জীবাশ্ম জ্বালানিতে এডিবির ব্যাপক ঋণ অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে: প্রতিবেদন

বাংলাদেশে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বিপুল জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিনিয়োগ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও পরিবেশগত ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে নতুন এক প্রতিবেদনে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ব্যাপক সম্ভাবনা সত্ত্বেও নবায়নযোগ্য খাতে ব্যাংকটির বিনিয়োগ উদাসীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বক্তারা।

রবিবার (৭ নভেম্বর) ‘বাংলাদেশ এনার্জি কনফারেন্স ২০২৫’ এর দ্বিতীয় দিনের এক সেশনে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। রাজধানীর বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘরে তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

‘বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বহুজাতিক ব্যাংক’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন এনজিও ফোরাম অন এডিবির কো অর্ডিনেটর শারমিন আক্তার বৃষ্টি। সেশনটি পরিচালনা করেন সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক রায়ান হাসান। তিনি বলেন, ‘এডিবির একপেশে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিনিয়োগ মডেল বাংলাদেশকে জ্বালানি ঘাটতি, বাড়তি ঋণঝুঁকি ও জলবায়ু বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।’

একইদিন বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা ও সমস্যা শীর্ষক আরেকটি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে দেশে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক সম্ভাবনা সত্বেও নীতিগত নানা বাধায় এ খাতের সম্প্রসারণ আশানুরূপ হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন বক্তারা।

এনজিও ফোরামের প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ায় মোট ৫৭০টি জ্বালানি প্রকল্পে ৯২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার প্রতিশ্রুতির মধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছে ১৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৩৬টি গ্যাসকেন্দ্রিক প্রকল্পে রয়েছে ৫ দশমিক ৯৯৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ; যা দিয়ে ৩ হাজার ৬৫৯ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশে এডিবির গ্যাস খাতে অর্থায়নের ৬০ শতাংশ এসেছে টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স স্পেশাল ফান্ড থেকে; ৩৬ শতাংশ উচ্চ সুদের ওসিআর ঋণ থেকে এবং মাত্র ৪ শতাংশ এডিএফ তহবিল থেকে।

১৯৭৭ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত এডিবি গ্যাস পরিকল্পনা, সিস্টেম উন্নয়ন ও পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যান নিয়ে কাজ করলেও ২০০০ সালের পর সরাসরি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে জোর দেয়। সিরাজগঞ্জ ও মেঘনাঘাট ৪৫০ মেগাওয়াট প্লান্টের টেন্ডারও পরিচালনা করে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, এডিবি বাংলাদেশে যে বিনিয়গ করছে তার বড় অংশই যাচ্ছে গ্যাস সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে। ১ দশমিক ২৩২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে, ১ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণে, ৭০৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে গ্যাস খাত উন্নয়নে, ৬৬০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে পরিকল্পনা খাতে, ৬০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যানে এবং ১ দশমিক ৩৯৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে অন্যান্য গ্যাস সম্পর্কিত প্রকল্পে।

সরকারি খাতের চারটি প্রকল্প পেয়েছে ৮১৭ মিলিয়ন ডলার, আর বেসরকারি খাতের ৪১৫ মিলিয়ন ডলার গেছে জিইই, পেন্ডেকার, সামিট, জেরা-রিলায়েন্স ও এনডব্লিউপিজিসিএল’র প্রকল্পে।

নিষ্ক্রিয় প্রকল্প, বাড়তি ঋণঝুঁকি

গ্যাস সংকট ও পাইপলাইন অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে এডিবি-অর্থায়িত রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট ও রিলায়েন্স মেঘনাঘাট ৭১৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র নির্মাণ শেষ হয়েও চালু হয়নি।

বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও এসব প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশকে ওসিআর ঋণের আওতায় উচ্চমাত্রার ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে; যা অর্থনৈতিক সংকট আরও বাড়াচ্ছে।