কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল শেষে এই ব্যাংকের খেলাপি ঋণ আগের প্রান্তিকের ৪ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা হয়েছে। তিন মাসে এই ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। শুধু যে, খেলাপি ঋণ বেড়েছে তা নয়, ব্যাংকটিতে প্রভিশন ঘাটতিও বেড়েছে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর—এই তিন মাসে বেসিক ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে এই ব্যাংকে ডিসেম্বর শেষে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা। আগের প্রান্তিক শেষে ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা।
নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর ঋণঝুঁকি বিবেচনা করে এর বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংকের প্রভিশন রাখার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ে। আর প্রভিশন ঘাটতি রেখে কোনও ব্যাংক লভ্যাংশ ঘোষণা করতে পারে না। আগে কোনও ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি হলে শুধু সতর্ক করতে ও ঘাটতি মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দিকনির্দেশনা দেওয়া হতো। কিন্তু সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইনে কোনও ব্যাংকে টানা দুবছর ঘাটতি থাকলে তার বড় অঙ্কের জরিমানাসহ লাইসেন্স বাতিলের কথা বলা হয়েছে।
এদিকে, অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও মনে করে সরকারি মালিকানাধীন বেসিক ব্যাংক এখনও ঝুঁকিমুক্ত নয়। কমিটির এক পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, ডিসেম্বর ২০১৫ শেষে বেসিক ব্যাংকের সব সূচকই নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর ফলে ব্যাংকটি এখনও আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে। সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারলে ব্যাংকটিতে নতুন করে সংকট সৃষ্টি হতে পারে বলেও আশঙ্কা সংসদীয় কমিটির। কমিটির তৈরি করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০১৪ সালে এই ব্যাংকটিতে নানা ধরনের অনিয়মের কারণে সব সূচকের অবনতি হয়েছে। খেলাপি ঋণ বাড়ার পাশাপাশি মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে গেছে। বৈদেশিক বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এরই মধ্যে সরকার এই ব্যাংকটিকে ২ হাজার ৩৯০ কোটি টাকার মূলধন সহায়তা দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এ মজিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, খেলাপি ঋণ বাড়লেও বেসিক ব্যাংক আগের চেয়ে কিছুটা ভালো চলছে। আগের কমিটির রেখে যাওয়া সমস্যাগুলো ঠিক করতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, আগের প্রশাসন নামসর্বস্ব বিভিন্ন কোম্পানিকে ঋণ দেওয়ার কারণে খেলাপির পরিমাণ বেড়েছে। তবে অচিরেই এই ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করেন তিনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তিন মাসে বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা বাড়লেও একই সময়ে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ তিন হাজার ৭৬২ কোটি টাকা কমেছে। একইভাবে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমেছে ৪৯৭ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমেছে ৩৫ কোটি টাকা। তবে, সোনালী ব্যাংক ও বিডিবিএলের খেলাপি ঋণ বেড়েছে। তিন মাসের ব্যবধানে সোনালী ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৮২ কোটি টাকা। বিডিবিএলের বেড়েছে ৫৩ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৩৯টি বেসরকারি ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। অথচ ৬ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৩ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। ডিসেম্বর প্রান্তিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএলের মোট ঋণের ২১ দশমিক ৪৬ শতাংশ খেলাপি ঋণ। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮ হাজার ১০০ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকে এখন খেলাপি ঋণ রয়েছে ১ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা। আর বিডিবিএলের খেলাপি ঋণ ৬৪৯ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরে ব্যাংকগুলোর ৩০ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা প্রভিশন রাখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এর বিপরীতে ব্যাংকগুলো সংরক্ষণ করেছে ২৬ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। এতে ঘাটতি দেখা দিয়েছে ৪ হাজার ২৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসিক ব্যাংকেরই ঘাটতি ৩ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আগের কমিটির রেখে যাওয়া সমস্যা থেকে এখনও বেসিক ব্যাংক বেরুতে পারেনি। এ কারণে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ আগের প্রান্তিকের তুলনায় অনেক বেড়েছে। একই কারণে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতিও বেড়েছে। তবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর তদারকির ফলে ব্যাংকটির সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে রফতানি আয় কমেছে ২ হাজার ৬৯ টাকা। ব্যাংকটির ৬৮ শাখার মধ্যে ২৫টি শাখা এখনও লোকসান দিয়ে যাচ্ছে।
এই ব্যাংকটি গত বছরে ২৩৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে বলে সম্প্রতি জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
প্রসঙ্গত, এই ব্যাংকের গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগরসহ কয়েকটি শাখা থেকে নামসর্বস্ব শতাধিক কোম্পানির নামে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি পরিমাণ ঋণ দেওয়া হয় অনিয়মের মাধ্যমে। মূলত ২০১০ থেকে ২০১৪ সালে এ সব অনিয়ম হয়। আর এই ঋণের টাকা আদায় করতে না পারার কারণে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিকহারে বাড়ে।
/এমএনএইচ/