জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত, বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি 

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে ঘিরে দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ায় একশ্রেণির মানুষ ও ব্যবসায়ী অবৈধভাবে তেল মজুতের দিকে ঝুঁকছেন। সরকার বারবার জ্বালানি সংকট না হওয়ার আশ্বাস দিলেও সেই বার্তায় পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারছেন না অনেকেই। ফলে বাসাবাড়ি, গ্যারেজ, এমনকি মাটির নিচেও বিপজ্জনকভাবে জ্বালানি তেল সংরক্ষণের প্রবণতা বাড়ছে, যা তৈরি করছে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি। 

বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতি অতিরিক্ত তেল কিনে মজুত না করার আহ্বান জানালেও বাস্তবে তার প্রভাব খুব কম দেখা যাচ্ছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পের সামনে দীর্ঘ যানবাহনের লাইন সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলছে। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে কিছু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও অতিরিক্ত মুনাফার আশায় জ্বালানি তেল মজুত করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।   

বিস্ফোরণের ঝুঁকি বাড়ছে   

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা বলছেন, অনিরাপদ পরিবেশে তেল সংরক্ষণ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণের কারণ হতে পারে। জ্বালানি তেল অত্যন্ত দাহ্য হওয়ায় সামান্য আগুনের স্পর্শেই বড় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। 

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মতে, অনুমোদিত নিরাপদ স্টোরেজ ও নির্ধারিত নিরাপত্তা মান বজায় না রেখে জ্বালানি সংরক্ষণ করলে প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়।  

দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান  

শুক্রবার (২৭ মার্চ) চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা থানার শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রায় ৬ হাজার লিটার অবৈধভাবে মজুত করা ডিজেল উদ্ধার করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুব্রত হালদারের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) ও পুলিশের সদস্যরা অংশ নেন। ঘটনাস্থল থেকে ৩০টি ড্রাম ও তেল লোডিং-আনলোডিং পাম্প জব্দ করা হলেও কাউকে আটক করা যায়নি। জব্দকৃত সরঞ্জামের আনুমানিক মূল্য প্রায় আট লাখ টাকা।  

পুলিশ ও প্রশাসন জানায়, জ্বালানি সংকটের আশঙ্কাকে কাজে লাগিয়ে এক ব্যবসায়ী পানির ট্যাংকে ডিজেল মজুত করে বেশি দামে বিক্রির পরিকল্পনা করেছিলেন।   

একই দিনে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে দুই প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ এলপিজি গ্যাস, অকটেন ও পেট্রোল উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠান দুটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।  

এর আগে বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) রাতে ময়মনসিংহের শেরপুরে একটি পাঁচতলা আবাসিক ভবনের নিচতলায় নিয়মবহির্ভূতভাবে ২৫ হাজার লিটার জ্বালানি তেল মজুত রাখার দায়ে এক ব্যবসায়ীকে জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং একদিনের মধ্যে ট্যাংক অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। 

২৪ মার্চ মাদারীপুরের শিবচরে তিন দোকান থেকে ১০০ লিটার পেট্রোল উদ্ধার করা হয়। একই দিন টাঙ্গাইলের সখীপুরে অভিযান চালিয়ে ৫ হাজার ১৮০ লিটার পেট্রোল ও ডিজেল জব্দ করা হয়। উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে এসব তেল অবৈধভাবে মজুত করা হয়েছিল।  

বিশেষজ্ঞদের সতর্ক বার্তা  

বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, “অবৈধভাবে জ্বালানি মজুত করা শুধু বেআইনি নয়, অত্যন্ত বিপজ্জনকও। বিশেষ করে পেট্রোল ও অকটেন দ্রুত বাষ্পে পরিণত হয়। ওই বাষ্প কোনও আগুনের উৎসের সংস্পর্শে এলে তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ ঘটতে পারে।”   

বিস্ফোরক অধিদফতরের পরিদর্শক মো. আলিম উদ্দিন বলেন, “লাইসেন্স ছাড়া জ্বালানি তেল বিক্রি বা সংরক্ষণ পেট্রোলিয়াম আইনের পরিপন্থি। আবদ্ধ স্থানে তেল মজুত থাকলে সামান্য স্পার্ক থেকেও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”   

ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজাহান সরদার জানান, নিরাপত্তার স্বার্থে অনুমোদিত ডিলারদের কাছ থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং ফায়ার সার্ভিস অনুমোদিত স্থাপনাতেই সংরক্ষণ করা উচিত।  

পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুত করা অন্যায়। আমরা এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী বা ব্যক্তি অতি লাভের আশায় বাসা-বাড়িসহ নানা জায়গায় জ্বালানি তেল মজুত করছেন। তবে এটা ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা নিয়মিত এর বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছি। তেল উদ্ধার ও আটকও করা হচ্ছে।” 

জেলায় জেলায় ‘ভিজিলেন্স টিম’  

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জ্বালানি বাজারে কৃত্রিম সংকট বা অবৈধ কারবার ঠেকাতে প্রতিটি জেলায় ‘ভিজিলেন্স টিম’ গঠন করেছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, এসব তদারকি দল অভিযোগ গ্রহণ, নজরদারি জোরদার এবং তাৎক্ষণিক অভিযান সমন্বয়ে কাজ করবে।   

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, সমন্বিত নজরদারি বাড়ানো গেলে অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। 

জ্বালানি তেল মজুতদারির তথ্য দিলে মিলবে পুরস্কার  

দেশে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট রোধে অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। এখন থেকে জ্বালানি তেল অবৈধভাবে মজুত করার সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করা হবে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। শুক্রবার (২৭ মার্চ) এক বার্তার মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়েছে।   

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি তেলের সরবরাহ তদারকি করতে ইতোমধ্যে দেশের সব জেলায় ভিজিলেন্স টিম গঠন করা হয়েছে। অবৈধ মজুতদারি বন্ধে যারা তথ্য দিয়ে সহায়তা করবেন, তাদের জন্য দ্রুতই আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কারের ঘোষণা আসতে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে সচেতন নাগরিকদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও পরামর্শ প্রদানের জন্য অনুরোধ জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।