বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরি

দুই দেশেই সিসি ক্যামেরা বন্ধ ছিল!

বাংরিজার্ভের অর্থ চুরিলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিলিং রুমে সিসি ক্যামেরা বন্ধ ছিল। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ তোলার সময় ফিলিপাইনের রিজল ব্যাংকেরও সিসি ক্যামেরাগুলো অকার্যকর ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ডলার চুরির ঘটনার সময় সংঘটিত লেনদেনের তথ্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কে বা কারা এসব তথ্য কম্পিউটার ও সার্ভার থেকে মুছে ফেলেছেন। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনার আগে থেকেই ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ ও ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনের ডিলিং রুমের (বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনের জন্য বিশেষভাবে ব্যবহৃত কক্ষ) দুটি ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা বিকল ছিল বলেও বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়।
এদিকে, ফিলিপাইনের  দৈনিক ইনকোয়ারার-এর তথ্য অনুযায়ী, ফিলিপিন্স সিনেট ব্লু রিবন কমিটির চেয়ারম্যান তেওফিস্তো গুংগোনা সোমবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, রিজল ব্যাংকের জুপিটার স্ট্রিট শাখা সিসি ক্যামেরার আওতাধীন হলেও ৯ ফেব্রুয়ারি যেদিন অ্যাকাউন্টগুলো থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ তোলা হয়েছিল, সেদিন সেগুলো ছিল অকার্যকর। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক থেকে ওই অর্থ ফিলিপাইনের রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকের মাকাতি শহরের জুপিটার স্ট্রিট শাখার পাঁচটি অ্যাকাউন্টে সরানোর পর ক্যাসিনোর মাধ্যমে বৈধ করে করে অন্যদেশে পাচার করা হয়। এই অর্থ পাচারের তদন্তে থাকা ফিলিপিন্সের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি) এর কাছ থেকে এই তথ্য মিলেছে বলে জানিয়েছেন সিনেট কমিটির চেয়ারম্যান।

প্রসঙ্গত, গত ৫ ফেব্রুয়ারি  বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেম থেকে অর্থ স্থানান্তরের  যে সংকেতলিপি (সুইফট কোড) ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের কাছে পাঠানো হয়েছিল, তা ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকেরই কোড। বাংলাদেশ ব্যাংকের কোড ব্যবহার করেই ১০১ মিলিয়ন ডলার স্থানান্তরিত হয়ে যায় ফিলিপাইনে। শ্রীলঙ্কার একটি ব্যাংকে আরও ২০ মিলিয়ন ডলার সরানো হলেও বানান ভুলের কারণে সন্দেহ হওয়ায় শেষ মুহূর্তে তা আটকে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেক্স রিজার্ভ ও ট্রেজারি ম্যানেজমেন্ট ডিভিশনের পূর্বদিকে কাচঘেরা কক্ষটির নাম ডিলিং রুম। এই কক্ষে বিশেষ কার্ডের সাহায্যে প্রবেশ করতে হয়। এখানে দুটি সিসি ক্যামেরা রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ডলার চুরির ঘটনার কিছু দিন আগে থেকেই ডিলিং রুমের দুটি ক্যামেরা অকেজো ছিল। ফলে কারা কক্ষে কাজ করেছে সেই ভিডিও ফুটেজও নেই। বৈদেশিক লেনদেনের জন্য ডিলিং প্রায় সব সময়ই খোলা রাখার নিয়ম রয়েছে। বহুজাতিক ব্যাংকসহ বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও ছুটির দিনে ডিলিং রুম খোলা রাখে।

এছাড়া, বাংলাদেশ ব্যাংকেরও ছুটির দিন ডিলিং রুম খোলা রেখে কাজ করার নজির রয়েছে। কিন্তু রিজার্ভ থেকে ডলার চুরির সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিলিং রুম বন্ধ ছিল। ফলে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যে বার্তা এসেছিল, তা পরীক্ষা করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।

পাঁচটি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে লেনদেনের খবর ইনকোয়ারারে প্রতিবেদনে আগে বলা হলেও গুংগোনা বলেন, চার ব্যক্তির ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে এই অর্থ তোলা হয়। তারা হচ্ছেন, এনরিকো তিওদোরো ভাসকুয়েজ, আলফ্রেদ সান্তোস ভারগারা, মাইকেল ফ্রান্সিসকো ক্রুজ ও জেসি ক্রিস্টোফার লাগরোসাস। ভুয়া প্রমাণপত্র দিয়ে তারা অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন বলে জানিয়েছেন সিনেট কমিটির চেয়ারম্যান গুংগোনা। তিনি বলেন, তাদের দাখিল করা নথিপত্র ছিল ভুয়া। তারা যে ড্রাইভিং লাইসেন্স জমা দিয়েছিলেন, তাও ভুয়া।

রিজল ব্যাংকের জুপিটার স্ট্রিট শাখা, যার মাধ্যমে লেনদেন হয় বাংলাদেশের অর্থের রিজল ব্যাংকের জুপিটার স্ট্রিট শাখা, যার মাধ্যমে লেনদেন হয় বাংলাদেশের চুরি যাওয়া অর্থের।

এই চারজন যে যে প্রতিষ্ঠানের চাকরি করেন পরিচয় দিয়েছিলেন, সে সে প্রতিষ্ঠানে খবর নিয়ে কোনও সত্যতা পাওয়া যায়নি। তারা যে ঠিকানা দিয়েছিলেন, তাও ভুয়া।  কারণ ওই সব ঠিকানায় এসব নামে কাউকে পাওয়া যায়নি।

রিজল ব্যাংকের ওই শাখার ব্যবস্থাপক মাইয়া সানতোস দেগিতো ইতোমধ্যে তদন্তের আওতায় রয়েছেন। তার বিদেশ যাওয়া সম্প্রতি আটকে দেয় দেশটির ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ। দেগিতোর মুখপাত্র দাবি করেছেন, ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশেই কয়েক মাস আগে ওই অ্যাকাউন্টগুলো খোলা হয়েছিল, যেগুলো এখন সন্দেহভাজন। তবে দেগিতোর এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন রিজল ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লরেঞ্জা তান। তদন্তের স্বার্থে তিনি দায়িত্ব পালন থেকে ছুটি নিয়েছেন

/এমএনএইচ/