বেসামাল নিত্যপণ্যের বাজার, সিন্ডিকেট ঠেকাবে কে?

বাংলাদেশের মানুষের চিরস্থায়ী দুঃখের নাম নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি। বাজারে অস্থিরতা স্বাভাবিক ঘটনায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারের ওপর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই কারও। সিন্ডিকেটে বন্দি দ্রব্যমূল্য। বাজারে পণ্যের মজুত থাকলেও বাড়ে দাম। পণ্যের দাম বৃদ্ধির এ ধারা পবিত্র রমজান মাস এলে আরও বেড়ে যায়। পণ্যের মজুত থাকলেও সৃষ্টি করা হয় কৃত্রিম সংকট, বাড়ানো হয় দাম। এতে বিপাকে পড়েন ক্রেতারা। 

নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানোর নির্দেশ দিয়েছেন। নির্দেশনা পেয়ে কাজ শুরু করেছে সরকার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। এ কাজের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে মন্ত্রিসভা, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও ইউএনওদের। তবে, এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন ও তা কার্যকরের সম্ভব্যতা নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট সন্দেহ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দ্রব্যমূল্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এ অবস্থার প্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বেশকিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মধ্যে যেসব কারণে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ছে, সে কারণগুলো শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর এর অংশ হিসাবে বাজার বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, ক্রেতাদের সংগঠনসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে  রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) বৈঠক করবেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

সিন্ডিকেটের কবলে বাজার ব্যবস্থা

সব পণ্যের দাম আকাশছোঁয়ার মূল কারণ অসাধু সিন্ডিকেট। যার হাতে জিম্মি ছিলো দেশের বাজার ব্যবস্থা, যা এখনও বিদ্যমান। এ সিন্ডিকেট বাজারে পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি করাসহ পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিতে ভাসমান জাহাজে পণ্য মজুত করে। সরকারের পক্ষ থেকে বার বার অনুরোধ ও পরবর্তীতে অভিযান পরিচালনা করেও তা রোধ করা যায়নি।

পণ্যের দাম বাড়াতে ব্যবসায়ীরা নিত্যনতুন কৌশলে লিপ্ত। তারা নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য এক বা একাধিক পণ্যকে টার্গেট করে পরিকল্পিতভাবে দাম বাড়াচ্ছেন। আর কৌশলে যুক্ত করেছে আড়তদার, কমিশন এজেন্ট ও ডিও প্রথার মতো কারসাজি।

চ্যালেঞ্জের মুখে নতুন সরকার

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও নিজেদের মেয়াদেও বাজারের কোনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করতে পারেনি। বরং কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চমাত্রায় থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার।

অভিযোগ রয়েছে, সবশেষ কয়েকটি সরকারের অংশীদার ছিলেন ব্যবসায়ীরা। এর জেরে তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। অংশীদারত্বের সুযোগে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কেটেছে।

এমতাবস্থায় সিন্ডিকেট নিয়ে নতুন সরকারও রয়েছে বিপাকে। ইতোমধ্যে সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন
হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার কথা জানিয়ে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, “সাধারণ নিম্নআয়ের মানুষ ঠিক মতো খেতে না পারলে, মাফিয়াদের বাড়িতেও রান্না হবে না।”

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর বাজার মনিটরিংয়ের নির্দেশ দিয়ে দেশের সব ডিসিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভাগীয় কমিশনারদেরও এ চিঠি পাঠানো হয়েছে। ফলে এখন জেলা পর্যায়ে বাজার মনিটরিং চলবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, জেলা পর্যায়ে বাজার মনিটরিং কঠোরভাবে করতে হবে। কারণ, বিগত সময়েও এ ধরনের চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম চোখে পড়েনি।

কি বলছেন বাণিজ্যমন্ত্রী
 
দায়িত্বভার গ্রহণ করে নতুন বাণিজ্যমন্ত্রী আব্দুল মোক্তাদির বলেছেন, “দ্রব্যমূল্য নিয়ে কোনো ‘সাউন্ড বাইট’ নয়, বরং কাজের মাধ্যমে ফল দেখানো হবে।” তিনি আরও বলেছেন, “দেশে রমজানের পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত ও সরবরাহ রয়েছে। পণ্য নিয়ে ভোক্তাদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। রমজান ও পরবর্তী সময়ের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত সরকারের হাতে রয়েছে এবং পাইপলাইনেও পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে বাজার নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বাজার তদারকি ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।”

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য

রমজান এলেই দাম বাড়ে বিভিন্ন পণ্যের। এ তালিকায় রয়েছে খেজুর, ছোলা, লেবু, শসা থেকে শুরু করে বিদেশি ফলও। আমদানিকৃত পণ্যের দাম বৃদ্ধির জন্য আমদানিকারকদের দুষছেন পাইকাররা। তাদের মতে, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ায় আমদানিকারকরা। যার ফলে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে।

কাওরান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বন্দর থেকে এসব পণ্য খালাস করে সেগুলো নিজেদের লাইটার জাহাজে মজুত করে রাখে আমদানিকারকরা। এর মধ্য দিয়ে তারা বাজারে পণ্যের সংকট বলে একটা আওয়াজ তুলতে চায়। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে পারলেই তাদের লক্ষ্য সফল। সুযোগ বুঝেই তারা সকল পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। সেক্ষেত্রে আমাদেরও দাম বাড়ানো ছাড়া কোনও পথ থাকে না। এ নীল নকশার অংশ হিসেবে ছোলা ও চিনির দাম বেড়েছে।”
 
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজির হোসাইন বলেন, “নিত্যপণ্যের বাজারে লাগাম টানতে বিগত সরকার আলু, পেঁয়াজ ও ডিমসহ অনেক পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। যদিও এসব পণ্যের দাম কার্যকর করা যায়নি। আলু, ডিম, সয়াবিন তেল, পেঁয়াজ নিয়ে কারা কারসাজি করছে তার তথ্য সরকারের জানা। কারও বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”

তিনি আরও বলেন, “পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে। নিত্যপণ্য সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণের পাশাপাশি ভোক্তাদের সমঅংশগ্রহণ দরকার। নিত্যপণ্যের কারসাজি রোধে বিদ্যমান আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে যথাযথ আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বাজারে কোনও মহল বা গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে প্রভাব বিস্তার করতে চাইলে কঠোর হস্তে দমনের জন্য প্রতিযোগিতা কমিশন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে হবে।”