গুলশানে গভর্নর বাসভবনে বিদায় উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন আতিউর রহমান। সংবাদ সম্মেলনে তাকে বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। পদত্যাগে যেন অনেকটাই ভেঙে পড়েছেন তিনি। অবশ্য তিনি মনের শক্তি প্রদর্শনে একাধিকবার চেষ্টা করেছেন সাংবাদিকদের সামনে। কিন্তু তার বিমর্ষতার প্রকাশ ঘটে প্রতিটি শব্দে। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই ভারি কণ্ঠে আতিউর রহমান বলেন, ‘আমি সাংবাদিকদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেওয়ার জন্য আজ মিলিত হয়েছি।’
সাংবাদিকদের প্রশ্ন ও সমালোচনা করাকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরে বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির যে সাফল্যে, তার ভাগিদার সাংবাদিকরাও।’
তিনি বলেন, ‘আমার আজ খুব ভালো লাগছে যে আমি একটা তৃপ্তির সঙ্গে এবং অনেকটা বীরের বেশে, মাথা উঁচু করে আপনাদের কাছ থেকে বিদায় নিতে পারছি।’ এই কথাগুলো যখন ড. আতিউর বলছিলেন, তখনও তার কণ্ঠ ভারি শোনাচ্ছিল। ওই সময়ও তার চোখ ছলছল করছিল।
প্রসঙ্গত, গত ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেম থেকে অর্থ স্থানান্তরের যে সংকেতলিপি (সুইফট কোড) ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কের কাছে পাঠানো হয়েছিল, তা ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকেরই কোড। বাংলাদেশ ব্যাংকের কোড ব্যবহার করেই ১০১ মিলিয়ন ডলার সরানো হয় ফিলিপাইনে। শ্রীলঙ্কার একটি ব্যাংকে আরও ২০ মিলিয়ন ডলার সরানো হলেও বানান ভুলের কারণে সন্দেহ হওয়ায় শেষ মুহূর্তে তা আটকে যায়।
সংবাদ সম্মেলনে ড. আতিউর বলেন, ‘আমি চাই না বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ে কোনও বির্তক হোক। আমি চাইনি বাংলাদেশ ভাবমূর্তি সংকটে পড়ুক। আমি চাইনি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কোনও বির্তক হোক। সেই জন্য আমি স্বেচ্ছায়, নৈতিক দায়বদ্ধতা থেকে পদত্যাগ করেছি।’ কথাগুলো বলার সময় তার চোখে পানি দেখেছে দেশবাসী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির কেলেঙ্কারি মাথায় নিয়ে ড. আতিউর রহমান সাংবাদিকদের সামনে কেঁদে ফেলেন। এ সময় তিনি দেশবাসীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আতিউর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংককে যখন সন্তানের সঙ্গে তুলনা করছিলেন তখনও তার গলা ভারি হয়ে আসে।
তিনি বলেন, ‘আমি সাত বছর দায়িত্ব পালন করেছি। বাংলাদেশ ব্যাংককে সন্তানের মতো মনে করেছি। রিজার্ভের ২৮ বিলিয়ন ডলার থেকে অর্থ চুরি হোক- এটা আমি কখনও চাইনি। আমি চেষ্টা করেছি নিজের মতো করে এগিয়ে নিয়ে যেতে। তারপরও যদি কোনও ভুল করে থাকি তাহলে, আমি দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।’
