প্রশাসন ক্যাডারের আধিপত্য বজায় রাখতে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদিত প্রস্তাবগুলো নতুন পে-স্কেলের গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। এজন্য সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজনসহ প্রভাবশালী ৫ সচিবকে দায়ী করছেন বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। তবে, ইস্যুটি স্পর্শকাতর বলে অনেকেই মুখ খুলতে চান না। এদিকে, সরকারি চাকরিতে প্রথম শ্রেণির প্রবেশ পদে ক্যাডারদের মতো ননক্যাডারদের ৮ম গ্রেডে বেতন-ভাতার সুযোগ দেওয়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেল-টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড ছাড়াই শিক্ষকদের পদমর্যাদা ও সুবিধা বহাল রাখার আন্দোলন নিরসনের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ উদ্দেশ্যে ঘোষিত পে-স্কেলে কিছুটা সংশোধন আনা হতে পাতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বেতনবৈষম্য নিয়ে সৃষ্ট সংকট নিরসনে নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে তিন সচিবকে নিয়ে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, যারা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদিত অংশ বাদ দিয়ে গেজেট প্রকাশ করেছেন, তাদের দিয়েই আবার এই কমিটি করা হয়েছে। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের কোর কমিটিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ রয়েছেন। সরকারের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে বিষয়টির একটি সম্মানজনক সমাধান হবে। কোনও অসন্তোষ থাকবে না।
সূত্র জানায়, সচিবদের একক ক্ষমতা বহাল রাখতে পে-স্কেলের ১ নম্বর গ্রেডে মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত কোনও প্রতিষ্ঠানের প্রধান যদি প্রশাসন ক্যাডারের না হন সেক্ষেত্রে তাকে যদি গ্রেড-১ মর্যাদা (সচিবের মর্যাদা) দেওয়া হয়, তাহলে তাদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা যেন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের কাছেই থাকে। সে বিষয়টির দিকেও নজর রাখা হচ্ছে। সে লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে একটি কমিটি করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করা হতে পারে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী এপ্রিলের মধ্যে বিভিন্ন পেশাজীবীর বেতন বৈষম্যের নিরসন হবে। টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড তুলে দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ক্যাডারদের পদোন্নতি নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তারও সমাধান হবে। নতুন পদ সৃষ্টি না করেই পুরনো পদ সমন্বয়ের মাধ্যমে সৃষ্ট সংকট দূর করার পাশাপাশি পদোন্নতির বিষয়টিও স্পষ্ট করা হবে। এ ক্ষেত্রে ২৬টি ক্যাডারের কয়েকটি পদকে আপগ্রেড করে গ্রেড-১ এবং গ্রেড-২-এর পদ বাড়ানো হতে পারে। পাশাপাশি ক্যাডার-নন ক্যাডারদের এন্ট্রি পদের বেতন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার নিরসন হবে। যদিও সদ্যঘোষিত পে-স্কেলে বেতন বৈষম্য দূর করার দাবিতে সম্প্রতি বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের কর্মসূচি চলছে। শিক্ষক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, চিকিৎসক এবং ২৬টি বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তারা ছাড়াও ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্দোলন করছেন।
জানা গেছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১ হাজার ৪০০ প্রকৌশলী পে-স্কেল নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে। তাদের পদোন্নতির পথ বন্ধ হয়ে গেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একাধিক ক্যাডারের মধ্যে বৈজ্ঞানিকও রয়েছেন। নতুন পে-স্কেলে তাদের পদোন্নতিতেও সমস্যা সৃষ্টি হবে বলে তারা দাবি করেছেন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অধিদফতরের প্রধানদের গ্রেড-১ দেওয়ায় সচিবদের আলাদা মর্যাদা দেওয়ার দাবি করেছেন অনেক সচিব। এ ছাড়া, শিক্ষকদের দাবি তো রয়েছেই।
অভিযোগ উঠেছে, অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত ও প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদিত পে-স্কেলের সারসংক্ষেপে টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের পরিবর্তে নতুন দুটি প্রস্তাবনা ছিল। কিন্তু ১৫ ডিসেম্বর জারি করা পে-স্কেলের গেজেটে সেটি সংযোজন করা হয়নি। প্রশাসন ক্যাডারের আধিপত্য বজায় রাখতেই সার সংক্ষেপ থেকে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদিত এ অংশটি বাদ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের স্থলে নতুন দুটি প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। এর একটি হচ্ছে, চাকরির ১০ ও ১৬ বছরে দুটি স্বয়ংক্রিয় পদোন্নতি। অন্যটি হচ্ছে, আট ধাপে গ্রেড পরিবর্তন পদ্ধতি। সেটি ভেটিংও হয়। কিন্তু অর্থ বিভাগ গেজেট প্রকাশ করে অন্য একটি ফাইলের, যেখানে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর দ্বিতীয় সুপারিশের