বিনিয়োগ খরা কেটে যাচ্ছে!

বিনিয়োগ খরা কেটে যাচ্ছেআবার গতিশীল হচ্ছে অর্থনীতির চাকা। কেটে যাচ্ছে বিনিয়োগের খরা। বেড়ে চলেছে ব্যাংক ঋণ, প্রবৃদ্ধিও। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, তিন বছরের বন্ধ্যা কাটিয়ে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশে উপনীত হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক ঋণে সুদের হার কমার কারণে উদ্যোক্তারা ঋণের দিকে ঝুঁকছেন। পুরনো ঋণগ্রহীতা উদ্যোক্তাদেরও অনেকে ঋণসীমা বাড়াচ্ছেন। আর এ কারণেই ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষপাল বলেন, বিনিয়োগ খরা কেটে যেতে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীরা এখন বিনিয়োগ করার জন্য উৎসাহী হয়ে উঠছেন। ইতোধ্যে অনেকেই বিনিয়োগ করতে শুরু করেছেন। তিনি বলেন, তিন বছর ধরে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ শতাংশের নিচে। এখন ১৪ শতাংশ অতিক্রম করেছে। তার মতে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্যই বলে দিচ্ছে বিনিয়োগ খরা ধীরে-ধীরে কেটে যাচ্ছে ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ। কিন্তু ২০১৩ সালের শুরুতে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ঋণ প্রবাহে ভাটা পড়ে, যা পরের বছরেও প্রলম্বিত হওয়ায় ঋণ প্রবাহে মন্দাভাব দেখা দেয়। এর পর থেকে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি অব্যাহতভাবে কমে ১৩ শতাংশে নেমে আসে। ২০১৫ সালের  জুনে ছিল ১৩ দশমিক ১৯ শতাংশ। অক্টোবরে ছিল ১৩ দশমিক ২২ শতাংশ। নভেম্বরে  বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩ দশমিক ৭২ শতাংশ।  ডিসেম্বরে এসে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি  দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশে। 

উদ্যোক্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতের সমস্যা কেটে গেলে ঋণ প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে। 

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি ও রফতানিকারক সমিতির প্রেসিডেন্ট আবদুস সালাম মুর্শেদী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকায় ঋণের প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়েছে। তবে, অনেকদিন পর এই প্রবৃদ্ধি ১৪ শতাংশ অতিক্রম করায় এটিকে বেশি বলে মনে হচ্ছে। তিনি মনে করেন, ঋণের প্রবৃদ্ধি আরও দরকার। কারণ, টানা তিন বছর ধরে বাংলাদেশে বিনিয়োগ স্থবিরতা বিরাজ করেছিল। এখন রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই। কিন্তু, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতের সমস্যা রয়েছে। আগে এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হবে।

বিনিয়োগ খরা কেটে যাচ্ছেকেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ দিনগুলোয় কেবল ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়েনি, আমদানি-রফতানিও বেড়েছে। জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে ২৯ শতাংশ। আর নিষ্পত্তির পরিমাণ বেড়েছে ১৫ শতাংশ। এই সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ২৪০ কোটি (২ দশমিক ৪ বিলিয়ন) ডলারের এলসি (ঋণপত্র) খোলা হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১৮৬ কোটি ডলার। অন্যদিকে, শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে ৮২১ কোটি ৫৫ লাখ ডলারের। যা গত অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরের চেয়ে প্রায় ৪ শতাংশ বেশি।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাবে, চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বিদেশে পণ্য রফতনি করে বাংলাদেশ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ বেশি আয় করেছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরেরর জুলাই-জানুয়ারি সময়ে বাংলাদেশের রফতানি আয় হয়েছে এক হাজার ৯২৬ কোটি ৯৫ লাখ ডলার। যা আগের একই সময়ে ছিল এক হাজার ৭৭৯ কোটি ৯৩ লাখ ডলার।
এ প্রসঙ্গে ড. বিরূপাক্ষপাল বলেন, গত জানুয়ারিতে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। কিন্তু এখন সেই অস্থিরতা নেই। ওই সময় অস্থিরতার কারণে ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা আতঙ্কে ছিলেন। যার প্রভাব পড়েছিল আমদানি-রফতানির ওপর। তিনি বলেন, এখন উদ্যোক্তারা নিশ্চিত হয়েছেন যে, বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বিনিয়োগের জায়গা। এ কারণে সবাই এখন বিনিয়োগে মনোনিবেশ করছেন। এর ফলে আমদানি-রফতানি পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। এক বছর আগে উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ নেওয়া থেকে সরে গিয়েছিলেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। ব্যাংক আবার ঋণ দেওয়া শুরু করেছে। ব্যবসায়ীরা বিশেষ ঋণ নেওয়া শুরু করেছেন।

বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিয়েছেন ৬ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে ডিসেম্বর শেষে বায়ার্স ক্রেডিটসহ বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা বিদেশি ঋণ নিয়েছেন ৭০০ কোটি ডলার বা প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে  ব্যাংকের এমডিদের সংগঠন এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান ও বেসরকারি মেঘনা ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ নূরুল আমিন বলেন, ঋণের সুদ হার কমার কারণে উদোক্তারা ঋণের দিকে ঝুঁকছেন। বর্তমানে দেশে কোনও অস্থিরতা  নেই। এ  কারণে অনেক নতুন উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন। আবার পুরনোদের অনেকে ঋণসীমা বাড়াচ্ছেন।

/এমএনএইচ/