প্রতিবেদনটি হাতে পাওয়ার পর খোঁজ নেওয়া হয়, চাকরি হারানো কামাল উদ্দিন জমাদারের। ব্যাংকে উল্লেখ করা রাজধানী ঢাকার ১৪১/এ/১ মহাখালীর ঠিকানায় তাকে পাওয়া যায়নি। তবে অগ্রণী ব্যাংকে চাকরি করা তার এক সহকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চাকরি হারানোর আগেও পাওনাদারের ভয়ে তিনি পালিয়ে বেড়াতেন। সহকর্মীদের অনেকেই তাকে এড়িয়ে চলতেন। চাকরি চলে যাওয়ার পর তার কোনও খবর পাওয়া যায়নি। অগ্রণী ব্যাংকে চাকরি পাওয়ার পর থেকেই ঢাকায় একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় ঋণ জালিয়াতি হতে পারে। তবে, এই জালিয়াতির প্রভাব কিছুটা কমেছে। কমার কারণ, অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা। ‘ছোট অপরাধের বড় শাস্তি, বড় অপরাধে কম শাস্তি’ প্রসঙ্গটি তিনি এড়িয়ে যান। তবে, তিনি বলেন, অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় অধিকাংশ ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এতে অপরাধ করার প্রবণতা কিছুটা হলেও কমেছে।
ওই প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ছোটখাটো অপরাধের কারণে অনেক কর্মর্কতা চাকরি হারালেও শত-শত কোটি টাকার অনিয়মে জড়িত থাকার পরও রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকে অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই চিত্র রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকের।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় সুশাসনের অভাব থাকার কারণেই এই অবস্থা হয়েছে। সেখানে বড় বড় অপরাধীর শাস্তি হয় না, ছোটছোট অপরাধ করায় চাকরি যায়। বাংলাদেশে এটাই এখন হচ্ছে, উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই খাতে স্বচ্ছতা না থাকা ও জবাবদিহিতা না থাকার কারণে এই অবস্থা হয়েছে। তিনি বলেন, এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও কঠোর হতে হবে। না হলে এই রোগ বেসরকারি ব্যাংকেও ছড়িয়ে পড়বে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা অনিয়ম করায় অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার ইসহাক মিয়াকে শাস্তি হিসেবে প্রশাসনিক সতর্কীকরণ করা হয়েছে। আবার ৫০ কোটি টাকার ঋণে অনিয়ম করার অপরাধে একই শাস্তি পেয়েছেন মোর্তুজা আলী ও আনোয়ারুল আজিম। ১০ কোটি ৬১ লাখ টাকার অনিয়ম করার কারণে এম মতিউল কবিরকে ২টি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করা হয়েছে। একইভাবে ১৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা ঋণ বিতরণে অনিয়ম করায় রফিকুল আলম সরকারকে ১টি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করা হয়েছে। যদিও মাত্র ২৬ হাজার ৫০০ টাকা আত্মসাৎ করায় চাকরি হারিয়েছেন অগ্রণী ব্যাংকের দেলোয়ার হোসেন ভুঁইয়া। ৩৯ হাজার টাকা আত্মসাৎ করায় চাকরি হারিয়েছেন শফিউল হাসান চিশতি। আবার ৫০ হাজার টাকা চুরির অপচেষ্টা করায় রহমত আলীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তত্ত্ববধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রভাবশালীদের কারণে অধিকাংশ ঋণ অনিয়ম হয়ে থাকে। এ কারণে নিরপেক্ষভাবে দেখা উচিত। প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে ব্যাংক খাতে অনিয়ম কমে আসবে। সুশাসনও বাড়বে।
রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের তৈরি করা এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১০ সাল থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে চার ব্যাংকে চাকরিচ্যুত হয়েছেন সাড়ে ৭শ কর্মকর্তা। এর মধ্যে প্রায় ৫ শ কর্মকর্তার চাকরি চলে যাওয়ার জন্য `অননুমোদিত অনুপস্থিতি’কে কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বাইরে, শুধু ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে অগ্রণী ব্যাংকের ১০০ জনেরও বেশি কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৫ সালেই ৩৩ জনকে অপসারণ করা হয়েছে। অননুমোদিত অনুপস্থিতির কারণে চাকরি গেছে ১৫০ জন কর্মকর্তার। সোনালী ব্যাংক থেকে ৫ বছরে চাকরি গেছে ১৮০ জনের। এর মধ্যে অননুমোদিত অনুপস্থিতির কারণে চাকরি গেছে ১৫৫ জন কর্মকর্তার। জনতা ব্যাংকে ৫ বছরে ২০০ জনেরও বেশি ব্যাংক কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এর মধ্যে `অননুমোদিত অনুপস্থিতির কারণে চাকরি গেছে ১৪২ জন কর্মকর্তার। রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকে’ অননুমোদিত অনুপস্থিতির কারণে চাকরি গেছে ১০০ জন কর্মকর্তার। এর মধ্যে ৩১ জনের চাকরি গেছে ২০১৫ সালে।
এ প্রসঙ্গে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রদীপ কুমার দত্ত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, যেসব কর্মকর্তা অনিয়ম ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত কেবল তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যেকোনও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে তার অপরাধসংক্রান্ত এক বা একাধিক তদন্ত কমিটি হয়। সেই কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে চাকরিচ্যুত বা যেকোনও ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়। তিনি বলেন, আগের চেয়ে সোনালী ব্যাংকে অপরাধ প্রবণতা কমে এসেছে। এর কারণ সোনালী ব্যাংকে আগের চেয়ে সুশাসন বেড়েছে।
প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ঋণ কেলেঙ্ককারির সঙ্গে জড়িত থাকার চেয়েও গ্রাহকের সঙ্গে র্দুব্যবহার, পদোন্নতি প্রত্যাখ্যান, সিকিউরিটি স্টেশনারী হারানো, জিএমের সঙ্গে অসৌজন্যমুলক ব্যবহার, টাকা চুরের চেষ্টা, অসদাচরণ, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ব্যাংকের কাগজপত্র সরানো, দায়িত্ব কর্তব্যে অবহেলা, ধার দেনা করা, কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করাকে বড় অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। আর এই ধরনের অপরাধে জড়িত থাকায় অনেকেই ব্যাংকের চাকরি হারিয়েছেন। তবে, অনেকেই অনৈতিক কাজে লিপ্ত থাকা, নিয়মবহির্ভুত সাসপেন্স হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন, অবৈধ লেনদেন, ব্যাংকে বন্ধকীকৃত সম্পত্তি অন্যত্র বিক্রি করে দেওয়া, গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের চেষ্টা, ঋণ প্রতারণা করার অপরাধে চাকরি হারিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারপ্রেস নেটওয়ার্কের (আইপিএন) সিনিয়র গবেষক আনোয়ারুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো এখনও প্রভাবশালীদের সুবিধা দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যে সব কর্মকর্তা প্রভাবশালীদের সহযোগিতা করতে পারছে, তাদের কোনও সমস্যা হচ্ছে না। বরং যে সব কর্মকর্তা প্রভাবশালীদের সহযোগিতা করতে চায় না বা বিশেষ সুবিধে দিচ্ছে না তারাই পড়ছে বিপদে। এই ব্যাংকগুলোয় সুশাসনের অভাবেই এমনটি হয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের জন্য একটি ব্যাংক কমিশন জরুরি বলেও মনে করেন তিনি।
/এমএনএইচ/আপ-এসএম