আট ধাপ থেকে গ্রেড পরিবর্তন পদ্ধতিকে বাদ দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রীর জন্য তৈরি করা অর্থমন্ত্রীর বিকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, নবম গ্রেড থেকে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে (চতুর্থ গ্রেড পর্যন্ত) পদোন্নতি হবে চাকরিকাল পূর্ণ ও সন্তোষজনক কাজ করার শর্তে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। এতে কাউকে কোনও ধরনের তদবিরও করতে হবে না। অর্থাৎ চাকরির মেয়াদ ১০ বছর পূর্ণ হলে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে প্রথম পদোন্নতি এবং ১৬ বছর পূর্ণ হলে দ্বিতীয় পদোন্নতি পেয়ে উচ্চতর গ্রেডে যাবেন নবম গ্রেডের নিচের কর্মকর্তারা, যা বেতন কাঠামোয় রাখা হয়েছে। এছাড়া, আট ধাপে গ্রেড পরিবর্তন পদ্ধতিটা ছিল, নবম থেকে অষ্টম গ্রেডে পদোন্নতি পেতে হলে চাকরির তিন বছর পূর্ণ করতে হবে। একইভাবে অষ্টম থেকে সপ্তম গ্রেডে পদোন্নতি পেতে হলে চার বছর, ষষ্ঠ গ্রেড পেতে হলে পাঁচ বছর, পঞ্চম গ্রেডের জন্য ১০ বছর, চতুর্থ গ্রেডের জন্য ১২ বছর, তৃতীয় গ্রেডের জন্য ১৪ বছর, দ্বিতীয় গ্রেডের জন্য ১৭ বছর এবং প্রথম গ্রেডে পদোন্নতি পেতে হলে ২০ বছর চাকরি পূর্ণ করতে হবে। এ দুটি পদ্ধতির মাধ্যমে প্রশাসনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীই গ্রেড পরিবর্তনের পাশাপাশি আর্থিকভাবে লাভবান হতেন। টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাদ দেওয়ার ফলে অনেকেই শুধু পদোন্নতি নয়, উচ্চতর বেতন থেকেও বঞ্চিত হবেন। যদিও এটি কাম্য নয়, যা প্রধানমন্ত্রীকে অর্থমন্ত্রী বুঝিয়েছিলেন। এ কারণেই তিনি টাইমস্কেল ও সেলেকসন গ্রেডের বিকল্প ফর্মুলা বের করে তাতে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি নিয়েছিলেন। এ প্রস্তাব নিয়ে অর্থমন্ত্রী ১৮ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথাও বলেছিলেন বলে জানা গেছে। এরপর ২২ নভেম্বর আবুল মাল আবদুল মুহিত ফর্মুলাটি লিখিতভাবে সারসংক্ষেপ আকারে শেখ হাসিনার কাছে পাঠান। তাতে প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষর করেন ২৭ নভেম্বর। ২৯ নভেম্বর তা অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। ৩০ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের কপি পেয়েই অর্থমন্ত্রী তা বাস্তবায়নের জন্য অর্থসচিবের কাছে পাঠান। বিষয়টি আইনমন্ত্রী আনিসুল হককেও জানানো হয়েছে। অথচ ১৪ ডিসেম্বর রাতে পে-স্কেলের জারি করা প্রজ্ঞাপনে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর স্বাক্ষরিত সিদ্ধান্তটি প্রতিফলিত হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। অর্থাৎ বেতন কাঠামোর গেজেটে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর বিকল্প প্রস্তাবের প্রথমটি স্বয়ংক্রিয় পদোন্নতি রাখা হলেও দ্বিতীয় প্রস্তাব অর্থাৎ আট ধাপে গ্রেড পরিবর্তন পদ্ধতি রাখা হয়নি। জানা গেছে, ১০ জন সিনিয়র সচিব উচ্চহারে বেতন পাচ্ছেন। একজন শিক্ষক এবং একজন বিচারককে সমমানের পদ দেওয়ার প্রস্তাব ছিল অর্থমন্ত্রীর। মুহিতের প্রস্তাব ছিল জাতীয় অধ্যাপকদের সিনিয়র সচিবের সমান বেতন দেওয়ার। কিন্তু সেটিও গেজেটে প্রতিফলিত হয়নি।
এটি রুলস অব বিজনেস, বাংলাদেশের সংবিধান এবং বাংলাদেশ সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০১৪ লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব সা’দত হুসেইন। তিনি বলেন, এটি যদি হয়েই থাকে, তা হলে তা হবে অপরাধ।
জানা গেছে, এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে পে-স্কেল সংক্রান্ত আলোচনায় বলেছেন, ‘আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক ভেটিং করা কপি জারি না করে ভিন্ন কিছু জারি করা হয়েছে, যেটি আমার জানা নেই। এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, এটি খুবই দুঃখজনক যে শত যাচাই-বাছাই করে গেজেট প্রকাশের পরও বেতন কাঠামো নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।
তবে, এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মনিন্দ্র নাথ রায় বলেন, সব রীতিনীতি অনুসরণ করেই যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে জাতীয় বেতন স্কেলের গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। এখানে কোনও তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। কোনও তথ্য গোপন বা ভুল তথ্য পরিবেশন করারও কোনও সুযোগ নেই। তিনি বলেন, জাতীয় পে-স্কেল-২০১৫ এবং সার্ভিস ম্যাটার সংক্রান্ত কতিপর বিষয় বিবেচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হলে তিনি ২টি বিষয় অনুমোদন দেন। আর ২টি বিষয় অনুশাসন প্রদান করেন। যে দুটি বিষয় প্রধানমন্ত্রী অনুশাসনের জন্য পাঠিয়েছেন, তা তিনি অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মতো সে বিষয় দুটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। বিষয় দুটি সার্ভিস ম্যাটার সংক্রান্ত। যা এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি। কাজেই এ দুটি বিষয় গোপন করে গেজেট প্রকাশের অভিযোগ ভিত্তিহীন।
/এমএনএইচ/টিএন/