ব্যাংকের করপোরেট কর কমানো ও ট্রেজারি বন্ডের মূলধনি আয়ে করমুক্তির দাবি

আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে দেশের ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো বিভিন্ন কর–সংক্রান্ত প্রস্তাব দিয়েছে। ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) ব্যাংকগুলোর করপোরেট করহার কমিয়ে ৩০ শতাংশ বা তার নিচে নামিয়ে আনার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মূলধনি আয়কে করমুক্ত করার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।

বুধবার (১ এপ্রিল) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে রাজস্ব ভবনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সম্মেলন কক্ষে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রাক্‌–বাজেট আলোচনায় এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান।

আলোচনায় ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজার–সংশ্লিষ্ট আটটি সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সংগঠনগুলো হলো—অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি), বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই), ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ), সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল), বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) এবং বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ)।

সভায় এবিবির চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন বলেন, কিছুদিন আগেও ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মূলধনি আয়ের ওপর কোনো কর ছিল না। বর্তমানে এ আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ কর দিতে হচ্ছে, যা প্রত্যাহার করা প্রয়োজন।

জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, ট্রেজারি বন্ড থেকে পাওয়া আয়ও ব্যাংকের একটি আয়। ব্যাংক তাদের অন্যান্য আয়ের ওপর সাড়ে ৩৭ শতাংশ কর দেয়, কিন্তু ট্রেজারি বন্ডের অগ্রিম আয়কর মাত্র ১৫ শতাংশ। সেটি কেন সাড়ে ৩৭ শতাংশ হবে না—সেটিই প্রশ্ন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আলোচনায় এবিবির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, বর্তমানে বেশ কয়েকটি ব্যাংক মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে এবং অনেক ব্যাংক নগদ লভ্যাংশ দিতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর জন্য কিছু করসুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। বিশেষ করে শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে রাখা নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশনিংকে ব্যয় হিসেবে গণ্য করার দাবি জানানো হয়।

এ বিষয়ে এবিবির ভাইস চেয়ারম্যান ও পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, ২০০৬ সালের আগে শ্রেণিকৃত ঋণের বিপরীতে রাখা প্রভিশন ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হতো। পরে প্রজ্ঞাপন জারি করে সেটিকে করযোগ্য করা হয়।

জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, প্রভিশনিংয়ের পরবর্তী ধাপ হলো রাইট–অফ বা অবলোপন। রাইট–অফ করা হলে সেটি ব্যয় হিসেবে দাবি করা যায়। তবে ব্যাংকগুলো যথাযথভাবে রাইট–অফ প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সভায় এবিবির প্রতিনিধিরা আরও বলেন, বর্তমানে ১০ লাখ টাকার বেশি মেয়াদি আমানত বা ২০ লাখ টাকার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্নের প্রমাণপত্র (পিএসআর) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে অনেক অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলে আসছে না।

এ বিষয়ে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, যারা নিয়মিত কর দেন তারাই বারবার করের চাপ বহন করছেন। এই করবৈষম্য দূর করা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এজন্য আয়কর রিটার্নের প্রমাণপত্রের বিধান রাখা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

এসএমই কোম্পানির জন্য কর অবকাশের প্রস্তাব

আলোচনায় পুঁজিবাজারের উন্নয়নে বেশ কিছু প্রস্তাব দেয় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম বলেন, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এসএমই খাতের কোম্পানিগুলোর জন্য পাঁচ বছরের কর অবকাশ দেওয়া হলে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে উৎসাহিত হবে। এতে কোম্পানির সক্ষমতা ও কর্মসংস্থান বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে সরকারের রাজস্বও বাড়বে।

এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে অনিবাসী ব্যক্তি বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মূলধনি মুনাফার ওপর পাঁচ বছরের জন্য কর অব্যাহতির প্রস্তাবও দেয় ডিএসই। বর্তমানে এই করহার ১৫ শতাংশ।

তবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা ও আস্থা তৈরি হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবেই আসবেন। বিদেশি বিনিয়োগকারী বা এসএমই কোম্পানির জন্য কর অব্যাহতি দেওয়ার পরিকল্পনা আপাতত নেই বলে জানান তিনি।

বিমা খাতের কর কমানোর দাবি

সভায় বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাঈদ আহমেদ বলেন, বর্তমানে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করপোরেট করহার সাড়ে ৩৭ শতাংশ। কিন্তু ব্যাংকের তুলনায় বীমা কোম্পানির আয় অনেক কম। তাই সেবা খাতের মতো বিমা কোম্পানির করহার ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি জানান তিনি।

অপরদিকে, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) রাজস্ব আহরণ বাড়াতে নিবন্ধিত সব কোম্পানিকে কার্যকর তদারকির আওতায় আনার পরামর্শ দেয়। সংগঠনটির মতে, দেশে অনেক কোম্পানি নিবন্ধিত থাকলেও এর মধ্যে মাত্র কয়েক হাজার নিয়মিত কর পরিশোধ করে।

সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেন, বর্তমানে দেশের কর–জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। এক বছরের মধ্যে এটি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি খুব শিগগির অনলাইনে আয়কর রিফান্ড ব্যবস্থা চালু করা হবে। এতে করদাতারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের প্রাপ্য কর ফেরত পাবেন।