সরকার গঠিত উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এ কমিটি তদন্ত চলার সময় কোথাও কোনও মন্তব্য করবে না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগাম মন্তব্যে কাজ ব্যাহত হয় বলে মনে করে তদন্ত কমিটি। একই সঙ্গে তারা তদন্তকাজ পরিচালনার সময় নির্দিষ্ট কোনও স্থান ব্যবহার করবেন না। বিভিন্ন সময় কমিটির পছন্দ বা সুবিধা অনুযায়ী বিভিন্ন স্থানে বসে কাজ করবেন। এ ক্ষেত্রে তা হতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক, সচিবালয় বা অন্য কোথাও। আপাতত সরকার নির্ধারিত তিনজনই এই তদন্তকাজ পরিচালনা করবেন বলে জানিয়েছেন কমিটির চেয়ারম্যান ড. ফরাসউদ্দিন আহমেদ।
পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রবিবার বিকেলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে তার সরকারি বাসায় সাক্ষাৎ করে তার নির্দেশনা অনুযায়ী আনুষ্ঠানিভাবে কাজ শুরু করে এই কমিটি। এ কাজের সঙ্গে যুক্ত করা হতে পারে দেশি-বিদেশি তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের।
সূত্র জানায়, তদন্তের শুরুতেই রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনসহ তিনটি দেশের জড়িত ব্যাংকগুলোর কাছে তথ্য চাইবে বাংলাদেশের এই তদন্ত কমিটি। এ জন্য আগামী কয়েকদিনের মধ্যে ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি), যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক এবং শ্রীলংকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে এ বিষয়ে চিঠি দেওয়া হতে পারে।
রিজার্ভ চুরির সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনও কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা এবং দায়িত্বে অবহেলা ছিল কিনা প্রথমেই তা খতিয়ে দেখবে তদন্ত কমিটি। চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারের সম্ভাবনা এবং এ ব্যাপারে নেওয়া কার্যক্রমের পর্যাপ্ততা খুঁজে বের করা হতে পারে। এছাড়া বেশ কয়েকটি বিষয়ে অনুসন্ধান করবে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কীভাবে ও কার বরাবর অবৈধভাবে অর্থ পরিশোধের নির্দেশ গেছে, অবৈধ অর্থ পরিশোধ ঠেকানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া পদক্ষেপ পর্যাপ্ত ছিল কিনা, রিজার্ভ চুরির বিষয়টি কেন বাংলাদেশ ব্যাংক শুরুতে সরকারের কাছে গোপন করেছে, এর পেছনে যৌক্তিকতা কতটুকু তা বের করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কমিটিকে। কমিটি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে সুপারিশ করবে। সেই সুপারিশ মতো কাজ করবে সরকার।
জানা গেছে, রিজার্ভের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটার সিস্টেমে অন্তত দুই সপ্তাহ আগে গোপনে ঢুকে সবকিছু হাতড়ে বেড়িয়েছে অর্থ চুরির সঙ্গে জড়িতরা। একটি অন্তর্বর্তীকালীন তদন্ত প্রতিবেদনে এমন তথ্য পাওয়া গেছে বলে ব্যবসাবিষয়ক সংবাদ প্রতিষ্ঠান ব্লুমবার্গ দাবি করেছে। সাইবার অপরাধীরা কিভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেমে ঢুকে তাদের ঘায়েল করেছে তার বর্ণনাও রয়েছে ওই প্রতিবেদনে। বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ফায়ারআই ও ওয়ার্ল্ড ইনফরমেটিক্স। তবে এ প্রতিবেদনের ব্যাপারে অবগত নয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকের মুখপাত্র নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভংকর সাহা এ বিষয়টি জানান। সরকার গঠিত তদন্ত কমিটি এসবই পর্যবেক্ষণ করবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কমিটির একজন সদস্য।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ থেকে অর্থ লোপাটের ঘটনায় সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন-সুইফটের প্রতিনিধি দল তাদের সিস্টেম পরীক্ষার কাজ করেছে বলে শনিবার জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিন। আর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক থেকে বাংলাদেশের অর্থ লোপাটের এ ঘটনা দেশটির কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইও তদন্ত শুরু করেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনাটি বর্তমানে দেশের অন্যতম আলোচিত-সমালোচিত ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ ঘটনায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও করা হচ্ছে। তাই সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এর মূল উদঘাটনের পাশাপাশি দোষীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই অবস্থায় ব্যাংকিং খাতের আস্থা ফেরানোর মিশনে রবিবার যোগ দিয়েছেন নতুন গভর্নর ফজলে কবির। এছাড়া সিআইডির তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। রবিবার এফবিআইয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছে সিআইডি।
এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, অর্থ চুরির ঘটনাটি আন্তর্জাতিক লেনদেনে ভাবমূর্তি সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখন সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে কমিটি যে রিপোর্ট দেবে, সেটার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। রিজার্ভের অর্থ থেকে পরিশোধ বার্তার ইনফরমেশন টেকনোলজিতে কোনও দুর্বলতা ছিল কিনা সেটা খতিয়ে দেখতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনও কর্মকর্তা এই ঘটনায় জড়িত কিনা সেটাও দেখতে হবে। কারণ রিজার্ভের টাকা চুরি হওয়ার ব্যাপারটা খুবই দুঃখজনক, একই সঙ্গে তা উদ্বেগজনকও বটে।
উল্লেখ্য, ফিলিপাইনে সরানো বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার স্থানীয় মুদ্রা পেসোতে রূপান্তরকারী মুদ্রা বিনিময় কোম্পানি বিনিময় বাবদ তাদের আয় বাংলাদেশকে ফেরত দেবে বলে জানিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ফিলিপাইনের প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও অনুসন্ধান সংক্রান্ত সিনেট কমিটির (ব্লু রিবন কমিটি) শুনানিতে উপস্থিত হয়ে এ কথা বলেন ফিলরেম সার্ভিস ইনকর্পোরেশন নামে ওই মুদ্রা বিনিময় কোম্পানির প্রেসিডেন্ট সালুদ বাউতিস্তা। বিনিময় করা মুদ্রা বাংলাদেশের চুরি করা অর্থ থেকে এটি তার কোম্পানি জানত না দাবি করে তিনি বলেন, আমরা দুঃখিত। এই মুদ্রা বিনিময় থেকে তাদের পাওয়া স্থানীয় মুদ্রায় এক কোটি চার লাখ ৭৪ হাজার ৬৫৪ পেসো বা প্রায় দুই লাখ ২৬ হাজার ডলার দ্রুতই বাংলাদেশ সরকারের নামে একটি চেক লিখে ফেরত দেওয়া হবে বলে শুনানিতে বলা হয়েছে। এর আগে ফিলিপাইন থেকে আরও ৬৮ হাজার ডলার ফেরত পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনায় গত সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সরকার। কমিটিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব গকুল চাঁদ দাস এবং বুয়েটের কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদকে রাখা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তাই তদন্তকাজ চলার সময় এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করা ঠিক হবে না। আগে তদন্ত শেষে করে সরকারের কাছে রিপোর্ট দেওয়া হোক, তার পর দেখা যাবে।
এদিকে আলোচিত এই ঘটনার ৪০ দিন পর মামলা হলে তার তদন্তে নেমেছে পুলিশের সিআইডি। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, সুইফটের প্রতিনিধিরা নিজেদের সিস্টেম পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার গঠিত তদন্ত দলের সঙ্গেও বৈঠক করবে। তদন্ত সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক টিম শনিবার ব্যাংক থেকে প্রযুক্তিগত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে।
/এসআই/এজে/