বায়িং হাউজে ভালো বেতনের চাকরি করতেন আমজাদ হোসেন। এপ্রিলে লকডাউনের সময় চলে যান সিরাজগঞ্জের গ্রামের বাড়ি। লকডাউন শেষে যোগাযোগ করে জানতে পারেন তার চাকরি নেই। করোনার কারণে অন্য প্রতিষ্ঠানে চেষ্টা করেও মেলেনি চাকরি। বাধ্য হয়ে এলাকায় ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করেন। বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দীর্ঘ ১০ বছর চাকরি করা প্রতিষ্ঠান তাকে ছাঁটাই করেছে। এমনকি মার্চে কাজ করলেও পাননি বেতন। অফিসে যাদের বেতন বেশি ছিল, তাদের সবাইকে করোনার কারণ দেখিয়ে বাদ দেওয়া হয়েছে। পরের কয়েক মাস চেষ্টা করেও কোথাও চাকরি পাননি। বাধ্য হয়ে এলাকায় অল্পপুঁজির ব্যবসা শুরু করেন। এখন তাতেই কোনোরকম দিন যাচ্ছে আমজাদ হোসেনের।
পৌরসভা থেকে ট্রেড লাইসেন্স করে স্টেশনারির দোকান দিয়েছিলেন আমজাদ। কেমন চলছে বেচাকেনা? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এখন বেচা-কেনা হচ্ছে। তবে স্কুল-কলেজ চালু হলে আরও বাড়বে।
করোনায় ঢাকার একটি গার্মেন্ট কারখানা থেকে চাকরি হারানো পাবনার ভাঙ্গুড়ার সোহেল রানা বলেন, চাকরি হারিয়েই তিনি শুরু করেছেন মাছের ব্যবসা। ভোরে আড়ত থেকে মাছ কিনে এলাকার বাজারে বিক্রি করছেন। আগের চেয়ে তার আয় বেড়েছে বলেও জানান তিনি।
ঢাকার একটি গার্মেন্ট কারখানায় চাকরি করতেন মাসুদ রানা। লকডাউন চলাকালে বাড়িতে চলে আসার পর চাকরিটা আর ফিরে পাননি। এখন রাজধানীর মানিকনগর এলাকায় নিজেই দিয়েছেন মুদি দোকান। ‘চাকরি খুঁজেছি অনেক। বাধ্য হয়ে দোকান দিয়েছি। পুঁজি কম। তাই বেচাকেনাও কম।’ জানালেন মাসুদ।
অবশ্য গার্মেন্ট মালিকরা বলছেন, গার্মেন্টস থেকে যারা চাকরি হারিয়েছেন, তাদের আবার চাকরি দেওয়া হচ্ছে। বিকেএমইএর সহ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যেসব কারখানা বন্ধ হয়েছে, সেসব কারখানার শ্রমিকরা চাকরি হারিয়েছে সত্যি। তবে অনেকেই আবার অন্য কারখানায় নিয়োগ পেয়েছেন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) এক যৌথ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির প্রভাবে বাংলাদেশের প্রায় ১৭ লাখ তরুণ কাজ হারিয়েছে। ‘ট্যাকলিং দ্য কোভিড-১৯ ইয়ুথ এমপ্লয়মেন্ট ক্রাইসিস ইন এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি গত আগস্টে প্রকাশ হয়।
অন্যদিকে বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, করোনার তাণ্ডবে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের ৬৬ শতাংশ মানুষ আর গ্রামাঞ্চলের ৪১ শতাংশ মানুষ তাদের চাকরি হারিয়েছেন। শহরাঞ্চলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মহীন হয়েছে ঢাকায়। ‘লুজিং লাইভলিহুডস: দ্য লেবার মার্কেট ইম্প্যাক্টস অব কোভিড-১৯ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি কর্মক্ষেত্রে করোনার নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে জানার জন্য গত ১০ জুন থেকে ১০ জুলাই ফোনকলের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে তৈরি করা হয়েছে। তবে এ প্রতিবেদন তৈরিতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ ‘হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার’ জরিপের ফলাফলও বিশ্লেষণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, শহরাঞ্চলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ কর্মহীন হয়েছে ঢাকায়। এখানে ৭৪ শতাংশ মানুষে তাদের চাকরি হারিয়েছেন। ঢাকা বিভাগের গ্রামাঞ্চলের ৪৫ শতাংশ মানুষ কর্মচ্যুত হয়েছেন এই করোনায়। গ্রামাঞ্চলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মহীন হয়েছে বরিশাল বিভাগে। এখানে চাকরি হারিয়েছেন ৪৭ শতাংশ চাকরিজীবী। এই বিভাগের শহর এলাকার চাকরি হারিয়েছেন ৫৪ ভাগ।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, করোনায় চট্টগ্রাম বিভাগের শহর এলাকার ৬৩ শতাংশ ও গ্রামাঞ্চলের ৪৪ শতাংশ; খুলনা বিভাগের শহরের ৫৯ ও গ্রামাঞ্চলে ৩৯ শতাংশ; রাজশাহী বিভাগের শহরে ৬১ শতাংশ ও গ্রামের ৩৫ শতাংশ; রংপুরে যথাক্রমে ৫৮ ও ৩৭ শতাংশ এবং সিলেটে যথাক্রমে ৬৬ ও ৩৯ শতাংশ কর্মজীবী মানুষ কাজ হারিয়েছে।
আইএলও ও এডিবি’র যৌথ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, করোনা ও লকডাউনের কারণে বাংলাদেশে স্বল্পমেয়াদে চাকরি হারিয়েছেন ১১ লাখ ১৭ হাজার তরুণ। দীর্ঘমেয়াদে তা বেড়ে ১৭ লাখ ৭৫ হাজারে দাঁড়িয়েছে।
তরুণদের চাকরি হারানোর সাতটি খাত চিহ্নিত করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এর মধ্যে কৃষি খাতে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ, খুচরা বাণিজ্য খাতে ১২ দশমিক এক শতাংশ, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট খাতে দুই দশমিক ছয় শতাংশ, অভ্যন্তরীণ পরিবহন সেবা খাতে সাত দশমিক চার শতাংশ, নির্মাণ খাতে ১২ দশমিক আট শতাংশ, টেক্সটাইল খাতে ১৩ দশমিক ছয় শতাংশ ও অন্যান্য সেবা খাতে চাকরি হারিয়েছেন চার দশমিক পাঁচ শতাংশ।
এদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা বলছে, করোনার কারণে দেশে চাকরি হারিয়েছে মোট দেড় কোটি মানুষ। অন্যদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি বলছে, করোনার কারণে ৮০ শতাংশ যুবকের আয় কমে গেছে।
এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, অনেকেই ভিন্ন পথ বেছে নিচ্ছেন। এদের মধ্যে অনেকে ছোট উদ্যোক্তা হচ্ছেন, এটা ভালো দিক। পরের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে যারা নিজেরা কিছু করার চেষ্টা করছেন তাদেরকে সরকারিভাবে সহায়তা দেওয়া দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জানা গেছে, করোনাকালে চাকরি হারিয়ে বিদেশ থেকে কর্মী ফেরত আসার ঢল থামছে না। প্রতি মাসেই এমন ফিরে আসা কর্মীর সংখ্যা বাড়ছে। অক্টোবর মাসে ফেরত এসেছেন ৮০ হাজার ৭৮২ জন। সেপ্টেম্বরে এসেছিলেন ৭০ হাজার ৫৯৬ জন। গত ১ এপ্রিল থেকে সাত মাসে দেশে এসেছেন দুই লাখ ৪৫ হাজার ৭৯০ জন।