জড়িত বিদেশি চক্র

ত্রুটি সারানোর নামে বুথে লাগানো হয় ‘স্কিমিং ডিভাইস’

এটিএম বুথএটিএম বুথের নিরাপত্তা প্রহরীকে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে যান্ত্রিক ত্রুটি সারানোর নাম করে জালিয়াত চক্র বুথে ‘স্কিমিং ডিভাইস’ বসায় বলে অভিযোগ করেছে জালিয়াতির শিকার ব্যাংকগুলো। আর এ ডিভাইসের মাধ্যমেই চুরি করা হয়েছে গ্রাহকদের সব তথ্য। বুথের সিসি ক্যামেরায় চক্রের সদস্যদের চিহ্নিত করা গেছে বলেও দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ। অপরাধীরা ‘বিদেশি’ বলে তাদের মনে হয়েছে।
গ্রাহকের তথ্য চুরি করে ক্লোন কার্ড বানিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া চক্রে ‘বিদেশিদের’ যোগসাজশ রয়েছে বলে সন্দেহের কথা পুলিশকে আগেই জানিয়েছিল ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তেও মিলেছে বিদেশি চক্রের সম্পৃক্ততা। বুথে স্থাপিত গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও চিত্র থেকে এসব তথ্য মিলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে এসব তথ্য-প্রমাণ রয়েছে, যার ভিত্তিতে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে সিটি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
রাজধানীর ইস্টার্ন (ইবিএল), সিটি ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) ছয়টি বুথে ‘স্কিমিং ডিভাইস’ বসিয়ে দুই শতাধিক গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য চুরির পর কার্ড ক্লোন করে টাকা তুলে নেওয়ার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তকারীরা।
তদন্তে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত যেসব ভিডিওচিত্র সংগ্রহ করা হয়েছে, তা পর্যালোচনা করে একাধিক বিদেশির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। একেক বুথে একেকজন বিদেশির সঙ্গে দেশীয় চক্রের লোকজনও রয়েছে। তাই এটি সংঘবদ্ধ একটি চক্রের কাজ বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গতকাল রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তকারীরা তিনটি ব্যাংকের যেসব এটিএম বুথে বিশেষ যন্ত্র বসানো হয়েছিল, সেইসব বুথ পরিদর্শন করেন। পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না হয় সে জন্য ব্যাংকগুলোকে বেশ কিছু নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

এদিকে শুক্রবার জালিয়াতির ঘটনার পর রবিবার লিখিত ব্যাখ্যা দিয়েছে ইস্টার্ন ব্যাংক। ব্যাংকটির ২১ জন গ্রাহকের হিসাব থেকে টাকা তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে এ ক্ষেত্রে ইস্টার্ন ব্যাংকের কোনো বুথ থেকে টাকা তোলার ঘটনা ঘটেনি।

এই ঘটনায় শুক্রবার রাতে বনানী থানায় মামলা করেছে ইউসিবিএল। মামলার এজাহারেও ওই ব্যাংকটি বলেছে, তাদের বনানী এলাকার এটিএম বুথে ৭ ফেব্রুয়ারি বেলা আনুমানিক পৌনে ১১টায় স্কিমিং ডিভাইস বসিয়ে গ্রাহকের কার্ডের তথ্য চুরি করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১১ ফেব্রুয়ারিসহ একাধিক দিন ওই সব চুরি করা তথ্যের ভিত্তিতে কার্ড ক্লোন করে অন্য ব্যাংকের এটিএম থেকে টাকা তোলা হয়। ইউসিবির ওই ঘটনার সঙ্গেও একজন বিদেশি জড়িত থাকার প্রমাণ রয়েছে ভিডিওচিত্রে। মামলার এজাহারেও সেই বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। ইউসিবির করা মামলার এজাহারের সঙ্গে একটি এটিএম বুথের সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা ছবিও তারা জমা দিয়েছে, যাতে একজন ‘বিদেশির মুখাবয়ব’ ধরা পড়েছে বলে তাদের দাবি। ওই বিদেশির বাংলাদেশ থেকে পালানো ঠেকাতে পুলিশকে বিমান, নৌ ও স্থলবন্দরগুলোতে নজরদারি চালাতে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে পুলিশকে অনুরোধ করা হয়েছে।

শুক্রবার রাতে ইউসিবি কর্তৃপক্ষ মামলা করে, যার তদন্ত ইতোমধ্যে শুরু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ।

এ প্রসঙ্গে বনানী থানার ওসি মো. সালাউদ্দিন খান জানিয়েছেন, বনানী এলাকায় ইউসিবির কিছু এটিএম বুথে ‘স্কিমিং ডিভাইস’ বসিয়ে গ্রাহকের গোপনীয় তথ্য চুরি করা হয়। থানায় মামলাটি করেন ইউসিবি কার্ডের ব্রাঞ্চেস কন্ট্রোল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ডিভিশনের হেড অব ফ্রড কন্ট্রোল অ্যান্ড ডিসপিউট ম্যানেজমেন্ট মাহবুব উল ইসলাম খান।

