করোনাভাইরাসের কারণে এখন পর্যন্ত ২৭ জন মারা গেছেন এবং শনাক্ত হয়েছেন ৪২৪ জন। এই পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে কয়েকটি জেলা এবং আক্রান্ত রোগী পাওয়া এলাকা লকডাউন করা হয়েছে। দেশের কাঁচাবাজারগুলোতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব না হওয়ায়, জিনিসপত্রের তুলনামূলক চড়া দাম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার সক্ষমতা না থাকায় অনেক ক্রেতাই সুপার শপমুখী হচ্ছেন।
রাজধানীর ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের মীনা বাজার আউটলেটে ক্রেতা ফরিদা নাসরিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি প্রচলিত বাজারের প্রতি আর আগ্রহী নই। কারণ সেখানে অনেক লোকজন একটি জায়গায় জড়ো হন, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ পাওয়া কষ্টকর। মানসম্মত পণ্য, পণ্যের ধরন ও ছাড়ের কারণে আমি সুপার শপেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।’ তবে ফরিদা নাসরিনের মতে, সুপার শপের ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের জন্য অতিরিক্ত বোঝা। ভ্যাটের কারণেই তিনি সবসময় সুপার শপে যেতে পারেন না।
রাজধানীর বিভিন্ন সুপার শপের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিভিন্ন আউটলেটে তাদের ক্রেতার সংখ্যা বেড়েছে।
নন্দন সুপার শপের ধানমন্ডি আউটলেটের বিক্রয় কর্মকর্তা জানান, ‘বেশিরভাগ মানুষ যারা করোনাভাইরাসের বিষয় সম্পর্কে সচেতন, তারা প্রচলিত বাজারের চেয়ে সুপার শপে আসাই নিরাপদ মনে করছে।’
রাজধানীর বিভিন্ন সুপার শপে সরকারের সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশনা অনুসারে ক্রেতাদের সেবা দিতে দেখা গেছে। একইসঙ্গে ক্রেতাদের স্বাস্থ্যবিধি ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং স্প্রে সুপার শপগুলোই সরবরাহ করছে। সুপার শপগুলোতে ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে এবং নির্ধারিত দামেই পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে।
মীনা বাজারের মিরপুর আউটলেটের গ্রাহক মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সুপার শপের কারণেই প্রয়োজন ও সংকটের এই সময়ে আমরা পর্যাপ্ত সুরক্ষা, স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক দূরত্বের দিকনির্দেশনা বজায় রেখে কমমূল্যেই প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় করতে পারছি। মীনা বাজারের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আমি খুবই সন্তুষ্ট।’ এসময় সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘খাদ্যপণ্যসহ প্রয়োজনীয় সব পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা উচিত, যাতে গ্রাহকরা একটি আউটলেট থেকেই প্রয়োজনীয় সব পণ্য কিনতে পারেন।’
মীনা বাজারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শাহীন খান বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানোর প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করাসহ আমাদের কর্মী ও গ্রাহকদের সুরক্ষায় আমরা সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিয়েছি। মীনা বাজার কর্তৃপক্ষ তার কর্মীদের সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে এবং প্রতিনিয়ত মেঝে এবং পণ্যের তাকগুলো জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করা হচ্ছে। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে মীনা বাজার একসঙ্গে বেশি গ্রাহককে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। ক্রেতাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ইস্যুতে পদক্ষেপ নেওয়ার ফলেই গ্রাহক সংখ্যা বেড়েছে।’
গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়ে একমত পোষণ করে স্বপ্ন সুপার শপের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার সাব্বির হাসান নাসির বলেন, ‘করোনাভাইরাসজনিত লকডাউনের কারণে অনেক সাধারণ মানুষ আমাদের আউটলেটে আসছে। এটা মূলত স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্যই। তবে ভ্যাট সাধারণ মানুষের জন্য সত্যিই বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার যদি জনগণের স্বার্থে ভ্যাট প্রত্যাহার করে, তবে নিম্ন-মধ্য আয়ের মানুষের পক্ষে এটি খুব সহায়ক এবং কম ব্যয়বহুল হবে।’
বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের ফিন্যান্স ডিরেক্টর কাজী রুহুল আমিন বলেন, ‘সুপার শপগুলো সুরক্ষা ও সামাজিক দূরত্ব সম্পর্কিত বিষয়ে আপস করে না। স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই আমরা সুপার শপের ফ্লোরে সার্কেল তৈরি করে দিয়েছি, যাতে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা যায়।’
এসময়, শাকসবজি, মাছ ও অন্যান্য কৃষিজাত পণ্য অবরুদ্ধ এলাকা থেকে যেন রাজধানীতে নির্বিঘ্নে আসতে পারে তার ব্যবস্থা করতে সরকারের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুসারে, দেশে সুপার শপের প্রায় ৩০০ আউটলেট রয়েছে এবং তাদের বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। অ্যাসোসিয়েশন ইতোমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বিক্রয়ের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছে। কারণ তারা মনে করেন, এই ব্যবস্থা গ্রাহকদের সংকটের সময়কালে তাদের ব্যয় কমাতে সহায়তা করবে। বর্তমানে সব কেনাকাটায় গ্রাহককে ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হচ্ছে।
তবে এনবিআর সদস্য (ভ্যাট) মো. জামাল হোসেন বলেন, এখনই বাণিজ্যিক ভ্যাট হ্রাস বা স্থগিত করার কোনও পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, ‘সরকারের মোট ভ্যাট রাজস্বের মাত্র ৫ শতাংশ আসে সুপার শপসহ বাণিজ্যিক ভ্যাট থেকে। এনবিআর সুপার শপ থেকে আদায় করা ভ্যাটের আলাদা হিসাব রাখে না। তবে এর পরিমাণ বাৎসরিক ২০০ কোটি টাকার বেশি হবে না।’