ইউরোপের বাজারে রফতানি বাড়াতে কাজ করছে যৌথ বিজনেস কাউন্সিল





সবজি রফতানিইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশে উৎপাদিত ও শাক-সবজি, আলু, পান, ফলসহ ভেজিটেবল রফতানি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া, রোগবালাই ও পোকামাকড় দূর করে এসব পণ্যের উৎপাদন বাড়িয়ে উপযুক্ত ল্যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গ্রহণযোগ্য সার্টিফিকেটসহ রফতানির ক্ষেত্রে বিরাজমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা দ্রুত সমাধানেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্টদের।
উল্লেখিত পণ্য রফতানি বাণিজ্যে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সংশ্লিষ্টদের সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক আরও বাড়াতে একটি যৌথ বাণিজ্য কাউন্সিল কাজ করছে বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ।
বিষয়গুলো পরীবিক্ষণ ও সুপারিশ প্রণয়নের জন্য বাণিজ্য সচিবকে প্রধান করে গঠিত পাঁচ সদস্যের একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি কাজ করছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন কৃষিসচিব, শিল্পসচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একজন প্রতিনিধি।
একই সঙ্গে কাজ করছে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাণিজ্য কাউন্সিল।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো ইপিবি সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার মাঝেও ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য গুণগতমানের পণ্য রফতানির পরিমাণ বাড়ছে। কেবল শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের জন্য নয়, উন্নত গুণগত মানের জন্যও ইইউর বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের এ রফতানি প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। তৈরি পোশাক, হিমায়িত খাবারসহ অন্যান্য বাংলাদেশি পণ্যের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নের অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়িয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে রফতানি বৃদ্ধির আরও সুযোগ রয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন সদস্য দেশসমূহ এবং আমাদের বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠনের ২৫ জন প্রতিনিধির সমন্বয়ে এই কাউন্সিল গঠিত হয়েছে।

সূত্র বলেছে, বাণিজ্য কাউন্সিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য ট্যারিফ ও নন-ট্যারিফ বাধা দূর এবং টেলিযোগাযোগ, রিফাইনারি এবং স্যাটোলাইট প্রোগ্রামের মতো বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিনিয়োগ বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে কাজ করছে। অস্ত্র ছাড়া ইইউয়ের বাজারে সব ধরনের পণ্য রফতানির সুযোগ রয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ইইউয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী এই কাউন্সিল গঠিত হয়েছে। তিনি জানান, ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই), ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই), চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই), মেট্রোপলিটান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই), বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি বাংলাদেশের পক্ষে এই কাউন্সিলের সদস্য।

মুখপাত্র আরও বলেন, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানো এবং ইইউ সদস্যভুক্ত দশ এবং বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক আরও বাড়াতে এই কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) বাংলাদেশের রফতানি অব্যাহতভাবে বাড়ছে। বিদায়ী বছরে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে ৯২০ কোটি ইউরো মূল্যের পণ্য রফতানি করেছে। একই সময়ে এসব দেশ থেকে বাংলাদেশ আমদানি করেছে মাত্র ১৫০ কোটি ইউরো মূল্যের পণ্য। ২০০১ সাল থেকে ইইউ’র বাজারে বাংলাদেশি পণ্য অব্যাহতভাবে শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা ভোগ করার ফলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বরাবরই বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অবস্থানে রয়েছে।

সূত্রটি বলছে, তৈরি পোশাকের পর ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি যেসব পণ্যের সমাদর সব চেয়ে বেশি এর মধ্যে হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি অন্যতম। যদিও ২০০৮ সালে ইউরোপে রফতানি করা হিমায়িত মাছ ও চিংড়ির মধ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানের প্রমাণ মেলায় আরেক দফা বাংলাদেশি হিমায়িত পণ্যের ওপর সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। এরপরই এই পণ্য রফতানিতে একটি আইন করে ইউরোপ। যেখানে বলা হয়েছিল, প্রতিটি চালানের সঙ্গে রফতানিকারককে একটি সনদ দিতে হবে। যাতে প্রমাণ থাকতে হবে, রফতানি করা পণ্যে ক্ষতিকর কোনও রাসায়নিক উপাদান নেই। আর ওই সনদ কতটা নির্ভরযোগ্য তাও পরীক্ষা করে দেখতে হবে।

এমন বিধিনিষেধের পর ২০১০ সাল থেকে চলতি বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত পাঁচ বছরে রফতানি হওয়া মাছ ও চিংড়িতে ক্ষতিকর কোনও রাসায়নিক দ্রব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রমাণ পেয়েছে ইইউ। পাশাপাশি ইউরোপের মানুষের খাদ্য তালিকায় যোগ হওয়ার মতো গুণগত মানও বজায় ছিল বাংলাদেশি হিমায়িত পণ্যে। এছাড়া, ইউরোপের একটি নিরীক্ষা দল চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বাংলাদেশ সফর করে। ওই প্রতিনিধি দল চিংড়ির খামার থেকে কারখানা পর্যন্ত ছয়টি স্তরে উৎপাদন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে। স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে চিংড়ি উৎপাদন হচ্ছে কি না, হিমায়িত চিংড়িতে অপদ্রব্য আছে কি না এসব নিরীক্ষা করে ওই টিম। ইইউ’র অডিট টিম চিংড়ির খামার, ডিপো, আড়ৎ-অবতরণ কেন্দ্র, মাছ বাজার, পরিবহন ব্যবস্থাপনা এবং হিমায়িত কারখানা পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষা করে।

সর্বশেষ প্রতিনিধি দলটি যে প্রতিবেদন দেয়, তাতে বলা হয়, বাংলাদেশ ক্রমাগত হিমায়িত খাদ্যের গুণগত মান বজায় রাখছে। এসব বিবেচনায় সম্প্রতি ইউরোপীয় সংসদ আরেকটি আইনের খসড়া প্রায় চূড়ান্ত করে। যেখানে বলা হয়, ইউরোপের এ সংক্রান্ত অধিদফতর মনে করে প্রতিটি রফতানি চালানে এখন থেকে আর পরীক্ষার প্রয়োজন পড়বে না। যা বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সব দফতরে ইতোমধেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মৎস্য অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ইউরোপের বাজারে মৎস্য জাতীয় খাদ্য রফতানি করে বাংলাদেশ গত বছর প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা আয় করে।

উল্লেখ্য, একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ করার ফলে রফতানিকৃত চিংড়িতে নাইট্রোফুরান পাওয়া যায়। এ জন্য ১৯৯৮ সালে ইইউভুক্ত দেশগুলোয় বাংলাদেশি চিংড়ি রফতানি নিষিদ্ধ ছিল। ২০০৮ সালে করা হয় আরেক দফা সতর্কতা। এরপর চিংড়ির গুণগতমান নিরীক্ষায় ২০১১ ও ২০১৪ সালে ইইউ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে আসে। বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস্ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনও পুশ প্রতিরোধে নানা পদক্ষেপ নেয়। ইইউ কর্তৃপক্ষও অন্যান্য উপায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাংলাদেশের রফতানিযোগ্য চিংড়িকে মানসম্মত বলে প্রমাণ পায়। যে কারণে সর্বশেষ ইইউ পার্লামেন্ট বাংলাদেশি চিংড়ির ওপর থেকে সব শর্ত প্রত্যাহার করে নেয়।

/এমএনএইচ/