সোমবার ভারত থেকে দেশে ফেরার পরই তার পদত্যাগ নিয়ে গুঞ্জন ওঠে। তবে সব গুঞ্জনের অবসান ঘটিয়ে মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় তার পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ইহসানুল করিম।
বিকালের সাংবাদ সম্মেলনে সদ্য বিদায়ী আতিউর বলেন, ‘রিজার্ভের টাকা যেভাবে চুরি গেছে, সেটা ছিল মারাত্মক সাইবার অ্যাটাক। এটা একটা হাইটেক সাইবার অ্যাটাক। অনেকটা টেরোরিস্ট অ্যাটাকের মতো ঘটনা। কোন দিক থেকে এই অ্যাটাক আসছে, তা বোঝা যাচ্ছিল না। এমন অবস্থায় আমরা বিহ্বল ছিলাম। এটা এমন সময় ঘটেছে, যখন এটিএম জালিয়াতির ঘটনা নিয়ে সবাই ব্যতিব্যস্ত ছিল। আর এ কারণে সরকারকে বিষয়টি জানাতে খানিকটা দেরি হয়েছে। আমরা যখন পরিস্থিতি খানিকটা নিয়ন্ত্রণে এনেছি এবং বুঝেছি টাকা ফেরত আসবে, তখন আমরা সরকারকে জানিয়েছি। আমি অর্থমন্ত্রীকে লিখিতভাবে এবং প্রধানমন্ত্রীকে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘আমি যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব নিয়েছিলাম, তখন রিজার্ভের পরিমাণ ছিল সাড়ে ৬ বিলিয়নের মতো। আর এখন তা ২৮ বিলিয়নের ওপরে। যখন যাচ্ছি দেখতে পাচ্ছি কোনও না কোনওভাবে ব্যাংকের সেবা নেওয়ার সুযোগ হয়েছে ৭০ শতাংশ মানুষের।’
তিনি আরও বলেন, ‘একেকটা চ্যালেঞ্জ এসেছে, আমরা মুখোমুখি হয়েছি এবং এগিয়ে যেতে পেরেছি। আমি যখন চলে যাচ্ছি, তখন বাংলাদেশের অর্থনীতি সবচেয়ে স্থিতিশীল অবস্থায়।’
আতিউর রহমান বলেন, ‘আমি পদত্যাগপত্রে বলেছি, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্বব্যাপী উজ্জ্বল ভাবমূর্তি আছে। আমি চাই না বিতর্ক হোক, আমি নৈতিক দায় নিয়ে সরে দাঁড়িয়ে নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করতে চেয়েছি। আমি কোনও পরাজিত সৈনিক নই। একশটা ভালো কাজ করলে, একটা-দুটা ভুল হবে। তদন্ত করে বের করা হোক। ঘটনাটি দুদিন পর বলা হয়েছে, এতে বড় কোনও হেরফের হয়ে গেছে বলে আমি মনে করি না।’
তিনি বলেন, ‘এই ব্যাংক আমার সন্তানের মতো। সেখান থেকে টাকা চলে যাবে, এটা আমি কল্পনাও করতে পারি না। শুরুতে আমাকে সাবধান হতে হয়েছে, যে টাকা আছে, যাতে সেটাতে কেউ হাত দিতে না পারে। সেন্ট্রাল ব্যাংক আগে নিরাপদ করি। ফেরত আনার ব্যবস্থা করতে গিয়ে আমাদের একটু সময় লেগেছে।’
ড. আতিউর রহমান বলেন, ‘আমি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একজন মানুষ। প্রধানমন্ত্রীর উপদেশ নিয়েই কাজ করেছি। তিনি যেহেতু আমাকে নিয়োগ দিয়েছেন, তাই তার হাতেই পদত্যাগপত্র দিয়েছি।’
সাংবাদিকে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি একেবারেই এই মাটির সন্তান। আমি একজন ভূমিপুত্র। আমি বিধাতার কাছে, আল্লাহর কাছে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞ।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি সন্তানের মতো বাংলাদেশ ব্যাংককে দেখেছি। তিলে তিলে খনি শ্রমিকের মতো ২৮ মিলিয়ন ডলার গড়ে তুলেছি। সে ডলার হারিয়ে যাবে আমার অবহেলায়, এটা বিশ্বাস করতেও আমার কষ্ট হয়।’
/এজে/ আপ- এমএসএম