সহসা কাটছে না গ্যাস সংকট

সকালে উঠে দেখি একেবারেই গ্যাস নেই। দুপুরে গ্যাস এলে টিমটিম করে জ্বলে। বিকল্প উপায়ে রান্নার জন্য বৈদ্যুতিক চুলা, রাইস কুকার কিনে নিয়েছি। কিন্তু এসব চুলায় গ্যাসের মতো আঁচ থাকে না। ফলে রান্না হতে অনেক সময় লাগে। ব্যস্ত নাগরিক জীবনে এ এক ভীষণ ভোগান্তি। অনেক সময় সকালের নাস্তাটা বাইরে থেকেই কিনে না এনে খাই। বলছিলেন রাজধানীর খিলগাঁও মানিকনগরের বাসিন্দা সোমা চৌধুরী।

একই সমস্যার কথা জানান বনশ্রীর বাসিন্দা মারিয়া ইসলাম। রাত ১২টার পরে গ্যাসের চুলার আঁচ বাড়ে। তাই আজকাল মধ্যরাতেই সারা দিনের মূল রান্নাটা করে রাখেন। বাকিগুলা সেই রাইস কুকার আর বৈদ্যুতিক চুলা দিয়ে চালান। এরমধ্যে আবার নতুন করে লোডশেডিং-ও কিছুটা হচ্ছে। সব মিলিয়ে গ্যাস সংকটের এই ভোগান্তি যেন শেষই হচ্ছে না। একই অভিযোগ পাওয়া গেছে রামপুরা, উলনসহ পুরানো ঢাকার আরও বেশ কিছু এলাকা থেকে। 

পেট্রোবাংলা জানায়, সামিটের জন্যই কাটছে না গ্যাস সংকট। দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি সামিটের। সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় রিমালে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও সামিটের টার্মিনালটি গ্যাস সরবরাহ শুরু করতে পারেনি। দুই-তিন দফা সময় দিলেও টার্মিনালটিকে সাগরের বৈরি আবহাওয়ার কারণে সমুদ্রের তলদেশের পাইপ লাইনের সঙ্গে সংযুক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে এখন মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির একটি টার্মিনালের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, সামিট করপোরেশনের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ্বালানি বিশেষ করে এলএনজি সরবরাহে মহেশখালিতে একটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। গত সরকার পদত্যাগের কিছু দিন আগে সামিটকে মহেশখালিতে আরও একটি টার্মিনাল নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছিল। যদিও এখনও এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার সঙ্গে সামিটের চূড়ান্ত কোনও চুক্তি হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল দেশের স্থলভাগের গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়াতে আরও বেশি আমদানি নির্ভর হতে হবে। অতিরিক্ত এই আমদানির জন্যই দুটি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল, যার একটি মহেশখালিতে সামিট নির্মাণ করবে। অন্যটি পায়রাতে এক্সিলারেট এনার্জি নির্মাণ করবে।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, কেবলমাত্র এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন টার্মিনালই নয়, সামিট খোলাবাজার থেকে এলএনজি কেনার সঙ্গেও জড়িত। এছাড়া বেসরকারি তেল চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি সরবরাহ করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি।

সামিট থেকে এক খবর বিজ্ঞপ্তিতে দুই দিন আগে জানানো হয়েছে, সমুদ্রের অবস্থা ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মাসের শেষ দিকে টার্মিনালের ডিটিএম প্লাগটি পুনঃস্থাপন ও পুনঃসংযোগ দিতে পারবে। এরপর আগামী মাসের মাঝামাঝি এলএনজি সরবরাহ শুরুর জন্য এটি তৈরি হবে। অর্থাৎ আরও এক মাসের মতো গ্যাস সরবরাহে সময় প্রয়োজন হবে। জুলাই এবং আগস্ট মিলে সামিট কয়েক দফা টার্মিনালটির পুনঃসরবরাহের কথা বললেও সামিট এতে সক্ষম হয়নি।

সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, সামিটকে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ দেওয়ার শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটির এ জাতীয় কাজের অভিজ্ঞতা না থাকায় সমালোচনা ছিল। সামিট দেশে বিদ্যুৎ বাণিজ্যের কাজে সম্পৃক্ত থাকলেও এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ বা সংরক্ষণে তাদের অভিজ্ঞতা ছিল না। এজন্যও এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হচ্ছে বলে সমালোচনা রয়েছে।

এদিকে সামিট করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়সাল খানের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

প্রসঙ্গত, এখন গড়ে দৈনিক ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে পেট্রোবাংলা সরবরাহ করছে ২৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এরমধ্যে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। বাকি ২ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে দেশীয় খনি থেকে। সামিটের টার্মিনালটি সচল থাকলে আরও ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হতো।

সামিট এলএনজি সরবরাহ করতে না পারাতে দেশের বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের ঘাটতি দেখা গেছে। এতে শুধু গ্যাসেরই সংকট হচ্ছে তা নয়, বিদ্যুতের লোডশেডিং-ও বাড়ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প, বাণিজ্য এমনকি বাসাবাড়িতে গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) মো. কামরুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, প্রথমে সামিট এই মাসের ১০/১১ তারিখের মধ্যে মেরামতের কাজ শেষ করতে পারবে বলে জানালেও পরিস্থিতি এখন তা নাই। বৈরি আবহাওয়ার কারণে সাগরের নিচের পানি অনেক ঘোলা। ভিজিবিলিটি নেই। ফলে নিচে একেবারেই কাজ করা যাচ্ছে না। সর্বশেষ তারা এই মাস পুরোটা লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন।

এই সংকট কাটাতে বিকল্প কিছু করা যাবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের অন্য কোনও বিকল্প কিছু নেই অপেক্ষা করা ছাড়া। সর্বশেষ বেগমগঞ্জ থেকে জাতীয় গ্রিডে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়েছে।