনে এনেছেন, তার সঙ্গে পরিবহন খরচ যুক্ত করে কিছুটা মুনাফা ধরে তারা বিক্রি করছেন। মূল্য যা বাড়ানোর তা আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা বাড়িয়েছেন। 

এদিকে, রাজধানীতে পেঁয়াজের অন্যতম পাইকারি বাজার হিসেবে পরিচিত শ্যামবাজার পাইকারি ব্যবসায়ী আলতাফ হোসেন বলেন, দেশে পেঁয়াজের কোনও সংকট নেই। সরবরাহ ভালো। পেঁয়াজ পচনশীল হওয়ায় গত কয়েকদিনের আবহাওয়ায় দেশে মজুদ করা পেঁয়াজ অনেকটাই পচে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই লোকসানের ভয়ে আমরা মূল্য কমিয়ে বিক্রি করছি।     

ক্রেতারা বলছেন, খুচরা বাজারে সরকারের মনিটরিং না থাকার কারণে পেঁয়াজের বাজারে এমন নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ভারতের পাশাপাশি মিয়ানমার, তুরস্ক ও মিশর থেকে পেঁয়াজ আমদানির কথা বললেও এখনপর্যন্ত ওই বিষয়ে কোনও সুসংবাদ নেই। অন্যদিকে, গত ১৩ আগস্টের পর ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে হঠাৎ করে পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টিকারী সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের কারসাজি খুঁজে বের করতে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের মাঠে কাজ করার বিষয়ে কোনও অগ্রগতি হয়েছে হয়েছে কিনা, তা জানাতে চায় না কেউ। অন্যদিকে পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল করতে টিসিবি খোলা বাজারে ৪৫ টাকা কেজি দরে আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করলেও তা বাজারে কোনও প্রভাব ফেলেনি।  

এদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পেঁয়াজের মূল্য বাড়ার বিষয়টি নিয়ে গত ১৩ আগস্টের পর থেকে কয়েক দফায় মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাসহ গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলেছেন বাণিজ্য সচিব ড. জাফর আহমেদ। কিন্তু এ বিষয়ে অগ্রগতির যে কোনও তথ্য দিতে নারাজ বাণিজ্য সচিব।

সূত্র জানায়, বর্তমানে বাজারে আমদানি করা ভারতের যে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে, সে পেঁয়াজ অন্তত তিন মাস আগে আমদানি করা। কারণ, আমদানির জন্য এলসি খোলার ১৪ থেকে ২১ দিন পর ওই এলসি নিষ্পত্তি হয়। এলসি নিষ্পত্তির পর পণ্য আসতে সময় লাগে আরও কয়েক দিন। ফলে মিয়ানমার, তুরস্ক বা মিশর থেকে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নিলেও সে পেঁয়াজ দেশে আসতে সময় লাগবে আরও কয়েকদিন।

ভারতে মহারাষ্টের বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে সেদেশে ব্যাপকহারে পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহে ঘাটতি পড়তে পারে এমন আশংকায় রফতানি নিরুৎসাহিত করতে ভারত সরকার গত ১৩ আগস্ট পেঁয়াজের রফতানি মূল্য তিনগুন বাড়িয়ে দেয়। ২৫০ থেকে ৩০০ মার্কিন ডলারে বিক্রি হওয়া প্রতিটন পেঁয়াজের মূল্য ৮৫২ ডলার নির্ধারণ করে দিয়েছে ভারতের কাঁচা পণ্য নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ন্যাপিড। কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে এখনই এর প্রভাব পড়ার কথা নয়। অথচ ২৩ আগস্ট সিদ্ধান্তে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বাংলাদেশে ৫০ টাকা কেজি দরের পেঁয়াজের মূল্য উঠেছে ৭৫ টাকায়। পরবর্তী সময়ে সুযোগ হাতছাড়া না করতে অসাধু ব্যবসায়ীরা নিজেদের মতো করে মূল্য বাড়াতে বাড়াতে এখন তা ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। এখানে একটা সিন্ডিকেট কাজ করছে বলেও জানায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ১৫ সেপ্টেম্বর টিসিবির চেয়ারম্যানকে নিজ দফতরে ডেকে এনে ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে খোলা বাজারে ন্যায্যমূল্যে পেঁয়াজ বিক্রির নির্দেশ দেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্‌শি। কিন্তু টিসিবির কাছে ওই মুহূর্তে কোনও পেঁয়াজ না থাকায়  মাঠে নামতে পারেনি টিসিবি। তবে, তার পরের দিন ১৭ তারিখ থেকে স্বল্পপরিসরে রাজধানীতে পেঁয়াজ বিক্রি কার্যক্রম শুরু করে টিসিবি। কিন্তু এর কোনও প্রভাব বাজারে পড়েনি।

বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন জানিয়েছে, দেশে প্রতিবছর পেঁয়াজের চাহিদা ২৪ লাখ মেট্রিক টন। এ বছর দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে ২৩ লাখ ৭৪ হাচার মেট্রিক টন। কিন্তু প্রতিবছরই উৎপাদিত পেঁয়াজের ৩০ শতাংশ পচে যায়। সে হিসেবে এ বছর সাড়ে সাত লাখ মেট্রিক টন পেঁয়াজের ঘাটতি ধরে সেই ঘাটতি মেটাতে ১০ থেকে ১১ লখ মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে ইতোমধ্যেই ৮ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। 

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্‌শি জানিয়েছেন, ভারতে পেঁয়াজের রফতানি মূল্য বাড়িয়ে দেওয়ার কারণে এখানে এর প্রভাব পড়েছে। তবে দেশে পেঁয়াজের কোনও ঘাটতি নেই। তারপরও ভারতের পাশাপাশি মিশর, তুরস্ক ও মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমদানির পাইপলাইনেও অনেক পেঁয়াজ রয়েছে।’ মূল্য কমে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে চলে আসবে বলেও তিনি আশা করেন।