মামলার এজহারে তিনি বলেছেন, তাদের বনানীর একটি এটিএম বুথের নিরাপত্তা প্রহরীকে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে যান্ত্রিক ত্রুটি সারানোর নাম করে গত ৭ ফেব্রুয়ারি ঢুকেছিলেন এক ব্যক্তি। তিনি সকাল ১০টা ৪২ মিনিট থেকে বিভিন্ন সময়ে ঢুকে বুথে স্থাপিত এটিএম মেশিনে ডাটা কপি করার যন্ত্র (স্কিমিং ডিভাইস) স্থাপন করেন। বুথের মধ্যে থাকা সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা চিত্রে অপরাধীরা ধরা পড়েছে দাবি করে এজাহারে বলা হয়, পুনরায় ওই আসামিকে দেখলে তিনি ও তাদের বুথের প্রহরী চিনতে পারবেন। আসামিকে বিদেশি বলেই তাদের মনে হয়েছে। তিনি যেন পালাতে না পারেন, সেজন্য সব বন্দরে ছবি পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছে এজাহারে।

এজাহারে বলা হয়, অজ্ঞাতনামা ওই আসামি ১১ ফেব্রুয়ারিসহ কয়েকটি দিন ও সময়ে জালিয়াতির মাধ্যমে অন্তত সোয়া লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তার সঙ্গে সংঘবদ্ধ একটি দল জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

ইউসিবির মতো ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল) গুলশান এলাকার দুটি বুথ থেকে এভাবে গ্রাহকের তথ্য চুরি হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, জালিয়াত চক্র ছয়টি বুথে ‘স্কিমিং ডিভাইস’ ও ভিডিও ক্যামেরা বসিয়ে রেখেছিল, যার মাধ্যমে তারা বুথে ঢোকানো কার্ডের তথ্য ও পিন নম্বর জেনে গেছে। এরপর ডুপ্লিকেট কার্ড তৈরি করে তারা টাকা তোলার কাজটি সেরেছে। এসব কারণে ব্যাংকগুলোকে এন্টি স্কিমিং ডিভাইস স্থাপন, নিয়মিত ভিডিও ফুটেজ পর্যবেক্ষণ এবং এটিএম বুথে যেন কোনোভাবে বাইরের কেউ কোনো যন্ত্র বসানো বা মেরামতের কাজ করতে না পারে, সে বিষয়ে সজাগ থাকতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে আমরা জানতে পেরেছি তিনটি ব্যাংকের ছয়টি বুথে এই ধরণের ঘটনা ঘটেছে। আমাদের কাছে যে তথ্য এসেছে, তাতে ২০০ কার্ডের তথ্য চুরির প্রমাণ রয়েছে। এসব কার্ডধারীর সঙ্গে কথা বলে দ্রুত কার্ডগুলো নিষ্ক্রিয় করার বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত কর্তকর্তাদের উদ্ধার করা ভিডিও চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৬ ফেব্রুয়ারি সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা এই ১০ ঘণ্টায় সিটি ব্যাংকের কালশী বুথটিতে ৬৪টি কার্ডের লেনদেন হয়। যার মধ্যে ৩২টি সিটি ব্যাংকের নিজস্ব গ্রাহকের বাকি ৩২টি অন্যান্য ব্যাংকের কার্ড। তথ্য চুরি করা কার্ডগুলোর মধ্যে সিটি ব্যাংকের তিনটি কার্ড ক্লোন করে তা দিয়ে ৮ ও ৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর উত্তরা, মিরপুরে একাধিক দফায় লেনদেন করে তিনজন গ্রাহকের হিসাব থেকে ৫০ হাজার, ২০ হাজার ও ২০ হাজার টাকা করে মোট ৯০ হাজার টাকা তুলে নেওয়া হয়। টাকা তোলার ক্ষেত্রে সিটি ব্যাংকের কোনো বুথ ব্যবহার করা হয়নি। তবে পুরো ঘটনাটি জানাজানি হয় ১২ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার এসে। ওই দিন বেসরকারি ইস্টার্ন ব্যাংকের কার্ডধারী বেশ কিছু গ্রাহকের হিসাব থেকে গ্রাহকের অজান্তে টাকা তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। একাধিক গ্রাহক মোবাইলে ক্ষুদে বার্তা বা এসএমএসের মাধ্যমে টাকা তুলে নেওয়ার বিষয়টি টের পেয়ে ব্যাংকে অভিযোগ করেন। একসঙ্গে একাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়ার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে নামে।

/এজে/