আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে বেড়েছে সয়াবিন তেলের দাম। কারণ ছাড়াই বেড়েছে মসুর ডালের দাম। নতুন চাল উঠতে শুরু করেছে। তাই বলে দাম কমার লক্ষণ নেই। উল্টো বেড়েছে। ভরা মৌসুমেও সহনীয় পর্যায়ে আসছে না রসুন ও পেঁয়াজের দাম। নিত্যপণ্যের মূল্য সহনীয় রাখতে ও অস্বাভাবিক মজুদ ঠেকাতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নতুন করে ১৪টি মনিটরিং টিম গঠন করা হলেও সেগেুলো পুরোপুরি অকার্যকর। নানা অজুহাতে কাজ করছে না কমিটিগুলো।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে সরকারি মনিটরিং না থাকার সুযোগে অসৎ ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট যুগ্মসচিব সদর আলী বিশ্বাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, বাজার স্থিতিশীল। দাম সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। তাই ওইভাবে আর মনিটরিংয়ের প্রয়োজন পড়ে না।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, মনিটরিং টিম পরিচালনার জন্য ম্যাজিস্ট্রেট, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন ও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের প্রয়োজন হয়। কিন্তু অনেক সময় প্রয়োজনীয় ম্যাজিস্ট্রেট পাওয়া যায় না। ম্যাজিস্ট্রেট থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন পাওয়া যায় না। এ কারণে নিয়মিত মনিটরিং করা সম্ভব হয় না।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছরই বাজার মনিটরিংয়ের জন্য দুই দফা ১৪টি কমিটি করা হয়। উপসচিব পদ মর্যাদার একজন কর্মকর্তার নেতৃত্বে প্রতিটি কমিটির ছয় মাস করে বাজারে মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পালন করার কথা। প্রতিটি কমিটিতেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, ঢাকা জেলা প্রশাসন, ঢাকা সিটি করপোরেশন, এফবিসিসিআই, বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশিন, ও ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত থাকেন। জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সারা বছরের জন্য গঠিত ১৪টি মনিটরিং টিম গঠিত হলেও টিমগুলো মূলত কাজ করে রোজার সময়।
বর্তমানে কার্যকর ১৪টি মনিটরিং কমিটি করা হয়েছে ২২ ডিসেম্বর। ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া এ কমিটির মেয়াদ ৩০ জুন পর্যন্ত। ১৪টি মনিটরিং কমিটিতে প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব আবদুছ ছাত্তার শেখ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য পরামর্শক এ কে এম মাহমুদুল হাসান খান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব কামরুল ইসলাম চৌধুরী, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) উপ পরিচালক বেগম সাদিয়া হক, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোহম্মদ মাহবুবুর রহমান পাটোয়ারী, বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের উপ প্রধান বেলাল হোসেন মোল্লা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মো. যোবায়দুর রহমান, বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের সিনিয়র সহকারী প্রধান ইউসুফ আলী মজুমদার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মো. শহীদুল ইসলাম, ইপিবির সহকারী পরিচালক এ কে এম ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের পরিচালক বেগম লায়লাতুন ফেরদৌস, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) সিও মো. আক্তার হোসেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উপ-প্রধান মো. মোসলেহ উদ্দিন ও টিসিবির সিও আছির উদ্দিন সরকার।
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘অতীতের যে কোনও সময়ের তুলনায় বাজার স্থিতিশীল। নিত্যপণ্যের দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই রয়েছে। বাজার অস্থির হলে অবশ্যই মনিটরিং শুরু হবে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।’
সাংবাদিকদের উদ্দেশ করে মন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা লিখে লিখে বাজার অস্থির করে দেবেন না।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যে কোনও পণ্যের মজুদ শেষ হলে, সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। সিজন শেষ হয়ে যাওয়ায় মসুর ডাল ও পেঁয়াজের দাম বেড়েছিল। এটা সাময়িক।
এদিকে চালের মূল্য বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বাবুবাজার-বাদামতলী চাল আড়ৎদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, দেশে চালের মোকাম বলে খ্যাত উত্তরবঙ্গে প্রচণ্ড শীত। শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ঘন কুয়াশায় ট্রাক চলছে না। তাই সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি আছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম কমলেও দেশীয় বাজারে কেন বেড়েছে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্রে কারও কারসাজি থাকলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ১০ টাকা করে বেড়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে হঠাৎ করে দাম বাড়ায় খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতা এবং কোম্পানির কর্মকর্তারা একে অন্যকে দোষারোপ করছেন।
জানুয়ারিতে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের কমোডিটি মার্কেট আউটলুকেও ভোজ্যতেলের দাম কমেছে বলে উল্লেখ করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজার বিষয়ক ওয়েবসাইট ইনডেক্স মুন্ডির তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের মধ্যে নভেম্বরে দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে ছিল। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিন ১ হাজার ২৫৭ ডলারে লেনদেন হলেও গত নভেম্বরে তা ৬১৪ ডলারে নেমে এসেছে। এর পরেও বেড়েছে দাম। কারণ জানতে চাইলে সিটি গ্রুপের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করেই দাম বাড়ানো-কমানো হয়। মিলগেট পর্যায়ে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হয়নি।
ভোজ্যতেলের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা এবং ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে চলতি সপ্তাহে একটি কমিটি গঠন করবে বলে জানা গেছে। মূল্য পর্যালোচনা করে কমিটি শিগগিরই প্রতিবেদন দেবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন বলেন, ভোজ্যতেলের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
কাওরানবাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাজধানীর বাজারে গত এক সপ্তাহ ধরে খুচরায় প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন ৮৮ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগের সপ্তাহে এ মূল্য ছিল ৭৮ থেকে ৮০ টাকা। দু'সপ্তাহ আগে বিক্রি হয়েছে ৭৫ থেকে ৭৬ টাকায়। তবে এ সময় বোতলজাত সয়াবিনের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। প্রতি লিটার ৯৫ থেকে ১০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
/এসআই/এফএ/